ধারাবাহিক

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ২৩

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ ‘সত্যমানুষ’। সত্য প্রতিষ্ঠায় অতন্দ্র প্রহরীর কাজ করেছেন সারাজীবন। কঠিন হস্তে ধরেছিলেন হাল। সত্য প্রতিষ্ঠার এই মিশনে রাইট টাইম, রাইট প্লেস, রাইট ম্যান এর এমন সুনিপুন সমন্বয়ের কাজটি করেছেন যা পর্যবেক্ষণ করে বিস্ময়ে অভিভুতই হতে হয়।

সত্য নিয়ে বিতর্কের কোন শেষ নেই। প্রশ্ন এসে যায় সত্য ছাড়া কি কিছু আছে? “সত্য কি” – এই প্রশ্নের জবাবে সত্য মানুষ শেখ আবদুল হানিফ সুবিদিত এই বাগধারাটি উল্লেখ করলেন ‘যাহা নিত্য তাহাই সত্য’, স্বেচ্ছাশ্রম সম্পর্কে বললেন ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’। সত্য সম্পর্কে বললেন ‘সত্য শাশ্বত, সত্য জাগতিক’।

সত্য প্রতিষ্ঠার কথা আসলে এই প্রশ্নগুলো এসেই যায় – সত্য কি, কোন সত্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা কাকে বলে, কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়? বিশেষ করে সত্যের ধারনাটি পরিষ্কার থাকতে হয়। সত্য শাশ্বত তাতে নেই কোন ভুল, সত্য চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়, এক, অদিতীয়, অখন্ড এবং সবসময়ই বর্তমান কিন্তু তার প্রকাশ-বিকাশ বহু বৈচিত্রময় বহুরূপে, বহুভাবে যা বিজ্ঞানময়, একে প্রকাশ-বিকাশ বিজ্ঞানও বলা হয় যা পরিবর্তন-বিবর্তন-রূপান্তরের মাধ্যমে গতিশীল। সত্যের বহু বিচিত্র, বিজ্ঞানময়, প্রকাশিত, বিকশিত এই রূপ নিয়েই যত বিতর্ক। এই প্রসঙ্গে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর একটি বানী উল্লেখযোগ্য – ‘সব জানার নাম অজ্ঞান, এক জানার নাম জ্ঞান-বিজ্ঞান’। সত্যমানুষ সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন ‘সবচেয়ে কম বুঝা কি? সবচেয়ে কম বুঝা হলো ‘এক’ বুঝা’। আবার এও বলেছেন ‘আমি আপনাদের মত পন্ডিত না, আমি দুই বুঝি, আমি ‘আনারকে (সূফী সাধক আনোয়ারুল হক)’ বুঝি আর হাক্কানী বুঝি’।

এমন গুরুভক্ত সাধক মিলা ভার। সাঁঈজীর ভাষায় বলতে হয় ‘ভবে মানুষগুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তাঁর।’ গুরু’র আগে পৃথিবী থেকে চলে যেতে চেয়েছিলেন, অনুমোদন পাননি। তাই গুরু চলে যাওয়ার আগে (৯৯ সনের আগে) একদিন বলেছিলেন ‘আমার মালিক আমাকে রেখে গেলে আমি পৃথিবীকে একটা নাড়া দিব’। আর একদিন বলেছিলেন, ‘একদিন বাংলার আনাচে-কানাচে থেকে হাক্কানী হাক্কানী রব উঠবে’। উনি সত্যমানুষ অবশ্যই সত্য বলেছেন। আমাদের পর্যবেক্ষনী দৃষ্টিই একমাত্র এই নাড়া দেয়ার স¦রূপটি বের করতে পারবে। সারা বিশ্বের সত্যানুসন্ধানীদের একসূত্রে গাঁথার প্রচেষ্টার অন্ত ছিলোনা। নিজেকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোপন রেখে কার্যক্রম চালিয়েছেন বাংলাদেশ ও সারাবিশ্বে যেখানে প্রয়োজন। সঙ্গে সঙ্গে চলেছে মানুষ তৈরী করার কাজটি। রেখে গেছেন এক বিরাট বাহিনী। বপন করে গেছেন অসংখ্য বীজ যা একসময় বটবৃক্ষে রূপ নেয়ার অপেক্ষায় যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান থাকবে। তিন হাজার বছর পরের চিন্তা করে যে কাজ করে গেলেন তা এত সহজে দৃষ্টিগোচর না হওয়াই স্বাভাবিক। স্বল্পমেয়াদী কার্যক্রমগুলো সহজে দৃশ্যমান হয়। দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রমগুলো থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে দূরদৃষ্টি ছাড়া তা ধরা যায় না। কাজেই আজকে যেই বীজ বপন করলেন একসময় তাহাই বটবৃক্ষে রূপ নিবে আর তখনই সারাবাংলা জুড়ে, বাংলার আনাচে কানাচে থেকে সাড়া পড়ে যাবে। সেই সাড়া পড়ার রূপটি কিরূপ হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে পৃথিবী নাড়া দেয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।

জাগতিক সেট আপটা কি সেভাবেই ঠিক করে গেলেন যেন সেই সেট আপ এর মধ্য দিয়ে দুদিক থেকে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন ভিতরে বাহিরে, বস্তুজগতে-সূক্ষজগতে, প্রতিষ্ঠানিকতায়-আধ্যাত্মিকতায়। যারা হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রী তারা এ বিষয়ে সম্যক অবগত। এমন কথা বলা ঠিক হবেনা- যে বিষয়ে কোন সুষ্পষ্ট প্রমান নেই আমাদের হাতে তবে গবেষণা হতে পারে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ লোকান্তরিত হবার আগে কেন চীন ভ্রমনে গেলেন, সেখানে এক সাধকের মাজারে গেলেন। চীন থেকে এসে চীনের ব্যপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দিলেন। চীন সম্পর্কে এতকাল শুধু নেতিবাচক কথাই শুনে এসেছি কিন্তু উনি চীন সম্পর্কে সব ইতিবাচক কথাই বলেছেন। আর একটা কথা বলেছেন উনি দুই জায়গায় রক্ত দিয়েছেন ভারত ও চীনে। এভাবেও বলেছেন চীন আর ভারত আমার কাছ থেকে রক্ত নিয়েছে। গাড়ির দরজার বাড়ি খেয়ে ওনার আঙ্গুল থেকে রক্ত ঝরেছে চীনে। কি বুঝালেন জানিনা তবে এটুকু বলা যায় চীনে উনি বিশেষ কোন কাজ করেছেন যা আমরা জানিনা। ওনার চলে যাওয়ার পর চীন থেকে শুরু হলো করোনার যাত্রা যা সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে যত মহামারি এসেছে সেগুলো ছিলো একেকটা অঞ্চলে। একমাত্র করোনাই সারাবিশ্বকে একযোগে নাড়া দিয়েছে যা আমাদের চিন্তনে নাড়া দিয়েছে। আর করোনা মানবজাতির জন্য আশির্বাদরূপেই এসেছে সত্যপথের যাত্রীদের চিন্তন তাই বলে।

চলে যাওয়ার আগে বর্তমান সংলাপের যে শেষ সংখ্যাটি ওনার সম্পাদনায় বেরিয়েছে তাতে হেডলাইনে ছিলো সময়টা সাধারণ সময় নয়, পথ চল বন্ধ হয়না। পূবেই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছিলেন, প্রশ্ন করেছিলেন আমরা বর্তমান সংলাপের হেডলাইনগুলো পড়ি কিনা এবং মাসে যে চারটা সংখ্যা বের হয় তাতে রাষ্টীয় চিত্র থাকে। ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তিনতলায় ওনার টেবিলে পূর্বদিক ফিরে সোজা হয়ে বসে কিছু কথা বললেন আর এই তারিখটা স্মরনে রাখতে বললেন। প্রথমেই বললেন মাসে বর্তমান সংলাপের যে ৪ টা সংখ্যা বের হয় তার মধ্যে প্রত্যক্ষ করলে সে সময়ের রাষ্ট্রীয় চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। ৩০/৪০ বছর পর মন্দির মসজিদ গীর্জার অবস্থান কি হবে তাও বললেন। হিউম্যান রেস আর এক রকমে যাত্রা শুরু করবে। একটা আইন মানুষকে মানতে হবে যা রাষ্ট্রীয় আইন। একজন মানুষের পক্ষে একসঙ্গে অনেক আইন মানা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে ইস্টার্ন ব্লক কাজ শুরু করবে। হাক্কানী চিন্তনপীঠ ডিসেন্ট্রালাইজেশনের জন্য কাজ করছে, এই পদ্ধতিতে সমাজকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যায় কিনা।

১০ বছর আগে থেকে বলা শুরু করেছেন, আজ থেকে ৫০ বছর পর পৃথিবীতে মানুষ আধ্যাত্মিকতা ছাড়া বাঁচতে পারবেনা। ৫০ বছর পর পৃথিবীতে মেয়েরা এগিয়ে যাবে। ৫০ বছর পর এশিয়ানরা সাদা চামড়াদের তাড়াবে। সময়ের হিসাবে দেখা যাচ্ছে এখন থেকে ৩০/৪০ বছর পর পৃথিবী একটা অবস্থানে যাবে। মাঝখানের সময়টা হবে একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড যা শুরু হয়ে গেছে, যা এখন চলমান।

আর একদিন বলেছিলেন ‘কোনকিছুকে নিগেটিভ দেখবেন না, সবকিছুকে পজিটিভ দেখবেন, নিগেটিভ এর মধ্যে পজিটিভ আছে পজিটিভ এর মধ্যে নিগেটিভ আছে’। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-কে একজন প্রশ্ন করেছিলেন ‘হুজুর আল্লাহকে পাওয়া যায় কিভাবে’,উনি উত্তর দিয়েছিলেন,‘আমি মুখ্খু সুখ্খু মানুষ, আমার এই গালে চড় দিলে আলহামদুলিল্লাহ, ঐ গালে চড় দিলেও আলহামদুলিল্লাহ’। কি চমৎকার কথা! আমরা সবসময় একটা কথা ব্যবহার করি বুঝে হোক, না বুঝে  হোক, মতলবে হোক, নিজের দোষ ঢাকার জন্য হোক,  বলি আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্য করেন। কেন বলি, মঙ্গলই বা কি? (চলবে)

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক


সুবিশাল জগৎ সংসারে অনন্ত গতিময় জীবন প্রবাহে সৃষ্টির বৈচিত্র্যময়তা রয়েছে অক্ষুন্ন। পৃথিবীও নিজস্ব নিয়মে অব্যাহত রেখেছে এই ধারা। এখানে জীবন আসে জীবন যায়। ফেনায়িত সৃষ্টি-সাগরে সামান্য বুদবুদ সমান অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিটি মানুষ আসে এবং যায়। তবু এই সাধারণ নিয়মটাকে ব্যতিক্রমে বিভাসিত করেন কেউ কেউ। তফাতটা শুধু অস্তিত্বের দীর্ঘস্থায়ীত্বের অর্থাৎ সময়ের। এর পেছনের মূল যে সত্য প্রধান ভূমিকা রাখে তা হচ্ছে ‘কল্যাণ-ব্রত’। ‘অন্যের জন্যে আমি’ – এই কর্ম সাধনায় তাঁরা অতিবাহিত করে যান সমগ্র জীবন। কল্যাণিত জীবন সমষ্টিই তাই ঋণী চেতনায় ‘একক জীবন’-কে ধরে রাখে। আত্মশক্তিতে ও সত্যে তাঁরা অধিকার করে নেন অনুগত জীবনের উপাচার। ‘একক জীবন’-কে ঘিরে বিচিত্র জীবনের যে সমাগম, তাদের কেউ সত্যকে, কেউবা শক্তিকে গ্রহণ করেন। স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও দু’য়ের কাছেই তিনি উপনীত হন মহাপ্রাণ-এ। দু’য়ের কাছেই তিনি হন স্তুতির ‘রূপ’। রূপ থেকে রূপান্তরে যাত্রা তাই সেই সব ‘মহাপ্রাণ’-দেরকে ক্ষয়িষ্ণু সত্তায় নয় বরং ক্রমশ জীবন্ততর করে তোলে সময়ের অভিযাত্রায়। এই ধূলিধরা থেকে লোকান্তরিত এমনই এক মহাপ্রাণ – ‘সুলতানুল আউলিয়া আলহাজ্ব হযরত শাহ্ কলন্দর সূফী খাজা আনোয়ারুল হক রওশন জমির মাদ্দা জিল্লাহুল আলী’। মানবতার মহান সাধক তিনি। তথাকথিত ধর্ম-ধারণা থেকে সম্পূর্ণরূপে এক ভিন্ন ও মূল সত্যে প্রতিষ্ঠিত ধর্মবোধকে পুনরুজ্জীবিত করে তিনি আত্মোৎসর্গ করেছেন মানুষেরই কল্যাণ-ব্র্রতে।

বিরল ব্যক্তিত্ব আগমনেই রেখে থাকেন আগামীর ইঙ্গিত। খুব সাধারণ ধারায় ঘটে না তাঁদের আগমন বা আবির্ভাব। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে তাঁরা অভিবাদন গ্রহণ করেন পৃথিবীর, প্রকৃতির। জননী ও জনকের নিবিড় আকাঙ্খার সাত্ত্বিক প্রকাশ হয়ে তাঁদের প্রথম কান্না ধ্বনিত হয় জাগতিক বলয়ে। সূফী সাধক খাজা আনোয়ারুল হক আবির্ভূত হন এই ধারায় মা-বাবার বহু আকাঙ্খার বহু সাধনার ধন রূপে। তাঁর মায়ের কন্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে সেই সত্য – ‘ওকে আমি মাজারে মাজারে ঘুরে পেয়েছিলাম।’ তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন কলকাতার হ্যারিসন রোডে দুই তলা বাসার পশ্চিমের ঘরে। অবিভক্ত বাংলায় ১৯৩৬ সালে। বাংলা সন হিসেবে ১৩৪৩-এর ১৭ অগ্রহায়ণ, বুধবার সকাল ১১টায়। বাবা মজর উদ্দিন ভূঁইয়া ও মা ছায়েদা আখতার – দীর্ঘদিন বিভিন্ন পীর-ফকির, মাজার-দরবার, দান-দক্ষিণার পর লাভ করেন তাঁকে। কিন্তু দুর্লভ এই সন্তান দুর্লভই হয়ে রইলেন জগতের বুকে।

অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় আবির্ভূত হয়ে তাঁর মন-মানসিকতাও শৈশব থেকে ছিল রাজসিক। রাজধানীর বিলাসপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মহান সাধক পরিবারের সাথেই দেশ বিভাগের সময় চলে আসেন বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কিশোরগঞ্জে। পিতার পথ অনুসরণ করে তিনিও আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নেন ব্যবসা। কিশোরগঞ্জ শহরেই ছিল তাঁর কাপড়ের দোকান। স্বাধীনচেতা মানুষকেই সচরাচর ব্যবসাকে অবলম্বণ করতে দেখা যায়। চাকরি করা মানেই অন্যের গোলামী করা – তিনি নিজেই তা বলতেন। আজীবন তিনি স্বাধীন জীবন-যাপন করেছেন। আপন ভূবনে আপনিই বাদশাহী করেছেন।

সংসারের জটিল আবর্তে তিনি বাঁধা পড়ে থাকেননি। যদিও পারিবারিকভাবেই তিনি বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন ষাট দশকে (সম্ভবত ১৯৫৫/৫৬ সালে)। দাম্পত্য জীবনে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী। যোগ্য স্ত্রীর সংস্পর্শে তিনিও তাঁর সাধনার গতিপথকে ত্বরান্বিত করতে পেরেছেন। দু’জনার মধ্যে কখনও বিবাদের ছোট খাটো অংশও প্রকাশ পায়নি। সংসার উদাসীন তিনি অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন মাজার-দরবারে ঘুরতেন। বিশাল সম্পত্তির মায়া ছিন্ন করে তিনি বাইরে বাইরে ঘুরতেন অন্তরে প্রোথিত সত্য সন্ধানী সত্তার উদ্বেলতায়। প্রচুর অর্থও নিজে দু’হাতে নিঃসঙ্কোচে ব্যয় করেছেন এ পথেই। অবশেষে তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন খুঁজে পেলো তাঁর কাঙ্খিত আশ্রয়। আত্মবিকাশের সঠিক মাধ্যম। দর্শন পেলেন, আত্মসমর্পিত হলেন ‘কান্দুলিয়ার মৌলভী’ অর্থাৎ হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দিন শাহ্ কলন্দর গউস পাক্-এঁর চরণে। নিখাদ প্রেমের তরী ভাসালেন গউস পাক-এঁর হৃদয় সাগরে। কর্ম ও ত্যাগের সাধনায় তাঁর একনিষ্ঠতা তাঁকে মুক্তির সনদ এনে দিল।

পরশ পাথরের পরশে ‘ভাটির ছেড়া’ (তাঁর হুজুর তাঁকে এ নামেই ডাকতেন) হলেন স্বতন্ত্র এক পরশ পাথর। সাধনার এই পর্যায়ে বৈশ্বিক মানবতার অনুধ্যান নিয়ে তিনি হলেন সংসার ত্যাগী। তবে পরিবারে তখন তাঁর মা, স্ত্রী, ছেলেরা বা ভাই-বোনদের কারো প্রতিই তিনি অবিচার করেননি। ব্যবসা-সম্পত্তি সব ছোট ভাই আজিজুল হক বাচ্চুর হাতে দিয়ে দেন। স্ত্রীকে পূর্ব থেকেই ইঙ্গিত দিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখেন। আর তাঁর মা তো জানতেনই যে – ‘ওর বয়স যখন এক বছর তখন এক সাধক ওকে দেখে বলেছিলেন, ‘মা’ তুই এ ছেলেকে কোন বন্ধন দিয়েই ধরে রাখতে পারবি না।’ সাধনার সন্তান হারালো সাধনায়। তবে মাতৃভক্তি ছিল তাঁর চরম। তাঁর যারা অনুসারী বা তাঁর কাছে যারাই আসতেন তিনি তাঁদেরকে ‘মা’-এর প্রতি অনুরক্ত হতে উপদেশ দিতেন। তিনি বারবারই বলতেন যে, মায়ের ঋণ কখনো শোধ করা যাবে না।

গউস পাক্ বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁকে খাঁটি পরশ পাথরে পরিণত করেছেন। সে সব অনেক ঘটনাই তিনি বলেছেন। যা ‘বর্তমান সংলাপ’ পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে ইতোপূর্বে। অনেকেরই জানা আছে সে সব ঘটনা। জানা যায়, ‘শাহ্ সূফী হওয়ার পর তিনি প্রথম অবস্থান করেন ছাতিরচরে। অতঃপর সেখান থেকে তিনি এলেন রাজধানী ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলিতে। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনি ধানমন্ডিতে অবস্থান নেন। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিলাসবহুল রাজধানীতে যাঁর জন্ম রাজধানীতেই তাঁর লোকান্তর। যদিও তফাৎটা এপার বাংলা – ওপার বাংলা। ঢাকার বিলাস বহুল ধানমন্ডিতে তিনি হাক্কানী খান্কা শরীফ স্থাপন করে তাঁর মুর্শিদের হুকুমেই গড়ে তোলেন তাঁর রাজত্ব। কিন্তু শুধু ঢাকা কেন্দ্রিকই ছিল না তাঁর কর্মসাধনা, দেশ তথা উপমহাদেশ তথা সমগ্র এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অঞ্চলে ছড়িয়েছেন তাঁর সাধনার দীপ্তি। গ্রামে-গঞ্জের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মাঝে মানবতার ধর্মকে প্রসারিত করে দিয়েছেন। ভাববাদী ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে তিনি ধর্মান্ধতাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি। তাঁর সংস্পর্শে যিনি এসেছেন তিনিই উপলব্ধি করতে পেরেছেন প্রকৃত ধর্মের স্বরূপ।

ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করতে সারা দেশব্যাপী তিনি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে স্থাপন করেছেন হাক্কানী খানকা শরীফ, আস্তানা শরীফ, দরবার শরীফ, হাক্কানী কমপ্লেক্স প্রভৃতি। তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠা সেই একই লক্ষ্যে – ‘ধর্ম মানবতার জন্য, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্য নয়’। হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ, হাক্কানী মিশন মহাবিদ্যালয় – তাঁর শিক্ষানুরাগকেই প্রকাশিত করে। বর্তমান হলুদ সাংবাদিকতার জগতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নির্ভীক হওয়ার জেহাদে রত, সৃজনশীল ও আত্মিক সেবা সহায়তা দানের অভিপ্রায়ে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ তাঁর যুগোপযোগী আধুনিক চিন্তা-চেতনাকেই প্রতিভাত করে। তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট হয়েই ‘বর্তমান সংলাপ’ দৈনিকের পথে পদার্পণ করবে একদিন। কেননা একাধিকবার তিনিই একথা বলেছেন।

ধর্মের গোঁড়ামিকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দিতেন না। ‘সূফীতত্ত্ব সাধনার’ উন্মুক্ত চিত্ত বলয়ে তাঁর পরিভ্রমণ। শুভ্র বসনে সজ্জিত হয়ে যে শাহানশাহীতে তিনি থাকতেন, তা কারো কারো কাছে প্রশ্নবোধক হয়ে দেখা দিতো। কিন্তু যিনি তাঁর সঙ্গ লাভ করেছেন তিনিই দেখেছেন বাহ্যিক আবরণের আড়ালে তাঁর ত্যাগের চরমতম  নিদর্শন।

ভক্তবৃন্দের উপহার, উপাচার তিনি কখনোই ব্যক্তি স্বার্থে কুক্ষিগত করেননি। বরং তিনি মর্জি মাফিক তা বিলিয়ে দিয়েছেন ভক্তদের মাঝে। যে পুঁরুষ সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভের সাধনায় নিবেদিত, তাঁকে আর কী করে টানতে পারে জাগতিক সম্পত্তির মোহ? আত্মোন্নতির চরমতম পর্যায়ে উন্নীত হতে তিনি মজ্জুব অবস্থায়ও থেকেছেন। পথে পথে, নদীর ঘাটে নিজের সাধনায় একাগ্রচিত্তে মশগুল থাকতেন। খাওয়া-দাওয়া তুচ্ছ জ্ঞান করে ‘এক আল্লাহ্র’ ধ্যানে নিমগ্ন থেকেছেন তিনি। তাঁকে এক সপ্তাহ পর্যন্তও কোনো কিছু না খেয়ে থাকতে দেখেছেন অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ। ভক্তদের আনা বিচিত্র রকমের অভিজাত খাবার সামনে থাকলেও কখনই তিনি পেট ভরে তা খেয়েছেন বলে শোনা যায় না। খুব সামান্যই তিনি খেতেন। ঘুমের ক্ষেত্রেও তাঁর নিয়ন্ত্রণ পুরোমাত্রায়। তাঁর সাথে রাত জেগেছে এমন অনেককেই বলতে শোনা যায় তিনি আদৌ ঘুমাতেন না। অর্থাৎ নিজের প্রতি নিজের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর পুরোপুরি। আল্লাহ্র শক্তিতে শক্তিমান যিনি তাঁর কাছে অন্য কোনো বিরুদ্ধ শক্তিই কি প্রভাব ফেলতে পারে?

সফর প্রিয় ছিলেন তিনি। অধিকাংশ সময়ই তিনি সফরে সফরে থাকতেন। কখনো গাড়িতে, কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁটে তিনি সফর করেছেন দেশের আনাচে-কানাচে। তাঁর প্রতিটি সফর ছিল কার্যকারণ সম্পর্কিত। ধর্মকে কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তিনি শিক্ষা দিয়েছেন – ‘নিজের বিচার নিজে করো রাত্র-দিনে।’ আত্মবিশ্লেষণের সূক্ষ্মতায় আত্মোন্নয়নের পথে অভিযাত্রী রূপে গড়ে উঠতে তিনি দীক্ষা দিয়েছেন তাঁর অনুসারীদেরকে। ভালবাসায়, স্নেহে, আদরে, আপ্যায়ণে, আতিথেয়তায় তাঁর তুলনা চলে না। অনেকেই তাঁর কাছে আসতেন এসবেরই টানে। শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, জাগতিক কর্মানুশীলনের মাধ্যমেও তিনি অনেককেই দিয়েছেন নতুন জীবনের সন্ধান। তাঁর প্রতিটি কথায়, চলাফেরায়, ভঙ্গিমায়, চাহনিতে তিনি শিক্ষণীয় ইঙ্গিত রেখেছেন। যে যেভাবে বুঝেছে সে সেভাবেই তা গ্রহণ করেছে। দরবারী আদব ও তাঁর হুকুম যথাযথ পালন করতে পারলে অনেক মকসুদিই তার সমস্যার সমাধান করিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। আত্মপ্রচার বিমুখ ছিলেন বলেই ওলিকুল শিরোমনি হয়েও তিনি নিভৃতচারী জীবন-যাপন করেছেন। ‘মন চাইলে আইসেন’ – সূত্রে তাই তিনি আগন্তুকদের আহ্বান জানাতেন। কখনই তিনি নিজের সুপ্ত সাধন ভান্ডার যেচে কারোর সামনে প্রচার করেননি। কারণ তাঁর শিক্ষাই ছিল ‘ধনবান হও, প্রকাশিত হয়ো না’। যিনি তাঁর একান্ত অনুগ্রহের পাত্র শুধু তিনিই তাঁর প্রকৃত পরিচয় জানতে পেরেছেন।

২০ শ্রাবণ ১৪০৬, ৪ আগস্ট ’৯৯ বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে তিনি লোকান্তরিত হন। মা ভক্ত সাধক সন্তান মায়ের মৃত্যু তারিখকেই বরণ করে নিলেন নতুন পথে যাত্রার। পরিশেষে মায়ের পাশেই শায়িত হলেন তিনি। কিশোরগঞ্জ জেলার চান্দপুর গ্রাম আজ এই মহাপ্রাণের স্পর্শে পুনরুজ্জীবন লাভ করে হয়েছে ‘চান্দপুরশরীফ’। কল্লোলিত হয়ে উঠেছে তাঁর প্রেমিক, ভক্ত ও মকসুদিদের সমাগমে। এক মহামিলন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে চান্দপুরশরীফ। এর  ব্যাপ্তি দিনে দিনে প্রসারিত। জাগতিক দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আজ অন্তরালে থেকেই নিজেকে প্রকাশিত প্রসারিত করছেন বিশ্বাসীদের অন্তরে ও চিন্তা প্রবাহে। বিশ্বাসীদের কাছে তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী এক মহাপ্রাণ, যিনি অবশ্যই  প্রশংসার সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত ছিলেন-আছেন-থাকবেন।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে –

প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বীয় কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে

শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ আমাদের কর্মই আমাদেরকে নির্মাণ করে। আমরা যে যা করতে থাকি সে তা হয়ে যেতে থাকি। কর্মের মধ্য দিয়েই আমার থেকে সৃষ্টি হয় পরমপ্রকৃতি আমি। মানুষের সৃষ্টি হয়ে গেছে এমন ধারণা ঠিক নয়। মানুষ প্রতিদিন একটু একটু করে কর্মের মাধ্যমে নিজেকে সৃষ্টি করে। আমরা কিভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবো, কিভাবে নিজের কাছে অপ্রকাশিত ‘নিজ’কে প্রকাশিত করবো তা নির্ভর করে আমাদের সৃষ্টিশীলতার উপর। আমার ভেতরে পরমপ্রকৃতি আমি জেগে উঠবে কি-না, আমি জানবো কি-না কোন নতুন পৃথিবীর ঠিকানা, আমি যাত্রা করবো কি-না কোন এক অজানা, অন্তহীন, নতুন দিগন্তে তা নির্ভর করে আমি কোন্ কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ তার উপর। যে যা করে সে তাই হয়ে যায়। যে যা করছে সে প্রতিদিন তা হয়ে যাচ্ছে।

আবদ্ধতা দু’ প্রকারের। প্রথমত, আবদ্ধতা প্রকৃতি প্রদত্ত ও সহজাত। মায়ের পেটের ভেতরে শিশু আবদ্ধ থাকে। আবদ্ধ অবস্থায়ই মানুষের জন্ম হয়। ইন্দ্রিয়গুলো নতুন নতুন ক্ষুধা প্রাপ্ত হয়। আর এ সব ক্ষুধা নিবৃত্তির তাগিদে অনেকটা স্বয়ংক্রিয় ভাবে আসতে থাকে নতুন নতুন আবদ্ধতা। জীবন বিকাশের এক একটা স্তরে এক একটা বন্ধনে মানুষ আবদ্ধ হয়। আবদ্ধতা মানুষকে কষ্ট করে অর্জন করতে হয় না। কষ্ট করে অর্জন করতে হয় আবদ্ধতা থেকে মুক্তি। আবদ্ধ হয়ে জন্ম নেয়া, আবদ্ধ হয়ে বেড়ে উঠা কোন পরিতাপ বা আফসোসের বিষয় নয়। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আবদ্ধ অবস্থায় মরে যাওয়া। মানুষ একটা গরু জবাই করতে গেলেও জবাই করার আগে গলার বাঁধনটি খুলে দেয়। কিন্তু নিজে জবাই হবার পূর্বে নিজের গলার বাঁধনটি খুলতে চায় না। তাই মৃত্যুকে মানুষ ভয় পায়। মৃত্যুকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাতে পারে না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে না। আবদ্ধ অবস্থায়ই মানুষের মৃত্যু হয়। তাই জীবন থেকে জীবনের ধারাবাহিকতায় চলতে থাকে আবদ্ধতা।

ডোবার পানি আবদ্ধ। আবদ্ধ পানি বিষে পরিণত হয়। আবদ্ধ পানি থেকে চারিদিকে ছড়াতে থাকে দুর্গন্ধ। মানুষের জীবনের এই বিষাক্ত ডোবাটি হচ্ছে সংসার। খাওয়া, জন্ম নেয়া, জন্ম দেয়া এবং সংÑই এর সার। এই সার বিহীন সং এ যারা সর্বক্ষণ আবদ্ধ থাকে তাদের জীবন ডোবার পানির মতোই বিষাক্ত হয়ে উঠে।

আবদ্ধ শব্দের দ্বিতীয় অর্থ – সংযোগ, সম্পর্ক। সংযোগ ও সম্পর্ক অর্থে আবদ্ধতা হচ্ছে বদ্ধতা থেকে মুক্তির পথে যাত্রা। ডোবা যখন সাগরের সাথে সংযুক্ত হয় তখন সাগরের সাথে তার একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ডোবার সাথে সাগরের সংযোগ থেকে সম্পর্কের সূত্র ধরে ডোবা মুক্তি পায় তার বদ্ধতা থেকে। সাগরের সাথে সংযোগের ফলে সে হারিয়ে ফেলে তার কদর্যতা। সাগরের জোয়ারে জোয়ার আসে ডোবার পানিতেও। তখন ডোবার জলেও থাকে সাগরের স্বাদ।

কর্ম শব্দেরও দু’টি তাৎপর্য আছে। এক ধরনের কর্ম বদ্ধতা সৃষ্টি করে, অন্য ধরনের কর্ম সংযোগ ও সম্পর্ক সৃষ্টি করে এবং সম্পর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে ডোবার জলকে প্রবাহিত করে সাগরে।

যে কর্ম বদ্ধতার সৃষ্টি করে সে কর্ম হচ্ছে অর্থ উপার্জনের নিমিত্তে চাকরী, ব্যবসা বা অন্য কোন কাজ। এই কর্মকে বলা হয় স্বকাম কর্ম। স্বকাম কর্ম, প্রত্যাশাপূর্ণ। মানুষ কর্ম করে কর্মের জন্য নয়। কর্ম করে মূলত টাকা বা খ্যাতির জন্য। অধিকাংশ মানুষই এই স্তরের কর্মেই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে।

দ্বিতীয় প্রকারের কর্ম Ñ প্রত্যাশাহীন। প্রত্যাশাহীনতা এক প্রকারের মৃত্যুই বটে। মরার আগে মরা। কর্মকে খেলায় পরিণত করলেই কর্ম প্রত্যাশাহীন হয়। শিশুরা বর্তমানে থেকে অবিরাম খেলে, তাদের মধ্যে পরাজয়ের গ্লানি নেই, নেই বিজিত হবার প্রত্যাশাও। অথচ শিশুরা খেলে একাগ্রতার সাথে। কোন রকম ফলাফলের প্রত্যাশা না করেও অবিরাম একাগ্রতার সাথে খেলা যায়। খেলায় ক্লান্তি আসে না কিন্তু একাগ্রতা আসে। এখানেই খেলার মজা। একাগ্রতার সাথে ক্লান্তিহীন খেলাই প্রত্যাশাহীন কর্ম। এই কর্মই সংযোগ ও সম্পর্ক সৃষ্টি করে।

প্রত্যাশাহীন কর্ম কি আছে? প্রশ্নটা একটু উল্টিয়ে করলে সঠিক উত্তরটা পাওয়া যাবে। কর্মহীন প্রত্যাশা কি আছে? প্রতিদিন আমরা হাজারটা প্রত্যাশা করি কিন্তু সেই প্রত্যাশাকে কর্মে পরিণত করি না। সুতরাং কর্মহীন প্রত্যাশা আছে। কর্মহীন প্রত্যাশা থাকলে প্রত্যাশাহীন কর্ম থাকতেই হবে। এই প্রত্যাশাহীন কর্মই ডোবার সাথে সমুদ্রের সংযোগ পথ।

প্রেম এবং কর্ম এই দুইটি অবিচ্ছেদ্য। আমরা যার জন্য কর্ম করি তাকে প্রেম করি। কিংবা যার সাথে প্রেম করি তার জন্য কর্ম করি। যে যে আশায় কর্ম করে সে সেই ফল পায়। যার আশা নেই তার হতাশাও নেই। যার আশাও নাই হতাশাও নাই, তার কর্মই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

‘প্রত্যেক ব্যক্তি তার স্বীয় কর্মবৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে’। স্বীয় অর্থ -স্বকীয় বা নিজ। ‘নিজ’ শব্দটিও দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রথমতঃ নিজ শব্দটি ব্যবহৃত হয় অহংকার বা কর্ত্তৃত্ত্বের আধার হিসেবে। যেমন  ‘আমি নিজের বাড়িতে থাকি’। ‘আমি নিজেই এটা করেছি’। দ্বিতীয়ত : ‘নিজ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় আত্মা, পরমপ্রকৃতি, বা পরমাত্মা হিসেবে। যেমন ‘আমার মাঝে রয়েছে অনির্ব্বাণ নিজ’। ‘যে নিজেকে জানে সে আল্লাহকে জানে’। পরমপ্রকৃতি হিসেবে ‘নিজ’ হচ্ছে নিত্য এবং অপরিবর্তনীয় ‘নিজ’।

‘নিজ’, নিজেকে দেখতে পারে। যে ‘নিজ’ নিজেকে দেখতে পারে, সেই ‘নিজ’ই পরমপ্রকৃতি ‘নিজ’। নিত্য ‘নিজে’র একটা প্রধান গুণ হচ্ছে নিজেকে অবলোকন করতে পারার ক্ষমতা। এখানেই রয়েছে স্রষ্টার, দ্রষ্টা নামের সার্থকতা। আমরা নিজেরা যতক্ষণ নিজেকে দেখতে পারি ততক্ষণ ‘নিজ’এর মধ্যে থাকি।

সাধারণত, নিজে কর্তা হিসেবে কর্ম দ্বারা বিশেষ্যের সৃষ্টি করে, বিশেষ্য নিজকে বিশেষায়িত করে। নিজের বিশেষণগুলোই পরমপ্রকৃতি ‘নিজ’ এর উপর আবরণ। যে ‘নিজ’ কর্তা হিসেবে কর্ম দ্বারা নিজেকে বিশেষণের সৃষ্টিতে ব্যস্ত রাখে না, সে কর্মই ‘নিজ’কে পরমাত্মার সাথে সম্পর্কিত করে।

মানুষ আবদ্ধ থাকে একটা বৃত্তের মধ্যে। মাতৃগর্ভ একটা বৃত্ত। মাতৃগর্ভ থেকে সে যে ভূমিতে ভূমিষ্ট হয়, তাও একটা বৃত্ত। পৃথিবীটা যে গ্যালাক্সিতে আছে, তাও বৃত্ত। গ্যালাক্সি গুলো যে মহাবিশ্বে আছে, তাও বৃত্ত। এই মহা বৃত্তকে বলা হয় ব্রহ্মান্ড। ব্রহ্ম অর্থ মহা, আন্ডা মানে বৃত্তাকার। মহা আন্ডা বা মহাবৃত্তকে বলা হয় ব্রহ্মান্ড। সুতরাং মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারে না। একটা বৃত্ত থেকে অন্য একটা বৃত্তে তার প্রবেশ ঘটে। মহাবিশ্বের এমন কোথাও আমরা যেতে পারবো না, যা বৃত্তের অংশ নয়। কার বৃত্ত কতটা বৃহৎ হবে তা নির্ভর করে কে কতটা ব্যাস নিয়ে বৃত্ত রচনার কর্মে নিয়োজিত হয়েছে, বৃত্ত রচনায় কে কতটা একাগ্র ও নিষ্ঠাবান হয়েছে। যে যতটা ব্যাস নেয় সে তার ব্যাস অনুযায়ী তত বড় বৃত্ত রচনা করে।  একটা বৃত্তের আবরণ ছিঁড়ে মানুষ প্রবেশ করে নতুন একটা বৃত্তে। বৃত্ত থেকে বৃত্তে পরিভ্রমণ করতে করতে মানুষ আশ্রিত হয় মহাবৃত্তে, ব্রহ্মান্ডে। ব্রহ্মান্ডে আশ্রিত হয়ে পরিচিত হয় ব্রহ্মার সাথে। আর, আমি যুক্ত আমি হয়ে আমরা হতে থাকে।

শূণ্যের মাঝে কেউ বৃত্ত রচনা করতে পারে না। বৃত্ত রচনা করতে হলে একটা কেন্দ্র চাই। কেন্দ্র ছাড়া বৃত্ত হয় না। কম্পাসটাকে কেন্দ্রের মধ্যে চাপ দিয়ে ধরে না রাখলে, কম্পাসের কাঁটা কেন্দ্র থেকে সরে গেলে কখনো পরিশুদ্ধ বৃত্ত অঙ্কন করা সম্ভব নয়। জ্যামিতির দৃষ্টিকোণ থেকে বৃত্তই হচ্ছে পরিপূর্ণ ফিগার। মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তার সবকিছু ঘুরতে ঘুরতে বৃত্তে পরিণত হয়। বৃত্তাকার বলেই পৃথিবী ঘুরতে পারছে সূর্যের চারদিকে, চন্দ্র ঘুরতে পারছে পৃথিবীর চারদিকে। সুতরাং জীবনকে পরিপূর্ণতা ও শুদ্ধতার দিকে নিয়ে যেতে হলে বৃত্ত রচনা করতেই হবে। এই বৃত্ত রচনা করতে গেলে কেন্দ্র লাগবেই। বৃত্তের পরিধি যতই বৃহৎ হোক না কেন পরিধির প্রতিটি বিন্দু রচিত হতে হবে কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে। একটি বিন্দুও কেন্দ্রের সাথে সম্পর্ক না রাখলে পরিধির মধ্যে একটা ডট বা শূন্যতার সৃষ্টি করবে এবং বৃত্ত তার পরিপূর্ণতা ও শুদ্ধতা হারাবে।

নিজের কথা – ৪৫

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ বিদ্যাই মানবগনে প্রদানে নম্রতা, নম্রতা হতে পরে পায় সে যোগ্যতা, যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়, ধন হতে ধর্ম, ধর্ম হতে সুখোদয়। এ অমর বাণীটিতে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর অনুসারীবৃন্দের জন্য সফল শান্তিময় জীবন যাপনের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।যে বিদ্যা মানব জীবনের ইগো বা অহঙ্কার জাগ্রত করে, এমনতর বিদ্যা জীবনের জন্য প্রয়োজন নেই। কারন কথায় আছে, অহঙ্কার পতনের মূল। শান্তিতে জীবন যাপন করতে হলে সেই বিদ্যা অর্জন করা অত্যাবশ্যক, যে বিদ্যা অহঙ্কারী উগ্রবাদী না হয়ে বরং নম্রতার সাথে জীবন যাপন করতে শেখে। কারন মানুষ নম্রতার সাথে জীবন যাপন করতে না পারলে সমাজ ও পরিবারের সদস্যদের উপর সদয় ব্যবহার প্রদর্শন করতে পারেনা। যা শান্তিময় জীবন যাপনের  প্রধান অন্তরায়।

নবীজীর বাণীতে পাওয়া যায়, তরবারির আঘাতের চেয়ে কলমের খোঁচার আঘাত অধিকতর তীব্র। অর্থাৎ কথার আঘাত তরবারির আঘাতের চেয়েও অধিকতর ক্ষতের সৃষ্টি করে। তরবারির আঘাতে বড়জোর দেহের ক্ষতিসাধন করতে পারে এতে অন্তরের কোনো ক্ষতিসাধন করা যায় না। কিন্তু কথার আঘাতে মানষিক ও শারীরিক উভয়বিধ ক্ষতিসাধন করা যায়। তাই যারা কথার বাণ ছুড়ে করো অন্তরে আঘাত দিতে চাই তারা অধিকতর হিংস্র। তাদের আচরণে আর যা থাক, নম্রতা থাকেনা। আর যাদের আচরণে নম্রতা থাকেনা তারা আদব রক্ষা করে চলতে পারেনা অর্থাৎ তারা শিষ্টাচার বহির্ভূত। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর অমর বাণীতে বলেন, ‘আদবে আওলিয়া, বেয়াদবে শয়তান। অন্যত্র বলেন, ‘বেয়াদব বেনসীব।’

কথায় আছে, উচিত কথায় দেবতা বেজার। কিন্তু নম্রতার আচরণে উচিত কথায় দেবতা বেজার হয়না। নম্রতা ব্যক্তির এমন ধরনের আচরণ যে আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তির অপমানিত বোধ হয়না অথচ শিক্ষা লাভ করে ব্যক্তির বিবেক জাগ্রত হয়। একমাত্র বিবেক জাগ্রত হলেই মানুষ মনুষ্যত্বের আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন। অন্যথায় মানুষের আচরণের মাধ্যমে অন্যের অন্তরে আঘাত দেবার প্রবণতা জাগ্রত থাকে। যতক্ষণ আচরণের মাধ্যমে অন্যের অন্তরে আঘাত দেবার প্রবণতা থাকে ততক্ষনই মানুষ থাকে মনুষ্যত্বহীন।

মনুষত্বহীন ব্যক্তির সম্পর্কে ¯ স্রষ্টা আল-কোরআনে বলেন, তারা পশুর চেয়েও অধিকতর নিকৃষ্টতর এবং তারাই অধঃপতনের অতল গহবরে তলিয়ে যায়। তাই মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটানোর জন্য প্রয়োজন সংযত আচরণের মাধ্যমে নম্রতাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শন করা। যাতে করে অন্যের অন্তরে আঘাত দেবার প্রবণতা জাগ্রত না হয়। এটি ব্যক্তির এক অপূর্ব সুন্দ যোগ্যতা। ব্যক্তির আচরণে এরূপ যোগ্যতা অর্জন হলেই ব্যক্তি ধনবান হতে থাকেন।

মানুষের নম্রতাপূর্ণ সুন্দর আচরণ ব্যক্তিকে শত্রুতামুক্ত রাখে এবং সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। আর যারা দৈনন্দিন জীবনে সুরক্ষিত থাকে তাদের তেমন কোন অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়না। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিমুক্ত ব্যক্তিরাই দুঃখ ও হতাশামুক্ত থাকে। এটিই ব্যক্তির যোগ্যতা যা তার সুন্দর আচর থেকে অর্জিত হয়। কেহ যা কিছু অর্জন করে তাই সে জীবনে ধারণ করতে পারে। আর ধারণকৃত সম্পদের প্রভাবেই ব্যক্তির অভ্যাসের পরিবর্তন হতে হতে একসময় স্বভাবে পরিণত হয়। এভাবে ব্যক্তির আচরণের কারণেই ব্যক্তির স্বভাব গড়ে ওঠে।

ব্যক্তির নম্রতাপূর্ণ আচরণের প্রভাবে ব্যক্তির মাঝে যে স্বভাব গড়ে ওঠে সে স্বভাবই গড়ে তুলে ব্যক্তির ধর্ম। একদা নবীজীকে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ধর্ম কি? নবীজী উত্তর দেন, সৎস্বভাব। আবারও একই প্রশ্ন করলে নবীজী উত্তর দেন, সৎস্বভাব। আবারও জানতে চান, ধর্ম কি? নবীজী একই উত্তর দেন, সৎস্বভাব। এ সৎস্বভাব ব্যক্তির জীবনের অমূল্য সম্পদ, যা ব্যক্তির নম্রতাপূর্ণ আচরণের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। আর এটিই ব্যক্তি জীবনে ধারণ করতে করতে একদা ব্যক্তির স্বভাবজাত ধর্মে রূপান্তরিত হয়। যার প্রভাবে ব্যক্তি সুখী সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে সক্ষম হন। (চলবে)

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-আবু আলী আক্তার উদ্দিন আবির্ভাব আবহে

অগ্রহায়ণ মাসব্যাপী শান্তি সমাবেশ উদ্বোধন হলো….

সমগ্র মানবজাতির জন্য অশেষ কৃপা, রহমত, আশীর্বাদ ও সত্যের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আহ্বান নিয়ে যুগে যুগে সত্যমানুষকূল পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, মানুষের মাঝে রেখে যান বাস্তবতার আলোকে সত্যমানুষ হয়ে উঠার শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের সহজ-সরল পথ। বাংলা-বাঙালি-বাংলার সাধককূল ও অগ্রহায়ণ একসূত্রে গাঁথা। সত্যানুসন্ধানী ও সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীদের জীবনে অগ্রহায়ণ বিশেষ রহমত ও আশীর্বাদ প্রাপ্তির মাস। নিত্য নতুন মাত্রা যোগের মাস। এই অগ্রহায়ণ মাসেই বাংলার বুকে আবির্ভূত হয়েছিলেন হাক্কানী দর্শনের দুই মহান সাধক পুঁরুষ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক – সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। বিশ্ব জুড়ে বিরাজমান সত্যমানুষের ¯স্রোতধারায় উজ্জ্বল নক্ষত্র মহান এই সাধকদ্বয় বাংলা ও বাঙালির প্রাণপুঁরুষ, সত্যের কান্ডারী। কর্ম-মানবতা ও শান্তির বার্তা নিয়ে মানুষেরই কল্যাণে তাঁদের আবির্ভাব এই ধুলির ধরায়। তাঁদের অগণিত ভক্ত, অনুসারী, সত্যব্রতী হওয়ার পথের যাত্রীরা সত্যব্রত দর্শন ও আদর্শের আলোকে পথ চলছেন সমাজ ও নিজ জীবনে সত্য প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে।

মহান সাধকদ্বয়ের আবির্ভাবের মাস অগ্রহায়ণকে মূল ধরে অগ্রহায়ণ ১৪১৮ বঙ্গাব্দ থেকে হাক্কানী বর্ষ গণনা শুরু হয়েছে। বিশ্বব্রহ্মান্ড জুড়ে বিরাজমান হাক্কানী ¯ স্রোতধারায় ‘হাক্কানী বর্ষ’ নিয়ে আসে সত্যের সাথে একাত্মতা প্রকাশে নতুন বার্তা। বাংলা-বাঙালির সত্য ও শেকড়ের সন্ধানে এ বছর ‘হাক্কানী বর্ষ-১০’ এর পহেলা অগ্রহায়ণ থেকে বাংলাদেশ ও সমগ্র বিশ্ব জুড়ে অবস্থিত হাক্কানী আস্তানা, দরবার ও খানকা শরীফে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী শান্তি সমাবেশ।

পহেলা অগ্রহায়ণের প্রথম প্রহরে ঢাকাস্থ মিরপুর আস্তানা শরীফ হতে হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রীর একটি দল শাহ্ সূফী ডা. সুমাইয়া সুলতানার নেতৃত্বে নয় সদস্যের প্রতিনিধি দল শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনে চান্দপুরশরীফ যাত্রা করেন। কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার নিভৃত পল্লী চাঁন্দপুরে অবস্থিত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর পবিত্র রওজায় গিলাফ ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। একইসঙ্গে মা-ভক্ত মহান এই সাধক-এঁর মা’এঁর রওজায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

বিকেল ৪টা ০১ মিনিটে মিরপুর আস্তানা শরীফে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আনন্দঘন পরিবেশে ‘হাক্কানী বর্ষবরণ-১০’ ও আবির্ভাব আবহে শান্তি সমাবেশে আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে হাক্কানী শব্দ তরঙ্গের তালেতালে পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব আবহের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা হয়। পতাকা উত্তোলন করেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা) ব্যবস্থাপনা সংসদের মহাসচিব শাহ্ এন.সি. রুদ্র, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা সংসদের মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা এবং মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা ব্যবস্থাপনা সংসদের যুগ্ম-সচিব আজমত খান। দরবারে আগত সবাই সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

হক হক হাক্কানী….. হক হক হাক্কানী….. হক হক হাক্কানী….. ধ্বনির মধ্য দিয়ে মিরপুর আস্তানা শরীফ-এর জ্যোতি ভবনের আনোয়ারুল হক মিলনায়তনে শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন পর্ব। ‘ধন্য অগ্রহায়ণ মাস বিফল জনম তার – নাহি যার চাষ’ এই শিরোনামে বর্তমান সংলাপে প্রকাশিত লেখাটি পাঠ করেন আবির্ভাব উদযাপন পর্ষদের সদস্য সচিব আবদুল কাদের টিটু।   

দিবা-রাত্রির সন্ধিক্ষণে দরবারের পশ্চিম প্রান্তে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলনে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদেও সহ-সভাপতি শাহ্ জাহাঙ্গীর আলম। দরবারের পূর্ব প্রান্তে আবির্ভাব উদ্যাপন পর্ষদের আহবায়ক শাহ্ শওকত আলী খানের নেতৃত্বে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন করেন আবির্ভাব উদযাপনের সদস্য সচিব আবদুল কাদের টিটু, সদস্য যথাক্রমে সফিউল আলম খোকন, শাহ্ আবেদা বানু তরু, শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা,  শাহ্ তৌহিদা জেসমিন, ফিরোজা খানম, মহিউদ্দিন সরকার, শহীদুল ইসলাম খান, মো. মাহবুব আলম ও আব্দুল হামীম মিয়া।বিশেষ পর্বে কেক কেটে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন শাহ্ জাহাঙ্গীর আলম। মুক্ত আলোচনা পর্বে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর বাণী ‘সত্য বলুন, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হোন, নিজে বাচুঁন, দেশ ও জাতিকে বাঁচান’ বিষয়ের উপর মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণ করেন যথাক্রমে বিবি ফাউন্ডেশনের সভাপতি সত্যানুসন্ধানী বাহাদুর বেপারী, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা সংসদের মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের নির্বাহী সম্পাদক শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা) ব্যবস্থাপনা সংসদের সভাপতি শাহ্ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্-উল-ইসলাম এবং হাক্কানী আস্তানা শরীফ-এর তত্ত্বাবধায়ক ও আবির্ভাব উদ্যাপন পর্ষদের আহবায়ক শাহ্ শওকত আলী খান। মুক্ত আলোচনা মূলতবির পর শুরু হয় হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ভাব-সঙ্গীত পর্ব। এ পর্বে অংশগ্রহণ করেন সাজনা, আভা, নিটোল, মৌটুসী ও ইব্রাহিম এবং তবলায় ছিলেন সাদাফ।  হাক্কানী স্মরণ ও  নৈবেদ্য এবং শোধনসেবা বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠান মূলতবী হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন হাক্কানী আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব এবং মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা ব্যবস্থাপনা সংসদের যুগ্ম-সচিব আবদুল কাদের টিটু।

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম যাহা নিত্য তাহাই সত্য ২২

শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ সত্য প্রতিষ্ঠার জীবন্ত উদাহরন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন জীবনব্যাপী। সাধনার জগতে সৃষ্টি করেছেন এক নতুন ধারা যা বহমান। গবেষকদের গবেষণায় তা উদ্ভাসিত হবে। সত্য প্রতিষ্ঠার এই মিশনে যে কর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন তা চলমান রয়েছে। মানুষ তৈরীর কাজটি করে গেছেন অত্যন্ত সুনিপুন হাতে। তাই বলতে পেরেছেন ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন কাজ মানুষ তৈরী করা’। আরও বলেছেন ‘এক সময় বলা হতো সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই, এখন সবার উপরে সত্যমানুষ তাহার উপরে নাই’। আরও বলেছেন ‘সত্য মানুষ ১০০ হোক, ২০০ হোক, ১০০০ হোক, সত্যমানুষে ভরে যাক পৃথিবী, পৃথিবী পরিচালনা করুক’, নবী মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর ধর্মে এখনও তিন ডিজিট (১০০) হয়নি। যেদিন সত্যমানুষ পৃথিবীতে তিন ডিজিট হবে সেদিন পৃথিবীর চেহারা পাল্টে যাবে, এও বলেছেন যে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে এমন কোন সাধক আসেননি যিনি সারা বিশ্বে রাজত্ব করেছেন, একেকটা অঞ্চলের জন্য এসেছেন, আজ থেকে ৩০/৪০ বছর পর পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে তাও বলেছেন। একদিন বলেছিলেন যে, নবী মোহাম্মদ একদিন পূর্ব দিকে মুখ করে বসেছিলেন, সাহাবাদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন,‘আমার ধর্ম আবার পৃথিবীর পূর্ব দিক হতে পূনরায় উদ্ভাসিত হবে’।

বিভিন্ন সময়ের কথা থেকে প্রতিয়মান হচ্ছে সেই স্থানটা বাংলাদেশ, চীন , এবং আশপাশ। কারণ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন -‘বর্তমান বাংলাদেশকে বিশ্ব আধ্যাত্মিক জগৎ শ্রদ্ধার আসনে স্থাপন করেছে। আধ্যাত্মিক সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার মহান দায়িত্ব বাংলাদেশের উপর অর্পিত হয়েছে। প্রবল প্রানশক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে বাঙালী সভ্যতা বর্তমান অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছে। বাংলার সাংস্কৃতিক বৈচিত্রময় ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে বহু সাধক পুরুষ ও নারী বাঙালী ভাবধারায় সর্বোত্তম লক্ষে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে স্বার্থক ভূমিকা গ্রহন করেছেন এবং করছেন। এই পবিত্র ঐতিহ্য এই সভ্যতার পরম মাহাত্ম সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে আরো সচেতন করে তুলতে হবে। অতীতের সেই মহান নারী পুরুষগন বিধাতার বার্তাবহ দূতস্বরূপ। তাঁরা তাদের সমুন্নত জীবনধারার মধ্য দিয়ে সকলের অন্তর্নিহিত শক্তির মৌলিক ঐক্যের বিষয়টিতে আলোকপাত করেছেন। প্রেম, সমন্বয়, শান্তি, প্রজ্ঞা, ত্যাগ, বিশ্বাস,সত্য ও সেবা সম্বন্ধে তাদের বিশ্বজনীন মনোভাব মানুষের চিন্তাজগতে জড়বস্তু অপেক্ষা চৈতন্যময় প্রভাব সম্বন্ধে সুগভীর রেখাপাত করে। সেকারনে আজ বাঙালী আধ্যাত্মিক দর্শন আধ্যাত্মিক জগতে সমাদৃত। বাংলার এই সত্যদর্শন জনগনের উচ্চতম স্তর থেকে শুরু করে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে পরিব্যপ্ত হয়ে আছে এবং আরো করতে হবে সত্যমানুষ হওয়ার পথযাত্রীদের।

জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলি নানা অপ্রয়োজনীয় কর্মে ব্যয় করা হয় আর দার্শনিক চিন্তা হয়ে উঠে গৌন। বাংলার দর্শনশাস্ত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ এক বিষয় এবং অন্য সকল বিষয় সেই শাস্ত্র থেকেই প্রেরণা ও অবলম্বন লাভের সন্ধানে রত। ব্যক্তিবিশেষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার জীবনীশক্তির গতিপথ জ্ঞানের যে আলোকপথে চলে এবং যে নীতি তাকে নিয়ন্ত্রন করে সেই বিষয়গুলির উপর। রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে বাংলার মানুষের যে অবদান আছে যার ধারা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অব্যাহত থাকছে, সেগুলির উর্ধ্বেও বাংলার আরো কিছু অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিকতার অবদান আছে- এগুলি হলো সঠিকভাবে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সত্যের অধিকতর মাহাত্মপূর্ণ এক পাত্রের সন্ধান, পরমসত্যের উপলব্ধি করার পদ্ধতি এবং চেতনার অতি সূক্ষèজগৎ সম্বন্ধে নিষ্ঠার সাথে পর্যবেক্ষণ এবং নিমগ্নতা।’ (সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ ৯ এপ্রিল ২০১৬ ফেসবুকে এ সত্য প্রকাশ করলেন) তিনি কি করে এ ব্যপার অবগত হলেন, আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর অবস্থান কোথায়, তিনি কি করে গেলেন, কি রেখে গেলেন, এখন তিনি কি করছেন, কোথায় আছেন এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হতে পারে যা আমাদের পথ দেখাবে।

সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রমের জীবন্ত উদাহরন সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর জীবনব্যাপী কর্মকান্ডের গবেষণাই হতে পারে আমাদের জন্য পাথেয়। হাজার হাজার কথা বলেছেন, কথার ফুলঝুড়ি ঝরিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন সত্যমানুষ তৈরী করার। তাঁর ৪২ বছরের সাধনার জীবন ছিলো বহুমুখী কর্মকান্ডে ভরপুর। প্রতিষ্ঠানিকতা ও আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যাক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আর্ন্তজাতিক বলয় সর্বত্র এক সামগ্রীক কর্মকান্ডের সূচনা করে, চালিয়ে নিয়ে পথ দেখিয়েছেন আমাদের। প্রতিটি বাস্তবতায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মকান্ড চালিয়েছেন। শুধুমাত্র তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন তাদের প্রত্যেকের গবেষণাগুলো সমন্বয় করে সত্যপ্রতিষ্ঠার এই মহাকর্মকান্ডের কুলকিনারা পাওয়া যেতে পারে। আমাদের বলেছেন ঝিনুক যেভাবে একফোটা পানি মুখে নিয়ে জলের নীচে ডুব দিয়ে মুক্তা বানায় তেমনি গুরুর কথা নিজের মধ্যে ধারণ করে ডুব দিয়ে মুক্তা বানাতে হবে। একটা ব্যপারে সাবধান করেছেন -ওনার কথা নিয়ে যে গভীরে গেলো না অথচ প্রচার করে বেড়াচ্ছে, সে নিজের ক্ষতি করছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এঁর বহু কথা শুনেছি ওনার মুখে কিন্তু সেগুলো বানীর লিস্টে দেননি। অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এব্যপারে। তাই ওনার মুখনিসৃত কথাগুলো প্রচার করতে ভয়ই পাচ্ছি, আবার চিন্তা করছি হয়তো প্রকাশ করলে সবাই উপকৃত হবে। ওনার একই কথা অনেকেই শুনেছেন, প্রতিটি কথার একটা প্রেক্ষাপট আছে সেটা না জানলে সঠিকভাবে বোধগম্য না হওয়াই স্বাভাবিক, কখনও একজনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন হয়তো সেটাই সার্বজনীনতা পেয়েছে। আমি আমার লেখনীর মাধ্যমে ওনার কিছু কথা প্রকাশ করব অতি সাবধানতার সঙ্গে তবে একটা অনুরোধ সবার প্রতি আপনারা যারা পড়বেন তারা ফেসবুক বা কোন মাধ্যমে তা প্রকাশ করবেন না নিজের কানে ওনার এই কথাগুলো না শুনে থাকলে। শুধু নিজের জীবন চলার পথে কাজে লাগাতে পারেন বা কোন প্রশ্ন থাকলে আমার সাথে আলাপ করতে পারেন। আমরা ওনার কথাগুলো বাস্তবতার নিরীখে আলোচনা করতে পারি। বহু বক্তব্য রেখেছেন রেকর্ডগুলো আছে অনেকের কাছে। বক্তব্যের মাঝখান থেকেও কথা নিয়েছি। চলে যাওয়ার পূর্বে দফায় দফায় মিটিং করেছেন সবার সঙ্গে। ব্যক্তি, দরবার, মিশন, মিশনের প্রতিটি প্রকল্পের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে। ১২/৬/১৯ হাক্কানী মহিলা উন্নয়ন বিভাগের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করলেন, গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিলেন। পুরো মিটিং এ আমি ওনার পিছনের সোফায় বসেছিলাম। হঠাৎই পিছন ফিরে আমাকে বললেন ‘সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রম’ এই বিষয়ে লিখবেন, কাল রাতে চিন্তা করেছি, সিরিজ চলবে, বই হবে। ’

তাই ওনার কথাগুলো প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছি। সত্য প্রতিষ্ঠায় স্বেচ্ছাশ্রমের এমন জীবন্ত বাস্তবসম্মত উপলব্ধির বিকল্প আর কিছু কি হতে পারে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সত্য মানুষ, একমুহূর্তের জন্যও সত্য থেকে বিচ্চুত হননি, একমুহূর্তের জন্যও অসচেতন হননি। ৩০ বছরে আমার যেটা পর্যবেক্ষণ তা হলো যা কিছু করেছেন সার্বিক অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই করেছেন। যেখানে প্রয়োজন, যেখানে ঘাটতি দেখেছেন সেখানেই কাজ করেছেন। সারাজীবন ছাত্র ছিলেন, এক্সপেরিমেন্ট করে করেই চলেছেন, তার ফলাফল দেখেছেন। মা ভক্ত ছেলে ছিলেন তিনি, বিশেষ করে মায়ের জাতিকে সম্মানের আসনে বসিয়েছেন, তাদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। একদিন বলেছিলেন যে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে, যখন মাতৃতান্ত্রিক পরিবার ছিলো, তখন পৃথিবীতে শান্তি ছিলো।

২১/৫/১৯ তারিখ ইফতারের পর দরবারে গেলাম। তিন তলায় পত্রিকা অফিসে মালিকের কাছ থেকে আজ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পেলাম। বাহাখাসের কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন সেখানে। সবাইকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বললেন।   ‘নিজেকে কুক্ষিগত করে রাইখেন না। নিজেকে বিলিয়ে দেন সবার মধ্যে, এটার আউটপুট অন্য। সুখের পর দুঃখ যেন না আসে, দুঃখের পর সুখ আসুক, সেই সুখের পর আর দুঃখ না আসুক। যত রকমের দুঃখ আছে ভোগ করে সুখে যান। ধৈর্য ধারণ করতে হবে, কাল ক্ষেপন করতে হবে, তারপর কালকে ফেলে দেন অসুবিধা নাই। ঐ সুখ যে সুখের পর আর দুঃখ না আসে। কাউকে ছেড়েন না (কাউকে ছাড়বেন না)। যে যেমন তার সাথে বুঝে সেভাবে সম্পর্ক করেন কিন্তু ছেড়ে দিয়েন না। হাক্কানীতে কাউকেই ছেড়ে দেয়া হয় না।

কিভাবে আয় করে হাক্কানী সেটা দেখেনা। কিভাবে ব্যয় করা হয় হাক্কানী সেটা দেখে, অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই। ব্যয় ঠিক না হলে ঐ আয়ও অন্যায়। পাপপূণ্যের কথা আমি কাহারে শুধাই।

অল্প কাজ করেন, ছোট্ট কাজ করেন কিন্তু সুন্দর করে করেন, ঠিকভাবে করেন।’ (চলবে)

নিজের কথা – ৪৪

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ শাহ্জীর মালিক সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন ‘গরীবের শখ করলেই হয়।’  তিনি আরও বলতেন, ‘আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ছোটলোক না।’ আবার কখনও কখনও বলতেন, ‘গরীব গজবের পয়দা।’  এসকল বাণী থেকে বুঝা যায়, গরীব দু’ধরনের। এক ধরনের গরীব যারা গজবের পয়দা তারা ছোটলোক। আর যে সকল গরীব ছোটলোক না তাঁরা যেসব সখ করেন, সেই সকল সখ করা মাত্রই তা পূরণ বা বাস্তবায়ন করে থাকেন। যা নিম্নোক্ত বাণীটিতে প্রকাশ পায়। ‘আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ছোটলোক না।’ আর যে সকল গরীব নিজেদের শখ পূরণ করতে পারে না, এসকল গরীব হলো গজবের পয়দা।

‘আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু ছোটলোক না।’ এই বাণীতে সাধক নিজেকে সেই শ্রেণীর গরীবদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করেন, যাদের শখ করা মাত্রই পূরণ করে থাকেন। আবার যে সকল গরীব গজবের পয়দা তারা নিজেদের সখ পূরণ করতে পারে না অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকে। এরাই প্রকৃতপক্ষে কৃপণ ও সংকীর্ণ।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ তিনি ছিলেন তাঁর মালিকের মতই অত্যন্ত সফরপ্রিয়। মাঝে মাঝেই শত শত সফরসঙ্গীদের নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকদিনের জন্য তিনি সদলবলে সফরের আয়োজন করতেন। তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্য আরব আমিরাতের বিভিন্ন সাধনাকেন্দ্র ও দর্শনীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করেন। দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা উপজেলার সাধকদের মাজার শরীফ ও দর্শনীয় এলাকা সফর করেন।  সাধক শেখ আবদুল হানিফ কোথাও কোন সফরে যেতে চাওয়া মাত্রই তা যতই ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হোক না কেন তিনি তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতেন।

তিনি কখনও কিশোরগঞ্জ, চাঁন্দপুরশরীফ, ফরীদপুরশরীফ, জঙ্গলবাড়ী, সরারচর, হবিগঞ্জ কালিকাপুর দরবার শরীফ, সিলেট সীপাহশালার মাজার শরীফ, কখনও কুষ্টিয়া সাঁইজির মাজার শরীফ সফর করেছেন। আবার কখনও খুলনা, বাগেরহাট খানজাহান আলী মাজার শরীফ, নলতা খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ্ সাধকের মাজার শরীফ, সুন্দরবন হীরণ পয়েন্ট, কটকা দুবলারচর, কখনো কাপ্তাই, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়া, বান্দরবান নীলকান্ত, নীলাচল, নীলগিড়ি। আবার কখনওবা সম্পন্ন করেছেন ভোলা হাতিয়া নিঝুমদ্বীপে শুদ্ধিযাত্রা।

সাধক বছরের অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানসহ নানান ঐতিহ্যময় ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহ জাঁকজমকের সাথে উদ্যাপন করতেন। তিনি বেশ কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাসব্যাপী উদযাপন করতেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর মালিকের আবির্ভাব ও লোকান্তর মাস অগ্রহায়ণ ও শ্রাবণ মাসসহ সাধক খাজা মঈনুদ্দিন হাসানের আবির্ভাবের রজব মাস ও রমযান মাসব্যাপী নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান উদ্যাপন করতেন। অনুষ্ঠানে শত শত আগত ভক্ত ও অন্যান্য সকলের জন্য তেহারী ও বিভিন্ন ফলের মাধ্যমে শোধনসেবার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া দৈনন্দিন দরবারে নানাবিধ প্রয়োজন ও  ফরিয়াদ নিয়ে আগত নানান শ্রেণীর নারী-পুরুষের সমস্যা সমাধানের উপদেশসহ আত্মশুদ্ধির জন্য দরবার ও শিষ্টাচারের উপর রবিবার ও বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে উদ্যাপন করা হয় এবং আত্মিক উন্নয়নে জ্ঞান চর্চার জন্য প্রতি শনিবার বিকেলে সাধকের গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফের ব্যবস্থাপনায় হাক্কানী চিরন্তন বৈঠকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালু রয়েছে।

এভাবে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বছরের পর বছর ধরে সমাজ ও দেশের জনগণের উন্নয়নের জন্য নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণপূর্বক আজীবন নিজেকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেন। (চলবে)

ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ১২

এই ধারাবাহিক রচনায় প্রথমবারের মতো ইটিমোলজি’র (শব্দের বুৎপত্তি নির্ণায়ক শাস্ত্র) নিরিখে লালন সাইজি’র পদাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পদাবলির প্রতিটি চরণ শব্দমূল অর্থাৎ ধাতুভিত্তিক দর্শনে বর্ণিত; তাই এটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ধাতুসুধায় লালনপাঠ’। গোটা ভাব বা বস্তুকে যা দিয়ে ধরে রাখা যায় সেটাই তার মূল বা ধাতু। দেহ নানা প্রকার প্রাণরস ধারণ করে টিকে থাকে; সেগুলোই দেহের ধাতু। ঠিক তেমনি শব্দ একটি ভাব বা চেতনার কাঠামো যা ধাতুকে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দের গোটা ছবি দেখতে হলে ধাতুবিচার খুবই জরুরি।

॥ তারিফ হোসেন ॥

সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্কে অবশ্যই স্মরণ করিও।

আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার অপর নাম ইবাদত।

তোমার আল্লাহ্ হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মধ্যেই রয়েছে সার্বিক শান্তি।

বাড়ির কাছে আরশি নগর বাড়ির কাছে আরশি নগর সেথায় এক পড়শী বসত করে

আমি একদিনও না দেখিলাম তারে ॥

গেরাম বেড়ে অগাধ পানি নাই কিনারা নাই তরণী পারে বাঞ্ছা করি দেখব তারে

আমি কেমনে সেথা যাইরে ॥

বলব কী সেই পড়শীর কথা হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর

ক্ষণেক ভাসে নীরে ॥

পড়শী যদি আমায় ছুঁতো যমযাতনা সকল যেত দূরে সে আর লালন একখানে রয়

লক্ষ যোজন ফাঁকরে ॥

‘বাড়ির কাছে আরশি নগর  সেথায় এক পড়শী বসত করে আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’  এই নগর যেনতেন নগর নয়; খোদ আরশি নগর অর্থাৎ আদর্শ নগর। আরশি শব্দটি দর্শনসূচক। সাধারণভাবে আরশিতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ছবি দেখা যায়। সাধারণ জীব অনেক কিছু দেখে কিন্তু পরমদর্শনযোগ্য শিষ্ট-রসিক-পুরী অর্থাৎ আরশি নগরকে দেখে না। সাঁইজি আরশিগ্রাম না ব’লে তাকে যে নগর বলেছেন তা অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ শব্দচয়ন। গ্রাম্য শব্দটি মূর্খ, অরসিক, অশিষ্ট, অসভ্য ইত্যাদি অর্থে প্রচলিত। গ্রাম্য থেকে গোঁয়ার, গেঁয়ো, গাঁইয়া ইত্যাদি শব্দমালার সৃষ্টি। মানুষের গোবিন্দরূপী দেবসত্তা যখন পশুসুলভ আচরণে মাতে তখন তাকে আমরা গোঁয়ারগোবিন্দ বলে থাকি। যা হোক দর্শনীয় পুরবাসী (মনের মানুষ) আমার পড়শী বা প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও সে অদৃশ্যই থেকে যায়। এখানে প্রতিবেশীকে একটু বেশি করে দেখলে বেশ হয়। ‘বিশ’ ধাতুযোগে শব্দটি তৈরি। আবেশ, প্রবেশ, নিবেশ ইত্যাদি শব্দরাজি এই ধাতুর জ্ঞাতিগুষ্টি। দুটো বস্তুর একটি অপরটির বিপরীতে যে বেশ (গৃহ) বা বাস (অবস্থান) তাই প্রতিবেশ অর্থাৎ প্রতিবাস। তা হলে মুখোমুখি অবস্থান করেও নিমেষের তরে কামিনী-কাঞ্চন আসক্ত জীব তার নিকটের আবেশে আবিষ্ট বা প্রবিষ্ট হতে পারে না, দেখা পায় না দ্রষ্টব্য শহরতলীর। এই ভাষ্যের লালন-রূপায়ন ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর/সেথায় এক পড়শী বসত করে/আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’   ‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানি  নাই কিনারা নাই তরণী পারে বাঞ্ছা করি দেখব তারে  আমি কেমনে সেথা যাইরে।গ্রাম (গেরাম) শব্দটি নিয়ে আরও কিছুটা বিশ্লেষণ করা যাক। গম ধাতু থেকে গ্রাম নিষ্পন্ন। তাই লোকজনের গমনীয় অর্থাৎ যাতায়াতযোগ্য স্থান গ্রাম নামে অভিহিত। গ্রামে অনেক লোকের বাস এই হেতু গ্রাম শব্দটি সমূহ বা সমষ্টিবাচক অর্থেও ব্যবহৃত হয়; যেমন স্বরগ্রাম। পদাবলীর এই অংশে নগর ও গ্রামের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে অতল জলরাশির জন্য। আসলে মূঢ় জীবের ইন্দ্রিয়পরায়ণতার বিস্তার ঘটায় সহজ মানুষের সঙ্গে জীবের বিস্তর ফারাক রচিত হয়েছে; সহজমানুষে জীব অগম্য থেকে যাচ্ছে। কারণ এই কামসাগর উতরে যাবার কোন যান (তরণী) সেখানে নেই। যদিও উত্তীর্ণ হবার আকাঙ্খা (বাঞ্ছা) জীব পোষণ করে। ‘বলব কী সেই পড়শীর কথা  হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর ক্ষণেক ভাসে নীরে।’  দেহঘরের মধ্যেই যে পরমের উপনিবেশ সেই পরিবেশ বস্তুত বেশহীন, আকারহীন। হাত-পা-মাথা বিশিষ্ট অবয়ব সেখানে অনুপস্থিত। এই অবেশী প্রতিবেশী স্বরূপত এতই ঊন, হীন যে তা শূন্য শব্দব্রহ্মরূপী। এই আকাশসত্তার কখনও রিক্তভাব (শূন্য) কখনও সিক্তভাব (নীর)। শূন্যস্বরূপা আদিদেব তথা ধর্মের রসাস্বাদনের সেচনে তা সময়সময় ভেসে বেড়ায়। এটাই সাঁইজির বর্ণনায় ‘ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর/ক্ষণেক ভাসে নীরে”রূপে বর্ণিত।   ‘পড়শী যদি আমায় ছুঁতো  যমযাতনা সকল যেত দূরে সে আর লালন একখানে রয়  লক্ষ যোজন ফাঁকরে।’

জীবসত্তা যম বা যমজ অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে যন্ত্রণা ভোগ করে। প্রতিবেশী যদি তার নিবাসে জীবের আবাসন প্রকল্প গড়ে দিত তবে সমস্ত দূরত্ব ঘুচে গিয়ে দুর্দশার অবসান হত। প্রকৃত ঘটনা হল দুই প্রতিবেশীর একটি ছদ্মবেশী। জীব মোহের ছাদনে আচ্ছাদিত; এর বেশ থেকে ছাদ (আবরণ) সরে না গেলে পরম প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগ তথা অবস্থান যেটাকে যোজন বলা হয় তাতে লক্ষণীয় বা লক্ষমাত্রায় ফাঁক থেকে যায় যদিও তা অভেদাত্মক। এই অবস্থা লালন পদাবলীতে মূর্ত হয়ে ওঠে ‘সে আর লালন একখানে রয়/লক্ষ যোজন ফাঁকরে।’ (চলবে)

হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দিন-এঁর বাণী তাৎপর্য অন্নেষণে

সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়

‘সত্য’ একটি বহু অর্থবোধক শব্দ। সত্যের কোন সংজ্ঞা দেয়া যায় না। কারণ, সকল সংজ্ঞাই মানুষের ধারণা প্রসূত। সত্য কোন ধারণা নয় যাকে শব্দের সীমানায় আবদ্ধ করা যায়। ব্যাংকে টাকা জমানোর মতো কিংবা লাইব্রেরীতে বই সংগ্রহ করার মতো সত্য সংগ্রহ করা যায় না। সত্যকে স্মৃতিতে আটকে রাখা যায় না। বরঞ্চ স্মৃতি ও পূর্ব ধারণা আছে বলেই আমরা সত্যকে দেখতে পারি না।

পানির সংজ্ঞা আমরা দিতে পারি। কিন্তু পানির সংজ্ঞা আর পানি এক নয়। এক ফোঁটা পানি সত্য, কিন্তু পানি সম্পর্কে হাজার পৃষ্ঠার বিবরণ ও বিশ্লেষণ পানি নয়। পানি সম্পর্কে তথ্যপূর্ণ বিশ্লেষণ যেমন পানি নয়, সত্য সম্পর্কে পর্যালোচনাও তেমনি সত্য নয়। পানি পান করা ছাড়া পানি সম্পর্কে কোন জ্ঞান লাভ করা অসম্ভব। একইভাবে নিজের জীবনে সত্যকে প্রতিষ্ঠা না করে কেউ সত্যকে দেখতে পারে না। তাই হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীন বলছেন – “সত্য দেখার আগে সত্য নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠা করা শ্রেয়।”

যা বাস্তব তা সত্য। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মানুষ বাস্তবতাকে দেখে না বা দেখতে পারে না। কোন বস্তু, ব্যক্তি বা ঘটনাকে যেমন আছে ঠিক তেমনভাবে দেখতে না পারার কারণ হলো, লোকে দেখে তার কল্পনা দিয়ে, আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। মানুষ বস্তু এবং ঘটনাসমূহকে দেখে একটা সুবিধাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। যেভাবে দেখতে ভালো লাগে সেভাবেই দেখে। কারো কাছ থেকে কোন কথা শুনা মাত্রই সুবিধামতো শুনা কথার অংশ বিশেষকে গ্রহণ-বর্জন করা হয়। পাঠের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। এমনকি কুরআনের মতো কেতাব পাঠের বেলায়ও নিজেদের চিন্তার স্তর অনুযায়ী এর ব্যাখ্যা তৈরি করা হয় কিংবা তৈরি ব্যাখ্যা মেনে নেয়া হয়। মানুষের সকল গ্রহণ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে কিছু একটা আছে যা বাস্তবতাকে নিজ স্বার্থের অনুকূলে বিকৃত করে গ্রহণ-বর্জন করে। তাই মানুষ বাস্তবতাকে দেখতে দেয় না। যে যে স্তরের মানুষ, বিষয়সমূহ সেভাবে তার মধ্যে ধরা দেয়। সত্য হচ্ছে ফলের ঘন জুসের মতো এর সাথে ভেজাল না মিশিয়ে পান করা কষ্টকর। মানুষের দৃষ্টি, প্রত্যাশা ও নিজ নিজ কামনায় আচ্ছন্ন থাকে। দৃষ্টির স্বচ্ছতা তখনই আসে যখন মানুষ প্রত্যাশা, কামনা ও আসক্তি থেকে মুক্ত হয়। তাই সত্যকে দেখার আগে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হয়। অর্থাৎ নিজেকে অনাসক্ত করে দৃষ্টির স্বচ্ছতা আনতে হয়।

‘সত্য’ অর্থ একদিকে মুর্শিদ, গুরু বা পথপ্রদর্শক, অন্যদিকে ব্রহ্ম, নারায়ণ, পরমসত্তা বা বিধাতা। সত্য শব্দের এই দুটো অর্থ বাণীতে প্রতিস্থাপন করলে  বাণীটির তাৎপর্য হবে – ‘বিধাতাকে দেখার আগে মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা শ্রেয়’। স্বীয় মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই বিধাতা প্রতিষ্ঠিত হন। এই অর্থে, বাণীটির নির্দেশনা হচ্ছে -“মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করাই শ্রেয়”। শ্রেয় অর্থ- শ্রেষ্ঠ বা সর্বশ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠত্ব বিধাতারই একটা গুণ। বিধাতার একটি গুণবাচক নাম  কাবীরু অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ। মুর্শিদকে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করলেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জিত হয়। স্বীয় মুর্শিদে বিলীন সাধক নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেন ‘আমিই সত্য  আনাল হক। তাই সাঁইজী বলেন – ‘যেহি মুর্শিদ সেহি রসুল, তাহাতে নাই কোন ভুল,  খোদাও সে হয়’।

অন্যদিকে, জগতে যা কিছু আছে তা-ই সত্য। এমনকি যা কিছু নাই তাও সত্য। যদি বলা হয় “ সত্য বলতে কিছু নাই তাহলে এই নাই শব্দটিও আছে, না থাকলে নাই বলা যেতো না”। সুতরাং, নাইও সত্য। বস্তুত নাই বা শূন্যতাই পরম সত্য। আমরা ‘ক’ কে ‘ক’ বলে চিনতে পারি কারণ ‘ক’ এর মাঝখানে নাই বা শূন্যতা আছে। মাঝখানের এই শূন্যতাটুকু না থাকলে ‘ক’ হতো একটা কালির ছুপ। একই ভাবে যখন একটা বাক্য লেখা হয় তখন শব্দগুলোর মাঝখানে ফাঁকা জায়গা থাকে। এই ফাঁকা জায়গা না থাকলে কি লেখা হয়েছে তা পড়া যেতো না। মানুষের কথা আমরা বুঝতে পারি কারণ, শব্দগুলোর মাঝখানে ফাঁক বা শূন্যতা আছে। বস্তুত, ‘নাই’ আছে বলেই আমরা আছি। কোন একটা বস্তু আমাদের কাছে তখনই দৃশ্যমান হয় যখন তার চারিপাশে শূণ্যতা থাকে। একমাত্র শূন্য পেয়ালাই ব্যবহারযোগ্য। সাধকের বাণীতে সত্য লুকিয়ে থাকে তাঁর কথাগুলোর ফাঁকের মধ্যে। সাধক তখনই সবচেয়ে মূল্যবান বার্তাটি প্রেরণ করেন যখন কোন কথা বলেন না। সাধক যা বলেন, তা তাঁর বার্তা নয় তিনি যা বলেন না তা-ই তাঁর মূল বার্তা। এই নাই বার্তাটিকে নিজের মতো করে ধরতে হয়, বুঝতে হয়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তাহলে নাইকে দেখা যায়। তাই সত্যানুসন্ধানে ‘নেতি’ ‘নেতি’  একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।

সত্য অদ্বৈত। সত্য বলতে “ সত্য+মিথ্যাকে, দিন বলতে “ দিন+রাতকে আর মঙ্গল বলতে মঙ্গল+অমঙ্গলকে বুঝায়। কিন্তু মানুষ তার অবিদ্যার কারণে সত্যকে বুঝতে পারে না। তাই সে জগতে ভাল-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গল ও শুভ-অশুভ দেখতে পায়। মানুষ যখন সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সমগ্র জগতে সে শুধু সত্যকেই দেখে। তখন সত্য-মিথ্যার আলাদা কোন অস্তিত্ব থাকে না। প্রতিটি বস্তুই সত্য-মিথ্যা বা ইলেকট্রন-নিউট্রন কণা দিয়ে গঠিত। বিধাতা শুধু মঙ্গলই দেন না তিনি অমঙ্গলও দেন তাই বিধাতা অদ্বৈত। আমরা যাকে অমঙ্গল বলছি হয়তো তা-ই মঙ্গল। কারণ, তিনি যা জানেন আমরা তা জানি-না।

সত্য সম্পর্কে মানুষের বিচার বিশ্লেষণ একটা ছোট বাচ্চার মতো। একটা ছোট বাচ্চাকে আইসক্রীম দিলে খুশি হয়, মনে করে বাবা খুব ভাল কাজ করেছেন। কিন্তু টীকা দিলে কাঁদতে থাকে, মনে করে বাবা খুব মন্দ কাজ করেছেন। বাবা যা জানেন, শিশুটি তা জানে না। শিশুটির কাছে ভাল-মন্দের সংজ্ঞা এক রকম আর বাবার কাছে অন্য রকম। এ প্রসঙ্গে, কুরআনে বর্ণিত সুরা কাহাফের মুসা আ. ও খিজিরের গল্পটি উল্লেখযোগ্য। মুসা আ. জ্ঞান অন্বেষণের জন্য খিজিরকে অনুসরণ করেন।  খিজির শর্ত দেন, কোন প্রশ্ন করা যাবে না। পথিমধ্যে খিজির একটা শিশুকে অকারণে হত্যা করেন, ভাল নৌকা ফুটো করে দেন, বিনা পারিশ্রমিকে ভাঙ্গা দেয়াল মেরামত করে দেন। মুসা আ. শর্ত ভঙ্গ করে তিনবারই প্রতিবাদ জানান, এবং যাত্রার অবসান ঘটে। পরবর্তীতে খিজির – অকারণে শিশুটিকে হত্যা করা, ভাল নৌকা ফুটো করে দেয়া এবং প্রাচীর মেরামত করার কারণ ব্যাখা করেন। মানুষের বিচারে একটা শিশুকে অকারণে হত্যা করা নিশ্চয়ই মন্দ কাজ। কিন্তু যিনি জীবন ও মৃত্যুদাতা, তিনিই ভাল জানেন – কেন একটা শিশুর জীবন দিলেন আবার কেনইবা তার মৃত্যু দিলেন। মানুষ ভাল-মন্দের বিচার করে স্থান ও কালের পরিধির মধ্যে থেকে কিন্তু বিধাতার বিচার স্থান-কালের অতীত। মানুষ যখন বিধাতাকে অনুসরণ করে তাঁর মতো স্থান-কালের ঊর্ধ্বে উঠে ভাল-মন্দের মন্দের বিচার করতে পারবে তখন সে বিধাতার পরিচয় লাভ করবে।

কেউ কেউ বলেন, জগতে সত্য ও মিথ্যা এই দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তি ক্রিয়াশীল। সত্য বিধাতার আর মিথ্যা শয়তানের। বিধাতা শুধু মঙ্গল করেন আর শয়তান অমঙ্গল করে। কিন্তু দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে বিধাতার সর্বশক্তিমান গুণের তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। বিধাতা সর্বশক্তিমান, তাই শুভ এবং অশুভ সব শক্তিই তাঁর। এটা হতে পারে না যে, বিধাতা গোলাপ সৃষ্টি করেছেন আর শয়তান কাঁটা সৃষ্টি করেছে। কাঁটা এবং গোলাপ সব একই বিধাতার সৃষ্টি। সত্য এবং মিথ্যা দুইটি পরস্পরবিরোধী শক্তি নয়, একই শক্তির ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। বিষয়সমূহকে খন্ডিতভাবে দেখা নিম্ন বিশ্লেষণমূলক জ্ঞান। সত্য সর্বত্রই বিরাজমান।  জগতের প্রত্যেকটা বিষয়ে, প্রত্যেকটা বস্তু ও প্রাণীতে, প্রত্যেকটা ঘটনায় সেই সত্যকে দেখাই সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা।

মিথ্যা আছে বলেই আমরা চিনতে পারি সত্য কি। রাত না থাকলে মানুষ দিনের মর্ম বুঝত না, দিন না থাকলে বুঝতো না রাতের মর্ম। দুঃখ না থাকলে মানুষ সুখ চাইতো না, তৃষ্ণা না থাকলে পান করতো না, যন্ত্রণা না থাকলে স্বস্তি থাকতো না। রিপুর অদম্য ভোগেচ্ছা না থাকলে আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সাধনা বলে কিছু থাকতো না। মানুষের দুঃখ-কষ্ট থাকবে, রোগ-ব্যাধি থাকবে, অভাব-দারিদ্র্য থাকবে, শোক ও মৃত্যু থাকবে, থাকবে রিপুর তাড়না তাই মানুষ এই সবের সাথে সংগ্রাম করে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে নিজের জীবনে।

সত্য শব্দের আরেকটি অর্থ সংকল্প, প্রতিজ্ঞা বা শপথ। অন্যের সাথে কথা দিলে তা প্রতিশ্রুতি, নিজের সাথে কথা দিলে – সংকল্প। সংকল্প রক্ষা না করলে নিজের সাথে নিজের মিথ্যাচার হয়। যে ব্যক্তি নিজের সাথে নিজে মিথ্যাচার করে সে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সহজ কিন্তু সংকল্প রক্ষা করা খুবই কঠিন। সংকল্প রক্ষা করতে হলে ইচ্ছাশক্তি চাই। ইচ্ছাশক্তি না থাকলে কোন সাধনা বা প্রচেষ্টাই সফল হয় না। অন্যদিকে, সাধনা না থাকলে ইচ্ছাশক্তিও শক্তিশালী হয় না। ইচ্ছা শক্তির বলেই সাধক অসাধ্য সাধন করেন। তাই সত্যকে দেখার আগে সত্য বা সংকল্প নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।

সত্য হচ্ছে বাকসিদ্ধির মন্ত্র। সত্য বললে বাকসিদ্ধ হয়। সাধকগণ বলেন – কোন রকম মিথ্যাচার না করে কেউ একটানা ১৪ বছর সত্য কথা বললে, তিনি যা বলেন তা-ই সত্য হয়।

সত্য -অমিশ্র, বিশুদ্ধ। মানুষ যখন বিশুদ্ধতা অর্জন কওে অর্থাৎ চিন্তাজগত ‘এক’ বিধাতা ব্যতিত অন্য কিছুর মিশ্রণ থেকে মুক্ত হয় তখনই বিধাতা বা সত্য নিজেকে উন্মোচিক করেন। তাই সত্য দেখার আগে নিজের জীবনকে মিশ্রণমুক্ত বা বিশুদ্ধ  করা শ্রেয়।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে 

মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ দর্শনমুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ দর্শন

শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ যে আল্লাহকে খুঁজে তার ভেতরেই তিনি থাকেন লুকিয়ে। অথচ উদভ্রান্ত মানুষ তাঁকেই খুঁজে বেড়ায় আকাশে-পাতালে, বনে-জঙ্গলে কিংবা পাহাড়ের গুহায়। সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন- ভাতের নিচে কৈ মাছ, আমি কৈ মাছ তালাশ করে বেড়াই’।

যে খুঁজে, যা খুঁজে তা থেকে সে পৃথক নয়। আত্মদর্শনের মাঝেই আল্লাহ দর্শন। মানুষ নিজেকে চিনতে পারলেই চিনতে পারে তার আল্লাহকে। মানুষ এবং আল্লাহর মধ্যে একমাত্র পর্দা মানুষ নিজেই।আমি কে নিজের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে দেখা যাবে আমি বলে কিছু নেই। মানুষ নিজেকে যা ভাবে তা সে নয়। নিজেকে যা ভাবতে পারে না সে ঠিক তাই। এক অসীম শূন্যতা। এই অসীম শূন্যতা থেকেই আসে পূর্ণতা। কিভাবে হবে আত্মদর্শন? সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দীন এবং সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আত্মদর্শনের দুটি স্তর উল্লেখ করেছেন। প্রথম স্তর- ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষ্মভাবে দর্শন করা’। দ্বিতীয় স্তর- মুর্শিদ দর্শন’।

আমরা কি জানি নিজেকে ? কতটুকু জানি ? আমরা কি জানি আমাদের জীবনের লক্ষ্য ? কোন্ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যাপন করছি এ জীবন ? কি পেলে আমরা শান্ত হবো, নিজেকে সার্থক ও সফল ভাবতে পারবো তা কি আমরা জানি ? আমরা কি লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিয়ে জীবন যাপন করি, না-কি সাময়িক খেয়াল আমাদেরকে লক্ষ্যচ্যূত করে ? আমি কে? আমি যেমন আছি, তেমন হলাম কেন? আমি কি চাই? আমি যা চাই তা কিভাবে পেতে পারি? আত্মদর্শনে নিয়োজিত না থাকলে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা যায় না। আর এসব প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে জীবন শুধু অর্থহীন কালক্ষেপণ। মানুষ জীবনে কি চায় তা না জানলে জীবন নিরর্থক কাজকর্মে পূর্ণ হয়। জীবনের অর্থ নিয়ে মানুষ মানব-জীবন লাভ করে না। প্রত্যেককে নিজের জীবনের অর্থ সৃষ্টি করতে হয়। যে যতটুকু অর্থ সৃষ্টি করতে পারে সে ততটুকুই সার্থক। মানুষের সৃষ্টি শেষ হয় নাই। পরিপূর্ণ সৃষ্ট  জীব হিসেবে মানুষের জন্ম হয় না। মানুষ পৃথিবীতে আসে নিজেকে সৃষ্টি করার ক্ষমতা নিয়ে। কে, কিভাবে নিজেকে সৃষ্টি করবে এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। যে যেভাবেই নিজেকে সৃষ্টি করুক না কেন, এজন্য প্রথম পদক্ষেপ Ñ আত্মদর্শন। আত্মদর্শন থাকলে নিজের প্রতিটি কর্মের ব্যাখ্যা তার কাছে থাকবে। মানুষ জানবে Ñ কেন, কি উদ্দেশ্যে, সে কোন্ কাজটি করছে।

মানুষ নিজেকে বদলাতে চায়। কিন্তু নিজেকে না জানা পর্যন্ত নিজেকে বদলানো যায় না। নিজেকে জানতে থাকলে জানার প্রক্রিয়ায় নিজ বদলে যায়।  কি চাই, কেন চাই, তা না জানলে কিছুই পাওয়া যায় না, পাওয়া গেলেও এর মূল্য দেয়া যায় না। অথচ অধিকাংশ মানুষ জানে না সে কি চায়, কারণ, আত্মদর্শন নেই। মানুষ সাধারণত আত্মদর্শন করে না, নিজেকে দর্শন করে না। মানুষ দর্শন করে বাহিরের অযুত দৃশ্য। সিনেমা, টিভি, ক্রিকেট খেলা, আড্ডা ও নানারকম বিনোদনের উছিলায় পালিয়ে বেড়ায় আত্মদর্শন থেকে।

আত্মদর্শন হচ্ছে Ñ আত্ম বা নিজের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি, বোধ, আচরণ, ব্যক্তিত্ব, কল্পনা, স্মৃতি, নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতা, সর্বোপরি নিজেকে দর্শন। আত্মদর্শন হচ্ছে Ñ নিজের দোষগুণ পরীক্ষা, নিজ আত্মার স্বরূপ বোধ। তাই আত্মদর্শন বাস্তব, এটা অন্ধকার ঘরে কালো বেড়াল খোঁজার দর্শন নয়! এই মুহুর্ত থেকে, যে কোন ব্যক্তি, নিজেকে দর্শন করা শুরু করতে পারে এবং যে যতটুকু দর্শন করতে পারবে তার নগদ প্রাপ্তিও হবে ততটুকুই।

তাই আত্মদর্শন নিজেকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ। আত্মদর্শনের শুরুতে এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। আত্মদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করা যাবে, নিজেকে আরো উন্নত স্তরে আরোহন করানো যাবে, নিজের প্রতি এই বিশ্বাস না থাকলে আত্মদর্শন হয় না।

আত্মদর্শনের প্রথম ধাপেই আসবে আত্মসচেতনতা। মানুষ ততটুকুই নিজের জীবনযাপন করে যতটুকু সে আত্মসচেতন। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, উপলব্ধি থাকে তার চেতনায়। তাই সচেতন না হলে, শরীরের কোষগুলো আত্মরক্ষার প্রয়োজন ব্যতিত অন্য কোন তথ্য গ্রহণ করে না। অচেতন কোন কর্মের জন্য যেমন নিজেকে দায়ী করা যায় না, তেমনি অচেতন কর্মের মাধ্যমে যে সাময়িক সফলতা আসে তাও নিজের নয়। আত্মসচেতনতাই বর্তমান। আমি আত্মসচেতন অর্থাৎ আমি বর্তমানে আছি। কিন্তু সাধারণত মানুষ বর্তমানে থাকতে পারে না। যখন যেখানে তখন সেখানে থাকতে পারে না। চিন্তাকে পড়তে শুরু করলেই দেখা যায়, চিন্তা অতীত বা ভবিষ্যতে বিচরণ করছে।

এটা পরিতাপের বিষয় যে, ধর্ম বিষয়টিই হয়ে আছে অতীত এবং ভবিষ্যৎ নির্ভর। কখন কে, কি বলে গেছেন, মৃত্যুর পর কি হবেÑ  ইত্যাদি নিয়ে ধর্মানুষ্ঠানে ধর্মের আলোচ্য বিষয় আটকে আছে মরনের আগে ও পরের’ বিষয়গুলোতে। তাই জীবন চলার বন্ধুর পথ থেকে তা দূরবর্তী হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ধর্ম অতীতেও নেই ভবিষ্যতেও নেই। ধর্ম আছে বর্তমানে। বর্ত+মান = বর্তমান। বর্ত অর্থ Ñ পথ। মান অর্থ Ñ প্রকৃতমূল্য।

যে পথের প্রকৃত মূল্য আছে তা-ই বর্তমান। পাবিরে অমূল্যনিধি বর্তমানে’। কারণ Ñ আমরা অতীতকে পরিবর্তন করতে পারি না। অতীতকে যাপন করতে পারি না। অতীতে কোন একদিন জল পান করেছিলাম এই স্মৃতির রোমন্থনে বর্তমানের জলতেষ্টা মেটে না। সুতরাং অতীতে জীবনের জন্য মূল্যবান কিছু নেই। ভবিষ্যতে কি হবে তাও আমরা জানি না। এমনওতো হতে পারে, এটাই জীবনের শেষ মুহূর্ত। সুতরাং এই মুহুর্তটিকে পূর্ণভাবে যাপন করার মাধ্যমেই জীবন তাৎপর্যময় হতে পারে।

আত্মসচেতন হলে নিজেকে দেখে বিষ্মিত না হয়ে উপায় নেই। আত্মসচেতন হলেই বুঝা যাবে আমি’-র অস্তিত্ব। বুঝা যাবে Ñ ক্ষুধার্ত আমি আর খাদ্য গ্রহণের পর আমি এক আমি নই, ক্লান্ত ও অবসন্ন আমি ও সতেজ আমি এক আমি নই, ঘুমন্ত আমি আর জাগ্রত আমি এক নই, ক্রোধান্বিত আমি এবং শান্ত আমি এক নই। ঠিক একই ভাবে, আত্ম-সচেতনতার একটা পর্যায়ে নিজের মধ্যে টের পাওয়া যায় আমি’র অস্তিত্ব । তখন প্রতিটি কর্মের মূল্যায়ণ শুরু হবে নিজের মধ্যে। আমি’র অস্তিত্ব খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত নিজের বিচার নিজে করা যায় না। নিজেকে এমনভাবে দেখতে হয় যেন নিজের ভেতরের  ‘আমি’ সামনে দাঁড়িয়ে আমি’কে দেখছে। এখান থেকে আর একটু গভীরে গেলে শুরু হবে আত্মসমালোচনার স্তর।

চিন্তা ব্যতিত আবেগ, অনুভূতি, হৃদয়, মন বলতে কিছু আছে কি-না তা নিজের মধ্যে প্রত্যেকেরই খোঁজে দেখার প্রয়োজন আছে। কারো মন খারাপ মানে তার চিন্তা খারাপ। সুতরাং চিন্তা ভাল হলেই মানুষ ভাল হয়। ধারণা, কল্পনা, দৃষ্টিভঙ্গি, কল্পনা ইত্যাদি সবই চিন্তার বিভিন্ন অধ্যায় মাত্র।

সুতরাং, আত্মদর্শনের প্রধান বিষয় চিন্তাদর্শন। চিন্তা সম্পর্কে সচেতন হলে অহেতুক নানা বিষয়ে চিন্তাবিক্ষেপ বন্ধ হয় এবং চিন্তা নিজের লক্ষ্যবস্তুতে কেন্দ্রীভূত হয়। পরিবেশের প্রভাবে অসংখ্য চিন্তা মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে। সাধারণত মানুষ চিন্তা করে না। চিন্তা মানুষকে করে। অসংখ্য চিন্তা আসতে থাকে। এই অসংখ্য চিন্তা থেকে একটা নিয়ে সে কর্মে লিপ্ত হয়। চিন্তা বিক্ষিপ্ত হলে কর্মও বিক্ষিপ্ত হয়।  লক্ষ্যের প্রতি চিন্তা যত বেশি কেন্দ্রীভূত হবে লক্ষ্য অর্জন ততটাই সহজ হবে। চিন্তাকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে সূক্ষ্মভাবে, এমনভাবে যেন চিন্তায় আগত একটা শব্দও বাদ না পড়ে। কারণ, প্রতিটি চিন্তা, তা যত ক্ষুদ্রই হোক, অতিগুরুত্বপূর্ণ। চিন্তায় উদিত একটি মাত্র শব্দ হতে পারে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখি। ইন্দ্রিয়সমূহের বর্হিমুখিতাই চিত্তচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এই চিত্তচাঞ্চল্যের প্রভাবে মানুষ অশান্ত হয়। চোখ একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে যেসব দৃশ্য নিজের মধ্যে প্রবেশ করে তা মোহের সৃষ্টি করে। জীবনের প্রয়োজনে নয়, মোহাবিষ্ট হয়ে আচরণ করতে থাকে প্রতিটি মানুষ। চোখ বাহিরের দৃশ্য দেখে, কান বাহিরের শব্দ শোনে, ত্বক বাহিরের স্পর্শ অনুভব করে, নাক বাহির থেকে ঘ্রাণ গ্রহণ করে, জিহ্বা বাহিরের বস্তুর স্বাদ গ্রহণ করে।  ইন্দ্রিয় দিয়ে যেসব তথ্যের প্রবেশ ঘটে তা অবিরাম পরিবর্তন করে নিজকে। এসব তথ্য কিভাবে সত্তার উপর আবরণ সৃষ্টি করছে তা সূক্ষ্মভাবে দর্শন করলে ইন্দ্রিয়সমূহ বাহ্য বিষয় থেকে নিবৃত্ত হয়। ফলে চিত্ত শান্ত হয়। শান্ত চিত্তে নিজেকে প্রকাশিত করেন পরম জ্যোতির্ময়।

মুর্শিদ দর্শন না হলে আল্লাহ দর্শন স্তরের আত্মদর্শন হয় না।

মুর্শিদ দর্শনে আত্মদর্শন হয় কিভাবে? লোকে সাধরণত মুর্শিদ বতে ইনসানে কামেল’ বা এমন কোন ব্যক্তিত্বকে নির্দেশ করে যিনি নিজ থেকে পৃথক দেহধারী। অর্থাৎ, নিজ থেকে পৃথক কোন ব্যক্তিকে লোকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে অনুস্মরণ করে। তাঁর কাছে যায়, তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করে, তাঁকে অনুসরণ করে। কিন্তু সত্যই কি মুর্শিদ নিজ থেকে পৃথক? জগতে অনেক মুর্শিদ, গুরু বা পথপ্রদর্শক আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করার মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটা কি? যে ব্যক্তি মুর্শিদ হিসেবে কাউকে গ্রহণ করে তার মধ্যে নিজেকে বিকশিত করার একটা ইচ্ছা থাকে। সে নিজেকে একটা বিকশিত স্তরে উন্নীত করতে চায়। কাঙ্খিত এই বিকশিত স্তরটি কেমন হবে এ সম্পর্কে তার মধ্যে একটা অস্পষ্ট ধারণা থাকে। ব্যক্তি যেমনটি হতে চায় কিংবা নিজেকে বিকাশের যে স্তরে নিয়ে যেতে চায় যখন সে বাস্তবে ঐ স্তরের একজন ব্যক্তিকে দেখে তখন তাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে। অর্থাৎ Ñ মুর্শিদ নিজ চিন্তার বাস্তব রূপ। লোকে যাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর সাথে প্রথম সাক্ষাতের আগেই চিন্তাজগতের কোথাও না কোথাও তিনি বিরাজ করতেন। মুর্শিদ নিজ চেতনারই একটা উন্নত স্তর। নিজের মধ্যে সুপ্ত সেই উন্নত চেতনার কাছে আত্মসমর্পণই, মুর্শিদ Ñএঁর কাছে আত্মসমর্পণ। আত্মসমর্পণ হচ্ছে Ñ ঊর্ধ্বস্তরের নিজের কাছে নিম্নস্তরের নিজগুলোর সমর্পণ, অপরির্তনীয় আমি’র কাছে অসংখ্য পরিবর্তনশীল আমার সমর্পণ। মুর্শিদ হচ্ছেন নিজের মধ্যে সেই অপরিবর্তনীয় আমি। যতক্ষণ পর্যন্ত সে-ই আমিকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ না করা হবে এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ না হবে ততক্ষণ                                                                                                  পর্যন্ত আল্লাহ দর্শন হয় না। আল্লাহ স্ব-য়ম্ভু অর্থাৎ নিজ থেকে জাত। আল্লাহ Ñ আত্মভূ। এই আত্মই অনাদি এবং অনন্ত।

সুতরাং মুর্শিদ আত্মবৎ, আত্মভব, আত্মসদৃশ বা আপনার মত। শুধু মুর্শিদ নন, সমগ্র বিশ্বজগতই আপনার মতো। যে যেমন, তেমন ভাবেই সে দেখে জগতকে। তাই আমার মুর্শিদ কেবল ‘আমারই’ মুর্শিদ। আমি যেমন আমি ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না তেমনি আমার মুর্শিদও অন্য কারো মুর্শিদ হতে পারেন না। আমার মাঝে আমার মুর্শিদ আমারই পথ চেয়ে থাকেন।  চূড়ান্ত বিচারে মুর্শিদ দর্শন হচ্ছে সমত্বদর্শন, আত্মসাক্ষাৎকার বা আত্মদর্শন। একমাত্র আত্মজ্ঞ ব্যক্তিই আত্মতত্ত্ববিৎ। এই আত্মজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান।

আত্মদর্শন থেকে আত্মতত্ত্ব বা আত্মার যথার্থস্বরূপ তখনই উন্মোচিত হয় যখন মুর্শিদ নিজের মধ্যে একাগ্রভাবে স্থিত। মুর্শিদ Ñ আত্মনিশ্চল বা আত্মসংস্থ না হলে আত্মস্বরূপ উদ্ভাসিত হয় না। মুর্শিদই আত্মেশ্বর। এ যাবৎ ঊর্ধ্বতম যতগুলো স্তর মানবজাতি কল্পনা করেছে তার সবকিছুর অবস্থান নিজের ভেতরেই সুপ্ত। আল্লাহকে সপ্ত আসমানের উপরে নির্বাসিত করলে তাঁকে কোনদিন খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের ভেতরেই খুঁজে নিতে হবে।

মুর্শিদের গুণাবলি, তার ভাব, তার ব্যক্তিত্ব নিজের জীবনে প্রতিস্থাপিত হলে ব্যক্তি মুর্শিদময় হয় অর্থাৎ সে যেমন হতে চেয়েছিলো বাস্তবে তেমন রূপ ধারণ করে। তখন তার মধ্যে অন্য কিছু হবার বাসনা থাকে না। এ কারণেই মুর্শিদময় অবস্থা শান্ত অবস্থা। এই অবস্থাতেও কর্ম থাকে কিন্তু প্রত্যাশা থাকে না। কর্ম থাকলেই প্রত্যাশা থাকতে হবে এমন নয়। কর্ম ছাড়া যেমন প্রত্যাশা থাকতে পারে তেমনি প্রত্যাশা ছাড়াও কর্ম থাকতে পারে। মানুষ যখন মুর্শিদময় হয় প্রকৃত অর্থে তখনই সে আত্মতত্ত্বময় বা আত্মবান হয়। আত্মবানই প্রশান্তাত্মা।

বস্তু যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তার দু’টি রূপ আছে। একটি তার বাহ্যিক রূপ অন্যটি অভ্যন্তরীণ। বস্তুর অভ্যন্তরীণ রূপকে আবিষ্কার করার বিজ্ঞান হলো আধ্যাত্মিকতা বা আত্মঅধ্যয়ন। আত্মঅধ্যয়নেরও বাহ্যিকতা আছে। আত্মঅধ্যয়ন বিষয়ে লেখার মাধ্যমে এই বাহ্যিকতাটুকু সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা দেয়া যায় মাত্র। আত্মদর্শনের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় প্রকৃতই আছে যা অব্যক্ত। কিভাবে আত্মর্শন হবে তা লেখা কিংবা পাঠের বিষয় নয়। মুর্শিদের কাছ থেকে না জেনে এ পথে যাত্রা করা অসম্ভব।