ধারাবাহিক

জীবনে একটা ক্ষত থাকতেই হয় – ১

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ জীবন মানে যুদ্ধ। জীবন মানে স্নায়ুযুদ্ধ। জীবন অনন্ত যাত্রাপথের একটা ষ্টেশন। জীবন মানে গতি। এই গতি তাক করে রাখতে হয় জীবনের লক্ষ্যপানে। লক্ষ্যকেন্দ্রিক জীবনে একটা ক্ষত থাকতেই হয়। এই ক্ষতই জীবনকে বৃহৎ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। জীবনকে গতিশীল করে রাখে। এই ক্ষত কখনো তাকে সীমালঙ্ঘন করতে দেয়না। ক্ষতটা শুকিয়ে গেলে আর বৃদ্ধি হয় না। ক্ষতটা শুকিয়ে গেলে যুদ্ধ ঝিমিয়ে পড়ে। ক্ষতটার সাথে আর একটা গতি প্রয়োজন, আর একটা অনুপ্রেরণার প্রয়োজন।

দ্বন্দের মধ্যে চলতে চলতে কখনও কখনও জীবনে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয়। কখনও হার্ডলাইনে যেতে হয় যখন আর কোন পথ খোলা থাকেনা, তখন একটাই পথ খোলা থাকে সেটাই হার্ডলাইন। সেটাই কঠিন পদক্ষেপ। হঠাৎ করেই সব ছাপিয়ে দ্বিচারিতা, বহুচারিতা এক এ রূপ নেয়। একটাই যখন প্রাধান্য পায় তখন আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ থাকেনা। যখন কোন ভয় ডর থাকেনা, যখন আর কোন পথ থাকেনা তখনই আসে কঠিন সিদ্ধান্ত।

সারাজীবন ছাত্র থাকতে চান যিনি তাঁর পথটা কেমন? তিনি কি সারাজীবন ক্ষত নিয়েই চলেন? কোন শক্তিতে চলেন, কেমন করে চলেন?

মানুষের জীবনে কিছু ক্ষত  শুকায়না। ক্ষরণ হতেই থাকে। ক্ষত শুকিয়ে গেলে জীবন আর আগে বাড়েনা। ক্ষত রেখেই বৃদ্ধির কাজটি করতে হয়। ভাঙ্গা-চোরা অবস্থায় রেখেই আগাতে হয়। একেবারে ফাইন ফিনিসিং দিয়ে দিলে রাস্তা আর খোলা থাকে না। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের কাজ কখনও শেষ হয় না। জীবন চলার পথের কাজ, একেকটা কাজ আপাতত শেষ হতে পারে কিন্তু সময়ে আবার তা ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে হয়। সাময়িক বিশ্রাম হতে পারে তবে ঝুলে ঝুলেই যেতে হয় সারাজীবন। এজন্যই হয়তো সাধনার জীবনে, মানে গুরুকেন্দ্রিক জীবনে কোন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে দেয়া হয় না। একটা জায়গায় এনে থামিয়ে দেয়া হয়। আবার স্থান-কাল-পাত্র, বাস্তবতাভেদে যাত্রা শুরু করানো হয়। বিনির্মাণ করার সুযোগ দেয়া হয় অনুতে অনুতে। ভিতর ফাঁকা রেখে যে আগানো  তা বেশীদূর যেতে দেয়া হয় না। দেয়ালে পিঠ ঠেকতে দেয়া হয় না সাধারণত। ভিতর বিনির্মাণ করে স্থান পাত্র পরিবর্তন করে বা একটা দুইটা অবস্থা পরিবর্তন করে কখনও সামগ্রীকতার ভিত্তিতে আবার যাত্রা শুরু করানো হয়। কখনও একজনকে দিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান টেনে নেয়া হয়, সাময়িকভাবে ধরে রাখা হয়, কালক্ষেপন করা হয় সময়, সুযোগ ও বাস্তবতার জন্য। এক্সপেরিমেন্ট করেই চলেন, চালান, শিখান। সাময়িক স্বাধীনতা দেন, দেখেন আবার সময়মত হস্তক্ষেপ করেন। ভুল করার সুযোগ দেন, যেখানে গলদ আছে সেখানে ভুলের আঘাতে শিক্ষাটি পোক্ত করেন সে ভুল যেনো আর না হয়। পরিবেশ তৈরী করেন, ধাঁধার সৃষ্টি করেন। চোরকে চুরি করতে, গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলেন। পরীক্ষা করে, সুযোগ দিয়ে, ধাঁধার সৃষ্টি করে প্রত্যেকের জায়গাটা চিহ্নিত করেন, করান। এই খেলা চলতেই থাকে। এ এক মহাবিস্ময়কর, মহাবিজ্ঞানময়, সূক্ষèাতি সূক্ষè এক আর্ন্তজাল যা ধরতে হয় অত্যন্ত সচেতনভাবে।

অকালে পেকে গেলে সেই জিনিস আর সুন্দরভাবে পাকানো যায়না, কখনও আর ম্যাচিউরিটি আসেনা। বাস্তবতার কষাঘাতে যে পাকে তার মতো আর হয় না।  জীবনের প্রতিটি বাস্তবতায় চিরে চিরে চলা ব্যক্তি যেভাবে পোক্ত হয় আর কিছুতেই এমন পোক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিখতে হলে বাস্তবতার নিরিখে খোলা পথে চলতে হয়। সারাজীবন যিনি ছাত্র থাকতে চান তাঁর জীবনের কাজ কখনও শেষ হয় না। মানুষ তৈরী করার কারখানা কখনও রঙ চঙা চুনকাম করা যায় না। টিউনিং রিপেয়ারিং যেখানে চলে সেখানে নতুনের সাথে সাথে পুরাতনও চলে, চালানো হয়। কাউকেই ফেলে দেয়া হয় না। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। টাকা ঢেলে যে প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়, বাহির থেকে তা দৃশ্যমান হয়, চকচকে হয়। মানুষ তৈরী করার কারখানায় সে সুযোগ থাকে না। ক্ষতগুলো দৃশ্যমান করে রাখতেই হয়, বার বার ঘুনে ধরা জায়গায় নতুন করে ক্ষত সৃষ্টি করতে হয়। দূর্বল ঘুনেধরা পচনধরা জায়গাগুলো এমনভাবে পরিষ্কার করতে হয় যাতে শক্ত অবস্থানটুকু শুধু থাকে। এভাবেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পচন পরিষ্কার করে ধৌত করতে হয়। সারা জীবনব্যাপী চলে এই টিউনিং আর রিপেয়ারিং এর কাজ। এ এক চলমান প্রক্রিয়া। আজ যেটা ঠিক প্রতীয়মান হয় কাল সেটা ঠিক নাও হতে পারে । চার বছর বয়সে যে কাজটি ঠিক ছিলো দশ বছর বয়সে সেটা ঠিক হতে পারে কি। পরিবর্তন, বিবর্তন, রূপান্তরের সাথে সাথে কর্মপদ্ধতিও পরিবর্র্তিত হতে হয় বাস্তবতার নিরিখে। বাস্তবতার নিরিখে সচেতনভাবে সংস্কার করে করেই চলে এ পথ পরিক্রমা।

একজনের সাথে কথা হয়েছিলো। তার সারা শরীরে ক্ষত, কাটা, শরীরে পুঁজ জমা হয় একেক জায়গায়। কেটে কেটে পুঁজ বার করতে হয়, আর কোন চিকিৎসা নেই এভাবেই চলতে হয়, চলতে হবে তার সারাজীবন। সারা শরীরে তার কাটার চিহ্ন। এতো কষ্ট মেনে নিয়েছেন তিনি। হাসিমুখে থাকেন ।  এ জীবনই মেনে নিয়েছেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, শরীরের একটা না একটা জায়গা তার কাটাই থাকে সবসময়। তেমনি চিন্তার জগতের পুঁজ পরিষ্কার করার জন্য একটা না একটা ক্ষত সারাজীবন লেগে থাকতে হয়। এভাবেই চালাতে হয় শুদ্ধিকরণ সারাজীবনব্যাপী। একটা না একটা ক্ষত নিয়েই চলতে হয় এপথে। এপথ বিশ্বাসীদের পথ। সত্যের পথে, সাধনার পথে একবার থেমে গেলে, ক্ষত শুকিয়ে গেলে শুদ্ধির আর পথ থাকেনা। সুখে ডোবার কোন সুযোগ নেই এই যাত্রায়। অত্যন্ত সতর্ক, সচেতন, সন্তর্পনে পার হয়ে যেতে হয় এ পথ। সুখে, দুখে কোনটাতেই ডুবে যাওয়ার সুযোগ নেই, কাতর হওয়ার সুযোগ নেই এ যাত্রায়, সাময়িক হতে পারে কিন্তু চলমান রাখতে হয়। এ এক অনন্ত যাত্রাপথের ট্রানজিট ষ্টেশন, ওয়েটিং রুম, ডুবে যাওয়ার সুযোগ কোথায় এখানে। ডুবতে হয় শুধু নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়ে। একটা সাফল্য নিয়ে আটকে থাকার সুযোগ নেই এখানে। সাময়িক প্রাপ্তি সাময়িক সন্তুষ্টি। আবার যাত্রা শুরু করতে হয়। একটার পর একটা করে যেতে হয় এভাবে। সময়ে ঝিমিয়ে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, আবার চলা শুরু করতে হয় আস্তে আস্তে শামুকের ন্যায় দূর্গে অবস্থান করে ধীর লয়ে। পায়ের নীচে কাঁচের টুকরো, চারপাশে কাঁটা, তাই সাবধানে, সন্তর্পনে অতি ধৈর্য নিয়ে চলতে হয় এপথে। জীবন চলার খোলা পথে একটা ক্ষত রেখে দিতেই হয়, যে পথ দিয়ে খারাপ রক্তের মত সব খারাপ বেরিয়ে যেতে পারে শেষ পর্যন্ত।

খোলা পথটি হলো এক্সপেরিমেন্ট করে চলার পথ। আধ্যাত্মিক সাধকগন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুকে বিষ বলেন, পুজিকে পুঁজ বলেন। খোলাপথ  সব খারাপ বেরিয়ে যাবার পথ, যেমন কারো ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গেলে আঙ্গুলের মাথা বা শরীরের কোন জায়গা সুঁই দিয়ে ফুটো করে দিলে বাড়তি রক্ত বেরিয়ে গিয়ে রোগী বিপদমুক্ত হয়।

নিজেকে চেনাই সাধনা, চিনতে গেলে দেখতে হয়। দেখা, শোনা, জানা, বুঝা তারপর হয় চেনা। আঘাত ছাড়া মানুষ নিজেকে চিনতে পারেনা। আঘাত মানুষকে সমৃদ্ধ করে, তিল তিল করে বিনির্মাণ করে ভিতর থেকে।

নিজের কথা – ৫৭

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ক্রোধ জীবনের এক ধরনের বিষাক্ত শক্তি, যা শরীরের উপর মহামারীর ন্যায় প্রাণঘাতী বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে। এ বিষ হাটে বাজারে ক্রয় বিক্রয় করা যায় না। ব্যক্তির অজ্ঞতা হলো এ বিষ উৎপাদনের মূল কারখানা। অজ্ঞতা ব্যক্তির চিত্তের অসচেতন স্তরের চিন্তাশক্তির একটি অবস্থা। প্রাকচেতন অবচেতন কিম্বা অচেতন স্তরের অজ্ঞতা থেকেই ঈর্ষা হিংসা লোভ ক্রোধ ইত্যাদি নামক চিন্তাশক্তির উদ্ভব ঘটে থাকে। লোভ নামক চিন্তাশক্তির প্রভাব থেকেই অজ্ঞ ব্যক্তিগণ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়। আর ক্রোধশক্তির উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। ক্রোধশক্তির উৎপাদন ও প্রয়োগ করে অন্যের যতটা ক্ষতিসাধন করা যায় এ শক্তির প্রভাবে মানুষ তারচেয়ে অনেক বেশি নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

ক্রোধশক্তি প্রজ্বলিত অনলের মত চেতনাস্তরের এক শিখা বিহীন অনল। যা প্রাণশক্তির ভাললাগা নামক চিন্তাশক্তির স্তরকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারপূর্বক ভষ্ম করে ফেলে। ফলে ব্যক্তির ভালোলাগার ঘাটতি ও আত্মবল দুর্বল হতে দর্বলতর হতে থাকে। যার প্রভাবে ব্যক্তির জীবনের সুখ বিনষ্ট হয় এবং অসুখ ও জ্বরাব্যধির সুত্রপাত হতে থাকে । ব্যক্তি প্রথমে আত্মিক ও মানুষিক এবং পরবর্তীতে ক্রমেই শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কথায় আছে, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘অজ্ঞতাই সকল ভুলের মূল।’

অজ্ঞতার কারণে ব্যক্তির ক্রোধ নামক চিন্তাশক্তির উদ্ভব হয়। ফলে অসুস্থতার সুত্রপাত ঘটে এবং ব্যক্তির জীবনের দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়ে আচরণের উপর বিরক্তিভাব ও বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। ফলে মাত্রাধিক্য ক্রোধের কারণে চলার পথে ব্যক্তি পারিবার ও সমাজের জনগনের সাথে সদ্ব্যবহার ও আত্মীয়তা রক্ষা করে চলতে পারে না। যে কারনে ব্যক্তি ক্রমেই পরিবার ও সমাজের অশান্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়। আর পরবর্তীতে সে পরিবার ও সমাজের সদস্যদের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। এভাবেই অজ্ঞতার কারনে উদ্ভুত বিভিন্ন চিন্তাশক্তির অপব্যবহার করে অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ্য ও দুর্বল হয়ে শারীরিক মানসিক পারিবারিক সামাজিক ও আর্থিকভাবে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন ও প্রতারিত করে থাকে। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ নিজেরাই নিজেদের অধিক প্রতারিত করে থাকে।

সাম্প্রতিক ৬০ বয়ষোর্ধ এক উচ্চশিক্ষিত  মহিলার বাস্তব জীবনের ঘটনা থেকে জানা যায় তার শরীরের রক্তচাপ মেপে দেখা গেল তার রক্তচাপের উপরের মাত্রা ছিল ১০০ একক ও নিচের মাত্রা ছিল ৬০ একক। অর্থাৎ সে তখন নিম্ন রক্তচাপ নিয়ে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় সে তার ছেলের সাথে পারিবারিক বিষয় নিয়ে  উত্তেজিতভাবে কিছু কথা বলে। মাত্র ৩০ মিনিট পর তার রক্তচাপ মেপে দেখা যায় তার রক্তচাপ বেড়ে উপরের মাত্রা ১০০ একক থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ একক আর নিচের মাত্রা ৬০ একক থেকে বেড়ে হয়েছে ৯০ একক। অর্থাৎ তার নিম্ন রক্তচাপ বৃদ্ধি পেয়ে উচ্চরক্তচাপের যন্ত্রণা অনুভব করতে আরম্ভ করেছে। এতে দেখা যায় একটা বয়সের সাথে মানুষের রক্তচাপ তার চিন্তাশক্তির পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। মানুষের প্রত্যাশার অনুকূলের রক্তচাপ মাত্রা ও প্রত্যাশার প্রতিকুলের রক্তচাপের মাত্রা ভিন্নতর হয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যক্তির মেজাজের তথা আচরণের নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করে প্রবাহিত হয় ব্যক্তির স্বাভাবিক রক্তচাপ। অর্থাৎ ব্যক্তির সুস্থ্য স্বাভাবিক আচরণের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে ব্যক্তির সুস্থ্য স্বভাবিক জীবন যাপন।

গবেষণায় দেখা যায় ব্যক্তির নিজস্ব পরিবেশ গড়ে ওঠে তার আচরণের উপর নির্ভর করে। দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অনুসারে একই কর্ম সম্পাদন করতে বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন ভাবে আচরণ করে থাকে। কেহ পরিবেশ শান্ত ও সুখকর রেখে তার কর্মগুলো সম্পাদন করতে পারেন আর কেহ তা পারে না। সুখকর পরিবেশ বজায় রেখে নিজের কর্মগুলো সম্পাদন করা ব্যক্তির অন্যতম যোগ্যতা। এ সুখকর পরিবেশ বজায় রেখে কর্ম সম্পাদন করতে চেতনার অজ্ঞতা স্তরের চিন্তাশক্তির ব্যবহার না করে সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তির ব্যবহার করা হয়। সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তিগুলো হলো ভাললাগা ভালবাসা স্নেহ সম্মান শ্রদ্ধা প্রেম ভক্তি বিশ্বাস সম্পর্ক এসব উচ্চতর স্তরের জ্ঞানমূলক চিন্তাশক্তি।

চিত্তের সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তিগুলো ব্যক্তির আচরণের উপর যে প্রভাব ফেলে থাকে তার ফলে ব্যক্তি নিজে থাকেন শান্ত ও পরিবেশের অন্যরাও শান্ত থেকে ব্যক্তিকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে প্রেরণা যোগায়। ফলে একদিকে ব্যক্তি সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কর্ম করতে পারেন। অন্যদিকে নিজের সুস্বাস্থ্য পরিবার ও সমাজের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আর্থিক ও আত্মিক ভাবে উন্নত ও শান্তিময় জীবন যাপনের নিশ্চয়তা লাভ করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর অনুসারীদের আচরণের উপর যে অমর বাণী রেখে গেছেন তা অনুসরণীয়। ‘বিদ্যাই মানবগণে প্রদানে নম্রতা, নম্রতা হতে পরে পায় সে যোগ্যতা। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়, ধন হতে ধর্ম, ধর্ম হতে সুখোদয়।’ (চলবে)

কম শক্তি যার গায়, উঠোনা হাক্কানীর নায় উঠেই যদি পড়ো তবে, ভয় করো না এ সংসারে

– সাধক আনোয়ারুল হক

সাইমা (মাস্কাট) ॥ কম শক্তি যার গায়-উঠোনা হাক্কানীর নায়-উঠেই যদি পড়ো-তবে ভয় করো না এ সংসারে। বাণীটি সাধক আনোয়ারুল হক্-এঁর। পৃথিবীতে শক্তির উৎস হলো সূর্য। সূর্যেরও শক্তির একটি নিদিষ্ট উৎস আছে। পদার্থ বিজ্ঞান পুরোটাই শক্তির আলোচনায় উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ। শক্তি সর্ম্পকে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞান উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ হয়েছে। আরো শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে রাত-দিন গবেষণা অব্যাহত রাখার বিকল্প নাই। যে বল প্রয়োগে বস্তুকে স্থানান্তরিত করা যায় না, ইহা বল নয়। যাঁরা শক্তি নিয়ে গবেষণা করেন-তাঁরা শক্তি হয়েই জগতে বেঁচে আছেন এবং থাকবেন। বিশ্বজুড়ে করোনার টিকা আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীরা রাত-দিন পরিশ্রম করছেন। চুড়ান্ত একটি পর্যায়ে যাওয়ার জন্য আরো গবেষণা চলছে। অর্থাৎ আরো জ্ঞান শক্তির প্রয়োজন। শক্তি যদি শূন্য হয়ে পড়ে তবে সকল কিছু অচল। সুতরাং, জীবন চলার পথে শক্তি আবশ্যকীয় একটি বিষয়।

পদার্থ বিজ্ঞানে শক্তির গবেষণা হয়। কিন্তু এই গবেষণা, সাধক তাঁর বাণীতে নিয়ে এসে আমাদের কি ব্যাখা করতে চাইলেন ? পৃথিবীকে সবচেয়ে বেশী শক্তির প্রয়োজন পা থেকে মাথা পর্যন্ত মানুষের শরীরে। এর উৎকৃষ্ট উদাহারণ হলো, মানুষের শরীরের যখন ব্লাড সুগার শূন্য-এ নেমে আসে, তবে সাংঘাতিক ঘটনা ঘটার আশংকা থাকে এবং ঘটেও থাকে। যেহেতু শক্তি স্থানান্তরযোগ্য তাই নিজে শক্তিশালী হয়ে-এই শক্তি অন্য বস্তুতেও সঞ্চালন করা যায়।

পৃথিবীতে সকল ধরণের ইঞ্জিন মানুষের চিন্তা শক্তির সফল গবেষণা ও সঞ্চালন ।

পৃথিবীতে শক্তির উৎস সূর্য বটে, সূর্যও বিধাতার সৃষ্টি। সূর্য বিধাতার সনে কঠোর সংযোগের মাধ্যমে বিধাতার নিকট থেকে শক্তি সঞ্চার করে। পবিত্র গ্রন্থ সমুহ বলছে- চন্দ্র/সূর্য/গ্রহ/নক্ষত্র সকল কিছু ইশ্বরের আদেশ মোতাবেক নিদিষ্ট পথে চলছে এবং তাঁরা ইশ্বরের নাম স্মরণ /তাছবীহ পাঠ করছে। কিন্তু মানুষ এই কাজ  করছে অথবা করছে না।

মানুষের এই দুই ধরণের চরিত্রের কারণে সাধক, মানুষের প্রতি দয়াবশতঃ শিরোনামে বর্ণিত বাণীটির অবতারণা করেছেন। কাজেই, মানুষ কি পদার্থ ইহা সংক্ষেপে জানা আবশ্যক। পবিত্র গ্রন্থ বলছে – মানুষ মাটির তৈরী। কিন্তু বাস্তবে মানুষের শরীরের এক কণা মাটিও পাওয়া যায় না। মানুষ মাটির তৈরী এর অর্থ হলো – মানুষের শরীরের সোডিয়াম/পটাশিয়াম/ ম্যাগনেশিয়াম/ক্যালশিয়াম/ হাইড্রোজেন/অক্সিজেন ইত্যাদি রাসায়নিক পদার্থ আছে যা মাটিতেও আছে। তাই মানুষের সাথে মাটির প্রচুর মিল আছে। এই কারণেই বলা হয়, মানুষ মাটির তৈরী। বিভিন্ন প্রকার মাটি আছে। যেমন – পলিমাটি/দোঁআশ মাটি / এটেল মাটি ইত্যাদি। পলিমাটিতে প্রচুর ফসল হয়। তবে, বর্তমানে কৃষিখাত উন্নত হওয়ায় সকল প্রকার মাটিতেই ভালো ফসল হচ্ছে।

মাটির তৈরী জিনিস দূর্বল, ভঙ্গুর এবং এক সময় অযত্মে ভেংগে যায়। মাটির তৈরী দ্রব্যাদি যত্ম করে রাখলে সুন্দর থাকে। এই কারণে লক্ষ্য করা যায়, কিছু মানুষ জগতে দেখতে ভীষণ সুন্দর/অপূর্ব! চোখ ফিরানো যায় না। ঠিক একইভাবে মানুষ যদি নিজেকে যত্ম করে-তবে মানুষও অনেক বছর বেঁচে থাকে এবং সুন্দর থাকে। কিন্তু একসময় তাঁকে পৃথিবী ছাড়তেই হবে। কারণ, সে মাটির তৈরী। মাটির তৈরী জিনিষকে যতই যত্ম করা হোক না কেন -ইহা একসময় ভাঙ্গবেই। এই কারণে, মানুষ অসুস্থ হলে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহন করে। অর্থাৎ মাটির তৈরী নিজ দেহটির প্রতি যত্মশীল হওয়ার চেষ্টা করে। এখানে চেষ্টার ত্রুটি/ভুল হলে সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে। সুতরাং, মানুষের জীবনে সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন নিজের প্রতি নজর রাখা। অন্যের প্রতি নজর দেয়ার সুযোগ নাই ? 

মাটির তৈরী হাড়ি-পাতিল/ থালা-বাসন, এগুলি কি কম কিছু ? ভগবান শ্রী কৃষ্ণ,  মাটির তৈরী প্রতিমার সাথে কথা বলতে পারতেন। তাঁর সেই শক্তি ছিলো এবং এখনও আছে। কিন্তু এখন যারা পূজা করেন-তাঁদের, সেই শক্তি হয়তো আছে /হয়তো নাই। অর্থাৎ পূজা ঈদের মতো অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং ভক্তিতে আশাতীত প্রাণ/সত্তা আসছে না। ফলে এসব কর্ম সমাজ তো দুরের কথা, নিজেরও উপকারে আসছে না। এভাবেই জীবনের সূর্য উঠছে এবং ডুবছে।

মাটি খাবার গ্রহন করে। মানুষও খাবার গ্রহন করে। মাটি মানুষকে প্রবল আকর্ষণ করে। মানুষ ছোট প্রাণী। মাটির জগত বিশাল। তাই মাটি একদিন মানুষকে কঠিন আকর্ষণ করে এবং মানুষ শক্তিহীনতার কারণে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই, মানুষ মাটিতে ঢলে পড়ে। মাটিতেই মানুষের শক্তিহীন অবস্থায় স্থান হয়।  (চলবে)

খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি ঃ জীবন ও দর্শন

সংলাপ ॥ সূফী সাধক খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এঁর জন্ম সিস্তানের চিশতি নামক গ্রামে। তাঁর      জন্মসাল নিয়ে মতবিরোধ আছে। মতবিরোধের সীমানা হিজরি ৫৩০ থেকে ৫৩৭। তা সত্ত্বেও ৫৩৬ হিজরির (১১৪১ খ্রি.) ১৪ রজবকে জন্ম সন ও তারিখ হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে মোটামুটি একটা ঐক্যমত আছে। পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকেই তিনি হযরত আলীর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী এবং সাধক, নাম- গিয়াসুদ্দীন হাসান। তাঁর মায়ের নাম, সাইয়েদা উম্মুল ওয়ারা।

তাঁর আবির্ভাবকালে সমগ্র মুসলিম জগতেই ছিল অরাজকতা ও নৈরাজ্য। বিশেষ করে তাঁর জন্মস্থান সিস্তানে মানব জীবনের কোন নিরাপত্তা ছিল না। মারামারি, কাটাকাটি, লুটতরাজ, রাহাজানী লেগেই থাকতো। তাছাড়াও তাতার জাতির অত্যাচারে অতিষ্ট ছিল সাধারণ মানুষ। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁর পিতা গিয়াসুদ্দীন হাসান নিরাপত্তার খোঁজে সিস্তান ছেড়ে রাজধানী নিশাপুরে বসবাস শুরু করেন। নিশাপুর ছিল তৎকালীন সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র। নিশাপুরের নিজামিয়া পাঠাগার ছিল বিশ্বখ্যাত। কিন্তু যে শান্তি ও নিরাপত্তার সন্ধানে পিতা গিয়াসুদ্দিন হাসান সিস্তান ছেড়ে এসেছিলেন তা নিশাপুরেও ছিল না। সুলতান একদিকে তার ভাইদের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন অন্যদিকে, তাকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে হতো। এক পর্যায়ে বহিঃশত্রুদের সাথে যুদ্ধে সুলতানের পতন হলে শত্রুরা রাজ্যে প্রবেশ করে অসংখ্য নিরীহ জনতাকে বিশেষ করে জ্ঞানী-গুণীদের হত্যা করে, নারী ও তরুণদের বলপ্রয়োগে তাদের দাসত্ব করতে বাধ্য করে।

খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি শিশুকাল থেকেই তাঁর পিতার তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া শুরু করেন। তাঁর পিতা একজন প্রখ্যাত আলেম ও আরেফ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি শরীয়ত ও মারেফাত বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। কথিত আছে, মাত্র ১০ বৎসর বয়সে তিনি কুরআনে হাফেজ হয়েছিলেন।

হিজরী ৫৫১ সালে ১৫ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি পিতৃহারা হন। মা হারিয়েছিলেন এর আগেই। ফলে লোভ, হিংস্রতা, হত্যা ও রাহাজানির মধ্যে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তিনি একবারেই একা হয়ে যান।

তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি – এঁর মানসে দেশব্যাপী হত্যা, লুণ্ঠন এবং নৈরাজ্যকর পরিবেশ গভীর দাগ কাটে। শিশুকাল থেকেই তিনি যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন তাও তাঁর মনে গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরকম ভয়ংকর পঙ্কিল পরিস্থিতি থেকে তিনি মুক্তির পথ খোঁজেন, ভাবতে থাকেন পরিত্রাণের পথ, নিবিষ্ট হলেন প্রকৃত শান্তির অন্বেষায়। তাঁর দরদী মন নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠে। ঐ সময় থেকেই তিনি অসহায় মানুষের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। যৌবনের সমগ্র শক্তি ও সাহস তিনি ব্যয় করেছেন আধ্যাত্মিক সাধনায়। যৌবনে তিনি বিয়ে করেননি। লক্ষ্য অর্জনের পর, মতান্তরে ৫৯০ হিজরিতে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। তিনি নিজে তাঁর স্ত্রীকে স্ব-ধর্মে দিক্ষীত করেন এবং স্ত্রীর নাম রাখেন বিবি আমাতুল্লাহ।

৬২০ হিজরীতে অর্থাৎ প্রায় ৯০ বৎসর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম বিবি আসমত। বিবি আসমত ছিলেন আজমীরের কমিশনার সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিনের কন্যা। সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিন তার কন্যার বিয়ের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, তিনি একদিন স্বপ্নে রসুল সা. হতে তার মেয়েকে খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি-এঁর নিকট বিয়ে দেবার জন্য নির্দেশিত হন। খাজা ছিলেন আঁতায়ে রসুল অর্থাৎ রসুল সা. এঁর উপহার। তাই তিনি ওয়াজউদ্দিনের প্রস্তাবে সম্মত হলেন।

দুনিয়াদারির হিসেবে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি -এঁর তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। তিন ছেলের নাম – ফখরুদ্দিন, হিসামুদ্দিন, জিয়াদ্দিন। মেয়ের নাম- বিবি হাফিজা জামাল। মতান্তরে জিয়াদ্দিনের মা ছিলেন বিবি আসমত। বড় ছেলে ফখরুদ্দিন আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন এবং দিল্লীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সংস্পর্শে আসেন। ১২৬৫ খৃষ্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীর থেকে ৩৭ মাইল দূরে আজমীর কিকরি রোডে তাকে শায়িত করা হয়। দ্বিতীয় ছেলে হিসামুদ্দিনও সাধক ছিলেন। তিনি ১২৫৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তৃতীয় সন্তান জিয়াদ্দিন সম্পর্কে এইটুকুই জানা যায় যে, ৫০ বৎসর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীরে দরগায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। দুনিয়াদারির হিসেবে তাঁর একমাত্র মেয়ে, বিবি হাফিজা জামাল ছিলেন বিদূষী মহিলা। তার বিয়ে হয়েছিলো সূফী সাধক হামিদ উদ্দিনের ছেলে রাজিউদ্দিনের সাথে। দরগার দক্ষিণ দিকে বিবি হাফিজা জামাল শায়িত আছেন। খাজার সহধর্মীনীদেরকেও আজমীর দরগায় সমাধিস্থ করা হয়।

হিজরি ৬৩৩ সনে (১২৩৩ খ্রি.) ৬ রজবে ৯৭ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি দেহত্যাগ করেন। ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক আবেগ ও অনুভূতির মহাকর্ষণে প্রতি বছর ৬ রজবে তাঁর উরস বা মহামিলন দিবস উৎযাপন করা হয়। সংক্ষেপে এই তাঁর দুনিয়াদারি জীবন।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত জীবন হচ্ছে সাধনার জীবন, দর্শন এবং দরশনের জীবন। যতদূর জানা যায়, এ জীবনের শুরু হিজরি ৫৫৬ সনে অর্থাৎ ২০ বৎসর বয়সে, একটি বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। ঘটনাটা হলো- হিজরি ৫৫৬ সনে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি একদিন তাঁর বাগানে পানি দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক মজ্জুম সাধক তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। তিনির মজ্জুম সাধকের হাতে চুমু খেয়ে তাঁকে গাছের ছায়ায় বসতে আকুতি জানালেন। বাগান থেকে কিছু আঙ্গুর নিয়ে এলেন তাঁর জন্য। সাধক, তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন- এঁর আদব, বিনয় ও আন্তরিক আতিথেয়তায় বুঝতে পারলেন যে, এ তরুণের মধ্যে সত্যের জন্য প্রবল তৃষ্ণা আছে। এই সাধকের নাম শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি। শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি তাঁর নিজ থলে হতে একটা রুটি বা খৈল বের করলেন। রুটিটি চিবিয়ে তিনি খাঁজা মঈন উদ্দিন- এঁর মুখে দিলেন। খাজা কোন দ্বিধা না করে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলেন এবং অসাধারণ এক আত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। এই দুনিয়া থেকে কিছু সময়ের জন্য তিনি বিচরণ করলেন পরমানন্দলোকে। ভাব জগত থেকে যখন তাঁর প্রত্যাবর্তন হলো তখন আর খুঁজে পেলেন না সাধক শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি-কে।

এই ঘটনার পর তাঁর চিন্তার জগতে একটা তীব্র আলোড়ন শুরু হলো। ‘উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সম্পত্তি অভাবী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তিনি গৃহত্যাগী হলেন। ২০ বৎসর বয়সী এক তগবগে যুবক তাঁর সর্বস্ব ত্যাগ করে কপর্দকহীনভাবে একাকী লোকালয় ত্যাগ করে বের হলেন এলমে দ্বীন অর্জনের পথে এবং মানবেতর প্রাণীদের মতো জীবন-যাপন শুরু করলেন। কোন পিছুটান না থাকায় তিনি একনিষ্ঠভাবে সাধনায় নিমগ্ন হলেন। জ্ঞানের প্রবল পিপাসায় সমরকন্দ থেকে বোখারা, বোখারা থেকে খোরাসান ছুটলেন। বোখারায় তিনি কুরআনের তফসীর, হাদিস ও ফেকাহশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তিনি প্রথাগত ইসলামী শিক্ষায় সমরখন্দ ও বোখারার বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণা যে কেতাবী বিদ্যায় মেটে না। তাই তিনি হাটতে থাকেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আধার অলি-মাশায়েখগণের দরবারে, মাজারে। সত্যের সন্ধানে দরবার থেকে দরবারে ঘুরে তিনি এসে পৌঁছেন ‘হারুন’ নামক গ্রামে। এখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় খাজা ওসমান হারুনী-এঁর সাথে। তিনি খাজা ওসমান হারুনী-কে তাঁর মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং হযরত ওসমান হারুনীও তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন। এরপর থেকে মুর্শিদের আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং একনিষ্ঠ সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। একটানা ১৫ বছর তিনি তাঁর মুর্শিদের সাথে অবস্থান করেন।

খাজা উসমান হারুনীর বয়স যখন ৭০ বছর অতিক্রান্ত, তখন খেলাফত প্রদান করে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি-কে দ্বীন-এ মোহাম্মদী প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আধ্যাত্মিকতায় চিশতিয়া ধারার প্রচার এবং প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু চিশতিয়া ধারাটি শুরু হয়েছিল তাঁর আগে। খাজা উসমান হারুনীর মুর্শিদ ছিলেন খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি। খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় চিশতি ধারা শুরু হয়। খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি তাঁর মুর্শিদের মাধ্যমে চিশতি ধারায় দীক্ষিত হন এবং ভারতবর্ষে চিশতি ধারার ব্যাপক প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।

নিজের ভক্তশ্রেষ্ঠকে ভারতবর্ষে প্রেরণকালে খাজা উসমান হারুনী বলেছিলেন- ‘বাবা মঈন উদ্দিন সৃষ্ট জীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না।’ নিজের মুর্শিদের এই উপদেশকে আদেশ হিসেবে গ্রহণ করে খেরকান, ওস্তারাবাদ, হেরাত, সবজাওর, বলখ, গজনী, লাহোর, দিল্লী পার হয়ে তিনি আজমীরে পৌঁছেন। আজমীরে এসে তিনি যাত্রা বিরতি করার ও আস্তানা স্থাপনের নির্দেশনা লাভ করেন। যতদিন মানুষের মাঝে মানুষকে নিয়ে ছিলেন তিনি তাঁর মুর্শিদের আদেশ- ‘সৃষ্টজীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না’ বিস্মৃত হননি। প্রত্যাশাহীন কর্ম করে গেছেন আজীবন। তাই লোকে তাঁর নাম দিয়েছে গরীরে নওয়াজ। ‘নওয়াজ’ অর্থ প্রতিপালক। তিনি ছিলেন আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার গরীবের প্রতিপালক ও বন্ধু। আল্লাহ্ হচ্ছেন দাতা। যিনি অকারণে, অহেতুক, প্রত্যাশাহীনভাবে দিতে থাকেন তিনিই আল্লাহ্। আল্লাহ্ বলছেন- তোমরা আমার রঙে রঞ্জিত হও। প্রত্যাশাহীনভাবে দিতে থাকাই আল্লাহ্র রং। এই রঙে যিনি নিজেকে রঞ্জিত করেন তিনিই তাঁর পরিচয় লাভ করেন।

গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আল্লাহ্র রঙে নিজেকে রঞ্জিত করেন। তাই লোকশ্রোতি আছে- ‘খাজার দরবারে কেউ ফেরে না খালি হাতে’। খাজা, আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান এবং রাহমাতুললিল আলামীনের উত্তম আদর্শের পরিপূর্ণ বাস্তব উদাহরণ। এজন্যই মানুষ সম্পর্কে তাঁর কোন ভেদজ্ঞান ছিল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসহায় ও দিশেহারা মানুষ শান্তি লাভের আশায় ভীড় করেছে তাঁর দরবারে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আত্মিকভাবে গরীব মানুষ তাঁর কাছে থেকে সমভাবে উপকৃত হয়েছে এবং এখনও তাঁর নির্দেশনা থেকে সঠিক পথের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে।

আজমীরের প্রভাবশালী হিন্দুগণ নানা উৎপীড়ন নিপীড়ন অত্যাচার করেও যখন তাঁর প্রচার প্রতিরোধ করতে পারেনি তখন তারা দিল্লি ও আজমীরের নৃপতি পৃথ্বিরাজের কাছে খাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণ করেন। এতে পৃথ্বিরাজ খাজার প্রতি এক পত্র প্রেরণ করে খাজাকে আজমীর ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।

খাজা পত্রের মর্ম অবগত হয়ে বাহককে বললেন, ‘আমি পৃথ্বিরাজকে জীবন্ত বন্দী করে শিহাবুদ্দিন ঘোরীর হাতে তুলে দিলাম’। এ কথা বলার কয়েকদিন পরেই পৃথ্বিরাজ বন্দী হলেন শিহাবুদ্দিন ঘোরীর হাতে। উল্লেখ্য, কোন মুসলিম শাসকের প্রচেষ্টায় বা শক্তির প্রভাবে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়নি। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে মূলত খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এবং তাঁর পরবর্তী হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল, শাহপরান, শাহআলী, শাহ সুলতান প্রমুখ সূফী সাধকদের প্রচেষ্টায়।

সুদীর্ঘ কালের সাধনা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি যে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে জ্ঞানের জ্যোতি ছড়িয়েছে তাঁর কালজয়ী লেখার মাধ্যমে। কাব্যের অনুপম ছন্দে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর অর্জিত তত্ত্ব। তিনি এক চিরঞ্জীব কবি ও সাহিত্যিক, তত্ত্বজ্ঞান ও দর্শন ভান্ডার। সূফীতত্ত্বকে যে অসাধারণ বাক্যচয়নে তিনি প্রকাশ করেছেন তা সত্যানুসন্ধানী ও জ্ঞান-পিপাসুদের কাছে চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

শুধুমাত্র একটা গজলে সাধক কবি মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি সূফীতত্ত্বের সবটুকু প্রকাশ করেছেন, শব্দের সীমানায় আবদ্ধ করেছেন অসীমকে। তাঁর গজল পাঠে ব্যক্তি মানস হারিয়ে যেতে থাকে অসীম শূণ্যতায়। এমনই একটি গজলে খাজা আল্লাহ্কে উদ্দেশ্য করে বলছেন-

‘আমরা তোমাকে অন্বেষণ করি আর তুমি আমাদের থেকে পালিয়ে বেড়াও, আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো।

আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো।

আমরা ছয়দিক থেকে বেড়িয়ে এসে শতদিকে তোমাকে অন্বেষণ করি। আমাদের দিকে না তাকিয়ে আর কতকাল তুমি সবদিকে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে ?’

সত্যের অন্বেষণে ব্যাকুল আত্মার এটাই শ্বাশ্বত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাবে কবি আল্লাহ্র জবানীতে গেয়ে উঠেন-

‘হে বেখবর, তুমি যেখানেই থাক না কেন, আমাদের সাথেই আছো আমরা তোমাকে ছাড়া থাকি না, যদি না তুমি থাক আমাদের ছাড়া।

আমরা সমুদ্র, তুমি মেঘমালা, কাজেই বারি বর্ষণের চিন্তা করো না। যদি তুমি অশ্রুজল ফেলো তবে তোমার বাগিচা হবে হাস্যোজ্জ্বল। মারেফাতের নিগূঢ়তত্ত্ব আরো স্পষ্ট করার জন্য তিনি আবার পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘তাকে বললাম, পর্দার অন্তরালে আর কতকাল গোপন থাকতে চাও?

সে সময় এসেছে যখন তুমি আমাদের কাছে চেহারা ঢেকে রাখতে পারবে না।

আল্লাহ্ উত্তরে বললেন,- ‘আমি পর্দাবিহীন, যদি কোন পর্দা দেখ তবে তা- ‘তুমিই’।

তুমি আছো হাজার পর্দায় ঢেকে আমাদের থেকে।

তুমিইতো তোমার হকিকত, কতদিন আর এনাম ওনামে চলবে? (আমিত্বের আবরণ) এ এক অনর্থক অস্তিত্ব, তা তুলে নাও আমাদের থেকে।’

খাজার এই একটি মাত্র গজলে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার সকল প্রশ্নের উত্তর। খাজা কেবল একজন কবিই নন, তিনি একজন জ্ঞানবান প্রবন্ধকার। খাজা যেসব প্রবন্ধ তাঁর ভক্তশ্রেষ্ঠ, প্রধান খলিফা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, তাতে প্রকাশিত হয়েছে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দার্শনিক ও সূফীতাত্ত্বিক তাৎপর্য, যা সাধনায় রত প্রত্যেকের জন্য আলোকবর্তিকা।

পঞ্চস্তম্ভের প্রথমে রয়েছে কালেমা তাইয়্যেবা। কালেমা তাইয়্যেবা বা তওহিদতত্ত্বের হকিকত সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তার মর্মার্থ হলো-

মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু’ বললেই কালেমা তাইয়্যেবার দায়িত্ব শেষ হয় না। কি বলা হচ্ছে তা হৃদয়াঙ্গম না করে শুধু মুখে উচ্চারণ করলে তা মানবিক উচ্চারণই হয় না। ‘নাই কোন মাবুদ আল্লাহ্ ব্যতিত’- এ কথা উচ্চারণের আগে প্রথমে জানতে হবে এর নিগূঢ়তত্ত্ব, তারপর নিজের জানাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

নিজের মাবুদগুলোকে নাই করতে পারলেই কেবল ‘ইল্লালাহু’ বলার তাৎপর্য আছে, অন্যথায় মুখে এই কালেমা পড়ার কোন তাৎপর্যই নেই। ‘লা ইলাহা’ দ্বারা সাধক প্রথম নিজের আমিত্ব ও প্রবৃত্তির দাসত্বকে অস্বীকার করবে এবং ‘ইল্লালাহু’ দ্বারা আল্লাহ্ আমিত্বের প্রভুত্ব মেনে নেবে। ‘লা ইলাহা’ প্রবৃত্তির দাসত্বের স্তর আর ‘ইল্লালাহু’ আল্লাহর প্রেমের স্তর। ‘ইল্লালাহু’ স্তরে প্রবৃত্তির দাসত্ব থাকতে পারে না। তাই এই স্তরে শুধু ‘ইল্লালাহু’ আছে কিন্তু ‘লা ইলাহা’ বলার কোন অর্থ নেই। এই স্তরে উপনীত হয়েই সাধকগণ শুধু ‘ইল্লালাহু’ জিকির করেন, ‘লা ইলাহা’ বলেন না। মুনসুর হাল্লাজ এই স্তরে উপনীত হয়েই বলেছিলেন ‘আনাল হক’; বায়েজিদ বলেছিলেন ‘আমি-ই পবিত্র সত্তা’; ফরিদ বলেছিলেন ‘আমি-ই সে’। তাই খাজা বলেন ‘মনে রেখো যে পর্যন্ত সালেক তার চিন্তাজগত থেকে গায়রুল্লাহ্ খেয়াল দূরীভূত করতে না পারবে অর্থাৎ যে পর্যন্ত ‘লা ইলাহা’ না বলতে পারবে সে পর্যন্ত সে মারেফাতের রাস্তায় এক কদমও অগ্রসর হতে পারবে না। আরেফ-কামেল আল্লাহ্কে স্মরণ করাও বিস্মৃত হয়। কারণ, স্মরণও এক প্রকারের দ্বিত্ব এবং দ্বিত্ব আরেফের কাছে কুফরি তুল্য। যে পর্যন্ত শিক্ষার্থী হকিকতের এ তত্ত্ব উপলব্ধি করতে না পারবে সে পর্যন্ত সে তওহিদের মর্ম বুঝতে পারবে না এবং দ্বিত্বের সাগরে ডুবে থাকা অবস্থায় তওহিদভুক্ত হবার দাবি করা বিলকুল মিথ্যাচার বলে প্রতিপন্ন হবে।’ এইভাবে একবার যে ব্যক্তি কালেমা পড়তে পাড়বে নিশ্চয়ই শান্তি হবে তাঁর ঠিকানা।

ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাত। খাজা সালাতকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। রুকু, সেজদা, কেয়াম, কেরাত সম্বলিত লোক দেখানো সালাত এবং আম্বিয়া ও আউলিয়াগণের সালাত যা হুজুরি কালব্ সহকারে আদায় করা হয়। কুরআন প্রথমোক্ত সালাতকারীদের জন্য অর্থাৎ লোক দেখানো নামাজীদের জন্য ধ্বংস নেমে আসবে বলে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছে। এ ধরনের লোক দেখানো নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ পরিচয় লাভ করা যায় না। খাজা বলেন ‘লোক দেখানো নামাজ একেবারে মূল্যহীন শারীরিক কসরত মাত্র। সাধকগণ হুজুরি কালব সহকারে হকিকি সালাত করেন এবং তাঁরা সর্বদা নিজেদেরকে গায়রুল্লাহ্র খেয়াল থেকে মুক্ত রাখেন। তারা সালাতে স্বীয় লতিফাগুলোকে আল্লাহ্র জেকের ও ফেকেরে মশগুল রাখেন এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসের হিসাব তারা রাখেন। তাঁরা ইয়াদে ইলাহি ব্যতিত কোন নিঃশ্বাস ছাড়েন না। এরাই প্রকৃত সালাতি।

সালাতের হকিকত হলো আমিত্বের আবরণগুলো উন্মোচন করার প্রচেষ্টা। এই সালাত রুকু, সিজদা ও কেয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের আল্লাহ্ ব্যতীত চিন্তাজগত থেকে অন্য সকল চিন্তাকে দূরীভূত করা এবং চিন্তায় কেবলমাত্র আল্লাহ্ প্রতিষ্ঠিত করাই সালাতের তাৎপর্য। এই সালাত নিশ্চয়ই সালাতকারীর জন্য মেরাজ অর্থাৎ আল্লাহ্ সাক্ষাৎ। যে সালাতে মেরাজ হয় না তা লোক দেখানো নামাজ হয় কিন্তু কুরআনিক সালাত হয় না।

ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ সিয়াম। সিয়ামের তাৎপর্য হচ্ছে নিজেকে দ্বিন এবং দুনিয়ার আশা-আকাঙ্খা থেকে মুক্ত করা। দ্বিনের আশা-আকাঙ্খা হচ্ছে বেহেশতের আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও হুরের লোভ। এসব লোভ ও আশা-আকাঙ্খা সাধকের জন্য পরিত্যাজ্য। কারণ, এসব আকাঙ্খাও আল্লাহ্ ও বান্দার মাঝে আবরণের সৃষ্টি করে। যতক্ষণ সাধকের মনে বেহেশতের লোভ থাকে ততক্ষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। দুনিয়ার প্রতি লোভ হচ্ছে অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ ও ক্ষমতার লোভ। এসব লোভ শেরেক পর্যায়ভুক্ত। খাজা বলেন ‘সিয়াম হকিকি তখনই সঠিক হবে যখন মানুষ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য সবকিছু চিন্তাজগত থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, যাতে গায়রুল্লাহ্ ধারণা পর্যন্ত থাকে না এবং সব রকমের আশা ও ভয় থেকে চিত্ত মুক্ত হয়।’

সাধারণ মানুষ প্রথমে রোজা রাখে এবং রোজা শেষে ইফতার করে। কিন্তু হাকিকি সিয়াম শুরু হয় ইফতার দিয়ে। সিয়ামের জন্য ইফতার শর্ত নয় বরং ইফতারের জন্য সিয়াম শর্ত। সাধকের অবস্থা এমন নয় যে, তিনি বছরে একমাস সিয়াম বা সংযম করবেন আর বাকী সময় সংযম ভঙ্গ করবেন। সাধকের সংযম একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তিনি সংযম করেন কিন্তু কখনো তা ভঙ্গ করেন না। সাধকের ইফতার দিদারে এলাহি।

খাজা বলেন ‘মনে রেখো, যে ব্যক্তির শায়েখ, মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক নেই তার দ্বিন নেই। যার দ্বিন নেই তার মারেফাতে এলাহি নেই। যার মারেফাতে এলাহি নেই সত্যপথের পথিকদের সাথে তার সম্পর্ক নেই।

সত্যপথের পথিকদের সাথে যার সম্পর্ক নেই তার কোন শুভাকাঙ্খী নেই। যার শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন বন্ধু বা মাওলা নেই।’ যার মাওলা নেই তার সিয়াম থাকবে কি করে?

সিয়ামের পরেই আসে যাকাতের প্রসঙ্গ। শরীয়তের দৃষ্টিতে শতকরা আড়াই ভাগ অর্থাৎ ১০০ টাকার মধ্যে আড়াই টাকা অভাবীদের দেয়া যাকাত কিন্তু তরিকতের দৃষ্টিতে আড়াই ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকী সব বিলিয়ে দেয়া যাকাত। সুরা বাকারর ২১৯ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, ‘লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করে কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও উদ্বৃত্তের সমুদয়।’ প্রশ্ন হচ্ছে ‘উদ্বৃত্তের সমুদয়’ বলতে কি বুঝায়? উদ্বৃত্ত কি শুধু ধন-সম্পত্তি? ধন-সম্পত্তি তো বাহ্যিক উদ্বৃত্ত। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে তা আর্থিক উদ্বৃত্ত। আর কোন উদ্বৃত্ত কি মানুষের নেই? সন্তান জন্ম দেয়া ব্যতিত মানুষের কাম শক্তির সবটাই উদ্বৃত্ত। এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহ্ উদ্দেশে উৎসর্গ করার নাম যাকাত। দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের শেষে যে সময়টুকু থাকে সে সময়টুকুও উদ্বৃত্ত। এই উদ্বৃত্ত সময় আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার নাম যাকাত। একইভাবে, মেধা, বুদ্ধি, শারিরীক ও মানসিক শক্তিরও উদ্বৃত্ত আছে। কার, কোথায়, কতটুকু উদ্বৃত্ত আছে তা তাকেই খুঁজে বের করতে হয় এবং এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহ্ পথে ব্যয় করার নাম যাকাত।

মুক্ত মানুষেরই যাকাত দেবার অধিকার আছে। যে ব্যক্তি মুক্ত নয় তার যাকাত নেই। সুতরাং যাকাত প্রদানের পূর্বশর্ত হচ্ছে মুক্ত হওয়া। যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির বন্ধনে আবদ্ধ তার প্রথম যাকাত হচ্ছে প্রবৃত্তিকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে আনা। যে ব্যক্তি নফসের দাসত্ব করে সে কোন যাকাত দিতে পারে না।

যাকাত দিতে পারে কেবল সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ। উন্মাদের উপর যাকাত দেয়ার কর্তব্য বর্তায় না। যে ব্যক্তি অনাবশ্যক বাক্য ব্যয় করে, জীবনীশক্তিগুলোর অপচয় করে, সকালে এক কথা আর বিকালে অন্য কথা বলে, মিথ্যাচার ও আত্মপ্রঞ্চনা করে, নিজের জিহ্বার উপর যার কোন নিয়ন্ত্রন নেই তাকে কি সুস্থ মানুষ বলা যায়? একজন সুস্থ মানুষ হচ্ছে যে জানে সে কি চায়, যে জানে কেন সে জীবন যাপন করছে। একজন সুস্থ মানুষের জীবন কর্মবৃত্তের একটা কেন্দ্র থাকবে।

একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে। লক্ষ্যহীন জীবন হচ্ছে ‘ন’ ছাড়া জীবন অর্থাৎ জীবের জীবন, জীবের জীবন সুস্থ মানুষের জীবন নয়। সুতরাং যাকাত দিতে হলে প্রথমে সুস্থ হতে হবে অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য বা কাবা ঠিক করতে হবে।

নাবালকের কোন যাকাত নাই। সাবালকের যাকাত আছে। মানুষের নাবালকত্ব আর সাবালকত্ব বয়সের উপর নির্ভর করে না। নাবালকত্ব হচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীলতা। মানুষ আল্লাহ্ ছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নাবালক।  যে ব্যক্তি তার প্রতিটি কর্মের জন্য ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ অর্থাৎ মানুষের গ্রহণশীলতার উপর নির্ভরশীল থাকে সে সাবালক নয়। যে সাবালকই হয়নি তার যাকাতও নেই। সাবালকত্ব হচ্ছে ‘অনেষ্টি টু দ্যা পারপাস, সিনসিয়ারিটি টু দ্যা পারপাস’। সাবালকত্ব হচ্ছে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের যোগ্যতা। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের পরিপূর্র্ণ দায়িত্ব নিজে নিতে না পারে, যতক্ষণ  পর্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার নিষ্ঠা, সততা ও একাগ্রতা প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে সাবালক বলা যায় না।

পঞ্চস্তম্ভের শেষ স্তম্ভটি হজ। হজে কাবাকে প্রদক্ষিণ করতে হয়। খাজা বলেন ‘ইনসানের দেল খানায়ে কাবা এবং মোমিনের দেল আল্লাহ্র আরশ। এ দেল কাবার হজ করা প্রয়োজন।’ এই দেল কাবার হজ সম্পন্ন করতে হয় ‘ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষèভাবে দর্শন করার মাধ্যমে।’

ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখি। ইন্দ্রিয়সমূহের বর্হিমুখিতাই চিত্তচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এই চিত্তচাঞ্চল্যের প্রভাবে মানুষ অশান্ত হয়। ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, স্পর্শ প্রবেশ করে নিজের ভেতরে। প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য, স্পর্শ, গন্ধ, স্থান করে নেয় অস্তিত্বে, সৃষ্টি করে মিথ্যা আমিত্ব। ফলে, স্তরে স্তরে আবৃত হয় এক, একক এবং অদ্বিতীয় ‘আমি’। মিথ্যা আমিত্বের আবরণ উন্মোচন করলে অপরিবর্তনীয় আমির সাক্ষাৎ মেলে। তাই খাজা বলেন, ‘সন্দেহ, গোমরাহি ও গায়রুল্লাহ্ পর্দা দূরীভূত করলে দেলরূপ আয়নায় আল্লাহ্ জাতের জলোয়া প্রত্যক্ষ নজরে আসবে। এটাই খানায়ে কাবার হজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ রকম হকিকি হজের আরো একটা বিশেষ উদ্দেশ্য হলো ইনসান মিথ্যা আমিত্বকে এমনভাবে মিটিয়ে দেবে যেন এই আমিত্বের কোন নাম-গন্ধও অবশিষ্ট না থাকে। এ পর্যায়ে সে ভেতর-বাহিরে সমভাবে পবিত্র হবে এবং দেল আল্লাহ্ সিফাতে গুণান্বিত হবে।’ খাজা লিখেছেন ‘এরপর উমর জিজ্ঞেস করলেন, কাবায়ে দেলের হজ কে সমাধা করে? রসুল সা. উত্তরে বললেন, ‘কাবায়ে দেলের হজ একমাত্র খোদ মহিমান্বিত সত্তা সমাধা করে থাকে। অর্থাৎ বান্দা যখন নফসের বন্দেগিরূপ পর্দা দূর করে দেয় এবং আবেদ ও মাবুদের মধ্যে যখন কোন পর্দা অবশিষ্ট থাকে না তখন সে সিফাতে এলাহিতে সামিল হয়ে যায় এবং তখন তার দেলে জাতে এলাহি প্রকাশ পায়। বান্দার দেলে আল্লাহ্ জাতের প্রকাশ হওয়াই কাবায়ে দেলের হজ বা হকিকি হজ।’

‘কেউ ফেরে না খালি হাতে খাজা তোমার দরবারে।’ খাজার দরবারে চাইতে জানলে এখনো কেউ খালি হাতে ফেরে না। কিন্তু এসব চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারে খাজা বলেন যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে চিনতে সক্ষম হয়েছে সে কখনো আল্লাহ্ কাছে কিছু চায় না।’ এইসব চাওয়া পাওয়া থেকে যে ব্যক্তি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছেন তিনিই আল্লাহ্ পরিচয় লাভ করেন।

খাজা বলেন

‘নিজের সম্মুখ থেকে চাওয়া-পাওয়ার নেকাব তুলে ফেলো

হৃদয়ের আয়নায় তুমি মাওলার সৌন্দর্য দেখো।

সাধুতার কাঁচ দিয়ে আঘাত কর ভৎসনার পাথরে

তাকওয়ার মর্যাদাকে ঢেলে দাও প্রেমালয়ে।’

খাজার এই আহ্বান আঘাত করে অস্তিত্বের অতলান্তে। তাই তাসাউফ ভুবনে খাজা চিরঞ্জীব, অবিস্মরণীয়। প্রায় হাজার বছর ধরে সত্যানুসন্ধানীরা তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ দিয়ে আসছেন। পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন এ ধারাও থাকবে অব্যাহত। খাজা বলেন

‘প্রেমাস্পদ এমন আগুন জ্বালিয়েছে যা

আমার দেহ ও প্রাণ পুড়ে ফেলেছে,

ভাবলাম, আহ্ করে চীৎকার দেবো,

অমনি আশা ও ভাষা পুড়ে গেছে।

বিরহ অনলের তাপ ও জ্বালা দোজখের আগুনেও নেই

হায়! এ আগুন আমার ভেতরটাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

দোজখের আগুন দগ্ধ করে শুধু গুনাহ্গারদের চামড়া তাঁর বিরহের আগুন দগ্ধ করেছে আমার হাড়ের ভেতরের মজ্জা।

হৃদয় দোজাহানের নেয়ামত ও তার পরিণাম কামনা করেছে

প্রেমাস্পদের আগুন এসে আমার

দোজাহানই পুড়ে ছাই করেছে।

দুনিয়া ও আখেরাত চলে যাক্,

শুধু মাওলার প্রেম থাকাই যথেষ্ট।’

যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল তাঁর জন্য তাঁর আল্লাহ-ই যথেষ্ট। আমিন।  (পুনঃপ্রকাশিত)

ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ২৫

মিলন হবে কতদিনে

মিলন হবে কতদিনে আমার মনের

মানুষের সনে ॥

চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালোশশী হব বলে চরণদাসী ও তা হয় না কপালগুণে ॥

মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন লুকালে না পায় অন্বেষণ কালারে হারায়ে তেমন

ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে ॥

ঐ রূপ যখন স্মরণ হয় থাকে না লোকলজ্জার ভয় লালন ফকির ভেবে বলে সদাই

ও প্রেম যে করে সেই জানে॥

‘মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষের সনে।’ প্রত্যেকের অহম বা আমি (ইগো) যেখানে রয় তাকে আমার বলা হয়। এই মায়াবৃত আমির মান হীন বা কম; তাই এই আমির জ্ঞান অনুমানভিত্তিক। এই আনুমানিক আমি মনের মানুষ অর্থাৎ পরম আমি বা প্রামাণিক আমির সঙ্গে জ্ঞানালোকের সাহায্যে সংযুক্ত হতে চায় যা সাঁইজির ভাষ্যে ‘মিলন হবে কতদিনে/আমার মনের মানুষের সনে।’ ‘চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী হব বলে চরণদাসী ও তা হয় না কপালগুণে।’  এখানে চাতক ও প্রায় শব্দের মর্মার্থ বুঝে নিতে হবে। মেঘজল প্রার্থনাকারী হল চাতক এবং নাওয়াখাওয়া ইত্যাদি প্রতিদিনের কাজ ত্যাগ করার নাম প্রায়। অর্থাৎ ভোজন পরিত্যাগ করে রাতদিন বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করাকে ‘চাতক প্রায় অহর্নিশি’বলা হয়েছে। আর এই অনশনব্রত পালন করা হচ্ছে কালোশশীর জন্য। কৃষ্ণচন্দ্রই হল কালোশশী; যিনি চন্দ্রের মতো আনন্দকর। কৃষ্ণ শব্দের মধ্যে কৃষ ধাতু আছে যার অর্থ ‘যিনি প্রলয়ে বিশ্ব আপনাতে আকর্ষণ করেন।’ চাতকের মতো জীবসত্তার সেই পরমপুরুষের আকর্ষণে আকৃষ্ট হবার মানসিকতাকেই সাঁইজি চেয়ে আছে কালোশশী’ – বলেছেন।  দাসের মধ্যে দান, অর্পণ বা আত্মনিবেদন জড়িত। সবিনয় নিবেদনে পরমের চরণ বা গতির মধ্যে বিলীন হওয়াকে ‘হব বলে চরণদাসী’রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তা সম্ভব হচ্ছে না কপালগুণে। কপাল শব্দটিতে ‘ক’ ও ‘পাল’ বিদ্যমান। ক মানে ব্রহ্ম (মনের মানুষ) পাল মানে (পালন) অর্থাৎ ব্রহ্ম যেখানে পালিত হয় তার নাম কপাল। প্রতীকী অর্থে যা শিরোরক্ষক হিসেবে অভিহিত। উল্লেখ্য শিরই জ্ঞানের আধার; যেখানে ব্রহ্মজ্ঞান পালিত ও পুষ্ট হয়। অপর দিকে বন্ধন বা বাঁধনকে গুণ বলে। তা হলে জীব বা রাধাসত্তা পরম বা কৃষ্ণসত্তার সঙ্গে ঐক্য গড়তে চাইলেও ব্রহ্মজ্ঞান বন্ধনযুক্ত থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থাকেই লালন ও তা হয় না কপালগুণে’বলেছেন। ‘মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন  লুকালে না পায় অন্বেষণ কালারে হারায়ে তেমন  ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।’  মেঘের ইচ্ছা জল, জলের ইচ্ছা বিদ্যুৎ। এই এষণা বা ইচ্ছাগুলো মেঘ-জল-বিদ্যুতে একাকার থাকে। ইচ্ছাগুলো প্রকাশিত না হয়ে গুপ্ত থাকলে অন্বেষণ বা সন্ধান পাওয়া যায় না। এর প্রতিফলন নিজের দুই চরণে প্রতিফলিত মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন/লুকালে না পায় অন্বেষণ।’ কৃষ্ণরূপী মহাকাল সত্তাই হল কালা। এই দেহেই জীব ও পরম জুটি মেঘ-বিদ্যুৎ জুটির মতো মিলেমিশে আছে। বিদ্যুৎরূপী পরম মাঝে মাঝে ঝিলিক দিলেও ব্রহ্মজ্ঞান লব্ধ না হওয়ার কারণে সেই পরমপুরুষ বা মহাকাল ‘কালা’ অদৃশ্যমান থেকে যায় যার সাঁইজীয় ভাষ্য ‘কালারে হারায়ে তেমন।’ তা সত্ত্বেও সেই শ্রীকৃষ্ণের রূপ এই দেহের আদর্শে বা আরশিতেই দেখা যায় যাকে লালন বলেছেন ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।’ ‘ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়  থাকে না লোকলজ্জার ভয় লালন ফকির ভেবে বলে সদাই  ও প্রেম যে করে সেই জানে।’  জীব যখন সেই পরমরূপ ভজন বা ভাজক করে নিজেই পরমের অংশী হয় তখন নির্বিকার পরমাত্মিক চেতনার দর্শন থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা যাকে ‘লজ্জা’ বলা হয়েছে তা দূর হয়, পরম আকর্ষণীয় সত্তাকে (কৃষ্ণ) প্রিয় বা পতিরূপে বরণ করলে যে অনুরাগের সূচনা হয় সেই অনুরাগই জীবকে (রাধা) পরমের যানে উঠিয়ে দেয়। এই অনুরাগী পরমপুরুষ সম্পর্কে অবগত হয়।

লালন ফকিরের আত্মজ্ঞানের নিত্য অনুসন্ধানী দৃষ্টি তাই বলে। যার লালন সুভাষণ ‘লালন ফকির ভেবে বলে সদাই/ও প্রেম করে সেই জানে।’ (সমাপ্ত)

নিজের কথা – ৫৪

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥  ‘আমিত্বের আবরণ দুর  করার প্রচেষ্টার অপর নাম এবাদত’ – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক।

সাধক তাঁর এ বাণীতে স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তব জীবনের এবাদত কি এবং তা কিভাবে করা যায়? তারই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন তাঁর এ মহান বাণীতে। এ বাণী থেকে বুঝা যায় আমিত্বের আবরণ ধারণ করে আর যা কিছু করা যাক কখনো এবাদত নামক কর্মটি করা যায় না। তাই এবাদত নামক কর্মটি যথাযথ ভাবে করতে হলে এর মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া দরকার। বুঝা দরকার আমিত্ব কি? আমিত্বের আবরণ কিভাবে হতে থাকে? আমিত্বের আবরণ দুর করার প্রচেষ্টার কিভাবে করা যায়? মানুষের এবাদত করার প্রয়োজন ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি? এবাদত করার জন্য এইসব বিষয় বুঝা দরকার।

আমি এবং ত্ব এ শব্দ দু’টি যোগ করে আমিত্ব শব্দটি লিখা হয়। আমি শব্দটিতে একবচন নিজ সত্ত্বাকে বুঝায়। ত্ব শব্দটিতে ব্যক্তির গুণাবলীর বিষয় বুঝায়। কাজেই আমিত্ব শব্দটিতে আমির গুণাবলী তথা নিজের গুণাবলীকে বুঝায়। আমির গুণাবলী তথা নিজের গুণাবলী প্রকাশের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পারেন। জ্ঞানী ব্যক্তিগণ যুগে যুগে বলেছেন,’  নিজেকে চেন। আবার শাস্ত্র মতে বলা হয়, ‘যে নিজকে চিনতে পারেন, সে ব্যক্তি তাঁর স্রষ্টাকেও চিনতে পারেন। ‘তাই বলা যায় কেহ নিজের পরিচয় সম্পর্কে সঠিক সমাধান বের করতে পারলে সে ব্যক্তির নিকট তাঁর স্রস্টার সৃষ্টির সকল রহস্যের সমাধান সহজ হয়ে যাবে।’

ব্যক্তির ভুমিষ্ঠ ও বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তার পারিবারিক সামাজিক ও অন্যান্য জীবনের সম্পর্ক, জনবল, বিত্তবল, শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোন কর্মগুণাবলীর পরিবর্তনের প্রকাশ ও বিকাশ সাধন হতে থাকে।  এ সকল পরিবর্তনের হ্রাসবৃদ্ধির ক্ষমতা যখন ব্যক্তির নিজের কাছে ধরা পড়ে তখন ব্যক্তির আত্মবলের সমানুপাতিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। এ আত্মবল যতবার পরিবর্তিত হতে থাকে, ব্যক্তির পূর্ব পরিচিতির উপর ততবারই এর কিছুটা প্রভাব পড়তে থাকে। এর ফলে পরিবার ও সমাজের নিকট ব্যক্তির নুতন পরিচিতির বিস্তার ঘটতে থাকে।

পরিবার ও সামাজিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে একজন মানব শিশুর পরিচয় তুলে ধরার জন্য প্রথমে পায় একটি নাম, অতঃপর পিতা মাতা ভাইবোন দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচী, বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী ইত্যাদি সহ বিভিন্ন মহলে পরিচিতির জন্য লাভ করতে থাকে বি.এ, এম.এ, এসব বিভিন্ন ডিগ্রি। চাকুরীর ক্ষেত্রে দারোয়ান পিয়ন সুপারভাইজার, সেকশন অফিসার, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাপরিচালক এভাবে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একইভাবে বিভিন্ন পরিচিতি তুলে ধরার জন্য পায় বিভিন্ন খেতাব ও পদবী। এ সকল সাময়িক কর্মপদবীর মাধ্যমে মানুষের আচরণের সাময়িক কর্মপরিচিতি প্রকাশ পেলেও, স্থায়ী জীবন পরিচিতির প্রকৃত পরিচয় বহন করেনা। সাময়িক কর্মপরিচিতি মানুষে মানুষে উঁচু নীচু, অমির ফকির, ধনীগরিব এসব ভেদাভেদ তুলে ধরে। যা মানুষ হিসেবে সবাই সকলের মর্যাদাকে একইভাবে সমুন্নত দেখতে পায়না। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী এসকল গুণাবলীর পরিচিতির মাধ্যমে সৃষ্টি হয় মানুষের ইগো বা মিথ্যে অস্থায়ী পরিচয়। মানুষের এ অসুস্থ অস্থায়ী পরিচিতির এক এক স্তরের গুণাবলী হতেই সৃষ্টি হয় মানুষের আচরণে আমিত্বের আবরণ।

মানুষের অস্থায়ী দেহকেন্দ্রিক ঋণাত্মক আচরণের প্রভাব যেমন তার জীবনকে আমিত্বের আবরণে আবৃত করে থাকে তেমনি ভাবে আত্মকেন্দ্রিক আচরণের ধনাত্মক পরিবর্তন অনাবৃত করতে পারে ব্যক্তির জীবনের আমিত্বের আবরণ। আত্মকেন্দ্রিক আচরণের ধণাত্মক পরিবর্তন বলতে বুঝায় সকলের আত্মার রয়েছে সত্যময় ক্ষমতাসম্পন্ন স্রষ্টাকে অনুভব করা ও বুঝার সুষম-ক্ষমতা। এ ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার করে ব্যক্তি চাইলে সমুন্নত মর্যাদা সম্পন্ন স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি সদ্ব্যবহার পূর্বক আনন্দ ও শান্তিময় জীবন উপভোগ করতে পারেন। কারণ সকল ব্যক্তির আত্মাই হলো সমউপযোগী সমমর্যাদা ও সমক্ষমতা সম্পন্ন সুবিচারক মহান স্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদা সম্পন্ন আচরণ প্রদর্শন করার উপযোগী গুণাবলী সম্পন্ন আত্মাই হলো মানব জীবনের প্রকৃত পরিচিতি বা স্থায়ী আমিত্ব। ব্যক্তির এ স্থায়ী আমিত্বের প্রভাব ও পরিচয় তুলে ধরার জন্যে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী আচরণের মাঝে সৃষ্ট যে সকল অসুস্থ অস্থায়ী পরিচয়ধারী আমিত্বের আবরণ গড়ে ওঠে, ব্যক্তির স্থায়ী আমিত্বকে এসব সৃষ্ট আবরণের প্রভাবমুক্ত করার অব্যহত প্রচেষ্টাকেই সাধক এবাদত হিসাবে গণ্য করেন।

শান্তি ও আনন্দ ব্যক্তির জীবনের এমন এক সম্পদ যা উপভোগ করে কেহ কখনও ক্লান্ত বা অবস্বাদগ্রস্থ হয়না। তাই ব্যক্তি তার অনন্তকালীন জীবনকে শান্তিময় আনন্দলোকের মাঝে যাপিত করতে চাইলে নানান পরিচয়ধারী আবৃত জীবনকে আমিত্বের আবরণমূক্ত করা অত্যাবশ্যক। এ কর্মটি সুসম্পন্ন করার জন্যই মানব জীবনে এবাদতের ভূমিকা বিশেষ ভাবে অনন্য। (চলবে)

ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ২২

ধন্য ধন্য বলি তারে

ধন্য ধন্য বলি তারে  বেঁধেছে এমন ঘর শূন্যের উপর পোস্তা করে।।   ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি, খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি কিসে ঘর রবে খাড়ি ঝড়-তুফান এলে পরে।।

ঘরের মূলাধার কুঠুরি নয়টা তার উপর চিলেকোঠা তাহে এক পাগলা ব্যাটা বসে একা একেশ্বরে।।

ঘরের উপর নিচে সারি সারি সাড়ে নয় দরজা তারি লালন কয় যেতে পারি কোন দরজা খুলে ঘরে।।

‘ধন্য ধন্য বলি তারে বেঁধেছে এমন ঘর  শূন্যের উপর পোস্তা করে।’  এই পদাবলীর মাধ্যমে সাঁইজি মানবদেহের তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক বর্ণনা তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। এই মানবঘরে পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ধন প্রভূত পরিমাণে যুক্ত আছে এই জন্য সাঁইজি‘ধন্য ধন্য বলি তারে’বলে গেয়ে উঠেছেন। এই ঘর তত্ত্ব বা বস্তুস্বরূপে নির্মিত যা আসলে শূন্যের সমার্থক। ভাব ও রূপের এমন অপূর্ব সমন্বয় জগতের অন্য কোন ঘরে নেই। কাশ বা জ্যোতিসত্তায় তৈরি এই ঘরে অফুরন্ত অবকাশ যার নিকাশ বের করা অসম্ভব। পরমজ্ঞান ভিত্তিক (শূন্য) এই গৃহনির্মাণ প্রকল্প অকল্পনীয়রূপে সংহত (পোস্তা)। যা লালনভাষ্যে‘শূন্যের উপর পোস্তা করে’ পদশৈলীতে উঠে এসেছে। ‘ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি  খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি কিসে ঘর রবে খাড়ি  ঝড়-তুফান এলে পরে।’  ঘরের প্রধান অবলম্বন একক (অখণ্ড) পরমচেতনা। কণ্ঠের উপর দ্বিদল বা তার উপরে সহস্রারে পরমচেতনলোক। এই চেতনার উৎস লিঙ্গমূল বা মূলাধার। এখানে কুণ্ডলিনী শক্তির নিবাসভূমি (মাটি), এটি ঐ পরমগুরুর শ্রীক্ষেত্র। আসক্ত জীবের মূলাধারে সেই ক্ষেত্র বা মাটির অভাব থাকে; ক্ষেত্র ধাতুগত অর্থে ঐশ্বর্য, উৎপত্তিসূচক ও জাগরণমূলক। বীজের অঙ্কুরোদ্গম এখানে সম্পন্ন হয়। কুণ্ডলিনী ঘুমিয়ে থাকলে ইন্দ্রিয় বাজার সরগরম হয়; কাম-ক্রোধ তীব্র বেগে বইতে থাকে। এতে সৃষ্টি হয় জীবের টাল-মাটাল অবস্থা। তা হলে দেখা যাচ্ছে পরমের একক চেতনার (খুঁটি) বীজ জীবের মূলাধারের ক্ষেত্র থেকে প্রস্ফুটিত না হওয়ায় জীব মায়ামোহ ঝটিকায় পড়ে বিপর্যস্ত হয়; যার সাঁইজীয় বাকপ্রতিফলন ‘ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি/খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি/কিসে ঘর রবে খাড়ি/ঝড়-তুফান এলে পরে।’ ‘ঘরের মূলাধার কুঠুরি নয়টা  তার উপর চিলেকোঠা তাহে এক পাগলা ব্যাটা  বসে একা একেশ্বরে।’  ঘরের প্রধান কক্ষগুলো নয়টি; যাকে নবদ্বার বলা হয়। কানের ২টি, নাসিকার ২টি, চক্ষুর ২টি, মুখের ১টি, মলদ্বারে ১টি, লিঙ্গ/যোনিদ্বার ১টি। কপালের নীচ থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত নবদ্বারের বিস্তার। এই নয়টি ছাড়াও কপালের শীর্ষভাগে অবস্থিত মস্তিষ্কও একটি কক্ষ যেটি ঐ প্রধানগুলোরও প্রধান; যাকে সাঁইজি চিলেকোঠা বলেছেন। ঘরের এই শীর্ষে-থাকা-কামরায় (মস্তিষ্ক) এক সংক্ষিপ্ত (পাগলা), সূক্ষ্ম পরমপুরুষ (পাগলা ব্যাটা) একক কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে অবস্থান করছে। লালনশ্লোকে যা ‘তাহে এক পাগলা ব্যাটা/বসে একা একেশ্বরে’ রূপে বর্ণিত। ‘ঘরের উপর নাচে সারি সারি  সাড়ে নয় দরজা তারি লালন কয় যেতে পারি  কোন দরজা খুলে ঘরে।’  ঘরের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে উচ্চ-নিম্নক্রমে সারণি আকারে দরজাগুলো সজ্জিত আছে। এর আগের অন্তরায় নয় দরজার উল্লেখ রয়েছে; এখানে সাড়ে নয়। সাড়ে শব্দটি সার্ধ থেকে এসেছে। অর্ধের সহিত যা তা-ই সার্ধ। আবার অর্ধের মধ্যে আছে ঋধ্ যার অর্থ বৃদ্ধি। অর্থাৎ নয়কে সমুদয়রূপে বৃদ্ধি করে যা তার নাম সাড়ে নয়। আগে যে নয় দরজার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রক অবস্থান করছে আড়ালে যার নাম মন। এই মনকে অনেকে দশম দ্বার বলে থাকে যা রসিক সাঁইজির পদে সাড়ে নয় হিসাবে পদস্থ। এই মন আসলে পরম মন; যার

অবস্থান মস্তিষ্কের সহস্রপদ্মে। সাধক মূলাধারের সর্পিল শক্তিকে সুষুম্নার ভিতর দিয়ে উর্দ্ধগামী করে সহস্রারে নিয়ে গিয়ে পরম মনের সঙ্গে মিলিত করেন আর তখনই রুদ্ধ দরজা খুলে যায়। যা সাধক লালনভাষায়‘লালন কয় যেতে পারি/কোন দরজা খুলে ঘরে।’ (চলবে)

নিজের কথা ৫২

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ‘যেখানে আল্লাহ থাকেন সেখানে শয়তান থাকে’, এ কথাটি বলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। অমৃত কথাটি তাঁদের জন্য মহামূল্যবান যাঁরা আল্লাহওয়ালা হতে চান। আল্লাহর আদেশ নিষেধ উপদেশ অনুস্মরণ পূর্বক নিরহংকার জীবন যাপন করেন আল্লাহওয়ালাগণ। আর শয়তানগণ নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে উত্তম বিবেচনা করে। তাই তারা সর্বদাই অহংকারী তথা হামবড়াই ভাবনিয়ে জীবন যাপন করে । তাই আল্লাহওয়ালাদের জীবন চলার পথ আর শয়তানের জীবন চলার পথ সম্পূর্ন ভিন্ন ও বিপরীত। আর অধিকাংশ সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার কারনে কখনও আল্লাহওয়ালার আবার কখনও কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের অনুস্মরণ করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের ত্রুটিপূর্ণ আচরণের কারনে তাদের জীবন যাপন পদ্ধতিও অনেকটা দ্বিচারিতাপূর্ণ। শয়তান সন্দেহপ্রবণ, সংকীর্ণ পরচর্চাকারী ঈর্ষাকাতর ও অহংকারী। তাই তারা অন্যদের মঙ্গলময় জীবন যাপন সহ্য করতে পারে না। তারাজীবন চলার পথে কখনও মনে মুখে এক থাকতে পারে না। তাই শয়তান সর্বদাই সাধারণ মানুষকে কুমন্ত্রনা দিয়ে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তিতে রাখার জন্য মুনাফেকি তথা দ্বিচারী চরিত্রের আচরণ করা পছন্দ করে।

সত্যদর্শী সূফী সাধকগন আল্লাহর সুপথে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে অনুসারীদের সজাগ থাকতে একদিকে বলেন,  ‘সুজন কুজন আপনজন এই নিয়ে হয় জীবন যাপন’। অন্যদিকে শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে মুক্ত থাকতে সাবধান করেন এভাবে, ‘সাবধান হাসতে খেলতে চলতে আর বলতে ঈমান চলে যেতে পারে!’

শয়তানের চক্রান্ত আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে না থাকলে যে কেউ আল্লাহওয়ালা হতে পারত। আল্লাহওয়ালা হতে সাধকদের সাধনার প্রয়োজন হতো না। তাই বলা যায় সাধনা জগতের পথচলায় সাধকগণের আল্লাহওয়ালা হবার নেপথ্যে শয়তানের শয়তানী ভূমিকা পালন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। শয়তানী চক্রান্ত জয় করার মাধ্যমে সাধকগণের একদিকে যেমন জ্ঞান অর্জনের পথ প্রসারিত হতে থাকে। অন্যদিকে সাধনার সাফল্যের পরিণতি হিসেবে সাধকেরা জ্ঞানের পরিমন্ডলে বিচরণ করে আলোকিত ভুবনের আনন্দময় জীবনের সন্ধান লাভ করে থাকেন।

তাই বাস্তবে দেখা যায় সাধারণ মানুষ চতুরতার আশ্রয় নিয়ে তাদের কর্মক্ষেত্রের সৃষ্ট জটিলতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করে এবং নিজেরাই নিজেদের জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ করে নিজেদের আলোকিত আনন্দময় জীবনের পথচলা থেকে বঞ্চিত করে। ফলে তারা পরমুখাপেক্ষী হয়ে ভিখারির জীবন যাপন করে। আর কর্ম ক্ষেত্রে অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে থেকে দারুন কষ্টের মাঝে ধুঁকে ধুঁকে মরে।

সাধনা জগতের সাধনশক্তি বলে সাধকগণ নিজেদের শয়তানী কর্মকান্ড থেকে নিয়ন্ত্রিত রেখে মহান মৃত্যুঞ্জয়ী জীবন যাপনের কর্মক্ষমতা লাভ করে থাকেন। ফলে কুজন শয়তান সুজন সাধকদের সাথী হয়ে সাধকদের নিয়ন্ত্রিত আজ্ঞাবহ শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং সাধকগনের কর্মকন্ড পরিচালনা করার উপযোগী পরিবেশ গড়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়োজিত করে। (চলবে)

গুরু নামের স্মরণ – ২

শাহিনুর আক্তার ॥ দরবারে যেতাম-আসতাম, নানা কাজে ভুল করে ফেলেছি। কারন একজন সাধকের দরবারে প্রতি নিয়ত আদব রক্ষা করতে হয়। আমাদের পরিবারে মা ছাড়া কেউ যেতেন না। তাই সেভাবে তেমন কিছু শিখে উঠতে পারিনি, ছোট বেলায় মায়ের সাথে মামার কাছে গেলে, মাকে দেখতাম সরাসরি মামার পা ছুঁতেন না, পায়ের সামনের স্থানটিকে স্পর্শ করে কদমবুচি করতেন। পরে এটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। দর্শনরুমে মামার সাথে দেখা করার পর পায়ের কাছে কদমবুচি করতাম। একদিন বললেন, ‘এভাবে লোক দেখানো সম্মানের কোন প্রয়োজন নাই, মামাকে যদি চাস, হৃদয়ে স্থান দিস। তাহলেই হবে যোগ্য সম্মান।’ তখন কিছু না ভেবে বলে ফেললাম, ছোট বেলা থেকে মাকে দেখে অনেকটা অভ্যাস হয়ে গেছে। মামা তখন শব্দ করে হেসে উঠলেন। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না আমি কি ঠিক/ভুল করলাম। অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। এখনও যে সবটা বুঝে ফেলেছি এমনটাও নয়।

জীবনের নানা দুঃখ-যন্ত্রণা, কষ্ট, ক্ষোভ নিয়ে মামার কাছে যেতাম। খুলে বলব বলে। যখন তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছি। ঐ চোঁখের চাহনিতে মনে হয়েছে সবটা জানেন। কালো মোটা ফ্রেমের মধ্যে দুটো চোঁখ যেন, আমার ভেতরের হৃদপিন্ডটার স্পন্দনটা পর্যন্ত  দেখতে পাচ্ছেন। যেন আমার অন্তর্যামী। বলতেন, ‘গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পঁয়সা করা কোন ব্যাপার নয়। ইচ্ছে করলেই করা যায়।’ বিভিন্ন সন্মানীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বলতেন। কথাগুলো কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তাও তো বুঝতে পারতাম না।

সালটা সঠিকভাবে মনে করতে পারছিনা। পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষ্যে মিটিং ডাকা হয়। যুব উন্নয়নের পক্ষ থেকে ঐ মিটিং এ আমিও উপস্থিত ছিলাম। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত চাওয়া হয়। সকল সদস্যগণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। জ্যোতিভবনের সামনে রাস্তায় প্যান্ডেল ও মঞ্চ প্রস্তুত করা হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপন করার জন্য। আমার কেবল সেমিনার রুমের ঘড়ির দিকে চোঁখ। রাত গভীর হচ্ছে। কারন একা আমি, ফার্মগেট আমার গন্তব্য। সাথে বাচ্চাকে নেইনি। সুতরাং মায়ের বাসায়ও থাকতে পারবো না। ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিভাবে বাড়ি ফিরবো। রাতে গণপরিবহন পাব কিনা নানাবিধ চিন্তায় আমি বিভোর। ঘড়ির কাটা ১২:০০ টায়, মামাও সভা মূলতবী ঘোষণা করলেন। মামা উঠে অফিস রুমের দিকে গেলেন। আবার ফিরে আসলেন শাহ সূফী শামসুল হক চৌধুরী মহোদয়কে সম্বোধন করে বললেন,  ‘আমার একটা মেয়ে আছে, তাকে একটু ফার্মগেট নামিয়ে দিতে পারেন?’ উনি অত্যন্ত সমীহ করে বললেন, ‘অবশ্যই পারব’। উনি নিচে এসে আমাকে বললেন,  আমি কোন দিকে নামবো। সবশুনে সেভাবে গাড়িতে বসলেন, যাতে আমার নামতে সুবিধা হয়। মানুষের সুন্দর ব্যবহার কতটা সুন্দর হতে পারে । ভালোর কতরূপ হতে পারে, তা বুঝি এরকম একজন ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে না আসলে বুঝতে পারতাম না। জীবনে ভালো মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখার সুযোগ খুব কাছ থেকে হয়েছিল। এগুলো চরম পাওয়া। এটা তাঁর আর্শীবাদ। নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এমন পাওয়া আর কি ভাগ্য হবে? ছোট বা বড় সকলের প্রতি এমন করে ভাবনা তো কেবল সাধক শ্রেণীর মানুষই করতে পারেন।

সময়টা ২০১৩ সাল হবে। অডিট আসার আগে সদস্যদের বইগুলো অফিসের হিসেবের সাথে মিলিয়ে দেখা হয় হিসেব কোন গড়মিল আছে কিনা। প্রতিটি বইকে খুব যত্ন সহকারে রাখা হয়। কারন প্রতিটি বইয়ে, মানুষের টাকা গচ্ছিতের দলিল থাকে। অফিসের অডিট অফিসার ও উর্ধ্বতনরা প্রতিটি বই সংরক্ষণ ও তার প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অফিস কর্তৃক সামান্য ত্রুটিকেও তাঁরা সহজভাবে নিতে পারেন না। হিসেবে কোনরকম গড়মিল হলে দিগুন অর্থজরিমানা দিতে হয়। একটা সমিতির সবসদস্যের ব্যাগ ভর্তি বই আমি এক সদস্যের

বাসায় ভুলে ফেলে আসি। পড়ে খোঁজ করলে উনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। ভীষণভাবে মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ এতগুলো বই ডুপ্লিকেট কপি করার অনুমতি অফিস দেবে না। এতবড় দায়িত্বহীনতার কথা অফিসে বলতে পারছিলাম না। ম্যানেজার স্যারকে বলবো কিনা সাহস করে উঠতে পারছিনা। অডিট  অফিসাররা ভেবেই নেবেন কোন বড় ধরনের ঘাপলা ঢাকার জন্য বইগুলো আমি ইচ্ছে সরিয়ে ফেলেছি। মাসব্যপী অনুষ্ঠান চলছিল আমি দরবারে গেলাম। আমি অনুষ্ঠানে এক মুহূর্তের জন্য মনোসংযোগ স্থাপন করতে পারছিলাম না। আমার মন ঘুরেফিরে সেই হারানো বইয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমার চিন্তা জগতে শুধু বই নিয়ে অস্থির ছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম যেন, বইয়ের সন্ধান পাই। পরের দিন অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম, আমার অফিসে এক ভদ্রমহিলা ফোন করে জানিয়েছেন, আপার ব্যাগভর্তি বই পাওয়া গেছে। আপা যেন নিয়ে যায়। এদিকে ম্যানেজার শুনে খুব বেশি কিছু বললেন না। বইয়ের সন্ধান আমার মনের স্বস্তি ফিরে এলো। অজানা কারনে ঐ ভদ্রমহিলা রাতের শেষভাগে বই খুঁজতে লাগলেন এর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে না কিন্তু আমি জানি এটা অবশ্যই আমার মালিকের রহমত ছাড়া আর কিছু নয়।

মানুষের জীবনের নানা উত্থান পতনের এক জটিল সমীকরণ। আমরা জানি না কোথায় আমি কতখানি ব্যাকুল হয়ে উঠবো। চান্দপুর কাফেলার উদ্দেশ্যে মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে রওনা হলাম। সঙ্গে সানী ছিল। তখন সানী বেশ ছোট। আমাদের গাড়ির অগ্রভাগে হাসান ভাই ছিলেন। মাঝে মধ্যে চান্দপুর যাত্রার নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। আমরা সকলে খুব খেয়াল করে শুনছিলাম। চান্দপুর শরীফ পৌছে ভেতরে গেলাম। দরবার মধ্যে মহিলাদের সঙ্গে বসে আছি। দরুদে সামা চলছিল। সংসারের নানাবিধ কারনে আমি ভীষণ ভাবে ব্যাথিত ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, আর যেন কোন সন্তান আমার জীবনে না আসে। যেন কোন কষ্ট পেতে আমার সঙ্গী না হয়। অদ্ভূত এক অভিমান ভেতরে দানা বেঁধে ছিল। জানি না সেদিন কেন এমন প্রার্থনা করছিলাম। মালিক তা সত্যি করে দিলেন। ২০০৩-২০১৩ পযন্ত কোন এক অজানা কারনে আমার জীবনে কোন সন্তান ধারনের সুযোগ হয়নি। যারা দুনিয়াদারী জীবনে সক্ষম দম্পতি আছেন, তারা জানেন অকারণে কেউ ইচ্ছে করলেই সন্তান ধারণ প্রকৃতিগতভাবে রোধ করতে পারেন না। কোন ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্র ছাড়া। সকলে উৎকন্ঠা রোধ করছেন আরেকটি সন্তান কেন আসছে না। আমি তো জানি কোথায় আমার প্রার্থনা কবুল হয়ে আছে। ভেতরে একটা খচখচানি ছিল তবুও সবাই ডাক্তারি চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমি জানি পৃথিবীর কোন ডাক্তার আমার এই বন্ধ্যাকরন দূর করতে পারবে না, আরজি/ক্ষমা প্রার্থনা তো আমার সেখানেই জানাতে হবে। (চলবে)

হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ নিয়ে ১০ম পর্বের আলোচনা

আল্লাহর আশ্রয়েই অর্জন হয় সুন্দর আচরণ

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)এর নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ বিষয়ে আলোচনার ১০ম পর্ব ৯ মাঘ ১৪২৭, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনের আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা, সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ, হাক্কানী বিশেষ দূত মোল্লা হাসানুজ্জামান টিপু এবং বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পর্ষদ সদস্য হারুন অর রশিদ। সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা ব্যবস্থাপনা পর্ষদের যুগ্মসচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু। আগামী ৩০ জানুয়ারি, ১৬ মাঘ ‘আচরণ’ নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ লিখিত বক্তব্যে বলেন, মানুষের ‘আচরণ’ তার পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, উদারতা, সংকীর্ণতা, দৃষ্টিভঙ্গী, বিবেক-বুদ্ধি, হুঁশ-জ্ঞান, জীবন চলার পথে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, নিয়ম-আইন-কানুন ইত্যাদি সব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ্ বলেছেন, ‘আমি জ্বীন ও মানুষকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি  করিনি।’ তাই বলা চলে, মানুষের সকল কর্মই ইবাদত হওয়া উচিত। তবে এই উপলব্ধি বা বোধে আসার জন্য আল্লাহ, ইবাদত, কুরআন বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। কারণ, মানুষ কেবল তার কর্মের মধ্য দিয়েই আচরণের প্রকাশ ঘটায়। আচরণ ঠিক করতে হলে আল্লাহ, ইবাদত ও কুরআনের আলোকে সকল কর্মকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায়, কুরআন নির্দেশিত পথে আচরণ ঠিক করতে হলে সকল কর্মকেই ইবাদতের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।        

আল্লাহকে চিন্বো কী করে? আল্লাহকে পাবোই বা কীভাবে? হাক্কানী চিন্তনপীঠে যে-তিন সাধকের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আমরা পথচলার চেষ্টা করছি, সেখানে তাঁদের বাণীসমূহ থেকেই আল্লাহকে চেনার পথ খুঁজে দেখতে পারি। যেমন-সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী-‘আল্লাহর স্বভাব মোতাবেক নিজের স্বভাব তৈরি করলে আল্লাহর পরিচয় লাভ হবেই হবে’, ‘মুর্শিদ দর্শনের মাঝে আত্মদর্শন। আর আত্মদর্শনের মাঝে আল্লাহ্ দর্শন’, ‘তারা ইসলামের আলোকে দেখিতে পায় নাই যারা আল্লাহর জন্য লালায়িত নয় ’। বস্তুত আল্লাহ্কে না চিনলে আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলা যাবে না, আচরণও ঠিক হবে না। এ জন্য আল্লাহকে চেনার চেষ্টায় আমাদেরকে ব্রতী হতে হবে। সেজন্যই ‘আচরণ’ নিয়ে চিন্তনের এই পর্বে এসে আমি আল্লাহকে চেনার ওপর গুরুত্বারোপ করতে চাই। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দিন-এঁর বাণী-‘নিজেকে চেনার চেষ্টা কর। যতই নিজেকে চিনবে ততই আল্লাহর নিকটবর্তী হবে’,

‘প্রত্যাশাহীন কর্মই ধার্মিক হতে সহায়তা করে ও আল্লাহ্ প্রাপ্তির সহায়ক হয়’। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর বাণী ‘ তুমি তোমার আল্লাহ্র সাথে সংযোগ রক্ষার্থে প্রতিদিন তাঁকে কমপক্ষে এক হাজার একবার স্মরণ কর’। সূফী সাধকগণ জীবন্ত কুরআন। তাঁরা কুরআনকে, কুরআনের বাণীসমূহকে নিজের মধ্যে সম্যকভাবে ধারণ, পালন ও লালন করেন বলে কুরআনের বাইরে একটি কথাও বলেন না। তাঁরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত। ফলে তাঁদের আচরণেই আল্লাহর আচরণ প্রকাশ পায়।

হাক্কানী চিন্তনপীঠ মতে, সম্যক কাজ সম্যক সময়ে সুসম্পন্ন করার নাম ইবাদত। পবিত্র কুরআন নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেই বলেছে, এই কিতাবের মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। কর্তব্যপরায়ণদের জন্য এটি একটি হেদায়েত। কুরআন শব্দের আভিধানিক অর্থও বারবার পাঠ করা। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘কুরআন অর্থ বুঝবেন কীভাবে? এর ৬০% অর্থই হচ্ছে রূপক’।

সূফী সদরউদ্দিন আহমদ চিশ্তি তাঁর কুরআন দর্শন গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘কোরান জীবনবিধান নয়। ইহা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। সালাত এই দর্শন জ্ঞানের মূল উৎস। ইহার দর্শনে যিনি পরিপক্ক তিনি যখন যে বিধান যাহাকে দান করিবেন তাহাই তখন তাহার জন্য কোরানের বিধান। বিধান পরিবর্তনশীল কিন্তু দর্শন অপরিবর্তনীয়। গুরুকেন্দ্রিক সালাতের আত্মিক অনুশীলনের কথা কোরানের সর্বত্র পরিব্যাপ্ত আছে’। এভাবে দেখা যায়, জানার শেষ নেই। যতই জানা যায় ততই চিন্তার গভীরে প্রবেশ করা যায়। মানুষের পক্ষেই সম্ভব এই গভীরে যাওয়া, অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে নয়। তাই মানুষই আজ পর্যন্ত সভ্যতা-সংস্কৃতি-ধর্ম তথা মনুষ্যত্ব বিকাশের এতটা পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান জায়গাটিতে এসে পৌঁছেছে।   

কিন্তু এতটা পথ পাড়ি দেওয়ার পেছনে অবদানও যুগে-যুগে-কালে-কালে কিছু কিছু মানুষের-যাঁরা মানবতার মহান ব্রতে নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, যাঁদেরকে হাক্কানী চিন্তনপীঠে ‘সত্যমানুষ’ বলা হয়েছে, তাঁদের আচার-আচরণ চিন্তা-চেতনা, কর্ম তথা ইবাদত কেমন ছিল, কী ছিল সেটিও ভেবে দেখার বিষয়। নিঃসন্দেহ যে, তাঁদের আচার-আচরণ তাঁদের সময়ের শ্রেষ্ঠতম আদর্শমণ্ডিত ছিল। তাঁরাই আল্লাহর আদর্শের অনুসারী ছিলেন। আর এর বিপরীতে এক শ্রেণীর লোকের ছিল যাদের আচরণটা নিঃসন্দেহে নিকৃষ্টতম ছিল। তারা ছিল বিভ্রান্ত ও পথভ্রস্ট, তাদের পথ ছিল শয়তানের পথ। শয়তান কী? সূফী সদরউদ্দিন চিশতিএঁর ভাষায়, ‘মানুষের আমিত্বই শয়তান’। ‘আমি ও আমার’ ইহাই শয়তানের কথা। আমিত্বের আশ্রয়ে থাকা জাহান্নাম। আল্লাহর আশ্রয়ে থাকা জান্নাত। যে যতবেশি আমিত্ব প্রকাশ করে সে ততবেশি জাহান্নামের গভীরে প্রবেশ করে’। জাহান্নামবাসী কারও পক্ষে ভালো আচরণ সম্ভব কি? কখনও সম্ভব নয়। কুরআনের ১৬ নম্বর সূরা নাহলে বলা হয়েছে, ‘অতএব যখন কুরআন পাঠ কর তখন প্রস্তরাহত শয়তান হইতে আল্লাহর সহিত আশ্রয় লও’ ফাইজা ক্বারা তাল কুরআন ফাসতাঈজ বিল্লাহ মিনাস শাইতানের রাজিম’।

কুরআনের এই নির্দেশের জবাবে আমরা বলে থাকি, ‘আউজু বিল্লাহ্ হিমিনাশ শাইতানের রাজীম’-‘আমি আল্লাহ্ সহিত আশ্রয় লইতেছি বা আশ্রয় সন্ধ্যান করিতেছি প্রস্তরাহত বা (বিচূর্ণিত) শয়তান হইতে।’

নিজের মধ্যে থাকা শয়তানকে বিতাড়িত করে আল্লাহর আশ্রয়ে যেতে পারি না বলেই আমরা অশান্তিতে বাস করি। কখনও ধনসম্পদকে, কখনও স্বাস্থ্য, ক্ষমতা, মান-মর্যাদা, আত্মীয়-স্বজনকে বিপদমুক্তির আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করি। কিন্তু বস্তুতপক্ষে আল্লাহ ব্যতীত বস্তুর যে কোনো আশ্রয় মানুষকে এক জাহান্নাম থেকে অন্য জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হই মাত্র। এই শয়তানকে বিতাড়িত না করে শুধুমাত্র মুখে মুখে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যতই বলি বা কাজ করি সেখানে শয়তানী থেকেই যায়, যা আচরণের মধ্যেই প্রকাশ পায়।

তাই আল্লাহর আশ্রয়ে না-যাওয়া পর্যন্ত কারও পক্ষে সুন্দরতম আচরণের অধিকারী হওয়া কখনই সম্ভব নয়। অর্থাৎ, আল্লাহর আচরণ অর্জনের অধিকারী গুরু/মুর্শিদ/পথ-প্রদর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন না হোক, অন্ততপক্ষে সংযোগ রক্ষা না করা পর্যন্ত মানুষের পক্ষে সুন্দরতম আচরণের অধিকারী হওয়া কখনই সম্ভব নয়। আল্লাহর আশ্রয়ে যেতে পারলেই একজন মানুষ সুন্দর আচরণের অর্জন করতে পারে। গুরু/মুর্শিদকে স্মরণে রাখা এবং তাঁর আদর্শ ধারণ-পালন-লালনই সুন্দরতম আচরণের অধিকারী হওয়ার সর্বোত্তম পন্থা। নচেৎ আচরণ নিয়ে যত কথাই বলা হোক সেটি হবে লক্ষ্যবিহীন পথচলা, মাঝিহীন নৌকার গন্তব্যের মতো। বক্তব্যে আমার ভুলত্রুটির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। সবাইকে ধন্যবাদ।              

মোল্লা হাসানুজ্জামান টিপু বলেন, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ বিষয়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পাওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই শ্রীগুরুর প্রতি। এই হাক্কানী চিন্তনপীঠ সত্যপথে চলার রাস্তা দেখায়, উপলব্ধিবোধে জাগ্রত করে। জয় হানিফ। সকলকে সত্যের শুভেচ্ছা।

আচরণ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত একটি শব্দ। মানুষ ও প্রকৃতির প্রতিটি ক্রিয়াই তার  আচরণ। সাধারণ অর্থে আচরণ হলো মুডের বহির্প্রকাশ। মুড হলো অনুভুতি বা উপলব্ধি- চিন্তায় বা অনুভুতিতে যা ধারণ করে প্রকাশিত হয় সে সব অবস্থার প্রতিক্রিয়া। সাধারণত প্রত্যাশিত আচরণকেই ভালো বা সদাচরণ বলে, অপ্রত্যাশিত আচরণই অসদাচরণ। ভালো  আচরণ বা আদব জানা লোক সমাজে আদরণীয় অথবা সন্মানিত। বেয়াদবকে কেউ পছন্দ করে না, সবাই এড়িয়ে চলে।

হাক্কানীর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে একটা বাক্য শুনে বেশ পুলকিত হয়েছিলাম, ‘আদবে আউলিয়া, বেয়াদবে শয়তান’। শয়তান কেন এটা ভাবতে ভাবতে চিন্তায় এলো শয়তান মানে বেয়াদব। কারণ, সে ঈশ্বরের আদেশ অমান করে দূর্বিনীত হয়েছিলো, সে ঈশ্বরের শাপগ্রস্ত হয়েছিলো। তাহলে এখানে আদেশ মানার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আদেশ মানার সাথে অনেকগুলো ব্যাপার জড়িত। যথা- বিনয়, মান্যতা, বশ্যতা, শৃংখলা, সভ্যতা, শান্তি, স্থিরতা বজায় থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই বিশৃংখলা, দূর্বিনীত, অসভ্যতা প্রকাশ পায়। আর আদবদার হলে শান্তি বজায় থাকে।

প্রকৃতি সদাচরণযুক্ত। প্রকৃতির আচরণের কোন ব্যত্যয় নেই। সূর্য পূর্বদিকে উঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়। গ্রহগুলো নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। ফসল, ফুল, পাখি নিদিষ্টতার বৃত্তে প্রকাশিত। দুর্বিনীত বা অসদাচরণের নয়। সদাচরণে প্রকৃতি শান্ত থাকে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেই প্রকৃতি অশান্ত হয়ে উঠে যাতে প্রকৃতিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। 

মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) যখন ঐশিবাণী প্রাপ্ত হয়েছিলেন হেরার গুহায় তখন তাঁকে বলা হয়েছিলো পড়তে, সেই পাঠ হলো দেহপাঠ। দেহে যে সদাচরণের বা আদবের যে খেলা চলছে তা বুঝার জন্য বলা হয়েছিলো। এই যে আমরা খাবার গ্রহণ করি সেই খাবার থেকে আমার দেহ পায়। দেহে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি যেখানে যাওয়ার সেখানে চলে যায়। এই যে দেহের সকল অঙ্গের সঠিক আচরণ তার জন্যই আমরা সুস্থ থাকি। এর ব্যত্যয় ঘটলেই আমরা অসুস্থ হয়ে যাই।

প্রকৃতিতে মানুষই হলো সবচেয়ে বড় বেয়াদব। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী মানুষ স্বর্গবাসী ছিলো কিন্তু শয়তানের প্ররোচনায় আদেশ অমান্য করে লানৎপ্রাপ্ত হয়ে পৃথিবীতে নির্বাসিত হয়ছে। তাহলে অসদাচরণের শাস্তি হলো লানৎ, প্রভুর নিয়ম ভঙ্গ করলে তাকে শাস্তি পেতে হয়। আচরণ এই লংঘনের পরেও মানুষ সৃষ্টির সেরা হয়েছে। কারণ মানুষ তার নিজের মধ্যে সদাচরণের বিকাশ অর্থাৎ সভ্যতার দিকে ধাবিত করেছিলো জীবনের প্রয়োজনে। সভ্যতার আজকে যে চরম উৎকর্ষতা তা কিন্তু সদাচরণের ফসল। কিছু মানুষ সঠিক আচরণের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলো এবং তারাই হলো সাধক, পয়গাম্বর, প্রেরিতপুরুষ, যুগে যুগে তারাই মানুষকে শিখেয়েছে কী রকম আচরণ করতে হবে। সৃষ্টি র শুরু থেকে এই প্রক্রিয়া যে চলছে তা কোরআনে বলা আছে, ‘তোমাদের মধ্য হতে নির্বাচিত করি তোমাদেরকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য’। এঁরা যে শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তা কিন্তু  নয়। তিনি হতে পারেন বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, কবি, গীতিকার, গায়ক নানা পেশায় জীবনের সকল প্রয়োজনে আমাদের কাছে পথ প্রদর্শক এসেছেন এবং এঁরাই সাধক। নিউটনের সামনে আপেল না পড়লে কী হতো? আর্কিমেডিস চৌবাচ্চায় প্লাবতা যদি না বুঝতেন তাহলে কি হতো? আইনস্টাইন যে অটিষ্টি ক ছিলো তার চিন্তা থেকে কি করে শক্তির সূত্র বের হয়? আরবদের সঠিক আচরণ শেখাতে আসছিলো মোহাম্মদ, লালনের সিরাজ সাঁইয়ের সাথে সাক্ষাৎ যদি না ঘটতো তাহলে কি মানুষের আচরণের চিন্তায় বিদুৎঝলক লাগতো, সাধক রুমি তার গুরুকে না পেলে মানুষ কী পেত আধ্যাত্মিকতার রহস্য জানতে? 

হাক্কানীর সাধকগনের আচরণ, কথা বা বাণী বিশ্লেষণ করে আমাদের আচরণকে সঠিকভাবে আদবপূর্ণ করতে পরি। কারণ তারাই আমাদের শিখিয়েছেন কী করে হক বা সত্যের রাস্তায় চলতে হবে। যেমন “কম শক্তি যার গায় উঠো না হাক্কানীর নায়” কিংবা “বিদ্যা, বুদ্ধি, বল বিক্রম গর্ব দোষে খর্ব হয়” “ধনবান হও প্রকাশিত হইয়ো না, কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো আরো পাবে” তুমি সেই ফুল হও, যে ফুল প্রস্ফুটিত হয় ঝরে পড়ে না। “তোমার প্রতিটি ক্রমের প্ররাম্ভে তুমি তোমার গুরু বা মুর্শিদকে স্বরণ করবে। সত্য মানুষ হও, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে।

আচরণ সে রকমই হতে হবে যা সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন। আচরণ হতে হবে অনুকরণীয়, মানুষ যাতে বুঝতে পারে আমিই সত্য        পথের যাত্রী হাক্কানী। যেমন ‘সত্যমানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’ সত্যমানুষ কে? – যার      আচরণে মানবীয়, যে নিয়ম বজায় রাখে, যে-নিজেকে তার মুর্শিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে চলে। এ কথা সবসময় চিন্তায় রাখে এই কথাটি যে ‘আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট’।

নিজের কথা ৫০

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ‘সুজন কুজন আর আপনজন, এই নিয়ে হয় জীবন যাপন’ – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ।

এ পৃথিবীতে আগমন করার পর পরই শুরু হয় আমাদের সকলের কান্নার আওয়াজ। এ আওয়াজ জানান দেয় আমরা জীবিত। যত্মের ক্ষেত্রে যাঁর আশ্রয়ে থেকে প্রয়োজনীয় আহার নিদ্রা বিশ্রাম এসব যাবতীয় কার্যকলাপের জন্য আমাদেরকে নির্ভর করতে হয় তিনিই হলেন আমাদের পরম পূজনীয় প্রতিপালনকারী মা।

এ পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই প্রতিপালকের পরম কৃপায় আমাদের মা-কে সুরক্ষাদান করতে যিনি সর্বদাই সহযোগিতা করে থাকেন তিনি হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় বাবা। এ মা-বাবার যোগসাজশে গড়ে ওঠে আমাদের পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা। পরিবারের মাধ্যমে আমরা মাতৃগর্ভেই এ মোহনীয় দেহ ধারণ পূর্বক স্রষ্টার অতুলনীয় সুন্দর পৃথিবীতে আগমন করি। আর এ পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই মাতৃগর্ভ থেকে আমরা অনেকেই কৃপাধন্য মা বাবার প্রেমের পরশে প্রতিপালিত হতে থাকি। তাইতো জীবন চলার পথে স্রষ্টার পরম কৃপায় আমরা মা বাবার সান্নিধ্যে থেকেই শুরু করি আমাদের পৃথিবীর পথচলা।

পৃথিবীর পথচলার প্রারম্ভে আমাদের সুরক্ষাদানে দয়াল স্রষ্টার পরম কৃপায় সুজন ও আপনজন হয়ে যাঁরা সঙ্গী হিসেবে আমরা আমাদের পাশে থাকেন তাঁরাই হলেন আমাদের সকলের পূজনীয় মা বাবা।

জীবন চলার পথে আমরা যাঁদের কূজন বলে থাকি আমাদের দয়াল প্রভুর কৃপায় তাঁদের পাশবিকতা থেকেই আমরা আমাদের মহান মানবতার জীবন গড়ার শিক্ষালাভ করে থাকি। প্রশ্ন আসে কিভাবে তা সম্ভব হয়? কথায় আছে,  ‘শিখলে কোথায়? ঠেকলে যেথায়।’ আমরা বাহ্যিকভাবে দুঃখের যাতনা-বেদনা অনুভব করি। তাই দুঃখকে ভয় পাই এবং দুঃখ থেকে দূরে সরে থাকতে চাই। এ দুঃখ দানের কর্মটিকে আমরা কুকর্ম বলি। আর এ কুকর্ম  যিনি সম্পাদন করে থাকেন, তাকেই আমরা কুজন বলে থাকি। একইভাবে যে সকল কর্ম আমাদের জীবনের দুঃখ মোচন করে থাকে এসকল কর্মকে আমরা সুকর্ম বলি। আর সুকর্ম সম্পাদনকারীদের আমরা সুজন ও আপনজন হিসেবে গণ্য করে থাকি।

 বাস্তবে প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি নয় বরং ব্যক্তির সম্পাদিত কর্মের কারনেই আমরা সাধারণত বাহ্যিকভাবে ব্যক্তিকেই সুজন, কুজন ও আপনজন বলে বিবেচনা করে থাকি। আর ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে আমরা কখনো কখনো দয়া মায়া সম্মান শ্রদ্ধা প্রেম ভক্তি বিশ্বাস এসকল সুকর্ম সম্পাদন করে সুজন ও আপনজনদের আসন অলংকৃত করে নিজেরা সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকি। আবার কখনো কখনোও ক্রোধ হিংসা বিদ্বেষ ঈর্ষা ঘৃণা এসকল অপকর্ম করে মানুষে মানুষে অপ্রীতিকর অশান্তির অনল জ্বালিয়ে নিজেরাই নিজেদের দগ্ধ বিদগ্ধ করে জীবন যাপন করে থাকি। তাই সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করার জন্য গুণীজনদের গানের বাণীতে বলা হয়, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপী কে নয়। ‘গুণীজনদের এ কথারই প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয় সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর বাণীতে, ‘সুজন কুজন, আপনজন এই নিয়ে হয় জীবন যাপন।’

সুজন, কুজন ও আপনজন সকলেই বাহ্যিকভাবে দেহধারী মানুষ হলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষ দেহ নয় বরং দেহী আত্মা। সকল দেহধারী মানুষই সুখী শান্তিময় জীবন যাপন করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে সকল মানুষ অজ্ঞতা বসত সুস্থ্য ও বলবান আত্মা ধারণ ও লালন পালন করতে না পারার কারনে সুখী শান্তিময় জীবন যাপন করতে পারে না।

সুস্থ্য ও নিরোগ জীবন যাপনের জন্য দেহ ও আত্মা উভয়ের জন্যই পুষ্টিকর পরিমিত খাবার প্রয়োজন। অজ্ঞতার কারনে অশিক্ষিত মানুষ তার সুস্থ্য ও সবল দেহগঠন ও আত্মবল বৃদ্ধির জন্য পরিমিত মাত্রায় পুষ্টিকর খাবারের যোগান দিতে পারেনা। তাই অপুষ্টির কারনে অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ্যকর দুর্বল জীবন যাপন করে থাকে।মানুষ তার চোখ কান ত্বক মুখ চিন্তা এসকল ইন্দ্রিয় পথের মাধ্যমে দেহ ও আত্মার খোরাক গ্রহন করে থাকে। ইন্দ্রিয় পথে যেসব তথ্য নিজের সাথে আদান-প্রদান করে এসব তথ্যের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় ব্যক্তির চিন্তার জগৎ। এ চিন্তার জগৎ থেকেই ব্যক্তি তার পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী তার চিন্তা শক্তি ব্যবহার করে আত্মার খোরাক গ্রহন করে থাকে। আধ্যাত্মিকভাবে পর্যায়ক্রমে দুষিত চিন্তা গ্রহন করার কারনে অসচেতন অজ্ঞ ব্যক্তিদের আত্মা ও শরীর উভয়ই অসুস্থ্য ও দুর্বলতর হতে থাকে। যার পরিণতিতে ব্যক্তি অসুখী ও অশান্তির জীবন যাপন করে থাকে। অপরদিকে আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ পর্যায়ক্রমে বিশুদ্ধ চিন্তা গ্রহন করার কারনে তাঁদের আত্মা ও শরীর উভয়ই সুস্থ্য থাকে। তাই তাঁরা সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকেন। যে ব্যক্তি স্রষ্টার বিধিমালা অনুযায়ী জীবন যাপন করে থাকেন তিনিই আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন ও জ্ঞানী ব্যক্তি। আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সর্বদাই সুজন, কুজন ও আপনজনদের নিয়ে সুখী সমৃদ্ধ শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকেন। (চলবে)