ভিতরের পাতা

আমার সত্য আমাকেই আবিষ্কার করতে হবে

সংলাপ ॥ যা সত্য নয় তাই মিথ্যা। কারো কারো মতে, শুধুমাত্র জেনেশুনে মিথ্যা বললেই তা মিথ্যা বলে গণ্য হবে; ভুলবশত, কিংবা অনিচ্ছায় প্রকৃত অবস্থার বিপরীত কিছু বললে তা মিথ্যা বলে গণ্য না করে অজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করা উচিত। কথা বলার আগে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা বক্তার দায়িত্ব। যে যা বলে তার দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়, অন্যের উপর চাপানো যায় না। বক্তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অজ্ঞতা বা অন্য কোনো বিষয় এখানে ধর্তব্য নয়।

সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে, অনিচ্ছাকৃতভাবে, অজ্ঞতার কারণে বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক বাস্তবের বিপরীত কোনো কথা বলাই মিথ্যা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত যে কোন কালের কথা বাস্তবের বিপরীত হলে তা মিথ্যা বলে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যত সম্পর্কেও যদি কেউ বলে ‘আজ বৃষ্টি হবে’, বৃষ্টি না হলে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হবে। ধর্ম, জাতি ও বর্ণ নির্বিশেষে মিথ্যাকে পাপ, অন্যায় ও ঘৃণিত মনে করা হয়। কুরআনে মিথ্যাচারকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে মানুষকে সর্বাবস্থায় সত্যপরায়ণ হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে মিথ্যাকে ঘৃণিত পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তজ্জন্য ভয়াবহ শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে। সত্যই ধর্ম, সত্যই পুণ্য, সত্যই শান্তি দাতা। যিনি সত্য বলেন তিনি আল্লাহর কাছে ‘সিদ্দীক’ হিসেবে সম্মানীত হন।

কুরআন সর্বাবস্থায় ও সার্বক্ষণিক সত্যবাদিতার নির্দেশ দিয়ে বলছেন

“হে আমানুগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও।” (সুরা তওবা ঃ ১১৯)। “যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায্য বলবে স্বজনের সম্পর্কে হলেও।” (সুরা আন’আম ঃ ১৫৩)। “সত্যবাদী পুরুষ এবং নারী…এদের জন্য আল্লাহ্ ক্ষমা ও মহা প্রতিদান রেখেছেন।” (সুরা আহজাব ঃ ৩৫)। “হে আমানুগণ! আল্লাহ্কে ভয় কর এবং সত্য কথা বল, তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ত্রুটিমুক্ত করবেন ও তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন।” (সুরা আহজাব ঃ ৭০-৭১ )।

অন্যদিকে, কুরআনে মিথ্যাকে ভয়ঙ্কর পাপ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাপ মানুষকে দুঃখ ও দুর্দশার দিকে পরিচালিত করে। যে মিথ্যা বলে বা মিথ্যা বলতে সচেষ্ট থাকে সে এক পর্যায়ে মিথ্যাবাদী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মিথ্যা বলা মুনাফিকীর অন্যতম চিহ্ন। তাই কুরআনিক মুসলিম অনেক অন্যায় করতে পারে, কিন্তু কখনো মিথ্যা বলতে পারে না। কুরআন নির্দেশ দিচ্ছে

“মিথ্যা কথন থেকে দূরে থাক।” (সুরা হজ ঃ ৩০)। “হে ঈমানদার লোকেরা যা কার্যত তোমরা করছ না, তা কর বলে মুখে দাবি কর কেন? যা কর না, তা করো বলে প্রচার করা তো আল্লাহ্ নিকট খুবই জঘন্য কাজ। (সুরা সাফ ঃ ২-৩)। “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মিথ্যাবাদী ও অকৃতজ্ঞকে হেদায়েত দান করেন না।” (সুরা আজ যুমা : ৩)। “যে মিথ্যাবাদী, তার উপর আল্লাহ্ অভিশাপ বর্ষিত হোক।” (সুরা আলে ইমরান ঃ ৬১)। “আর যে ব্যক্তি নিজে কোন অন্যায় বা পাপ করে, অতঃপর কোন নির্দোষ ব্যক্তির উপর তার দোষ চাপিয়ে দেয় সে তো নিজের মাথায় বহন করে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য গোনাহ।” (সুরা নিসা ঃ ১১২)। “আল্লাহ্ লা’নত তার উপর যদি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সুরা নূর ঃ ৭)।

মিথ্যার প্রভাবে মানুষ ধর্মের নামে এমন সব কর্মে লিপ্ত হয় যা পার্থিব জীবনে হিংসা-বিদ্বেষ বৃদ্ধি করে। পূর্ববর্তী ধর্মগুলির দিকে তাকালে আমরা বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখতে পাই। যেমন,  বাইবেলের বিবরণ অনুযায়ী  হযরত ঈসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের এক আল্লাহর ইবাদত করতে, পূর্ববর্তী ধর্মের ১০ মূলনির্দেশ পালন করতে, খাতনা করতে, তাওরাতের সকল বিধান পালন করতে এবং অন্যান্য কর্মের আদেশ নিষেধ উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন চাপে বাইবেলের আদেশ উপদেশ নিষেধ চাপা পড়ে গেছে। ফলে ক্রমান্বয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানব সন্তান ত্রিতত্ববাদের ব্যাখ্যায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা অন্যদের দোষ দেখি, কিন্তু নিজেদের দোষ সচরাচর দেখি না। ইসলাম অনুসারীরাও যে এখন মিথ্যা হাদীসের চাপে পড়ে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস এবং শিরকের মধ্যে পতিত হচ্ছে তা আমাদের নজরে পড়ে না।

মিথ্যা সর্বদা ঘৃণিত। মিথ্যা যদি ওহীর নামে হয় তাহলে তা আরো বেশি ঘৃণিত ও ক্ষতিকর। সাধারণ মিথ্যা মানুষের বা মানব সমাজের জন্য জাগতিক ক্ষতি বয়ে আনে। আর ওহীর নামে মিথ্যা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ধ্বংস ও ক্ষতি করে। ওহীর নামে মিথ্যাচার সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যা হওয়ার কারণে কুরআনুল কারীমে ওহীর নামে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নামে মিথ্যা বলতে কিংবা সন্দেহ জনক কিছু বলতে কিংবা আন্দাজে কিছু বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কুরআনের নির্দেশ “যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তা অনুসরণ করো না। কান, চোখ, মন প্রত্যেকের কৈফিয়ত তলব করা হবে।” (সুরা বনি ইসরাইল ঃ ৩৬)।

“হে আমানুগণ তোমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুমান থেকে দূরে থেকো। কারণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কল্পনা বা অনুমান করা পাপ।” (সুরা হুজুরাত ঃ ১২)।

কুরআনের নির্দেশ উপেক্ষা করে ‘ওহী’র নামে মিথ্যাচার চলছে সকল প্রচার মাধ্যমে। ওহীর নামে মিথ্যা প্রচারের দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথমত, নিজে ওহীর নামে মিথ্যা বলা ও দ্বিতীয়ত, অন্যের বলা মিথ্যা গ্রহণ ও প্রচার করা। উভয় পথ রুদ্ধ করার জন্য কুরআনে আল্লাহর নামে মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। অপরদিকে কারো প্রচারিত কোনো তথ্য বিচার ও যাচাই না করে গ্রহণ করতেও নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এবং রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের বর্ষিত) এঁর নামে যে কোন কথা বলার আগে নির্ভুলতা যাচাই করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয। জাগতিক সকল বিষয়ের চেয়েও বেশি সতর্কতা ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে। কারণ জাগতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বা সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করলে মানুষের সম্পদ, সম্মান বা জীবনের ক্ষতি হতে পারে কিন্তু আল্লাহ, রাসূল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর নামে মিথ্যা বললে ইহকাল ও পরকালের অনন্ত জীবনের জন্য ধ্বংস নেমে আসবে।

ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার বিকৃতি, ভুল বা মিথ্যা থেকে ওহীকে রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলিমকে স্মরণে রাখতে হবে, “যে ব্যক্তি রাসূলের (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নামে মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল জাহান্নাম”। অথচ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর নামে মিথ্যাচার চলছে হিজরি তৃতীয় শতক থেকে। ধর্ম প্রচারের নামে জাল হাদীস প্রচারের জঘন্য মিথ্যাচার শুধু যে অব্যাহত রয়েছে তা নয়, দিন দিন তা বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাহাবীগণ হাদীস রচনা করেন নি এবং তাঁরা হাদীসের নামে সকল মিথ্যাচারকে প্রতিরোধ করতেও সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা না থাকার কারণে অনেক ধর্মভীরু মানুষ ও ধর্মবেত্তারা না জেনে হাদীস বলেন, প্রচার করেন বা লিখেন। এভাবে সমাজে কুরআনের বদলে প্রাধান্য লাভ করছে হাদীস। আর আল্লাহর হাদীস বা কুরআন ক্রমেই চাপা পড়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে অগণিত বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথা হাদীস নামে আমাদের সমাজে প্রচারিত হয়েছে ও হচ্ছে। ফলে আমরা দুইদিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। একদিকে, এ সকল বানোয়াট হাদীস আমাদেরকে কুরআনের শিক্ষা, চর্চা ও আমল থেকে বিরত রাখছে। অন্যদিকে, এগুলির উপর আমল করে আমরা আল্লাহর কাছে পুরস্কারের বদলে শাস্তি পাওনা করে নিচ্ছি। ধর্মভীরু মানুষ মিথ্যাচারে  বিশ্বাস করে কঠিন পাপের মধ্যে নিপতিত  হচ্ছে।

প্রায় সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্ আজ হাদীসের খপ্পরে পড়ে গেছে। হাদীসের প্রচারে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত  হচ্ছে ইসলাম। একদিকে আল্লাহ তায়ালা একবারও যা করতে বলেন নি তা হয়ে গেছে এখন মুসলমানের মানদ- (যেমন দাড়ি রাখা, টুপি পড়া ইত্যাদি আরো অনেক কিছু)। অন্যদিকে মানুষ মনোযোগ দিতে পারছে না কুরআনের প্রতি। ফলে কুরআনের উদার, মানবিক আহ্বানের প্রতি সাড়া দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ তৈরী হচ্ছে না। আমাদের দেশে একদিকে যয়ীফ ও বানোয়াট হাদীসের পঠন, পাঠন ও চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে কমছে কুরআন চর্চা। কুরআনের প্রতি বিশেষ অবহেলা পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র।

হাদীস সংক্রান্ত নানারকম মারাত্মক বিভ্রান্তিতে আছে মুসলিম উম্মাহ। অনেক হাদীসবেত্তারাই মনে করেন ‘হাদীস’ মানেই রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর বাণী, কাজেই কোনো হাদীসকে দুর্বল বলে মনে করার অর্থ রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা বা বাণীকে অবজ্ঞা করা। তাদের মতে যত দুর্বলই হোক, যেহেতু রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর কথা, কাজেই তাকে গ্রহণ ও পালন করতে হবে। কিন্তু কথাটি প্রকৃতই রাসূলুল্লাহ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর কি-না, কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কি-না তা তারা যাচাই করে দেখতে চান না।

মুসলিমের দায়িত্ব হলো কুরআন অধ্যায়ন, বুঝা এবং কুরআন দর্শনকে জীবন দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা, লালন করা, পালন করা। প্রত্যেক মুসলিমকে আল্লাহর দরবারে তার নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে। অন্য কারো কর্মের জন্য আমাদের দায়ী করা হবে না, হিসেবও চাওয়া হবে না। তাই কথায় কথায় হাদীসের ব্যবহার থেকে প্রত্যেক মুসলিমকে সতর্ক হতে হবে। কোন অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়া যাবে না। কারণ আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক মানুষকেই বিবেক-বুদ্ধি দিয়েছেন। প্রত্যেককেই দিয়েছেন চিন্তা করার ক্ষমতা, সত্যকে মিথ্যা থেকে পৃথক করার ক্ষমতা। পৃথিবীর অনেক মানুষ মিথ্যা বললেও মিথ্যা বলা বৈধ হয় না। জেনে বা না জেনে অধিকাংশ মানুষ মিথ্যা বলছে তাই বলে আমিও মিথ্যা বলব এটা কোন যুক্তি হতে পারে না। যে কোন বিষয়ে বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তা করে সত্যের অন্বেষণ করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব। আমার আহার যেমন অন্য কেউ গ্রহণ করতে পারে না ঠিক তেমনি আমার স্থলে কেউ সত্য অন্বেষণ করে তৈরি সত্য আমার কাছে সরবরাহ করতে পারে না। আমার সত্য আমাকেই আবিষ্কার করতে হবে। যে কোন বিষয়ে হাদীসের উদ্বৃতি দেওয়ার আগে জেনে নিতে হবে যা বলা হচ্ছে তা কি সঠিক? কারো কথায় প্রভাবিত না হয়ে প্রত্যেককে অনুসন্ধিৎসু হতে হবে এবং প্রয়োজনে গবেষণা করে সত্য আবিষ্কার করতে হবে। নতুবা হাদীস বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেউ যদি জীবনে একটি হাদীসও না বলে তাহলে তার কোন পাপ হবে না কিন্তু রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে একটি কথাও যদি মিথ্যা বলা হয় তা হলে তা হবে মহাপাপ। এমনকি ধর্ম প্রচারের জন্য কিংবা অন্য কোন সৎ উদ্দেশেও যদি কেউ রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যাচার করে তবে তা কঠিনতম পাপ। মুসলিম উম্মাহ একমত যে, রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যা বলা হারাম। যে ব্যক্তি রাসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এঁর নামে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে পারে না, তার পান ও আহারের ক্ষেত্রে হালাল-হারাম বিচার মূল্যহীন।

মহান আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের এই মহাপাপ থেকে রক্ষা  করেন। আমাদের জীবন আবর্তিত হোক কুরআনকে কেন্দ্র করে।

চেতনা হারিয়ে গেলে সব হারিয়ে যায়

সংলাপ ॥ মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় পরিণতি হচ্ছে ভাষার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া। ভাষার উপর দখলদারিত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেয়ে বড় অপরাধ নেই। আধিপত্য বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল হচ্ছে ভাষাকে হারিয়ে দেয়া কিংবা অকার্যকর করে দেয়া। আবার ভাষাকে মর্যাদা না দিয়ে ভাসা ভাসা পথ চলার চেয়ে মানহানিকর কিছু নেই। ভাব চিন্তার গভীরতা যতই হোক ভাষাবিহীন সেই সৌন্দর্য কোন কাজে লাগে না। সমাজে গোষ্ঠীতে শোষকের প্রধান কৌশল ভাষা রুদ্ধ করে দেয়া। ভাষা চেতনা হারিয়ে গেলে দেশ জাতি হারিয়ে ফেলে তার গতিপথ। সেই পথে এসে যুক্ত হয় বিপর্যয় বৈরিতা ধ্বংসের নানা উপাত্ত। গোলকধাঁধায় পড়ে বাঙালির ভাষা চেতনা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। উপেক্ষিত হচ্ছে ভাষার শক্তি। ভাষার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে না পারার কারণে ক্ষয়িঞ্চু হয়ে বেড়ে উঠছি আমরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সব ধরনের সৃষ্টিশীলতা। ভাসা ভাসা হয়ে তৈরি হচ্ছে জীবন মান। মান সম্মত হচ্ছে না কোন কিছু। ভাষার সত্য প্রকাশ হতে পারছে না ফলে ভাষা বিহীন ষড়যন্ত্র কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ফুলে ফেপে বড় হচ্ছে। অচেনা হচ্ছি আমরা, আর সেই পথে নিয়ে যাচ্ছি অন্যদেরকে। আত্মবিস্তৃত জাতি এগুতে পারে না। সামগ্রিক ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এটিই আমাদের ভাষার সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা চেতনা হচ্ছে গতিময়তা, সক্ষমতা লড়াই করার সামর্থ্য সর্বোপরি নিজেকে নিয়ে চলার পাথেয়। নিজের সাথে নিজের লড়াই, সমাজে, পরিবেশকে বাসযোগ্য করার লড়াই। পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজনের পথে চালিত করার মূলধন হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বিমুখ জাতি হারিয়ে ফেলে ঐতিহ্য, কৃষ্টি, গতিময়তা, ছন্দময়তা, নিজস্ব ভাষা ও দার্শনিকতা। ইতিহাস বিকৃতি ঘটে, মিথ্যাচার, চাটুকারিতা, বিভ্রান্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। আত্মঘাতি প্রবণতা বাড়ে। লোভ খ্যাতির মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। মারাত্মক জীবনঘাতি অসুখ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থিরতা বাড়ায়। দর্শন, উপলব্ধি, চেতনা নির্বাসিত হয়। মুক্তির আকাঙ্খা জাগে না। ছিটকে পড়ে জীবন-যাত্রা। রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না, নেতা আর নেতা থাকে না। প্রেম হয়ে যায় শুষ্ক বালুকাবেলা। ভুইফোঁড় এক মতলববাজে পরিণত হয় মানব জীবন। দারুণ অন্ধত্ব বন্ধ্যাত্ব ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে। মুখে খঁইমুড়কীর মতো ভাষা থাকে বটে তবে তা আর ভাষা হয়ে উঠে না। ভাষাপ্রেম মুখ থুবড়ে পড়ে। মা মাতৃভূমি অচেনা হয়ে পড়ে। ভাষা হচ্ছে ভাবের প্রকাশ। বোধ প্রকাশিত হয় ভাষার অলংকারে। মানুষের চিহ্ন তার মনন, প্রকৃতির উৎস, মোহনা, চলাফেরা সবই তো ভাষার ক্ষমতা। ভাষা শনাক্তের মধ্য দিয়েই আসে আত্ম-পরিচয়, সৃষ্টি হয় সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র। পুরো শরীরটাই ভাষা, ফলে তার প্রত্যেকটি প্রকাশও ভাষা। বাঙালিকে হারানোর যে সব জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে নানা প্রক্রিয়ায় তার মধ্যে ভাষার উপর আগ্রাসনই প্রথম। বহুমাত্রিক সে আক্রমণে একপ্রকার ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে আমাদের ভাষা। এখন ভাষা অনেকটা ভাসা কচুরী পানার মতো। ভাষার চেয়ে ভাতই মূখ্য হয়ে উঠেছে পেটুক স্বভাবের কাছে। আবার কারো কারো শিক্ষার নামে আধিপত্য বিস্তার, বিভেদ, বিভাজন রেখা জিইয়ে রাখার কৌশলও ভাষাকে নিয়ে। নামি-দামি শিশু শিক্ষালয়গুলোতে ভাষার উপর রীতিমতো ছুরি চালানো হয়।

আমাদের আচরণ অসহিঞ্চু কারণ আমাদের ভাষা জ্ঞান নেই। আমরা নিজেদের ভাষা জানি না। নিজের ভাষা অনুভব, উপলব্ধি করি না। আমাদের ভাষা কি, কি তার রং, রূপ, ব্যঞ্জনা, দোতনা তা দেখা যায় না, খুঁজে পায় না। পন্ডিতজন নিজেকে কঠিন কঠিন ভাষায় প্রকাশ করেন ফলে তাতে জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। ভাষা আহত হয়। কৌশল-অপকৌশলের খেলায় ভাষা অসুস্থ হয়। শিশুর ভাষা প্রাঞ্জল, মধুর। শিশুর প্রতিটি শব্দ প্রয়োগ দারুণ ঝংকার তোলে। তাই তাকে উপেক্ষা করা চলে না। কিন্তু একজন প্রতারক গোছের মানুষ যত সুললিত কন্ঠে ভাষার প্রয়োগ করুন সেখানে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। ভাষা কোন প্রতারককে ধারণ করে না। চোর, বাটপার, খুনিরা সবেচেয়ে বেশি প্রতারণা করে ভাষার সাথে। ফিসফিসিয়ে গোপনে অধরা পথে ভাষা এড়িয়ে চলে। আবার চোরের মা’র বড় গলা প্রবাদের কথা স্মরণে বলতে হয় গলা যত বড়ই হোক ভাষা তার চরিত্রের গোপন  চেহারা প্রকাশ করে দেয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে প্রতারক যতই দৃষ্টি আকৃষ্ট করুক না কেন থলের বিড়াল থেকে ভাষা সব বের করে দেয়। রুক্ষতার পথ রুদ্ধ করে দেয় ভাষা। ফলে তা বিস্তার করতে পারে না।

বহুমুখি আগ্রাসনে প্রথম আঘাত আসে ভাষার উপর। এই যে এতসব ধমআন্ধতা তাতো ভাষার দখল ছিনিয়ে নেবার জন্য। যতদিন ভাষা সক্রিয় থাকে, ভাষার মর্যাদা লোপ পায় না, ততদিন সার্বভৌমত্ব আত্ম-পরিচয় প্রবল থাকে। প্রতিরোধে দ্রোহে বিক্ষোভে বাধাপ্রাপ্ত হয় সব অপশক্তি। যতক্ষণ ছোট ছোট শিশু এক সাথে গেয়ে উঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ তখন ষড়যন্ত্রকারী মিথ্যুকের দল ভড়কে যায়, তাদের চোখ কপালে গিয়ে ঠেকে। যখন মা মা বলে ডাকতে থাকে কোন শিশু, তখন ৭১’এর ভ্রন হত্যাকারীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। যখন প্রতিবাদী শ্রমীক মজুর কৃষক সম্মিলিত কন্ঠে ধ্বনি তোলে তখন পুরো লুটেরারা ভয়ে আটসাট হয়ে মুখ লুকায়। যে কৃষক সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনিতে ফসল ফলায়, সে শ্রমিক সব বৈষম্য সহ্য করে উৎপাদন অব্যাহত রাখে তার কাছেই ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ধরা দেয়। যে শিশু তার লেখায় আঁকায়, বলায় ছড়িয়ে দেয় ভাষার শক্তি সে শিশু রীতিমতো আতঙ্কের হয়ে উঠে ভন্ড প্রতারক কৌশলবাজের কাছে। ভাষার হাত ধরেই আসে পরিবর্তন, ভেঙে চুরমার হয় নটরাজদের প্রাসাদ। প্রতারক প্রবঞ্চকের কাছে সবচেয়ে বেশি ভয়ের হচ্ছে ভাষা। ধর্মান্ধরা ভাষার প্রকাশ্য শত্রু। লুটেরারা ভাষাকে বাক্সবন্দি করতে চায়। ছলে, বলে, কৌশলে ভাষা রুদ্ধ করার প্রচেষ্টায় রত থাকে। নিজেকে আড়ালে রাখে দূর্গে, ভয় পাছে ভাষার আঘাতে খান খান হয়ে যায়। তাইতো পালিয়ে বাঁচতে চায় সে। এদের কেউ-ই ভাষার মুখোমুখি হতে চায় না। এ এক স্বেচ্ছা নির্বাসন। এ জন্যই হঠাৎই কোন কোন চেনা প্রতারক ভাষা হারিয়ে চুপসে যায়। আবার খুব বেশি ভাষা দরদী ভাড়াটে ভাষা প্রেমিক ভাষার পাল্টা হামলায় আহত হয় মাঝে মধ্যেই। ভাষার যত্রতত্র ব্যবহারকারীদেরকে ভাষা ছুড়ে ফেলে বহুদূরে। ভাষা প্রতারকরা নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়ে। ভাষা নিজেও মুখোশ খুলে দেয়। কিন্তু সহজ সরল ভাষাবন্ধুরা টিকে থাকে বছরের পর বছর। কত সুন্দর সুশ্রী স্বভাবের হয় তারা। কত প্রেম, ভাললাগা, আনন্দ জাগানিয়া হয়ে বেঁচে থাকে তারা। এ যেন ফুলের সৌরভ মাখা বিশুদ্ধ বাতাস। এই গাছ পালা পশু পাখি, কাকতাড়–য়া, বৈশাখী বর্ষবরণ সবই ভাষা। ভাষাহীন চোখে গভীর দৃষ্টিতে যে ভাষা কথা বলে উঠে সে ভাষা চরম  প্রকাশ। খুব বেশি ভালবাসলেও  বলতে হয় ভালবাসি এটাই তো ভাষার শক্তি। মাকে মা বলার অনিবার্য সত্য হচ্ছে ভাষা। নিজেকে কেবলই মাতৃভাষার কাছেই আপন করে রাখা যায়। নিজেকে কেবলই মর্যাদাবান রাখা যায় মাতৃভাষার কাছে। মাতৃভাষার প্রতি প্রেম মানে মায়ের প্রতি, দেশের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি, সর্বোপরি সৃষ্টির প্রতি দারুণ প্রেমের প্রকাশ। যোগ সংযোগ সম্পর্কের সাথে থাকা। রুচিবোধ, চিন্তা সবই প্রস্ফুটিত ফুলের সৌরভ হয়ে ঝরে পড়ে ভাষায়। স্রষ্টা ভাষাময়, উদ্ভাসিত সব সত্য তো ভাষা হয়ে ফুটে আছে। রূপ, সৌরভ, মাধুর্যতা তাও ভাষা। সৃষ্টির পরতে পরতে নির্যাসে লুকায়িত আছে ভাষা। ভাষার পুরো কাঠামোর মধ্যে গভীর আত্মপরিচয়। এখানে শব্দ হয়ে, চিহ্ন হয়ে, সুর হয়ে, ছন্দ হয়ে ভাষার নৃত্য দেখি আমরা। ভাষা সত্য, ভাষা নিত্য, ভাষা নিয়তি। ভাষার গভীরে লুকিয়ে আছে ভূবন মোহন বাঁশি। এক একটি উচ্চারণ, এক একটি মহাসাগরের পথে নিয়ে যায়। ভাষার অন্তর্নিহিত যোগসূত্রের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে পৃথিবীর তাবৎ রহস্য, সুর লহরী। সব সত্যের আধার ভাষা। আশা নয়, নয় ভালবাসা। ভালবাসা খেলা, আসুন ভাষাতে বাঁচি ভাষাতেই চষি আমাদের এ জীবন।

নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী

সংলাপ ॥ মানুষের মধ্যে পৃথক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দু’টি সৃষ্টি – নারী ও পুরুষ। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে এদের উভয়েরই স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কুরআনে নারী-পুরুষের সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে সকলেই সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াতকে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন। এ আয়াতের পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদের অন্ত নেই। আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদ হলো – ‘পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেক্কার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।’ ধর্মান্ধগোষ্ঠী নারীদের ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করতে আশ্রয় নেয় এই আয়াতটির।

সত্য হলো এই যে – উক্ত আয়াতে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কি অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিতে নারী কোন ভোগ্যবস্তু নয়, দাসীও নয়। এই আয়াতে আল্লাহ্ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। ‘কাওয়্যামুনা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, ঠেক্না, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা [আরবি-বাংলা অভিধান, ই.ফা.বা.]। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদ- এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহ্ই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য নারীর তুলনায় অধিক দান করেছেন। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ্ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়ণতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তারা সন্তান ধারণ, লালন-পালন ও গৃহকর্ম করে থাকেন।

আদম ও হাওয়া আল্লাহ্ অবাধ্য হওয়ায় আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। তওরাতের বর্ণনায় আল্লাহ্ হাওয়াকে বললেন, ‘আমি তোমার গর্ভকালীন অবস্থায় তোমার কষ্ট অনেক বাড়িয়ে দেব। তুমি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সন্তান প্রসব করবে।’ তারপর তিনি আদমকে বললেন, ‘যে গাছের ফল খেতে আমি নিষেধ করেছিলাম তুমি তোমার স্ত্রীর কথা শুনে তা খেয়েছ। তাই তোমার জন্য মাটি অভিশপ্ত হলো। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে তবে তুমি মাটিতে ফসল উৎপন্ন করবে। তোমার জন্য মাটিতে কাঁটাগাছ ও শিয়ালকাঁটা গজাবে, কিন্তু তোমার খাবার হবে ক্ষেতের ফসল। যে মাটি থেকে তোমাকে তৈরি করা হয়েছিল সে মাটিতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোমাকে খেতে হবে। তোমার এই ধূলার দেহ ধূলাতেই ফিরে যাবে।’ (তওরাত: জেনেসিস: ১৬-১৯)।

‘মনুসংহিতা’য় নারীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীলোকেরা সন্তান প্রসব ও পালন করে বলে তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী; এরা গৃহের দীপ্তিস্বরূপ হয়। এই কারণে স্ত্রীলোকদের সকল সময় সম্মান-সহকারে রাখা উচিৎ, বাড়িতে স্ত্রী এবং শ্রী-র মধ্যে কোন ভেদ নেই।’

বাংলা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেয়া হয়েছে – পতি, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। পুরুষের দায়িত্ব হলো – স্ত্রী ও পরিবারভুক্ত সকলের জাগতিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা, তাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোর যোগান দেয়া।

উল্লিখিত কাজগুলো নারী ও পুরুষের বুনিয়াদি ও নীতিগতভাবে মৌলিক কাজ হলেও অন্যান্য অঙ্গনে তাদের কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা আল্লাহ্ দিয়েছেন। কুরআন মতে যার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে। অযোগ্য পুরুষকে নারীর কর্তা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত কুরআন সমর্থন করে না। যে প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতায় নারী অন্যদের থেকে অগ্রগামী সে প্রতিষ্ঠানে নারীকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মেনে নিতে কোন বাধা নেই।

অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে জীবিকার যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলে তাতে ধর্মের কোন বাধা নেই। রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর অনেক নারী অনুসারী নিজ পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় কিংবা পুরুষ সদস্যরা ধর্মপ্রতিষ্ঠায় অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। স্বয়ং খাদিজাও ছিলেন একজন ব্যবসায়ী।

রসুলাল্লাহ্ সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। আনাস (রা:) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সেদিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা:) এবং উম্মে সুলাইমকে (রা:) দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের গোছা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন’ (বোখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৭৬৭)। মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী – রুফায়দাহ (রা:)। শুধু তাই নয়, যুদ্ধে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেও অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হবে তাহলে  তারা পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করতে পারে। তার প্রমাণ ইতিহাস। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তখন নারীরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-কে সুরক্ষা দেয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের উপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী অনুসারী উম্মে আম্মারার (রা.) ভূমিকা ছিল অবিশ্বাস্য। এ সম্পর্কে রসুলাল্লাহ্ ((যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাহকেই লড়াই করতে দেখেছি।’ তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা নজিরবিহীন – এক শত্রু সৈন্যের তরবারির কোপ পড়ল তার মাথায়, তিনি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করেই পাল্টা আঘাত করলেন ওই সৈন্যের ঘোড়ার পায়ের উপর। অশ্ব ও অশ্বারোহী দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। মহানবী এই দৃশ্য দেখে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্কে (রা.) সাহায্যের নির্দেশ দিলেন। তিনি পতিত সৈন্যকে শেষ করলেন। এলো অন্য এক শত্রু। সে আঘাত হানলো আব্দুল্লাহ্ (রা.) বাম বাহুতে। মা পুত্রের ক্ষতস্থান বেঁধে দিলেন। আর ছেলেকে আমৃত্যু লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করলেন। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বললেন, ‘হে উম্মে আম্মারাহ! তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, তা আর কার মধ্যে থাকবে?’ নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) নিজ হাতে সেদিন এই বীরাঙ্গনার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকজন বীর সৈনিকের নাম উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহ্ কসম! আজ তাদের সবার চেয়ে উম্মে আম্মারাহ বেশি বীরত্ব দেখিয়েছেন।

যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসঙ্কুল এবং সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী অনুসারীরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে তৎকালীন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য কাজে যে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা কখনই পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতেন। ঠিক একইভাবে সংসার সমরাঙ্গণেও যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেই প্রথম সারিতে অর্থাৎ উপার্জন ও পরিবার ভরণপোষণের কাজে নামতে হবে তবে ইসলাম কোন বাধা তো দেয়ই না বরং তাকে উৎসাহিত ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার নির্দেশ দেয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব নারী রসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করেছেন, তারা তাবুসদৃশ বোরখা গায়ে দিয়ে যুদ্ধ করেন নি। বোরখা পড়ে ঘোড়ায় চড়া যায় না, তলোয়ার চালানো যায় না। অথচ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এখন নারীদের গায়ে বোরকা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের গৃহবন্দি করেছে। দুঃখের বিষয় – তথাকথিত প্রগতিশীলরাও ধর্মান্ধদের মুর্খতাকে অসার প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মকেই দোষারোপ করছেন। বোরখা পরিহিতা কিম্ভুতকিমাকার নারীমূর্তি দেখেই তারা ধরে নিয়েছেন কুরআন বুঝি নারীকে অথর্ব, জড়বুদ্ধি, অচল, বিড়ম্বিত করেই রাখতে চায়। অথচ ধর্মান্ধদের ইসলামের সাথে আল্লাহ্-রসুলের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

একটি জাতির প্রায় অর্ধাংশই নারী। জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অচল করে রাখা, আর এক পায়ে হাঁটার চেষ্টা করা সমান কথা। নারী-পুরুষ একে-অন্যের শুধু পরিপূরকই নয়, উভয়ে মিলেই ভারসাম্য ও জীবসত্ত্বা রক্ষা করে চলছে সৃষ্টির প্রথমাবধি। আমরা সেই পরিপূরকের জায়গাটায় ভারসাম্য রক্ষা করছি না।  নারী-পুরুষ মিলে যে পূর্ণ আকাশ, তার অর্ধেক ঢাকা পড়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক পেশী জোরে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে নারীদের শোষণ ও বঞ্চনার যে ভয়াবহ চিত্র আমরা নিরন্তর দেখতে পাই, তা পরোক্ষভাবে পিছিয়ে দেয় পুরো সমাজকেই। আমাদের দেশে কন্যাভ্রুণ হত্যা, যৌতুক কিংবা পণজনিত কারণে গৃহবধূ হত্যার তালিকা ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। আইন থাকলেও বাল্যবিবাহ হচ্ছে হরহামেশা। নারীদের প্রতি হিংসাত্মক আক্রমণের হারও কম নয়। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, দৈহিক, মানসিক নির্যাতন, অপহরণ এখনও দৈনন্দিন ঘটনা।

বুদ্ধিমত্তার নিরীক্ষায় বহু পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে যে, যা পুরুষ পারে তা নারীও পারে। দায়িত্ব পেলে নারী যে তা পুরুষের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারে, সে উদাহরণ আজ শত-সহস্র। অর্ধেক অন্ধকার আকাশ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে দেশের     অগ্রগতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীলতা, অগ্রসরমানতা ও অসাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে নারীমুক্তি সংগ্রামের সম্পর্ক দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী।

প্রবাহ

ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ১৫ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৭৮ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৫ হাজার ১৩৮ কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। সোমবার (১ মার্চ) এ তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২০ সালে ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪৫ কোটি ডলার।

করোনা মহামারির মধ্যেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি ৭২ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা)।

রাহিঙ্গা সঙ্কটে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ওআইসি

মিয়ানমারের রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। এছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে (আইসিজে) বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মুসলিম দেশগুলোর এ জোট।

গত সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ও প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ প্রতিশ্রুতির কথা জানান সংস্থাটির রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব ইউসেফ আলডোবেয়া। এ সময় ওআইসির প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের গভীর প্রশংসা করে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ আখ্যা দেন। ভাসানচরের বিষয়ে বাংলাদেশের নেওয়া উদ্যোগেরও প্রশংসা করে তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওআইসির প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশে স্বাগত জানান এবং ভাসানচরের অবকাঠামোগত নির্মাণের বিষয়ে তাদের অবহিত করেন যা এখন প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

আবদুল মোমেন বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ওআইসির প্রতিনিধি দলকে তাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা জানিয়ে বলেন, তিনি দেশটিকে রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন এবং এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান অর্থাৎ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং তাদের স্বদেশে স্থায়ী প্রত্যাবাসনকে এ সমস্যার কার্যকর সমাধান বলে পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রতিমন্ত্রী ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ক্রমাগত চাপ বজায় রাখার আহ্বান জানান। রোহিঙ্গাদের জন্য ওআইসি মানবিক ফান্ড তৈরি করায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ওআইসির সদস্য দেশগুলোর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

ওআইসির ফান্ড থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার পাশে থাকতে সংস্থাটিকে আহ্বান জানান শাহরিয়ার আলম। এ সময় ওআইসিকে সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানান তিনি।

সফররত ওআইসির সহকারী মহাসচিব জানান, তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেছেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে একমত হয়েছেন।

এর আগে ওআইসির প্রতিনিধিদল পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তাদের সফর সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্র সচিব স্থায়ীভাবে এই মানবিক সংকট নিরসনে ওআইসিকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানান।

‘মায়ের মতো পরিণতি হতে পারত’: প্রিন্স হ্যারি!

মায়ের মতো পরিণতি হতে পারত। প্রিন্স ডায়ানার মৃত্যুর ঘটনাকে উল্লেখ করে ওপরা উইনফ্রে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের সম্পর্কে এমন আশঙ্কার কথাই বলেছিলেন প্রিন্স হ্যারি। সাক্ষাৎকারে বলা সেই আশঙ্কার কথাই সামনে আসে রবিবার। যা নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

গত বছরই রাজকীয় দায়িত্ব এবং কর্তব্যের পাট চুকিয়ে বাকিংহাম প্যালেস ছেড়ে ছিলেন হ্যারি এবং স্ত্রী মেগান। তাঁরা ক্যালিফোর্নিয়ায় গিয়ে ওঠেন। মেগানকে পাশে বসিয়ে সাক্ষাৎকারে হ্যারি বলেন, “আমি যথেষ্ট খুশি যে, মেগানকে পাশে বসিয়ে এই সাক্ষাৎকার দিতে পারছি।” তাঁর মায়ের যে পরিণতি হয়েছিল, সেই বিভীষিকাময় ঘটনাকে কল্পনা করতেও তাঁর কষ্ট হচ্ছে সেটাও জানিয়েছেন হ্যারি।

রাজপরিবার ছেড়ে বেরিয়ে আসা একটা কঠিন সিদ্ধান্ত তো বটেই। তবে তাঁরা দু’জনে যে পরস্পরের জন্য বাঁচতে পারছেন, সেটাই অনেক বলে জানান হ্যারি।

হ্যারি এবং তাঁর স্ত্রী মেগানের সঙ্গে ব্রিটেনের রাজপরিবারের ‘তিক্ত’ সম্পর্কের বিষয়টি কারও অজানা নয়। রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যে তাঁদের সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছিল, তা ক্রমশ প্রকাশ্যে এসেছিল। তার পর গত বছরই তাঁদের রাজকীয় দায়িত্ব এবং কর্তব্য থেকে সরে দাঁড়ান হ্যারি এবং মেগান। কারণ হিসেবে দাবি করেছিলেন, রাজকীয়তার বাইরে বেরিয়ে তাঁরা সাধারণ জীবন কাটাতে চান। শুধু তাই নয়, তাঁদের জীবন নিয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগও তুলেছিলেন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে।

মিয়ানমারে ফেরার নির্দেশ ১০০ কূটনীতিককে

বিদেশি মিশনে দায়িত্বরত মিয়ানমারের কমপক্ষে ১০০ কূটনীতিককে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সেনা কর্তৃপক্ষ। জাতিসংঘে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াউ মো তুনের সেনাবিরোধী বক্তব্যের পরই ১৯টি দেশে সু চি পন্থী কূটনীতিকদের এই নির্দেশ দেওয়া হলো।

এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই নির্দেশনা মিয়ানমারের জান্তা সরকার গোপন করতে চাইলেও এ সম্পর্কিত বেশ কিছু নথি ফাঁস হয়ে গেছে বলে গত সপ্তাহের সোমবার খবর প্রকাশ করে দ্য ইরাবতি।  

মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিউজ কভার করা থাইল্যান্ডের এই পত্রিকার খবরে বলা হয়, রবিবার এক নির্দেশনায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ও সচিবসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠায় জান্তা সরকার। সেইসঙ্গে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয় বিদেশি মিশনে কর্মরত প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে।

এসব কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স, নরওয়ে, বেলজিয়াম, সার্বিয়া, চীনা, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ফিলিপাইনের মতো ১৯ দেশে কর্মরত আছেন।

খবরে আরও বলা হয়, মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের শতাধিক কর্মকর্তাকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত। তিনি চলমান বিক্ষোভ-আন্দোলনে সমর্থন প্রকাশ করেন। প্রতিবাদের জনপ্রিয় প্রতীক তিন আঙুলে সালামও দেন। যে কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

চন্দ্রপৃষ্ঠে সূর্যের আলো পড়া অংশে মিলল জলের অস্তিত্ব

প্রথমবার ২০০৮ সালে ইসরো জানিয়েছিল, চাঁদের যে অংশে সূর্যালোক পড়ে, সেখানে জলের উপাদান রয়েছে। কিন্তু, সেই উপাদান কী অবস্থায় রয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি সেই সময়। পরবর্তী সময়ে নাসার শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে লাগাতার পর্যবেক্ষণ চালিয়েও (৬ পৃষ্ঠা ১ কলাম)

এবিষয়ে কোনও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। অবশেষে নাসার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চন্দ্রপৃষ্ঠের যে অংশে সূর্যালোক পড়ে, সেখানে জলের অস্তিত্ব মিলেছে। নাসার সায়েন্স মিশন ডিরেক্টরেটের অন্তর্গত অ্যাস্ট্রোফিজিক্স ডিভিশনের ডিরেক্টর পল হারৎজ বলেন, পৃথিবীতে জল যেভাবে পাওয়া যায়, সেই একই গঠনগতভাবে এবার চাঁদের মাটিতে জল পাওয়া গিয়েছে। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের নবীন গবেষক ক্যাসে হনিবল তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্রে এই বিষয় নিয়ে কাজ করছিলেন। অবশেষে তিনি সাফল্য পান। নাসার অন্তর্গত স্ট্র্যাটোস্ফেরিক অবজারভেটারি ফর ইনফ্রারেড অ্যাস্ট্রোনমির  (সোফিয়া) মাধ্যমে চন্দ্রপৃষ্ঠে সূর্যালোক পড়ে, এমন অংশে জল পাওয়া গিয়েছে। তবে কত পরিমান জল সেখানে রয়েছে এবং কীভাবেই বা সেখানে জল এল? সেবিষয়ে এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। হনিবল জানান, ১৯৬৯ সালে আমেরিকার নভোশ্চররা চাঁদ থেকে যখন ঘুরে এসেছিলেন, তখন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন চন্দ্রপৃষ্ট সম্পূর্ণ শুষ্ক। যদিও পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা যায় চাঁদের দুই মেরুতেই বরফজাতীয় উপকরণের অস্তিত্ব রয়েছে। এরপরেই ২০০৮ সালে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের কৃত্রিম উপগ্রহ নিশ্চিত তথ্য দিয়ে জানায়, চাঁদের সূর্যালোক পরে এরকম অংশে জলের উপাদান (হাইড্রোজেন বা অক্সিজেন) রয়েছে। যদিও তা জল (এইচ২ও) নাকি হাইড্রক্সিল (ওএইচ) যৌগ হিসেবে রয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি ইসরোর গবেষণা। সেই গবেষণার প্রায় ১২ বছরের মাথায় নাসার বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন চাঁদে জলের অস্তিত্ব থাকা নিয়ে। উল্লেখ্য, কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ পল হেনেও একই বিষয়ে কাজ করছিলেন। ক্যাসে হনিবল এবং পল হেনের গবেষণাপত্র একইসঙ্গে ‘নেচার  অ্যাস্ট্রোনমি’ নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে নাসাও। একইসঙ্গে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চাঁদের দক্ষিণাংশের ক্ল্যাভিয়াস নামক গর্তের কাছে এই জল পাওয়া গিয়েছে। ওই জায়গায় কীভাবে জল এল, তা আরও গবেষণাসাপেক্ষ। একইসঙ্গে এই আবিষ্কারের ফলে আগামীতে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে চাঁদ সম্পর্কিত গবেষণা এবং মহাকাশের অন্যান্য রহস্য অনুসন্ধান এক অন্য মাত্রা পাবে।

আলোচনায় বসবে না ইরান হতাশা ওয়াশিংটন   

ইরান পরমাণু সমঝোতা নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বসার ইউরোপীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় হতাশা প্রকাশ করেছে আমেরিকা। ওয়াশিংটন বলেছে, তারা বিষয়টি নিয়ে অর্থবহ কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদে ইউরোপীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরপরই মার্কিন সরকার তার এ অবস্থান ঘোষণা করল। খাতিবজাদে রোববার বলেছিলেন, পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে ইউরোপ সম্প্রতি যে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে তার জন্য বর্তমান সময়কে উপযুক্ত মনে করছে না তেহরান।  এই সমঝোতার ব্যাপারে আমেরিকা ও তিন ইউরোপীয় দেশের সর্বসাম্প্রতিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে ইরান আলোচনায় না বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

খাতিবজাদের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মাথায় হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেন সাকি বলেন, “আমরা ইরানের প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হলেও একই সময়ে দু’পক্ষের এই সমঝোতায় ফিরে আসার লক্ষ্যে অর্থবহ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে নিজেদের প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করছি।” তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন পরমাণু সমঝোতার বাকি পাঁচ দেশ চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ব্রিটেন ও জার্মানির সঙ্গে আলোচনা করবে ওয়াশিংটন।

আমেরিকা দাবি করছে, পরমাণু সমঝোতায় তার ফিরে আসার একই সময়ে ইরানকেও তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ফিরতে হবে। কিন্তু তেহরান বলছে, আমেরিকা এই সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এক বছর পর ইরান এতে দেয়া নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পরিমাণ কমাতে শুরু করেছে। কাজেই আমেরিকাকে আগে এই সমঝোতায় ফিরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সুফল বাস্তবে পাওয়ার পর ইরান এই সমঝোতায় দেয়া প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরে যাবে।

এর আগে পরমাণু সমঝোতার ইউরোপীয় সমন্বয়কারী জোসেফ বোরেল অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের যে প্রস্তাব দিয়েছেন ওই প্রস্তাবকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সময় উপযোগী বলে মনে করে না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদেহ বলেছেন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তিন ইউরোপীয় দেশের সাম্প্রতিক অবস্থান ও পদক্ষেপই এর কারণ।

ইরানের কূটনৈতিক সংস্থার এক মুখপাত্র বলেছেন: আমেরিকার অবস্থান কিংবা আচরণে এখন পর্যন্ত কোনোরকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। এই মুখপাত্র বলেন: বাইডেন সরকার এখনও সাবেক ট্রাম্প প্রশাসনের ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের ব্যর্থ নীতি পরিহার করে নি। এমনকি পরমাণু সমঝোতায় দেওয়া অঙ্গিকারগুলো কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়ন করার ঘোষণাও দেন নি। খতিবজাদেহ বলেন পরমাণু সমঝোতা নিয়ে দর কষাকষির কোনো সুযোগ নেই। পাঁচ বছর আগে সেসব হয়ে গেছে।

ইরান সম্প্রতি সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এনপিটি চুক্তির সম্পূরক প্রটোকল বাস্তবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। পরমাণু সমঝোতার ২৬ ও ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রতিপক্ষের অঙ্গিকার মেনে না চলা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করার কারণে ওই সম্পূরক প্রটোকল বাস্তবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। সুতরাং পরমাণু সমঝোতা রক্ষার জন্য নতুন কোনো চুক্তির প্রয়োজন নেই। আগের সমঝোতায় ফিরে এলেই হবে। এ জন্য পরমাণু সংস্থারও কোনো সনদ কিংবা প্রটোকলের প্রয়োজন নেই।

সম্প্রতি জাতিসংঘে ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মাজিদ তাখ্তে রাভানচি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সে কথারই অনুবৃত্তি করেছেন। তিনি বলেছেন: আমেরিকা যদি ছয় জাতিগোষ্ঠির দলে ফিরে আসতে চায় তাহলে প্রতিশ্রুতি অনুসারে কাজ করলেই হবে। সেক্ষেত্রে ইরানের ওপর থেকে বিগত পাঁচ বছরে যত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে সেসব তুলে নিতে হবে। তাহলেই ইরান পরমাণু সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে।

ইরানের পররাষ্ট্রনীতি হলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রক্ষা করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। এক্ষেত্রে খাতিবজাদেহ’র মন্তব্য পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন। পরমাণু সমঝোতা একতরফাভাবে বাস্তবায়নের কোনো অর্থ নেই।

অপরদিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেছেন, মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে তাদের চাপ ও নিষেধাজ্ঞার ব্যর্থতা স্বীকার করেছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় বিজয়। রুহানি জনগণের উদ্দেশে বলেন,‘ইরানের সব অর্জনের পেছনে রয়েছে আপনাদের ঈমানি শক্তি, প্রত্যয় ও দৃঢ়তা।’ আমেরিকাই ইরানি জাতির মোকাবেলা নতিস্বীকার করে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন,আমেরিকার নয়া সরকার এ পর্যন্ত চার বার স্বীকার করেছে যে তাদের সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। এটা ইরানি জাতির জন্য বড় বিজয়। কারণ যারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল তারাই নিজের মুখে স্বীকার করছে তাদের নিষেধাজ্ঞায় কাজ হয়নি।

ইরানের প্রেসিডেন্ট ভিডিও লিঙ্কের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণের দুটি বিশাল তেল-গ্যাস প্রকল্প উদ্বোধন করেছেন। এর একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন ৬৫ হাজার ব্যারেল খনিজ তেল উত্তোলন করা সম্ভব হবে।

রিয়াদে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইয়েমেন

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইয়েমেনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ভূপাতিত করার দাবি করেছে রিয়াদ। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি প্রদেশে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে রিয়াদ। সৌদি সরকার শনিবার দাবি করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদের আকাশে ইয়েমেনি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে গুলি করে ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। সৌদি আরবের আল-ইখবারিয়া টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে দেখা গেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে গুলি ছুড়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।

ইয়েমেনের সেনাবাহিনী সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জিযান প্রদেশে বোমা-ভর্তি ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলেও রিয়াদ জানিয়েছে। এসব ড্রোনের অন্তত তিনটি আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে এবং বাকিগুলো হামলা চালিয়ে তাদের উৎসে ফিরে গেছে।

সৌদি সরকার দাবি করেছে এসব হামলার পেছনে আনসারুল্লাহ আন্দোলন জড়িত রয়েছে। যদিও হুথি আনসারুল্লাহ আন্দোলনের পক্ষ থেকে এ সম্পর্কে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এসব হামলায় তাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

সৌদি সরকার ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিশ্চিত করার কিছুক্ষণ আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, রাজধানী রিয়াদের অধিবাসীরা তাদের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

ওমান সাগরে ইসরাইলি মালিকানাধীন একটি জাহাজে বিস্ফোরণের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার একই সময়ে সৌদি আরবে ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর এল। এখনো কেউ ওই বিস্ফোরণের দায়িত্ব স্বীকার করেনি।

ইসরাইলি হামলা ঠেকাল সিরিয়া

রাজধানী দামেস্কে ইসরাইলি হামলা আবারও ঠেকিয়ে দিয়েছে সিরিয়া সামরিক বাহিনি।

সিরিয়ার গণমাধ্যম জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এর ফলে সেগুলো আর লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারেনি।

সিরিয়ার সরকারি গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত রোববার সন্ধ্যায় গোলান মালভূমি থেকে দামেস্কের বিভিন্ন স্থান লক্ষ্য করে দখলদার ইসরাইল একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রকেই আকাশে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। মুসলমানদের অন্যতম প্রধান শত্রু ইহুদিবাদী ইসরাইল গত কয়েক বছর ধরে মাঝেমধ্যেই সিরিয়ার ওপর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে। সিরিয়া যে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে সে লড়াই বানচাল করার জন্য ইসরাইল এসব হামলা চালিয়ে আসছে। যারা উগ্র সন্ত্রাসীদেরকে অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক সহযোগিতা দিচ্ছে তার মধ্যে ইসরাইলও রয়েছে।

সাংবাদিক খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন সালমান: আমেরিকা

সৌদি আরবের ক্ষমতাধর যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে সেদেশের ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে তৈরি করা মার্কিন সরকারের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দিয়ে রাখলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তা প্রকাশ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মাদ বিন সালমান এমন একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন যাতে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীকে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, খাশোগিকে ‘ধরে আনতে অথবা হত্যা করতে’ হবে। এই প্রথম মার্কিন সরকার খাশোগিকে হত্যার জন্য সরাসরি সৌদি যুবরাজকে দায়ী করল। মোহাম্মাদ বিন সালমান শুরু থেকে এই হত্যাকান্ডের দায় অস্বীকার করে আসছিলেন।

এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, খাশোগি হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার দায়ে সৌদি আরবের ৭৬ নাগরিকের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। এসব সৌদি নাগরিক আমেরিকার ভিসা পাবেন না। তবে বাইডেন  প্রশাসন সৌদি যুবরাজের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে না বলে মার্কিন বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

মোহাম্মাদ বিন সালমান ও তার পিতা সৌদি রাজা সালমানের সমালোচক হিসেবে পরিচিত খাশোগি জীবনের নিরাপত্তার ভয়ে আমেরিকায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে গিয়েছিলেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসি’র শহরতলীতে বসবাস করতে শুরু করেন এবং সেখানে বসেই ওয়াশিংটন পোস্টে নিবন্ধ লিখে সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকেন। দেশত্যাগের আগে বহুদিন রাজ পরিবারের সঙ্গে জামাল খাশোগির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে তিনি খুনি মোহাম্মাদ বিন সালমান ও তার রাজ পরিবারের হাড়ির খবর জানতেন। সৌদি যুবরাজ ঠিক এ কারণেই জামাল খাশোগিকে ভয় পেতেন।

খাশোগিত ২০১৮ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য তুরস্কের ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আনতে গিয়ে নৃশংসভাবে নিহত হন। সৌদি আরব থেকে বিশেষ বিমানে করে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল তাকে হত্যা করার জন্য আগেই ইস্তাম্বুলে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তারাই খাশোগিকে হত্যা করে তার লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলে। এখন পর্যন্ত খাশোগির লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সৌদি ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়ার অপরাধে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মাদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।

তিনি এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজকে উদ্দেশ করে বলেছেন, বিন সালমানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। ক্যালামার্ড বলেন, যারা খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে তাদেরকে আন্তর্জাতিক সমাজ থেকে একঘরে করে রাখতে পারলে একই ধরনের অপরাধ করার কথা যারা চিন্তা করে তারা শিক্ষা পেয়ে যাবে।  খাশোগি হত্যাকান্ডের ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ গোয়েন্দা প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেয়ার জন্যও মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি।

গুরু নামের স্মরণ ০৪

শাহিনুর আক্তার ॥ ভোলা দরবার, নিঝুম দ্বীপ, দ্বীপের মাটিতে চোখ বুজে তাঁর শুয়ে থাকা। ভোলা দরবারে বড় পুকুরে একটা ‘জলযান’ প্রস্তুত ছিল। ফুলের উপাচারে সজ্জিত। মামার জন্য আসন পাতা। সকলে বারে বারে তাঁর জলযানে সঙ্গী হচ্ছিলো আর প্রার্থনা সঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে সমেবেত স্বরে। আমার ছোট ছেলেটা বিরক্ত করছিল তাই আমি দরবারে কক্ষেই ছিলাম। বের হলাম দেখলাম পুকুর থেকে বড় বড় মাছ তোলা হচ্ছে। বিভিন্ন মানুষ নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত। আমার ছেলে বললো আম্মু নানাভাই তো পুকুরে খুব মজা করছেন। সবাইকে চড়িয়েছেন, তুমিও যাও। ছোটকে নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। মামা ভীষণ খুশি ছিলেন, বেশ হাসিখুশি। আমাকে ছোট’র নাম জিজ্ঞেস করলেন, আমি বললাম ‘সালেহ আল রাজীন’। শুনে বললেন ভালো হয়েছে। জুবায়ের জী জলযানের সাথে ভাসছিলেন। দড়ি দিয়ে জলযানকে টেনে টেনে ঘুড়িয়ে আনা হচ্ছিল।  মামার দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই হাসিমুখ অদ্ভত ভালোলাগা যেন মনে রঙ্গিন প্রজাপতির মত। নিঝুম দ্বীপের নৌকায় যেতে যেতে যে নৈস্বর্গের ছোঁয়া মানুষের চোখে ধরা পড়েছে তা কল্পনাতীত। এমন কাফেলা এমন মহামানবের রহমতের ছোঁয়া পাওয়া এ জীবনে হবে না, এযে তোমার অপার রহমতের ধারা।

০১/০৪/১৯ইং পাইকপাড়া দরবার – এ সত্যব্রত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করি। আমার সাথে আমার ছোট ছেলে ছিলো। আমার পাশে বসা ছিল। কিন্তু বার বার সে মামার কাছে চলে যাচ্ছিল । স্বেচ্ছাসেবী যারা ছিল ওরা সামলাতে পারছিল না। আমিও তাকে আটকাতে পারছিলাম না। বিরতি পর্বে আমার মায়ের বাড়ি চলে আসি। ০৩/০৪/১৯ইং চলছে রজব মাসব্যাপী অনুষ্ঠান। আমি দরবারে খুব একটা উপস্থিত হতে পারি না। বৃহস্পতিবার মিলাদে আমার জন্য এতটা চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ভাবিনি। মিলাদ প্রায় শেষ তখন মাসুম এসে বললো,  আপনি শাহিনূর আপনার বাসা ফার্মগেট? বললাম হ্যা। আবার প্রশ্ন, আপনার ছোট ছেলেকে আনেননি? আমি লজ্জিত হয়ে বললাম,  না আনিনি।  মাসুম বললো, মামা বলে পাঠিয়েছেন – মিলাদ শেষে দেখা না করে যাবেন না। আমি অপেক্ষা করছিলাম যাব। অবাক করে উঠে, মহিলা কক্ষে নিজেই চলে এলেন। হাস্বোজ্জল মুখে বললেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আপনার ছেলেটিকে কেন আনেন নি? এখন সম্পর্ক আমার ওর সাথে। পাইকপাড়া দরবারে ও  আমার পায়ে চুমা খাচ্ছে। হাত দিয়ে পায়ে আদর করছে।’ কথাগুলো যখন বলছিলেন মামাকে ভীষণ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। তাঁর চোখ -মুখ দেখে আমার ভেতরে এত আনন্দ হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত খুশি, সমস্ত সম্পদের অধিকারী, শান্তি , সুখ, আনন্দ যেন আমাকে ঘিরে ধরেছে। আমার মত দীনহীন তুচ্ছ প্রাণীর জন্য এ প্রাপ্তির কোন মূল্য হয় না। জাগতিক পরিমাপক একে পরিমাপ করতে পারে না। 

পরের দিন ক্ষুদে হাক্কানীকে নিয়ে গেলাম।  মামার জন্য ছোট ফুলের তোড়া নিয়ে গেল। একজন সত্যমানুষ অন্যজন শিশু তাই দু’জনের আলাপচারিতায় শিশুসুলভ সৌন্দর্য যেন ঝরে পড়ছে।  রাজীন মামার পাশে বেশ শান্ত  ভাবে বসে আছে। নানা ভাইয়ের কাছ থেকে চকলেট উপহার পেয়ে সে বেশ খুশি। মিলাদ শেষে  মামা রাজীনের সাথে করমর্দন করতে করতে বললেন, ‘আগামীকাল রজবের শেষ, কালকে আবার আসবেন।’ মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো রাজীন।

পরের দিন দু’জনকে নিয়ে গেলাম। নানাভাইয়ের আদর পেয়ে ভীষণখুশি সে। অনুষ্ঠান শেষে ফিরে এলাম।  একরাশ ভালোলাগা নিয়ে। এত আনন্দ জীবনে হইনি। এত প্রাপ্তিও কখনো ঘটেনি। এত আর্শীবাদ পেয় আমি ধন্য।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আর্শীবাদপুষ্ট বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) বার্ষিক সাধারণ সভা ২০১৮ইং নিমন্ত্রণ পাই।  সময়টা ছিল ১৪/০৬/১৯ইং রোজ শুক্রবার। একটু আগেভাগে চলে যাই। যেয়ে দেখি মামা সামনের সারিতে বসে আছেন, নতুন কমিটি গঠন করায়ে, এগারজনের নবগঠিত কমিটিতে আমার নাম ঘোষনা করা হয়। আমি ভীষণ ভাবে চমৎকৃত হই। তাঁর সাথে ছিল শেষ সাক্ষাত। মামাকে সামনা সামনি আর দেখিনি।  বাহাকাশ  চান্দপুর শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষ বেলায়, মামার সাথে দেখা হয়নি। আর সৌভাগ্য হলো না তাঁর সেই দ্বীপ্তিময় মুখশ্রী দেখার। আর হলো না।  তাকেই তো রাগের ভাষায় কথা বলা যায়। যে আমার আপনার আপন আত্মার আত্মীয়। কেন বুঝতে পারিনি কেন তাঁর কাছে বারবার আসিনি। কেন দূরে থেকে অভিমান পুষেছি। আজ কেন আফসোস করছি কেন কাঁদছি। এখন এই ব্যাকুলতার জন্য দুঃখ হয়। তাঁর  চলে যাওয়া বড় বুকে বাজে। তাঁর দর্শনরূপের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর আচ্ছাদিত গিলাফের ফুলের ঝালর বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। আমি সেই বিশাল শুভ্র অবয়বে আপনার স্নিগ্ধ হাসিমাখামুখ দেখতে চাই। আমাদের ভুলের জন্য বজ্রকন্ঠের সেই হুংকার শুনতে চাই। আমাদের বেদনাতুর চোঁখে স্নেহের পরশ পেতে চাই। ভীষণ কষ্ট লাগে, ভীষণ কষ্ট…….

‘সাজানো ফুলের বনে ঝড় বয়ে গেল

সে ঝড় থামার পরে

পৃথিবী আধার হলো

তবু দেখি দ্বীপ গেছো জ্বেলে।

তুমি চলে গেলে…. ’

৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ২০ জুলাই ২০১৯ইং সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ লোকান্তরিত হন।

‘মৃত্যু বলে কিছু নেই আছে রূপান্তর

অনন্ত অসীম স্রষ্ঠা অ-জড় অমর।’

শ্রাবণ যেন আমাদের কাছে করুণার ধারার মতোই  বইয়ে দিলো। অনন্ত কাল ধরে। যত দিন পৃথিবীর বুকে হাক্কানীর ধারা অব্যহত থাকবে।

‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা

কে বলে তুমি নাই

তুমি আছ মন বলে তাই।’ (চলবে)

প্রবাহ

ইয়েমেন ইস্যুতে বাইডেন সরকারের ইতিবাচক অবস্থান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকার ইয়েমেন যুদ্ধ সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ব্যাপারে যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলোর মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম পদক্ষেপেই ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর ওপর থেকে অবরোধ এক মাসের জন্য তুলে নিয়েছে। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জো বাইডেন কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে, আনসারুল্লাহকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বাইডেনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর আগে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কির্বিও বলেছিলেন, ইয়ামেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

বাইডেন সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলোকে বেশিরভাগ কৌশল বলেই মনে হয়। কৌশলটা হলো আনসারুল্লাহ’র সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। কেননা এটি বর্তমানে ইয়েমেনের সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। অবশ্য এই সিদ্ধান্তগুলো কৌশলগত হলেও এর ইতিবাচকতা রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে নয়া মার্কিন প্রশাসন আনসারুল্লাহকে ইয়েমেনের প্রভাবশালী একটি দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপরদিকে বাইডেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতি আনসারুল্লাহর প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। আনসারুল্লাহ এই সিদ্ধান্তগুলিকে স্বাগত জানিয়ে এই ‘ঘোষিত’ নীতিকে ‘প্রায়োগিক’ নীতিতে রূপান্তর করার আহ্বান জানিয়েছে।

মার্কিন সরকার গত ছয় বছর ধরে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। আমেরিকাকে বিশ্বাস করা দুরূহ ব্যাপার। সুতরাং আস্থা সৃষ্টির জন্য যুদ্ধ বন্ধ করতে সৌদি আরবের উপর চাপ সৃষ্টি করার দাবি জানিয়েছে আনসারুল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে ইয়েমেনের সর্বোচ্চ বিপ্লবী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আল-হুথি বলেছেন: ‘আমরা বর্তমানে বাইডেনের অবস্থানকে একটি মৌখিক বিষয় হিসেবে নিয়েছি। আমরা যুদ্ধের অবসান এবং অবরোধ তুলে নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। ওয়াশিংটনের মদদপ্রাপ্ত সৌদি ও আরব-আমিরাত আগ্রাসন বন্ধ করবে বলে আশা করছি।”

ইয়েমেনে সৌদি হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং সৌদি নৃশংসতার ধারাবাহিকতার কারণেই আমেরিকার ব্যাপারে এ ধরনের আস্থাহীনতার মতো প্রতিক্রিয়া আনসারুল্লাহর।

সৌদি আরব অবশ্য বাইডেন সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নীরব রয়েছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তারা গত দেড় বছর ধরে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িত ছিল না। তারা ২০২০ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইয়েমেনে সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে।

যাই ইয়েমেন যুদ্ধে বর্তমানে আনসারুল্লাহ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমনকি কৌশলগত প্রদেশ মার্বেও তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে রয়েছে। সুতরাং বাইডেন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বরং সৌদি জোটকে ইয়েমেন যুদ্ধের চোরাবালি থেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

মার্কিন সরকার ও মিডিয়ার প্রতি জনগণের ব্যাপক অবিশ্বাস : হোয়াইট হাউজ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস ও অনাস্থা দিনকে দিন বাড়ছে। এমনকি হোয়াইট হাউজও এ বিষয়টি স্বীকার করেছে।

মার্কিন সরকার, সার্বভৌমত্ব ও মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতি এই অবিশ্বাসের কারণ হল সেখানকার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট-নির্বাচন-পরবর্তী নজিরবিহীন সহিংসতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও  করোনা ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেনিফার সাকি  বলেছেন,  সরকার, সংবাদ মাধ্যম ও তথ্য-উপাত্ত এবং পরিসংখ্যানের প্রতি মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস বিরাজ করছে। তিনি বলেন, কোন্টি সঠিক ও কোন্টি সঠিক নয় এবং বাস্তবতা ও বাস্তবতা নয় তা বোঝা যাচ্ছে না!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আমেরিকার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বলে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র দাবি করেন।

হোয়াইট হাউজের স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট মার্কিন সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি মার্কিন জনগণের  অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। এর অর্থ মার্কিন জনগণের মনে দেশটির  সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে।

এই সংকটের এক বড় কারণই হল সাম্প্রতিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পক্ষে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে বলে পরাজিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ। কেবল তাই নয় ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন। ট্রাম্পের মতে এবারের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল এবং তার পরোক্ষ আহ্বান ও উসকানিতে একদল উগ্র সমর্থক গত ছয় জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবনে অভ্যুত্থানের স্টাইলে ভয়াবহ হামলা চালায়।

আর এ বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বৈধতাকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট দলের সমর্থক ও দেশটির রক্ষণশীলদের মধ্যে এখন দিনকে দিন দূরত্ব বাড়ছে এবং উভয় পক্ষের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মেরুকরণ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। ফলে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাড়ছে দেশটির জনগণের অনাস্থা।

মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনা দেশটির ঘরোয়া সন্ত্রাস ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা জোরদারের ইঙ্গিতও তুলে ধরেছে। এ ছাড়াও ট্রাম্প সরকারের উদাসীনতার কারণে দেশটিতে করোনা ভাইরাসে মারা গেছে প্রায় ৫ লাখ নাগরিক ও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে দুই কোটি আশি লাখ মানুষ। ট্রাম্প সরকারের সময় বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটিতে দারিদ্র ও ক্ষুধা ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। আর এই অবস্থামোকাবেলা করা এখন বাইডেন সরকারের কর্মসূচির প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হল মার্কিন ডেমোক্রেট দলের সমর্থক ও রিপাবলিকানদের মধ্যে বিতর্ক এখনও চলছে। বাইডেন সরকার এক দশমিক নয় ট্রিলিয়ন ডলারের যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েছে তার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে সব রিপাবলিকান সিনেটর!

মার্কিন রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে এই কাদা- ছোঁড়াছুঁড়িতে দু পক্ষের সমর্থক মিডিয়াগুলোও অংশ নিচ্ছে! ফলে দেশটি সংবাদের জগতের প্রতিও আস্থা হারাচ্ছেন মার্কিন জনগণ!

৩৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মিলনমেলায় মিরপুর আস্তানা শরীফ

সত্যের দুর্নিবার ঝাণ্ডা নিয়ে বাংলার এই অঞ্চলে শান্তি (ইসলাম) প্রতিষ্ঠায় পূর্ব দিগন্তে এক মাহেন্দ্রক্ষণে যে জ্যোতির্ময়ের আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁরই জ্যোতি আজ দিক হতে দিগন্তে প্রসারিত। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক সেই জ্যোতি, সত্যের কাণ্ডারী। হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রী ও সত্যানুসন্ধানীদের জীবনে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর হুকুমে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত মিরপুর আস্তানা শরীফ হাক্কানী চিন্তনপীঠের প্রাণকেন্দ্র্র। নিজের সত্যকে উপলব্ধি করার নতুন প্রেরণাশক্তি নিয়ে আমাদের জীবনে প্রতিবছর ফিরে আসে মিরপুর আস্তানা শরীফ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, আসে অনাবিল আনন্দ উদ্যাপনের শুভ লগ্ন। ১৯৮৮ সন থেকেই তা হয়ে আসছে। বাংলা ১৩৯৪ সনের ১৩ মাঘ, ইংরেজি ১৯৮৮ সনের ২৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ’ প্রতিষ্ঠিত হয় রাজধানী ঢাকার মিরপুরে।

হাক্কানী দর্শনের সত্যমানুষের মহামিলনের পূণ্য তীর্থকেন্দ্র মিরপুর আস্তানা শরীফ দীর্ঘ ৩২ বৎসরকাল অতিক্রম করে এবছর ৩৩-এর প্রোজ্জলন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উে ঠছে। ৩৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনে মিরপুর আস্তানা শরীফ ১২ ও ১৩ মাঘ ১৪২৭, (২৬-২৭ জানুয়ারি ২০২১) মঙ্গলবার ও বুধবার পর্যন্ত সত্যানুসন্ধানীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

৩৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রারম্ভে কিশোরগঞ্জ জেলার চান্দপুরে অবস্থিত সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর মাজার চাঁন্দপুর শরীফে যথাযথ ভক্তি ও আদবের সাথে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

দু’দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ১২ মাঘ ১৪২৭, (২৬ জানুয়ারি ২০২১) মঙ্গলবার দেশের বিভিন্ন

জেলায় অবস্থিত হাক্কানী খানকা, দরবার ও আস্তানা শরীফ থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ ও দরবারি ভাই বোনদের নাম নিবন্ধন, বরণ, স্বত:স্ফূর্ত শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ দিন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট ও সুফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ  (হামিবা)-এর ৩১ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদাযাপিত হয়।

বিকেল ০৪.০১ মিনিটে আস্তানা শরীফ প্রাঙ্গনে পতাকা উত্তোলন করেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের আজমত খান (যুগ্ম-সচিব, মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা ব্যবস্থাপনা সংসদ), মহিউদ্দিন সরকার (যুগ্ম-সচিব, মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা ব্যবস্থাপনা সংসদ), আবদুল কাদের টিটু (যুগ্ম-সচিব, মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা

 ব্যবস্থাপনা সংসদ)। এরপর হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদ-এর নেতেৃত্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ও মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দ, বাহাখাশ কেন্দ্রিয় ব্যবস্থাপনা সংসদের সদস্যবৃন্দসহ বাহাখাশের অন্যান্য সদস্যবৃন্দ ও বিভিন্ন প্রকল্পের সদস্যবৃন্দ এবং উপস্থিত দরবারি ভাই-বোন দরবারে পদক্ষীণ করে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর রওজায় গিলাফ ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। এদিন দিবা-রাত্রি সন্ধিক্ষণে দরবারের পশ্চিম পাশের মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন ও ফল শোধনসেবার মোড়ক উন্মোচন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা সভাপতি শাহ্ সূফী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ উল ইসলাম এবং দরবারের পূর্ব পাশের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হামিবা নির্বাহী সভাপতি শাহ ড. আলাউদ্দিন আলন, শাহ্  ড. মো. আলাউদ্দিন আলন (নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ), শাহ্ শেখ মজলিস ফুয়াদ (সদস্য, কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আলোচনা কেন্দ্র), শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ টিটু (সভাপতি, হাক্কানী যুব উন্নয়ন বিভাগ), শাহ্ এন.সি.রুদ্র (সভাপতি, স্বাস্থ্য ও সেবা প্রকল্প, হামিবা),

মনোয়ারা সুলতানা (মহাসচিব, মহিলা উন্নয়ন বিভাগ, হামিবা), হারুন-উর-রশিদ (সভাপতি, হামিবা সদস্য উন্নয়ন তহবিল ও সূফী আনোয়ারুল হক স্মারক কল্যাণ তহবিল), সালেহ আল দ্বীন (সভাপতি, হামিবা তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ), ব্যারিষ্টার তানভীর সারোয়ার (সভাপতি, আইন সহায়তা কেন্দ্র হামিবা), দেলোয়ার হোসেন পিন্টু (সদস্য সচিব, হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী), আমিরুল ইসলাম (সিনিয়র কাউন্সিলর, হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়), মোল্লা হাছানুজ্জামান টিপু (হাক্কানী বিশেষ দূত)। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলনের পরবর্তী পর্ব ছিল ‘হাক্কানী প্রচার-প্রসারে হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ’ বিষয়ক মুক্ত আলোচনা। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন-অধ্যাপক ড. আহসান আলী (উপদেষ্টা, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ), (মামুন আল হাসান নাজু)

 (উপদেষ্টা, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ), অধ্যাপক ফরিদা হোসেন (উপদেষ্টা, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ), এ্যাডভোকেট এ.কে.এম. সোহেল আহমেদ, (প্রধান উপদেষ্টা, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ), আমিরুল ইসলাম (সিনিয়র কাউন্সিলর, হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়), দেলোয়ার হোসেন পিন্টু (সদস্য সচিব, হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমী), ব্যারিষ্টার তানভির সারোয়ার (সভাপতি, আইন সহায়তা কেন্দ্র হামিবা), সালেহ আল দ্বীন (সভাপতি, হামিবা তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ), হারুন-উর-রশিদ (সভাপতি, হামিবা সদস্য উন্নয়ন তহবিল ও সূফী আনোয়ারুল হক স্মারক কল্যাণ তহবিল), শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা (মহাসচিব, মহিলা উন্নয়ন বিভাগ, হামিবা), শাহ্ এন.সি.রুদ্র (সভাপতি, স্বাস্থ্য ও সেবা প্রকল্প, হামিবা), শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ টিটু (সভাপতি, হাক্কানী যুব উন্নয়ন বিভাগ), শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ (সদস্য, কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আলোচনা কেন্দ্র), মোল্লা হাছানুজ্জামান টিপু (হাক্কানী  বিশেষ দূত), শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন (সদস্য, সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ)। মুক্ত আলোচনা পর্বের সঞ্চালনায় ছিলেন হামিবা নির্বাহী সভাপতি শাহ্ ড. আলাউদ্দিন আলন। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তনা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের যুগ্ম সচিব আবদুল কাদের টিটু।

সন্ধ্যা ৫.৫১ মিনিটে হামিবা ব্যবস্থাপনা সংসদের নেতৃত্বে কেক কেটে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন উপস্থিত সকল ভক্ত ও আশেকানবৃন্দ। সন্ধ্যা ৮.১৫ ‘ফিরে দেখা’ শিরোনামে ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়। রাত ৯.৪৫ মিনিটে শোধনসেবা বিতরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের মূলতবী করা হয়।

দ্বিতীয় দিন ১৩ মাঘ, ২৭ জানুয়ারি, বুধবার সকাল ১০.০১ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হয়। মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম’ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন ক্ষুদে হাক্কানী – পার্থ, সাজনা শেখ, সেজুতি, ফারিহা, মীম, নোরা, আহনাফ, তাসমিন, তানজিম, তাজি, নাফিসা ইসলাম ফাইসা, রাজলক্ষ্মী, তাহিরা ইসলাম সামন্তা, উপমনি, তুষার, ঈশরাত, আরোতি, আভা, আলভী, রাইসা, প্রিয়াংকা, পিউলি, ঈশামা, জুবায়ের, ফয়সাল, নিখিল, শরিকা ইসলাম, আনাফী ইসলাম, রাফিজা ইসলাম, সিয়াম, আনজিস। উন্মুক্ত অনুভূতি প্রকাশ  পর্বে : ‘বারে বারে দেখি আপনারে’ অনুভূতি প্রকাশ করেন শাহ্ সূফী শেখ হায়দার আলী (সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী বন্ধু), শাহ্ ইমতিয়াজ আহমেদ, শাহ্ খায়রুল মোস্তাফা, শাহ্ শেখ মজলিস ফুয়াদ।

মধ্যাহ্ন ভোজনের পর ভাবসঙ্গীত পর্ব শুরু হয়। বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্বে বিকাল ৪:০১ মিনিটে অংশগ্রহণ করেন-প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ও উপস্থিত ভক্ত আশেকানবৃন্দ এবং অন্যান্য। গিলাপ, ফুল ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের অন্যান্য উপাদান নিয়ে দরবার প্রদক্ষীণ করে মিরপুর আস্তানা শরীফ এর নেতৃত্বে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর রওজায় এবং শাহ্ আনোয়ারা বেগম এঁর রওজায় শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়।

বিকাল ৫:০১ মি মুক্ত আলোচনা পর্ব – ‘আপন উপলব্ধিতে আমরা সবাই জানি’তে অংশগ্রহণ করেন- শাহ আলম খান (উপদেষ্টা, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা শরীফ উন্নয়ন পর্ষদ), আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া (চারাবাগ, আশুলিয়া দরবার শরীফ), শাহ্ ইফতেখাইরুল আলম রাসেল (তত্ত্বাবধায়ক, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ, নবাবগঞ্জ), শাহ্  ফরহাদ হোসেন (তত্ত্বাবধায়ক, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ, খুলনা), শাহ্ দিলারা নাজমা (তত্ত্বাবধায়ক, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ, কুষ্টিয়া), শাহ্  শাহাবউদ্দিন খান (তত্ত্বাবধায়ক, বাংলাদেশ               হাক্কানী খানকা শরীফ, ধীতপুর), শাহ্  শাহনাজ সুলতানা (সভাপতি, বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা সংসদ), শাহ্  ফাতেমা আফরোজ নাসরিন (উপদেষ্টা, মিরপুর আস্তানা শরীফ ও রওজা ব্যবস্থাপনা সংসদ)।

দিবা-রাত্রির সন্ধিক্ষণে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও  স্ব স্ব অবস্থান থেকে নীরব স্মরনে অংশগ্রহণ করেন- দরবারের পশ্চিম পার্শ্বে : সফিউল আলম খোকন (আহবায়ক, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ১৪২৭), দরবারের পূর্ব পার্শ্বে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদ ১৪২৭ এর সদস্য সচিব আবদুল কাদের টিটু, সদস্য শাহ্  খায়রুল মোস্তফা, শাহ্  আবেদা বানু, শাহ্  তৌহিদা জেসমিন, আজমত খান, মহিউদ্দিন সরকার,  শহীদুল ইসলাম খান,  মো. মাহবুব আলম, মো. আব্দুল ওয়াহিদ, নাসরিন সুলতানা জুলি, কাজী সবুর। কেক কেটে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন ক্ষুদ্রে হাক্কানী বন্ধুরা ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন পর্ষদের সদস্যবৃন্দ। এরপর বিশেষ পর্ব প্রদর্শিত হয় ‘চিন্ময় চেনা’ শিরোনামে। ভিডিও প্রদর্শনের পর শুরু হয় সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর পরিচালনায় ভাবসঙ্গীত পর্ব। ভাবসঙ্গীত পর্বে অংশগ্রহণ করেন হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমীর শিক্ষার্থীবৃন্দ ও অতিথি শিল্পীবৃন্দ। রাত ১১:১৫ মিনিটে হাক্কানী স্মরণ ও নৈবেদ্যের মধ্য দিয়ে ১৪২৮ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পর্যন্ত অনুষ্ঠান মূলতবী হয়।

২ দিনব্যাপী আয়োজিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তনা শরীফ ব্যবস্থাপনা সংসদের যুগ্ম সচিব ও হাক্কানী আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব আবদুল কাদের টিটু ও শাহ্ সূফী ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মি।

প্রবাহ

সাইবেরিয়ায় মিলল তুষার যুগের 
গন্ডারের অক্ষত দেহাবশেষ

তুষার যুগের গন্ডারের দেহাবশেষ মিলল সাইবেরিয়ায়। প্রায় ৫০ হাজার বছর কেটে গেলেও এখনও সতেজ প্রাণীটির বেশকিছু অঙ্গ। যা দেখে রীতিমতো অবাক বিজ্ঞানীরা। এতো পুরনো দেহও যে এমন ভালোভাবে পাওয়া যাবে তা কল্পনা করতে পারেননি তাঁরা। বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে সাইবেরিয়ায় বরফ গলতে শুরু করায় গত কয়েকমাসে ওই অঞ্চল থেকে ম্যামথ, শরীরে বড় বড় পশম থাকা গন্ডার, সিংহশাবক সহ বেশকিছু প্রাণীর দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে গন্ডারের দেহাবশেষটিরই সবচেয়ে ভালো অবস্থা। তার শরীরের অন্ত্র, চর্বি এমনকী কোষ এখনও পর্যন্ত অক্ষত। বরফের পুরু চাদরে ঢাকা থাকায় সেগুলি নষ্ট হয়নি বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের ধারণা, উদ্ধার হওয়া গন্ডারের দেহাবশেষটি প্রায় ৫০ হাজার বছরের পুরনো। তবে সেটির সঠিক বয়স জানতে রেডিওকার্বন পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যেই পরীক্ষার ফল জানা যাবে।

দুই থেকে তিন বছর বয়সে জলে ডুবে গন্ডারটির মৃত্যু হয় বলে বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণা। রাশিয়ার উত্তরে অ্যাবিক্স জেলায় তিরেখতাখ নদীর ধারে প্রাণীটির দেহাবশেষ পাওয়া যায়। এর আগে ২০১৪ সালে ওই এলাকা থেকেই একটি  গন্ডারের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়। তার শরীরেও বড় বড় লোম ছিল। বিস্তর পরীক্ষানিরীক্ষার পর ‘সাশা’ প্রজাতির ওই গন্ডারটি ৩৪ হাজার বছর আগে মারা গিয়েছিল বলে জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা। এবার যে গন্ডারের দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে, তার বয়স আরও অনেক বেশি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে ৪ চরিত্রের করোনাভাইরাস

২০১৯ সালে চিনের উহান প্রদেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে সারা পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত চারবার চরিত্র পাল্টেছে এই মারণ ভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র পক্ষ থেকে এই নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। হু জানিয়েছে, করোনা সংক্রমণের পর থেকে একাধিক খবর তারা পেয়েছেন, যেখানে করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন উপসর্গের রোগ দেখা দিয়েছে। আসলে সেগুলি ভাইরাসের নতুন চরিত্রের লক্ষণ, জানিয়েছে হু।

২০২০ সালের জানুয়ারির শেষ ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে সার্স কোভ-২-এর একটি ভিন্ন চরিত্রের ভাইরাস, যার নাম ডি৬১৪জি পাওয়া যায়। তারপর বেশ কয়েক মাস ধরে এই চরিত্রের ভাইরাসটি বারবার চরিত্র পাল্টেছে বলে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ভাইরাসের যে স্ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল, সেটির আমূল পরিবর্তন এর মধ্যে হয়ে গিয়েছে বলে জানায় চিন। ২০২০ সালের জুন মাসে হু-এর পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনা সংক্রমণ যত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে, ততই চরিত্র পাল্টাচ্ছে এই ভাইরাস।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় যে স্ট্রেন পাওয়া গিয়েছিল, সেটি আগের তুলনায় অনেক দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। কিন্তু সেটির মারণ ক্ষমতা আগের থেকে কম। চিকিৎসকরা জানান, এই নতুন স্ট্রেন মানুষের শরীরে আগের থেকে কম ক্ষতি করছে। এরপর তৃতীয় চরিত্রের স্ট্রেন যুক্ত ভাইরাস খুঁজে পাওয়া যায় ২০২০ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ। ডেনমার্কে এই নতুন প্রকারের ভাইরাস খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে পশুর শরীরেও এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে।

২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রিটেনে পাওয়া যায় করোনার নতুন এক চারিত্রিক বৈশিষ্টযুক্ত ভাইরাস। সেটির নাম দেওয়া হয় সার্স কোভ ২ ভিওসি ২০২০১২/০১। আগের করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার পর থেকেই এই নতুন চরিত্রের ভাইরাসটি ব্রিটেনে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তবে কোথা থেকে এই নতুন চরিত্রের ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে বলা যায়নি।

এ ছাড়াও, ডিসেম্বর মাসের ১৮ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকায় সার্স কোভ ২-এর নতুন এক চরিত্রের ভাইরাসের সন্ধান মেলে। সে দেশের তিনটি প্রদেশে এই নতুন চরিত্রের ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে জানায় প্রশাসন। দক্ষিণ আফ্রিকা নতুন চরিত্রের ভাইরাসের নাম দেয় ৫০১ওয়াই.ভি২। দক্ষিণ আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া নতুন চরিত্রের ভাইরাসটি এখনও পৃথিবীর আরও চার দেশে পাওয়া গিয়েছে।

আমেরিকার মিত্র দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে পাকিস্তান

আমেরিকায় বিলটি পাশ হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে পারে পাকিস্তান। অর্থনৈতিক অনুদান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আগেই। এ বার ন্যাটো-বহির্ভূত মিত্রদেশের তালিকা থেকেও পাকিস্তানের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উঠল আমেরিকায়। সোমবার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এই মর্মে বিল পেশ হল। এই বিল অনুমোদিত হলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গবেষণা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত হবে পাকিস্তান । অর্থাৎ, আমেরিকার থেকে কোনও বাড়তি সুবিধা পাবে না তারা। কংগ্রেসম্যান তথা রিপাবলিকান নেতা অ্যান্ডি বিগস এই প্রস্তাব আনেন। তাতে বলা হয়, ন্যাটো বহির্ভূত মিত্র দেশের তালিকা থেকে একবার বাদ পড়লে, পাকিস্তানকে অন্য কোনও তালিকার অন্তর্ভুক্ত করাও যাবে না। তবে হক্কানি নেটওয়ার্কের মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনকে যদি তারা দেশের মাটি থেকে উচ্ছেদ করতে পারে এবং খোদ প্রেসিডেন্ট যদি দায়িত্ব নিয়ে তা নিশ্চিত করতে পারেন এবং সেই শংসাপত্র দাখিল করতে পারেন, সে ক্ষেত্রে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা যেতে পারে।

শুধু তাই নয়, পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে আফগানিস্তানে নাশকতামূলক কাজকর্ম চালানোর অভিযোগ হক্কানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে। পাকিস্তান সরকার তাদের পূর্ণ মদত দেয় বলেও দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছে। তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান আদৌ কোনও পদক্ষেপ করেছে কি না, হক্কানি নেটওয়ার্কের কতজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রেসিডেন্টকে লিখিত শংসাপত্র দিতে হবে। এ সব হলেই পাকিস্তানকে মিত্র দেশ হিসেবে অন্য তালিকায় জায়গা দেওয়া হতে পারে বলেও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ওই বিলে।

২০০৪ সালে জর্জ বুশের আমলে ন্যাটো বহির্ভূত মিত্র দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে নথিভুক্ত করে তৎকালীন আমেরিকার সরকার। অস্ট্রেলিয়া, মিশর, ইজরায়েল, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জর্ডন, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, বাহরাইন, ফিলিপিন্স, তাইওয়ান, তাইল্যান্ড, কুয়েত, মরক্কো, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, টিউনিশিয়া এবং ব্রাজিল, ১৯৮৭ সাল থেকে মোট ১৭টি দেশ ওই তালিকায় জায়গা পেয়েছে। ২০১৯ সালে জায়গা পাওয়া ব্রাজিলই ওই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন। বারাক ওবামার আমলে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগী হয়ে ওঠে ভারত।

এর আগে, ২০১৮ সালে পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ আর্থিক অনুদানে নিষেধাজ্ঞা বসান ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সময়ই পাকিস্তানকে ন্যাটো বহির্ভূত মিত্র দেশের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিল ট্রাম্প সরকার।

রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নে কোনো সীমারেখা থাকবে না:চীন   

চলতি ২০২১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয় দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে চীন। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, এ বছর দু পক্ষ সহযোগিতার কোন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে সে ব্যাপারে কোনো সীমারেখা থাকবে না।

তিনি বলেন, ২০২১ সাল হচ্ছে দুই দেশের সম্পর্ক ও সহেযাগিতার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং দুই দেশই সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা শিনহুয়াকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি এসব কথা বলেছেন ওয়াং ই। তিনি সরাসরি বলেন, “চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কোন সীমারেখা দেখি না, আমাদের সামনে কোনো নিষিদ্ধ এলাকা নেই এবং এমন কোনো উচ্চতা নেই যেখানে আমরা পৌঁছাতে পারি না।”

চীন এবং রাশিয়ার মধ্যকার সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের প্রশংসা করে শীর্ষ এ কূটনীতিক বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দু দেশের নেতারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, দুই দেশ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বিশ্ব অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সম্পর্ক গভীরতর করবে। ওয়াং ই আরো বলেন, রাশিয়া এবং চীন গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে বন্ধুত্ব ওপ্রতিবেশী সৎ প্রতিবেশীসুলভ দেশের উদাহরণ অব্যাহত রাখবে এবং বিশ্বের কৌশলগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।

পারস্য উপসাগরে কোরীয় তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে ইরান

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি পারস্য উপসাগর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে। সমুদ্র পরিবেশ বিষয়ক আইন ভঙ্গ করার কারণে জাহাজটি আটক করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

আইআরজিসি’র নৌ শাখা সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার হানকুক কেমি নামের একটি জাহাজ সৌদি আরবের জুবাইল বন্দর থেকে ছেড়ে আসে কিন্তু জাহাজ থেকে রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে

পারস্য উপসাগরের পানি দূষিত করছিল। জাহাজটিতে সাত হাজার ২০০ টন ইথানল বহন করা হচ্ছিল এবং বর্তমানে সেটি ইরানের বন্দর আব্বাসে আটক রয়েছে।

আইআরজিসি’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাহাজে দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের ক্রু ছিলেন এবং তাদের সবাইকে আটক করা হয়েছে। বিষয়টি আরো তদন্তের জন্য ইরানের বিচার বিভাগের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, হরমুজগান প্রদেশের বন্দর ও সমুদ্র বিভাগের অনুরোধে এবং প্রাদেশিক প্রসিকিউটরের নির্দেশে জাহাজটি আটক করা হয়।

টিকা নেয়ার সাতদিনের মধ্যে করোনা আক্রান্ত  মার্কিন নার্স

ভারতের পর এবার আমেরিকা। টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত হলেন এক নার্স। ঘটনাটি ক্যালিফোর্নিয়ার। সংক্রামিত হওয়ার পর নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি জানিয়েছেন ম্যাথু ডাবলু নামে ওই ব্যক্তি। শহরের দু’টি হাসপাতালে কাজ করেন তিনি। ম্যাথু বলেন, ১৮ ডিসেম্বর তিনি ফাইজারের টিকা নিয়েছিলেন। এরপর ক্রিসমাসের দিন কোভিড ওয়ার্ডে তাঁর ডিউটি পড়েছিল। কাজ সেরে ফেরার পর জ্বর আসে। সেইসঙ্গে পেশিতে ব্যথা ও ক্লান্তিভাবও দেখা দেয়। হাসপাতালে গিয়ে করোনা পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ম্যাথু ওই পোস্ট করার পরই বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন সান দিয়াগোর ফ্যামিলি হেল্থ সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান রামারস। তিনি বলেন, ভ্যাকসিন শরীরে প্রবেশ করার পর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ১০ থেকে ১৪ দিন লেগে যায়। টিকার প্রথম ডোজের পর করোনার বিরুদ্ধে ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের পর ৯৫ শতাংশ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। তাই  ম্যাথুর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারেই অপ্রত্যাশিত নয়। প্রসঙ্গত, এর আগে টিকা নেওয়ার পর করোনা আক্রান্ত হন হরিয়ানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনিল ভিজ।

এদিকে, বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণ এখনও সামলে ওঠা যায়নি। এরই মধ্যে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন বিশেষজ্ঞদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন মুলুকে এক ব্যক্তির শরীরেও করোনার নয়া স্ট্রেইন মিলেছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হল, কলোরাডোর বাসিন্দা ওই আক্রান্তের কোনও ট্রাভেল হিস্ট্রি নেই। তা সত্ত্বেও ব্রিটেন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনার নতুন স্ট্রেইনে তিনি কীভাবে আক্রান্ত হলেন, তা হন্যে হয়ে খুঁজছেন স্বাস্থ্যকর্তারা।

বর্ষবরণের প্রথা চালুর ইতিহাস

নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার ব্যাপারে পথিকৃৎ বলা যায় ব্যাবিলনীয় সভ্যতাকে। সে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগের কথা। তবে সেটা এখনকার মতো ১ জানুয়ারি নয়। নতুন বছর শুরু হতো বসন্তের প্রথম দিনে। ব্যাবিলনীয়দের পর বর্ষবরণের জাঁকজমক সূচনা হয় রোমানদের হাত ধরে। তাদের নতুন বছর আবার ১ মার্চ থেকে। তবে রোমান সরকারের নতুন অধিবেশন শুরু হতো জানুয়ারি মাস থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭ সালে সম্রাট  জুলিয়াস সিজার তা বদলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি করেন। সেই ক্যালেন্ডারেও দু’দফায় বদল আনা হয়। এসবের শেষ হয় ১৫৮২ সালে পোপ ১৩তম গ্রেগরির হাত ধরে। তিনিই অতীতের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বদলে বর্তমান কাঠামোয় নিয়ে আসেন। সেই থেকে নতুন বছরের শুরুর দিনটি ১ জানুয়ারি। এই ক্যালেন্ডার ভারতে নিয়ে আসে ব্রিটিশরাই। তারপর যত দিন গিয়েছে, বেড়েছে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের বহর।

নতুন বছরে আর আসে না হাজারো রঙের খামে ভরা শুভেচ্ছা। শেষ হয়ে গিয়েছে বাঙালির আরও এক হুজুগ—গ্রিটিংস কার্ড। কত বন্ধু, কত চেনামুখ এখনও স্মৃতিতে ভিড় করে আসে দু’টি শব্দ শুনলেই। একটা কার্ড ঘিরে হিংসে-অভিমান সব ঝরে গিয়েছে কালের নিয়মে।

বছর কয়েক আগেও এমন ছিল না। ডিসেম্বরের গোড়া থেকে তল্লাট ছেয়ে যেত গ্রিটিংস কার্ডের দোকানে। সিনারি, নাকি ফোল্ডিং পড়ুয়াদের মধ্যে কার্ড বাছার হুড়োহুড়ি পড়ত। এক-দু’ টাকা থেকে শুরু। বন্ধুত্বের রসায়ন অনুযায়ী সাইজের তারতম্য হতো। প্রেম নিবেদনেও এর জুড়ি ছিল না। নিজের হাতে গ্রিটিংস কার্ড বানিয়ে প্রিয়জনকে দিতেন অনেকেই। ভিতরে চিরাচরিত দু’লাইনের শুভেচ্ছাবার্তা। আন্তরিকতার সেই আদানপ্রদান আজ বিলুপ্তপ্রায়। স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া কেড়ে নিয়েছে কৈশোরের সেই উন্মাদনা। প্রযুক্তির যুগে নিখরচায় সারা যায় এই সব রীতি। ইংরেজি নতুন বছরের ‘উইশ’ এখন জমে থাকে চ্যাটবক্সে। হাতে গোনা দোকানে গ্রিটিংস কার্ডে দেখা মিললেও নতুনত্ব প্রায় নেই। দামও বড্ড বেশি।

ইতিহাস বলছে, গ্রিটিংস কার্ড কিনে দেওয়ার রীতি প্রায় ১৭৭ বছরের পুরনো। সেই রানি ভিক্টোরিয়ার আমলে। তখন অবশ্য তাতে বড়দিন এবং ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা একসঙ্গেই থাকত। ধীরে ধীরে দুনিয়াজুড়ে সমাদৃত হয়ে ওঠে কার্ড দেওয়ানেওয়ার প্রথা। এখনও অনেক মানুষই ভাবেন গ্রিটিংস কার্ডই ভালো। চ্যাটবক্সের মেসেজ তো ডিলিট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কার্ডের স্মৃতি মোছা যায় না।

কোভিড-১৯ এর নতুন স্ট্রেনে  উদ্বিগ্ন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর লকডাউনের ঘোষণা

ফের দেশজুড়ে লকডাউনের ঘোষণা করলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের উত্তোরত্তর বৃদ্ধির জেরে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছেন তিনি। করোনার নতুন স্ট্রেনে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে ব্রিটেনে। এর ফলে নতুন করে সে দেশের হাসপাতালগুলিতে চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কড়া সিদ্ধান্তের পথেই হাঁটলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ব্রিটেন একজোট হয়ে এই মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হয়েছিল। সেই লড়াই এখনও চলছে। এখন ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন এসে গিয়েছে । ফলে সামনের সপ্তাহগুলি কঠিনতর হতে চলেছে। নতুন এই স্ট্রেনের সংক্রমণ লাগাতার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা নৈরাশ্যের এবং উদ্বেগের। মারণ ভাইরাসের জেরে আমাদের হাসপাতালগুলি অনেক বেশি চাপের মধ্যেই ছিল। সেটি এখন আরও বেড়েছে। তাই দেশজুড়ে লকডাউন ছাড়া আর কোনও পথ নেই। সরকার আবার আপনাদের আবেদন করছে, দয়া করে ঘরে থাকুন। জাতীয় লকডাউন করা হচ্ছে।’ এর ফলে নতুন লকডাউনে আগেরবারের মতোই নিয়ম বলবৎ থাকবে। বন্ধ থাকবে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোনো যাবে না। তবে অত্যাবশকীয় পণ্য, ওষুধের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে শরীরচর্চার জন্যও বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে। বাড়ি থেকেই অফিসের কাজ করতে বলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত লকডাউন থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই সময়ের মধ্যে ব্রিটেনে টিকাকরণের কাজ জারি থাকবে। এর আগে স্কটল্যান্ডে লকডাউনের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপরই ব্রিটেনেও লকডাউন জারি করা হল। অন্যদিকে ওয়েলস এবং নর্থ আয়ারল্যান্ডেওই লকডাউন জারি করা রয়েছে। উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের নতুন স্ট্রেনের কারণেই ব্রিটেন জুড়ে সংক্রমণের হার ক্রমেই বেড়েছে। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী মাত্র একসপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি থাকা কোভিড রোগীর সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় সংক্রমণ রুখতে ফের লকডাউন করতে বাধ্য হয়েছে ব্রিটেন। 

মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতিভবন’এ ‘আচরণ’ নিয়ে ৮ম পর্বের আলোচনা

মানবধর্মের সৌন্দর্য -আচরণগত উৎকর্ষতা ও নিরুদ্বেগ জীবনাচারে

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) এর নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ বিষয়ে ৮ পর্বের আলোচনা ২৫ পৌষ ১৪২৭, ৯ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনের আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ।  করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে এ আলোচনায় অংশ নেন বাহাখাশ উপদেস্টাম-লির সদস্য এবং বাহাখাশ ধীতপুর, ভালুকা, ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শাহাবুদ্দিন খান, বাহাখাশ-এর কোষাধ্যক্ষ শাহ্ মো. শহীদুল আলম,  যুগ্মসচিব মোঃ আব্দুল ওয়াহিদ এবং সাংগঠনিক সচিব দেলোয়ার হোসেন পিন্টু।  সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আচরণ  ব্যক্তিসত্তা দর্শনের ফসল ও অবস্থানের ব্যারোমিটার। আচরণ যতটা ব্যক্তিক তথা অর্জনগত তার থেকে কম বংশগত। পর্যবেক্ষণ করে করে তিলে তিলে এটি অর্জন করতে হয় । এটি উন্নতি ও অবনতির প্রথম ও শেষ সোপান । আচরণ ব্যক্তিসত্তার ধমনির্যার্স। একটি  সত্তা কর্তৃক  অন্য একটি সত্তাকে গ্রহণ ও বর্জনের মিথস্ক্রিয়া হল আচরণ। আচরণ সে অর্থে সত্তা  প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম। সূক্ষ্মতম ক্রিয়া যেমন- কথা,বাক্য, আলাপচারিতা, ক্রোধ, হাসি, ঠাট্টা, ঈশারা ঈঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি,কন্ঠস্বর, সংযম, নীরবতা, ধৈর্য, লিখনি পোশাক পরিচ্ছদে এর প্রকাশ। আচরণ বহুপাক্ষিক অর্থাৎ এক সত্তার সঙ্গে এক বা একাধিক সত্তার, হতে পারে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির।   সবচেয়ে কম খরচে, বলা যায় বিনামূল্যে সবচেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ অর্জন, বিতরণ ও সৃষ্টিসেবার কাজে লাগানো যায় সেটি হল আচরণ। মানুষের যতরকম সম্পদ থাকে যেমন: অর্থবিত্ত, জ্ঞান-বুদ্ধিজাত সম্পদ সেগুলোর মধ্যে আচরণ হল সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। চরিত্র ব্যক্তির স্থায়ী প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট, আর আচরণ হচ্ছে স্থান-কাল-পাত্র-ভেদে ব্যক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ-মানুষের সকল গুণের মধ্যমণি, ব্যক্তিক অলংকার ও সৌন্দর্য, ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের প্রকাশিত রূপ। সকল মানবীয় গুণাবলী অর্জন যেখানে শেষ সেখান থেকে আচরণের শুরু। জীবন ও জীবিকার প্রকৃতি অনুযায়ী আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়। একজন মানুষ চরম বৈরি পরিবেশ-পরিস্থিতিতেও সাবলীল, ঠান্ডা ও খোশ -মেজাজে প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ করছে, অন্য একজন হয়তো তিলকে তাল করে সামান্য একটু কারণেই তেলে-বেগুনে জলে ঊঠছে, চিৎকার করে পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলছে। এর কারণ ব্যক্তির জীবনদর্শন। একটি হিসাবে সমাজে আনুমানিক ৭০% মানুষ দুনিয়াবী চাকচিক্যে মধ্যে ডুবে থাকে, না পাওয়ার হাহাকার, ক্রমাগত অসন্তুষ্টি, মেকি অবস্থান, ২০% মানুষ জীবনের মূলসময় পার করছে বেহেশত পাওয়ার লোভ ও দোজখ থেকে বাঁচার উপায়  নিয়ে, ৯%  মানুষ দোদুল্যমান ও  সিদ্ধান্তহীনতায় জীবন কাটায়, তাদের নিজস্বতায় নয় -পরিবেশ, পরিস্থিতি ও জীবনের গতিপ্রকৃতি দ্বারা তাদের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়, মাত্র ১%  মানুষ নিরুদ্বিগ্ন, সরল, সমর্পিত, কৃতজ্ঞচিত্ত, অকপট,পবিত্র ও আচরণে পরিচালিত  হয়।

মানুষ স্রষ্টার নেয়ামতে পরিপূর্ণ। তৎসত্ত্বেও যাদের পর্যবেক্ষণ নেই সন্তুষ্টি নেই তারা থাকে অশান্ত। মানবতা হয় ব্যহত, মানবাত্মা পায় কষ্ট, নিজে হয় অপদস্থ ও অবমূল্যায়িত। মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়া একদিকে বহমান নিরন্তর, অন্যদিকে স্বার্থকেন্দ্রিক। তাই একই মানুষ একই স্থানে একই বিষয়ে একজনের সঙ্গে একরকম অন্যজনের সাথে অন্যরকম আচরণ করে থাকে। তারা সময়, পরিবেশ,  ঘটনা,  আবেগ,উৎকন্ঠা,অভিমান ও ক্রোধ দ্বারা চালিত ও তাড়িত হয় । এটি সে নিজের সঙ্গেও করে অর্থাৎ  নিজের চিন্তা, কথা ও কর্মের মধ্যে কোন সমন্বয় রাখতে পারে না তাই তাদের ইবাদতও শুদ্ধ হয় না। আর যারা কোন দর্শন দ্বারা সিক্ত হয়ে জীবনদর্শন গড়ে তুলেছে তাদের আচরণ সর্বত্রই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সৃষ্টি তথা মানুষের সেবার প্রথম  যোগ্যতা, মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার অর্থাৎ সদাচরণ । তাই কোন ব্যক্তি জীবনে ধর্মের স্বাদ পাওয়ার সাধ থাকলে তাকে সদাচারী ও সৎস্বভাবী হওয়া অপরিহার্য। মানবধর্মের সৌন্দর্য লুক্কায়িত থাকে তার আচরণগত উৎকষতার্য় ও নিরুদ্বেগ জীবনাচারে অর্থাৎ সৎস্বভাবে ।

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার বলেছেন, ‘বিদ্যা, বুদ্ধি, বল- বিক্রম, পান্ডিত্য গর্বদোষে খর্ব হয়’। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন, ‘ ত্রুটিপূর্ণ আচরণ ত্যাগ করে ভদ্র আচরণ করতে হবে, ত্রুটি ও অক্ষমতা অকপটে স্বীকার করে উন্নতির চেষ্টা করা উত্তম। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেছেন, ‘সর্বাগ্রে একজনকে বিহ্যাভ্যারিয়্যাল প্যাটার্ন ঠিক করতে হয়। কোন কিছুকে গভীরভাবে গ্রহণ এবং সুক্ষভাবে প্রকাশ করার সমক্ষমতা রাখতে হয়, ঠোটে হাসি লাগিয়ে কথা বলতে হয়, কারো সঙ্গে কথোপকথন শুরু করতে হয় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, মুক্ত হয়ে ষ্পষ্টভাষায় কথা বলতে হয়।’ আচরণের মানদ- মুর্শিদ দর্শন ও  মুর্শিদ  আচরণ । মানব দ্বিবীজ প্রাণিঃ প্রথমত: মা এর গর্ভে, দ্বিতীয়ত: মুর্শিদ দর্শনে। যেদিন থেকে মানবীয় জন্ম সেদিন থেকে তার আচরণ গণণা শুরু । মুর্শিদ আচরণই  ব্যক্তির আচরণ পরিমাপের একমাত্র মানদ।

শাহ্ মো. শহীদুল আলম বলেন, আমরা কতটুকু মানুষ হয়েছি তা আচরণেই বুঝা যায়। আচরণের প্রকাশে আমার সর্ম্পকে মানুষ জানতে পারে। চুপচাপ বসে থাকলে তা বুঝা যায় না। লোকটি কি সত্যবাদী, সদালাপী, হাসিমুখী একমাত্র মানুষের আচরণেই বুঝা যায়। ভদ্র আচরণ কীভাবে করবো এ ক্ষেত্রে কুরআনের সূরা আরাফ আল্লাহ্ বলেন “ আল্লাহ যাকে  গোমরাহ  করে দেয় তারা গুরু/মুর্শীদ/পথপ্রদর্শক পায়না।’ সত্য পথের যাত্রী বা হাক্কানী হতে পারে না। পথের দিশা পেতে হলে অবশ্যই আল্লাহর রহমত লাগবে। বাংলায় একটি কথা আছে ‘আপনী আচারী পরকে বলো’। অর্থাৎ আমি সত্য কথা বলি না অপরকে সত্য বলার দাওয়াত দেই’! জানা যায়, নবী মুহাম্মদ  (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) এঁর কাছে একজন ব্যক্তি তার ছেলে মিষ্টি বেশী খায় জানিয়ে তা বন্ধ করার হুজুরকে বলেন। হুজুর তাকে কিছুদিন পরে আসতে বলেন। কয়েকদিন পর লোকটি এলেন হুজুর বলেন, ‘বেশি মিষ্টি খাওয়া ভাল না’। তাই তার ছেলেকে বলতে বলেন এই কথা শুনে লোকটি বলেন, হুজুর এই একটি কথা বলার জন্য এত সময় নিলেন কেন? হুজুর বলেন, আমিও মিষ্টি পছন্দ করি তা বলিনি। এখন আমি মিষ্টি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। এই হলো আপনী আচারী পরকে বলো’- এই হলো ভদ্র আচরণ।সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘আপনারা মা, বোন, স্ত্রী, সন্তান- সবার সঙ্গে কি একই রকম আচরণ করেন?।’

 সূফী সাধক আনোয়ার হক বলেন, ‘প্রেম আদায় করা যায় না প্রেম হয়ে যায়।’ যারা ধর্ম পালন করে তারা প্রতারক, আর যারা ধর্ম লালন করে তারা ধার্মিক। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি একজন নামাজী আজান দিলে আমাকে নামাজ পড়তে বলেন। কিছুদিন পর জানতে পারি সে অন্যের টাকা চুরি করে ধরা পড়েছে। এতে বুঝা যায় ধর্ম পালন আর ধর্ম লালন করা এক জিনিস নয়। মানুষের আচরণ অত্যন্ত রহস্যময় ও চিন্তার বিষয়।

দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, মানুষের কথা-বার্তা, অঙ্গভঙ্গি, বাচনভঙ্গি ও চোখে-মুখে, দৈনন্দিন জীবনে সর্বক্ষণ তার আচরণ প্রকাশ পায়। তবে এ আচরণ আমাদের বাহ্যিক রূপ। আচরণে আমি নিজের সাথে নিজে প্রতারণা করি। আমার ভেতরে এক, বাইরে আরেক রূপ। দরবারের ভাষায় একে ‘দ্বিচারিতা’ বলে।

একটা প্রবাদ আছে, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। আমরা সব সময় নিজের স্বার্থে আচরণ করি। যেমন-একজন বিক্রেতা ক্রেতার সঙ্গে, ডাক্তার তার রোগীর সঙ্গে, স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে, এমনকি ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের আচরণেও স্বার্থ রয়েছে। আমাদের ভেতরে এক রক, কিন্তু বাইরে প্রকাশ পায় আরেকটা। ভেতর ও বাইরে এক না হলে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। ভাগ্যগুণে মিরপুর আস্তানা শরীফে এসে এক ‘সত্যমানুষ’ পেলাম-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর দেখা। তাঁর বাণী, ‘আমরা প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে নিজে প্রতারণা করি ’-কথাটা বাস্তব। তিনি কৃপা করে আমাদের প্রতি উপদেশমূলক যেসব কথা বলে গেছেন সেগুলোকে যে আদেশ হিসেবে নিয়েছেন সি নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবে। দরবারে একটা কথা আছে-‘ তোর স্বভাব তাকে দিয়ে, তাঁর স¦ভাব নে না কেড়ে’। এখানে ধারণ-পালন-লালনের একটা ব্যাপার থাকে। আমি যাঁকে স্মরণে নিয়ে চলবো সে আমার মধ্যে উদিত হবে, আমার আচরণ তাঁকেই প্রকাশ করবে। প্রভুকে স্মরণে রেখে ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’র মধ্যে থাকতে পারলে অবশ্যই আমার শুদ্ধতা, আচরণ প্রভুর সুবাতাস সবাই দেখতে পারে-এটাই আমার বিশ্বাস। প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে আর বলবো, ‘আমি মানব, এখনো মানুষ নই।’ ফলে আমার মধ্যে এখনো মানুষের আচরণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি-হয়তো এটাই স্বাভাবিক।

উপমহাদেশের উজ্জ্বল তারকা স্বামী বিবেকানন্দ-শুভ আবির্ভাব দিবস

শ্রী শ্রী বিদ্যা শিখা ॥ উপ-মহাদেশের এক উজ্জল তারকা -স্বামী বিবেকানন্দ যাঁর জন্ম ১৮৬৩ সনে জানুয়ারী মাসের ১২ তারিখ সকাল ৬:৩৩। তাঁর মাতার নাম ভূবনেশ্বরী আর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত। বিশ্বনাথ দত্ত কোলকাতা হাইকোর্টের একজন প্রভাবশালী উকিল ছিলেন। মাতা ভূবনেশ্বরী শিব মন্দিরে শিবের নিকট একটি পুত্র সন্তান প্রার্থনা করেছিলেন। ভূবনেশ্বরী মনে করতেন, তাঁর প্রার্থনার ফলেই পুত্রের জন্ম হয়েছে। তাঁর ডাক নাম নরেন। ছোট বেলায় নরেন ছিলো দুরন্ত। তাকে সামাল দেয়া পিতা-মাতার পক্ষে ছিলো কঠিন কাজ। তাঁর মা প্রায় সময় বলতেন, ‘শীব আমার নিকট এক ভূত পাঠিয়ে দিয়েছে। এই ভূত নিয়ে আমি বিপদে আছি’। 

নরেন প্রথমে বাড়ীতে তাঁর মায়ের নিকট লেখা পড়া করেন। পরবর্তীতে পিতা বাড়ীতে গৃহ-শিক্ষক রেখে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। নরেন Scottish College (১৮৭১  ১৮৭৭ ) লেখাপড়া করেন। ১৮৮৪ সালে রাজা রামমোহন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কোলকাতার  Presidency College থেকে স্মাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ঐ বৎসর তাঁর পিতা মারা যান। পিতা মারা যাওয়ার পর তাঁর বাড়ী অভাবের কালো ছায়া ঢেকে ফেলে। তাঁর আর পড়ালেখা হয়নি। নরেনের স্মরণ শক্তি এতই তীব্র যে মাত্র ৬ বৎসর বয়সে সে রামায়ন মুখস্থ করে ফেলে। তিঁনি শুধু পড়ে যেতেন -আর অমনি সকল কিছু মুথস্থ বলতে ও লিখতে পারতেন।

পিতার মৃত্যুর পর নরেন General Assembly Institution এ শিক্ষকতার চাকুরী নিলেন। নরেন ছোট বেলা থেকেই ইশ্বর ভক্ত ছিলেন। পিতার অজান্তে পিতার সংগী বয়স্ক মানুষদের গোপনে জিজ্ঞাস করতেন, তুমি কি ভগবান-কে দেখেছো ? একদিন এক মরমী সাধক, তাঁর পিতার ঘনিষ্ট বন্ধু প্রিন্স দারকানাথ ঠাকুর – নরেন তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, মহাশয়! ‘তুমি কি ভগবান-কে দেখেছো ’? উত্তরে প্রিন্স দারকানাথ বললেন, ‘আমি দেখিনি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তুঁমি একদিন ভগবান-কে দেখতে পাবে’। এমন কথা শুনে নরেন দারুন খুশী। ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার প্রতি নরেন ছিলো দারুন আত্বপ্রত্যয়ী ।

কলেজে লেখাপড়ার সময় Professsor Histon এর নিকট থেকে গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের নাম শুনতে পান। একজন আধ্যাতিক সাধকের হাত ধরে দাক্ষিণাশ্বরে নরেন শ্রী রামকৃষ্ণের নিকট দেখা করতে যান। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন পেয়ে তিঁনি অভিভূত হয়ে পড়েন। তিঁনি ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণের ভক্ত হওয়ার জন্য বাড়ী ছাড়েন, শ্রী রামকৃষ্ণও তাঁকে ঘনিষ্ট ভক্ত হিসাবে গ্রহন করেন।

নরেন শ্রীরামকৃষ্ণের নিকট থেকে জানতে পারেন, ‘প্রতিটি জীবে ইশ্বর অবস্থান করছেন। কার সাথে তুমি দুর্বব্যবহার করছো?’  নরেনই লিখেছে, ‘বহুরুপে তোঁমাকে ছাড়ি / কোথায় খুঁজেছি ইশ্বর ? জীবে প্রেম করে যেই জন/সেই জন সেবিছে ইশ্বর।’  ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে স্বামী বিবেকানন্দ বলে ডাকতেন এবং এই নামেই তিঁনি পৃথিবীর সকলের নিকট পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুবাস চন্দ্র বসু, মাহাত্বা গান্ধী প্রমুখ মনীষিগণ স্বামীজি-কে ভীষণ পছন্দ করতেন। ১৮৮৬ সনে নরেন আমেরিকার শিকাগো শহরে এক ধর্ম সভায় বক্তব্য রাখেন। ওই বক্তব্যই তাঁকে বিশ্বসভায় পরিচিত করে তোলে। মাথায় পাগড়ি এবং শরীরে লাল কাপড় পরিহিত ধ্যানরত আসনে, তাঁর ছবিটি সারাবিশ্বেই ব্যাপক পরিচিত। মেয়ে জাতির প্রতি নরেনের ছিলো ভীষণ শ্রদ্ধা। স্বামীজি বলতেন ধর্ম পরিবর্তনের প্রয়োজন নাই। প্রতিটি ধর্মই পরিপূর্ণ। কোন সাম্প্রদায়িকতা নয়। শান্তিই ধর্ম এবং ইহার নাম সত্য। অর্থাৎ সত্যই ধর্ম। পৃথিবীতে ধর্ম একটি এবং ইহা হলো সত্য । সত্য এক। একক অবিচ্ছিন্ন। অবিনশ্বর। স্বামীজির ঐতিহাসিক একটি কুপের শিক্ষা পাঠকদের জন্য বর্ণনা করছি। 

স্বামীজির একদল উচ্চ শ্রেণীর ভক্ত ছিলো। একদিন তাঁদের উদ্দেশ্যে স্বামীজি একটি উদাহরন উপস্থাপন করেন। সেই উদাহারণটি ছিলো – একদিন সমুদ্রের একটি ব্যাঙ ঘুরতে ঘুরতে একটি কুপে এসে উপস্থিত হলো। কুপের ভেতর একটি ব্যাঙ ছিলো। সমুদ্রের ব্যাঙ ও কুপের ব্যাঙ এর দেখা হলো। সমুদ্রের ব্যাঙ কুপের ভেতর প্রবেশ করে ভীষণ অস্বস্তি অনুভব  করতে লাগলো। কারণ, কুপ অত্যান্ত ছোট জায়গা। সমুদ্রের ব্যাঙ মনে করলো, সে-কুপের ব্যাঙকে শিক্ষিত এবং আধুনিক করে গড়ে তুলবে এবং এই ধরণের  কুপের ভিতর যত ব্যাঙ আছে, তাদের সকলকে সমুদ্র সর্ম্পকে ধারণা দিবে এবং শিক্ষিত করে

উন্নত জীবনের জন্য সমুদ্রে নিয়ে যাবে। সমুদ্রের ব্যাঙ কুয়ার ব্যাঙ-কে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি এই কুপের ভেতর কত দিন ধরে আছে ?  কুপের ভিতরের ব্যাঙ বললো, প্রায় সারাটি জীবন আমি কুপের ভিতরেই আছি এবং আমার খুব ভালো লাগছে। আনন্দেই আছি।

সমুদ্রের ব্যাঙ, কুপের ব্যাঙ এর নিকট ব্যাখ্যা করলেন, দেখ ইহা হলো কুপ। অত্যন্ত ছোট জায়গা। এত ছোট জায়গা থাকা-খাওয়া, চলা-ফেরা এবং জীবন যাত্রার মান অত্যান্ত দুর্বিষহ। তোমার এই কুপের চেয়ে আরো অনেক সুন্দর জায়গা এই পৃথিবীতে আছে। এসবের মধ্যে আছে, যেমন পুকুর, বিল, নদী-নালা, বিশাল সমুদ্র কত কিছু ?  তুমি সুন্দর সুন্দর এসব জায়গা দেখলে অবাক হবে ও বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে পড়বে! কুপের ব্যাঙ উত্তরে বললো, ‘না আমার এইসব সুন্দর জায়গার প্রয়োজন নাই। এই কুপের ভিতর আমি প্রায় জীবনব্যাপী আছি। ই্হাই আমার আনন্দ – ভীষণ আনন্দ। এর চেয়ে আনন্দ পৃথিবীর কোথাও নাই। কুপের ভিতর আমি খুব সুখেই আছি। আামার সুখ-শান্তি তোমার সহ্য হচ্ছে না। বুঝতে পারছি। তুমি আমার নিকট থেকে চলে যাও। অন্যান্য কুপের ভিতর যে সকল ব্যাঙ বাস করছে, তুমি তাদের নিকটও যাবে না। তোমার বিল-খালে বা সমুদ্রে  তুমি চলে যাও।

সমুদ্রের ব্যাঙ তার সকল বিদ্যা ও বুদ্ধি প্রয়োগ করেও কুপের ঐ ব্যাঙ-কে খাল-বিল নদী-নালা এবং সমুদ্র সর্ম্পকে বুঝাতে ব্যর্থ হলো। সমুদ্রের ব্যাঙ ব্যর্থ হয়ে এই কুপ থেকে বাহির হয়ে অন্য কুপে গিয়ে অন্য ব্যাঙ এর নিকট একই বিষয় বর্ণণা করলো। অন্য কুপটির ব্যাঙ কিছুটা বুদ্ধিমান হওয়ায় সমুদ্রের ব্যাঙ-কে বললো, ঠিক আছে। তুমি আমাকে পুকুরে নিয়ে চলো। দেখি, পুকুর কেমন? কুপের ব্যাঙ পুকুরে গিয়ে পুকুরের বিশালতা দেখে কুপের ব্যাঙ আনন্দে লাফা-লাফি আরম্ভ করলো। সমুদ্রের ব্যাঙ কুপের ব্যাঙকে আবারো বুঝালেন যে, এর চেয়েও সুন্দর জায়গা আছে, যেমন খাল-বিল, নদী-নালা আরো কত কিছু? কুপের ব্যাঙ বললো, আমার আর নতুন জায়গার প্রয়োজন নাই। পুকুর হলো পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। আমি এর চেয়ে বেশী কিছু সুন্দর চাই না।

এবার সমুদ্রের ব্যাঙ এই কুপের ব্যাঙ এর নিকট থেকে অন্য কুপের ব্যাঙ এর নিকট গিয়ে একই বিষয় বর্ণনা করলেন। এই বার এই কুপের ব্যাঙ আরো কিছুটা বেশী বুদ্ধিমান। এই কুপের ব্যাঙটি পুকুর হয়ে খাল-বিল, নদী-নালায় পর্যন্ত পৌঁছালো এবং বললো পৃথিবীতে সেই সবচেয়ে বেশী সুন্দর জায়গা দেখেছে এবং ভালো জায়গায় আছে। নির্বিগ্নে সাঁতার কাটতে পারছে। গোটা পৃথিবীই তাঁর। তাঁর চেয়ে সূখী জগতে আর কেহ নাই ।

সমুদ্রের ব্যাঙ বুঝতে পারলেন এর নিকট থেকে আর ফল কিছু হবে না। তাই এবার সে অন্য কুপের ভিতর গিয়ে আরো বুদ্ধিমান ব্যাঙ খুঁজতে লাগলেন এবং পেয়েও গেলেন। এই  কুয়ার ভিতরের ব্যাঙ এর নিকট সমুদ্রের ব্যাঙ সমুদ্র সর্ম্পকে বিশদ বর্ণনা পেশ করলেন। এরবার এই কুপের ব্যাঙ পুকুর, বিল-খাল , নদী-নালা পার হয়ে বিশাল সমুদ্রে উপস্থিত হলেন। সমুদ্রে প্রচুর খাবার। সীমাহীন জায়গা। চারদিকে সাঁতার কেটে কি আনন্দ! সে-যে এক বিশাল স্বর্গ। সে তার কুপের ভেতর অন্যান্য ব্যাঙ এর সীমিত জায়গায় দুঃখময় জীবনের জন্য ব্যথিত হলো। কিন্তু করার কিছু নাই। কুযার ব্যাঙগুলি যে, কথা শুনে না – কুয়ার ভিতর ব্যাঙগুলি কুয়ার ভিতর থেকে বাহির হয়ে আসতে চায় না।  কুয়ার ভিতরের ব্যাঙ এর নিকট সমুদ্রের বিশালতা বর্ণনা করা ভীষণ কঠিন কাজ এবং সম্বব নয়। তাই হতাশ হয়ে সমুদ্রের ব্যাঙ পূণরায় সমুদ্রে ফিরে গেলো। 

আজকাল সমাজে আমরা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত, কম-বেশী  শিক্ষিত। বিভিন্ন পেশায় শিক্ষিত হয়ে গর্বের সীমা নাই। প্রকৃতপক্ষে আমরাও একেক জন একেকটি নির্দিষ্ট কুপের ভিতর অবস্থান করছি। একজন পন্ডিত ব্যক্তি মনে করছে – সে সবচেয়ে বড় পন্ডিত। তার চেয়ে বড় পন্ডিত আর কোথাও নাই। একজন পি এইচডি ডিগ্রীধারী ভাবছে- তার চেয়ে বড় পিএইচ ডি ডিগ্রীধারী আর নাই। একজন এস এস সি বা পিএইচডি ডিগ্রীধারী আছেন, যে মানুষকে সালাম দিতে রাজী নন। ৮০ বছরের একজন জন বৃদ্ধ, একজন পিএইডি ডিগ্রীধারীকে সালাম না দিলে, উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ে!!!

একজন পুলিশ কনষ্টেবল একজন নিরীহ পথচারীকে ঠাস করে চাপার মধ্যে চড় থাপ্পড় মারছে। কাধে সরকারী রাইফেল। হাতে লাঠি। বাহ কি ক্ষমতা! কাধে সরকারী রাইফেল পেয়ে তার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক/শিক্ষার্থী ও মানুষের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। শহরে গরীব ভ্যানওয়ালা বা রিকশা চালক কথা মতো কাজ না করলে, আবাল-বৃদ্ধ যাই হোক, লাঠি দিয়ে আঘাত করে হাত ভেংগে দিচ্ছে। ভয়াবহ শক্তিধর ! এভাবে চলছে, একক কুয়ার ভিতরে অবস্থানরত একেক পন্ডিত ও শক্তিধরের তান্ডব রাজত্ব বা লীলা।

অথবা একজন হুজুর যিনি ব্যবসা করেন- আর পণ্য দ্রব্যে ভেজাল মিশ্রিত করেন- সে মনে করে, তার চেয়ে ভালো মানুষ জগতে আর নাই। কারণ, সে নামাজ পড়ছে/ আল্লাহ্-কে ডাকছে। ব্যবসার মাধ্যমে মানুষের সেবা করছে। তার এক কথা- নামাজের কাজ নামাজ করবে, ব্যবসার মাধ্যমে মানুষের/সমাজের সেবা করা হচ্ছে। তার মতো সেবক সমাজে আর কেহ নাই।

পণ্য দ্রব্যে ভেজাল মিশ্রিত করার ফলে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে – ইহা কোন বিষয় নয়। নামাজ চলছে – মিথ্যা কথাও চলছে ট্রেনের গতিতে। খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশানোর ফলে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে – সে কোন বিষয় নয়। নামাজের মাধ্যমে একদিন সে বেহেশতে যাবেই।  এই অদ্ভুত ও অলীক চিন্তায় – সে বিভোর। সে ভাবছে – সে  পিএইডি ডিগ্রীধারীর চেয়ে উপরে অবস্থান করছে।  কারণ -সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পড়ছে। আল্লাহ্-কে ডাকছে। তার চেয়ে মহান আর কে? সমাজের উচ্চ শ্রেণীর ডাকে, সে আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করে। আখেরী মোনাজাতে হাজার হাজার মানুষ আমিন ! আমিন ! অথবা গর্দভের মতো ঠিক! ঠিক!  বলছে। ফল হউক আর নাইবা হোক। সে-যে জগত বিখ্যাত পন্ডিত।

চার পাশে গরীব অসহায়, অসুস্থ ও পীড়িত মানুষের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে উঠলেও নামাজী কিংবা পিএইডি ডিগ্রীধারীর ভ্রক্ষেপ নাই। তার নিজ নিজ জায়গায় নিজের রাজত্ব ও মহানতায় নিয়ে ব্যস্ত। এভাবেই এককজন একেক বিশেষ ধরনের পন্ডিত ও নিজ নিজ কুপের ভিতর বাস করছে। কোন পন্ডিত নিজের রাজত্বেও বাইরে কিছু শুনতে রাজী নয়।

আমরা বিভিন শ্রেণী পেশায় কাজ করি। বাজার করি- ভালোমন্দ খাই। চলি-ফিরি। একদিন অজান্তে এবং অনিচ্ছায় জোরপূর্বক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি অথবা হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ি। অর্থৎ মৃত্যু যেন আমাদের নিকট না আসতে পারে- সেই বিষয়েও আমরা সতর্ক আছি। ধানমন্ডি বা গুলশানে ৭/৮ তলা বিল্ডিং। কত সম্পদ? এইগুলি রেখে কি মৃত্যু বরণ করা যায়? তারপরও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ি এবং মৃত্যুর নিকট পরাজিত হই। মৃত্যু গোটা পৃথিবীতে তাঁর কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমরাও কম কি ? আমরা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছি। তবু গুলশানের ৭তলা বিল্ডিংটি নতুনের জন্য ছাড়তে রাজী নই। শেষ পর্যন্ত জীবনের সমাপ্তি ঘটছে মনে করি। শ্রেণী পেশার কুপের জীবনে  ইহাই স্বাভাবিক।

তাই জীবনে নিশ্চিতে সত্য পথ ধরে একাই চলতে হবে। কেহ মনে চাইলে আসবে নতুবা আসবে না। ইহাই সত্য প্রচার এবং সত্য অনুসন্ধান। সত্য প্রচারক এবং সত্য অনুসন্ধানীর সংখ্যা সর্বকালেই নিতান্তই খুব সামান্য। আশা যে, একদিন মানুষ নিজ নিজ কুয়ার ভিতর থেকে নিজ দায়িত্বে উঠে আসবে এবং বিশাল সমুদ্রের সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত করবে। স্বামীজির আবির্ভাব দিবসে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।