ভিতরের পাতা

মৃত্যু বলে কিছু নেই, আছে রূপান্তর..

সংলাপ ॥ চলে গেলেন বর্তমান সময়ের প্রথিতযশা সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, দৈনিক সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মুনীরুজ্জামান। সাংবাদিক মহলে তিনি গভীর জ্ঞান আর বিশ্লেষণী দক্ষ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২৪ নভেম্বর ২০২০, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ মঙ্গলবার সকাল ৭টা ২০মিনিটে রাজধানী মুগদা জেনারেল হাসপাতালে তার ইন্তেকালের প্রচারিত হলে সাংবাদিক ও সুধী মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে খন্দকার মুনীরুজ্জামান বিগত ২১ দিন রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। করোনা থেকে তিনি সেরে উঠেছিলেন। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তিনি ইন্তেকাল করেন।

তিনি স্ত্রী ও এক ছেলে রেখে গেছেন। তার স্ত্রী চিকিৎসক। খন্দকার মুনীরুজ্জামান ১৯৪৮ সালের ১২ মার্চ ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানার রাণীদিয়া গ্রামে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মুদ্রণ (প্রিন্ট) ও বৈদ্যুতিন (ইলেক্ট্রনিক) মাধ্যমসহ সাংবাদিকতার বিভিন্ন অঙ্গনে মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা এবং গণমানুষের পক্ষে তার বক্তব্য ও লেখালেখির জগতে তিনি একটি বিশেষ স্থান তৈরি করেছিলেন।  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। একই সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দৈনিক সংবাদে তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। পরে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি (সিপিবি)’র ঢাকা জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন। খন্দকার মুনীরুজ্জামান সাংবাদিকতা ছাড়া ও কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, চিত্র, সমালোচনা ও নিয়মিত কলাম লিখতেন। সমকালীন সাংবাদিকতায় গণমানুষের পক্ষে সদ্যপ্রয়াত খন্দকার মুনীরুজ্জামানের ভূমিকা ও অবদান বর্তমান সংলাপ পরিচালনা পর্ষদ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে।

অনুভূতি-উপলব্ধি যে করে লালন সোজা পথে হয় তার চলন

সাইমা, মাস্কাট (ওমান) থেকে ॥ পৃথিবীর বিখ্যাত সূফী সাধকদের অন্যতম সুলতানুল আউলিয়া আলহাজ্ব হযরত শাহ কলন্দর সূফী খাজা শেখ আবদুল হানিফ – অনুগ্রহবশত তাঁর নিকট বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আগত মানুষদের সাথে কথা বলার  সময়, একদিন এক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তির সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে সমস্যা গ্রস্থ ব্যক্তিকে উদ্দেশ্যে করে এই বাণীটি উচ্চারণ করেছিলেন। নিজ সমস্যা নিজের চেয়ে ভালো কেউ বলতে পারে না। কে কি করছে – নিজেই ভালো করে জানেন। শরীরের কোন জায়গায় ব্যথা আছে? ডাক্তারের চেয়ে ব্যক্তিটি ভালো করে জানেন ।

ব্যথার উৎস খুঁজতে হলে নিজের সাথে শরীর এরং মনের নিবিঢ় সর্ম্পক থাকা প্রয়োজন। শরীরের যদি উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস থাকে এবং দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তবে একসময় শরীরের ব্যথা থাকলেও, ইহা অনুভব শক্তিতে উপলদ্ধিও সৃষ্টি করে না। যেমন- হাসপাতালে ডাক্তার যখন রোগীর সার্জারী করেন, তখন নিদিষ্ট স্থানে চেতনানাশক ইনজেকশান দিকে দিয়ে স্থানটি অনুভূতিহীন করেন এবং রোগী সার্জারীকৃত স্থানের ব্যথা তাৎক্ষনিক উপলদ্ধি করতে পারেন না। 

আলোচ্যক্ষেত্রে বানীটি সমস্যাগ্রস্থ এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে সূফী সাধকের অনুগ্রহ। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সাধারণ মানুষকে খুবই ভালোবাসতেন এবং ছোটদের ভীষণ স্নেহ করতেন। মানুষ এইসব বিষয় জানেন। সমস্যাগ্রস্থ লোকটিকে সূফী সাধক ব্যাখা করতে চেয়েছিলেন – ঐ নিদিষ্ট অসুখটির জন্য বিশেষ কোন  ঔষধের প্রয়োজন নাই। সমস্যাটি যেখানে আছে – ইহা উপলদ্ধি করে ব্যবস্থা নিলে আপনি থেকেই – ঐ লোকের অসুখটি দূর হবে।

সমাজে মানুষ দিন-রাত্রি ছুটছে। কোথায কি কাজে ছুটছে – ছুটন্ত ব্যক্তিও জানে না। চলছে হাটে-বাজারে-অফিসে, কত যে কাজে!  দিনের পর দিন – মাসের পর মাস, এমনি বছর বা যুগ যুগ ধরে। চলার পথে শেষ নাই। আহ! কি অক্লান্ত পরিশ্রম। দিনের সমাপনান্তে দুঃখ-দৃর্দশা ও দুর্বিষহ জীবন। একটি মুহূর্তও মানুষ ব্যক্তিজীবনে অনুভব করে না – যে এই বিভীষিকাময় মিথ্যা ধোকাবাজির জীবন থেকে বের হয়ে আসা নিজের জন্য অতি জরুরি।

কারণ ব্যক্তি জীবনে কেউ অশান্তিতে ভুগলে সমাজ/দেশ/জাতি কারো কিছু আসে যায় না। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ব্যক্তিজীবনে নিজের। সুতরাং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যামে নিজের মধ্যে একক শক্তি অর্জন করা দরকার এবং এই একক শক্তি অনুশীলন ও চর্চা করতে হবে সারাটি জীবন। এক ছেড়ে যখনই দুই এর মধ্যে পা রাখা হবে- ঠিক তখনই ভয়াবহ ধ্বংস আরম্ভ হবে। দুর্বলতা যখন চরম -ভাঙ্গন বা ধ্বংস তখন অবশ্যই। দুর্বলতা তখনই যখন নিজের উপর নিজের বিশ্বাস অর্থাৎ আত্ববিশ্বাস থাকে না। ৯০% মুসলিম জনগোষ্টির দেশে কতটি মানুষের আত্ববিশ্বাস আছে অর্থ্যাৎ নিজকে নিজে বিশ্বাস করেন ? শুধু একে অন্যের কথা শুনে এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করছে। যেখানে ছুটাছুটি বা দৌড়াদৌড়ি থাকে – সেখান মানুষ স্থির নয়। যে মানুষ স্থির নয়- সে নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নাই।   যার নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রন নাই সে বেহুশ। বেহুশ লোক বেফাশ কথাবার্তা বলে। বেহুশ লোককে বিশ্বাস করা যায় না এবং বেহুশ লোকদের সাখে চলাফেরা করা বিপদজ্জনক।

বেহুশ লোকের জ্ঞান-বুদ্ধি ঠিকমতো কাজ করছে না। জ্ঞান-বিবেক ঠিকমতো কাজ না করলে – তার শুভ অনুভূতির সৃষ্টি হয় না। কোন ভালো অনুভূতির সৃষ্টি হয় না – উপলদ্ধির সৃষ্টি হয় না – সোজা পথে চলন হবে কিভাবে ? সমাজের মানুষ বাঁকা পথে চলতেই পছন্দ করে। কারণ ৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠির দশে প্রতিটি খাবারে ভেজাল। মিথ্যার দাপটে দেশ-জাতি নিদারুন অসহায়। মানুষ এসব জেনেও নিজকে রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। কারণ তার উপলদ্ধি নাই। সে ভেজাল বা মিথ্যার জগতে বাস করে – বেহুশ অবস্থায়। কথায় আছে, “চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী”। আমাদের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। কিন্তু রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম আমাদেরকে ভেজাল খাবার থেকে রক্ষা করতে পারছে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ধর্ম আমার ব্যক্তি জীবনে কাজে আসছে না। যে লোকটির নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নাই – তার অবস্থা ঠিক একটি ভাঙ্গা ও অকোজা ট্রাফিক লাইটের মতো। নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নাই – এমন লোকটি সম্পূর্ণ অপদার্থ এবং অকেজো ও দুর্বল। তার অনুভূতি এবং উপলদ্ধি কিছুই নাই। সে এমন দুর্বল তার শরীরে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ  আছে – সে বুঝতে পারছে না। কিডনীর ৭৫% ডেমেজ হওয়ার পর সে অসুস্থ অনুভব করে। হার্ট ৭০% ক্ষতি হওয়য়ার পর সে অসুস্থ অনুভব করে। একইভাবে লিভার এবং অন্যান্য অঙ্গসমূহ। এসব ক্ষতি হওয়ার পর কি করার থাকে? দূর্বিসহসহ ভোগান্তির জীবন। একজন মানুষ যখন তার ঈশরের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে – ঠিক তখনই তার দূর্বিসহ ও দুঃখময় জীবন আরম্ভ হয়। অর্থাৎ আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থাটিই হলো জাহান্নাম – তথা দুঃখময় দূর্বিষহ জীবন। সুতরাং কোন অবস্থাতেই আল্লাহর নিকট থেকে মূহুর্ত সময়ের জন্য হলেও নিজকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। এক আল্লাহর সাথে সার্বক্ষনিক যুক্ত থাকা আবশ্যক। আজকে এখানে এক আল্লাহ পেলাম-আগামীকাল ওখানে অন্য আল্লাহ। এভাবে চলা যায় না। মাদ্রাসার হুজুরেরা বলেন, আল্লাহর নাম ৯৯টি। ঠিক আছে। কিন্তু মূল আল্লাহ তো একজনই। যেহেতু আমি একজনই – সেই কারণে আল্লাহ একজনই। বহুর মধ্যে কখনো এক থাকতে পারে না। একের মধ্যে বহু হতে পারে। এই বিষয়ে কারো আপত্তি নাই। সুতরাং এক আল্লাহর সাথে যুক্ত থাকতে হবে। ইহাই জীবনের লক্ষ্য ও জীবনের উপলদ্ধি ।

পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল-এ প্রভু যীশু বা ঈসা পয়গম্বর  বলেছেন, “আমার সাথে যুক্ত থাকো। গাছের ডালা-পালার মতো আমার সাথে নিবিঢ়ভাবে যুক্ত থাকো। আমার সাথে যুক্ত না থাকলে, তোমরা মৃত গাছের ডালা-পালার মতো  হয়ে পড়বে এবং আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।”

বাবা লোকনাথ ভ্রহ্মচারী তাঁর গুরুর হুকুমে হিমালয়ের ঝর্ণা ধারায় এক পাথর খন্ডে একনিষ্ট এবং নিবিঢ়ভাবে গুরুসহ ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন। বাবা লোকনাথ, তাঁর ভ্রমন বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, তাঁর জীবনে তিনি ৩ জন ব্রক্ষচারী (অর্থাৎ ৩ জন সিদ্ধ পুরুষ/আদম/মৌলভী) পেয়েছিলেন। একজন আফগানিস্তনে। একজন মক্কায় (আব্দুল গফুর) এবং বানারসের সাধক তৈলঙ্গ স্বামী।

উপমহাদেশের উজ্জ্বল তারকা স্বামী বিবেকানন্দ লাল পাগড়ি এবং লাল পোষাক পরিহিত অবস্থায় গভীর ধ্যান মগ্ন ছবি আজও তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বৌদ্ধরা কঠোরভাবে গুরু ধ্যান সাধনা করে। তাঁদের মেডিটেশন সেন্টারই আছে।

এসব ধ্যান কেন করা হয় ? কারণ বেশী কিছু নয়। নিজ গুরুর সাথে যুক্ত থেকে নিজেকে জানা এবং সুস্থ একটি উপলদ্ধির সৃষ্টি করা। যিঁনি নিজকে উপলদ্ধি করতে পারেন- তিনি যা বলেন – তাই হয় । অন্যরা কিছু বললে  হয় না। পার্থক্য এখানে। বিশ্বনবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত), “যে নিজেকে চিনেছে – সে আল্লাহ-কে চিনেছে”। আউলিয়া/গাউস/পীর/মাশায়েক সকলেই বলেছেন, নিজকে চিনো। নিজ গুরুর হুকুম পালন ব্যতীত কোনদিন নিজকে চেনা সম্ভব নয়। নিজ গুরুর আদেশ-উপদেশ-নিষেধ মানতেই হবে। ইহা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে গুরু সামনে উপস্থিত না থাকলে, গুরুকে স্মরণ করা এবং গুরুর হুকুমসমূহ পালন করা একান্তই বাধ্যতামূলক।

Socrates তাঁর ছাত্রদের বার বার নির্দেশ দিয়েছেন, “Knwo yourself” আমার পিতা আমাকে বার বার বলেছেন, “যতই নিজকে চিনবে – ততই আল্লাহর নিকটে যাবে”। অর্থাৎ নিজকে ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে পারবো। নিজকে উপলদ্ধি করার জন্যই সকল আয়োজন। যারা নিজেকে চিনেছেন, তাঁরা সকলেই এক গুরুর নিকট স্থির ছিলেন এবং একনিষ্ঠভাবে একক গুরুর হুকুম মোতাবেক কাজ করেছেন। একের মধ্যে তাঁরা সকলেই বহু এবং বিরাজমান সর্বত্রই। তাঁরা কোথাও দৌঁড়াদৌড়ি করে না।

ইবলিশ অতি চালাকির কারণে নিজকে উপলদ্ধি করতে পারে নাই অথবা বা নিজকে বুঝতে পারে নাই। সারা জীবন এতো সিজদা করেছে – আদমকে সিজদা দিলে, এমন কিইবা হতো? মানুষ তো ভুলবশতঃ সিজদা করে ফেলে। আল্লাহ যখন সিজদা দিতে হুকুম দিলেন, তখন তো দ্বিতীয় অজুহাতেই চলে না। আল্লার হুকুমই স্বয়ং আল্লাহর প্রকাশ এবং সামনা সামনি উপস্থিতি। বিষয়টি অনুভব এবং উপলদ্ধি করতে না পারার কারণে সে ইবলিশ বা মোকরোম।

উপলদ্ধি জ্ঞান না থাকার কারণে ইবলিশ আদমকে সিজদা করে নাই। অর্থাৎ অতি চালাক। আজও সমাজে প্রচুর মানুষ আছে -যারা আদমকে সিজদা করতে রাজি নয়। কারণ, তারা ইবলিশের চেয়েও অতি চালাক। অতি চালক না হয়ে, নিজকে উপলদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়া আবশ্যক। যাঁরা নিজকে চিনেছেন, তাঁরা সকলেই উপলদ্ধি জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। (চলবে)

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর বাণী তাৎপর্য অন্বেষণে

নিজের বিচার নিজে কর রাত্র দিনে

শাহ্ সূফী ড. এমদাদুল হক ॥ আমরা নিজের বিচার নিজে করতে পারি না, কারণ সর্বক্ষণই অন্যের বিচার করতে ব্যস্ত থাকি। অন্যের বিচার করতে করতে নিজের বিচার নিজে করবার মতো সময়ই থাকে না আমাদের। তাই নিজের বিচার নিজে করার পূর্ব শর্ত হচ্ছে অন্যের বিচার না করা। রাত্রদিনে আমরা পরধর্ম বিচার করি, পরনিন্দা-পরচর্চা করি, পরের উপর দোষারূপ করি। এসব পরচর্চা বন্ধ হলেই কেবল নিজের বিচার নিজে করার কাজটি শুরু করা যায়।

শান্তি প্রতিষ্ঠার মূলনীতি হচ্ছে – সকল মানুষই আল্লাহর বৃহত্তম পরিবার। তাই অন্য কোন মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে হেয় করার কোন সুযোগ নেই। নিশ্চয়ই অন্যদের  রক্ত আমাদের রক্তের মত। অন্যদের মাল আমাদের মালের মত এবং অন্যদের ইজ্জত-আবরু আমাদের ইজ্জত-আবরুর মত। ধর্মের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি কিংবা কোন বাধ্য বাধকতা নেই। আমার জন্য আমার ধর্ম, তোমার জন্য তোমার ধর্ম। আমার  ধর্মের সাথে অন্যের ধর্মের তুলনা করা পাপ। হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, জৈন, শিখ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্ম নয়, একই ধর্মের বিভিন্ন নাম। আল্লাহ, গড, ঈশ্বর, ভগবান ইত্যাদিও বিভিন্ন বিধাতার নাম নয়, একই বিধাতার বিভিন্ন নাম। একইভাবে – বাইবেল, কুরআন, গীতা, ত্রিপিটক ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ নয়। একই ধর্মের একই ধর্মগ্রন্থ। সমগ্র মানবজাতি একই আল্লাহর পরিবারভুক্ত। আল্লাহ এক, ধর্ম এক, ধর্মগ্রন্থ এক, নবী-রসুল এক। আমিও এক, দু’টি চোখ দিয়ে আমি একই দেখি, দুটি কান দিয়ে একই শুনি, দুটি পা দিয়ে একই দিকে চলি। তবু এত বিভাব কেন? বিভাবের সৃষ্টি হয় চিন্তার বিভাব থেকে। আমরা যদি চিন্তার বিভাবকে ‘এক’ – এ পরিণত করে ‘এক’ এবং অভিন্নতাকে দেখতে পারি তবেই পরচর্চা বন্ধ হবে এবং নিজের বিচার নিজে করতে পারবো।

অন্য লোক কতটুকু ধার্মিক, অন্য লোকের কতটুকু গুরুভক্তি আছে তা বিচার্য বিষয় নয়। অন্য লোকের বিয়াদ্দবির দিকে নজর না দিয়ে নিজের আদব আছে কি-না সেদিকে নজর দিলে আত্মোন্নতি হয়। অন্যদিকে, বন্ধ হয় ধর্মের নামে দলাদলি ও তর্কাতর্কি। ধর্মের নামে অধর্ম শুরু হয় পরচর্চা-পরনিন্দা থেকে। এক ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার দোষ অন্যদের নিকট প্রকাশ করলেই অধর্মের চর্চা শুরু হয়। কেউ পরিপূর্ণভাবে দোষমুক্ত নয়। মানুষের দোষ থাকতেই পারে। দোষ থাকলেও দোষের কথা ব্যক্তির অনুপস্থিতে বলা যাবে না। নিজের বিচার নিজে করার ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। তাই কুরআন পরনিন্দা পাপের ব্যাপকতা বুঝাতে পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সাথে তুলনা করেছে। কোন মানুষ মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করবে এটা যেমন কখনও চিন্তায় আসে না ঠিক তেমনি পরের দোষ বা পরের বিচার যেন কখনও নিজের চিন্তাজগতেও প্রবেশ না করে।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মধ্যেই কোন না কোন গুণ রয়েছে। সৃষ্টি জগতে এমন একটা প্রাণীও নেই যার কোন গুণ নেই। মানুষ যা খুঁজে তারই সন্ধান সে পায়। প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা কি খুঁজবো? যদি কলঙ্ক খুঁজি তবে তা চাঁদেও পাওয়া যাবে। কলঙ্ক না খুঁজে গুণ খুঁজার চেষ্টা করলে প্রত্যেকের মধ্যেই তা-ও পাওয়া যাবে। মানুষের দোষ না খোঁজে গুণ খুঁজলেই মানুষের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠবে। তাহলে আমরা শান্তিতে থাকতে পারবো এবং নিজের বিচার নিজে করার সময় পাবো।

‘নিজ’ হচ্ছে – আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া, স্মৃতি, হতাশা, সফলতা-ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, স্বপ্ন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, ভাল লাগা ও খারাপ লাগা, চিন্তা, কল্পনা, দিবাস্বপ্ন, আবেগ, লোভ, ক্রোধ ইত্যাদির সমষ্টি। নিজের বিচার নিজে করার অর্থ – নিজের মধ্যে এসব কিভাবে বিরাজ করছে সে সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা।

প্রশ্ন হচ্ছে – নিজের বিচার নিজে করবো কিভাবে? আমার বিচার কি আমি করতে পারি? তাহলে যে আমি আমার বিচার করবে সে আমি কি আমারই অর্ন্তভূক্ত? আমার মধ্যে আমার থেকে পৃথক এমন কোন আমি আছে কি যে আমি আমার বিচার করবে? আমি কি সে আমিকে চিনি? ধরা যাক্, রাতে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম যে, সকাল ৫ টায় ঘুম থেকে উঠবো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠলাম না। তাহলে কোন্ আমি প্রতিজ্ঞা করেছিল যে ৫ টায় উঠবে, আর কোন্ আমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলো? আমার মধ্যে কতগুলো আমি আছে? আমি কি এক?

নিজেকে এভাবে পর্যবেক্ষণ করলে অনেকগুলো পরিবর্তনশীল আমির অস্তিত্ব উপলব্ধিতে আসে। বুঝা যায়  যখন যেখানে যে চরিত্রে অভিনয় করা দরকার সে চরিত্রে মানুষ অভিনয় করে মাত্র। প্রায় প্রতিটি মানুষই বহুরূপী। মালিকের কাছে যিনি ভৃত্যের অভিনয় করেন তিনিই ভৃত্যের কাছে মালিকের অভিনয় করেন। নিজের কাজের লোকের সামনে যিনি কর্কশ, মালিকের সামনে তিনিই কোমল। মানুষ ভুলে যায় কোন্টি তার আসল রূপ। নকল রূপের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে নিজেই আবার নিজেকে খুঁজে মরে। নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা অব্যাহত রাখলে দেখা যাবে অনেকগুলো পরিবর্তনশীল আমির মধ্যে একটা আমি আছে যার কোন পরিবর্তন হয় না। সেই অপরিবর্তনীয় আমিই হচ্ছে ‘নিজ’ যে নিজের বিচার করতে পারে।

‘নিজের বিচার নিজে কর’ অর্থ হচ্ছে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করা। নিজের চিন্তাপ্রবাহকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে প্রতি মিনিটেই নিজের ভেতরে রূপের পরিবর্তন ঘটছে। প্রতিদিন প্রায় ৬০ হাজার বার রূপের পরিবর্তন ঘটে। এ বহুরূপীতার উপলব্ধি থেকেই এক রূপে থেকে ‘এক’-কে জানার তৃষ্ণা জাগ্রত হয়।

‘রাত্রদিনে’ অর্থাৎ সর্বক্ষণ। আমরা  যদি পানির গুণগত মানের পরিবর্তন ঘটিয়ে একে বাষ্পে পরিণত করতে চাই তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাষ্পে পরিণত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত একটানা  একে উত্তপ্ত করতে হবে। নিজের সুবিধামতো সময়ে মাঝে-মধ্যে উত্তপ্ত করলে রূপান্তর ঘটবে না। অন্যদিকে রাতের গুরুত্ব দিনের থেকে অধিক। তাই দিবানিশ বা দিনরাতে না বলে, বলা হয়েছে ‘রাত্রদিনে’। নিজের বিচার নিজে করার কর্মে রাতের গুরুত্ব দিনের চেয়ে বেশি মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, রাতে চারিপাশে একটা নীরবতা বিরাজ করে। চারপাশের নীরবতা ভেতরটাকে নীরব করতে প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, সারাদিন কাজ করে রাতে সব মানুষই বিশ্রাম নেয়। রাতে আরামের ঘুমকে উপেক্ষা করে ভক্ত যখন গুরুর সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টায় রত থাকে তখন এ প্রচেষ্টার মূল্যায়নও উঁচু স্তরের হয়। তাই সাধনার ক্ষেত্রে দিনের চেয়ে রাত অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, রাত্রি জাগরণ মানুষের বিক্ষিপ্ত চিন্তাকে ‘এক’ – এ পরিণত করতে অধিক সহায়ক।

নিজেকে বিচার করার প্রচেষ্টা রাত থেকেই শুরু করা উত্তম। প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার আগে দিনের কার্যাবলী পর্যালোচনা করতে হবে। আজ সারাদিন কি করেছি? কতবার মিথ্যা বলেছি? কতবার সত্য থেকে দূরে সরে গেছি? কতবার, কতরূপ নিজের মধ্যে প্রকট হয়েছে? এসব বিচারের উপযুক্ত সময় দিনের শেষে। দৈনন্দিন কর্মের বিচার করলে আজ কি কি কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে মনে মনে তার একটা তালিকা তৈরী করা যায়। তাহলে আজকের অসমাপ্ত কাজগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে আগামী কাল তা সম্পন্ন করতে সুবিধা হয়।

মানুষ যা করে তাই পায়। প্রতিদিনের কর্ম তালিকার শীর্ষে যিনি গুরুর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা রাখেন গুরুও তাঁর তালিকায় সে ভক্তকে শীর্ষে রাখেন।

প্রবাহ

ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে ভূমি ফেরত দিচ্ছে আর্মেনিয়া

রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সই হওয়া কারাবাখ শান্তি চুক্তির অধীনে আজারবাইজানের ভূমি ফেরত দিতে শুরু করেছে আর্মেনিয়ার সরকার। এসব ভূমি গত ৩০ বছর ধরে আর্মেনিয়া দখল করে রেখেছিল।

সম্প্রতি রাশিয়ার মধ্যস্থতায় যে চুক্তি সই হয়েছে তার অধীনে আর্মেনিয়া আজারবাইজানের কাছে কালবাজারে নামে একটি এলাকা সম্প্রতি হস্তান্তর করেছে। এছাড়া আগদাম নামে আরেকটি জায়গা আগামী ২০ নভেম্বরের ভেতরে আজারবাইজানকে ফেরত দিতে হবে। একইভাবে লাচিন নামে একটি এলাকা আগামী পহেলা ডিসেম্বর এর ভেতরে আজারবাইজানের কাছে ফেরত দেয়ার কথা। ওই এলাকার বেশ কিছু ভূখন্ড এরইমধ্যে আজারবাইজানের সেনারা পুনর্দখল করেছে।

জাতিগত বংশোদ্ভুত আর্মেনীয় লোকজন আজ কালবাজার এলাকা থেকে আর্মেনিয়ায় চলে গেছে। ১৯৯০ সালের দিকে এলাকাটি আর্মেনিয়া সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গেরিলারা এবং আর্মেনিয়ার সেনারা দখল করে নিয়েছিল। তবে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে লোকজন তাদের ঘর-বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়। কারাবাখ অঞ্চলটি আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের বলে স্বীকৃত।

৪ বছর পর দেশে ফিরলেন ইরানি নাবিকরা

তানজানিয়ায় চার বছর ধরে অনর্থক আটক থাকার পর ইরানের আটজন নাবিক দেশে ফিরেছেন। ইরান সরকারের সফল কূটনীতি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুক্তি সম্ভব হয়েছে।

সম্প্রতি নাবিকরা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রবন্দর চবাহারে পৌঁছান। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরীতে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হামিদ রেজা তুসি জানান,গত সপ্তাহে এই আট নাবিক তানজানিয়া থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

তিনি জানান, আফ্রিকার এ দেশটিতে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব নাবিকের মুক্তির পথ সহজ করেছে। ইরানি নাবিকদের মুক্ত করার জন্য তানজানিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত কয়েকদফা দেশটির প্রেসিডেন্ট, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

তুসি জানান, তানজানিয়ায় এখনো কমপক্ষে ২২ জন ইরানি জেলে আটক রয়েছেন।

আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের এখনই সময়: ভারপ্রাপ্ত মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

আমেরিকার ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্রিস মিলার বলেছেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের এখনই উপযুক্ত সময়। পেন্টাগনের দায়িত্ব নেয়ার পর এই প্রথম তিনি সরকারি কোনো বক্তব্য দিলেন।

নি বলেন, “আমরা কোনো যুদ্ধবাজ জাতি নই, লাগাতার যুদ্ধ করতে হবে সেটিও কোনো কথা নয় বরং প্রত্যেকটা যুদ্ধের অবসান হওয়া উচিত।”

ক্রিস মিলার আরো বলেন, যুদ্ধ অবসানের জন্য কিছু আপোষরফার প্রয়োজন হয় এবং অংশীদারিত্বের প্রশ্ন রয়েছে। আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি। এখন সময় হয়েছে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার।”

এর আগে গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আফগানিস্তান থেকে সমস্ত সেনা ক্রিসমাসের মধ্যেই প্রত্যাহার করা হবে। তার এ বক্তব্যের পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন। মিলি বলেন, আফগানিস্তান থেকে শর্তসাপেক্ষে সেনা প্রত্যাহার করা যেতে পারে তবে তার আগে কাবুল সরকার এবং তালেবানের মধ্যে শান্তি চুক্তি হওয়া জরুরি।

অতীত মহামারিগুলো থেকে
নেওয়া ৫টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

বর্তমান সময়কে বলা হচ্ছে নিউ নরমাল। কোভিড-১৯ মহামারির পূর্বের সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তিত হতে শুরু করেছে। মানবজীবন এবং সমাজ ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবে যুক্ত হচ্ছে নতুন কিছু অভ্যাস। পূর্বের বিভিন্ন সময়ের মহামারি নানাভাবে বদলে দিয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা। মানুষ মহামারির সাথে লড়াই করতে গিয়ে শিখেছে নতুন সব বিষয়, যা কখনো সক্রিয়ভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণে কাজে এসেছে, তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহস জুগিয়েছে, কখনো বা জাগিয়েছে বাঁচার নতুন অনুপ্রেরণা।

কোয়ারেন্টিন

‘কোয়ারেন্টিন’ শব্দটি ইতালীয় ‘কোয়ারেন্টা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘৪০’। ১৩৭৭ সালের ২৭ জুলাই ব্যাধির ইতিহাসে প্রথম বন্দরনগরী রাগুসারের (বর্তমান ডাব্রোভনিক) আইনে কোয়ারেন্টিন যুক্ত করা হয়। তখন এই শহরটিতে বুবোনিক প্লেগ বা ব্ল্যাক ডেথ মহামারির তান্ডব চলছে। নগরীর জনগণের জীবন রক্ষার্থে তৈরি করা এই নতুন আইনে বলা হয়েছিল, “জীবাণু ছড়িয়ে পড়া অঞ্চল থেকে যারা আসবে তারা (রাগুসা) বা এর অন্য কোনো জেলায় প্রবেশ করতে পারবে না, যদি না তারা জীবাণুমুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে মর্কিন দ্বীপে বা কাভাত শহরে একমাস অবস্থান করে।”

সেকালের চিকিৎসকদের ধারণা ছিল রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। আর হয়েছিলও তা-ই।

 ১৩৭৭ এর দশকে উদ্ভূত সেই কোয়ারেন্টিন পরবর্তীতে বহু রোগের বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। বিংশ শতাব্দীতে আমেরিকান শহরগুলোতে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফেরত সৈনিকরা ফিরে আসছিল, তখন এখানে চলছিল স্প্যানিশ ফ্লু। সান ফ্রান্সিসকোতে, নৌপথে আগমনকারীদের শহরে প্রবেশের আগেই পৃথক করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সান ফ্রান্সিসকো এবং সেন্ট লুইসে সামাজিক জমায়েত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। একইসাথে এই অঞ্চলের থিয়েটার ও স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। শুধু স্প্যানিশ ফ্লু নয়, চতুর্দশ শতকের পরের সময় থেকে আজ পর্যন্ত ইয়েলো ফিভার, বুবোনিক প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু, কোভিড-১৯ সহ বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির গতি রোধে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।

ওয়াইন উইন্ডো

চতুর্দশ শতাব্দী থেকে আঠারো শতক অবধি বিশ্ব এক ভয়াবহ মহামারির কবলে পড়ে; যার নাম বুবোনিক প্লেগ, ব্ল্যাক ডেথও বলা হয় একে। ভয়াবহ এই মহামারির কবলে পড়ে ইউরোপের জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এই মহামারির পরবর্তী সময় বিশ্ব চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসেবাতে খুব দ্রুত এগিয়ে গেছে, তবে সেকালে মহামারির বিস্তৃতি রোধে যে সকল ব্যাবস্থা বা সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছিল তার চর্চা বর্তমান সময়েও লক্ষ্য করা যায়।

শুধু বর্তমান সময়ের কোভিড-১৯ নয়, ষোড়শ শতকে যখন প্লেগ মহামারির প্রকোপ ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইতালিও এ থেকে মুক্ত ছিল না। বরং এখানে মহামারির সংক্রমণ ছিল ভয়াবহ। এই সময় ইতালির লোকেরা ‘ওয়াইন উইন্ডো’ বা ‘বুচেটে দেল ভিনো’ ধারণাটি নিয়ে আসে। সামাজিক দূরত্ব অনুসরণ করে মদ ক্রয়-বিক্রয় কাজে মদের দোকানের প্রাচীরে এই ছোট জানালা তৈরি করা হয়েছিল।

সমগ্র ফ্লোরেন্স এবং টাস্কানি শহর জুড়ে এখনও সেকালের প্রায় শতাধিক ওয়াইন উইন্ডো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যদিও এগুলোর বেশিরভাগ বন্যাসহ নানা কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। বর্তমানে এই ওয়াইন উইন্ডোর ধারণা মানুষের সামনে পুনরায় ফিরে এসেছে। দোকান-মালিক এবং ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এগুলোকে আবার ওয়াইন এবং ককটেল বিক্রির কাজে ব্যবহার করছেন।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ওয়াইন উইন্ডো অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাত্তেও ফাগলিয়া বলেন, “আমরা সমস্ত ওয়াইন উইন্ডো দ্বারা একটি মাইলফলক স্থাপন করতে চাই, যখন লোকেরা এটি কী এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে পারবে, তখন তারা এর আরো বেশি কদর করবে।”

মাস্ক পরিধান

প্লেগ চলাকালে রোগীদের চিকিৎসা করার সময়ে চিকিৎসকরা দীর্ঘ, পাখির মতো চিটযুক্ত একপ্রকার মুখোশ পরিধান করতেন। এটি তাদের মুখ এবং নাককে আংশিকভাবে ঢেকে রাখত। রোগী এবং নিজেদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চিকিৎসকরা এই উপায় অবলম্বন করতেন। কিন্তু এর পেছনে তারা যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা দাঁড় করিয়েছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। মিয়াসমা তত্ত্বে বিশ্বাসী সেই সময়কার চিকিৎসকরা বিশ্বাস করতেন, বাতাসের গন্ধের সাথে রোগ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যা ছিল তাদের মাস্ক পরিধানের কারণ। তাদের চিটযুক্ত এই মুখোশে সুগন্ধযুক্ত একপ্রকার ঔষধি মিশ্রিত থাকত।

কিন্তু ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি চলাকালে মুখোশগুলো জনসাধারণের মাঝে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সান ফ্রান্সিসকোতে মুখোশ পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। এমনকি যারা মুখোশ পরিধান করবে না তাদের জরিমানা, কারাবাস থাকে শুরু করে তাদের নামগুলো সংবাদপত্রগুলোতে ‘মাস্ক স্ল্যাকার’ হিসাবে ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সময় সংবাদপত্রগুলো কেবল তাদের লজ্জা দেবার জন্য নয়; তারা ঘরে কীভাবে মুখোশ বানাবেন সেই সম্পর্কে নির্দেশাবলীও ছাপিয়েছিল।

ব্যক্তিগত সুরক্ষা-সামগ্রী

প্লেগ মহামারি চলাকালীন চিকিৎসকরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য এক বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধান করতেন। তারা বিশ্বাস করতেন- এই পোশাকগুলো তাদের বায়ুবাহিত রোগ থেকে রক্ষা করবে। সপ্তদশ শতকে ফ্রান্স এবং ইতালিতে এর প্রচলন হয়।

প্লেগে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা করার সময় চিকিৎসকরা প্রায় গোড়ালি পর্যন্ত দৈর্ঘের ওভারকোট এবং পাখির ঠোঁটের ন্যায় চাঁদযুক্ত মুখোশ, একজোড়া গ্লাভস, বুট, এবং প্রশস্ত ডানাযুক্ত টুপি পরিধান করতেন। কালের পরিক্রমায় সেই বিশেষ পোশাক পরিবর্তিত হয়ে আজ আমাদের সামনে এসেছে এক নতুন রূপে, যাকে আমরা ব্যক্তিগত সুরক্ষা-সামগ্রী বা পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট নামে চিনি।

সতেজ বায়ু এবং ভিন্নধর্মী শিক্ষা কার্যক্রম

বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বর্তমান মহামারিকালে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও সাময়িক, আবার কোথাও দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মহামারিকালীন শিক্ষা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়ার ঘটনা এবারই নতুন নয়।

১৬৬৫ সালে প্লেগের প্রকোপ চলাকালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। তখন সবাই বিশ্বাস করত, তাজা বাতাস, বিশুদ্ধ বায়ু চলাচল এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য স্বাস্থ্যের উন্নতিতে অবদান রাখে। তাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় যাতে তারা সতেজ বায়ু থেকে বঞ্চিত না হয়।

 মুক্ত এবং সতেজ বায়ুর ধারণার প্রেক্ষিতে জার্মানিতে প্রথম ওপেন-এয়ার স্কুলের সূচনা হয়। ১৯১৮ সাল নাগাদ ১৩০টিরও বেশি আমেরিকান শহর সেগুলো মেনে চলা আরম্ভ করে। স্প্যানিশ ফ্লু প্রাদুর্ভাবের সেকেন্ড ওয়েভে শিকাগো এবং নিউ ইয়র্কের সরকারি বিদ্যালয়গুলো তাদের পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় নিউ ইয়র্ক সিটির স্বাস্থ্য কমিশনার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, “শিশুরা বিদালয়ের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে তাদের বাড়ি চলে যায়, কিন্তু ওপেন-এয়ার স্কুলগুলোতে সর্বদা শিক্ষার্থীদের পরিদর্শন এবং রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।”

সতেজ বায়ু রোগ নিরাময়ে সক্ষম- এমন ধারণা থেকে জন্ম নিয়েছিল ওপেন-এয়ার স্কুল। আর ওপেন-এয়ার স্কুলের হাত ধরে মহামারিকালে জন্ম নেয় ভিন্নধর্মী শিক্ষা কার্যক্রম।

বিহারে সপ্তম বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন নীতিশ কুমার, কটাক্ষ, কংগ্রেস-আরজেডি

ভারতের বিহার রাজ্যে সপ্তমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন জেডিইউ প্রধান নীতীশ কুমার। সম্প্রতি বিহারের রাজধানী পাটনায় নীতীশ কুমারের বাসভবনে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ‘এনডিএ’ বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই সর্বসম্মতিক্রমে নীতীশ কুমারকে এনডিএ বিধায়ক দলের নেতা নির্বাচিত করা হয়। এরপরেই রাজভবনে রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাতে যান নীতীশ। নয়া সরকার গঠনের জন্য রাজ্যপালের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পাওয়ার পরে নীতীশ কুমার বলেন, সোমবার বিকেল সাড়ে ৪ টায় শপথ অনুষ্ঠান হবে।

এনডিএতে বিজেপি’র সর্বাধিক ৭৪ বিধায়ক রয়েছে। অন্যদিকে, নীতিশের জেডিইউ-এর রয়েছেন ৪৩ জন বিধায়ক। জোটের সহযোগী ‘হাম’ এবং ‘ভিআইপি’ দলের ৪ টি করে আসন রয়েছে।

এনডিএতে নীতিশ কুমারের দল জেডিইউ কম আসন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হতে যাওয়ায় কটাক্ষ করেছেন কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তারিক আনোয়ার। তিনি আজ বলেন, ‘নীতীশ কুমার যতই আবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হোন না কেন, এবার রাজ্যের লাগাম অন্য কারও হাতে থাকবে এবং নীতীশ রিমোটচালিত মুখ্যমন্ত্রী হবেন।’ সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের সাথে আলাপকালে তারিক আনোয়ার আরও বলেন, বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে এবং রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে নীতীশ কুমারকে দুর্বল করেছে।

অন্যদিকে, আরজেডি নেতা মনোজ ঝা বলেছেন, শেষমেশ ৪০ আসন পাওয়া ব্যক্তি কীভাবে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন? বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ম্যান্ডেট তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁকে খুব খারাপভাবে পরাজিত করা হয়েছে এবং এই বিষয়ে তাঁর ভাবা উচিত ছিল। যদিও বিহার তার নিজস্ব বিকল্প খুঁজে পাবে, যা আচমকা হবে। মনোজ ঝা-এর দাবি, এটি এক সপ্তাহের মধ্যে, দশ দিন বা এক মাসের মধ্যে হবে।

ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ১৩

এই ধারাবাহিক রচনায় প্রথমবারের মতো ইটিমোলজি’র (শব্দের বুৎপত্তি নির্ণায়ক শাস্ত্র) নিরিখে লালন সাইজি’র পদাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পদাবলির প্রতিটি চরণ শব্দমূল অর্থাৎ ধাতুভিত্তিক দর্শনে বর্ণিত; তাই এটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ধাতুসুধায় লালনপাঠ’। গোটা ভাব বা বস্তুকে যা দিয়ে ধরে রাখা যায় সেটাই তার মূল বা ধাতু। দেহ নানা প্রকার প্রাণরস ধারণ করে টিকে থাকে; সেগুলোই দেহের ধাতু। ঠিক তেমনি শব্দ একটি ভাব বা চেতনার কাঠামো যা ধাতুকে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দের গোটা ছবি দেখতে হলে ধাতুবিচার খুবই জরুরি।

॥ তারিফ হোসেন ॥

যদি উজান বাঁকে তুলসী ধায়

যদি উজান বাঁকে তুলসী ধায়

খাঁটি তার পূজা বটে চরণ চাঁদে পায়।।

তুলসী দেহ যত ভাটিয়ে যায়

তত কোথায় সে অটল পদ তুলসী কোথায়।।

তুলসী গঙ্গাজলে উজাবে কোনকালে

মনতুলসী হলে অবশ্য পায়।।

প্রেমের ঘাটে বসি ভাসাও মনতুলসী লালন কয়

তারে দাসী লেখে খাতায়।।

‘যদি উজান বাঁকে তুলসী ধায় খাঁটি তার পূজা বটে  চরণ চাঁদে পায়।’  সাঁইজির এই পদাবলীতে তুলসী ধারণাটিকে পূর্ণমাত্রায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ধাতু নিরিখে তুলসী শব্দটি ‘তুল’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন। পরিমাণ, ওজন, উত্তোলন, চড়ানো ইত্যাদি অর্থে তুল বা তোল শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ভেষজ হিসাবে তুলসরি সমকক্ষ ভেষজ উদ্ভিদজগতে বিরল। গুণ ও কার্যকারিতার দিক থেকে তুলসী অতুলনীয়; তাই তুলসী ও অতুল শব্দদ্বয় সমার্থক। সিন্ধুসভ্যতার ধারাবাহিকতায় বৈদিক যজ্ঞের উপাচারেও তুলসী একটি অপরিহার্য উপকরণ। গুণাধিক্যের কারণে বৈদ্যকুল তাকে যে জাতে তুলেছে তাতে করে অন্যান্য গাছ-গাছড়া সেই উচ্চতায় চড়তে পারেনি। তাই শিলাপূজার প্রধান নৈবেদ্য তুলসীকেই নারায়ণের প্রতীকরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। মনোদৈহিক বলবীর্য, প্রভুত্বের নিয়ন্ত্রক মস্তক। বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতিভূ যেমন মস্তকোপরি কেশগুচ্ছ, তুলসীর দীপ্তি তেমন বিকশিত মঞ্জরীতে। মূল, কান্ড, ত্বককে ছাপিয়ে মঞ্জরী পর্বেই তুলসী অধিক দূষণসংহারী তথা শুদ্ধি নিশ্চায়ক। মানুষের দুটো পাল্লা- দেহ ও মন। এই জোড়া পাল্লায় একটি মনোদৈহিক নিক্তি নির্মিত হয়। প্রতিনিয়ত এই যুগলভারায় বিভিন্ন জাগতিক চাহিদার বাটখারা উত্তোলিত হচ্ছে। পাল্লাদ্বয়ে সমতুল বাটখারা না চড়লে নিক্তি যে কোনো দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ঝুঁকে পড়ার অর্থ ফের সৃষ্টি হওয়া। এই ফের মানুষকে বিপাকে ফেলে দেয়। তারা : ড়ষবৎধহপব হারায়। ঞড়ষবৎধহপব-এ : ড়ষষ বা তোল থাকে- রাজা এই : ড়ষষ আদায় ক’রে রাজকোষে : ড়ষবৎধহপব আনে; ব্যক্তিমানুষ : ড়ষষ সংগ্রহ ক’রে মনোকোষে : ড়ষবৎধহপব প্রতিষ্ঠা করে।  মূলাধারের কু-লিনী শক্তির উত্তোলন প্রক্রিয়া উর্দ্ধগামী বা উজানগামী। এই শক্তির উর্দ্ধমুখী উত্তোলনধারাকে সাঁইজি ‘উজানবাঁকে তুলসী ধায়’ বলেছেন। এই প্রক্রিয়ায় রতিশক্তি সঞ্চালনের সাধনাকে ‘খাঁটি তার পূজা বটে’- বলে বর্ণনা করেছেন। তুলসীরস (বীররস) যখন চক্র ভেদ করে দ্বিদল (আজ্ঞাচক্র) পেরিয়ে

সহস্রারে (সহস্রদল বা পদ্মাকার জ্যোতিবলয়) উঠে আসে সাধক নিত্যানন্দ সত্তায় (চরণ চাঁদ) একীভূত হয়। পরম সত্তার আচরণ বা স্বভাব হল চরণ; আর তার আনন্দভাব চন্দ্রতুল্য। তাই নিত্যানন্দ স্বভাবে আত্মস্থ হওয়ার নাম ‘চরণ চাঁদে পাওয়া’। ‘তুলসী দেহ যত  ভাটিয়ে যায় তত কোথায় সে অটল পদ  তুলসী কোথায়?’  ভেষজ তুলসী শোধন ক’রে জীব দেহ রক্ষা করে; মানবশরীরস্থ তুলসীর (বীররস) স্খলন বা পতন হলে জীব সাধনমার্গ থেকে বিচ্যুত (টলে যাওয়া) হয়। রসস্খলন নিম্নগামী তাই ‘ভাটি’ শব্দে চিহ্নিত। তুলসী দেহ ও তুলসী মনের বৃত্তান্ত আলোচনা করা যাক। জীব সাধন প্রক্রিয়ায় নিজেকে মায়ার স্তর থেকে তুলে নিতে সক্ষম হলে তখন তার গতি পরমাত্মামুখীন এটাই মূলত মনতুলসী। এই উত্তোলনে ব্যর্থ জীব যখন মোহপাশে আবদ্ধ হয়ে ইন্দ্রিয়সর্বস্বতায় পরিণত হয় তখন তার অবতল বা রসাতল অবস্থা এটা তখন দেহতুলসী পদবাচ্য। ‘তুলসী গঙ্গাজলে  উজাবে কোনকালে মনতুলসী হলে  অবশ্য পায়।’  পার্থিব ভূগোলে গঙ্গা আর্যাবর্তে অবস্থিত পবিত্র নদী বিশেষ। গঙ্গা গম ধাতু থেকে তৈরি। নদী মানেই প্রবাহ; গঙ্গার গমনশীলতাও সেই অর্থকে নির্দেশ করে। প্রবাহ অব্যাহত থাকলে মল বা দূষণ সেখানে দাঁড়াতে পারে না। তাই গঙ্গা পবিত্রতার প্রতীক। উর্দ্ধগামী বীররস (বীর্য) সাধকের রিপু শোধন ক’রে পবিত্র করে। এটাই হল ‘তুলসীর গঙ্গাজলে উজানো’। বস্তুত এই কর্মসাধন যজ্ঞ ‘মনতুলসী’ সত্তায় অনুষ্ঠিত হয়। ‘প্রেমের ঘাটে বসি ভাসাও মনতুলসী লালন কয় তারে  দাসী লেখে খাতায়।’  জাগতিক মোহপাশ ছিন্ন করে কামিনী-কাঞ্চন মুক্ত হয়ে পরমপ্রিয় ভাবে অধিষ্ঠিত হওয়ার নাম-‘প্রেমের ঘাটে বসা’। বীররসের উর্দ্ধপ্রবাহে থাকার নাম- মনতুলসী ভাসানো। নিবেদনমূলক কার্যে কাঁচা ‘আমি’ অর্থাৎ অহঙ্কারকে বিসর্জন দিয়ে সহজ মানুষে সবকিছু সমর্পণ করা হয় দাসভাবে যা ‘লালন কয় তারে দাসী’- রূপে বিবৃত। উপরন্তু পরমসত্তার সঙ্গে সাধকের প্রেম-প্রীতি-লেনদেনের সার্বক্ষণিক হিসেবনিকেশ তখন ‘খাতায় লেখা’ হয়। (চলবে)

সরাইলের শাহজাদাপুরে সূফী সাধক শাহ্ জালাল’এঁর সফরসঙ্গী

সূফী সাধক শাহ্ রুকনউদ্দীন আনসারী’এঁর পূণ্যস্মৃতি এতিহ্য রক্ষার ডাক দিয়ে যায় 

(পর্ব - ৫)

শাহ্ ফুয়াদ ॥  সৈয়দ মুর্তাজা আলী লিখেছেন, ‘তখন বর্ষাকাল। ভাটি অঞ্চলের এই প্রবল বর্ষার সঙ্গে তুর্কী সৈন্যদের ইতিপূর্বে পরিচয় ঘটেনি। বর্ষার প্রকোপে সৈন্য শিবিরে নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ মনে করল হয়ত ভোজবাজির রাজা গৌরগোবিন্দের যাদুর প্রভাবেই এই ভীষণ বর্ষা নেমেছে। অনেকেই ভীত ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়ল। আক্রমণকারী সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ হল। সে সময় মুসলমানেরা কুসংস্কারবশত জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তী যুগে লিখিত ‘বাহারিস্তানে ঘাইবী’তে দেখা যায়, ইসলাম খাঁর প্রেরিত সৈন্যবাহিনীর অধিনায়করা যুদ্ধে যাত্রা করার পূর্বে শুভদিন গণনা করে রওয়ানা হতেন। যাহা হোক সিকন্দর গাজী বারবার বিফল মনোরথ হওয়ায় সুলতান শামসুদ্দীন জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হলেন। জ্যোতিষগণ বলল যে, কোনও দরবেশের অধিনায়কত্ব ব্যতীত গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করার সম্ভাবনা নাই এবং উক্ত দরবেশের যে বর্ণনা তারা দিল তা সৈয়দ নাসিরউদ্দীন সিপাহসালারের সঙ্গে হুবহু মিলে গেল।

সিকন্দর গাজী তখন শাহ্ জালাল ও তাঁহার সঙ্গীদের আধ্যাত্মিক বলে বলীয়ান হয়ে অভিযান করলেন এবং সৈয়দ নাসিরউদ্দীনকে এই সৈন্যবাহিনীর সিপাহসালার (সেনাপতি) করা হল।

ইতিমধ্যে শাহজালালের সঙ্গে তিনশত এগারজন দরবেশ অনুচররূপে যোগদান করেছেন। দরবেশ ও আওলিয়াদের শক্তিতে বলীয়ান এই বাহিনী বিনা বাধায় ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করে কুমিল্লায় আসে। কুমিল্লায় হযরত যেস্থানে অবস্থান করেন সেখানে একটি দরগা আছে। তৎপর শাহ্জালাল গৌড় গোবিন্দের রাজ্যের দক্ষিণ সীমাস্থিত নবীগঞ্জের নিকটস্থ চৌকি পরগণায় উপস্থিত হন। এখান থেকে হযরত শাহ্ জালাল ও তাঁর সঙ্গীয় দরবেশসহ সৈন্যবাহিনী বাহাদুরপুরের নিকট বরাক নদীর দক্ষিণ তীরে উপনীত হলেন; তদবধি ফতেপুরে এক মোকাম আছে। অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ ‘সরাইল যুগে যুগে’তে লিখেছেন, ‘ কুট্টাপাড়া গ্রামের মরহুম আব্দুল আউয়াল ভূঁইয়া আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি এক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিখিত একটি বই পাঠ করেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম রেলওয়েতে কর্তব্যরত থাকাকালে বইটি চট্টগ্রামে ফেলে এসেছিলেন। বইটিতে তিনি পাঠ করেছিলেন যে, সরাইলের এক সময়ে নাম ছিল সানতারা বা চাঁনতারা। আমার জন্মস্থান আঁখিতারা বা আগীতারা। কালীকচ্ছ গ্রামের পশ্চিমে আছে বিশুতারা। এই তারা (লাইটপোষ্ট) সম্পর্কিত গ্রামগুলোর পত্তনের ইতিহাস নিয়ে ভাবতে থাকি। বুঝতে বাধ্য হই যে, এই তারা সম্পর্কিত স্থানগুলোর পত্তনের ইতিহাস সিলেট বিজয়ের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে বিজড়িত। মেঘনা নদীর পশ্চিম তীরের আরো দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে আজো যে অস্তিত্ব নিয়ে আছে সোনারগাঁও সে এককালে বাংলার মুসলিম সুলতানদের আমলে ছিল রাজধানী। গৌড়ের পরেই সোনারগাঁও হয়েছিল রাজধানী। এখানেই ১৩০১-২ খ্রীস্টাব্দে/৭০৩ হিজরিতে সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের দরবারে গিয়ে ফরিয়াদ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দ রায়ের বিরুদ্ধে সিলেটের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলের অধিবাসী শেখ বোরহান উদ্দিন। শেখ বোরহানউদ্দিন পুত্রের আকীকা উপলক্ষে গরু জবেহ করেছিলেন। অপরাধে রাজা তার হাত কেটে দিয়েছিলেন ও তার পুত্রকে হত্যা করেছিলেন। সোনারগাঁওয়ের সুলতান তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর ভাগিনা সিকান্দার খান গাজীর নেতৃত্বে সোনারগাঁও থেকে সিলেটাভিযানে বাহিনী বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। প্রথম অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। সুলতান তাঁর ভাগিনেয়ের পরাজয়ের খবর শুনে সাতগাঁও-এর গভর্নর নাসিরউদ্দিনকে সিকান্দর খানের সাহচর্যে গমনের নির্দেশ দেন। এ সময়ই শেখ জালালউদ্দিন ইয়েমেনী (কুনিয়াভীও) ৩৬০ জন শিষ্যসহ সাতগাঁও অঞ্চলে মুশরিক ও বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে ইসলাম প্রচারের কাজে রত ছিলেন। সিলেটে মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা শুনে তিনি তাঁর ৩৬০ জন শিষ্য সমভ্যিহারে ত্রিবেনী নামক স্থানে সিকন্দর খানের সাথে যোগ দেন। এবারের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দ আসামের পার্বত্য অঞ্চলে পলায়ন করে। সিলেট মুসলমানদের দখলে গৌড়ের অঙ্গীভূত হয়।

সাতগাঁও, ত্রিবেনী, লাখনৌতি, সোনারগাঁও প্রভৃতি স্থান তদুপরি দিল্লীর মদদপুষ্ট বাহিনীর মিলিত সিলেট আক্রমণ স্থলপথে মেঘনার পূর্বতীরস্থ বর্তমান সরাইলের পানিশ্বর, টিঘর, সোহাগপুর, বাহাদুরপুর, দুর্গূাপুর, তাজপুর, খৈরালা, বিটঘর প্রভৃতি স্থানের উপর দিয়েই হয়েছিল। জলপথেও মেঘনার শাখা তিতাস ও তিতাসের শাখা লাহুর প্রভৃতি নদীসমূহের মধ্য দিয়েই হয়েছিল। এ সময় খুব সম্ভবত তিনটি স্থান-(১) সানতারা বা চাঁনতারা (২) আঁখিতারা বা আগীতারা (৩) বিশুতারা নামে আখ্যায়িত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই সময়কার মুসলিম বাহিনী প্রদত্ত কথাগুলোই গ্রামের নামরূপে থেকে যায়। (চলবে)

আমাদের ক্ষমতা পরখ করার চেষ্টা হলে কঠোর জবাব : মোদি

সংলাপ ॥ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, আমাদের ক্ষমতা কেউ পরখ করে দেখার চেষ্টা করলে তার কঠোর জবাব দেয়া হবে। ভারতের কাছে শক্তিও আছে এবং সঠিক জবাব দেয়ার জন্য রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিও রয়েছে। তিনি সম্প্রতি রাজস্থানের জয়সলমীরে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের দেওয়ালি উৎসবের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে ওই মন্তব্য করেন।

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি সারজিক্যাল স্ট্রাইক প্রসঙ্গে পাকিস্তানের নাম না করে  বলেন, ‘আজ ভারত সন্ত্রাসীদের ঘরে ঢুকে হত্যা করছে। আজ বিশ্ব এটা জানে, বুঝতে পারছে যে এই দেশ কোনওভাবেই নিজের স্বার্থ নিয়ে আপোস করবে না। ভারতের এই মর্যাদা ও শক্তি জওয়ানদের পরাক্রমের কারণে।’ অন্যদিকে, চীনের নাম না করে তিনি বলেন, ‘সমগ্র বিশ্ব এখন আগ্রাসনবাদী শক্তির কারণে সমস্যায় পড়েছে। আগ্রাসনবাদ এক ধরণের মানসিক ব্যাধি। ভারত অষ্টাদশ শতকের এই মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।

ভারতের রণনীতি স্পষ্ট, ভারত বোঝা এবং বোঝানোর নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু আমাদের  ক্ষমতা পরখ করে দেখার চেষ্টা করা হলে তার জবাবও তেমন কঠোর হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত বীর সৈনিকদের নিজেদের কর্তব্য পালন থেকে পৃথিবীর কোনও শক্তিই আটকাতে পারবে না বলে সাধারণ নাগরিকরা বিশ্বাস করেন। হিমালয়ের শীর্ষ থেকে মরুভূমির তপ্ত পরিবেশ কিংবা ঘন জঙ্গল থেকে গভীর সমুদ্র, সবক্ষেত্রেই আপনারা হার না মানা মনোভাব  নিয়ে প্রতিটি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেন। সেজন্য গোটা ভারত আপনাদের জন্য  গর্ব অনুভব করে।’

‘প্রত্যেক ভারতীয় সেনাদের শক্তি এবং সাহসিকতার জন্য গর্বিত। তারা আপনাদের অদম্যতা, আপনাদের অপরাজেয়তা নিয়ে গর্বিত’ বলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেনা জওয়ানদের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন।

জ্যোতি ভবনে হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ নিয়ে চতুর্থ পর্বের আলোচনা

‘আদবে আউলিয়া বে-আদবে শয়তান’

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) এর নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ বিষয়ে ৪র্থ পর্বের আলোচনা ২৯ কার্তিক ১৪২৭, ১৪ নভেম্বর ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনের আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ। আলোচনায় অংশ নেন  মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব শাহ্ মনোয়ারা সুলতানা,  (বাহাখাশ) এর সাংগঠনিক সচিব শাহ আকমল ইাম এবং হামিবা কম্পিউটার একাডেমির সভাপতি শেখ সালেহ আল দীন সঙ্গীত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা ব্যবস্থাপনা পর্ষদের  যুগ্মসচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু।

সালেহ আল সঙ্গীত বলেন, চিন্তাভাবনার বিষয়কে কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করাই আচরণ। আমার আচরণ অন্যের কাছে দৃশ্যমান, দুর্ভাগ্যক্রমে আমার কাছে নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনটি হয়। কাউকে ‘আপনার পরিচয় কি’- এ প্রশ্ন করা হলে স্বাভাবিকভাবে সে তার নাম, কোন্ ধর্মের, কোথায় থাকে এইভাবেই পরিচয় দেয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? নাম বাবা-মায়ের দেয়া, ধর্মের পরিচয়ও শেখানো। তাহলে নিজের পরিচয় কী হওয়া উচিত? অব্যশই ‘আমি মানুষ’। এটাই আমার প্রথম এবং প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত। আগে নিজের পরিচয় সনাক্ত করতে হবে, তারপর না আচরণ! যেহেতু আমি একজন মানবসন্তান, মনুষ্যত্ববোধ হওয়া উচিত মূল।লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রত্যেক পশু পাখি নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আচরণ করে। কেউ কারোরটা নকল করে না। এই নিজস্বতা এবং অনন্যতা তাদেরকে আলাদা করে রাখে। কিন্তু আমাদের চারদিকে তাকালে দেখা যায় – বিশৃঙ্খলা, হিংসা, বিবাদ, হত্যা ইত্যাদি অমানবিক কার্যক্রম। কোথায় মনুষ্যত্ব? আজকাল হিংস্র পশুরাও আমাদের দেখে হিংসা করে। আমরা মানুষ একমাত্র জাতি যারা নিজেরা নিজেদের হত্যা করে, তাও বুদ্ধি খরচ করে। তাই আচরণের পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে? কার মতন? সবার কি সুযোগ হয় পরিবর্তনের? পরিবর্তনের জন্য গুরু/মুর্শিদ/পথ-প্রদর্শক প্রয়োজন, তা ছাড়া সম্ভব না। শিশুদের আচরণ, চিন্তা ও কর্মের মধ্যে রয়েছে সরলতা। তাদের আচরণে পরিবর্তন কখন আসে? যখন তাদের একটু একটু করে বুঝ আসে। তারা নিজেদের মত বুঝলে সমস্যা ছিল না। আমরা শিশুদের চিন্তার মধ্যে নানা বিষয় অনুপ্রবেশ করিয়ে দেই। পর্যায়ক্রমে তারা চিন্তার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। আমাদের প্রতিটি মূহুর্তে রয়েছে সিদ্ধান্তের বিষয়টি। আরেকভাবে সিদ্ধান্ত হচ্ছে নির্বাচন করা সেই পথটি যা ওই সমময়ে তার জন্য সঠিক। তাই শিশু অবস্থায় তাদের আচরণ নির্বাচনের ক্ষমতা তৈরি করে দিলে তাদের লক্ষ্য স্থির এবং অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। সত্যমানুষের সংষ্পর্শে এসে দেখেছি, কখনও আচরণে তিনি বাবার ভূমিকায়, কখনও বন্ধুর মত যাকে সব কথা বলা যায় নির্দির্¦ধায়। ওনার কথা মেনে চলে কোনো দিন ভাল ছাড়া মন্দ কিছু হয়নি। তিনি পথ প্রদর্শকরূপে সামনে আছেন। পথচ্যুত হলে তিনি অভিভাবক হয়ে পথে ফিরিয়ে আনেন।   একজন সত্যমানুষের আচরণ অনন্য। কোটি মানুষের ভীড়েও তিনি অন্যতম। মানবতার ধারা তাঁরাই প্রবাহমান রেখেছেন। আচরণের মধ্য দিয়ে সত্যমানুষের ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। যারা হাক্কানী পরিবারের সদস্য, সবাই কিছুটা হলেও সাধকের সংষ্পর্শে এসেছি। আমাদের সবার মধ্যেই তাঁর আচরণের ছাপ কিছু না কিছু আছে। কর্ম ও চিন্তায় সত্যমানুষকে অনুস্মরণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের আচরণকে পরিবর্তন করতে হবে।

শাহ্ আকমল ইমাম বলেন, সাধককুল হতে ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি এভাবে- ‘বে-আদবে বে-নসিব, আদবে-নসিব, বে-আদবে শয়তান, আদবে আউলিয়া।’ শিশু জন্মের পর প্রথম শব্দ কান্না-চিৎকার, হাত-পা নাড়া-চাড়াসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে ধরাধামে চলতে থাকে তার প্রকৃতির রূপ-রহস্য ভেদ উন্মোচন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে, কৈশোর পর্যন্ত প্রকৃতির রূপের ধারায় মা-বাবা প্রতিবেশিসহ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সকল চাহিদা মিটিয়ে নেয়। কৈশোরের রূপ রহস্যের ধারা মাতৃকুল-পিতৃকুলের আচরণ, স্বভাব, ধর্মাচরণ দেখতে দেখতে, শুনতে একটি শিশু শিক্ষানবীশ হতে থাকে। আশপাশের সকলের কাছ থেকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও অভ্যাস জব্দ করতে থাকে। কিন্তু অনুকরণ ও অনুসরণ উপলব্ধি করার মতো জ্ঞান-বুদ্ধি তার হয় না। কৈশোর পেরিয়ে যৌবন এবং তারপর বয়স বাড়ার সাথে সাথে, ধাপে ধাপে তার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে সময়োপযোগী শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষা, কর্ম-মানবতা-শান্তির লক্ষ্যে এই শিক্ষা তাকে কে দেবে? কীভাবে সে শিখবে সদাচরণ? এই শিক্ষার জন্যই প্রয়োজন হয় গুরু-মুর্শিদ-পথ প্রদর্শক। বর্তমানে আমাদের প্রচলিত যে শিক্ষাব্যবস্থা সেখান থেকে একজন মানুষ সেই কাঙ্খিত শিক্ষা কতটুকু পেতে পারে বা এখন পাচ্ছে? সত্যমানুষ তথা গুরু-মুর্শিদের আচরণ থেকেই একজন মানুষ সমাজে সুস্থ ও শান্তিপূর্ণভাবে চলার শিক্ষা পেতে পারে। সত্যমানুষ/ সূফী সাধকগণ সেই আচরণ শেখানোর জন্য বিভিন্নমুখী পরিবেশ তৈরি করে থাকেন। মানুষের কুপ্রবৃত্তিসমূহ ব্যক্তিজীবনে অশান্তি, পরিবার ও সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মূল কারণ। সমাজকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মোটিভেশনাল কার্যক্রম গ্রহণ সেজন্যই দরকার। হাক্কানী চিন্তন বৈঠক এই ধরনের কার্যক্রমেরই এক বলিষ্ঠ উদাহরণ। সাধককুলের সংস্পর্শে এসে মানুষ বিশেষ করে শিশু-কিশোররা সুন্দর আচরণ শিখতে পারে। সূফী সাধক শামস তাবরিজের প্রেমের দীক্ষায় পরিবর্তন এসেছিল মওলানা রুমীর জীবনে। আচরণ সম্পর্কে তিন সাধকের বাণী- সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন-‘ত্রুটিপুর্ণ আচার-আচরণ বর্জন করে ভদ্র আচরণ করতে হবে’, সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘তুমি যতই তোমার প্রতিটি কর্মের বিশ্লেষণ করবে ততই তোমার আত্মিক উন্নতি হবে।’ সূফী সাধক কামরুল হক বলেন, ‘তুমি তাহাই পাইবে,যাহা তুমি করিবে।’

শাহ্ ,মনোয়ারা সুলতানা বলেন,  মানুষের আচরণ হচ্ছে অভ্যাসের সমস্টি। বাংলায় আচরণ, ভব্যতা, সদাচার ও শিস্টাচার। ইংরেজিতে বলে এটিকেট, ম্যানারস, বিহেভিয়ার্স। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেছেন, ‘মিত্রতা স্থাপন সদাচারের একটা বড় অংশ। মিত্রতা স্থাপন সদাচারের একটা বড় অংশ।’ মিত্রদের সম্মান ও যতœ করা অবশ্য কর্তব্য। সদাচারভ্রস্ট হলেই একেবারে নস্ট হতে হতে হয়। ’ সুতরাং আচরণ মানবজীবনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে আছে, ১.‘কথাবার্তায় কর্কশ হবেন না’ (৩:১৫৯), ২. অন্যের সাথে ভালো ব্যবহার করুন (৪:৩৪), ৩. ‘অহংকার করবেন না’ (৭;১৩), ৪.‘উচ্চ স্বরে কথা বলবেন না’ (৩১:১৯), ৫.‘রাগকে নিয়ন্ত্রণ করুন’ (৩:১৩৪), ৬. ‘পিতামাতার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করুন’ (১৭:২৩)। সুতরাং, আচরণ গুণের সমস্টি। এর বিপরীতে আচরণ নেতিবাচক হয়ে যায়। আশাবাদী, নৈরাশ্যবাদী, বিশ্বাসী ও ঈর্ষাপরায়ণ-এই চার শ্রেণীর মানুষের আচরণও চার রকমের হবে-এটাই স্বাভাবিক। মানুষ আচরণ শেখে পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠানও গুরুর কাছ থেকে। মানুষ তার নিজ আচরণে নিজের স্বভাবের পরিচয় তুলে ধরে। আচরণের মাধ্যমে মানুষ বা প্রাণী নিজেকে প্রকাশ করে এবং আচরণের মাধ্যমেই মানুষের মহত্ব ও ব্যক্তিত্ব বিকশিত হয়।  উপকারীর উপকার স্বীকার করে, কৃতজ্ঞ হয়ে ধন্যবাদ বলা, সবাইকে সমানভাবে দেখার চেষ্টা করা, নিজের ভুল স্বীকার বা অনুধাবনের মাধ্যমে মানুষ তার আচরণের উন্নতি ঘটাতে পারে। নিজের গুরু-মুর্শিদ-পথ প্রদর্শকের নির্দেশনা মেনে চলার মধ্য দিয়ে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি মেলে।

সভাপতির বক্তব্যে শাহ শেখ মজলিশ ফুয়াদ বলেন, আচরণ থেকে সদাচরণ মানুষকে জীবন চলার পথে শান্তি ও কল্যাণ এনে দেয় এবং এই গুণটি একান্তই ব্যক্তিগতভাবে অর্জনের বিষয়। সূফী সাধকগণের দরবার ও আস্তান সু-আচরণ শেখার বিরাট পাঠশালা এবং সাধকগণের কৃপায় এখানে আগতদের সবাই সু-আচরণের শিক্ষা পেয়ে থাকে। ব্যক্তি জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগের মধ্যেই নিহিত সকল কৃতিত্ব ।

সরাইলের শাহজাদাপুরে সূফী সাধক শাহ্ জালালের সফরসঙ্গী

সূফী সাধক শাহ্ রুকনউদ্দীন আনসারী’এঁর
পূণ্যস্মৃতি এতিহ্য রক্ষার ডাক দিয়ে যায়

 (পর্ব - ৪)

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুর্তাজা আলী আরও লিখেছেন, ‘সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের বংশে দ্বিতীয় নাসিরউদ্দীন একজন বিখ্যাত দরবেশ ছিলেন। এই বংশে বিখ্যাত শাহ্ ওলী শাহ্ দাউদের জন্ম হয়। তাঁর চিল্লাহ্ খানাই দাউদ নগরের দরগাহ। এই দরগাহে শাহ্ দাউদের ব্যবহৃত তক্তপোষ সংরক্ষিত আছে। ঐ দরগাহের সংলগ্ন পুষ্করিণীতে অসংখ্য গজার মাছ সর্বদা ভেসে বেড়ায়। শাহ্ দাউদ তরফ থেকে তাঁর নামীয় দাউদপুর পরগণা খারিজ করেন। ফতেহ গাজী শাহাজী বাজার রেলস্টেশনের নিকটে রঘুনন্দন পাহাড়ে ফতেহ্পুর মৌজায় অবস্থান করতেন; ঐ স্থানে তাঁর চিল্লাখানা এখনও প্রদর্শিত হয়। এই পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর ভাগ্নে মাহমুদ গাজী ও মসউদ গাজীর কবর আছে; এখানে বৎসরে একবার মেলা বসে। এই দরগাহের ব্যয় নির্বাহের জন্য মোঘল বাদশাহের সময় থেকে একটি গ্রাম লাখেরাজ আছে। সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের বংশে সৈয়দ সালেহ বা সুলেমান শাহ্ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাজার রঘুনন্দন পাহাড়ের পার্শ্বে রেললাইনের ধারে অবস্থিত। উহা সুলেমান শাহের দরগাহ নামে পরিচিত (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-৩২-৩৩)।

সৈয়দ বদরুদ্দীন ওরফে শাহ্ বদর: তিনি সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে তরফ জয় করতে গিয়েছিলেন। তরফ বিজয়ের পরে তিনি বদরপুরে অবস্থান করেন। বদরপুর রেলস্টেশনের নিকটে তাঁর মাজার অবস্থিত। তাঁর নামানুসারে ঐ স্থানের নাম বদরপুর হয়েছে। এক সময় বদরপুরের নিকটবর্তী বরাক নদীর বাঁকে নৌকা চলাচল বিশেষ দূরূহ ছিল। ঐ বাঁকে নৌকা নিয়ে যাবার সময় মাঝিরা পীর বদরের নামে শিরনী দিয়ে যেত। সম্ভবত এই শাহ্ বদরই চট্টগ্রামের বিখ্যাত বদর পীর। চট্টগ্রামের ইতিহাসে জানা যায় যে, চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম বিজেতা কদল খান গাজীর সঙ্গে বদর পীরের দেখা হয়েছিল। ঐ ঘটনা বাংলার সুলতান ফখরউদ্দীন মোবারক শাহের সময়ে ১৩৩৮ খ্রীস্টাব্দে ঘটে। বদরপুরের শাহ্ বদরের ঐ সময়ে জীবিত থাকার সম্ভাবনা আছে, কারণ তিনি শাহজালালের সমসাময়িক। নৌকার মাঝিমাল্লারা বিপদে পড়লে সর্বদাই বদরপীরের স্মরণ করেন’ (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা:২৮)। 

‘সরাইল’এর নামকরণ নিয়ে অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ ১৯৯৫ সালে ঢাকাস্থ সরাইল থানা সমিতির প্রকাশিত ‘সরাইল যুগে যুগে’ গ্রন্থে লিখেন-‘দেশ ও দেশবহির্ভূত প্রথিতযশা ইতিহাসবেত্তাদের মূল্যবান বই-পুস্তকাদি অধ্যয়ন, আর সুদীর্ঘ ৫০ বৎসর যাবৎ মেঘনা-তিতাস-লাহুর নদীর বাঁকে বাঁকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার উন্নয়নমূলক সৃষ্টিধর্মী কর্মকা-ে অবস্থান করে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও গবেষণাধর্মী কার্যকলাপের সাথে পঠিত ও অধীত বিদ্যার নির্যাসের সমন্বয়ে একটি সত্যে উপনীত হয়েছি-৭শ’ বছর পূর্বে সরাইলের অন্য নাম ছিল। আমার বক্তব্যের পেছনে যে যুক্তিগুলো দেবো তা বলার আগে সবিনয়ে আরজ করছি যে, এ যুক্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবেত্তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্তর দশকের উপাচার্য ডঃ আব্দুল করিম সাহেব-এর দ্বারস্থ হয়েছিলাম। তিনি আমাকে এ নিয়ে সন্দর্ভ লিখতে বলেছিলেন। কেননা, বাংলার ইতিহাসের এ অংশটা তখন (এখন) পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।

সরাইলকে সর্বপ্রথম ভৌগলিকভাবে চিহ্নিত করি। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎসারিত হয়ে ইতিহাসের বিখ্যাত নদী গঙ্গা প্রবাহপথে পললে পললে গড়ে তুলেছে বদ্বীপ সদৃশ জনপদ ‘বঙ্গ’। এই বঙ্গ বা বাংলাদেশের পূর্ব দক্ষিণে বর্তমান মেঘনা নদীর পূর্ব তীর ও ত্রিপুরা পার্বত্যাঞ্চলের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি সরাইল। ভাটি নামে এটি অভিহিত হয়ে আসছে। আমার ধারণা ভাটি অঞ্চলের রাজধানী সরাইলের কোথাও না কোথাও ছিল। আমরা এর নামকরণের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে এগিয়ে গেলে তার ইতিহাস অনেকটা উন্মোচিত হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

সরাইল থানার কালীকচ্ছ গ্রামটির অস্তিত্ব প্রাচীনকালের ‘কালীদহ’ সাগরের অস্তিত্বের সত্যতাজ্ঞাপক। তবে এ কালীদহ সাগরের সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস অর্থাৎ চর ঠেকাতে চাষাবাদের সময় আইল বা বাঁধ বাধা হতো বলে সরাইল নামকরণের যুক্তিটা বেমানান লাগে। সর+আইল=সরাইল হয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপের সর্বত্রই এমন নামকরণ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ‘ইতিহাস কথা কয়’ নামক পুস্তকে বড় দেওয়ান পাড়ার ফরিদ উদ্দীন ঠাকুর অবশ্য এ মতই পোষণ করেন। 

সরাইলের নামকরণ নিয়ে আকৈশোর অনুসন্ধিৎসু ছিলাম। আমার পিতা পীরজাদা শেখ মাসিহুজ্জামান আমাকে সিলেট বিজয়ের কাহিনী বলতেন। বলতেন এ অঞ্চলে আমাদের বংশের আগমনের কথা। পিতার মুখের কথা ও আমার অধীত পঠিত বিদ্যার সমন্বয়ে বুঝতে থাকি যে, মুসলমানদের সিলেট বিজয়ের পরবর্তী একটি রাষ্ট্রবিপ্লবের সাথে ‘সরাইল’ নামকরণ জড়িত। যে স্থানের বর্তমান নাম সরাইল এ স্থানটির ওপর দিয়ে সিলেটে বিজয়াভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তবে তখন স্থানটির অন্য নাম ছিল।’ অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদের এ দাবির সাথে সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘হযরত শাহজালাল ও সিলেটের ইতিহাস ’ গ্রন্থে বর্ণিত বিবরণীর মিল পাওয়া যায়। (চলবে)

প্রবাহ

রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা যার কঠিনই ছিল!

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

শুরুটা কঠিনই হয়েছিল জো বাইডেনের জন্য। ফেব্রুয়ারির শীতে আইওয়া ককাসের ভোটের ফলাফল দেখে মুষড়ে পড়েছিলেন। ২০২০-র প্রেসিডেন্ট পদে তার প্রার্থী হবার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা তা নিয়েই বড় রকম সংশয় দেখা দিয়েছিল।

এক কথায়, গত ফেব্রুয়ারিতেও তিনি ছিলেন হোয়াইট হাউসের দৌড়ে একজন পরাজিত ব্যক্তি। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে হোয়াইট হাউসে যাবার যে স্বপ্ন জো বাইডেন বহুদিন থেকে লালন করে আসছেন, তা পূরণ হবার জন্য এটাই ছিল সম্ভবত তার শেষ চেষ্টা।

প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দলের পূর্ব-বাছাই প্রক্রিয়া – যাকে বলা হয় প্রাইমারি নির্বাচন – তার শুরুর পর্যায়ে প্রচারণার সময় মি.বাইডেনকে এবার দেখা গেছে আবেগপূর্ণ কথাবার্তা বলতে। তিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে তার ছেলের মৃত্যুর কথা বলেছেন, বলেছেন তার ছেলেবেলার কথা, অভাব অনটনের পরিবারে তার বেড়ে ওঠার কথা। তবে জনগণকে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন: “সবসময়ই আশা আছে।” এটাই তার বিশ্বাস। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাইমারিতে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও তাকে রীতিমত বেগ পেতে হয়েছে। তবে তার ব্যক্তিসত্ত্বার পরিচয় উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রচারণা সভায় তার আবেগপূর্ণ আবেদন থেকে। তার মনমানসিকতা, তার রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিগত ও পেশাগত ক্ষেত্রে মানসিক আঘাতের জায়গাগুলো এবং যেসব রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে তার একটা ছবি পরিষ্কার হয়েছে এসব প্রচারণায়।

২০২০র প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর দৌড়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের উত্থান পতনের আবেগময় মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছেন মি. বাইডেন “আমি ভাগ্য মানি – ভাগ্যের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস,” মি. বাইডেন ১৯৮৯ সালে বলেছিলেন ন্যাশানাল জার্নাল নামে সরকারের একটি উপদেষ্টা সংস্থাকে। “আমার ব্যক্তিগত জীবন কখনই আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি যেটা চেয়েছি, সেটা কীভাবে যেন হয়ে গেছে- একটা অদৃশ্য হাত সেটা ঘটিয়ে দিয়েছে।”

ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনদের অকালমৃত্যুর অভিজ্ঞতা হয়েছে মি. বাইডেনের জীবনে একাধিকবার। রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা অর্জনে উপরে ওঠার সিঁড়ি যখন তিনি তৈরি করেছেন, সেগুলো ভেঙে পড়েছে। আবার তাকে নতুন করে সেগুলো গড়তে হয়েছে। বাকপটু হবার জন্য তাকে অনেক খাটতে হয়েছে। কারণ উল্টোপাল্টা ও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহারের যে প্রবণতা একসময় তার ছিল, তার জন্য তাকে অনেক ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছে। জো বাইডেন প্রায়ই একটা কথা বলেন, “বাবার একটা কথা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা – কে তোমাকে কতবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, সেটা বড় কথা নয়, কত দ্রুত তুমি উঠে দাঁড়াতে পারলে, মানুষ হিসাবে সেটাই হবে তোমার সাফল্যের পরিচয়।”

প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াইয়ে হেরে গিয়েও লড়ে গেছেন মি. বাইডেন। প্রতিটা পরাজয়ের পর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সিনেটার বব কেরি, ১৯৯০এর দশকে কংগ্রেসে মি. বাইডেনের সহকর্মী বলেছেন, “জো কখনও হাল ছাড়ে না। দরকার না হলেও তার কাজ সে করেই যায়।”

অনেকের মতে মি. বাইডেন অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়েটিকে থাকা একজন ব্যক্তি।

ডিসেম্বর ১৮, ১৯৭২ – মি. বাইডেন ছিলেন ওয়াশিংটনে। টেলিফোন বাজল, তার ভাই জিমি বাইডেন ডেলাওয়ার থেকে ফোন করেছেন। বোন ভ্যালেরির সাথে কথা বলতে চাইলেন।

বোন বললেন, ‘একটা ছোট দুরর্ঘ ঘটেছে। কিন্তু চিন্তা করার কিছু নেই।’

সেদিনই আরও পরের দিকে মি. বাইডেন জেনেছিলেন ওই দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী নেইলিয়া এবং শিশুসন্তান নেওমি মারা গেছেন। তার স্ত্রী গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একটা লরি গাড়িতে ধাক্কা মারে। গাড়িতে থাকা তার দুই ছেলে বোও আর হান্টারও গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।

তারা ক্রিসমাস উৎসবের জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনতে গিয়েছিলেন। মি. বাইডেন তখন সবে সেনেটার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার কংগ্রেস অফিসের কর্মী নিয়োগের জন্য সেদিন ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত ছিলেন। এছাড়াও পরিবারের থাকার জন্য একটা বাসা কেনার বিষয়টি সেদিন তিনি চূড়ান্ত করতে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তিনি একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। ‘আমি কথা বলতে পারতাম না, বুকের ভেতরে একটা বিশাল শূণ্যতা অনুভব করতাম, মনে হতো একটা কালো গহ্বর আমাকে ভেতরে টেনে নিচ্ছে,’ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন মি. বাইডেন। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবার কথা ভেবেছিলেন, ঠিক করেছিলেন যাজক হবেন, দুই ছেলেকে মানুষ করবেন। তিনি লিখেছেন, যেসব এলাকায় খুব গুন্ডামি হতো, সেসব এলাকায় তিনি সন্ধ্যেবেলা ঘুরে বেড়াতেন। মারপিট করতে তার ইচ্ছা হতো। ‘আমার ভেতরে একটা বিরাট ক্রোধ তৈরি হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর আমার সাথে একটা নিষ্ঠুর খেলা খেলছেন। আমার রাগ হতো।’ জো বাইডেনের রাজনৈতিক জীবনে ৩০ বছরের জন্মদিন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর না হলে সেনেটারের দায়িত্ব পালন সাংবিধানিক নিয়ম বহির্ভূত। ৩০ বছরের জন্মদিনের পার্টিতে স্ত্রী ও দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে কেক কাটছেন মি. বাইডেন। জো বাইডেনের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। মি. বাইডেনের জন্মের আগে তিনি ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু জো-র জন্মের পর তার ব্যবসা পড়ে যায়। জো বাইডেনের কৈশোর কেটেছে পারিবারিক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে। পেনসিলভেনিয়ায় খুবই সাদামাটা এক বাসায় যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। তার পরিবার ছিল খুব ধার্মিক। ক্যাথলিক মূল্যবোধ ও তার ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল পারিবারিক ধর্মচর্চ্চার সুবাদে। ছেলেবেলায় তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তোতলামি কাটিয়ে ওঠা। স্কুলের উঁচু ক্লাস পর্যন্ত এই সমস্যা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পড়তে গিয়ে তার তোতলামির জন্য সহপাঠীরা তো বটেই, এমনকী শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করতেন। “এখনও আমার মনে আছে সেই যন্ত্রণার কথা, লজ্জা রাগ আর অপমানের দিনগুলোর কথা,” মি. বাইডেন লিখেছেন তার স্মৃতিকথায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে কবিতা আবৃত্তি ও সংযতভাবে কথা বলা আয়ত্ত করতে করতে, হাই স্কুল পার হবার পর তোতলামো কাটিয়ে ওঠেন তিনি। হাই স্কুল শেষ করে তিনি পড়তে যান ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে।

কলেজেই পরিচয় হয়েছিল নেইলিয়া হান্টারের সাথে। লেখাপড়া শেষে ফিরে যান ডেলাওয়ারের উইলমিংটন শহরে। বিয়ে করেন নেইলিয়াকে। উইলমিংটনেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। একটি বড় আইনী প্রতিষ্ঠানে তিনি আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাশালীদের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষের হয়ে বিবাদী পক্ষে আইন লড়ার কাজ নেন তিনি। নগর পরিষদের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জেতার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় রাজনীতিতে তার পথচলা। এরপর আসে সিনেটে তার বিজয় ১৯৭২ সলে। অনেকদিন ওই আসনে থাকা রিপাবলিকান সিনেটারকে হারিয়ে তিনি সবার দৃষ্টি কাড়েন। রাজনৈতিক জীবনে জো বাইডেন তখন সফল তরুণ। মাত্র ৩০ বছর বয়সে দুই মেয়াদে সিনেটার থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি সিনেটে আসন জয় করেছেন। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের যেখানে ভরাডুবি হয়েছে, সেখানে তার এই অভাবনীয় জয়ের পর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি তখন হয়ে উঠেছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের সম্ভাবনাময় তরুণ।

তিনি বড় ছেলে বো বাইডেনকে হারান ২০১৫ সালে। বো মারা যান মস্তিষ্কের ক্যান্সারে। বাবার মত তিনিও রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ডেলাওয়ারের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে কাজ করতেন।

দু’হাজার সতের সালে লেখা তার আত্মজীবনীতে মি. বাইডেন তার ছেলের অসুস্থতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ২০১৬-র নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর লড়াইয়ে নামার ইচ্ছা ঘোষণার তোড়জোড় যখন তিনি নিচ্ছেন ২০১৫ তে, তখন তার ছেলের অকালমৃত্যু আবার তাকে বিধ্বস্ত করে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান। “মানসিকভাবে যথেষ্ট উৎসাহ পাবো কিনা আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি শোক এমন একটা মানসিক চাপ, যা কোন সময়সূচি বা কাজের সময়। য়ের তোয়াক্কা করে না,” তিনি লিখেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে শোক ও আঘাতের পাশাপাশি তিনি তার রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ জো বাইডেন ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবার লড়াই থেকে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। পাশে স্ত্রী জিল বাইডেন। এক ঝাঁক সাংবাদিকের সামনে ১৯৮৭ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর জো বাইডেনকে ঘোষণা করতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবার দৌড় থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। মাত্র তিন মাস আগে তিনি প্রার্থিতার লড়াইয়ে নেমেছিলেন।

‘এর জন্য দায়ী আমি নিজে। নিজের ওপর রাগ আর হতাশায় ভুগছি। আমেরিকার মানুষকে আমি কীভাবে বোঝাবো এটাই জো বাইডেনের আসল পরিচয় নয়। এটা শুধু আমার মস্ত একটা ভুল,” লিখেছেন মি. বাইডেন।

সেটা ছিল ১৯৮৮র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য লড়াই। মি. বাইডেনের প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার উদ্যোগ লজ্জাজনক ঘটনার কারণে হোঁচট খায়। তার বিরুদ্ধে অন্যের লেখা চুরির ও অসততার অভিযোগ আনা হলে তিনি প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

আইওয়ায় এক বিতর্কসভায় সমাপনী বিবৃতিতে মি. বাইডেন যে কথাগুলো বলেছিলেন তা ছিল ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা নিল কিনকের একটি ভাষণের প্রতিটি শব্দের হুবহু উচ্চারণ। মি. কিনক তার শ্রমিক পরিবারে বড় হেয়ে ওঠা নিয়ে। তার ভাষণে যা বলেছিলেন তা প্রায় হুবহু আওড়ে যান মি. বাইডেন। এর আগের এক ভাষণে একই বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি মি. কিনকের নাম উল্লেখ করলেও আইওয়ার সভায় সে কথা বলেননি। তারই এক ডেমোক্র্যাট প্রতিপক্ষ বিষয়টি সামনে আনেন। এই অভিযোগের সূত্র ধরে সামনে আনা হয় তার ছাত্র জীবনের একটি ঘটনা, যখন তিনি আইনের ছাত্র হিসাবে তার সাইটেশন পেপারে আরেকজনের লেখা হুবহু ব্যবহার করেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন সেটা যে নিয়ম বহির্ভূত তা তিনি জানতেন না। এই ঘটনা মি. বাইডেনের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড় রকমের ধাক্কা খায়। পরে তার এক জীবনীকারকে মি. বাইডেন বলেছিলেন, ওই ঘটনা তাকে “কুরে কুরে খেয়েছে। নিজেকে আমি চিরকাল একজন সৎ মানুষ হিসাবে মনে করেছি। সেই জায়গাটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে।” তার স্ত্রী ও শিশু কন্যার মৃত্যুর পর মি. বাইডেন তার জীবনে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেন। তার দুই ছেলেকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ঘরে অনেক সময় দেন। প্রথম ১৪ বছর তিনি ডেলাওয়্যার থেকে ওয়াশিংটন দৈনন্দিন যাতায়াত করতেন।

পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন জিল জেকবস নামে এক স্কুল শিক্ষয়িত্রীকে। তাদের একটি ছেলে হয়- অ্যাশলি। মি. বাইডেন সিনেটের বিচার কমিটিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজেকে আরও তুলে ধরতে শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হবার জন্য তার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পেছনে ওই লেখাচুরির কলঙ্ক তাকে অনেকদিন তাড়া করে বেড়িয়েছে। তবে ১৯৮৮ সালের ওই নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবার ঘটনা অনেকে বলেন তার জন্য শাপে বর হয়েছিল। লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক মাসের মাথায় নিউ ইয়র্কে এক হোটেল ঘরে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন জো বাইডেন। মস্তিষ্কের রক্তনালী ফুলে ওঠার এক সম্ভাব্য প্রাণঘাতী অসুখে তিনি আক্রান্ত হন। এর পরের ছয় মাস তাকে বহুবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বিশ বছর পর আবার নতুন করে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার লড়াইয়ে নেমেছিলেন মি. বাইডেন ২০০৮এর নির্বাচনের জন্য। তখন তিনি রাজনীতিতে আর নতুন মুখ নন, তিনি একজন প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি বলেন ১৯৮৭ সালে তার প্রচারণা ছিল বড় বড় বুলি আর ছবিতে ভরা। বিশ বছর পর তিনি তার প্রচারণার ভাষা বদলে ফেলেন। “গত বিশ বছর আমার জীবনযাত্রা দেখে আপনাদের নিশ্চয়ই বিশ্বাস জন্মেছে যে আমি একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ,” ২০০৮। য়ে আইওয়ার প্রচারণা সমাবেশে তিনি একথা বলেন। “আর সে কারণেই আবার এই পদে প্রার্থী হবার লড়াইয়ে আমি ফিরে এসেছি।”

তবে সেই লড়াইয়ে তিনি সফল হননি। বারাক ওবামা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পান প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার জন্য। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বারাক ওবামা তার ভাইস প্রেসিডেন্ট রানিং মেট হিসাবে বেছে নেন জো বাইডেনকে।

‘তারা দুজনে খুবই আলাদা প্রকৃতির মানুষ, বলেছেন সাংবাদিক ও ভাইস-প্রেসিডেন্সি বইয়ের লেখিকা কেট অ্যান্ডারসন ব্রাওয়ার। ‘ওবামা খুব সতর্কতার সাথে কথা বলেন, খুব ভাবনা চিন্তা করে মন্তব্য করেন। কিন্তু বাইডেন একেবারে উল্টো। না ভেবেই হুটহাট কথা বলা তার স্বভাব, যে কারণে অনেকবার তাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। বাইডেন ওবামাকে বলেছিলেন, তিনি বদলাবেন না ‘আমি যেমন আমি তেমনই থাকব’, বলেছেন কেট অ্যান্ডারসন ব্রাওয়ার। ওই নির্বাচনে মি.বাইডেনের একজন প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসন বলেন, ডেমাক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন পর্বের প্রচারণার সময় ওবামা আর বাইডেনের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। “ওবামা তার প্রশাসনে পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে একজন ঝানু রাজনীতিককে চাইছিলেন,” তিনি বলেন। ইলিনয়ের জন সমাবেশে মি. বাইডেনকে তার রানিং মেট ঘোষণা করে মি. ওবামা বলেছিলেন, “জো বাইডেন একজন বিরল মানুষ- কয়েক দশক ধরে তিনি ওয়াশিংটনে নানা পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ওয়াশিংটন তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। আমি মনে করি আমার পার্টনার হিসাবে, দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত।” মি. বাইডেন পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক আমেরিকান সিনেট কমিটিতে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন।

সিনেটের এই কমিটির সভাপতি হিসাবে ২০১২ সালের অক্টোবরে আমেরিকার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের ইরাক যুদ্ধে যাবার বিষয়টিকে অনুমোদন দেবার সিদ্ধান্ত ছিল তার ওপর। এর ১১ বছর আগে উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশকে সাদ্দাম হুসেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুমোদনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন মি. বাইডেন। “কুয়েতের মুক্তির জন্য আমেরিকানদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার আগে আমাদের উচিত দেখা কোনরকম বিকল্প পথ আমরা চেষ্টা করেছি কিনা, “সিনেট কমিটির শুনানিতে বলেছিলেন মি. বাইডেন। “আমরা করিনি।” ১৯৯০এ উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ সৌদি আরবে আমেরিকান নৌ সেনাদের সাথে মি. বাইডেনের হুঁশিয়ারি স্বত্ত্বেও উপসাগরীয় যুদ্ধের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ওই যুদ্ধে আমেরিকান মারা যায় অল্প সংখ্যক। এরপর থেকে বাইডেনকে পররাষ্ট্র ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে দুর্বলচিত্ত বলে তুলে ধরা শুরু হয়। ওই ভোট নিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হবার পরবর্তী কয়েক বছর মি. বাইডেন আন্তর্জাতিক বিষয়ে কট্টর অবস্থান দেখাতে শুরু করেন, যেমন বলকান গৃহযুদ্ধে আমেরিকান অবস্থান, ইরাকে বোমা হামলা এবং আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েমের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরাকের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই অভিযোগে যখন ইরাকে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তাব করেন, তখন মি. বাইডেন তাতে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন।

“আমি মনে করি না এটা যুদ্ধ করার জন্য একটা হুজুগ, আমার বিশ্বাস এটা শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে অভিযান,” তিনি বলেন। বাইডেনের ইরাক যুদ্ধে সমর্থন নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা মার্ক ওয়েসব্রট বলেছেন, “যেসব ডেমোক্র্যাট এই যুদ্ধ সমর্থন করেছিলেন, তাদের মনে হয়েছিল এই যুদ্ধ সমর্থন না করার ঝুঁকিটা হল, যুদ্ধটা যদি সফল হয়ে যায়, তাহলে তার থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ক্ষেত্রে তারা পেছিয়ে পড়বেন। “তবে তার ওই সমর্থনের কারণে অনেক ডেমোক্র্যাট সমর্থকের সমালোচনার মুখে তিনি পড়েন।

তার আত্মকথায় ২০০৭ সালে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে অধ্যায়ের শিরোনাম তিনি দেন – ‘আমার ভুল’। তিনি লেখেন: ‘তাদের আন্তিরকতা ও দক্ষতা আমি বুঝতে ভুল করেছিলাম।’

২০০৩এর এপ্রিলে আমেরিকান নৌ সেনারা বাগদাদে সাদ্দাম হুসেনের মূর্তি টেনে নামায় ইরাক যুদ্ধের পর তিনি বামপন্থার দিকে ঝোঁকেন। তিনি ইরাকে আমেরিকান সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধির বিরোধিতা করেন এবং সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী জোরদার করার এবং ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিপক্ষে পরামর্শ দেন। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হবার লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দেবার পর তিনি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতি আমেরিকার সমর্থন বন্ধ করার পক্ষে মত তুলে ধরেন। ইরানের সাথে পরমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা, জলবায়ু নিয়ে প্যারিস চুক্তি সমর্থন, চীনে মার্কিন স্বার্থ বজায় রাখা এবং ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক সংস্কার উৎসাহিত করা সহ নানা বিষয়ে তিনি গত কয়েক বছর কংগ্রেসের ওপর চাপ দিয়েছেন।

তবে চীন ও ইউক্রেন নিয়ে মি. বাইডেনের অবস্থানকে বিভিন্ন প্রচারণায় কড়া ভাষায় আঘাত করেছেন মি. ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মি. বাইডেন চীনের বেশি ঘনিষ্ঠ এবং ইউক্রেন নিয়েতার আগ্রহ মূলত ইউক্রেনে তার ছেলে হান্টারের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার খাতিরে। কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হলেও, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনীত প্রার্থী হবার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন জো বাইডেন। তার প্রতিপক্ষ বার্নি স্যান্ডার্সকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হবার টিকেট পান মি. বাইডেন। অনেক রাজনৈতিক বিশে¬ষক বলছেন, তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আট বছর বারাক ওবামার ডেপুটি হিসাবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্বপালন। এর সুবাদে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের বিপুল সমর্থন পেয়েছেন।

একজন কৃষ্ণাঙ্গ-ভারতীয় বংশোদ্ভুত নারী কমালা হ্যারিসকে তিনি বেছে নিয়েছেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট রানিং মেট হিসাবে। প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তার তৃতীয় প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ ৪০ বছরের স্বপ্ন তার শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো। আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক পপুলার ভোট আর ২৭০টিরও বেশি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন জো বাইডেন।

শিগগিরই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে পম্পেও: ইরান

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরানের ব্যাপারে যে অশোভন টুইট করেছেন তার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বলেছে, ব্যর্থতার বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে অচিরেই পম্পেওকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। মাইক পম্পেও সম্প্রতি এক টুইটার বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে তার পুরোনো অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করে ইরানের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদে এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, একথা সহজেই অনুমেয় যে, আড়াই বছর ধরে একের পর এক লজ্জাজনক ব্যর্থতা শেষে যখন পম্পেওকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ত্যাগ করতে হচ্ছে তখন তার মেজাজ খারাপ থাকাটাই স্বাভাবিক।  আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে পম্পেওসহ ট্রাম্প প্রশাসনের সবাইকে তল্পিতল্পা গুটাতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, তার দেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। সেইসঙ্গে পরাজিত হয়েছে এই নীতির ভিত্তি স্থাপনকারী আইন ভঙ্গকারী গুন্ডারা।

তিনি আরো বলেন, এমন সময় ব্যর্থতার বিশাল দায়ভার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হচ্ছে যখন ইরানি জনগণ আগের মতো বুক ফুলিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করছে।

ইরান নিয়ে ইউরোপ-মার্কিন বিরোধ নিরসন চায় জার্মানি

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার মতবিরোধ নিরসন করা না হলে আলোচনা বা অন্য কোনো প্রচেষ্টা কোনো ফল বয়ে আনবে না।

তিনি জার্মানির একটি রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন পরবর্তী মার্কিন সরকারের সঙ্গে ইউরোপের সহযোগিতা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। হেইকো মাস বলেন, “আমেরিকা যখন সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে এবং আমরা আলোচনার নীতি অনুসরণ করছি তখন দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমাধানে আসা অসম্ভব ব্যাপার। আমাদেরকে আবার এক জায়গায় আসতে হবে।”

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে তার দেশকে বের করে নিয়ে তেহরানের ওপর অতীতের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। সেইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে তেহরানের ওপর নতুন নতুন অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প।

বর্তমানে নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি এবারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতাকে তিনি তেহরানের সঙ্গে ‘আলোচনা শুরুর উপলক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তিনি বলেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে আমেরিকা পরমাণু সমঝোতায় প্রত্যাবর্তন করবে। এ সম্পর্কে ইরান বলেছে, আমেরিকাকে আগে অনুতপ্ত হয়ে পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসতে এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগে তেহরানের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে দিতে হবে।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার তার দেশের ডয়েচল্যান্ড ফুংক রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, জো বাইডেন আমেরিকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর দেশটিতে অবশ্যই এই আলোচনা সামনে আসবে যে, ওয়াশিংটন পরমাণু সমঝোতায় ফিরবে নাকি ইরানের সঙ্গে আরো বিস্তারিত চুক্তি করবে। হেইকো মাস বলেন, এ বিষয়ে ইউরোপ আমেরিকাকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে; কারণ, ইউরোপ ও আমেরিকা যতক্ষণ ইরানের ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকবে ততক্ষণ সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

পরিবেশ রক্ষায় দরকার ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্রযুক্তির কল্যাণকর অগ্রযাত্রায় দিন দিন বেড়েই চলেছে মোবাইল ফোনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহার। মানুষের হাতে শোভা পাচ্ছে নিত্যনতুন ফোন। এক সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাতের মোবাইলটি আর শখের ফোনটি পরিণত হচ্ছে পরিবেশ দূষণকারী ই-বর্জ্য।

দেশে ই-বর্জ্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় তা রোধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। এবার নষ্ট বা পুরনো মোবাইল টাকার বিনিময়ে ফেরত নেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ মোবাইল ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাহিদ যুগান্তরকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, নষ্ট মোবাইল ফোন ফেরত দিলে যাতে ফোনের মালিক কিছু টাকা পায়, সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে ই-বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে না রেখে মানুষ তা নির্দিষ্ট স্থানে দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হবে। পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১০টি শপিংমলে এ বুথ বসানোর কথাও জানান তিনি। এবং পর্যায়ক্রমে দেশের ১০০টি শপিংমলে এ বুথ বসান হবে। জনাব জাকারিয়া শাহিদ বলেন, করোনা মহামারীর কারণে আমাদের এ উদ্যোগ কিছুটা থেমে আছে, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আবার পূর্ণোদ্যমে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ শুরু করব। এখন স্বল্প পরিসরে চলছে, তবে এটি যথেষ্ট নয়। আর সবার আগে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে নিজ উদ্যোগে মানুষ পরিবেশ রক্ষার্থে এগিয়ে আসে।

পরিবেশ রক্ষার্থে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি বলেও যোগ করেন জাকারিয়া শাহিদ। বাংলাদেশে প্রতি বছরে প্রায় ৪ কোটি মোবাইল সেট নষ্ট হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি হ্যান্ডসেট আমদানি করা হচ্ছে। ফলে এখান থেকে যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, সেটি পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ অধিদফতর জানায়, বিশ্বে দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে চলছে ইলেকট্রিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর। এর কারণে ক্যান্সারে পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারেন মানুষ। এ বর্জ্যে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৪ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে এটি ১২ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।

ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখা। এতে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ট্যাব বেশি দিন ধরে ব্যবহার করা যাবে। গুরুত্ব দিতে হবে পুরনো সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর ওপরে। একই যন্ত্র একাধিক কাজ করবে, এমন মাল্টিপারপাস ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই চার্জারে সব সংস্থার সব মডেলের মোবাইল চার্জ করা যায়, এমন চার্জারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্মের ব্যবহার, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

৩ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন

সংলাপ ॥ ৩ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঢাকা জেলে নিহত এই চার মহান জাতীয় নেতা হচ্ছেন – স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় তৎকালীন সরকার। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলের অভ্যন্তরে জাতীয় এ চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমদের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর উচ্চাভিলাসী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা এ নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায়। দেশের এই চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৫ই আগস্টের হত্যাকান্ডের পর কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জাতীয় এ চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শুধু বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। তাদের হত্যাকান্ডের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দেশের রাজনীতিকরাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ হত্যাকান্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদের উচিত ছিল ব্যাপক অনুসন্ধান করা এবং সত্য খুঁজে বের করা। সেই কাজটি তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও সহযোগীরা এখনো করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চারনেতার হত্যার বিচার সম্পন্ন হওয়া জরুরি। জাতি আশা করে জাতীয় চারনেতার হত্যার সুষ্ঠু বিচার এদেশে সম্পন্ন হবে। জাতি হত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি চায়। খুনিদের শাস্তি চায়। সেই সঙ্গে হত্যা ও নৃশংসতাকে যারা উৎসাহ দিয়েছে তাদেরও বিচার করা জরুরি।