প্রথম পাতা

কর্মই ধর্মের শ্রেষ্ঠ পরিচিতি

  • অবশ্যই যারা ধর্ম সন্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহ্ এখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সন্বন্ধে তাদের জানাবেন’। (আল কুরআন-৬:১৫৯)।
  • ‘তুমি কি দেখেছ তাকে যে কর্মফল অস্বীকার করে? সে-তো সে-ই যে পিতৃহীনকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয় আর অভাবীকে অন্নদানে উৎসাহ দেয় না’। (আল কুরআন-১০৭: ১-৩)।
  • ‘আল্লাহ্ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মানুযায়ী ফল পেতে পারে, তাদের ওপর অত্যাচার করা হবে না’। (আল কুরআন-৪৫:২২)।
  • ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী’। (আল কুরআন – ৫২:২১)।

শেখ উল্লাস ॥ ইসলামের (শান্তির) নবী মুহাম্মদ (সা.)-এঁর উপর আরব দেশে কুরআন নাযিল হয়েছিল চৌদ্দ শ’ পঞ্চাশ বছর আগে। এখন আমরা বাস করছি বাংলাদেশে। কিন্তু কুরআনের নির্দেশনাবলী বাংলাদেশের মানুষ তথা মানবজাতির শান্তি ও মঙ্গলের জন্য আজও সমানভাবেই প্রযোজ্য। মুহাম্মদ (সা.)-এর শান্তি ও সত্যের ধর্মকে তখনো যেমনিভাবে বিধর্মীরা মেনে নিতে পারেনি, আজও পারছে না সেই বিধর্মীদেরই অনুসারীরা যারা মানবতার শত্রু, ধর্মের শত্রু। এই শত্রুরা কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী, এরা আজও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, পার্থিব ভোগ-বিলাসের জন্য সম্পদের পাহাড় সৃষ্টি করে মানুষে-মানুষে বৈষম্য তৈরি করে চলেছে। কিন্তু কর্মই বাংলার সাধারণ মানুষের ধর্ম, এদেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়-হাজারো বছরের ইতিহাসের  বিভিন্ন পথ-পরিক্রমায় তারা এই পরিচয় দিয়েছে। বিশ্বে বাঙালিদের একমাত্র স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুকঠিন সংগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এদেশের মানুষ তাদের কর্ম ও ধর্মের প্রমাণ রেখেছে। ১৯৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯ ও ’৭১-এ এদেশের মানুষ শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, রক্ত দিতে কখনো দ্বিধা করেনি। তাই দেখা যায়, সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে বাংলার মানুষ কখনো ভুল করেনি। এভাবে তারা প্রমাণ করেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সত্য ও ন্যায়ের জন্য প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জন দেয়া-এ সবকিছুই তাঁদের কর্ম ও ধর্মেরই অংশবিশেষ। যারা এর ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, মানুষে-মানুষে হানাহানি সৃষ্টি করেছে, অন্যায় করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করেছে, মানবতা ও মনুষত্বের বিরুদ্ধে কাজ করেছে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে এদের কোনো ধর্ম নেই। আবহমান কাল থেকে এদেশের প্রচলিত মূল্যবোধটাই এরকম। অথচ যুগে যুগে এক শ্রেণীর মানুষ লোভ, হিংসা, পরশ্রীকাতরতাসহ পার্থিব নানা মোহে আচ্ছন্ন হয়ে হত্যা-ব্যভিচারসহ নানা অন্যায়-অত্যাচার-নির্যাতন করে সমাজে অশান্তি ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, মনুষ্যত্ব ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নিয়েছে। মানুষের ধর্ম যে মানবতা ও মনুষ্যত্ব তাকে তারা অপমান করেছে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর একটি বাণী এক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য-‘মানুষ যদি হতে চাও, মনুষ্যত্বকে জাগ্রত করো’।

এদেশের প্রবাদে ও উপদেশবাণীতে বলা হয়েছে, ‘হও কর্মেতে বীর, আর ধর্মেতে ধীর’। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সাধারণ মুসলমান। আর এ মুসলমান সম্প্রদায় এদেশে হাজার বছর ধরে শান্তি (ইসলাম) ধর্মের অনুসরণ করে আসছে। এখানকার মুসলমানদেরকে নতুন করে ধর্ম শেখাতে চায়-এরা কারা? ‘অলি-আল্লাহ্ বাংলাদেশ, শহীদ-গাজীর বাংলাদেশ, তাঁদের ওয়াস্তে, তাঁদের ওয়াস্তে রহম করো আল্লাহ, রহম করো আল্লাহ’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা,  তোমাদের এ ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না’ ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না’, অথবা ‘একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার সারা বিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার’-এ জাতীয় কত শত গান ও কবিতার মধ্যে বিধৃত রয়েছে বাংলাদেশের পরিচয়, বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের তথা বাঙালিদের আবেগ-অনুভূতি ও উপলব্ধি। স্বাধীনতার ফসল হিসেবে এদেশের সাধারণ মানুষের এখন অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি ঘটেছে। গ্রাম ও শহরের মধ্যেকার ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রেই ঘুচে যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক উন্নতি, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ সুযোগ-সুবিধা মানুষের চিন্তা-চেতনাকে কোন্ দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। বিগত বছরগুলোতে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মের নামে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী কর্মকা-, নিরীহ মানুষ হত্যা ও  বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে প্রকৃত ধার্মিক মানুষেরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছে না। মানুষকে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়ে সমাজে অশান্তি ও অস্বস্তি তৈরি করা যাদের কর্ম ও ধর্ম তারা কখনো সফলতা অর্জন করতে পারে না, তাদের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বহুবার কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। বস্তুত মানুষের কর্ম ও ধর্ম পরষ্পর হাত ধরাধরি করে চলে। কর্ম ভালো না হলে তার ধর্মও কখনো ভালো হতে পারে না। আদম (আ.)-এর পর থেকে যত নবী-রাসুল-অলি-আউলিয়া-সূফী সাধক-দরবেশ এই পৃথিবীতে এসেছেন, মানুষকে শান্তি ও সত্যের পথে আহবান জানিয়েছেন, তাঁরা সবাই নিজ নিজ কর্ম যথাযথভাবে সম্পাদনের মাধ্যমে মানুষদেরকে সে পথ দেখিয়ে গেছেন। এজন্য তারা জীবনে স্বীকার করেছেন অপরিসীম কষ্ট, ত্যাগ করেছেন পার্থিব ভোগ-বিলাস। কর্ম সম্পাদনের মধ্য দিয়ে তাঁরা জীবনে ধীরতা ও  স্থিরতা অর্জন করেছিলেন। মানবজাতির শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণের পথে তাঁরা আজও রেখে গেছেন নিদর্শন। তাঁদের প্রদর্শিত সরল পথই শান্তি ও সত্যের পথ। অপরদিকে, যারা অশান্ত, পথভ্রষ্ট, যারা বিপথগামী ও অভিশপ্ত তাদের থেকে দূরে থাকার প্রার্থনাই সারাক্ষণ করে থাকে সাধারণ মুসলমানরা।

বর্তমানে ধর্মের নামে যে উগ্রতা, সহিংসতামূলক কর্মকা- বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অনেক দেশে বিরাজ করছে, তার পেছনে মদদ দিচ্ছে ইসলাম (শান্তি) ধর্মের শত্রুরা। এই শত্রুরা দেশে-বিদেশে সর্বত্রই তৎপর রয়েছে। এরা এজিদী ইসলামের ধারক ও বাহক। তাদের চক্রান্ত থেকে বাঙালি মুসলমানদের ধর্মকে রক্ষার জন্য সবাইকে সচেতনভাবে এগিয়ে আসার এখনই সময়।

সময়ের সাফ কথা…. রুগ্ন রাজনীতির কবলে জাতি!

নজরুল ইশতিয়াক ॥ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনীতির একটি রুগ্ন অবস্থা বর্তমানে জনগণকে দেখতে হচ্ছে। রাজনীতির নামে যা ইচ্ছা তাই দেখতে দেখতে জনগণের পীঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। রুগ্ন রাজনীতির ভয়ানক অবস্থা সামনে উঠে এসেছে। এটিই হবার কথা। যেমন কর্ম তেমন ফল। সন্ত্রাসী তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রযাত্রা রুখতে আদর্শিক ও প্রগতিশীল রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে ও হচ্ছে। দেশি বিদেশি নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দেশপ্রেমিক জনগণের জাগরণতো দূরের কথা রাজনৈতিক দলগুলো কর্মী তৈরিতেও চরম অদক্ষতা আর অযোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সরকারও আদর্শ ভিত্তিক জাগরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। জান-মালের নিরাপত্তা সংকটময় অবস্থায়। গতানুগতিক গুজব ও কাল্পনিক রাজনীতির উত্থান ঘটছে। পাল্টে যাচ্ছে উন্নয়নের সংজ্ঞা, পাল্টে যাচ্ছে সন্ত্রাস ও জঙ্গী রাজনীতির ধারণা। কোন্ মন্ত্রী, কোন্ নেতা ও কোন্ রাজনীতিক কখন কি বলেন তা অনুধাবন করাও দুষ্কর হয়ে পড়ছে। কি করতে হবে, কিভাবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে তার কোন সঠিক দিক্ নির্দেশনা ও রূপরেখা নেই জাতির সামনে।

প্রস্তুতি ও অনুশীলন ছাড়াই খেলার মাঠে গোল দেয়া যাবে এমন একটি ধারণা নিয়ে বসে আছেন সরকারী দলের নেতাকর্মীরা। মাঝেমাঝে কিছু অন্তঃসারশূন্য হাকডাক শোনা যাচ্ছে আবার তা হারিয়ে যাচ্ছে প্রবাহমান বাতাসে। গোলকধাঁধায় পড়ছে জাতি।

দেশে কোন জঙ্গি নেই, কোন জঙ্গিবাদও নেই (সত্য)। সরকারের এমন প্রচারনার সুর পাল্টে গেছে দু’টি ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর। সংঘটিত দু’টি ঘটনার পরক্ষণেই প্রকারান্তরে জঙ্গি আছে কিংবা জঙ্গিবাদ কায়েমের চেষ্টা চলছে এটির সরকারী স্বীকারোক্তি আদায়ে সামর্থ্য হলো এতদিন যারা বলেছিলেন জঙ্গি আছে জঙ্গিবাদ চলছে। বোঝা যায় সরকার বাস্তবতাকে চিহ্নিত করেনি। জঙ্গি কি এবং কাকে জঙ্গিবাদ বলা যাবে সেটি তাদের জানা নেই এবং জঙ্গি ও সন্ত্রাস জগাখিঁচুড়ি করে ফেলেছে। একই সাথে দেখা গেল সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রস্তুতির ঘাটতি। প্রশ্ন উঠতে পারে কি কারণে সরকার স্বীকার করলেন জঙ্গি ও জঙ্গিবাদ চলছে! পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় দেশে একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস চলছে। মাঝে মধ্যেই দেশ পরিচালনায় সুষ্পষ্ট দিক্ নির্দেশনার অভাব দেখা যাচ্ছে। দারুন ধোঁয়াশা আর অন্ধকার জেঁকে বসছে। মনে হতে পারে পথ হারিয়ে ফেলেছে রাজনীতি। সরকারের তথ্য বিশ্লেষণ, অনুধাবন ও পর্যবেক্ষণ গতানুগতিক এবং সব অঙ্গগুলো প্রয়োজন মাফিক কার্যকর নয়। যাদেরকে যে দায়িত্বে রাখা হয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানে অনীহা চলছে। পুলিশি ব্যবস্থা সন্ত্রাসী আঘাত মোকাবেলায় যুগোপযোগী পারদর্শী নয়।

গতির পার্থক্য, দেখার দূরত্ব, বাস্তবতা নিরূপণের অযোগ্যতা প্রকট হয়ে উঠেছে। আরো স্পষ্টভাবে বললে পরিস্থিতি মোকাবেলার উপযোগী দক্ষ পুলিশি ব্যবস্থাপনার অভাব। কোন সংকটকে চিহ্নিত করার মধ্যেই তার সমাধান নিহিত থাকে, সামর্থ প্রস্তুতি পদক্ষেপ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব হয়। ধর্মীয় জঙ্গিবাদ একটি ভুল শব্দ। এটির অন্তর্নিহিত সত্য উদঘাটন করলে দেখা যায় বর্তমান বিশ্বে জঙ্গিবাদের নামে যা সংঘটিত হচ্ছে তার নেপথ্যে বাণিজ্যে দখলদারিত্ব ও আধিপত্যবাদ জড়িত।

অন্ধ উগ্র বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীগুলোকে ধর্মের নামে বিভাজিত করে লড়াইয়ে অবতীর্ন রাখা প্রাথমিক উদ্দেশ্য। এমন একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করা যাতে করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অস্ত্র ব্যবসা এবং লুটপাটের মহাযজ্ঞ চালানো যায়। যতদিন এটি সম্ভব হবে ততদিন জিইয়ে রাখা। যা কিছু দেখছি ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া কোনটাই ধর্মীয় শাস্ত্রের মধ্যে পড়ে না। কৌশল-অপকৌশলের খেলায় ধরাশায়ী হয়েছে সে সব দেশগুলো। জাতীয়তাবোধের রাজনীতি তথা দেশপ্রেমিক শক্তির উত্থান না হওয়াই সংকটের কারণ। চলমান এসব খেলা বর্তমান সভ্যতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। পর্যবেক্ষণে সভ্যতার এই সংকটকে চিহ্নিত করা যায় যা বিশ্ববাস্তবতায় ক্ষত। আধিপত্যবাদের এই খেলা সব সময় চলছে। যেখানে ধর্ম ও দারিদ্রতা কেবলই খেলার হাতিয়ার।

অনুসন্ধানে দেখা যায় দেশের সামনের অগ্রগতি ও হুমকির বিষয়ে মাঝে মধ্যে আলোচনা হলেও সে সব নিয়ে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সরকারে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বাংলার মাটি-পানি-বাতাস-মানুষ পর্যালোচনা করে সময়োপযোগী কোন কার্যক্রম গ্রহণ করেনি।

ফলে উদ্ভূত সংকট ভয়াবহ রূপে সামনে এসে পড়েছে। বিশেষ করে ধর্ম মন্ত্রণালয়কে উপেক্ষা করার পরিণতি সরকার হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছে। সীমাহীন স্থবিরতা চলছে ধর্মমন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ের কোন প্রতিষ্ঠান ঠিকমত কাজ করছে না। ফলে বুমেরাং হয়ে প্রত্যাঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে গোটা দেশ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় লোক দেখানো কাজের কাজী আর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির আখড়া। কোন অর্জন নেই এই মন্ত্রণালয়ের বরং অদূরদর্শীতার ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে। কোন নজরদারি নেই, কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। কেবলই গলাবাজি সেখানে। উল্লেখিত মন্ত্রণালয়-গুলোর ওয়েব সাইট কোন সময় আপডেট থাকে না। তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন সমন্বয় নেই। জবাবদিহিতা নেই।

ধর্মের নামে সব সন্ত্রাসী তৎপরতার মূলে ষড়যন্ত্র রয়েছে। যাকে যখন যে কায়দায়, যে দক্ষিণায়, যে ফাঁদে – লোভে ফেলে লুটপাট করা যায় সে প্রচেষ্টাই শুধু চলে। সেক্ষেত্রে পরিকল্পনাকারীরা এখন পর্যন্ত দারুন সফল, কেননা ইসলামের নামে সন্ত্রাস কায়েমে তারা বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট সন্ত্রাসের মূল উদ্দেশ্য সেখানে সৌদী আরব ও আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখা ও বিস্তার করা। বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিত  খেলা চলছে সেখানে। সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ষ্পষ্টতই দু’টি বৃহৎ বিভাজন জিইয়ে রাখবে। যা আরো আগে ঘটলে বিশ্বে সন্ত্রাসের জোয়ার দেখা দিতো না। মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু থেকেই রয়েছে। সন্ত্রাসীদের হাতে অর্থ, অস্ত্র, ভূমি, জল-জলাধার, পতাকা, লক্ষ্য, যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ ও শাসন কাঠামো রয়েছে। সেখানে তারা একটি নাজুক দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে তাই এটাকে জঙ্গিবাদ (যুদ্ধবাদ) বলা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে যা হচ্ছে তা জঙ্গিবাদ নয়। এটির পিছনে রাজনীতির ষড়যন্ত্র, বিচার প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়া এবং সরকারকে বাধ্য করার প্রচেষ্টা জড়িত।

গুলশান কিংবা শোলাকিয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম। মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার বন্ধ এবং রুগ্ন রাজনীতির ষড়যন্ত্র এ হামলার কারণ। পরিকল্পিত সন্ত্রাস সৃষ্টির অবারিত সুযোগ রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে কতটুকু করতে পারবে, কারা ক্রীড়নক হবে, এটি চিহ্নিত করাটাই জরুরী। দৃষ্টান্ত স্থাপনের রাজনীতি, দেশপ্রেমের অভিন্ন আদর্শিক পথ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও শিক্ষার আড়ালে নানামুখি যে বিভাজন বৈষম্য সৃষ্টি করেছে সে সব বিভাজনের ফাঁক দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি একটি সহজ কাজে পরিণত হয়েছে। এটি রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা। গুলশানে সন্ত্রাসীরা চোখ এড়িয়ে ঢুকে পড়েছে। তারা কিভাবে কোন গাড়িতে সেখানে প্রবেশ করেছে, চেকপোষ্টে কেন তল্লাসীতে এসব ভারি অস্ত্র বোমা ধরা পড়লো না এটি নিরূপণ বেশি জরুরি। আবার তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য কি ছিল, কতটুক ছিল, কাদেরকে হত্যা করে, কখন কিভাবে বের হয়ে যাবে সেসব জানার মধ্য দিয়ে  হামলার স্বরূপ নির্ণয় হতে পারে। এসব নানা দিক  চিহ্নিত করে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গুলশান হত্যাকাণ্ড জনমনে আতংক সৃষ্টি করেছে। এটি সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়। ভিন্নধর্মী বিদেশী বন্ধু ও নারীদেরকে নির্মমভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার বিভৎসতা প্রমাণ করে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা ও উদ্দেশ্য। যা গুমোট একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সহায়ক।

অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যায় পরিকল্পিতভাবে এসব ঘটনা ঘটানোর মাধ্যমে সরকার উৎখাতের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। সরকারের দুর্বলতার সুযোগে সহজেই একটি রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় সন্ত্রাসীদেরকে দিয়ে এসব করছে। তাদের আশু লক্ষ্য আইন শৃংখলার চরম অবনতি ঘটিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলা। সরকার অস্থির হলে সৃষ্ট সংকট সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপে অংশগ্রহণ করা যাবে। সেখানে কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায়ে সরকারকে বাধ্য করা সম্ভব হবে।

নিশ্চিতভাবে দু’টি ঘটনা প্রমাণ করে সরকারের যথাযথ প্রস্তুতির ঘাটতি আছে। পরিস্থিতি মূল্যায়ণ তথা বাস্তবতা অনুধাবনেও সীমাহীন অদূরদর্শীতার চিত্র ফুটে উঠেছে। একই সাথে পুলিশ-প্রশাসনের প্রশিক্ষণ, কাজে গতি বাড়ানোয় সরকারযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা সামনে এসেছে। সরকার বাস্তবতা অনুধাবনে দূরদর্শীতার প্রমাণ দিতে পারেনি। তারা অনুধাবন করেনি ষড়যন্ত্রের ডালপালা কতটুকু বিস্তৃত এবং তা মোকাবেলায় জনগণকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।  বৈদ্যুতিন মাধ্যম যেন বল্গাহীন ঘোড়ার মতো ছুটছে, পুরো পরিস্থিতিকে জটিল করছে যা গণমাধ্যম সংস্কৃতির রুগ্ন ও ক্ষত দিকটা জনগণ দেখেছে।

দেশে জাগরণ সৃষ্টিতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং সেগুলোর সাথে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা কতটুকু সেটিই এখন দেখার বিষয়। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে ক্ষমতা দখলের খেলায় একটি সরকার কিংবা একটি দল ব্যর্থ হতে পারে কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। দেশপ্রেমিক জনগণ দেশের জন্য যা করা দরকার তাই করে। সরকারের সফলতা নির্ভর করছে উদ্ভুত ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণকে কতটুকু সম্পৃক্ত করতে পারছে তার উপর।

প্রজন্মের শিক্ষা ভাবনা

সুহৃদ মান্নাফি ॥ মানব প্রজাতি এগিয়েছে বহুদূর। বিজ্ঞানের নানামূখী আবিষ্কার মানবপ্রজাতিকে উন্নতির চূঁড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে বলে চারিদিকে রব উঠেছে। বিশেষ করে কম্পিউটার ও মোবাইল প্রযুক্তি মানব প্রজাতিকে উন্নতির এক বিস্ময়কর অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। চারিদিকে উন্নতির ছোঁয়া। স্বপ্ন ছোঁয়ার আনন্দে বিভোর। কিন্তু সে উন্নতি আর আনন্দের চিত্রটিকে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই আমরা তার অন্তসারশুণ্য অবস্থার চিত্রটি দেখতে পাবো। বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমাদের এই সোনার বাংলার রুক্ষ ও প্রাণহীন দশা সহজেই ধরা পড়ে। প্রযুক্তির কল্যানে শিক্ষা ব্যবস্থা বহুদূর এগুলেও আমরা বিশেষ করে বাঙালির নতুন প্রজন্ম যে দিশাহীন তা স্পষ্ট। যে প্রজন্ম গত হয়েছে তাদের কথা টেনে এনে লাভ নেই। যে প্রজন্ম আজও দেশ-দেশের মানুষকে গড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে পড়ন্ত বেলার দিকে হেলে পড়েছেন তাদের কথা একটু ধরা যাক। আর যে প্রজন্ম পরিপূর্ণভাবে এই বাংলার সমাজ, বাংলার বাঙালিকে গড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত তাদের কথা পূর্ণভাবে ধরতে হবে, কারন বর্তমান প্রজন্মের এই দিশাহীন অবস্থার পেছনে তাদের ব্যর্থতা রয়েছে। আর যে প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এই দেশ ও এই দেশের মানুষকে গড়বে বলে তাদের নিয়েই হওয়া উচিত আমাদের বিশেষ চিন্তা-ভাবনা।

বর্তমান প্রজন্ম যারা ভবিষ্যতে আমাদের হাল ধরবে তাদের জন্য আমাদের সত্যিই কী কোন পরিকল্পনা রয়েছে? কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছি আমরা তাদের? নতুন প্রজন্মের জন্য আমাদের ভাবনা কী সঠিক আছে? ভাবনা যদি থাকে তবে তা কতটা বর্তমান সময় উপযোগী? ভাবনা যদি থাকে তবে তা কতটা বাস্তব সম্মত? ভাবনা যদি থাকে তবে  তা কতটা মানবিক-মানবিকতা ও মানবতা সংশ্লিষ্ট ? এই ভাবনা থেকে আমরা আমাদের বর্তমান ও নতুন প্রজন্মের জন্য সুন্দর সু-পরিকল্পিত ও বর্তমান সময় উপযোগী শিক্ষা প্রদান করতে পারছি কী? যদি না পারি তবে দিশাহীন এই প্রজন্ম কোন দিকে নিয়ে যাবে তাদেরকে, এই সোনার বাঙলাকে? আমরা যদি এখনই সজাগ ও সচেতন না হই তবে তার পরিনতি কী হবে? এককথায়, যে মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই বাঙালি জাতির উত্থান তা ব্যর্থ হবে।

বাঙালির নতুন প্রজন্ম যে ইতোমধ্যেই দিশা হারিয়েছে তা বিগত কয়েকদিনের ঘটনা প্রবাহ দেখলে সহজেই ধরা পড়ে। কি ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক শিক্ষার ফাঁদে পা দিয়েছে এই প্রজন্ম তা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। বিশেষ করে বিকৃত ধর্মীয় শিক্ষা যে নতুন প্রজন্মের মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে তা এদেশের শুধু নয়, সারাবিশ্বের নিকট এখন স্পষ্ট। সারাবিশ্ব নিয়ে আমাদের ভাবনা আপাতত থাক। নিজ দেশের আপন প্রজন্মের ভাবনা যে এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিগত ২/৩ বছর ধরে এদেশে ধর্মের নামে যে চরম উগ্রতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ছবি মানুষ দেখেছে বিশেষ করে কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পর আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। বিশেষ করে বিকৃত ধর্মীয় শিক্ষা যেন এই প্রজন্মের আর কাউকে বিপথে ঠেলে দিতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। পরিবারের বাবা-মা-গুরুজন থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দিরসহ ধর্মীয় শিক্ষার যত প্রকার স্থান রয়েছে সে সকল স্থানে শিক্ষা প্রদানে নিয়োজিত সকল মহলকে সচেতন হতে হবে। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষায় কি পড়ানো হচ্ছে, কে পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করছে, আদৌ পাঠ্যসূচীতে সন্নিবেশিত বিষয়াবলী প্রকৃত ধর্মীয় বিষয়ভুক্ত- না কি বিভিন্ন কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক মনগড়া বিষয় সন্নিবেশ করা হয়েছে – সে সব প্রত্যেকটি বিষয়ে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্মমন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে বাস্তব সম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই ধর্মে বহুমত ও পথের ধর্ম শিক্ষা রোধ করতে না পারলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবার সম্ভাবনা শতভাগ এবং এর ফলাফল কি হতে পারে তা বোধ করি কাউকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে না। ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশনার ব্যাপারে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কোন প্রকার নিয়ম নীতি রয়েছে বলে মনে হয় না। যে যার মতো করে ইসলামের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ইসলাম ধর্মীয় পুস্তক প্রকাশ করছে। মনগড়া, যুক্তিহীন, সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান করে তথাকথিক ধর্মজীবিরা ধর্মের বারোটা বাজিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে। পাশাপাশি শান্তির ধর্মের অশান্ত রূপ দেখে আবারো জাহেলিয়াত যুগে প্রবেশ করছি বলে মনে হচ্ছে। এ দেশ, এ মানব সমাজ বিশেষ করে বাঙালির সোনার বাংলাকে উগ্র ধর্মীয় ও সন্ত্রাসী শিক্ষার হাত থেকে এবং আমাদের এই প্রজন্মকে বাঁচাতে সর্বমহলের সম্মিলিত প্রয়াস একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের জন্য সময় উপযোগী শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে আমাদেরকে চরম মূল্য দিতে হবে যার একটু নমুনা আমরা দেখতে পেলাম।

এ আবার কোন শান্তি (ইসলাম)!!!!

ড. আলাউদ্দিন আলন ॥ কোন একটি শব্দ যখন একটি জাতির ভাষায় যুক্ত হয় তখন নিঃসন্দেহে সে শব্দটির একটি গভীর তাৎপর্যময় অর্থ থাকে। সে অর্থের ব্যাপকতা থাকে। আর থাকে নান্দনিক সৌন্দর্য। শব্দটির আভিধানিক অর্থ, পারিভাষিক অর্থ, ব্যবহারিক অর্থসহ যত ধরনের অর্থ থাকে সে সকল অর্থ সমষ্টির গভীরে প্রবেশ করে অর্থটিকে জেনে ও বুঝে নিতে হয়। বিশেষ করে কোন একটি বিদেশী শব্দ যখন কোন জাতির ভাষায় স্থান করে নেয় তখন সে শব্দটির সার্বিক অর্থ, অর্থের গভীরতা ও ব্যাপকতা ও সৌন্দর্যের পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা থাকা একান্ত প্রয়োজন। নয়তো সে শব্দের প্রয়োগিক দিকটি অর্থহীন ও ঠুনকো হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষাসহ সারাবিশ্বের সকল ভাষায় ‘ইসলাম’ শব্দটি আরবী ভাষা হতে সরাসরি ব্যবহার হচ্ছে। মূলত একটি ধর্মকে বুঝাতে এ শব্দের বিশ্বময় বহুল ব্যবহার। প্রায় ১৪৫০ বছর পূর্বে নবী মুহাম্মদ (সা.) এঁর নিকট অবতীর্ণ আল কুরআনে আরবী ইসলাম শব্দটির যাত্রা যা একটি ধর্ম হিসেবে মানবজাতির জন্য মহান প্রভুর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। সারাবিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ ‘ইসলাম’ শব্দটিকে ‘ইসলাম’ হিসেবেই গ্রহণ করেছে। কেউই এ শব্দটিকে নিজেদের পারিভাষিক শব্দ হিসেবে নিজ ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেনি।

বিশেষ করে বাঙালির ভাষা বাংলায়-আরবী ‘ইসলাম’ শব্দ ‘ইসলাম ধর্ম’ নামে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আর বাঙালি জাতি তাদের মহান নবী মোহাম্মদ (সা.) কে স্বীকৃতি, তাঁর প্রচারিত ধর্মের স্বীকৃতি – সর্বোপরি আল কুরআনে আল্লাহ্র নির্দেশ ‘ইসলাম ধর্ম’ কে নিজেদের ধর্ম হিসেবে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মেনে নিয়েছে। ৯০ ভাগ বাঙালি যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আজ আরেকটি আরবী শব্দ মুসলিম কিংবা মুসলমান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তারাও কখনো নিজ ভাষায় তথা বাংলা ভাষায় এ শব্দ দুটির অনুবাদ করে নিজেদের প্রকাশ ও প্রচার করেন না। ফলে ‘ইসলাম’ ও ‘মুসলিম’ শব্দের আবির্ভাবের শুরু থেকে আরবীয়রা যেমন হানাহানি ও রক্তপাত থেকে নিজেদের নিভৃত করতে পারেনি, তেমনি বাঙালি জাতি ১২০০ বছর ধরে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ ব্যবহার করতে করতে আজ জাহেলিয়ার যুগের ধ্বংসাত্মক হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। আর এর পেছনে একটি অন্যতম কারণ বাংলা ভাষায় ইসলাম ও মুসলিম শব্দের অনুবাদ অর্থের ব্যবহার না থাকা এবং এ ধর্মের প্রকৃত সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হওয়া।

আমরা সবাই জানি আরবী ‘ইসলাম’ শব্দের বাংলা ভাষায় সহজ অর্থ হচ্ছে ‘শান্তি’। আরবী ‘দ্বীন’ শব্দের অর্থ সংস্কৃতিতে ধর্ম আর বাংলা ভাষায় ধর্ম শব্দের সহজ অর্থ ‘ধারণ করা চরিত্র’। আর যিনি ‘দ্বীন ইসলাম’ অর্থাৎ শান্তির ধর্ম বা শান্তির চরিত্র ধারণ করেছেন আরবী ভাষায় তার পরিচয় ‘মুসলিম’ যার বাংলা ভাষায় পরিচিতি ‘শান্তির চরিত্র ধারণকারী’ হিসেবে। সুতরাং যে ব্যক্তি নিজে শান্তির চরিত্র ধারণ করেছেন তিনিই মুসলিম এবং তার ধর্মের নাম ইসলাম (শান্তি)। আরবী ভাষায় ইসলাম শব্দ বাঙালির চিন্তায় যতটা প্রভাব ফেলেছে তার চেয়ে হাজার লক্ষগুণ বেশি প্রভাব ফেলতে পারতো ‘শান্তি’ শব্দটি। কারণ কোন বাংলা ভাষা-ভাষীকে ‘শান্তি’ কি তা বুঝিয়ে বলার কোন প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছেলে-বুড়ো সব বাঙালিই বুঝেন শান্তি কি জিনিস। আর এই শান্তির চরিত্র বাঙালি ১২০০ বছরে ধরে লালন-পালন করে আসছে যা তারা শান্তির দূত মুহাম্মদ (সা.) এঁর রেখে যাওয়া ‘মুহাম্মদী ইসলাম’ থেকে পেয়েছেন। আরবী ‘মুহাম্মদী ইসলাম’ শব্দটিরও বাংলা ভাষায় অর্থ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। আর তা হলেই শান্তির দূত (ইসলামের নবী) এঁর রেখে যাওয়া দ্বীন তথা ধর্ম তথা চরিত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে। আরবী ‘মুহাম্মদ’ শব্দের বাংলা ভাষায় অর্থ হচ্ছে ‘প্রশংসিত’। আর আরবী ‘ইসলাম অর্থ ‘শান্তি’। সুতরাং ‘মুহাম্মদী ইসলাম’ এর বাংলা অর্থ হচ্ছে ‘প্রশংসিত শান্তি’। মুহম্মদী ইসলামের ধারক-বাহক মুসলমানের বাংলা ভাষায় পরিচয় হচ্ছে ‘প্রশংসিত শান্তির চরিত্র ধারণকারী ব্যক্তি’। যে ব্যক্তির কর্ম তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রশংসিত হয় সেই ব্যক্তিই মুসলিম। সুতরাং কে মুসলিম আর কে মুসলিম না তা বোধ করি বাংলা ভাষাভাষীদের আর বুঝিয়ে বলা প্রয়োজন নেই।

যারা বাংলার মানুষকে মুসলমান বানানোর জন্য সন্ত্রাসী হয়েছেন, সন্ত্রাসী বানাচ্ছেন নিজেদের অধর্ম ও কুধর্মকে প্রতিষ্ঠা করতে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি – পাঁচ হাজার বছরের বাঙালি জাতি, বাংলার সংস্কৃতি, শেকড় অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে, উপড়িয়ে ফেলবেন – সে চেষ্টা বৃথা; অশান্তি তৈরি করতে পারবেন সাময়িক – তবে সফল হবেন না কখনো। বাঙালি প্রায় ১২০০ বছর ধরে শান্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এঁর রেখে যাওয়া প্রশংসিত শান্তির ধর্ম তথা মুহাম্মদী ইসলাম পালন করছে। এক-দুই-তিন করে আজ এদেশের ৯০ ভাগ মানুষ শান্তির চরিত্র ধারণ করে মুসলমান নাম ধারণ করে তাদের মানবজীবন অতিক্রম করে চলেছে।

আপনারা নতুন করে কোন শান্তি (ইসলাম) এ জনপদে প্রতিষ্ঠা করার জন্য গোপনে-প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী হয়ে নিরীহ মানবজাতিকে হত্যা করছেন ঘৃণ্য কায়দায় তা আমরা ভালোই বুঝতে পারছি। আপনাদের কোন পথ নির্দেশ এই শান্তিপ্রিয় (ইসলাম প্রিয়) জাতির প্রয়োজন নেই। আপনারা শান্তির দূতের (ইসলামের নবীর) সুমহান শিক্ষাকে নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারের আশায় বিকৃত করে আর ব্যবহার করবেন না। বুঝতেই পারছেন আপনারা এ জাতিকে অশান্তির জাহান্নামে নিক্ষেপ করার ষড়যন্ত্র ব্যতিত আর কিছুই দিতে পারছেন না। আপনাদের অসৎ ধর্ম, অসৎ কর্ম, অসৎ উদ্দেশ্য এ পবিত্র জমিনে কখনোই সফল হবে না। সাময়িক অশান্তি আর আতংকের সৃষ্টি করে নিজেদের সন্ত্রাসী-শয়তানী মনোভাবকে শুধু প্রকাশ করতে পারবেন। বিনিময়ে শান্তিপ্রিয় জাতি ও তাদের বন্ধুদের রক্তে আপনাদের হাত রাঙিয়ে পুরো জাতির অন্তরের ঘৃণা চিরকালের জন্য আপনাদের প্রাপ্তি হিসেবে সঙ্গী করতে পারবেন। তাছাড়া আর প্রাপ্তির কিছুই থাকবে না। যে কাল্পনিক স্বর্গের প্রত্যাশায় নষ্ট-ভ্রষ্ট জীবন ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছেন তা থেকে নিজেরা ফিরে আসুন, আমাদের সোনার ছেলেদের ফিরিয়ে আনুন, সোনার বাংলা গঠনের জন্য নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা সুন্দর চরিত্রকে কাজে লাগান। তবেই আপনি বাঁচবেন, আপনার পরিবার বাঁচবে, আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাঁচবে। বাঁচবে এ সোনার বাংলা, বাঁচবে সোনার বাংলার সোনার মানুষ।

বিকৃত ইসলাম (শান্তি!!!) এর কথা বলে কোন লাভ নেই। এজিদের চরিত্র সবাই জানে। এজিদ ও তার বাহিনী কোন ইসলাম (শান্তি!) প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল তা সবাই জানে। এজিদ আজ ঘৃণিত। এজিদ বাহিনী আজ ঘৃণিত। ইমাম হোসাইন আজ মুসলমানদের হৃদয়ের মনি। ইমাম হাসান আজ মুসলমানদের

চোখের মনি। কারবালায় শাহাদাৎ লাভকারীগণ সারা মুসলিম জাহানের সকলের প্রিয়মুখ। আর এজিদ ও তার দোসররা আজও ঘৃণিত মুসলমান সমাজে। আপনার যারা গোপনে এজিদের রূপধারণ করেছেন, প্রকাশ্যে এজিদ বাহিনীর মতো নিরীহ মানুষের মাথা কাটছেন ইসলামের! (শান্তির) নামে – তারাও তেমনি ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকবেন পরিবারে, আত্মীয় স্বজন বন্ধু-বান্ধবের পরিমণ্ডলে, সমাজে, রাষ্ট্রে – সর্বোপরি সারা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষদের কাছে।

আমরা শান্তিপ্রিয় (ইসলাম প্রিয়) বাঙালি মুসলিম। আমাদেরকে শান্তির ধর্ম শিখিয়েছেন সূফী সাধক অলি-আল্লাহ্গণ। শান্তির চরিত্র কিভাবে অর্জন ও ধারণ করতে হয়, তা আমরা বিগত ১২টি শতাব্দী ধরে শিখে আসছি, এখনও শিখছি। আমাদের নতুন করে ইসলাম তথা শান্তির বাণী এ রকম সন্ত্রাসী কায়দায় শেখানোর প্রয়োজন নেই। আপনাদের যারা মদদদাতা তাদের আমরা ভালো করেই চিনি। আপনারা কোন ফাঁদে, কিসের লোভে পা দিয়েছেন তাও আমরা জানি। সুতরাং আপনাদের প্রতি আহবান রইলো – ফিরে আসুন শান্তির সুশীতল ছায়াতলে। সন্ত্রাস করে, মানুষ হত্যা করে, বোমা মেরে, গলা কেটে, শান্তি তথা ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয় না। মানুষকে প্রেম আর ভালোবাসা দিয়ে শান্তির পথে তথা ইসলামের পথে টেনে আনতে হয়। আর এটাই করেছিলেন শান্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর চরিত্রগুনে গুনান্বিত সূফি সাধক অলি-আল্লাহ্গণ। সূফি সাধক অলি- আল্লাহ্গণ-এর সাহচর্যে গিয়ে নিজেদের চরিত্র সুন্দর করে সাধারণ মানুষকে শান্তির পথ দেখান, তবেই ইসলাম প্রতিষ্টা পাবে।

সময়ের দাবি শতভাগ বাঙালি জাতীয়তাবোধের জাগরণ

* ‘ইচ্ছা করলেই আল্লাহ্ তোমাদের এক জাতি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্ত করেন ও যাকে ইচ্ছা সৎপথে পরিচালিত করেন। তোমরা যা কর সে বিষয়ে অবশ্যই তোমাদের প্রশ্ন করা হবে’। (আল কুরআন – ১৬: ৯৩)

* ‘আল্লাহ্ তো কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। কোনো সম্প্রদায়ের সম্পর্কে যদি আল্লাহ্ অশুভ কিছু ইচ্ছা করেন তবে তা রদ করার কেউ নেই, আর তিনি ছাড়া ওদের কোন অভিভাবক নেই’। (আল কুরআন – ১৩:১১)

শাহ্ ফুয়াদ ॥ ‘আগে জন্ম না-কি আগে ধর্ম’?-এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই বলবে আগে জন্ম। কিন্তু এ নিয়ে বাঙালিদের কারো কারো মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব প্রাচীন কাল থেকেই ছিল বলে চার শ’বছর আগের কবি আব্দুল হাকিম বলেছিলেন, ‘যে জন বঙ্গে ত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ণ জানি।’ প্রাচীন যুগের আরেক বাঙালি কবি সৈয়দ সুলতান বলেছিলেন, ‘যারে যেই ভাষে প্রভু করেছেন সৃজন, সেই ভাষা হয় তার অমূল্য রতন’। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ যা বলেছিলেন তা এরকম- আমরা হিন্দু না মুসলিম-এটা আমাদের যতটা না পরিচয়, তার চেয়ে বড় পরিচয় আমরা বাঙালি। মা-প্রকৃতি আমাদের চেহারায় এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে টুপি-দাড়ি-টিকি দিয়ে সে পরিচয়টি ঢাকার জো’টি নেই। মহাজ্ঞানী সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘নিজেকে জানো’। হাদিসে আছে, ‘মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু’- ‘যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে তার রবকে চিনতে পেরেছে।’ সাধক কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে বাঙালির বাংলা, সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে’।

১৯৭১-এ বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, নিজেকে চিনেছিল বলে কী অসাধ্যই না সেদিন তারা সাধন করেছিল। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)  প্রায় দশ লাখ মানুষের ঐতিহাসিক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানী শাসন-শোষণের ইতিহাস তুলে ধরে বলেছিলেন,‘ ..আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের খবর বাইরে পাঠানো চলবে। কিন্তু যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

বঙ্গবন্ধুর সেই ঘোষণাকে বাস্তব রূপ দিতে বাঙালি জাতিকে কী আত্মত্যাগ-তিতিক্ষা, বীরত্ব ও সশস্ত্র সংগ্রামের কী কঠিন পরীক্ষাই না দিতে হয়েছিল। এসেছিল ১৬ই ডিসেম্বর, বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই বিজয় না হলে, দেশ স্বাধীন না হলে এদেশ আজ এমন হতে পারতো কি? সরকারি চাকুরি-ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দেশে-বিদেশে সর্বক্ষেত্রে বাঙালিরা যে উন্নতি ও অগ্রগতির চরম শিখরে অবস্থান করছে সেটাতো স্বাধীনতারই সোনালী ফসল। হাক্কানী (সত্যব্রতী) সাধক বলেন, ‘কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, আরো পাবে’। যারা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছেন তারা কার কাছে কৃতজ্ঞ হবেন? তারা কৃতজ্ঞ হবেন, তাদের প্রতি যারা এদেশটা স্বাধীন করে দিয়েছেন তাদের প্রতি। তারা কৃতজ্ঞ থাকবেন সেই আদর্শের প্রতি যে আদর্শের ভিত্তিতে এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল। আর নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সেই আদর্শ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শ। একটি জাতি তার মূল চেতনা, মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেলে সে পথ হারিয়ে ফেলতে বাধ্য। দুঃখজনক হলেও স্বীকার করতে হচ্ছে, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এদেশের কোনো কোনো মানুষ নিজেকে বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করে না। বাঙালির ঘরে জন্ম নিয়ে, বাংলার আলো-বাতাস-মাছ-ভাত খেয়ে বড় হয়ে নিজের দেশকে না ভালবাসলে, নিজেকে চিনতে না পারলে যে কেউ তার রবকে চিনতে পারে না, ধার্মিক হওয়া তো দূরের কথা সে কথাও অনেকে ভুলে যেতে বসেছে।

পবিত্র কুরআনে বারবারই এসেছে, ‘মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ, মানুষ বড়ই বিস্মৃতপ্রবণ’। এই বাণীরই অনেক সুষ্পষ্ট প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে স্বাধীনতার সুফল ভোগকারী অনেক শিক্ষিত, সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী বাঙালির জীবনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন সেটাতো ছিল শুধুই বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে, অন্য কিছু সেখানে ছিলো না। লাখো মানুষ আত্মাহুতি দিলো, নির্যাতিত হলো এদেশের স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলো। আর এই দেশে খেয়ে, এই দেশে থেকে, এই দেশেরই বিভিন্ন অবস্থানে থেকে ক্ষমতার স্বাদ নিয়ে সুবিধাবাদীরা টাকা জমায় বিদেশী ব্যাংকে, বিদেশে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে, নিজেও অবসর গ্রহণের পর চাকুরির সুবিধাদি নিয়ে বিদেশের মাটিতে গিয়ে জীবনের বাকী দিনগুলো কাটিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, নিজের ভোগ-বিলাস, ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধার জন্য বিদেশে গিয়ে ওই দেশের দি¦তীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে তাদেরকে জীবন কাটাতে হয়, এটা কি বিশ্বায়নের সুযোগ নিয়ে বাঙালির নিজের সাথে নিজের প্রতারণা? নাকি অন্য কিছু? দেশাত্মবোধ, দেশপ্রেম, দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশ ও নিরাপত্তার জন্য বিদেশে পাড়ি দেয়া বাঙালির কাজ হতে পারে না, এ কাজ যারা করে তারা দেশ ও জাতির প্রতি অকৃতজ্ঞ ছাড়া কিছু নয়।

সেই অকৃতজ্ঞতা ও বিস্মৃতির কলঙ্ক থেকে নিজেকে রক্ষা, একজন কৃতজ্ঞ ও সচেতন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আজ প্রতিটি বাঙালিকে নতুন করে নিজেকে চেনার সময় এসেছে। বিদেশ থেকে বিদ্যা-শিক্ষা লাভ করে তা দেশের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছে, এমন বহু প্রমাণ কীর্তিমান বাঙালিরা রেখে গেছেন। বিশ্বায়নের এই সময়ে বাঙালিরা আজ যেভাবে নানা প্রলোভনে পড়ে, ধর্মের নামে, সংস্কৃতির নামে বিদেশের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, দেশের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তা থেকে তাদেরকে মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাযজ্ঞের সুফলভোগীরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের কবর রচনা করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মোশতাক-জিয়াচক্র ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে অশুভ কাজ শুরু করার সংস্কৃতি চালু করেছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে বক্তৃতা শুরু করেন যেন জিয়ার আদর্শই তারা ধরে রেখেছেন! এটা ধর্মের নামে রাজনীতির একটি উদাহরণমাত্র। ষড়যন্ত্রকারীরা ১৫ই আগষ্টের পর বঙ্গবন্ধু, বাঙালিত্ব, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল চেতনা নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। সেই অপচেষ্টা আজও চলছে। বাঙালিকে নতুন করে মুসলমান বানানোরও চেষ্টা চলছে। এসব কিছুই পুঁজিবাদী ও সাম্র্রাজ্যবাদী চক্রের ঘৃণ্য চক্রান্তের অংশবিশেষ। এ সম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। নিজের মাতৃভাষা ও মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা না করে কোনো মানুষ, জাতি বা রাষ্ট্রের পক্ষেই উন্নতি করা সম্ভব নয়। বর্তমান বিশ্বসভ্যতার দিকে একটু সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করলেই দেখা যায় যে, জাপান, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মান, স্পেনসহ বিশ্বের যেসব জাতি উন্নতি ও মর্যাদার শিখরে আরোহন করেছে তার মূলে রয়েছে তাদের নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বজাত্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর ধরে চলার পথের বিভিন্ন বাঁকে বহু বিদেশি মত-পথ বাঙালি জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। এই বিভ্রান্তির কারণে বাঙালি যা হারাতে বসেছিল তা হচ্ছে তার আত্মপরিচয় ‘আমরা বাঙালি’। ধর্মান্ধ, ধর্মজীবী, মিথ্যাচারী ও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা  কোনো দিনই চায় না, বাঙালি তার আত্মপরিচয় নিয়ে এগিয়ে যাক। তবে এই সময়েও জাতির জীবনে এমন অনেক ঘটনাই সংঘটিত হয়েছে যার মধ্য দিয়ে জাতি সম্বিৎ ফিরে পাচ্ছে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা, অত্যাচার, নিপীড়ণ, নির্যাতন ও হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করে কেউ পৃথিবীতে সম্মানিত হয় না। নিজের দেশকে যারা ভালোবাসে, দেশের জন্য কাজ করে, জীবন দেয় তাঁরাই জগতে সম্মানের পাত্র-এসবকিছুই আজ বাংলার মাটিতে প্রমাণিত। তাই তো দেখা যায়, কেউই নিজেকে একাত্তরের রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিতে চায় না, সবাই মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির লোক  হিসেবে পরিচয় নিয়ে থাকতে চায়। ৭১’এ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সকল শক্তির পরিচয় ছিল তারা ‘জয় বাংলা’র লোক। এই ‘জয়বাংলা’ই বাংলাদেশের পরিচয় হোক, শ্লোগান হোক-যে শ্লোগান ছিল বাঙালি জাতির ভিত্তি, স্বাধীনতার ভিত্তি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। বাঙালি জাতির নতুন করে জাগরণের জন্য এই পরিচয়ের কোনো বিকল্প নেই। আজকের দিনের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী, দেশের মানুষের মাঝে দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও আস্থার দিকটি ফিরিয়ে আনতে শতভাগ বাঙালি জাতীয়তাবোধের জাগরণ তৈরি করা জরুরি হয়ে উঠেছে। দেশের সকল রাজনৈতিক দল এই জাগরণের পথে তাদের সকল শক্তি নিয়োজিত করবে-এটাই আজ সময়ের দাবি।

বাজারের ঈদ-উৎসব!

শাহ্ মহিউদ্দীন মাসউদ ॥ একজন পোষাক বিক্রেতা তার দোকানে একটি পোষাক বিক্রি করে আয় করেছেন বারো হাজার ছয়শত টাকা। আরেক দোকানী একটি পোষাক বিক্রি করেছেন যার মূল্য বিশ হাজার টাকা। এরকম দু’টি সংবাদ আমাদের সামনে এসেছে মিডিয়ার কল্যাণে। দু’টি পোষাকের একটি ঢাকাতে আর একটি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। ক্রেতা পোষাক দু’টি হয়তো ত্রিশ কিংবা চল্লিশ হাজার টাকায়ও কিনতেন। হয়তোবা অন্য কোন ক্রেতা কিনবেন ঈদের সময় যত এগিয়ে আসবে। আমরা হয়তো ভাবতে পারছিনা দোকানী এরকম কয়টি পোষাক বিক্রি করবেন বা কতোজন ক্রেতার এরকম ক্রয়ক্ষমতা আছে। নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি এরকম আর্থিক ক্ষমতার লোক আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। আমাদের এ ধারণার সবটা সত্যি নয়। গত চার দশকে আমাদের  দেশে রাজনীতি বড়লোক বা আর্থিক ক্ষমতার মানুষ, সমাজে স্থিতি নেয়ার যোগান দিয়ে আসছে, যাদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। লুটেরা বাজার অর্থনীতিতে এর প্রবৃদ্ধি, কোন আর্থিক নিয়ম শৃঙ্খলা দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। পকেটে লুটের টাকা থাকলে পাঁচ টাকার মাল পঞ্চাশ টাকায় কিনতেও যাদের হাত কাঁপে না, তাদের পরিসংখ্যান আমাদের কাছে না থাকলেও রাজনীতির কল্যাণে দেশের প্রতিটি জনপদেই তাদের সংখ্যা এখন যথেষ্ট।

আমরা আমাদের ছোটবেলায়, ঈদে নতুন জামা পোষাক পরতেই হবে এমনটা দেখিনি। বাবা মা এরকমটা চিন্তা করেছেন, তা-ও দেখিনি। আমাদের বেশির ভাগেরই দু’টির বেশি পোষাক থাকার বাস্তবতা ছিল না। ঈদের দিনের প্রস্তুতিতে আমরা আমাদের পুরাতন জামাটিকে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে ঈদের দিনে লুঙ্গির উপর পরিধান করে (আমাদের গ্রামীণ জীবনে পাজামার তেমন বালাই ছিলনা, প্যান্ট পড়ার প্রশ্নই ওঠেনা) ঈদ উদ্যাপন করতাম। তাতে আমাদের ঈদের খুশিতে কমতি ছিল বা ঘাটতি হয়েছিল, এমনটা মনে করতে পারছিনা। বরং, গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে, সকলের সঙ্গে দেখা করার বাসনা আমাদেরই ছিল, কারো বলার প্রয়োজন হয়নি। গুরুজনকে সালাম জানাতে সালামির প্রাপ্তি আকাক্সক্ষা, তখনও কারো মধ্যে বাসা বাঁধতে পারেনি। কেউ দুই চার আনা দিলে, খুশিতে ডগমগ হয়ে গোল্লা ছুট। এখনকার মতো নতুন টাকার বান্ডিল নিয়ে কেউ বসতেন না। টাকা দেখানোটা শোভনও ছিলো না। এখন সময় টাকা দেখাবার এবং সন্তানদেরকে বুঝতে দেয়ার, যে টাকাই ঈদ। তারাও সেরকমটাই আকাক্সক্ষা করে, প্রাপ্তিও ঘটে। তারপরই বাজারে দৌঁড়, ক্রেতা হবার আনন্দই যে ঈদ আনন্দ, সেটা তারা এই ছোট্ট বয়স থেকেই শিখে নিচ্ছে।

এখন সময় বদলে গেছে। গতি এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। ভেঙ্গে গেছে পুরোনো বহু ব্যবস্থাই। গ্রামীণ যোগাযোগ এক কথায় অসাধারণ না হলেও মূল্যায়ণ করার মতো। স্ব-কর্ম, সংস্থান বহুগুণে বেড়েছে। তাতে সৃজনশীল কর্মসংস্থান না হলেও রিকশার ব্যস্ততা এবং বাস্তবতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর মানুষ যখন বিজ্ঞানের নিত্য নুতন আবিষ্কারে ব্যস্ত তখন আমরা রিকশার আধুনিকায়নে বিপুল মনোযোগী। তাতে পরিবর্তন এসেছে, কায়িক পরিশ্রম কমেছে, আয়ও বেড়েছে। দারিদ্র্যের সীমাটা নিঃসন্দেহে কমেছে। তাদের অর্থ, ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। ভোক্তার এই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে বাজার অর্থনীতির প্রসার যে ঘটবে, সেটাই স্বাভাবিক। বেড়েছে মানুষ, দ্বিগুণেরও উপরে, তাই ভোক্তার সংখ্যাও বাড়বে, বেড়েছে। চাহিদা বাড়াতে পারলে মুনাফাও বাড়বে, এটা বাজার অর্থনীতি জানে। তাই ভোক্তাকে প্রাপ্তি আকাঙ্খা এবং প্রতিযোগী মন তৈরি করতে বিজ্ঞাপনী সংস্কৃতির চর্চা শুরু। সে এখন আকাশ ছুঁয়েছে। গভীর রাতে বেডরুমে তার উপস্থিতি, ভোক্তা না হবার কোন পথ থাকে না। প্রযুক্তি বিজ্ঞান তাদেরকে এক অসীম দুয়ার খুলে দিতে সাহায্য করেছে। তারাও তার অনু অনু ব্যবহার করার বিদ্যা-শিখে নিয়ে প্রয়োগ করে দেখলেন, এতো ব্রহ্মাস্ত্র। প্রয়োগের সাথে সাথে ভোগের সব দৈত্য যেনো কবর থেকে উঠে এলো। আর যায় কোথায়, বাজার এবং বাজার। সে এখন অন্তহীন অসীমের যাত্রায়। পিছে ফেরার সময় নেই, চাই-চাই এবং চাই, ঘুমের মধ্যেও পণ্য চোখের সামনে দাঁড়িয়ে, কিছুতেই পিছু ছাড়েনা। শেষ পর্যন্ত পণ্য বিক্রেতার কাছে কড় কড়ে নোট গুণে দিয়ে, তবেই শান্তি।

টাকার উৎস এখন অনন্ত, তবে যে সহজ পথে এই রাস্তা, কিছুজনের জন্য স্বর্গের দরজা খুলেছে, তা রাজনীতি এবং ধর্মের রাজনীতি যাকে গত সাড়ে চার দশকে কোনদিন কোন জবাবদিহিতায়, কোথাও দাঁড়াতে হয়নি। তার দেবার অসীম ক্ষমতা, পকেট কেন, বস্তা ভরেও যেনো তার শেষ নেই। স্বর্গের তিনিও এতটা দেবার ক্ষমতা রাখেন কী-না, তা নিয়ে সন্দেহের বিতর্ক অনেকের মধ্যেই জেগে উঠতে পারে! এই প্রাপ্তিযোগ এখন স্বর্গীয় হুর-গেলমানের জন্য মৃত অব্দি অপেক্ষা করতে রাজি নয়, প্রয়োজনও নেই। বাজার সব ব্যবস্থাই প্রস্তুত করে রেখেছে। আর তাই লাখ টাকায় পোশাক কিনে, সেই স্বর্গীয় অনুভূতি নেবার সুযোগ যখন হাতে আসে, পকেট বুঝিয়ে দেয় এতো নস্যি, তখন বাজারীরা বসে থাকবেন কেন? এককে শতকে কিংবা তারও বেশি উঠাতে না পারলে, তাদের বাজার মন্দা।

মানুষের ভোগস্পৃহাকে জাগিয়ে রাখতে পারলে বাজার জেগে থাকে। এটা বাজার অর্থনীতির মূলমন্ত্র। তাই তারা খুঁজতে শুরু করলেন কোন অস্ত্রটি এই বাজারকে জাগিয়ে রাখতে সক্ষম? তারা পেয়েও গেলেন, ধর্মসংস্কৃতিই সেই অস্ত্র, যে এই বাজারকে অনন্তকালের পথে নিয়ে যেতে পারে বা পারবে। হিসেব করে তারা দেখলেন প্রতিটি ধর্মই টিকে আছে তার আনুষ্ঠানিকতার বাতাবরণে। এবার তারা সেই আনুষ্ঠানিকতাকে বাজারজাত করতে নেমে পড়লেন। শতভাগ সাফল্য উৎপাদকের ঘরে। তারা দেখলেন পৃথিবীতে যে কয়টি বৃহৎ ধর্ম (জনসংখ্যার অনুগামীতার বিচারে) আছে, তাদের প্রত্যেকেরই একটি আনুষ্ঠানিকতার ভাণ্ডার আছে, সে ভাণ্ডারটি একবার বাজারে এনে উন্মুক্ত করতে পারলে, একেবারে নিপুণ ব্রহ্মাস্ত্র। মোটামুটিভাবে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এই চারটি ধর্মই পৃথিবীর অধিক জনসংখ্যার বিবেচ্য। তাদের প্রত্যেকেরই আছে বিপুল আনুষ্ঠানিকতা, সাধারণ দিনগুলোতে যেমন থাকে, তেমনি আছে বিশেষ দিনের বিশেষ প্রত্যাশায়। প্রত্যাশাকে রঙে-রসে টইটুম্বুর করে বাজারে আনার দক্ষতা, পণ্যবাজার বিনির্মাণে প্রতিযোগীকে হটিয়ে, জায়গা করে দেয়। তাকে সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকিয়ে ভোগস্পৃহাকে প্রতিযোগিতায় এনে ছেড়ে দিলে, সে তখন ভোগের মাত্রাকে নিজেই অসীমে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়, এটা মানব চরিত্রের একটি কঠিন দিক। এখানে কোন ধর্ম দর্শন উপাদেয় নয়। সক্রেটিস পণ্যবাজার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছিলেন। তিনি বলে দিলেন, পণ্য তুমি যতই আকর্ষণীয় হও, আমার কাছে তুমি কুৎসিত, তুমি দোকানীর শো’কেসেই শোভা বর্ধন করো, আমি মুক্ত। তাই তিনি সবার কাছে পূজ্য হতে পারেননি। কিন্তু ধর্মগুরুদের চৌকষ চালাকি বাজারী ধর্মকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আঁছড়ে পড়তে সাহায্য করেছে, আস্তিক্য মন এবং অঙ্গশোভনে। এসেছে মোড়ক। যত পারো নিজেকে মুড়িয়ে নাও। বাজার শিখাচ্ছে এই মোড়কই তোমার একূল-ওকূল দুকূল ছাপিয়ে দেবে। বিশ্বাসের বস্তুময়তায় ক্লান্তহীন চাহিদা পত্র। সকালেরটা বিকেলে শেষ, আর বিকেলেরটা পরের দিনের সুপ্রভাত বলার সুযোগে কৌলিণ্যে আঘাত আসে। এমনটা সেই ভোক্তারা করবেন, যাদের পণ্য ধর্মে বিশ্বাস নেই অথবা সামর্থ তৈরিতে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে পারেননি।

বাজারীরা তাদের এই হিসেব দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনে মিলিয়ে মানুষের মনে স্থায়ী আসন করতে সর্বাত্মক বাজার যুদ্ধ অব্যাহত রেখেছেন। তারা বলছেন এ সবই তোমার, তোমারই উপর ওয়ালার আশীর্বাদে, হেঁটে হেঁটে তোমার কাছে পৌঁছে গেছে, তুমি তুলে নাও, তুলে নাও। একটু দেরি হলেই তুমি হারবে, বঞ্চিত হবে স্বর্গীয় আশীর্বাদে। পড়ি কি মরি, দে ছুট বাজারে। এবার প্রতিযোগিতা, পণ্যবিক্রেতার সামনে সমীহ জাগানো নোটের বান্ডিলে। তার সব ভোগ এখন ধর্মের ছায়াতলে।

বাজারী অর্থনীতি মুসলমানদের দু’টি ধর্মাচারের আনুষ্ঠানিকতাকে লক্ষ্য করে, বাজার ব্যবস্থাকে সুবিন্যস্ত করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, ধর্মের মোড়কে। রমজানের ঈদ তার একটি। ধর্মের গুরুতত্ত্বের সম্পর্কহীন বিশ্বাস, কীভাবে তার ধর্মকে পণ্যের বাজরে বিক্রির প্রতিযোগিতায় নিলামে উঠিয়ে, নিজেকে ধার্মিক সৃষ্টির, অঢেল সুরঙ্গটি খুঁজে পেয়েছেন, তা কারোরই চিন্তার যৌক্তিক চেতনবিকাশে উপস্থিত রাখার প্রয়োজন হয়নি। পণ্যই ধর্ম, পণ্যকেই পেতে হবে। পণ্য সেই প্রিয়তম স্বস্তি। তাকে পেতে, নিজেকে প্রতিদিন বিক্রি করতেও অস্বস্তি নেই। তাই পেয়েও যাচ্ছেন। রমজানের সাতটি দিনও পার হতে পারেনি, চিন্তা করারও ন্যূনতম সুযোগ নেই, কেন তিনি উপোস করছেন বা করবেন, এই উপোসের উপাস্য কী পণ্য? বাজার তো তা-ই প্রমাণ করে। ক্রেতার উপস্থিতি এবং ক্রেতা হবার মরিয়া প্রচেষ্টা, তার-ই সাক্ষ্য দেয়। চিন্তার মধ্যে পণ্যই যখন সার্বক্ষণিক উপস্থিত তখন অন্য উপাস্য থাকেন কোথায়? সে প্রশ্নটি ধর্মগুরুরা করেন না, কারণ ভোগানুভূতিতে তাদেরও চৈতন্যের আচ্ছন্নতা কমাতে পারেননি, বরং কৌশলী মনটি নানান ফঁন্দি ফিকিরে, চিকন গলির পথটি আবিষ্কার করে, মধ্যম পথের মাধ্যমতায় কূল ধরিয়ে দিতে ক্লান্তহীন গলদঘর্ম। সকলেই খুশি, পাচ্ছি, খাচ্ছি, নিচ্ছি, লেপছি, পড়ছি, উড়োচ্ছি, ধর্মজয়ের পালে এখন দক্ষিণ হাওয়া।

পণ্যবিক্রেতারাও এখন মহা খুশি, ধর্মের আস্তরণে, লুটের মহারণে প্রতিদিনের কসরত। সাফল্য এখানেই তারা পারছেন। এক এ শতক বা হাজার। চলছে জোয়ার, চলবে মাস ধরে। চাহিদা এবং যোগান দিতে, এখন আর দেশীয় পণ্যই যথেষ্ট নয়, বিদেশী উৎপাদকরা সেটি বিবেচনায় নিবেন না, তা হয় কী করে? আধুনিক পৃথিবীতে বাজার ব্যবস্থা পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে, তাই এসেছেন তারাও। ছড়িয়ে পড়েছেন একেবারে তৃণমূলে। সেই বিজ্ঞাপনী সংস্কৃতি, পরিচিত করিয়ে দিচ্ছেন, ঝান্ডুবামের মতোই। গ্রামের ক্রেতারাও চিনছেন এবং বুঝছেন ঝান্ডুবাম এখন তারও প্রয়োজন। তাহলে লেহেঙ্গা তার কেন প্রয়োজন হবে না?

সুবিধা এই রাজধানীর বিখ্যাত বিপণী বিতানের লেহেঙ্গা বিশ পঞ্চাশ কিংবা লাখে উঠতে পারে, সে ক্ষেত্রে তৃণমূলের সুপারমলটি, তা আট/দশে পারবেনা কেন, তা-কী হয়? এরকম একটি লেহেঙ্গার মালিক হয়ে, নিজের কৌলিণ্যকে বাজারে ছড়াতে না পারলে, জীবন যে বৃথা। বাজারী ধর্ম সে জ্ঞান তো অনেক আগেই দিয়ে আসছে। তাইতো মাস ধরে সাধনা, পণ্যের মালিক হওয়া। হাজার দশেক খরচ করে পাঞ্জাবি পাজামার সাথে বাহারি চটি, পুরানো জমিদারী চলনের আস্বাদন নেয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। জমিদারি মরে গেছে কবে কিন্তু পণ্যবাজার তাকে এখনও জীবিত করেই চলছে। তাই প্রকাশিত হবেন ঈদের দিনে। ধন আর জনের প্রমোত্ত উলম্ফনে। মাঠ থেকে শুরু করে শ্রেণী বৈচিত্রের আনাগোনা আর সমাদরে। প্রতিযোগিতার সমাজে নিজের আসনটি পোক্ত করতে এরকম বাহারি ধর্ম উৎসব পালনের সুযোগ এখন কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। করেও না।

তাই কেউ কেউ ছুটবেন পণ্যের মালিক হওয়ার ধর্ম উৎসবের ধর্ম পালনে সিঙ্গাপুর, নিউইয়র্ক, লন্ডন অথবা প্যারিসের সৌরভে নিজেকে উৎসর্গ করতে। ষোল কোটির দেশে তারাই তো মালিক। সংখ্যায় কম, তবে ক্ষমতায় অসীম। সপ্ত আসমানের সকল কৃপা আশীর্বাদ, চুঁইয়ে পড়ছে তাদের শিরে দেশীয় রাজনীতির কল্যাণে। তাই বলে রমজানে মক্কা মদিনা ঘুরতে ভুল হয়নি তাদের। অঢেল কৃপা নিয়ে, এখন পণ্যের শ্রেষ্ঠ বাজারে পদাচরণা না হলে, আশীর্বাদের প্রমাণ মেলে কীভাবে? তারা যখন প্রমাণ রাখছেন, তখন যারা সে প্রতিযোগিতায় একটু পিছিয়ে পড়েছেন, তখন তারা নিদেন পক্ষে রাজধানীর শপিংমল তো খুঁজে নিতেই পারেন। সেটা তারাও করছেন। কেন করবেন না, এ যে পণ্য ধর্ম। তা পালন করতেই হবে।

এক মাসের সিয়াম কোন চিন্তাকে স্থান দেয়নি নিজেকে বদলাবার, খাদ্যভোগ আর বস্ত্রভোগের বাজারী চিন্তা ছাড়া।  মোহ আছে, কাম আছে, না পাওয়ার বেদনার তিক্ততা আছে। প্রয়োজন মিটাবার সকল ফন্দি-ফিকির আছে। নেই শুধু ত্যাগ এবং গ্রহণের মনের আকুতি। প্রতিযোগীমন সর্বক্ষণ হাহুতাশে অস্থির। পেতে হবে, নিতে হবে, জিততে হবে নিজের সামাজিক অবস্থান প্রমাণে। কিন্তু, নিজের কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের কোন লক্ষণ নেই। সেখানে আয়নায় নিজের মুখ, বরাবরই কদাকার। তাই অন্যের মুখ থেঁতলে দেবার তীব্র বাসনায়, সিয়ামের ধর্ম উৎসব। জিতেছে বাজার। পণ্যের বাজার। ছেলে বুড়ো, যুবক-যুবতী কেউ শোনেনি পণ্যবাজারের আহ্বান এমনটা মেলা ভার। এই-ই আমাদের ঈদের বাজার বা বাজারের ঈদ-উৎসব।

আদর্শিক রাজনীতির বিকল্প নেই

অ্যাডভোকেট এম.মাফতুন আহম্মেদ ॥ আদর্শের উপর ভিত্তি করে একটি দেশ গড়ে উঠে। একটি জাতি দুর্বার গতিতে উন্নতির সোপানে এগিয়ে চলে। আদর্শের বিচ্যুতি হলে একটি জাতির পতন তরান্বিত হয়। জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে ফেলে। তাই ব্যক্তির যেমন কিছু আদর্শ থাকে তেমনি রাজনৈতিক দলেরও কিছু আদর্শ-চিন্তা-চেতনা থাকে। এই আদর্শ ও চিন্তা-চেতনার ওপর ভিত্তি করে একজন সাধারণ ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মী এগিয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। দেশ ও জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার চেষ্টা চালায়। কঠিন দুঃসময়ে জাতির পাশে এসে দাঁড়ায়। অনাদর্শিক চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত কোন রাজনৈতিক দলকে প্রকৃত অর্থে দল বলা যায় না। এই উপমহাদেশে অনেক রাজনৈতিক দলের উত্থান হয়েছে। আদর্শহীনতার কারণে অনেকের পতন ঘটেছে। যেখানে আদর্শ নেই, সেখানে চেইন অব কমান্ড বলে কিছু থাকে না, ফলে নেতা-কর্মীরা পরস্পর হয়ে উঠে বিক্ষুদ্ধ ও উশৃঙ্খল। শুরু করে বিশ্বাসঘাতকতা আর পালন করে দলের অভ্যন্তরে বিভীষণের ভূমিকা। নেতা-কর্মীরা হয়ে পড়ে খন্ড-বিখন্ড। এক পর্যায়ে একটি রাজনৈতিক দল নিক্ষিপ্ত হয় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে।

এদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে আদর্শের কোন চর্চা নেই। আদর্শ শেখানোর কোন ব্যবস্থা    নেই। এক সময় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে আদর্শের চর্চা ছিল। তাদের কাছে ক্ষমতা নয় আদর্শই ছিল বড় কথা। আদর্শিক চেতনাই ছিল বড় চেতনা। এই চেতনাকে লালন করে এই উপমহাদেশে যুগ যুগ ধরে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কমিউনিষ্টরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আন্দোলন করেছেন শুধুমাত্র আদর্শের উপর পুঁজি করে। তাদের সবারই একটি আদর্শ ছিল; একটি দর্শন ছিল। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষের উপরে বড় কিছুই নেই’। তাই মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তারা নিরন্তর লড়াই করেছেন। এই লড়াইয়ে কেউ শহীদ হয়েছেন। অনেকে গাজী হয়ে মুক্ত স্বাধীন দেশের পুনর্গঠনে কাজ করেছেন। তাদের বেশীরভাগই ক্ষমতার জন্য নয়, আদর্শের জন্য লড়াই করেছেন। জনগণের মুক্তিই ছিল তাদের কাছে প্রধান আদর্শ। এই আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু তারা সংগ্রাম করে  গেছেন।

একটি আদর্শের উপর শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে একটি দল, একটি দেশ, একটি সমাজ। আদর্শের মৃত্যু হলে গোটা জাতির মৃত্যু হয়। আদর্শিক ধারণার উপর ভিত্তি করে একটি সরকারের রাষ্ট্রীয় পলিসি নিয়ন্ত্রিত হয়। আজও দেশে-দেশে সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, তবে সরকারের পলিসি পরিবর্তন হয় না। তাই আদর্শের বিচ্যুতি হলে একটি রাষ্ট্রের পতন ঘটার পথ তৈরী হয়। সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে তোলে। দলের সর্বনাশ ডেকে আনে। দেশের আপামর জনগনের জন্য দুর্দশা বয়ে আনে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন নজির যথেষ্ট পরিমানে রয়েছে।

একজন বিপ্লবীর মৃত্যু আছে, কিন্তু বিপ্লবের মৃত্যু নেই। আদর্শের কোনদিন মৃত্যু হয় না। বন্দুকের নল দিয়ে, শক্তির জোরে ক্ষমতা দখল করা যায়। কিন্তু সে ক্ষমতার স্থায়িত্ব কতটুকু! রাজনৈতিক বোদ্ধা মহলের মতে সাময়িক। আদর্শের ওপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক দলের ছাতার নীচে লাখো লাখো কর্মী সমবেত হয়, নেতা তৈরি হয়, কর্মী উৎপাদন হয়। দর্শনের উপর ভিত্তি করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এর চর্চা নেই বললেই চলে। ফলে দলের অভ্যন্তরে পারস্পরিক দ্বন্ধ, হামলা-মামলা খুন-গুম, নৈরাজ্য লেগেই থাকে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই বিশৃঙ্খল কোলাহল পরিবেশ আর কত দিন চলবে? জাতি হিসেবে এর থেকে পরিত্রানের কী কোন উপায় নেই?

এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যত না আদর্শিক চেতনায় বিশ্বাসী তার থেকে তারা অধিক ক্ষমতা লোভী ও পরস্পর যুদ্ধংদেহি। আর এই ক্ষমতার লোভে, পদের লোভে পরস্পর হয়ে উঠে মারমূখি। দেশের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল আ’লীগ, বিএনপি। পালাবদলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে আসছে। এরা পরস্পর যত না মারমুখি, তার থেকে স্ব-স্ব দলের অভ্যন্তরে বিভীষণের সংখ্যা বেশি। আওয়ামি লীগ-বিএনপি’র রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর অধিকাংশই দলের গঠণতন্ত্র বা আদর্শিক বিষয়বস্তু নিয়ে কোন চর্চা করেন না। অনেক কর্মী জানেন না তার রাজনৈতিক দল কোন আদর্শের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এর অন্যতম কারণ তারা দলীয় আদর্শ চর্চা করেন না, দলীয় গঠনতন্ত্রের পাতা উল্টে দেখেন না এর ভেতরে কী লেখা আছে? তবে পরস্পর কদার্য সমালোচনা ও নোংরামিতে ব্যস্ত। দলের অভ্যন্তরে দলাললি, খুন-খারাবি নিয়ে ষড়যন্ত্রে মত্ত। আমজনতাকে অন্ধকারে রেখে কালো টাকার পাহাড় বানাতে নানা ফন্দিতে ব্যস্ত। গড়ে তোলছেন নানা সিন্ডিকেট আর দলের নেতা-কর্মীদের ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজের আখের গোছানোর চেষ্টায় রত। নেতার ষড়যন্ত্রে কর্মী অকালে জীবন হারান। কর্মীর আঘাতে নেতা নির্মমভাবে খুন হন। আত্মঘাতি রাজনৈতিক কর্মে লিপ্ত থাকেন। দলও নির্লিপ্ত, সচেতনার কোন ব্যবস্থা নেই, কোন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই, সবই চলছে বায়বীয় কায়দায়।

জীবনের বাঁকে বাঁকে অতীত কিছু স্মৃতি মাঝে-মধ্যে স্মরণ করিয়ে দেয়। কাছে থেকে দেখেছি রাজনীতির নামে বিষবৃক্ষ আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির এই রঙ্গালয় থেকে কী শিখছি? নোংরামিতা এবং অনাদর্শিক চিন্তা-চেতনা আমাদের কোন কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে। আদর্শ দিয়ে এক সময় আর একটি আদর্শকে মোকাবেলা করা হতো। এ সবের এখন আর কোন চর্চা নেই। এখন দল করতে যেয়ে অপর দলের বিরুদ্ধে বুদ্ধিভিত্তিক লড়াই করা লাগে না, মেধা অপচয়ের কোন প্রয়োজন পড়ে না। চেয়ার দখল করতে যেয়ে এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে যেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলে। পরস্পরের মধ্যে চলে রক্তের হোলিখেলা।

কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। একজন গণতন্ত্র মনস্ক ব্যক্তি দেশকে শ্রদ্ধা করে। যে কোন আদর্শকে লালন করে, প্রিয় দেশকে হৃদয় দিয়ে ভালবাসে। সুস্থ মস্তিকের কোন ব্যক্তি দুর্বৃত্তকে কখনও লালন করতে পারে না। সমাজ সচেতন একজন ব্যক্তি অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে পারে না।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত যুগে যুগে ছিল। মানুষ এদের ঘৃণা করত। এড়িয়ে চলত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজনীতি করবেন? মানি-ম্যাসলমান পুষতে হবে। ভোট ডাকাতি করবেন, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবেন, সব কথার শেষ কথা দুর্বৃত্ত লালন করতে হবে। এসব পালনে ব্যর্থ হলে রাজনীতির পাঠশালা থেকে নিজেই শটকে পড়বেন। অসত্যের কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে।

আদর্শের বিপরীতে একটি দলে গুন্ডা, সন্ত্রাসিরা যদি হোতা হয়, নেতা হয়, সে রাজনৈতিক দলে মানুষ ভিড়বে কেন? এসব রাজনৈতিক দলের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে কেন? এসব গুন্ডা, সন্ত্রাসিরা দল করতে আসেনি। এরা দেশ-জাতিকে ধ্বংস করতে এসেছে। এরা দুর্বৃত্ত, এরা ধ্বংসকারি, এরা বিভীষণের ভূমিকা পালন করে দলকে ধ্বংস করছে। দেশ-জতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। এদের পরিচয় এরা সন্ত্রাসি। এরা পরস্পর অনৈতিক কাজে অভিন্ন। একে অপরের সাথে রয়েছে গভীর সখ্যতা। এরা সব সরকারের আমলে মিলে-মিশে চলে। দেশ বিক্রির পাঁয়তারা করে। একে অপর লুটেপুটে মিলেমিশে খেয়ে পরে জড়িয়ে থাকে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হলে আদর্শ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আদর্শ দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হবে। সারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিচ্ছবি দেখলে দেখা যায় সব দলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক মেধা বা প্রজ্ঞা দিয়ে মোকাবেলা দূরের কথা চেয়ার দখলের আশায় আত্মঘাতি হামলা-মামলার শিকারে বিধ্বস্ত। কোন রাজনৈতিক দল প্রাথমিক পর্যায়ে আদর্শ দিয়ে গড়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত আদর্শিক চেতনার উপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তাই কোন রাজনৈতিক দলে আদর্শের আলোকে গড়ে উঠেনি কোন কর্মী। টাকা হলেই এক চ্যান্সে নেতা। অত:পর সাংসদ, মন্ত্রী। আর এ সব হাইব্রিড়দের কারণে প্রতিটি দলে অস্থিরতা লেগেই আছে। এর থেকে পরিত্রানের একমাত্র পথ গণতান্ত্রিক চেতনার আলোকে দল পুর্নগঠন করা। নেতা-কর্মীদের দলীয় আদর্শের আলোকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া। দলের সুবিধাবাদিদের চিহ্নিত করে বিদায় করা। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত যথাযথ মূল্যায়ন করা। আদর্শকে বুকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে গেলে নিজের ও দেশের কল্যান। বাঙালি জাতি বাঙালি জাতীয়তাবোধের আলোকে জাগ্রত হোক তবেই এদেশে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি।

ফতোয়াবাজিতে ধর্মীয় মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হয়

যাহারা ঈমান এনেছ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ্‌র এবং আনুগত্য কর রাসুলের এবং তাহাদের যারা তোমাদের মধ্যে আদেশ দেয়ার অধিকারী। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা মতভেদ কর তাহলে তোমরা উহা আল্লাহ্‌ এবং রাসুলের প্রতি সমর্পণ কর যদি তোমরা আল্লাহ্‌ এবং শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখ। ইহা বড়ই কল্যাণজনক এবং পরিণামের দিক দিয়ে অতি উত্তম (সূরা ৪:৬০)।

 

সংলাপ ॥ কোন রাষ্ট্রের সংবিধান, সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য পবিত্র আমানত এবং ধর্মীয় পুস্তকের মতো পবিত্র। তাকে মেনে চলার অর্থই হল নাগরিক ধর্ম-পালন করা। ব্যক্তি জীবনে আমরা যে ধর্মাবলম্বীই হই না কেন জাতি হিসাবে যখন আমার পরিচয় আসে তখন প্রথম আমি বাঙালি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথা আসে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র এমনকি সৌদি আরবেও এর বাস্তবতা দেখেছি। ১৯৮২/৮৩ সন হবে সৌদি আরবে ‘আরব নিউজ’ পত্রিকায় সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলিষ্ঠ কণ্ঠে এক সাক্ষাৎকারে বলেন – প্রথমে আমি আরব তারপর মুসলমান। আমি এটা পড়ে খুব আশ্চর্য হয়েছি যে সত্যটা বলতে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। শুধু তাই নয় এর মধ্যে থেকেই জাতীয়তা বোধ ও দেশপ্রেম যে কতটুকু তা ধরা পড়ে। বাঙালি বাংলাদেশী হিসাবে যখন সংবিধান মেনে নিয়ে নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিই তখন আমার জীবনে প্রথম লক্ষ্য হওয়া দরকার সংবিধানকে কতটা মূল্য দিচ্ছি ও সম্মান প্রদর্শন করছি আমার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মধ্যে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা। আমি যেই হই না কেন; মন্ত্রি, সরকারি কর্মচারী, রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা, ধর্ম-প্রচারক, ছাত্র বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যখনই চিন্তা করবো অর্থাৎ আত্মবিশ্লেষণ করবো তখনই আমার কাছে অতি সাধারণভাবে ধরা পড়বে সংবিধান অনুসারে আমি কি দৈনন্দিন জীবনে আইন মেনে চলছি? এ উপলব্ধিবোধ আমার আসলে আমার পরিবারে তথা সমাজ তথা সারাদেশে অজান্তেই সামাজিক পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এ বোধ আসছে না কারণ আমি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। ধর্ম আগে না দেশ আগে এই চিন্তায় বিভোর। আর তাই কুচক্রীরা সুযোগ পাচ্ছে আমাদের ব্যবহার করতে। প্রকৃতপক্ষে ধর্ম আগে না দেশ আগে এর বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং আমার জীবনে তা প্রতিফলিত করতে হবে।

উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট-আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত যে কর্তৃপক্ষ তাহার অনুগত থাকা আল্লাহ্‌ ও রাসুলের অনুগত থাকার মতই জরুরি। অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের সংবিধান এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি অনুগত থাকা আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের একটি অঙ্গ এবং যদি কোন স্থানে বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের অগোচরে ক্ষুন্ন হয় তাহলে অবিলম্বে সচেতন ধর্মীয় নেতা, প্রচারক, শিক্ষক বা নাগরিকের উচিত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য, কিন্তু তা না করে স্বৈরাচারী হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মনগড়া ফতোয়া দিয়ে বা ষড়যন্ত্র করে কোন স্থানে বা জনগোষ্ঠীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহীতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে।

যখনই মনগড়া ফতোয়া দিলাম তখনতো রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে পড়লাম, ধর্মের নামে অধর্ম করলাম এবং কলংকিত হলাম। সরকার বিচার করুক না করুক নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যাবে না-বিবেক দংশাবেই। তার হাত থেকে রেহাই পাবেন না যতই মুনাফেকী হাসি হাসেন না কেন সত্য-সত্যই। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটবেই।

ধর্মীয় বিশ্বাস কারো উপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া যায় না এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃংখলা ও উন্নতির পথে বাঁধা সৃষ্টি করা সহজ বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে যেখানে অশিক্ষিতের হার ৬০%। আমাদের দেশে এক কুচক্রী সংগঠন ধর্মের ছত্র-ছায়ায় আমদানিকৃত বাহ্যিক লেবাছ সর্বস্ব হয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঢুকে পড়ে ধর্মপ্রচারের নামে যে অপব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের রুটী-রুজীর ব্যবসা চালাচ্ছেন এবং ধর্ম গেল ধর্ম গেল বলে সোর তুলছেন আসলে তারা কি ভেবে দেখেছেন ধর্মীয় আঙ্গিকে এর মূল্য কতটুকু? যদি সত্যিই কিছু দেখেন তাহলে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না কেন?

তাহলে কি তাদের স্বভাবজাত-ধর্ম পানি ঘোলা করে মাছ ধরা। কিন্তু এতে কি কোন ফল হবে?

লোকের যদি আহারের জন্য খাদ্য, পরনের জন্য কাপড়, বসবাসের জন্য গৃহ না থাকে অথবা ওই সমস্তের জন্য অর্থ না থাকে তবে তার পক্ষে বাহ্যিক আল্লাহ্‌র ইবাদত করতে যাওয়া ভন্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়।

ধর্মের নামে আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা পায়চারী করছেন, বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সংগঠন করে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বিভিন্ন ফতোয়া জারীর মধ্যে দিয়ে-একবার কি ভেবে দেখেছেন যে এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা যাবে না বাংলাদেশের বুকে। আবার সত্যধর্মও প্রচার হবে না বরং ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের বিতৃষ্ণার সৃষ্টি হবে। সত্যিই ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য দরদী হলে আপনাদের পিছনে যে বৈদেশিক সাহায্যের পাহাড় আছে তার অপব্যয় না করে বৈদেশিক সাহায্য সম্পদ এবং নিজেদের সম্পদ একত্রিত করে গ্রাম গঞ্জে ভূমিহীন দুস্থ, গরীবদের মধ্যে বসবাস করুন। সাহায্য করুন তাদেরকে স্বাবলম্বী হতে তাহলেই প্রকৃত শান্তি (ইসলাম) ধর্ম পালন হবে ও জনগণ আপনাদের পিছনে কাতারবন্দী হবে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত পাহাড়ী অঞ্চলে যে সমস্ত অধিবাসী আছে তাদের কাছে শিক্ষা ও সেবা নিয়ে এগিয়ে যান তাহলে দেখবেন সত্যিকার ইসলাম ধর্মের রূপ। অন্যথায় ফতোয়া দিয়ে বা ষড়যন্ত্র করে, রাষ্ট্র ক্ষমতার লোভে ধর্মের অপব্যাখ্যা প্রচার করে সমাজে যতই বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চান না কেন-ফল কিছুই হবে না বরং রাষ্ট্রদ্রোহীতার ছাপ নিতে হবে এবং নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়তে হবে জাতির কাছে। বিশ্বাস ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়বেন।

সত্যমানুষ হওয়ার আহবানে – সংলাপের ২৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হলো

 

20160130_133902

যারা হত্যাকারী তারা ইসলামকে ব্যবহার করে, ধর্মের নামকে ব্যহার করে এবং ধর্মের প্রতি মানুষের যে সহজাত
দুর্বলতা সেটাকে কাজে লাগিয়েই তারা হত্যাকাণ্ড ঘটায়। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়েও তারা ধর্মের নামে এই কাজটি করেছে।

– প্রধান অতিথি আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, মাননীয় মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

 

শাহ্‌ সারফুল ইসলাম ॥ ‘এদেশে সাংবাদিকতা একসময় মিশনারী কাজ ছিল। আমার জানামতে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ  এর সঙ্গে যে সব সাংবাদিক সংবাদকর্মী জড়িত তারা একে মিশনারী কাজ হিসেবেই বেছে নিয়েছেন এবং স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে পত্রিকাটিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ করে আসছেন-যা সাম্প্রতিককালের সংবাদপত্র প্রকাশনা ও সাংবাদিকতার জগতে একটি নতুন অধ্যায় তৈরী করেছে।’ বর্তমান সংলাপ নিয়ে এই মন্তব্যটি করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতৃত্বের জনপ্রিয় মুখ, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক শাহ আলমগীর।

বর্তমান সংলাপ কেন করছে কেন পারছে প্রতিকূল স্রোতে ভেসে এই অসাধ্য সাধন করতে? এর উত্তরও খুঁজেছেন শাহ আলমগীর- ‘ধর্মান্ধতা নয়, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে মানুষ ধার্মিকতার পথে পরিচালিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও দেশ বিনির্মাণ এর দিকে এগিয়ে যাবে এটাই পত্রিকাটির মূল লক্ষ্য।’

ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, প্রাতিষ্ঠানিক জীবন, সমাজ জীবন এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুক্তির অবিকল্প পথ হচ্ছে সত্য তুলে ধরা, সত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিতি হওয়া। বাংলা সত্য, বাঙালি সত্য, বাংলা ভাষা সত্য, মুক্তিযুদ্ধ সত্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সত্য; এই সত্যের পথ ধরে একদিন ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপান তলে’ কোটি প্রাণ বলিদানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে একদিন অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। এই সত্যকে সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়েই একদিন একুশ শতকের পৃথিবীর বুকে সমৃদ্ধ, গর্বিত বাঙালি জাতির পুনরোভ্যুদয় ঘটানো সম্ভব। আর তার জন্য চাই সত্যমানুষ।

“সত্যমানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে” – যুগাবতার সত্য সাধকের কালজয়ী এই আহ্বান দিক্‌ হতে দিগন্তে ছড়িয়ে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে বর্তমান সংলাপ প্রকাশনার ২৩ বর্ষপূর্তি উদযাপন করেছে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে। গত ৩০ জানুয়ারি, শনিবার বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার প্রধান আকর্ষণ ছিল গুণীজন সংবর্ধনা। স্ব স্ব অঙ্গনে বরণীয় নিজ দর্শনে  এমন ১১ জন গুনী ব্যক্তিকে অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয় মর্যাদাপূর্ণ হার্দিক বর্ণিল সংবর্ধনা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চেয়ারম্যান ড. এম গোলাম রহমান এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) এর মহাপরিচালক শাহ আলমগীর।

হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর সভাপতি শাহ্‌ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ-উল ইসলাম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এই সংবর্ধনা। সভায় যাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয় তাঁরা হলেন বাউল সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী সাধিকা ফরিদা পারভীন, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ছদরুল আমিন রেজভী, বিশিষ্টমুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক খুররম শাহরিয়ার, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক প্রফেসর শাহ্‌ আব্দুল হালিম মিয়া, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক শাহ্‌ শহীদুল আলম, গবেষক ও তরুণ রাজনীতিক বাহাদুর বেপারী, বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আলমগীর হায়দার, বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক এ্যাডভোকেট সুবোধ চন্দ্র দাস, বিশিষ্ট সাংবাদিক শরিফা বুলবুল, হাক্কানী পরিবার থেকে সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী, সালমা আক্তার এবং সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী শাহ্‌ আশরাফুল আলমকে।

বেলা ১২ টা ১ মিনিটে অনুষ্ঠানমালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে চলে সম্মানিত অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছায় আন্তরিক বরণের পালা। হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠের একদল শিক্ষার্থী মিলনায়তনের প্রবেশের পূর্বে দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে অভিবাদন জানান অতিথিদের। বিদ্যাপীঠের চৌকষ বাদক দল ড্রামের তালে তালে ঘোষণা দেন অতিথিদের শুভ আগমন বার্তার। তারপরেই মিলনায়তনের প্রবেশ মুখে অতিথিদের বরণ করে নেয়া হয় উত্তরীয় পরিধান ও পুষ্পার্ঘ দিয়ে। প্রধান অতিথি আ ক ম মোজাম্মেল হককে  উত্তরীয় পরিয়ে ও ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহ্‌ সূফী শেখ আমজাদ হোসেন ও পৃষ্ঠপোষক মন্ডলীর সম্মানিত সদস্য খালেদা খানম রুনু। বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সম্মানিত চেয়ারম্যান ড. এম গোলাম রহমান-কে উত্তরীয় পরিয়ে ও ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের মহাসচিব শাহ্‌ এন. সি. রুদ্র ও মিরপুর আস্তানা শরীফ মহিলা ব্যবস্থাপনা সংসদের মহাসচিব শাকিলা ইসলাম, বিশেষ অতিথি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সম্মানিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী-কে উত্তরীয় পরিয়ে ও ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেন শাকিলা ইসলাম ও শাহ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন, বিশেষ অতিথি পিআইবি মহাপরিচালক বিশিষ্ট সাংবাদিক শাহ্‌ আলমগীর-কে উত্তরীয় পরিয়ে ও ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে বরণ করে নেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর সহ-সভাপতি এ্যাডভোকেট ওয়াহিদুজ্জামান ও শাহ্‌ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন।

পবিত্র জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুভ উদ্বোধনের পর সম্মানিত অতিথিবৃন্দের আসন গ্রহণ পর্ব শুরু হলে মঞ্চে একে একে আসন গ্রহণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি গণপ্রজাতন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার চেয়ারম্যান ড. এম গোলাম রহমান, বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট সাংবাদিক বাংলাদেশ প্রেস ইনন্টিটিউট মহাপরিচালক শাহ্‌ আলমগীর, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক শাহ্‌ সূফী শেখ আমজাদ হোসেন, পৃষ্ঠপোষকমন্ডলীর সদস্য খালেদা খানম রুনু, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ এর সভাপতি শাহ্‌ সূফী ড: মুহাম্মদ মেজবাহ-উল ইসলাম, হাক্কানী ট্রাস্টের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্ণেল কাজী সেলিম উদ্দিন, কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আলোচনা কেন্দ্রের সভাপতি শাহ্‌ মোঃ লিয়াকত আলী এবং হাক্কানী মহিলা উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি শাহ্‌ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন।

তারপর সংলাপ ভাবনা নিয়ে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বর্তমান সংলাপের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. আলাউদ্দিন আলন। এরপরেই শুরু হয় গুণীজনদের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান পর্ব। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের কাছ থেকে একে একে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন বাউল সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী সাধিকা ফরিদা পারভীন, প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও ইসলামী চিন্তাবিদ ছদরুল আমিন রেজভী, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক খুররম শাহরিয়ার, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক প্রফেসর শাহ্‌ আব্দুল হালিম মিয়া, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক শাহ্‌ শহীদুল আলম, বিশিষ্ট গবেষক ও তরুণ জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বাহাদুর বেপারী, বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আলমগীর হায়দার, গবেষক ও লেখক এ্যাডভোকেট সুবোধ চন্দ্র দাস, বিশিষ্ট সাংবাদিক শরিফা বুলবুল, হাক্কানী পরিবার থেকে সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী, সালমা আক্তার, এবং সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী শাহ্‌ আশরাফুল আলম।

প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন ও গুণীজন সংবর্ধনার এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের পরবর্তী পর্বে ছিল হামিবা সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালনায় পরিবেশিত সাংস্কৃতিক পর্ব। সত্যের প্রতিধ্বনি শিরোনামে আয়োজিত মনোজ্ঞ এই সাংস্কৃতিক পর্বের শুরুতেই ঘোষকের কণ্ঠে ভেসে আসে… …

‘তাল আর সুর নিয়ে মানুষের জন্ম। সময়ের সাথে সাথে চিন্তা জগতের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাল আর সুরকে কেন্দ্র করে। অনুভূতি আর উপলব্ধির চলমান স্রোতে দেহ তরঙ্গায়িত হয়, আসে ভক্তি ও ভাব। মহাভাবের বলয় নির্মাণ হয় বিশ্বাস ও সমর্পণের মধ্য দিয়ে। চেতনায় সমৃদ্ধ, প্রকৃতি হয়ে উঠে উদ্বেলিত। সময়ের তালে তালে এবং সত্য সাধনার পথে ছন্দের তালে তালে ও সুরে সুরে সমাজের প্রয়োজনে জাতীয় জীবন তরঙ্গে- রূপান্তর ঘটাতে প্রকৃতি যেমন ক্ষণে ক্ষণে রূপের পরিবর্তন ঘটিয়ে হয়েছে চলমান – তেমনি জাতীয় জীবনে সমাজ সংস্কারে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে বর্তমান সংলাপ, হতে চায় সত্যের অতন্দ্র প্রহরী।’

তারই প্রতিধ্বনি তুলে পরিবেশিত হয় দলীয় সঙ্গীত ‘সত্যের অতন্দ্র প্রহরী’। এই দলীয় সংগীতের তালে নজর কাড়া দলনৃত্যের সংযোজন ছিল তাৎপর্যবহ ইঙ্গিতময়। শিশুশিল্পী রাজলক্ষী, নদী, রাইসা, আভা, নিটোল, সাজনা, ইশামা, তানজিলা, ডোনা, শাহনুর, আলভি, টিটু, হৃদম, ইব্রাহীম, তানজিম, দীঘি, অর্ক, মানসুরা, রুমা এই মাটিতে শান্তি, সম্প্রীতি সৌহার্দের মেলবন্ধনে হাজার বছর ধরে বসবাসরত প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতীকী প্রতিনিধি হয়ে তুলে ধরেন বাংলা শান্তির ভূমি, বাঙালি শান্তির জাতি। পরবর্তী দলীয় ‘আমারই দেশ, সব মানুষের, সব মানুষের’। দলীয় সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করেন রাজলক্ষী, নদী, রাইসা, আভা, নিটোল, সাজনা, ইশামা, তানজিলা, ডোনা, শাহনুর, আলভি, টিটু, হৃদম, ইব্রাহীম, তানজিম, দীঘি, অর্ক, মানসুরা, রুমা, ওয়াহিদ, ওস্তাদ বাবলা, ওস্তাদ হানিফ রতন, শাহ্‌ শওকত। তারপর ভেসে আসে ওস্তাদ হানিফ রতনের কণ্ঠে ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’। সর্বস্তরে, সর্বকালে আহ্বান থাকে মানবজাতির উন্নয়নের জন্য। কিন’ মানবজাতি পার্থিব বলয়ের মধ্যে পড়ে অনেক সময় তার হুশ বা উপলব্ধি ভুলে গিয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে। তাই বারবার সমাজ স্বরূপের সমাহার থেকে সত্যমানুষ এর আহ্বান নিয়ে ওস্তাদ আকরাম হোসেন বাবলা পরিবেশন করেন ‘উৎসর্গ করো জীবন মানবজাতির কল্যাণে’।

সত্যের প্রাণবন্ত প্রতিধ্বনি ঘটে এ পর্যায়ে বাউল সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন এঁর কণ্ঠে লালন সাঁইজীর কালজয়ী গান ‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’। ডা. সুমাইয়া সুলতানা সুম্মী পরিবেশন করেন ‘এ মাটি রক্তে আমার মিশে আছে’।

বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার জল, বাংলার বাতাসের আস্বাদ নিয়ে আমরা বাঙালি। বাংলায় আগুন, মাটি, পানি, বাতাস সৃষ্টির স্রোতধারায় সত্যের বন্দনায় চলতেই থাকবে। সেই সত্যের জয়কে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হাক্কানী পরিবারের অবস্থানকে জানান দিতে পরিবেশিত হয় দলীয় সঙ্গীত ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। তারপরেই তীরহারা এই ঢেউ এর সাগর পাড়ি দিব রে’। এরপর একে একে কুষ্টিয়া থেকে আগত শিল্পী জহিরের কণ্ঠে ‘না জানি ভাব নদীর কেমন ধারা’, শিল্পী রাজীবের কণ্ঠে ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপানো তলে’, শিল্পী পথিকের কণ্ঠে ‘এই বাংলায় এসেছিল দুর্জয় শপথের দিন’ এবং শিল্পী মানিকের কণ্ঠে ‘বল ক্ষ্যাপা তুই খুঁজিস কারে দেশে-বিদেশে’ পরিবেশিত হয়।

জীবন চলার পথে সুখ-দুঃখ, হতাশা, জরা ব্যধি নিয়ে মানুষ যখন অশান্ত হয়ে উঠছে তখন সত্যমানুষের অন্বেষণে তার মধ্যে আসে ব্যাকুলতা। অন্তরের ব্যাকুলতায় প্রকাশিত হয়ে পড়ে তার চাওয়া পাওয়া। উপেক্ষা করে তার যন্ত্রণা। আর ঠিক এই অবস্থায় ব্যাকুল চিত্তের ভাব ঝরে পড়ে হাক্কানী মরমী শিল্পী শাহ্‌ শওকত আলী খানের উতলা কণ্ঠে  ‘সত্যমানুষ কেমনে আমি হবো’। তারপরেই আবারো দলীয় কণ্ঠের গান ‘আবার ফেব্রুয়ারি আবার গর্জমান, আবার সাত’ই মার্চ আবার বর্তমান’।

মানবতা না থাকলে সত্য প্রকাশ হয় না। আবার সত্য না থাকলে মানবতা অবমূল্যায়িত হয়। তাই সব সময় চিত্তকে জাগ্রত রাখতে হয় মানবতার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। সেই দৃপ্ত প্রত্যয় উঠে আসে দলীয় সঙ্গীতে ‘মানবতার মহানব্রতে সত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নি:স্বার্থ কর্মের আদেশ/এই আমাদের বাংলাদেশ’।

টানা সাড়ে পাঁচ ঘন্টার রুদ্ধশ্বাস অনুষ্ঠান মালার সমাপ্তি ঘটে অনুষ্ঠানের সভাপতি শাহ্‌ সূফী ড: মুহাম্মদ মেজবাহ-উল ইসলাম এর হার্দিক শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে। গোটা অনুষ্ঠানমালা সঞ্চালনে ছিলেন শাহ্‌ শাহনাজ সুলতানা, নজরুল ইসতিয়াক, ফরিদা খাতুন মণি এবং আব্দুল কাদের টিটু।

বর্তমান সংলাপের ২৩ বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের বিস্তারিত ভাবধারা….

আ ক ম মোজাম্মেল হক এম পি

প্রধান অতিথি, মাননীয় মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়20160130_131834

প্রতিষ্ঠাবার্ষিক উদ্‌যাপন এবং গুণীজন সংবর্ধনা সভার সম্মানীত সভাপতি শাহ্‌ সূফী ড. মেজবাহ-উল ইসলাম, আমাদের সামনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রেখেছেন স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যিনি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য দীর্ঘদিন যাবত আন্দোলন করে আসছেন, আমার অত্যন্ত আপনজন নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভি, আজকে যারা সম্মাননা পেয়েছেন, বরণ করে নেয়া হয়েছে গুণীজন হিসেবে তাদের মধ্যে আছেন লালনকন্যা আমাদের দেশের, যাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, গর্বিত সঙ্গীতশিল্পী  ফরিদা পারভীন এবং আপনারা জানেন যে, তিনি ইতোমধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুনাম অর্জন করেছেন তাকে আজকে গুণীজন সম্মাননা দেয়া হয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধে বিশিষ্ট অবদান রেখে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গৌরবোজ্জল ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জীবনকে বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন এবং গাজী হয়ে আজও বেঁচে আছেন সেই সমস্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ, যিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, ছাত্রলীগের সুনামকে এবং সাংগঠনিক অবস্থাকে  একটা সুন্দর মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন, আমাদের সকলের প্রিয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর বেপারি, উপস্থিত রয়েছেন বর্তমানে ধর্মের নামে যে ব্যবসা চলছে সেই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যিনি সবসময় সোচ্চার থাকেন আমাদের হযরত রিজভী সাহেবসহ অন্যান্য গুণী ব্যক্তিবর্গ এবং সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট এই সংগঠনের ভক্তবৃন্দ, অতিথিবৃন্দ, সবাইকে হাক্কানী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

আমাদের এই বর্তমান সংলাপের যে মুল কথা এতেই স্পষ্ট করে দেয় যে তারা কি ভূমিকা পালন করছে। তাদের মূল কথাই হচ্ছে, আমরা নিরপেক্ষ নই, সত্যের পক্ষে। নিরপেক্ষতার নাম করে আমাদের দেশে বিশেষ করে সাংবাদিকতার জগতে যে ভণ্ডামি হয় তার উদাহরণ কিছুটা বলে গেছেন আমাদের শাহ্‌ আলমগীর সাহেব। এবং এই নিরপেক্ষতার ভান করে যখন অন্যায় হয়, মিথ্যাচার হয় তখন নিরপেক্ষতার ভান করে কোন প্রতিবাদ করেন না। মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এটা আমাদের ধর্মেরও কথা। যদি প্রতিবাদ করতে না পারি তাদেরকে ঘৃণা করবো, তা না পারলে তাদের কাছ থেকে দুরে থাকবো।

সেই কাজটি যারা না করে নিরপেক্ষতার কথা বলে নির্বিচারে হজম করে যায়, নির্বিকার থাকে বর্তমান সংলাপ সেই দলের নয়। তারা স্পষ্টই ঘোষণা করেছে যে, আমরা নিরপেক্ষ নয়, আমরা সত্যের পক্ষে। বর্তমান সংলাপ তাদের যে ঘোষণা তার সাথে মিল রেখেই কাজ করছে। আমি সাপ্তাহিকের অনেকগুলো সংখ্যাই পাঠ করেছি তাতে দেখেছি তাদের ঘোষণার সাথে তাদের লেখার মিল রয়েছে। তাদের কথার সাথেও তাদের কাজের মিল রয়েছে। তারা নিরপেক্ষ নয়, বা মিথ্যার পক্ষে নয়, তারা যে সত্যের পক্ষে সেই সত্য বলিষ্ঠভাবে তাদের লেখনির মাধ্যমে তারা প্রকাশ করে এসেছেন, প্রচার করে এসেছেন। এখানে একটি কথা, আমার মনে হয় বাহাদুর বেপারি বলেছেন সত্যই সুন্দর, সত্যই শান্তি, শান্তিই আনে সমৃদ্ধি, সত্যের অতন্দ্র প্রহরী সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের অবিরাম পথ চলায় সত্যের প্রদীপ জ্বেলে আমরা পাশে ছিলাম-আছি-থাকবো। অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন। আর উদাহরণ স্বরূপ আমাদের শাহ আলমগীর সাহেব তুলে ধরেছেন পত্রিকা কি করতে পারে। আমরাও ছোটবেলায় পড়েছি যে, ‘পেন ইজ মাইটার দেন সোরড’। অর্থাৎ তলোয়ারের চেয়ে একটি কলম অনেক শক্তিশালী। এবং সেই কলম দিয়ে একটি সমাজকে ধ্বংস করা যায়, ক্ষতি করা যায় আবার সমাজের মানুষের পক্ষে মানুষের অধিকারের পক্ষে বা ধর্মের পক্ষে যেটি আমরা বলি সেটাও করা যায়। আমরা আজকে এই ধর্মব্যবসায়ীরা, আপনারা জানেন, এরা আমাদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সময় ধর্মের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে। এবং শেষে তারা বলেছে তারা তা করেছে ধর্ম রক্ষার জন্য। অথচ ধর্মে বলা আছে বৃদ্ধ, নারী, শিশু, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে আঘাত করা যায় না। তারা কিন্তু সেই কাজটিই করেছে। শুধু তাই করেনি, এই ধর্মের নামে আমাদের মা বোনদের ইজ্জত-সম্ভ্রম তারা নষ্ট করেছে। এবং সেটি তারা বলেছে যে গণিমতের মাল। যেন সেটি উপভোগ করাই সওয়াবের কাজ, না করাই যেন পাপের কাজ। এই ধর্মকে ব্যবহার করেই, আপনারা জানেন, যারা আইএস সৃষ্টি করেছে, যারা ইতোপূর্বে লাদেনকে সৃষ্টি করেছে তারাই কিন’ আবার আইএস দমনের নামে বিভিন্ন দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত করছে। সেই দেশে তারা নিজেরাই গিয়ে হাজির হচ্ছে সৈন্যসহ। আমাদের দেশেও কিছুদিন আগে আপনারা লক্ষ্য করেছেন যখন তিনমাস ব্যাপী-গতবছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ প্রায় ১০০দিন পেট্রোল বোমা মেরে  মানুষ পুড়িয়ে, নির্বিচারে হত্যা করেও যখন তারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে নাই তখন তারা বিদেশি নাগরিক দু’জনকে হত্যা করে যাতে একটা অবস্থা সৃষ্টি করা যায় সরকার পরিবর্তনের, সরকারকে নামানোর অর্থাৎ আন্তর্জাতিকভাবে যাতে হস্তক্ষেপ করা যায় তার একটা পরিবেশ তারা সৃষ্টি করেছিলো। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানাই যে হত্যাকারীদের তারা সময়মতো ধরতে পেরেছেন, জনসম্মুখে তাদের হাজির করতে পেরেছেন। এবং ধৃত প্রত্যেকেই বলেছে বিশেষ দলের কর্মী হিসেবে প্ররোচনায় তারা বিদেশীদের হত্যা করেছে। যারা হত্যাকারী তারা এই বিদেশীদের চেনে না, তাদের সাথে কোন শত্রুতাও ছিল না, কেবল সরকারকে বিপদে ফেলানোর জন্যই তারা হত্যা করেছে এবং সারা দুনিয়ায় ওদের যারা সমর্থক তারা এদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে সুর তুলেছিলো, সারা পৃথিবীর মধ্যে একটা বিভ্রান্তির চেষ্টা করেছিলো। আমরা অস্বীকার করেছি, এদেশের মানুষ অস্বীকার করেছে, সরকার অস্বীকার করেছে যে এটা আইএসএ’র কাজ না কিন্তু ওনারা বলছেন যে এটা আইএস করছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করার জন্য একটা অবস্থা তৈরি করার জন্য ছিল ওই সমস্ত উদ্দেশ্য। তাই এই কলমের মাধ্যমে অর্থাৎ যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এইসমস্ত মাধ্যমে   মানুষের মতামতকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার যে একটা ঘৃণ্য প্রচেষ্টা কিছু কিছু মানুষ, কিছু কিছু দল বা নেতৃত্ব করে থাকে তার বিরুদ্ধে সময়মতো সত্য কথা বলা জিহাদের তুল্য। আমি মনে করি আজকে বর্তমান সংলাপ সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের ঈমানী দায়িত্ব তারা পালন করছেন যা আমরা অনেকেই পালন করছি। তাই বর্তমান সংলাপের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যোগদান করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। ধর্ম নিয়ে যুগে যুগে যে ব্যবসা এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। আমাদের হযরত মুহাম্মদ (সা.) এঁর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের চারজন খলিফার তিন জন খলিফাকে ঘাতকরা হত্যা করেছিলো। এবং তারা সকলেই ছিল মুসলমান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এবং প্রত্যেই বলেছে ইসলামকে রক্ষার জন্য খলিফাদের হত্যা করা হয়েছে। আজকের দিনে আমরা কি কেউ বিশ্বাস করি যে হযরত উমর (রা.), হযরত উসমান (রা.) এবং হযরত আলী (রা.) ইসলামের বিপক্ষে ছিলেন? বা তারা সত্যিকার ইসলামের পক্ষে ছিলেন না? আমরা কেউ তা বিশ্বাস করি না।

আমরা সকলে এটাই জানি যে তারা সকলেই ইসলামের পক্ষে ছিলেন। যারা হত্যাকারী তারা ইসলামকে ব্যবহার করে, ধর্মের নামকে ব্যহার করে এবং ধর্মের প্রতি মানুষের যে সহজাত দুর্বলতা সেটাকে কাজে লাগিয়েই তারা এই সমস্ত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। আজকেও, বাংলাদেশ সৃষ্টির সময়েও তারা ধর্মের নামে এই কাজটি করেছে। আপনাদের অনেকের মনে থাকার কথা, ৫৪ সালের যে নির্বাচন হয়েছিলো যুক্তফ্রন্টের, যেটা বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সহোরাওয়ার্দি, মজলুম জননেতা মাওলানা হামিদ খান ভাসানী এবং তরুণ নেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল, সেদিনও বলা হয়েছিল যে যুক্তফ্রন্টকে যারা ভোট দিবে, নৌকাকে যারা ভোট দিবে তাদের বৌ তালাক হয়ে যাবে। এরা আজকের দিনেও স্বাধীনতাকে নিয়ে কিভাবে খেলছে আমি তার ছোট একটা উদাহরণ দিতে চাই, পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কয়েকদিন আগে অর্থাৎ সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর পর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যা যা বলা হয়েছে বেগম খালেদা জিয়া ৩ দিনের মাথায় সেই কথাগুলোকেই পুনরাবৃত্তি করেছেন জাতির সামনে।

আমি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ওনার অতীতের কিছু কাগজপত্র আনার চেষ্টা করলাম। কারণ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ২টা দিবস তাদের পালন হয়ে থাকে অন্যান্য কাজের মধ্যে – স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস। এবং আপনারা জানেন যে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে বাণী প্রচার করেন। ক্রোড়পত্র বের করা হয় এবং ছাপানো হয়। বেগম জিয়া ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১০ বছরে ২০ বার বাংলাদেশে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে জাতির উদ্দেশ্যে বাণী দিয়েছেন, নিজের স্বাক্ষরিত। প্রত্যেকটা বাণীতেই লেখা আছে,  ‘৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা’ আমি সেটা যাচাই করে দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি এই কথা বলেছেন। আজকে আবার ভিন্ন কথা বলছেন। একটাই কারণ যে, মিথ্যাচার করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে, এক কথায় বাংলাদেশের এই অর্জনকে মুছে তাদের যে উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান রক্ষা করার সেই কাজটি করার জন্যই তারা এগুলো করে যাচ্ছে।

বলা হচ্ছে যে, এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। এসব কথা তাদের যারা দোসর, একাত্তরে যারা আমাদের দেশে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারাই সমস্বরে দেশে বিদেশে এগুলো প্রচার করছে। তাই আমরা জানি যে মিডিয়াগুলো অর্থাৎ প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, কলমের অনেক শক্তি আছে সেই শক্তি ন্যায়ের পক্ষে সত্যের পক্ষে যারা খাটায় তারাই সঠিক কাজটি করে। বর্তমান সংলাপ আমার বিবেচনায় সত্যের পক্ষে তাদের বক্তব্য রেখে তারা তাদের সেই নৈতিক দায়িত্ব সেই দায়িত্বটুকু পালন করছেন। বর্তমান সংলাপের সাথে যারা সম্পৃক্ত, যারা জড়িত, যারা পৃষ্ঠপোষক, যারা সম্পাদনায় তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এবং যেই সমস্ত নিবেদিত প্রাণ কর্মীগণ বর্তমান সংলাপকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। এবং বর্তমান সংলাপ যেন সারা দেশের মানুষের মুক্তচিন্তা প্রসরের ক্ষেত্রে আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার বহুল প্রচার যাতে ঘটে, সেই কামনা করে যারা আমাকে আজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সূধীমন্ডলী যারা ধৈর্য ধরে তাদের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আয়োজন সফল করেছেন তাদের সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি আমার আলোচনা শেষ করছি। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

সেলিনা হায়াৎ আইভী

মেয়র, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন

20160130_125435

বর্তমান সংলাপের যে উদ্যোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মাননা দেয়া, বিশেষ ব্যক্তিত্বদের, গুণীজনদের স্বীকৃতি দেয়া এটা অবশ্যই আমাদের সমাজে এখন অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ সমাজ আজকে বিভক্ত দুই ভাগে। স্বাধীনতার পক্ষে এবং বিপক্ষে। এবং পক্ষে কথা বলার জন্য অত্যন্ত সৎ সাহসের প্রয়োজন। বিশেষ করে এই সময়ে। যেখানে ধর্মের নামে হচ্ছে প্রচন্ড মিথ্যাচার, সত্যের নামে হচ্ছে অসত্যের এবং অন্যায় যেন ন্যায় হয়ে যাচ্ছে বর্তমান সমজে। সেই সমাজ থেকে এগুলো দূরীভুত করার জন্য এবং সত্যিকার অর্থে সঠিক পথকে নেয়ার জন্য সত্য বলা অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু সত্য বলা খুব কঠিন এবং অপ্রিয় সত্য বলা আরো বেশি কঠিন। যে সত্যের মুখোমুখি হয়েছে তাকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কারণ সত্য কখনও পরাজিত হয় না। সাময়িকভাবে কষ্ট দেয়। সাময়িকভাবে বিচলিত করে। সাময়িকভাবে হয়তো মনে হয় পথটা অনেক কঠিন। কিন্তু এটার শেষ হলো জয়-জয় এবং জয়। একজন সঠিকভাবে যে মানুষ নিজেকে পরিচালিত করতে পারে সে কখনও অন্যায় করতে পারে না, বিপথগামী হতে পারে না এবং দেশপ্রেম হয়ে ওঠে তার কাছে অনেক কিছু। আর যার ভেতরে দেশপ্রেম আছে সেই সত্যিকার অর্থে মানুষকে ভালোবাসতে পারে। এবং যে মানুষকে ভালোবাসতে জানে সে তার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্থাৎ সে তার আল্লাহকে পেতে পারে। কারণ মানুষের মাঝেই আল্লাহ বিরাজমান। মানুষের সেবার মাধ্যমেই তাকে পাওয়া যায়। যেখানে হাদিসে আছে দেশপ্রেম আমাদের ঈমানের অঙ্গ। সুতরাং মানুষকে সেবা করা, দেশকে সেবা করা নিজেকে সত্যভাবে পরিচালিত করার মাধ্যমেই সব কিছু নিহিত আছে। যে নিজেকে জানে নাই সে পৃথিবীর কোন কিছুকেই জানতে পারবে না। তার ভিতরের সত্যকে আগে জানতে হবে। আমার ভিতরের আমিকে আগে জানতে হবে এবং সৃষ্টিকর্তাকে পেতে হলে কোন না কোন গুরুর হাত ধরতে হবে। আর গুরুর কাছে যে নিজেকে সমর্পণ করেছে সেখানেই সে তার আমিত্বকে বাদ দিয়ে তার শ্রেষ্ঠত্বকে প্রমাণ করতে পেরেছে। গুরুকে যে ধরেছে সে আল্লাহকে পেয়েছে। আল্লাহ এই গুরুর মাঝেই আছেন, মানুষের মাঝেই আছেন, সকলের মাঝেই আছেন। আর যে মানব সেবা করতে পারে সে গুরুর সেবা করতে পারে, সে আল্লাহকে পেতে পারে, সেই দেশকে স্বাধীন পথে পরিচালিত করতে পারে। সুতরাং আসুন সময় এসেছে সত্যকে জানার, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার, আমার ভিতরের আমিত্বকে দূর করে পশুত্বকে দূর করে দেশকে সেবা করা।

যদিও হাক্কানী মিশনের আলোচনা চলছে এখানে, হাক্কানী মিশন সবসময় সত্যের কথা বলে যাচ্ছে। এখানে যারা উপস্থিত আছেন তাদের সবাইকে আহবান জানাবো আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্য শেখ হাসিনা যে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা যেন তার পাশে থাকতে পারি এবং তার ভালো কাজগুলোকে সহযোগিতা করতে পারি এবং সর্বদিকে যেন ছড়িয়ে দিতে পারি এই যেন হয় আমাদের প্রত্যয় এবং আশা।

আমাদের উদীয়মান তরুণ নেতা বাহাদুর ভাই। বাহাদুর ভাইকে আমি নারায়ণগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ধন্যবাদ সকলকে – জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

ড. এম গোলাম রহমান

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

যারা আজকে বিভিন্নভাবে সম্মানীত হলেন, তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাই। এরকম একটি অবস্থায় প্রগতিশীল চিন্তাভাবনায় এই মিশন কাজ করে যাচ্ছে এবং এই হাক্কানী যে বক্তব্য দীর্ঘকাল ধরে লালন করে আসছে তার জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে এটাই আমি প্রত্যাশা করি। আমার মনে হয় এই প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত সুযোগ্য এবং সংঘবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের কার্যক্রম আমি আগে খুব একটা জানতাম না। কিছুটা শুনেছি। কিন্তু আজকের এই অনুষ্ঠান দেখে মনে হচ্ছে তারা খুবই সংগঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। এবং তারা যেভাবে কাজকর্ম করে যাচ্ছে তা তাদের মধ্যে শুধু নিজেদের মধ্যে প্রচার রাখলে হবে না। এই প্রচারটি অনেক বড় করে জাতীয় কল্যাণে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এখন এমন একটি অবস্থা চলছে যখন বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দাবি রাখে। যখন আমরা জানি শুধুমাত্র উগ্র ধর্মান্ধতার মোড়কে সত্যকে আবদ্ধ করে অসত্যকে তুলে ধরা হচ্ছে, মানুষের মগজ ধোলাই করে মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে, সেখানে কোন মানবিকতা থাকে না। সেখানে মানবিক কোন গুণ মানুষের মধ্যে থাকে না। সুতরাং আজকের এই যে প্রগতির ধারা, আজকে বাংলদেশ স্বাধীন-স্বার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। এবং এখানে মানুষের যে অধিকার সেই অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মানুষ আরও উন্নত পর্যায়ে যাবে, মানুষ বিশ্ব দরবারে নিজেকে হাজির করবে এবং বাংলাদেশে বাঙালিরা বিশ্বের দরবারে অন্যতম নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, এমন একটা পরিবেশ পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি তাদেরকে পিছুটানে বাধ্য করা হচ্ছে। কুসংস্কারে টেনে নিয়ে তাদেরকে পশ্চাদপদ দিকে আহবান করা হচ্ছে।

বিভিন্ন ধর্ম বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে যে সম্প্রীতি, সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্য লালন করে বাংলাদেশ। সুতরাং তাদেরকে ছোট করার কোন সুযোগ নেই। আমরা জানি বিশ্বে এখন নানাভাবে বিভিন্ন রকম অর্থ এই সমস্ত খাতে প্রবাহিত হচ্ছে এবং মানুষকে পুঁজি করে, মানুষের দুর্বলতাকে মানুষের অসহায়ত্বকে এবং যারা চাকরি-বাকরি পায় না, হতাশাগ্রস্ত তাদেরকে মগজ ধোলাই করে ডাইভার্ট করা হচ্ছে। সুতরাং এই যে ডাইভারশন এবং আমাদের মানবিক গুণাবলীকে নষ্ট করে মানুষকে যে পঙ্কিল পথে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য এই হাক্কানী কাজ করে যাবে এটাই আমি প্রত্যাশা করি। আমি মনে করি আমাদের এই প্রগতিশীল আন্দোলনে নিশ্চয় আরো সবাই সমবেত হবেন এবং সবাই অংশগ্রহণ করবেন। আজকে আমাকে এখানে আহবান করার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, আমি অভিভূত এবং যারা এই সংগঠনটি করছেন তাদের প্রতি আমার আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এখানেই শেষ করছি।

সবাইকে ধন্যবাদ।

শাহ্‌ আলমগীর

মহাপরিচালক, পিআইবি

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

আজকে বর্তমান সংলাপ-এর ২৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে কিছু কথা বলবো প্রধানত যারা এই পত্রিকার সাথে যুক্ত আছেন তাদের জন্য। একজন ডাক্তার তার কাছে একটি ছুড়ি থাকে। এই ছুড়ি দিয়ে ডাক্তার কি করে? এই ছুড়ি দিয়ে ডাক্তার একজন মৃতপ্রায় মানুষকে অপারেশন করে সুস্থ করে তোলে।  কিন্তু এই ছুড়ি যদি একজন ছিনতাইকারীর হাতে যায়, একজন ডাকাতের হাতে যায় – তাহলে সেই ছুড়ি দিয়ে ছিনতাইকারী কিংবা ডাকাত মানুষকে হত্যা করবে। একইরকম ছুরি  মানুষকে বাঁচানোর কাজে একজন ব্যবহার করছেন অন্যজন মানুষকে হত্যার কাজে ব্যবহার করছে। এখন আমাদের কাছে একটি কলম আছে। বর্তমান সংলাপের বন্ধুদের কাছে একটি কলম আছে। এই কলমটি একটি ছুরির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি ক্ষমতাবান। আমার কাছে দু-চারটি কলম আছে, দু-চারটি পত্রিকা আছে। এখন আমি এই এমন কাজটিও করতে পারি যে, যে মানুষটি হয়তো তার দীর্ঘ দিনের সাধনা দিয়ে অনেক বড় হয়েছেন কিন্তু কোন কারণে আমি লোকটিকে পছন্দ করি না, তখন আমি কলম দিয়ে এমন কিছু লিখতে পারি হয়তো তিনি তা সহ্য করতে পারছেন না। অথচ আমি রাতারাতি একটি মানুষের সারা জীবনের যে সম্পদ, সারা জীবন তিনি যা অর্জন করেছিলেন আমি কিন্তু সেটা নষ্ট করে দিতে পারি এই কলমের মাধ্যমে। উদাহরণ হিসেবে বলি, আপনাদের ঝিনাইদহের সেই শিক্ষকের কথা মনে আছে। হরিদাস, তিনি একজন সাধারণ কৃষক। তিনি নিজের জমিতেই ফসল ফলান। এই ফসল ফলাতে ফলাতেই তিনি একসময় নতুন প্রজাতির ধান উদ্ভাবন করেন। যে ধানের বীজ রোপন করলেই উৎপাদন দ্বিগুণ হয়ে যায়। সেই হরিদাস নিজের জমিতে ধান চাষ করতেন। একসময় ওই গ্রামের বিশাল অংশ জুড়ে সেই ধানের চাষ হতো। যা আমাদের দেশের মানুষ আমরা কেউ জানতাম না। কিন্তু যখন একজন সাংবাদিক সেই গ্রামে যান, একটা টেলিভিশন চ্যানেল যখন সেখানে যায়, যাওয়ার পর যখন এটা প্রচার করা হয় এবং গবেষকরা যখন তাদের পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করে বলেন যে এটা সত্যি একটা নতুন প্রজাতির ধান এবং এই ধানটি তখন নাম দেয়া হয় হরিধান। সারা বাংলাদেশে এই ধানটি এখন সবার ঘরে ঘরে চাষ হচ্ছে। এই তথ্যটা বের করে একটি মানুষকে জাতির সামনে তুলে ধরার এই কাজটি করেছেন একজন সাংবাদিক।

এই কলম দিয়ে বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় এমন অনেক কাজ করা হয়েছে যে কাজগুলো কোন সাংবাদিকের কাজ ছিল না। বাবরি মসজিদ যখন ভাঙা হয় তখন আমাদের দেশের একজন সাংবাদিক রিপোর্ট করেছেন যে বাবরি মসজিদ ভাঙার কারণে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এবং এই খবরটি প্রকাশিত হবার পর শাঁখারি বাজারের অনেক মন্দির ভাঙ্গা হয়, অনেক হিন্দু বাড়িতে হামলা চালানো হয়। অথচ আমরা সাধারণ বুদ্ধিতেও একটি বিষয় খুব স্পষ্ট করে বুঝি যখন এইরকম সংখ্যালঘুরা বসবাস করেন তখন তারা এমনিতেও খুব আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। তারা মিষ্টি বিতরণ করবেন! তাও এমন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যার দাদারা হয়তো ব্যবসা করেছেন, এখন হয়তো তার নাতিরাও ব্যবসা করছেন, তারা খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করছেন বিনা পয়সায়, এটা কখনই হতে পারে না। অথচ এই রিপোর্টটি করা হয়েছে। কেন করা হয়েছে, কারণ তখন এরশাদ সাহেবের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল আন্দোলন করছে। সেই আন্দোলনের গতিটাকে পরিবর্তন করার জন্য ঠিক একটি এরকম খবর প্রচার করা হলো যাতে আমাদের দেশে একটি হানাহানি পরিবেশ তৈরি হয়। দেশে যতবার যত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তা হয়েছে।

আমি দেখেছি যে বর্তমানে ধর্মকে ব্যবহার করে সারা বিশ্বের যে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা যে বিভেদ তৈরি করা হয়েছে এইগুলোর বিরুদ্ধে বর্তমান সংলাপ সত্য কথা বলে। এই পত্রিকাটি এদেশের বাঙালিত্বের কথা বলেছে। এই পত্রিকাটি এদেশের মানুষের স্বভাবজাত তার ঐতিহ্যের কথা বলেছে। আমি এই পত্রিকাটির কাছ সবসময় এই ভূমিকাই আশা করি।

সবাইকে ধন্যবাদ।

ফরিদা পারভীন

বাউল সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

আজকের এই মহতী অনুষ্ঠানে আমাদের শ্রদ্ধেয় সভাপতি, সকলের পুজনীয় বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আমার শ্রদ্ধাভাজন, মঞ্চে উপবিষ্ট আছেন যারা সকলেই নিজ নিজ কর্মের জন্য সকলের শ্রদ্ধাভাজন। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এই কারণে যে আমি খুব নিমিত্ত মাত্র একজন সঙ্গীতশিল্পী। শিল্পী বলা ঠিক হবে না। কন্ঠটা হয়তো একটু ভালো তাই গায়িকা বললে মনে হয় মানায়। শিল্পীর যদি আভিধানিক অর্থ বোঝা যায় তাহলে শিল্পী শব্দটির গভীরতা অনেক। যাই হোক হাক্কানীর সাথে প্রথম বারই যখন তাদের ধামে যখন গান করেছিলাম, ভাইজান বলেই আমি তাকে সম্বোধন করেছিলাম। এবং এই কথাগুলো এতো সত্য, তিনি অনেক দুরে বসেছিলেন, আমার কেন জানি মনে হলো উনি কাছে এসে বসলে বোধহয় কালামগুলো আরো সুন্দর করে আমি পরিবেশন করতে পারবো। আমি যখন বললাম, তখন তিনি যেন একদম শিশুসুলভভাবে এসে সামনে বসলেন।

যারা এখানে সম্মাননা পেলেন, সংবর্ধনা পেলেন তারা অনেক বড় মাপের। সেই বর্তমান সংলাপের পক্ষ থেকে তাদেরকে সম্মানিত করার জন্য আমি আমার নিজের থেকে তাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, যদি হাক্কানী মিশন এবং বর্তমান সংলাপ তাদের একজন আমাকে মনে করেন সেই অর্থে। সবাইকে আবারো ধন্যবাদ।

খুররম শাহরিয়ার

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

আমার পরম বড়ভাই সহযোদ্ধা মুক্তবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং মঞ্চে উপবিষ্ট বিশেষ অতিথিবৃন্দ এবং সামনে যারা আছেন সবাইকে আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আজকে আমি নিজেকে এতো গর্বিত মনে করছি যে মুক্তিযুদ্ধে আমার যতটুকু কৃতিত্ব থাকুক বর্তমান সংলাপ যে আমাকে এভাবে গুণীজন হিসেবে সম্মাননা দিয়েছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। এবং আজকে উপস্থিত সকল বরণীয় ব্যক্তিত্বকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

শাহ্‌ শহীদুল আলম

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

মঞ্চে উপবিষ্ট মাননীয় সভাপতি, শ্রদ্ধেয় মন্ত্রী মহোদয়, বিশেষ অতিথিবৃন্দ এবং সম্মানিত উপস্থিতি, সবাইকে হার্দিক হাক্কানী শুভেচ্ছা। বর্তমান সংলাপ ২৩ বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আমাকে যে সম্মাননা দেয়া হয়েছে তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিছু স্মৃতিচারণ না করলেই নয়। ২৫ মার্চ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় থাকতাম। পিলখানার ২য় গেটের একটা বাসায়। ২৫ মার্চের কালোরাতের সেই বিভীষিকাময় সেই স্মৃতি আমি আজও বহন করে চলছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি যে লাশের বহর দেখেছি সেই কামানোর গোলার আঘাত যা আমি দেখেছি তা আমার স্মৃতিতে আজো ভাস্বর। ’৬৯ এর গণআন্দোলনে আমি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করি। ’৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণের সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জল। ভারতের ট্রেনিং দেয়ার সময় সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে পরে। একদিন বলা হয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী কয়েকটি ট্যাংক নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তোমরা কে কে ট্যাংকের নিচের বুকে মাইন বেঁধে ঝাঁপ দেবে? আমার মনে পরে আমার সাথে আরো কয়েকজন গর্জে উঠেছিল জয় বাংলা বলে এবং আমরা প্রত্যেকেই বলেছিলাম এখনই আমাদের বুকে মাইন বেঁধে দেন আমরা এখনই ট্যাংকের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়বো। কি উদ্দেশ্যে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম? আজকে সংলাপের প্রচ্ছদপটে আবহমান বাংলার ঐহিত্যকে তুলে ধরে যে কতগুলো ছবি ছাপা হয়েছে নদীনালা খালবিল এই দৃশ্য দেখে আমার ছোটবেলার একটা কবিতার কথা মনে পরে, ‘আষাঢ়ে বাদল নামে খালে আর বিলে, মনু মিয়া মারে মাছ নিয়ে যায় চিলে’। বাংলার মনুমিয়ারা এখনও ফসল উদপাদন করে কিন’ সঠিক মূল্য পায় না। মনু মিয়ারা সাগরে মাছ ধরে, লুটেরা লুট করে নিয়ে যায়। এই জন্যই আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম, মনু মিয়ারা যাতে আর শোষিত না হয়, তথাকথিত চিলেরা যাতে ছোঁ মেরে তাদের উৎপাদনকে তাদের শ্রমকে যাতে আর কেড়ে নিতে না পারে।

প্রয়োজন হলে ৭১ এর সেই হাতিয়ার আবার গর্জে উঠবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে আমাদের এই প্রত্যাশা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

শাহ্‌ আব্দুল হালিম মিয়া

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

মাননীয় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, উপস্থিত অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ এবং উপস্থিত সুধীমন্ডলী, সবাইকে আমার হাক্কানী শুভেচ্ছা। আজকে গুণীজন হিসেবে সম্মাননা প্রাপ্ত সকল ব্যক্তিত্বতে আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

বাহাদুর বেপারী

তরুণ উদীয়মান জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব

12524040_760883837375130_8514569390557455077_n

বাহাদুর বেপারী রাজনীতির জন্য আজকে সম্মাননা পেয়েছে। যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, শিশু একাডেমীর মঞ্চ এখান থেকে দুশ গজ দুরেই কার্জন হল। যেখানে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানেই আমার ছাত্র রাজনীতির শুরু হয়েছিলো। ফলে এক গভীর সংযোগে আমি। বর্তমান সংলাপ আমাকে একটি সংযোগে নিয়ে গেছে। সেই বর্তমান সংলাপের ২৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গুণীজন সংবর্ধনায় রাজনীতিতে বাহাদুর বেপারীকে তরুণ রাজনীতিক হিসেবে গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ এবং এই বাংলার জনপদের মানুষ, যাদের নেতৃত্ব আমি দেই, তাদের পক্ষ থেকে বর্তমান সংলাপকে অভিনন্দন ও শুভ কামনা। আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহ্‌ সূফী ড. মুহম্মদ মেজবাহ উল ইসলাম, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা একসময় ছাত্রলীগ করতেন  এবং সাইকেলে চড়ে এই গাজীপুরের ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আজ তিনি মন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, উপস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল শিক্ষক ড. এম গোলাম রহমান এবং তারই ছাত্র ও সাংবাদিক শাহ আলমগীর এবং বক্তব্য দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আইভী আপা, উপস্থিত হাক্কানী দরবার শরীফের বিভিন্ন কর্মকর্তাবৃন্দ যাদের বিভিন্ন দার্শনিক কথায় আমরা উদ্বেলিত হই উৎসাহিত হই এবং শক্তিশালী হই সেই সকল সাধকরা আমাদের সামনে বসা। সকলেই সাধক। এখানে আপা নাই ভাই নাই।

বাহাদুর ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে যেই সত্যের সন্ধানে ছিলো, এবং কোন দিন ছাত্র রাজনীতি করতে যেয়ে মিথ্যা কথা বলতে হয়নি কিন্তু এই সত্য গিয়ে আমি কোথায় পেলাম সেটা জানা দরকার। আমরা থাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, থাকি ধানমন্ডিতে, থাকি আওয়ামী লীগ অফিসে, থাকি ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ সড়কে, থাকি বঙ্গবন্ধু ভবনে, কিন্তু তার একটি শাব্দিক ভার্সন খুঁজে পাই মিরপুরের জ্যোতিভবনে সত্যমানুষের কাছে। তিনি শিখিয়েছেন দেখিয়েছেন সত্য কোথায়, কোন স্তর থেকে কোন স্তরে মানুষ গেলে সত্য প্রতিনিয়ত তার ভিতরে আসে এবং সে সত্য কি, আপনি কোথায় কখন কোন বর্তমানে থাকেন। আমি বাংলায় থাকি, বাংলাদেশে থাকি, এই জনপদ বাঙালি, এই চরিত্র জাতিগত চরিত্র। এই জাতীয় চরিত্র, রাষ্ট্রীয় চরিত্র এবং দলীয় চরিত্র এক রেখায় যখন থাকে তার পর আরেকটি অবস্থান সেটি দলীয় নেতৃত্ব যদি একই ধারায় হয়, এই চতুর্বিন্দু যদি একই বিন্দুতে আসে তখন জাতি হিসেবে একটি জাতি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। ২০১৬ সালে বর্তমান সংলাপ যখন সংবর্ধিত করছেন আমাকে তখন আমরা দেখি বাংলাদেশ বাঙালি জাতিসত্তায়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এবং তারপর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এবং তার নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা একই রেখায়। ফলে এই বাংলা পৃথিবীর দরবারে আজ একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠতম জাতি। শ্রেষ্ঠতম দেশ। এবং উন্নয়ন, অগ্রগতি, শিল্প, সাহিত্যে সকল জায়গায় বিশ্বে এক নম্বর  হতে চলেছে। সুতরাং বাঙালি চেতনাকে ধারণের মধ্য দিয়ে, এই রাষ্ট্রীয় চেতনা যখন বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে, আওয়ামী লীগ যখন বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে এবং তার নেত্রী বাংলাদেশ ও বাঙালি চেতনাকে ধারণ করেন তখন বোঝা যায় আপনি আমি কে, আপনি আমি বাঙালি। আমার পরিচয় আমি এই জনপদে এসেছি সুতরাং আমার শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি পৃথিবীর সেরা সংস্কৃতি। সুতরাং আমরা যারা এখানে উপস্থিত হয়েছি, আমি বলতে চাই আমি বাঙালি আমিই শ্রেষ্ঠ। বাংলাদেশ আমার দেশ। এই দেশে অন্য কোন সংস্কৃতি লাগে না। পাকিস্তান বা সৌদি আরবের কোন সংস্কৃতিই আমাদের আঘাত করতে পারবে না। যদি আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি সবাই হাক্কানীর পথে থাকি, সত্যের পথে থাকি।

সবাইকে ধন্যবাদ

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

ছদরুল আমিন রেজভী

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

আমি জানতাম না যে এখানে আমাকে কিছু বলতে হবে। আজকে আমি এখানে গুণীজনের একজন হিসেবে যে সম্মাননা পাব এটা আসলে আমার ধারণার মধ্যে ছিলো না। যেহেতু আমাকে সম্মাননা দেয়া হয়েছে এবং অন্যান্য যারা সম্মাননা পেয়েছেন তা কর্মের কারণেই হোক, কিংবা সমাজে কিছু কাজের বিনিময়েই হোক, আজকের এই অনুষ্ঠানে গুণীজন হিসেবে সম্মানিত হওয়ার পিছনে আমার মনে হয় সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ হাক্কানী মিশন – তাদের পক্ষ থেকে বিশেষ ভালোবাসা আছে। যে কোনভাবেই হোক, যে ভালোবাসার কারণে আজকে এখানে আমরা গুণীজন হিসেবে সংবর্ধনায় এসেছি, আমাদের মনে রাখতে হবে যাদের মধ্যে প্রকৃত ভালাবাসা আছে, যারা আসলেই প্রকৃতভাবে ভালোবাসে তারা কোনদিনই অন্যায়ের কাজ করতে পারে না। আমি যদি আমার সন্তানকে প্রকৃতভাবে ভালোবাসি, আসলেই সঠিকভাবে যদি ভালোবাসি সেই সন্তান কোনদিন পিতা-মাতার পকেটে হাত দিতে পারে না। যখন সে পকেটে হাত দিবে তখন তার বিবেকে বাধা দিবে, হায়রে হায় আমার পিতা আমার মাতা আমাকে যে ভালোবাসেন যদি তার কানে খবর যায় আমি চুরি করছি তাহলে তো তারা হার্টফেল করবেন। এই কারণেই তার হাত ওখান থেকে ফিরে আসবে।  সুতরাং প্রকৃত ভালোবাসার মধ্যে কখনোও কোন অন্যায় থাকতে পারে না। আজকে দেশকে যদি প্রকৃতভাবে সবাই ভালোবাসতো তাহলে এরা কোনদিন রাজাকার আল বদরে যেতে পারতো না। সুতরাং তারা প্রকৃতভাবে দেশকে ভালোবাসে না। বর্তমান সংলাপ, হাক্কানী মিশন  – আমি আলোচনায় জানতে পারলাম সত্য থেকেই হাক্কানী। যারা সঠিক মত ও পথকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এই আয়োজনে আছেন তাদেরকে আমি রেজভীয় দরবারের পক্ষ থেকে আয়াতুল সুন্নাহ জামাতের পক্ষ থেকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আপনারা যেভাবে আমাদেরকে ভালোবাসছেন আমিও তদ্রুপভাবে আপনাদেরকে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ রাখবো। সবাইকে ধন্যবাদ।

ডা. আলমগীর হায়দার

বিশিষ্ট সমাজসেবক

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

বর্তমান সংলাপের ২৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর গুণীজন সংবর্ধনায় সম্মানিত সভাপতি, মাননীয় মন্ত্রী মোজাম্মেল হক এমপি, উপস্থিত বিশেষ অতিথি, এবং উপস্থিত সকল গুণীজন ও সূধীবৃন্দ সবাইকে হার্দিক শুভেচ্ছা। প্রথমেই আমি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে – একজন সফল নেত্রী হিসেবে জাতিকে তিনি মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে এসেছেন এবং বাংলাদেশ দিন দিন শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়নে ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি। আজকে এখানে উপস্থিত আছেন ছাত্র নেতা বাহাদুর বেপারী যাকে নিয়ে আমরা গর্ববোধ করছি। আশা করছি উনি ছাত্রলীগের কর্মীদেরকে পরামর্শ দিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আর তাতেই আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো এই সফল নেতার হাত দিয়েই। আর আজকে আমি সমাজসেবায় সংবর্ধনা পেয়ে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ ও সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের সকলের প্রতি বিনম্র শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে আমি আমার আলোচনা শেষ করছি।

সুবোধ চন্দ্র দাস

বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক

20160130_141910

আজকের সভার প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাননীয় মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং এখানে উপবিষ্ট নক্ষত্র পুরুষ, নক্ষত্র মহামানবসহ আজকে যারা উপস্থিত আছেন সবাইকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমি আমার সমস্ত জীবন এবং সমস্ত লেখা অবহেলিত ও মেহনতি মানুষের জন্য সমর্পণ করেছি। আমি কোন সাড়া পাই নাই। জীবনের এখন অপরাহ্ন বলা চলে। আমাকে কেউ স্মরণ করে নাই এবং আমি গাজীপুর জেলায় ৪৮ বছর যাবত থাকি। সেখানেও কেউ আমারে কোনদিন ডাকেনি। আমি সকলের অগোচরেই আছি। তবে এই সূফী সাধক আনোয়ারুল হক, তিনি হিন্দুর দেবতা এবং মুসলমানের পীর বর্তমান যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ। তাঁর সংগঠন আমাকে ডেকেছেন। আমার আর পাওয়ার কিছু নাই। আমার ৪৫ বছরের শ্রমের মূল্য আমি পেয়েছি। আর কিছু না পেলেও আমার কোন দুঃখ নাই। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।

শরীফা বুলবুল

বিশিষ্ট সাংবাদিক

vlcsnap-2016-02-02-18h36m26s168

আমি আসলে মুগ্ধ, এবং কৃতজ্ঞ। এই কারণে যে, এই প্রথম কোন প্রতিষ্ঠান আমাকে সংবর্ধিত করলো। এই কারণে আমি বর্তমান সংলাপের সকলকে কবিতার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এবং যারা উপস্থিত আছেন এবং সম্মানিত অতিথিবৃন্দ সকলকেই আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। আমি বেশি কিছু বলবো না। আমি সাংবাদিকতা করছি, সাংবাদিকতাই করবো এই কথা দিচ্ছি। সত্য পথে থাকবো, সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, কারণ সে কখনো করে না বঞ্চনা। সবাইকে ধন্যবাদ।

সালমা আক্তার

সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের ২৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মহতি অনুষ্ঠানে প্রথমেই বাবা সূফী সাধক হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দিন এবং বাবা সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর প্রতি শ্রদ্ধার সাথে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং স্মরণ করছি। যিনি বর্তমানে মিরপুর আস্তানা শরীফ এবং হাক্কানী মিশনে দিনরাত এদেশের জন্য এদেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন বাবা শাহ্‌ সূফী শেখ আব্দুল হানিফ, তাঁর প্রতি আমি শ্রদ্ধাভরে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। উপস্থিত সম্মানিত শ্রদ্ধেয় ভাই বোনকে আমি হার্দিক হাক্কানী শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। হাক্কানী মিশনের সাথে আমি সম্পৃক্ত হই আমার মায়ের মাধ্যমে এবং সেই মাকেই আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি। আজ বর্তমান সংলাপের কিছু কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। এখানে বিশেষ সংখ্যায় লেখা আছে – সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এর ডান পাশে আছে কর্ম মানবতা শান্তি এবং আমরা নিরপেক্ষ নই সত্যের পক্ষে। এই সংলাপ সত্যসন্ধানীদের জন্যই বের করা হয়েছে। এবং নিচে  লেখা আছে সত্য মানুষ হোন দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে। তাহলে আমি বলবো যারা আমাদের এই মহতি অনুষ্ঠানে উপস্থিত আছেন প্রত্যেকেই আমাদের এই সংলাপের একজন গ্রাহক হবেন। এবং যাদের পরিচিত কেউ আছেন তাদের প্রত্যেকেই গ্রাহক করার জন্য চেষ্টা করবেন। কারণ এখানে বাস্তবতার নিরিখে সব তুলে ধরা হয়েছে। সংলাপ পড়ে দেখবেন আমরা বর্তমানে যে কর্মগুলো করছি সেই কর্মগুলোই তুলে ধরা হচ্ছে। আর আমি আমাকে এখানে সম্মাননা দেয়া হয়েছে তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যেন এই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারি, এই দেশের জন্য এই দেশের মানুষের জন্য যেন আমি কাজ করে যেতে পারি সত্য ও আদর্শ লক্ষ্য নিয়ে, এটাই আমার চাওয়া ও পাওয়া। সকলকে আবারো হাক্কানী হার্দিক শুভেচ্ছা।

আশরাফুল আলম

সত্যব্রতী শ্রেষ্ঠ কর্মী

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
OLYMPUS DIGITAL CAMERA

স্মরণ করছি শাহ্‌ কলন্দর সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফকে। খুব বেশি কিছু বলার নাই। শুধু দুটি কথাই বলতে চাই ‘তুমি দয়াল আমরা কাঙাল থাকব চিরদিন/ কোন কালেও শোধ হবে না হানিফ তোমার ঋণ/ তুমি দয়াল আমরা কাঙাল থাকব চিরদিন/ কোন কালেও শোধ হবে না হানিফ তোমার ঋণ/ ইয়া মুর্শিদ ইয়া হানিফ, ইয়া হানিফ।’

সবাইকে ধন্যবাদ।

শাহ্‌ সূফী ড. মুহাম্মদ মেজবাহ-উল ইসলাম

সভাপতি, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ

20160130_120644

হাক্কানী পরিবারের সকলের প্রতি রইলো আমার হার্দিক হাক্কানী শুভেচ্ছা। হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের ৯টি প্রকল্পের মধ্যে একটি সক্রিয় প্রকল্প হলো সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ। আজকে সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপের ২৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আপনারা সকলেই যেভাবে মিশনের কার্যক্রমের সাথে একাত্ম ঘোষণা করেছেন তার জন্য আমি সকলের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। মিশন এগিয়ে যাচ্ছে আপনাদের কে নিয়ে আপনাদের সকলকে নিয়ে। আমরা সাধককুলের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আমাদের কর্ম-মানবতা-শান্তি এই লক্ষ্যকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আপনারা আমাদের সাথে আছেন, আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন এবং আমরা এগিয়ে যাবো সাধকদের সন’ষ্টির লক্ষ্যে। সম্মানিত উপস্থিতি, আপনারা জানেন এবং আপনারা অনেকেই অবগত আছেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের রজত জয়ন্তী উদযাপন শুরু হয়ে গিয়েছে আজকের অনুষ্ঠানের মধ্য থেকে। আগামী জুন পর্যন্ত আমাদের ৮টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সেই আটটি অনুষ্ঠানের মধ্যে আজকে থেকেই রজত জয়ন্তী, হাক্কানী মিশন বাংলাদেশের রজত জয়ন্তী এবং বর্তমান সংলাপের ২৩ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী  এবং গুণীজন সংবর্ধনা। আগামীতে আমাদের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ ফেব্রুয়ারি, আমাদের ৬ মাস ব্যাপী রজত জয়ন্তী অনুষ্ঠানের ২য় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আশীর্বাদপুষ্ট হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের প্রাঙ্গনে। আপনারা সকলেই আমন্ত্রিত। আপনাদের  সক্রিয় সকলের অংশগ্রহণ আমি প্রত্যাশা করি। সকলকে ধন্যবাদ ও হাক্কানী শুভেচ্ছা।