প্রথম পাতা

সময়ের সাফ কথা…. নেতা ফিরেছিলেন স্বদেশে আমরা কি ফিরতে পেরেছি আজও?

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরেছিলেন। তিনি ফিরেছিলেন বিপুল বিস্ময়, আস্থা, ভালোবাসার প্রতীক হয়ে। বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালির অমিত শক্তি ও তেজ। জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন তা অনুসন্ধানী মাত্রই জানেন। বহু বই পুস্তকে ডকুমেন্টারিতে ইউটিউবে সেদিনের চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। চাইলেই আমরা তা দেখে নিতে পারি। তিনি তাঁর এই ফিরে আসা কে আখ্যায়িত করেছিলেন অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা হিসাবে।

বঙ্গবন্ধু জানতেন নতুন শপথে নতুন প্রত্যয়ে এই পথ চলা শুরু করতে হবে। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন – শাসক কিংবা রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে নয়- আপনারা আমার ভাই, আমি আপনাদের ভাই, আমাদের পরিচয় হবে এভাবে। তিনি নারী, বৃদ্ধ, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন সবাই ভাই ভাই। এই যে সম্বোধন এটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকারের অবসান মন্ত্র, আলোর পথে যাত্রার গভীর দর্শন, দিকনির্দেশনা। এগিয়ে চলার অবিরাম গতি। গভীর ইঙ্গিতবহ সেই ভাষণটি মাইল ফলক হয়ে আছে। আমরা কি সেই সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছি আজও। পেরেছি গোটা দেশের মানুষকে একই আস্থায়, একটি দর্শনে ঐক্যবদ্ধ করতে? সবার কথা শুনতে চেয়েছি? দূরত্ব বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে পাশাপাশি চলার সংস্কৃতির রূপায়ন কি সম্ভব হয়েছে গত ৪৯ বছরেও? গোপন, গহীন, বিচ্ছিন্নতার অবসান কি ঘটেছে?

ধর্মের নামে, দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বহু খেলার পথ রুদ্ধ করতে পেরেছি? খুলে দিতে পেরেছি মুখোশের আড়ালের চেহারাগুলো। যুক্তি বিশ্লেষণ নির্ভর সমাজ বিনির্মানের মাধ্যমে ভয় শংকা দূর করতে পেরেছি নাকি উপেক্ষা করেছি দেশ জনগণের অধিকারকেই। বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীল চিন্তাগুলো কি আজও খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ডান ঝাপটায় না ? সামাজিক মূল্য বোধ, সত্য চর্চার পাদপীঠ গুলোও হুমকীর মুখে পড়েছে বারবার।

নেতা তো ফিরেছিলেন তার নিজ দেশে। গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে অসীম সাহস ও বীরত্বের মালা গলায় নিয়ে। আমরা যারা সেদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, তারা কি স্বদেশে থেকেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন স্বদেশে রয়েছেন কিনা? আমাদের আবেগ, উচ্ছ্বাস আনন্দের কোন ঘাটতি ছিল না সেদিন, তবু কি আমরা সেদিন বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার তাৎপর্য টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম? হয়তো বিপুল আবেগ তাৎক্ষণিক নাড়া দিয়েছিল আমাদের। দেশ সরকার বিশ্ব রাজনীতি সংস্কৃতি উন্নয়ন সম্বন্ধে তেমন কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা অনেক কিছুই উপলব্ধি করতে পারিনি সেদিন। এ কারণে বেশি দিন সেটা ধরে রাখতে পারিনি। সেই বিপুল উচ্ছাস আনন্দে ভাটা পড়ে। রাজনীতির মাঠে বহু অপরিনামদর্শী খেলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। লোভী ভোগী রাজনীতিক ও সামরিক বেসামরিক আমলারা সেই

সত্য কে লালন পালন করতে পারেনি। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব কেই সীমাহীন এক চ্যালেঞ্জ এর মুখে পড়তে হয়েছে। একটি উত্তেজনাকর অশান্ত পরিবেশ তৈরীর সমস্ত উপকরণ  সেদিন বিদ্যমান ছিল। দেশ গঠনে সংবিধান প্রণয়ন সহ সময়োপযোগী আইন, পরিকল্পনা সবাই তিনি শুরু করেছিলেন। তার গৃহীত বহু পদক্ষেপ যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো মাত্র তিন বছরের মাথায় কেন তাঁকে হত্যা করা হলো এবং দলের লাখ লাখ নেতা কর্মী কেন সেদিন হতবিহ্বল হয়ে দিক্বিদিকশুন্য হয়ে রইলেন? কেন নেতা কর্মীরা মহান নেতাকে হত্যার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেন না এবং কার্যত কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হলেন?

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে জাতি কোন আলোর পথে যাত্রা করে কোন তিমিরে চলে গেল? এসবই চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। আত্মউপলব্ধিই কেবল সত্য কে চেনায়। তথ্য ভুরি ভুরি গল্প, উদাহরণ বস্তুত তেমন কোন কাজে লাগেনা। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অতীতে বলেছেন- যে দেশে জাতির জনক হত্যা হয়, সে দেশে সব করা যায়, সব হতে পারে। তিনি এও বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মাঠে কাউকে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনার এই সরল অভিব্যক্তিকে গুরুত্ব দিয়েই সত্য অন্বেষণ করতে হবে। ৭২ এ সংবিধান কে ঐতিহাসিক বলা হলেও কেন  আমরা ২০২১ সালে এসেও তা ফিরিয়ে আনতে পারিনি, কেন রাষ্ট্রীয় চরিত্র বিনষ্ট হবার পরও তার পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে না?

দেশ শব্দটি ব্যাপক ও বিশাল। দেশ মানে দশের সমষ্টি আবার দেশ মানে দিশা। প্রকৃত নেতা সব সময় সময়ের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে। এগিয়ে থাকেন বলেই তিনি নেতা। নেতৃত্ব দিতে পারেন। তিনি অগ্রসরমান মানুষ। নেতার সাথে কর্মীর এবং জনগণের কিংবা জনসাধারণের পার্থক্য এখানেই। এ জন্যই লক্ষ কর্মীর চেয়ে নেতার গুরুত্ব বেশি।

বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সময়টিকে ধরেছেন। এমন একটি সময় তিনি রাজনীতিতে ঢুকেছেন, সময়টি পরাধীন একটি জাতির প্রতি বৈষম্য দুঃখ কষ্টের সময়। তিনি ৪৬ এর দাঙ্গা, ৫০ এর মন্নন্তর দেখেছেন। ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯,৭০ তাঁর জীবন প্রবাহ। একই সময়ে কারাগারে বসে পড়েছেন, জেনেছেন বিশ্ব ইতিহাস,  প্রতিদিন গ্রেফতার নেতা কর্মীদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি। দেখেছেন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব। তাই তো তিনি বাংলার বন্ধু বঙ্গবন্ধু।

আজকের নেতৃত্ব কি সেটা উপলব্ধি করেন? তারা কি জানেন কেন শেখ হাসিনাকে থামিয়ে দিতে চায় ঘাতকরা? বুঝতে পারেননা বলেই ত্যাগের বিপরীতে ভোগের, সত্য সুন্দরের বিপরীতে নষ্ট উদভ্রান্তের রাজনীতি ঝেঁকে বসেছে। চরিত্রহীন লোকের হাতে রাজনীতি। লুটেরা ভূঁইফোড় মোসাহেবদের হাতে দল। পথ দেখানোর মতো নির্মোহ সৌন্দর্যবান নেতৃত্বই সব সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে, পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। বুনন সহমর্মিতার রাজনীতিই তো বাঙালির রাজনীতি। সেখানেই শক্তি ও সার্মথ্য।

জানুয়ারিতেই করোনার ভারতীয় টিকা পাচ্ছে বাংলাদেশ

সংলাপ ॥ সারাবিশ্বে যেভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস সে তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা ভালো অবস্থানে। তবুও থেমে নেই মৃত্যু, থেমে নেই সংক্রমণ। প্রতিদিনই বাড়ছে লাশের আর সংক্রমনের মিছিল। দেশে এখন পর্যন্ত ৫ লাখ ২৫ হাজারের অধিক মানুষের দেহে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ হাজার ৮০০ জনের অধিক মৃত্যু হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ৪ লাখ ৭০ হাজারের বেশি।

প্রায় দশমাস ধরে চলমান করোনা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে নিরাপদ থাকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ দেন।

১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে আওয়ামী লীগের এক আলোচনায় গণভবন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা সতর্ক করে বলেন- আগামী মার্চে করোনার আরেকটি ধাক্কা আসতে পারে। এসময় করোনার ভ্যাকসিন পেতে সরকারের আন্তরিকতার কথা জানিয়ে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, শিগগিরই ভ্যাকসিন পেতে সরকার অর্থ বরাদ্ধসহ সবরকম ব্যবস্থা করে রেখেছে।ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের টিকা উৎপাদনকারী কোম্পানি ফাইজার ও জার্মানির বায়োএনটেকের যৌথভাবে তৈরি করোনার টিকাও সংগ্রহের প্রস্তাব পেয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি কোভ্যাক্স থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো চিঠিতে এ প্রস্তাব এসেছে। এর ফলে আগামী এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের জন্য এই টিকা পাবার আশা করছে সরকার।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মীরযাদি সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, কোভ্যাক্সের পক্ষ থেকে গত ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশসহ  ১৯২ টি সদস্য দেশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জানুয়ারির শেষ অথবা ফেব্রুয়ারিতে এসব দেশের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। সদস্য দেশগুলোর আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ থেকে ২৮ জানুয়ারির মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও গ্যাভি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট দেশের আগ্রহপত্র ও অবকাঠামো পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। ২৯ জানুয়ারির মধ্যে টিকা বিতরণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। এরপর সদস্য দেশগুলোকে টিকাপ্রাপ্তির বিষয়ে জানানো হবে। জাতীয়ভাবে কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি ফাইজারের টিকা পেতে সব রকম প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনলাইনে অ্যাপের মাধ্যমে নাম তালিকাভুক্ত করতে হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। এই টিকা ফ্রন্টলাইনে কাজ করেন- এমন ব্যক্তিদের দেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছে কোভ্যাক্স। এ বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ওই শর্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এই টিকা স্বাস্থ্যকর্মীদের দিতে পারলে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা অন্যদের দেওয়া যাবে। জানুয়ারিতেই ভারতীয় টিকা পাবে বাংলাদেশ। স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে ৫০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। চুক্তিমাফিক ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার এই টিকা আমদানি করছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস।বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাজমুল হাসান পাপন গত সোমবার গণমাধ্যমকে জানান, প্রথম চালানে ৫০ লাখ টিকা দেশে আসতে পারে। এরপর প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে টিকা আসবে।

সচিবালয়ে শব্দ দূষণ : পরিত্রাণে ১৯ সুপারিশ

সংলাপ ॥ দূষণে দূষণে ছেয়ে গেছে সারাদেশ। সারাদেশের সাথে তালমিলিয়ে দূষণের নগরী আজ ঢাকাও। নদী দূষণ, বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ- কেবল দূষণ আর দূষণ । এবার খোদ রাজধানিতে নীরব এলাকা ঘোষিত বাংলাদেশ সচিবালয়ের চারপাশে শব্দ দূষণ তীব্রতর হয়েছে। ২০২০ সালে করোনাকালে যানবাহন চলাচলে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণের কারণে সময়ের ব্যাপ্তিতে শব্দদূষণ কিছুটা কমলেও তীব্রতার দিক থেকে তা বেড়েছে। শব্দের সর্বোচ্চ মানের দিক থেকে ২০১৯ এর চেয়ে ২০২০ সালে দূষণ বেড়েছে ৭.৮ শতাংশ ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় জানা গেছে এ তথ্য। সম্প্রতি, ঢাকা  রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে নীরব এলাকা ঘোষিত সচিবালয়ের চারপাশে তীব্র শব্দ দূষণ- শীর্ষক এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয় । সংবাদ সম্মেলনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাপার যুগ্ম সম্পাদক এবং ক্যাপস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। বাপা এবং ক্যাপস-এর যৌথ গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, তীব্রতার ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণ লক্ষ্য করা গেছে পল্টন বাসস্ট্যান্ডে এবং সময়ের ব্যাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি শব্দ দূষণ লক্ষ্য করা গেছে কদম ফোয়ারায়। ২০২০ সালে ১৪-২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ দিনে সচিবালয়ের আশে পাশে ১২ টি স্থানের সবগুলোর মধ্যেই সর্বোচ্চ শব্দের মান পাওয়া গিয়েছে ১২০ ডেসিবেলের উপরে। এদিক থেকে পল্টন বাসস্ট্যান্ডে (১২৯.২ ডেসিবেল) সবচেয়ে বেশী শব্দের মাত্রা পাওয়া যায়। সংগৃহীত উপাত্তের গড়ের হিসাবে শব্দের সর্বোচ্চ মান পাওয়া গিয়েছে কদম ফোয়ারায় যা ১১৮.৭ ডেসিবেল এবং সবার চেয়ে কম শব্দ রয়েছে সচিবালয়ের পশ্চিম দিকের (মসজিদ) স্থানে (৯৯.৫ ডেসিবেল)। ২০১৯ সালের তুলনায় সর্বোচ্চ মানের দিক থেকে ২০২০ সালে সবকটি স্থানেই শব্দ দূষণ বেড়েছে, তবে শব্দের সর্বোচ্চ মানের ভিত্তিতে দূষণের স্থান ভেদে ক্রম পরিবর্তন হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেহেতু করোনা পরিস্থিতে স্কুল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রায় ১০ শতাংশ যানবাহন কম চলাচল করেছে, যেখানে মাত্র ৩.৫ শতাংশ শব্দের মাত্রা কমলেও প্রকৃত হিসাবে শব্দ দূষণ বরং বেড়েছে।

জরিপ পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে হর্ণ গণনার ফলাফল অনুযায়ী ‘জিরো পয়েন্ট’ এলাকায় সবচেয়ে বেশী হর্ণ গণনা করা হয় যেখানে ১০ মিনিটে ৩৩২ টি হর্ণ বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ৭০টি হাইড্রোলিক হর্ণ এবং ২৬২টি সাধারণ হর্ণ বাজানো হয়।

২০০ ট্রাফিক পুলিশদের শ্রবণ স্বাস্থ্যের উপর প্রশ্নপত্র জরিপের ফলাফলে দেখা যায় যে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দায়িত্ব পালনরত ৯.৫ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি হ্রাস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ২৮.৬ ভাগ ট্রাফিক পুলিশ জানান যে, অন্যরা উচ্চস্বরে কথা না বললে তাদের কথা শুনতে কষ্ট হয়, ১৩.৭ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের সাধারণভাবে মোবাইলে কথা শুনতে অসুবিধা বোধ করে।

এ সময় সচিবালয়ের ভিতর ও চারপাশে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞগণ। এছাড়াও,  সচিবালয়ের দেয়ালে সাউন্ড প্রুফ প্লাস্টার বোর্ড বসানো এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও  প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে রাস্তায় সাইরেন বাজিয়ে ভিআইপি প্রটোকল না দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর মাননীয় উপাচার্য স্থপতি অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, শব্দ দূষণের মতো মারাত্মক ঘাতক থেকে আপামর জনসাধারণকে রক্ষা করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষক মন্ডলী ও ছাত্র সমাজকে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও, তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহকে এই ধরণের জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন, সরকার এবং জনগণ এর নিকট শব্দদূষণ এর ক্ষতিকর প্রভাবটি তুলে ধরতে পারলে আমাদের এই উদ্যোগ সফল হবে। বাপার সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, শব্দ দূষণ একটি সামাজিক ব্যাধি এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা। সর্ব প্রথম সমাজের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শব্দ দূষণ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও তিনি হাইড্রলিক হর্ন ব্যবহার ও এর আমদানী নিষিদ্ধ করণের আইনটি দ্রুত কার্যকর করার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন শব্দ দূষণের কারণে স্বাস্থ্যগত এবং সামাজিক ক্ষতির পরিমান অনেক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের চেয়েও বেশী, তাই একে বিশেষগুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাপার যুগ্ম-সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, শব্দ দূষণের কারণে মানব জাতি আস্তে আস্তে বধির এবং খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। এই জন্য তিনি সুষ্ঠ দূষণ মনিটরিং এবং এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান।

শব্দ দূষণের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ এর জন্য ১৯টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়-

১. সচিবালয়ের ভিতর ও চারপাশে প্রচুর পরিমান গাছ লাগাতে হবে।

২. সচিবালয়ের দেওয়ালে সাউন্ড প্রুফ প্লাস্টার বোর্ড বসানো যেতে পারে।

৩. বিধিমালা সংজ্ঞা অনুযায়ী চিহ্নিত জোনসমূহে (নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও মিশ্র) সাইনপোস্ট উপস্থাপন করা।

৪. হাইড্রোলিক হর্ণ আমদানি বন্ধ করা, হর্ণ বাজানোর শাস্তি বৃদ্ধি ও চালকদের শব্দ সচেতনতা যাচাই করে লাইসেন্স প্রদান করা।

৫. নিরব এলাকা ঘোষণার আগে পর্যাপ্ত গবেষণা এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং চালকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৬. অনুমতি ব্যতীত সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাইক বাজানো নিষিদ্ধ করা এবং মাইকের শব্দ সীমিত করা।

৭. ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য উচ্চতর শব্দের পরিবেশ এড়ানো উচিত।

৮. ট্রাফিক পুলিশদের কানের সুরক্ষা সরঞ্জামগুলি (পিপিই) যেমন কান এবং শ্রুতি সুরক্ষার জন্য কানের প্লাগ বা ইয়ারম্যাফ ব্যবহার করা উচিত।

৯. নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা।

১০.  সড়কের পাশে গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা।

১১. আবাসিক এলাকা সমূহকে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরিত না করা।

১২. পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সহ অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের সমন্বয় সাধন করা।

১৩. শব্দের মাত্রা অনুযায়ী যানবাহনের ছাড়পত্র দেওয়া।

১৪. গণপরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ।

১৫. পৃথক বাইসাইকেল লাইন চালু করা।

১৬. জেনারেটর এবং সকল প্রকার শব্দ সৃষ্টি যন্ত্রপাতির মান মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া।

১৭. শব্দের মাত্রা হ্রাসের পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যতীত শিল্প-কারখানা স্থাপনে ছাড়পত্র প্রদান না করা।

১৮. কমিউনিটি ভিত্তিক কমিটি করে শব্দ দূষণ সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের বিষয়ে তদারকি দায়িত্ব প্রদান করা। ১৯. শব্দ দূষণের ক্ষতি, প্রতিকার ও বিদ্যমান আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি

যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিল, আজ তারাই ব্যর্থ- শেখ হাসিনা

ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণে জাতির প্রত্যাশা!

শেখ উল্লাস ॥ ১৯৭০ এ জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তথা বাঙালিদের বিজয়। আওয়ামী লীগ ১৬৭ আসনে এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপিপি ৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। আর এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর যাতে না করতে হয় সে লক্ষ্যে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে ইয়াহিয়া-ভুট্টো। নির্বাচনের পর ২১ ডিসেম্বর ভুট্টোর উক্তি ছিল, গত তেইশ বছর পূর্ব পাকিস্তান দেশ শাসনে ন্যায্য হিস্যা পায়নি, তাই বলে আগামী ২৩ বছর পাকিস্তানের ওপর প্রভুত্ব করবে তা হতে পারে না। এদিকে ঢাকায় ৭১এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্সে বিরাট সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ছয়দফা এখন আর পার্টির সম্পত্তি নয়, জনগণের সম্পত্তি। ছয়দফা ও এগার দফার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধান প্রণীত হবে। এ ব্যাপারে কেউ আর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না।  এ সময় জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে ভুট্টোর একান্ত ও গোপন বৈঠকের খবর প্রকাশ হতে থাকে। ২৭ জানুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় আসেন ৩০ জানুয়ারি ভুট্টো বলেন,

শেখ মুজিবের সাথে আলোচনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়নি। আমি পরবর্তীতে আরও আলোচনায় রাজি আছি।  তারপরের ইতিহাস সবার জানা। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসেই কী ঘটলো। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি মুক্ত স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু লাখো জনতার সমাবেশে বললেন, আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার বাংলার মানুষ মুক্ত হয়েছে। সেই থেকে পার হয়েছে দীর্ঘ প্রায় ৫০টি বছর। স্বাধীনতা ও বিজয়ের এই মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ তাঁরই সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ম শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে একে মধ্যম আয় এবং তারপর উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে। ২০০৯ সাল থেকে টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের দ্বিতীয় বর্ষপূতি উপলক্ষে গত ৭ জানুয়ারি (২৩ পৌষ ১৪২৭) তারিখে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘জনগণের সরকার হিসেবে মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য বলেই মনে করি। গত এক যুগে আমরা জনগণের জন্য কী করেছি, তা মূল্যায়নের ভার আপনাদের। আমার পরম সৌভাগ্য যে আপনাদের সকলের সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করতে পেরেছি এবং মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণে-কথায় সচেতন দেশবাসীর কথারই প্রতিধ্বনি। পিতার মতো তিনিও  দেশটাকে ভালোবাসেন এবং এটাই স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেছেন, গত ১২ বছরে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।দ্য ইকোনমিস্টু-এর ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান নবম এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের সমৃদ্ধশালী-মর্যাদাশীল দেশ। আমরা ২০২১ সালের পূর্বেই উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি। প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমরা পথ নকশা তৈরি করেছি। রূপকল্প-২০৪১ এর কৌশলগত দলিল হিসেবে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা  ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে।   ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়। কারণ, পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে সেদিন ফিরেছিলেন বলেই দেশ থেকে মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ থেকে তাদের দেশ ভারতে ফিরে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেদিন ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশ ছেড়ে না গেলে অন্য কোনও নেতার পক্ষে এই কাজটি করা কখনও সম্ভব হতো না, আর স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ এদেশের মানুষ ভোগ করতে পারতো না। আজ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছরে এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধুর দল, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত-এদেশের স্বাধীনতাকামী বাঙালির জন্য এর চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কী হতে পারে! স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দেশি-বিদেশি শক্তির জন্য এর চেয়ে উচিত শিক্ষাও আর কিছু হতে পারে না। তাই এবারের ১০ জানুয়ারি রোববার বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা যথার্থই বলেছেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চেয়েছিল, আজ তারাই ব্যর্থ। আজকে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ

হিসেবে সারাবিশ্বে যে মর্যাদা পেয়েছে, এই মর্যাদা ধরে রেখে আমরা বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। জাতির পিতার কন্যার এসব বক্তব্য দেশের সাধারণ মানুষের মতের প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুর মতো তাঁর কন্যাও বাংলার সর্বস্তরের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে বলেই স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি হাজার চেষ্টা-ষড়যন্ত্র করেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি। বাংলার জনগণ স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তিকেই ক্ষমতায় দেখতে চায়, রাখতে চায়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে বাংলার মাটি ও মানুষ কখনো চায় না। এই অপশক্তিও বাংলার মাটি ও মানুষকে বিশ্বাস করে না, ভালোবাসেনা। পেশী  শক্তি, ধর্মের নামে উগ্রতা ও মিথ্যাচারের সাথে বাংলার মানুষের কোন সম্পর্ক হয় না। কারণ, বাংলার মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়, বাংলার মানুষ অসাম্প্রদায়িক, প্রকৃতিগতভাবেই এদেশের মানুষ শান্ত ও ভদ্র। এদেশে উগ্রবাদ, জঙ্গীবাদের স্থান হয় না। আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তাই যথার্থই বলেছেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের হাত থেকে দেশকে মুক্ত রেখে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব।   বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক। তাই বলে স্বাধীনতাকে যারা ব্যর্থ  করতে চেয়েছিল তারা ব্যর্থ-এ কথাটি কতটুকু বাস্তব তা হয়তো এখনও স্পষ্ট করে বলার সময় আসেনি। কারণ, তারা ঘাপটি মেরে বসে আছে সরকারি দল এবং সরকার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে। আর সরকার এবং এর দল ও প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে সুবিধা নিতে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির এজেন্টরাই সিদ্ধহস্ত। ওরা যে কপট-মুনাফেক। ওরা কৌশল পাল্টিয়েছে মাত্র। চুপটি মেরে বসে থেকে সরকার ও রাষ্ট্র থেকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে, আর সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে। ওদের কৌশল-অপকৌশল  মোকাবেলা করতে ওদের দিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণটাই এখন বেশি জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রসার ও জনগণের আর্থিক প্রতিপত্তি-সমৃদ্ধির এই সময়ে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় সচেতন মানুষকে তাড়িত, পীড়িত করছে প্রতিমূহুর্তে। করোনাও অনেক মানুষকে হুঁশ করতে পারেনি। সুবিধাভোগী আর সুবিধাবাদীদের ‘আরও চাই, আরও চাই প্রবণতা দেশে বৈষম্য ও অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর বছর শুরুর এই সময়ে, ২০২০-২০২১, এই ডিসেম্বর-জানুয়ারির (পৌষ-মাঘে) এই মাহেন্দ্রক্ষণে সরকারি দল ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি কর্মের ওপর আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ চায় জাতির সচেতন মহল।

জয় বাংলা – বাংলার জয় চেতনায় বিজয়

সংলাপ॥ বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে মহত্তম ও গৌরবের অর্জন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় যে স্বপ্ন বা আকাঙ্খা কাজ করেছে তা-ই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। কি ছিল সে চেতনা? আমাদের প্রাথমিক স্বপ্ন ছিল আমরা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হবো। আমাদের পরবর্তী স্বপ্ন ছিল আমরা আমাদের রক্তার্জিত দেশটিকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করব। সেই সোনার বাংলায় প্রতিটি নাগরিক হবে সোনার মানুষ, আর সামষ্টিকভাবে জাতিটি হবে সোনার জাতি। সেখানে প্রত্যেক বাঙালি সব ধরনের বৈষম্য, বঞ্চনা, অন্যায়, অবিচার, শোষণ, ত্রাস, অগণতান্ত্রিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, আধিপত্যকামিতা বা ক্ষমতান্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে এমন এক নৈয়ায়িক রাষ্ট্রের নাগরিক হবে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে একটি সমতাভিত্তিক শান্ত সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও শোষণ মুক্তির চেতনাকে ধরে রাখার জন্য আমরা একটি অসাধারণ দলিল প্রণয়ন করেছিলাম। সেই দলিলটিরই নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ (আজও জনগণতন্ত্রী হলো না)। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে পুষ্ট করে তোলার জন্য, রাষ্ট্রের জন্য আমরা চারটি মূলনীতি বিধিবদ্ধ করেছিলাম। জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র – এই চারটি মূলনীতিই ছিল আমাদের রাষ্ট্রের স্তম্ভ। আমাদের বিজয়ের চার বছর যেতে না যেতেই বিজয়ের সুফলটিকে স্বাধীনতার শত্রুরা অপহরণ করে নিয়ে যায়। জাতির জনককে তারা স্বপরিবারে হত্যা করে। স্বাধীনতার পক্ষের অনেক নেতাকে কারাবন্দি করে। বন্দি অবস্থাতেই হত্যা করে আমাদের আরও চার জাতীয় নেতাকে। এর পরপরই আমাদের সংবিধান ও দলিলটিকে প্রায় পুরোপুরি নষ্ট করে দেয় তারা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে এক উদ্ভট জাতীয়তাবাদের আমদানি করে। নাম দেয় তারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ!

আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে এও বলা হয়েছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে – রাষ্ট্র কোন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করবে না। কিন্তু স্বাধীনতার শত্রুরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুরোপুরি ধর্মহীনতা বলে অপপ্রচার চালায়। সেই অপপ্রচারে অনেক মানুষকেই তারা বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়। তাদের বক্তব্য ছিল – যে দেশের নাগরিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী, সেই বিশ্বাসকেই ধ্বসিয়ে দেবার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি আমদানি করা হয়েছে। এ রকম অপপ্রচারের মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার শত্রুরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম বলে ঘোষণা করে তা আজও বর্তমান। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় চেতনা লুট হয়ে যায়। বাঙালি জাতির পাঁচ হাজার বছরের লালিত চেতনার স্থলে কোন চেতনাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এখন ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রধর্ম উভয়ই সংবিধানে আছে। বদলে দেয়া হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতার তাৎপর্য। ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে এখন বুঝানো হচ্ছে সব ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা। অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকায় ইসলাম নিয়ে রাজনীতির সুযোগ অবারিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ইসলামের কূট কৌশলের প্যাঁচে পড়ে আমরা হারাতে বসেছি  নিজস্ব গৌরব ও শক্তি। রাজনৈতিক ইসলাম বাঙালি জাতি সত্তাকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমানকে আবার নতুন করে মুসলমান বানানোর প্রচেষ্টা চলছে। বস্তাপঁচা শারিয়া গেলানোর সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে দেশের গরীব মানুষ ও অশিক্ষিত লোকদেরকে উগ্রবাদী ও ধর্মান্ধ বানানোর নেশায় তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলামপন্থীদের ঘুম নেই। তারা ইসলামের নামে তথাকথিত জেহাদী শিক্ষা দিয়ে চলেছে যার সাথে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর ইসলাম এর জেহাদী শিক্ষার কোন মিল নেই। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর সময় কোথায় ছিলো শারিয়া? কোথায় ছিলো ইসলামী রাষ্ট্র? এমনকি আজকের পৃথিবীতে কোথাও কি কোন ইসলামী রাষ্ট্র আছে বলে কেউ প্রমাণ করতে পারবেন? সবই যুগে যুগে তৈরি করা হয়েছে ধর্মের নামে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দ্বারা শোষণ এবং শাসন করার জন্য। এখন বাঙালির সামনে আসছে সিদ্ধান্ত নেয়ার। পাঁচ হাজার বছরের শান্তির ধারক-বাহক বাঙালি জাতি যারা নিজেদের শান্তিকে শান্তিময় করে রাখার জন্য নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর (ইসলাম) শান্তিকে আঁকড়ে ধরে হাজার বছর শান্তিতে বসবাস করে আসছে সত্যকে আঁকড়ে ধরে, সেখানে তথাকথিত রাজনৈতিক ইসলাম তৈরি করে ধর্মান্ধরা বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র করে চলেছে।

সময় আসছে দেশবাসীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা আল্লাহ্ ও মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর ইসলাম ধারণ-লালন-পালন করবে নাকি ধর্মান্ধ মানুষের গড়া আমদানীকৃত ইসলাম মানবে। অপরদিকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের উর্দ্ধে উঠতে না পারায় এবং মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি জাতিকে দলীয়করণের নেশায় মত্ত হওয়ার ফলে মুক্তিযোদ্ধারা আজ বহুধা বিভক্ত। শুধু তাই নয়, একদল মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধাপরাধী-ধর্মান্ধদের লেজুড়বৃত্তি করছে শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার জন্য!

আজও দেশের শত্রু স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাজাকার, নব্য রাজাকার, রাজাকারের সন্তানেরা তাদের চিরচেনা বন্ধুদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় এসে সোনার বাংলার উপর তাদের কালো থাবা বসানোর দুঃস্বপ্ন দেখে। যাদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বহমান, যাদের চেতনায় বিজয় আছে, যারা দেশকে ভালোবাসেন তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে এই অপশক্তিকে নির্মূল করার।

এখন সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করে মাঠে নামার, বাঙালি জাতির বাঙালিত্ব নিয়ে মাঠে নামার। আবার সেই মুক্তিযুদ্ধের জীবনীশক্তি জয়ধ্বনি প্রতিটি বাঙালির কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হতে হবে এবং আওয়াজ তুলতে হবে – জয় বাংলা – জয় বাংলা – জয় বাংলা। যারা তথাকথিত ধর্মের নামে একে অসম্মান করতে চায় তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার সময় এসেছে এবং প্রতিহত করার সময় এসেছে যে জয় বাংলার শান্তি (ইসলাম) আর নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর ইসলাম এক ও অভিন্ন যা এদেশের মাটিতে আল্লাহ্ ওলীগণের দ্বারা বাংলায় বীজবপন করা হয়েছিলো এক হাজার দু’শত বছর আগে। বাংলাদেশে বাঙালি সত্ত্বাই একমাত্র সত্ত্বা যাকে ধারণ-লালন-পালন করতে হবে তবেই নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বাঙালি জগৎসভায় মর্যাদাময় আসন পাবে। এতে যদি আমরা অমনোযোগী হই, তাহলে আমাদের দুঃখ ঘুচবে না, আমাদের অন্ধকারের মধ্য দিয়েই চলতে হবে। জাগ্রত চিত্ত হতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় মৃত্যু শেখ হাসিনার নব উত্থান

নজরুল ইশতিয়াক॥ ১৯৭৫ সালে মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-  কোন কারণে দৈহিকভাবে আমার একবার মৃত্যু হলেও পরবর্তীতে লুটেরা, দলীয় চরিত্রহীন, নষ্ট  বিভ্রান্তদের হাতে নেতৃত্ব গেলে দ্বিতীয় মৃত্যু হবে। সেটা হবে ভয়াবহ। বিস্তৃ অতল গহ্বরে দীর্ঘকাল হারিয়ে থাকবে আওয়ামীলীগ। তিনি বলেছিলেন স্বাধীন দেশে লুটপাট ধনপতি হবার সুযোগ বেড়েছে।

দলকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সেটা কাজে লাগাবে। জাতির জনকের এই গভীর উপলব্ধি হতে প্রাপ্ত সত্য থেকে কতদূরে আমরা অবস্থান করছি? কঠিন অথচ সত্য জানার তাগিদেই যদি প্রশ্ন আসে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে কতবার বঙ্গবন্ধুকে মরতে হয়েছে? সেই হিসেব কি মিলবে বাঙালি জাতির?

তবু দেশ থাকে, থাকে দেশমাতা, থাকে সত্য। থাকে প্রকৃতি প্রতিবেশ ও মানবিক সৃজনশীল চিন্তার অপূর্ব এক উদ্যান। যা গোপনে গভীর আবেদন রেখে চলে। এই পথ চলা হয়তো শেষ হয়না।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় মৃত্যু হয়তো হয়েছে,  শুধু একবার দুইবার কেন শত শত বার হয়তো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। সেটা প্রমান করাও যায়। তবু বাঙালির জাতীয়তাবোধের সুকুমারী সুক্ষ্ম বুননের ভাঁজে ভাঁজে একটি সত্য; সত্য ধারা হয়ে বহমান প্রবাহ। সেই ধারা কিংবা শক্তিটি সাধারণ মানুষের, সেই সত্যটি কিছু নিদর্শন স্বরূপ বাংলার পথে প্রান্তরে রয়েছে। অল্প কিছু পরিসরে জোরালো ভাবেই নিরবে নিভৃতে সেটা কার্যকর রয়েছে। বাংলার সাধককূলের দানে অবদানে তা নির্মিত। রয়েছে কিছু ত্যাগী দেশপ্রেমিকের অবদান। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণগুলো যারা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন, তারা জানেন তিনি কতটা দূরদর্শী ছিলেন। তিনি তো কোন সত্য এড়িয়ে যান নি। তিনি তো কোন বিভ্রান্তি তৈরী করে যাননি। অথচ আজকের আওয়ামীলীগ সেসব সত্য তুলে ধরতে চায় না, বলো না বঙ্গবন্ধু কি বলেছেন দেশ বিনির্মানের জন্য! আফসোস তারা সেসময়ের জিডিপি বিনিয়োগ অর্থনীতি নিয়ে কথা বলে বাহ্বা নেন। অথচ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, চোরের দল, চাটার দল, মোসাহেব, লুটেরা, প্রতারক এসব বিশ্লেষণ। কারা এরা, তারা এখন কোথায়? আমরা কি সেই সত্য থেকে দূরে?

বঙ্গবন্ধু তো চরম অসহায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। পৃথিবীর দেশে দেশে ছুটেছেন দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। বিভিন্ন সম্মেলনে গেছেন কেবলমাত্র দেশের মানুষের ভাগ্য ফোরাতে। যেসব তথাকথিত মুসলিম দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি তাদের কাছেও গেছেন সাহায্য সহযোগিতার জন্যই। বঙ্গবন্ধু তো সবই জানতেন, হয়তো কিছুই করার ছিল না, বাস্তবতার মধ্যে পড়ে মরতে হয়েছে। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। বলতেন আমার কৃষক শ্রমিক চোর না। তারা উৎপাদন করে আর লুটেরারা লুট করে নিয়ে যায়। আমার গরীব মানুষেরা আমাকে ভালবাসে, তাদের পেটে ভাত নাই, পরনে কাপড় নেই তবু মুখে হাসি নিয়ে আমাকে একনজর দেখার জন্য পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি বহুবার স্পষ্ট করে বলেছেন শিক্ষিত লোকেরাই চুরি করে, সাধারণ মানুষ নয়। কৃষক শ্রমিকের ঘামের ঋণ শোধ দিতে পারি না। তিনি সমাজের উঁচুতলার অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বলেন আপনাদের বেতন হয় ঐ নিচুতলার মানুষদের টাকায়, আপনারা জনগণের চাকর, প্রজাতন্ত্রের সেবক। ৭২- ৭৫ এর শাসনামল পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধি করা যায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দূরদর্শীতার কোন ঘাটতি ছিল না। মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কোন ঘাটতি ছিল না। বস্তুত তার মতো মহান দেশপ্রেমিকের কোন মৃত্যু নেই।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ধীরে ধীরে সেই সত্য রেখা ধরেই চলছেন। স্পষ্টতই তাঁর সাফল্যের ঝুলিতে বহু অর্জন। চেতনায় তিনি বিজয়কে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন। সব অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করে তুলেছেন, তুলছেন। দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

সাম্প্রতিক ভাস্কর্য ইস্যুতেও শেখ হাসিনার দূরদর্শীতা দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। তিনি উপলব্ধি করছেন হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীদের শিক্ষা। তাইতো এবারের বিজয় দিবসে বললেন- এদেশ লালন, হাসন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শাহজালালের দেশ। এদেশ বঙ্গবন্ধুর দেশ। এদেশে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি মেনে নেয়া যাবে না। বস্তুত এই উপলব্ধি দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে এগিয়ে নেবে। দলের সহযোগী সংগঠনগুলোতে সংস্কার, দূর্নীতি বিরোধী অভিযান তাঁর অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে তিনি মানবতাবিরোধী ঘাতকদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন। একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ যাত্রা শুরু হয়েছে। চাইলেই তিনি রাতারাতি সব আবর্জনা সাফ করতে পারবেন না। সেটি সম্ভব হবে সব পর্যায়ের নেতৃত্বের গুণ সমৃদ্ধ নেতাদের অবদানে। সরকারী কর্মকতা ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে। সামাজিক পরিকাঠামো সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।

হুর এবং সওয়াবের আশায় ঈবাদত করা মূর্খতার উচ্চ শিখরে বাস করার নামান্তর

সাইমা (মাস্কাট)॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ -অনুগ্রহ বশতঃ, একদিন এই বাণীটি এক জনসমাবেশে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য উচ্চারণ করেছিলেন। আল্লাহ্ মানুষকে ভীষণ ভালোবাসেন। আল্লাহ্ মানুষকে ভালোবেসে, মানুষ-কে নিজ অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্র সকল গুন মানুষের নিকট বিদ্যমান। যেই স্থানে আল্লাহ্ আছেন- ঠিক সেই স্থানে ইবলিশও বর্তমান। মানুষ ব্যতীত আল্লাহ্ এবং ইবলিশের অস্তিত্ব নাই। পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীর অবয়বে; ঠিক কোন স্থানে আল্লাহ অবস্থান করছেন ? এটি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে আবিষ্কার করা যায় না। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীর অবয়বে আল্লাহ্ অবস্থান করছেন- আমার এই নিজের বিষয়টি অন্যরা কিভাবে বলবে। আমার শরীরে ব্যথা কোথায় ইহা আমি নিদিষ্ট করে বলতে পারি। অথচ শরীরের কোন জায়গায় আল্লাহ্ বা ইবলিশ আছেন – ইহা আমি জানি না।  যেহেতু আমি বিষয়টি জানি না, সেহেতু আমি এই বিষয়ে মূর্খ ও অচেতন। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সংশ্লিষ্টতা নাই। নামাজ যাদু নয়-যে, নামাজ পড়লেই আমি বুঝতে পারবো, শরীরের ঠিক কোন স্থানে আল্লাহ/ইবলিশ আছেন। ইহা গণিতের মতো নির্ণয় ও আবিষ্কারের বিষয়। এখানে পড়ার বিষয় নাই। এখানে কাজের বিষয়- নিষ্ঠার সাথে কাজ করার বিষয়। একটি কাজ করতে হলে, শান্তভাবে এক স্থানে নীরবে বসতে হয়। বৈজ্ঞানিকগণ দৌড়াদৌড়ি করে কিছুই আবিষ্কার করতে পারেন নাই। বিজ্ঞানী নিউটন- তিঁনিও আপেল গাছের নীচে বসেছিলেন। কাজেই, স্থির হয়ে এক স্থানে বসতে হয়  বিষয়টি নিশ্চিত।

একটু চিন্তা করতে হয় – যে ‘আমি’ বিষয়টি কি ? দীর্ঘদিন একাকী নীরবতার মধ্যে নিজেকে একটু খুঁজে বেড়াতে হয়। এই ভাবে খুঁজতে খুঁজতে একদিন হয়তো, নিজেকে খুঁজে পাওয়া যাবে অথবা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে, ইহা নিশ্চিত, একটি কাজ মনোযোগ ও নিষ্ঠার সাথে করলে, এর পজেটিভ ফল পাওয়া যায়। যারা কিছুদিন নীরবে একটু বসেন-তারপর অলসতা বা বিভিন্ন অজুহাতে খুঁজে বেড়ানো ছেড়ে দেন এবং বিভিন্ন স্থানে দৌড়াদৌড়ি করেন- তাদের কথা ভিন্ন। মনে রাখা আবশ্যক, হয় তুঁমি নিজেকে খুঁজো অথবা যা খুশী দৌড়াদৌড়ি করো। তোমাকে তো কেহ নীরবতায় বসে, নিজেকে অন্বেষণ করতে জোর করছে না। কিন্তু, একদিন তোমার এই দৌড়াদৌড়ি নীরবতার নিকট নির্মমভাবে পরাজিত হবে। প্রতিটি মানুষের সেই দিনটি মোটেও দুরে নয়। নিজেকে খুঁজে বেড়ানো এবং নিজেকে আবিষ্কার করাই মানুষের মূল কাজ। আল্লাহ চুপ/নীরব থাকতে পছন্দ করেন। তাই অল্লাহ-কে পেতে হলে একটু স্থির হয়ে নীরবে বসতেই হবে। ইহার কোন বিকল্প নাই। কিন্তু মানুষ এই কথাটি মোটেও শুনতে রাজী নয়। মানুষ দৌড়াদৌড়ি করে।

প্রতিটি দ্রব্যে ভেজাল করছে। ভেজাল মিশানো এবং ভেজাল সৃষ্টি করা মানুষের দারুণ প্রিয় বস্তু। ভেজাল খাওয়ার ফলে দেশের মানুষ অকালে মারা যাচ্ছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এরশাদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে সক্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী  রাখার জন্য দেশের সকল মানুষকে একটি ধর্মীয় প্যারাসিটামল খাওয়ালেন। ধর্মীয় এই প্যারাসিটামলের নাম ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলে আমার কি উপকার হবে? আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম দিয়ে কোন মানুষের এক পয়সার উপকার হয়নি। ইসলাম-এর নামে বিভিন্ন দলাদলি ও রেষারেষির সৃষ্টি হয়েছে।নিজেকে অন্বেষন করা বিষয়টি হারিয়ে গেছে।

আমাদের দেশের মানুষ খুবই ধর্মপ্রাণ এবং হাদীস প্রিয়। হাদীস প্রয়োজন মতো সংযোজন এবং ছাটাই করা যায়। হুজুরেরাই বলেন, সকল হাদীস ঠিক নয়। সুতরাং, নিজের মেধা ও জ্ঞান  দিয়ে নিজেকেই বুঝতে হবে- কোনটি সত্য হাদীস এবং কোনটি মিথ্যা হাদীস। আর যেখানে পবিত্র কোরআন শরীফ আছে -সেখানে হাদীসের প্রয়োজনটাই বা কি ? যেহেতু হাদীসের মধ্যে এতো সন্দেহ। যেখানে এত সন্দেহ-সেখানে যাবো কেন ? যাহা নিশ্চিত -অর্থাৎ পবিত্র কোরআন,  ইহা ধরে চললেই হয়!

সত্য/মিথ্যার পার্থক্যটা নিজের মেধা ও জ্ঞান দিয়ে  দিয়ে নিজেকেই বুঝতে হয়। কারণ, প্রয়োজনটা একান্তই নিজের। নিজের প্রয়োজন অন্যের উপর ছেড়ে দেয়া বিপদজ্জনক। তবু একটি হাদীছের বাণী থেকে উদ্বৃত করছি:  আল্লাহ বলেন, ‘আমার ইবাদত কর। আমি যখন কিছু সৃষ্টি করতে ইচ্ছা প্রকাশ করি , তখন বলি , ‘হও’, অমনি তা হয়ে যায়। আমার ইবাদত করো, তা হলে, আমি তোমাকে এমন ক্ষমতা দান করবো , তখন তুমিও যদি কিছু বলো, অমনি তা হয়ে যাবে ’।

এমনও দোয়া আছে, যেসব দোয়া পড়তে থাকলে দিবা/রাত্রি যে কোন সময় মারা গেলে বেহেশত পাওয়া যাবে। হুজুরদের মুখে আমরা এসব কথা প্রচুর শুনি। দিন-রাত্রি আমরা এতো পরিশ্রম করে আল্লাহকে ডাকছি, বিশেষ করে আমাদের দেশ থেকে Noval Corona virus দুর করে দাও। আজকে ৯ টি মাস ধরে আমরা সবাই সম্লিলিতভাবে খুব উচ্চস্বরে আল্লাহ-কে ডাকছি। আল্লাহর কানে কি হলো, আমাদের ডাক আল্লাহ শুনছে না। উপরোন্তু Noval Corona virus নতুন করে আরম্ভ হয়েছে।  জীবন চলার পথে মৌলিক যে প্রয়োজন, ইহা পাওয়া, যে দায় হয়ে পড়েছে।

হুর তো পরের কথা। হুর না হয়, কিছু দিন পরে কবরে/বেহেশতে গেলে পাবো। এখন যে, বাঁচতে হবে। বাঁচবো কিভাবে ? করোনার কারণে, চাকরি হারা, আমদানী/রপ্তানী-ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির। অর্থনৈতিক চাকা অচল।  আগে একদিন হরতাল হলে, দেশের  কি পরিমাণ ক্ষতি হতো- ইহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ বেতার/টেলিভিশনে প্রচারিত হতো। সুতরাং, এখন কি পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে – ইহা সহজেই অনুমান করা যায়। জন-জীবন এবং দেশকে রক্ষার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ইমাজেন্সী দরকার। কিন্তু এই কঠোর বিপদের সময়ই আল্লাহর সাড়া নাই-এ কি হলো ?   

ব্যক্তি জীবনে, এসব সাধারণ প্রশ্ন, এখন আমাদেরকে বিস্ময়ে বিমুঢ় করে তোলে। যে পদ্ধতি/সিষ্টেমে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ শুনে না এবং শুনতে রাজী নয়- সেই পদ্ধতিটি বাদ দিলে কি হয় ? দিন/মাস/যুগের/শতাব্দীর পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের নিজেদের উন্নয়ন ঘটছে না। বিপদ ঘাড়ের মধ্যে শক্ত করে বসেই আছে। জীবন তো আসলে করোনার আগেও চলেনি।

অথচ, খাজা গরীবে নেওয়াজ বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ-কে ডাকলে, তোমাদের আল্লাহকে শুনতে পাও না। কিন্তু আমি ডাক দেয়ার সাথে সাথে আল্লাহর আমার ডাকে সাড়া দেন। আামার কথা মতো আল্লাহ-কে ডাকো , তোমরাও জবাব পাবে।’

একটি নিদিষ্ট সত্তা ব্যতীত অল্লাহ অস্তিত্বহীন। পবিত্র গ্রন্থ বর্ণনা করছে , ‘ভূপৃষ্ঠের সকল বস্তুই ধ্বংশসীল, কেবলমাত্র রবে তোমার প্রভুর সত্তা বা চেহারা বা অস্তি¡ত্ব’। জীবনে কোন একটি নির্দিষ্ট একক সত্তা-কে অবলম্বন করে, আল্লাহ নামে ডাকলে, নিশ্চিয়ই তিঁনি সাড়া দেবেন। ইহা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই কাজটি করার আগে আহ্বানকারীকে সত্য জীবন-যাপন করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। চিটারী/বাটপারী এবং একই সংগে আল্লাহ-কে  ডাকা, এই দুইটি কাজ একসংগে চলে না।

৯০% মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশে পুলিশে পিটিয়ে, ভ্রাম্যমান আদালত দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে নিত্যপ্রয়োজনী জিনিসপত্রে ভেজাল মিশানো বন্ধ করতে পারছে না।  যে সকল শর্তে আল্লাহ মানুষের ডাক শুনবে, মানুষ ঐ সকল শর্ত ১০০% অমান্য করছে। অর্থাৎ মানুষ আল্লাহর শর্তও মানছে না এবং আবার ডাক ও শুনতে চাচ্ছে – এ কি পাগলামী ? সুতরাং পাগলামী, চালাকী, সত্যকর্ম ব্যতীত আল্লাহর নিকট পৌঁছার অভিপ্রায়, চরম বেকুবের মতো আচরণ। এ জাতীয় কর্মে আল্লাহ তোমার ডাক শুনবে- ইহা প্রত্যাশা করা সম্পূর্ণ ভুল। আমরা দেখছিও তাই। আল্লাহ আমাদের কথা কিছুই শুনে নাই।

আল্লাহর ডাক শুনতে হলে নিজেকে শুদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতিতে একটি একক সত্তাকে সাথে নিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে জীবন প্রণালী আরম্ভ করা প্রয়োজন। কারণ, নিজেকে শুদ্ধ হওয়া ব্যতীত আল্লাহর ডাক শুনা সম্ভব নয়। আল্লাহ পবিত্র। বিদ্যুৎ পরিবাহী পদার্থ দিয়ে যেভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহিত-সঞ্চালিত হয়, বিদ্যুৎ অপরিবাহী দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় না। মানুষ অপকর্ম করার কারণে সে অশুদ্ধ হয় এবং একক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, দুরে ছিটকে পড়ে। যেহেতু সে কোন একটি নির্দিষ্ট সত্তাকে আহ্বান করে না এবং অপকর্মও ছাড়তে রাজি নয়, সেহেতু তার নামাজ এবং ঈবাদতগুলো কাজে আসছে না। শুধু ডাকছি – কিন্তু সাড়া নাই ।

প্রতিদিনের প্রার্থনায় নিয়মিত বর্ণনা করা হয়, আমাকে খাওয়া দাও, বিপদ দুর কর, অসুখ দুর কর, কত যে প্রার্থনা হিসাব নাই। কেবল আবেদন আর আবেদন। আল্লাহ আমাদের সকলের সমস্যা অবহিত আছেন। এর পরও একই প্রার্থনা। এসব প্রার্থনা করে মানুষ এখন ক্লান্ত। তবু ,আমরা সকলে মিলেই ডাকছি, ডেকেই যাচ্ছি।

প্রার্থনায় মানুষ একবারও বলে না, ‘হে আল্লাহ ! আমি সত্য-পবিত্র হতে চাই এবং আর কোন দিন মিথ্যা-অনাচার করবো না। আমি  নিজেকে জানার চেষ্টার  প্রক্রিয়াটি সারা জীবন অব্যাহত রাখবো’।

সওয়াব পাথরের একটি টুকরা নয়। বরং, মানুষই একটি মূল্যবান/পবিত্র সত্তা/ সিদ্ধ টুকরা। মানুষ-কে সত্য/পবিত্র সত্তায় রূপান্তর করার চলমান প্রচেষ্টার একনিষ্ঠ প্রক্রিয়াটি হলো হুর। মানুষ যখন সিদ্ধ হয় -তখন সে হয় হুর। হুর অর্থ সুন্দরী বউ/মহিলা নয়।

পবিত্র কোরআন-এ যে হুুরের কথা বলা হয়েছে, ইহা হলো একটি পবিত্র/সিদ্ধ আত্মা। একটি সিদ্ধ আত্মার জ্যোতিতে সুর্যের আলো মলিন হয়ে যায় এবং সূর্যের প্রয়োজন নাই। সিদ্ধ আত্মাটিই সূর্য। সিদ্ধ আত্মাাটি যেখানে যাবে- হাটবে চলবে ঐ স্থান আলোকিত হবে। সিদ্ধ আত্মা যেখানে অবস্থান করবে – ইহা বেহেশত বা স্বর্গ। অর্থাৎ আল্লাহর সত্ত্বাটিই বেহেশত। যখন একটি মানুষ সিদ্ধ হয়-তখন সে সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করে। সেঁ আল্লাহ থেকে পৃথক নয়। সেঁ এবং আল্লাহ একই সত্ত্বায় বা আত্মায় পরিণত হয়। বেহেশত এই পৃথিবীর বাহিরের কিছু নয়। গোটা পৃথিবীই আল্লাহর প্রকাশ। পবিত্র গ্রন্থ বলছে -আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নাই । তিঁনি সন্তান গ্রহন করেন নাই। যখন একটি মানুষ সিদ্ধ হয়ে আল্লাহতে রূপান্তরিত হয় এবং সৃষ্টির পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করে তখন তাঁর কিছুর অভাব থাকে না।

একটি সিদ্ধ মানুষ যখন আল্লাহ তে রূপান্তরিত হয় -তখন সেঁ সুন্দরী বউ/ সুন্দরী মহিলা দিয়ে কি করবে ? একজন মানুষ সিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত, সে আল্লাহর সাথে দেখা করতে পারবে না। মানুষের মধ্যে আল্লাহ/শয়তানের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। মানুষ যখন নিজ থেকে ইবলিশকে পরিত্যাগ করে, তখন সেঁ স্বয়ং ইশ্বর হয়। তুঁমি যদি আল্লাহ হয়ে যেতেই পারো, তবে তোমার কি সুন্দরী বউয়ের প্রয়োজন আছে ?

পবিত্র গ্রন্থের মাধ্যমে জানতে পারি, আল্লাহর সুন্দরী বউ নাই, সন্তান নাই, তবে সিদ্ধ একটি আত্বা যখন আল্লাহতে রুপান্তরিত হয়ে, সেঁ কি বউ চাইতে পারে ? তাঁর কি সুন্দরী বউ থাকবে ? এই বেকুবি চিন্তা কিভাবে করছো ? একটি সিদ্ধ আত্বা ইচ্ছা করলে, কোটি কোটি সুন্দরী বউ/সুন্দরী মহিলা এবং বহু কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করবে ।

সম্পর্ক যদি শরীরের আবরণের সাথে ঘর্ষণমূলক হয়, তবে সেই সম্পর্ক অস্থায়ী এবং ক্ষনিক। এই সম্পর্কে এক সময় মারামারির সৃষ্টি হয় -স্থায়ী হয় না। আমরা জাগতিক জীবনে ইহা দেখছি। প্রতিদিন কি পরিমাণ ডির্ভোস হচ্ছে – উকিল ব্যারিষ্টার-আইন আদালত-কে কি পরিমাণ সময়, এসব কাজে ব্যয় করতে হচ্ছে/ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে – ইহা আমার সংবাদ পত্রের মাধ্যমে কিছুটা জানতে পারী । এই সব কাজে দেশের অফিস আদালতের অযথা সময় নষ্ট এবং রাষ্ট্রের চলমান কাজের প্রবাহ দূর্বল করে দেয়। 

আত্বার সম্পর্ক চিরস্থায়ী এবং আল্লাহময়। এখানে সৃষ্টির আনন্দময় ক্ষমতা অর্জন করা যায়। ইহা পরাক্রম শক্তিশালী ক্ষমতা। মানুষকে এমন ক্ষমতা অর্জনের জন্য সুষ্টির উন্নত/উত্তম করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সারাক্ষণ আল্লাহ খাবার দাও, বিপদ দুর করো /অসুখ ভালো করো এই সব বলবো -এমন কথাগুলি ঠিক নয়। কারণ, প্রতিটি মানুষের সমস্যা  আল্লাহ অবহিত আছেন। তাঁকে বার বার বলার প্রয়োজন নাই । বরং, সৃষ্টির ক্ষমতা অর্জনের দিকে নজর দেয়া আবশ্যক। 

হুজুরেরা, সুন্দরী মহিলাকে হুরের নামে আমাদের-কে লোভ দেখায় এবং বেহেশতে ঐ মহিলা হুরের সাথে  আমাদের থাকার  ও আনন্দের কথা বলে, ইহা ১০০% ভুল।

সওয়াব বলতে নিজেকে সিদ্ধ করার জন্য, আল্লাহর আদর্শ বা শিষ্টাচার (আল্লাহর আদেশ- উপদেশ এবং নিষেধ) অনুযায়ী জীবনকে যাপন করা – যা একটি কাজ বা নিরবিচ্ছিন্ন কর্ম প্রক্রিয়া। ৭০/১০০/৫০০/৭০০/১০০০ টি সওয়াব -এই গুলি ভুল এবং মিথ্যা । জীবনকে আল্লাহময় -এ পরণিত করে নিজেকে সিদ্ধ বা সত্যে রুপান্তরিত করার  কর্ম প্রক্রিয়াই হলো জীবনের মূল কাজ। আল্লাহর সাথে সার্বক্ষনিক যুক্ত থাকার নাম জান্নাত। আল্লাহ্ও নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবন-যাপন করার নাম জাহান্নাম। জান্নাত এবং জাহান্নাম কোন স্থান নয়। হুজুরেরা যে, বলে “যে ছোট বেহেশত পাবে, সেই বেহেশতটি এই দুনিয়ার ৫/১০ দুনিয়ার সমান ইহা সম্পূর্ণ ভুল এবং মিথ্যা।

যারা আল্লাহ্র গুণ অর্জন ব্যতীত জীবনকে পরিচালন করে-অর্থাৎ সওয়াব/সুন্দরী হুর /সুন্দরী বউয়ের/জান্নাতের আশায় এবং দোজখের ভয়ে ইবাদত করে – তারা মূর্খের উচ্চ শিখরে বাস করে। এদের উপরে আর মূর্খ নাই। এসব ধর্মীয় দূর্নীতিবাজ/ধর্মীয় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে একদিন দূর্বার আন্দেলন গড়ে তোলা হবে। কারণ, সাধকদের পরিশ্রম বৃথা যেতে পারে না। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আল্লাহ, স্বয়ং প্রতিশ্রতি দিয়েছেন, ”আল্লাহ্, ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। আল্লাহ্ , দূর্নীতিবাজ নামাজী/ দূর্নীতিবাজ হাজী/দূর্নীতিবাজ হুজুর/খাবারে ভেজাল মিশ্রণবারীদের সাথে নাই।

সময়ের সাফ কথা….জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ এর প্রত্যাশায়

সংলাপ ॥ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করে বাঙালি জাতি আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রার্ষ্ট্রের। ১৯৭২ সালে সদ্য ভূমিষ্ট রাষ্ট্রটির সংবিধান প্রণয়ণ কমিটি এর নামকরণ করেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। ইংরেজী ভাষায় এর নামকরণ করা হয় The People’s Republic of Bangladesh’. দেশের সকলেই জানেন সংবিধান প্রণয়ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা ড. কামাল হোসেন। বরাবরই তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা বলে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন এবং বর্তমানে তিনি বিএনপি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী মানবতাবিরোধী অপরাধী রাজাকারদের সাথে রাজনৈতিক স্বার্থিক আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলা ঐক্যফ্রন্ট নেতা। ঐক্যফ্রন্ট নেতা হিসেবে তিনি বারবার জনগণের কাছে দেশের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চান। অথচ তার রচিত সংবিধানেই তিনি এদেশের নামকরণ করেছেন ‘প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে। তিনি খুব ভাল করেই জানেন বাংলাদেশে কোন প্রজা নেই। জনগণকে সাংবিধানিকভাবে প্রজা সাজিয়ে সংবিধান রচনা করে জনগণের তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা এক ধরণের প্রতারণা। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে তিনি বুঝতে পারছেন জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে! অবশ্য তিনিই সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন ‘প্রজাতন্ত্র’।

আমরা জানি ‘রাজার নীতিকে বলে রাজনীতি। যারা রাজা হতে চায়, কিংবা রাজা হিসেবে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকতে চায় তারা যেসব নীতি, ছলা-কলা-কৌশল অবলম্বন করে জনসমর্থন আদায় করে, তা রাজনীতি হিসেবে পরিচিত। কে কিভাবে রাজা হবে বা রাজা হিসেবে টিকে থাকবে এ নিয়েই ব্যস্ততা রাজনীতিকদের। রাজনীতিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে একই ব্যাপারে ব্যস্ত আছে মিডিয়া ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। সারা দেশের শক্তি ও মেধা ব্যয় হচ্ছে কে কিভাবে রাজা হবে এ নিয়ে। আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচন দেশের নতুন রাজা নির্বাচন করবে এদেশের প্রজাগণ (জনগণ)। চলছে চুড়ান্ত প্রচার-প্রচারণা। বিতর্ক ও বাক-বিতন্ডা ছড়িয়ে পড়ছে টিভি, পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শহর-গ্রামের চায়ের স্টলে। যদিও জনগণের সাথে বর্তমান রাজনীতির (!) কোনো সম্পর্কই নেই তবু কে রাজা হবে এ নিয়ে জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। মানুষ ভুলে যাচ্ছে তাদের নিজেদের প্রকৃত সমস্যা। রাজনীতিক ও তাদের পোষা বুদ্ধিজীবীরা ঘুরিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনা। এদেশের সাধারণ মানুষ আর নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবে না, ভাবে রাজাদের সমস্যা নিয়ে। রাজনীতিকদের ষড়যন্ত্রে দেশে এখন আর রাজা-প্রজার দ্বন্দ্ব নেই, শাসক ও শাসিত শ্রেণীর মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এখন চলছে  ‘আওয়ামী লীগ Ñ বিএনপির (রাজাকার শক্তির ব্যাকআপে) দ্বন্দ্ব’। এই ক্ষমতার লড়াই আর দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট যারা আগামী একাদশ নির্বাচনে মহাজোটের বিপক্ষ শক্তি হয়ে মাঠে নামছে।

অন্যদিকে রাজনীতি হয়েছে দুষ্টলোকদের আশ্রয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু অসৎ লোক আবৃত হয়েছে দেশপ্রেমের পোশাকে। এখন বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসায়ী ও টাকাওয়ালারা। সারা জীবন যিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেন, জীবন-যৌবন উৎসর্গ করলেন, তার কোন দাম নেই। এখন দাম আছে টাকার, টাকা দিয়ে কেনা-বেচা হয় মনোনয়ন। শোনা যাচ্ছে, ১৫০০ কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে এবারের নির্বাচনে। দেশের ত্যাগী রাজনীতিবিদরা আজ করুণা ও পরিহাসের পাত্র। অন্যদিকে মূর্খ, বর্বর ও মতলববাজ কিছু লোক আজ রাজনীতিতে সমাদৃত। তাই হাজার কোটি, লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেও সাধারণ মানুষের কোন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না! মানুষের সামনে তৈরি হচ্ছে সমস্যার নতুন পাহাড়! কারণ যেসব মতলববাজরা রাজনীতিতে টাকা বিনিয়োগ করেন, তারা তো ব্যবসার উদ্দেশ্য নিয়েই তা করেন; জনসেবা তাদের উদ্দেশ্য নয়। রাজনীতিকরা এখন আর জনগণের নেতা নন, জনগণের কাছে তাদের কোন দায়বদ্ধতাও নেই। কেবল ভোটের মৌসুমে জনগণ এদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ভোট শেষ হলে এরা জনগণের কথা ভুলে যান, জনগণকে প্রজা ভাবতে শুরু করেন, মিশে যান রাজধানীর হাওয়ার সাথে। জনগণের ভাত-কাপড়ের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাববার সময় তাদের কখনো হয় না। এসব মতলববাজ রাজনীতিকরা আজ দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবন। একদিকে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার অভাব অন্যদিকে অপহরণ, গুম-খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি, জমিজমা থেকে উচ্ছেদ, কাজের অভাব, ছাঁটাই, মূল্যবৃদ্ধি, ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এসব নিয়ে দেশে কোন আন্দোলন নেই। জনগণের কণ্ঠ আজ আবদ্ধ রাজার নীতিতে যেহেতু তারা সাংবিধানিকভাবে প্রজা। সময় এসেছে। ভেবে দেখা দরকার সাংবিধানিক নামকরণে কোথায় আছি আমরা? কোথায় যাচ্ছি? কি করছি? কার স্বার্থে মিছিল, হরতাল করছি? রাজপথে জীবন দিচ্ছি? কে রাজা হলো বা না হলো, তার সাথে আমাদের অর্থাৎ জনগণের সংশ্লিষ্টতা কতখানি? কে কিভাবে রাজা হবে, কিভাবে নির্বাচন হবে তা জনগণের সমস্যা নয়। এটা রাজনীতিকদের সমস্যা। রাজাদের সমস্যা রাজারাই সমাধান করুক এ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাববার কোন দরকার নেই। সচেতন হওয়া দরকার।

যে রাজনীতি মানুষের কোন কল্যাণে আসে না, যে রাজনীতি জনগণের কথা বলে না, সে রাজনীতি আমরা আর চাই না। বন্ধ হোক রাজাদের নীতি ও রাজনীতির খেলা এবার থেকে শুরু হোক জননীতি। প্রজাতন্ত্র নয় জনতন্ত্র-গণতন্ত্র হোক। এদেশ জনগণের। কোন রাজা এদেশের স্বাধীনতা আনেনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার আপামর জনগণ এদেশের স্বাধীনতা এনেছে মরণপণ লড়াই করে। যারা সেই যুদ্ধের সময় লুকয়ে ছিল, পালিয়ে ছিল ব্যক্তিস্বার্থকে সুরক্ষা দিতে; যারা দেশের ক্রান্তিকালে সবসময়ই নিজেকে নিরাপদ রেখে জনগণের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোন প্রত্যাশা এদেশের জনগণ করে না। সময় এসেছে দেশের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের। প্রজা হয়ে জনগণ আর থাকতে চায় না। সব নেতারাই আজকাল জনগণ-জনগণ বলে মুখে ফেনা তোলেন।    এতই যদি জনগণের কথা ভাবেন তাহলে জনগণকে ‘প্রজা’ থেকে মুক্তি দিয়ে ‘জন’ নামে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার করুন। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নয় ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে আগামীর বাংলাদেশ হোক এটাই সময়ের দাবী।

বর্তমান সংলাপ-প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর আমরা নিরপেক্ষ নই-সত্যের পক্ষে

সাইমা (মাস্কাট) ॥ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আর্শীবাদপুষ্ট এবং সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সংলাপ পত্রিকা দীর্ঘ ২৮ বছর যাবৎ দেশের গণ-মানুষকে সত্যের একমাত্র দিকপাল হিসাবে মানুষকে সত্যের দিকে আহ্বান করে চলেছে। বাংলাদেশে সত্য প্রচারে অসামান্য অবদান এ পত্রিকার। একটি জাতিকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করতে হলে, নিশ্চিত সত্য পথ ধরে চলতে হবে- ইহাই প্রচলিত নিয়ম।  কিন্তু দেশের গণ-মানুষ জানে না-সত্য কি ? মুখে শুধু সত্য সত্য বললেই কেহ সত্য হয় না। জানা আবশ্যক, সত্য কি? এবং ইহা কোথায় থাকে। কিছু জানতে হলে, যিঁনি জানেন, তাঁর নিকট  থেকে শিখতে হয়।

সাভারে ট্যানারী শিল্পের বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। ফলে ধলেশ্বরী নদীর পানি বিষাক্ত তথা বিষে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি ধলেশ্বরী নদী থেকে ২ বা ৫ মিলিগ্রাম পানি পান করেন, তবে তাঁর জীবন রক্ষা করতে হলে, একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ট্যানারী বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্যে যদি ধলেশ্বরী নদীর পানি বিষাক্ত হয়, তবে প্রচলিত জীবন ব্যবস্থায় দেশের মানুষ যেভাবে দিন রাত্রি মিথ্যা কথা বলছে, তাতে কি  মানুষের মুখ বিষাক্ত বা দুষিত হয়নি? মানুষের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ মুখ। এই মুখ দেখে/মুখের কথা শুনে একে অপরকে ভালোবাসে। মুখটি যদি বিষাক্ত হয় তবে মুখের কথাগুলি অবশ্যই দুষিত। এই অবস্থায় সৃষ্টিকৃত সম্পর্ক বিষাক্ত বা দুষিত। মানুষের এই বিষাক্ত মুখ এবং দুষিত কথা গোটা দেশকে একটি অনাচারের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। দেশের মধ্যে অনাচার,খুন-খারাবি,মারামারি সহ বিভিন্ন অপরাধ বিষাক্ত মুখ এবং দুষিত কথার জলন্ত প্রমাণ। দেশের গণমানুষকে অনাচার থেকে রক্ষা করার জন্য সাধকগণ দেশের মানুষের প্রতি সদয় হয়ে আজ থেতে ২৮ বছর পূর্বে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বর্তমান সংলাপ পত্রিকার মাধ্যমে মানুষকে সতের পথে ডাকছেন।

সত্য কি? প্রথমে সত্য সর্ম্পকে সাধারণ ধারণা থাকা আবশ্যক। সত্য ইট- পাথরের টুকরা নয়। সত্যকে সূর্যের সাথে তুলনা করা যায়। সূর্য পৃথিবীকে আলো দেয় এবং পৃথিবী আলেকিত হয়।  আমরা পথ চলি। আলোকে হাতে ধরে কোন জায়গায় সংরক্ষণ করা যায় না। আমরা আলোর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি উপলদ্ধি করতে পারি। সূর্যের আলোতে পৃথিবীতে আমি পথ চলি। সৃর্যের আলো আমার শরীরে আসছে। আমার শরীর সূর্যের আলোতে উজ্জীবিত হচ্ছে। কিন্তু আমার শরীর থেকে আলো বাহিরে বিচ্ছরিত হচ্ছে না। আমার শরীরের এই শক্তি নাই কেন? এই শক্তি সর্ম্পকে অন্য একদিন বৈজ্ঞানিক ব্যাখা প্রদান করবো।

বর্তমান সংলাপ পত্রিকা নিরলস পরিশ্রম করে মানুষকে এই সত্যের দিকে ডাকছে। বর্তমান সংলাপ পত্রিকার পাঠক সংখ্যা কম। কিন্তু এতে হতাশ হওয়ার কিছু নাই। আমরা অবহিত, যীশু সত্য প্রচারে এতো খাটা-খাটনি করলেন/ক্রুশে বিদ্ধ হলেন, কিন্তু তাঁর শীষ্য ছিলো মাত্র ১২ জন। সত্যের পাল্লা দেখতে আপাত ওজনে কমই হয়। কথিত আছে হাশরের মাঠে মানুষের ৭২ টি লাইন হবে। একটি লাইন সত্য/সিদ্ধ লাইন। আজকের সমাজে দূর্নীতিবাজ নামাজী/দূর্নীতিবাজ হাজী/দূর্নীতিবাজ হুজুরদের কবল থেকে যারা রক্ষা পেতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য বর্তমান সংলাপ পত্রিকা। সাধকদের পরিশ্রমে এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা সাধকদের পরিশ্রম বৃথা যেতে দেবো না। জয়তু বর্তমান সংলাপ। সর্বকালে তোঁমারই জয় হে মহাসত্য।

আত্মপরিচয়ের সন্ধানে আপ্রাণ প্রয়াস!

সংলাপ ॥ ভাষার কারুকার্যে, কথার  বুননে, শব্দের গাঁথুনি দিয়ে হয়তো দেশ-স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচনা করা যাবে চটকদার কোন প্রবন্ধ বা হৃদয়াবেগ। কিন্তু যথার্থ বাক্যে যথার্থ মর্যাদায় সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরা কি কখনো যাবে? না যাচ্ছে? ইতিহাসের সত্যতা অটুট রেখে ইতিহাসের প্রকৃত আদলটা তুলে ধরা বিরল কাজ। কেননা, যা কিছু অতীত এবং সময়ের সাথে সংগ্রাম করে স্থান দখল করে থাকে বর্তমানের, তা কালের বিবর্তনে, কলমের পক্ষপাতিত্বে, স্বার্থের সংঘাতে, নীতির বেসাতিতে কখনো পাল্টে ফেলে রং, কখনো সাজে ঢং। এই বাস্তব সত্যের বিকল্প এখনো দেখা যায়নি। কিন্তু তাই বলে কি কালের জটাজালে নিবন্ধ হয়ে একটি ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্তরে ভুল আদলে, ভুল দর্শনে, ভুল উপাত্ত নিয়ে প্রচারিত হতে থাকবে? আর এই ভুলের বিপাকে বিভ্রান্ত হতে থাকবে নতুন প্রজন্ম? ধ্বংস হবে চৈতনিক উত্থান? কিন্তু – কেন?

সঠিক ইতিহাস জানা একটি জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার অতীত ইতিহাস থেকেই সে নিজেকে চেনে, নিজেকে জানে। ইতিহাস থেকেই সে অবগত হয় তার অতীত ভুল। ইতিহাস থেকেই সে খুঁজে নেয় বর্তমানের এবং ভবিষ্যতের যাত্রাপথ। নির্মাণ করে কালের চাকায় নতুন চেতনার  নতুন আদর্শ। সেক্ষেত্রে বাঙালি জাতি একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করে চললেও, কোন চৈতনিক বিনির্মাণে কি একটি আদর্শিক অবস্থানে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছে? জাতি হিসেবে নিজেদের মৌলিকত্ব না খুঁজেই আমাদের গবেষকগণ অকপটে জানিয়ে দেন আমরা বাঙালি ‘শংকর জাতি’। নির্যাতন, নিপীড়নের সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারায় দেহে, মনে, ভাষায়, আশায়, চলনে, বলনে, পোশাকে, খাদ্যে, বিনোদনে, আচরণে, শিল্পে, সাহিত্যে লেনদেনের যেকারবার চলেছে সে সত্য অস্বীকার করবার নয়। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, নিজের শেকড়ের খোঁজ না রেখেই আমরা ডালপালায় ঝুলে থাকবো? জাতিগত বোধ তখনই সুদৃঢ় ভিত্তি পায় যখন কোন জাতি জানতে পারে তার আদি ইতিহাস, তখন সে বিশ্বাস স্থাপন করে তার মৌলিকত্বের ওপর। জাতি হিসেবে আমাদের প্রধান হাতিয়ার নিঃসন্দেহে আমাদের ভাষা অর্থাৎ ‘বাংলা’। ভাষা থেকে উদ্ভূত যে জাতীয়তাবোধ আমাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছিল, সেই জাতীয়তাবোধই যে আমাদের বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসেছে, তা স্বীকার করতে হবে প্রত্যেককেই। আমাদের সামান্য যা কিছু অগ্রগতি বা উন্নয়ন তাও ওই জাতীয়তাবোধেরই ফসল। অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের ভান্ডারে প্রকৃতির দুলাল হয়ে নির্বিঘ, জীবনযাপন করা বাঙালির সম্ভব হয়নি কখনো। দস্যু, লুটেরা, ভ-, প্রতারক, ব্যবসায়ী, শাসক তিন হাজার বছর ধরে একের পর এক বাঙালি জাতিকে করেছে নির্যাতন, শোষণ ও শাসন। ধারাক্রমে ধরা যায় পাক শাসন-শোষণই ছিল বাঙালি জাতির জন্য সর্বশেষ। তাই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর ইতিহাস বাঙালি জাতির জন্য অন্যরকম গুরুত্ব বহন করেছে। কিন্তু এই গুরুত্ববহ ২৪ বছরের ইতিহাস কি সঠিক ও নিরপেক্ষভাবে আজো রচনা করা সম্ভব হয়েছে? কেনই বা হয়নি? নয় মাসের (?) ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ’৭১ -এ অর্জিত ‘স্বাধীনতা’য় যে ছোট্ট ভূখন্ড বাঙালি জাতি অর্জন করেছে, তা অবশ্যই বাঙালি জাতির জন্য একটি সর্বোচ্চ বড় অর্জন। কিন্তু এই ‘বড় অর্জনটি পরবর্তী এই ৪৭ বছরের বহমান ধারায় এতো ‘বিতর্কিত’ এবং ‘বিভ্রান্তমূলক’ হয়ে উঠলো কিভাবে? কপটতা এবং অনাদর্শিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আজ আমরা দ্বিধাবিভক্ত। তাই জাতীয়তাবাদের স্বার্থে যে অনিবার্য ইতিহাসকে সাত্তিক বোধে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ছিল, তা আজ খন্ডিত ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। ‘শাসিত’ থেকে ‘শাসক’-এ উন্নীত হয়ে আমরা সরে গিয়েছি সংগ্রামী চেতনা থেকে, সমৃদ্ধ একটি একক অবস্থানে থেকে। লোভ, লালসা আর ধর্মের নামে জিঘাংসায় বলে খাচ্ছি নিজেদেরই। নিজেরাই হয়ে গেছি নিজেদের শত্রু।  ক্ষমতার নির্লজ্জ লোলুপতায় বহুমাত্রিক স্বার্থের ভূখ- খোর অবস্থান নিয়েছি আমরা। তাই পায়ের নিচের মাটি এবং ঘাস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে ক্ষেপণ করেছি ধর্মের আনুষ্ঠানিকতায়, গদি আঁটা চেয়ারে এবং চেক বইয়ের পাতায়। স্বাধীনতার পরবর্তী আমাদের গতিবিধি সেই সত্যকেই তুলে ধরে। এই সত্যের রাতে ভাসমান বাঙালি জাতির কাছে এ কারণেই উপস্থাপিত হচ্ছে না প্রকৃত ইতিহাস স্বাধীনতার, মুক্তিযুদ্ধের, এমনকি জাতিসত্তার। অনাদর্শিক রাজনীতির রাতে গত ৪৮ বছরে যে ইতিহাস আমরা বহন করে চলেছি, তা সকলেরই জানা। ভ্রান্ত ইতিহাসের কবলে আজ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে প্রজন্ম। দিকভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে স্বদেশ। নিশ্চিত গন্তব্যে ধাবমান হচ্ছে না জাতি। বাঙালির এই আত্মবিনাশী যাত্রা ঠেকাতে চাই প্রতিটি অঙ্গনে বিশেষ করে ধর্মীয় জগতে সত্যের উন্মোচন। চাই আত্মপরিচয় সন্ধানের আপ্রাণ প্রয়াস, নিরন্তর সাধনা।