প্রথম পাতা

আলজাজিরায় প্রচারিত ডকুড্রামার বিশ্লেষণ এবার কাটুক অন্ধকার….

সত্যদর্শী ॥ কোন কিছুর সত্য জানতে হলে পুরো প্রেক্ষাপটকে ধরেই এগুতে হয়। মহান সাধক আনোয়ারুল হক এঁর অমৃত কথা ‘দর্শন- উপলব্ধিতে হয় সত্য, অন্যের কথায় নয়’ ।

জগৎ-সংসারে কোন কিছুই অযাচিত নয়, হঠাৎ ঘটে না। কারণের কারণ থাকে। ঘটনার নেপথ্যে থাকে ঘটনার উপযোগিতা। একটি বোমা বিস্ফোরিত হলে আমরা শব্দ শুনতে পাই, বোমাটির শক্তি, ক্ষয়-ক্ষতি, বিস্ফোরণের কারণ জানতে পারি। কিন্তু অনুসন্ধানে ধরা পরে পুরো বিষয়টির সত্য। যা আমাদেরকে নিয়ে যায় সেই সত্যের কাছে, যে সত্যের নেপথ্যে একটি গোষ্ঠীগত স্বার্থ, সক্ষমতা, চরিত্র লাভ কিংবা সুদূরপ্রসারী কোন প্রাপ্তি যোগ রয়েছে। আমরা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে, অশান্ত অস্থির মনোভাবের কারণে কোন কিছুর গভীরে প্রবেশ করতে পারি না বলে হুজুগ, গুজব, বিভ্রান্তি, অতি কাল্পনিক, গাল গল্পে মশগুল হয়ে পড়ি।

সত্য চোখের সামনে এসে আবার মিলিয়ে যায়। লালন ফকির ভণিতায় এসে বারবার নিজেকে ভেড়ো স্বভাবের সাথে তুলনা করে প্রকারান্তরে বাঙালি চরিত্রের গভীর ক্ষত দিকটিই তুলে ধরেছেন।

সম্প্রতি আলজাজিরা টেলিভিশনে প্রচারিত কারিগরি জারিজুরিটি নিয়েও সেই প্রবণতা দেখা গেল। একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক ভাবে বলা যেতে পারে। ভারতবর্ষে স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর কত মার্কে পাশ নির্ধারিত হবে সেটি নির্ধারণ করার জন্য ব্রিটিশরা দুঃখজনক একটি ব্যরোমিটারের সাহায্য নিয়েছিলেন। সেটা হলো ব্রিটিশদের পাশ ছিল ৬৫ মার্কে। বাঙালির মেধা অর্ধেক। ফলে তার অর্ধেক ৩২.৫০ পাশ মার্ক!!! বাংলাদেশ বহু পথ এগিয়ে গেলেও এখনো বিশ্বের বহু দেশ হেয়ালীর চোখে দেখতে চায়। আর ইসলামের ধব্জাধারী আরবদের কোন কোন দেশের শাসকরা আমাদেরকে তো মুসলিম হিসেবেই গণ্য করে না। 

সত্য ভাসমান পানা নয়। সত্য  কোন চমক নয়। সত্য সাইন্স ফিকশন কিংবা কতিপয় লোকের দক্ষ কারিগরি নয়। কারো মুখের কথায়, জোড়াতালি দিয়ে সত্যের নামে নাটক মুভি বানানো যায় তাতে সত্য হয়ে যায় না।

এ জন্য ভেড়ো স্বভাবের লোকজন কান নিয়েছে চিলে শুনেই ছুটতে থাকে। কোনদিন সত্য জানতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরায় প্রচারিত ডকু ড্রামার ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর স্বভাব হারানো গুজবধারী লোকের দৌঁড়ঝাপ নতুন করে সেই পুরোনো কথাটিই মনে করিয়ে দিল। এক শ্রেণীর বাঙালি এখনো কল্পনা প্রবন, কখনো কখনো আত্মবিস্মৃত। এই সত্য আমাদেরকে মনে রাখতে হবে দেশ জাতির বৃহত্তর স্বার্থে। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের দেশের স্বাধীনতা কারো দানে পাওয়া নয়। আধিপত্যবাদীদের মুখে ছাই কালি মেরেই চরম ত্যাগের মহিমামন্ডিত এ দেশের স্বাধীনতা। 

পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বরতম এই যুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষকে আত্মহুতি দিতে হয়েছে। ২ লক্ষ নারী মুক্তি যোদ্ধা এবং ভারতের বিভিন্ন শরনার্থী ক্যাম্পে অকাল মৃত্যুর স্বীকার ৭/৮ লক্ষ নব জাতকের মৃত্যুকেও যুক্ত করতে হবে স্বাধীনতার ইতিহাসে। 

৭০ এর নির্বাচন যখন স্পষ্টতই স্বাধিকার স্বাধীনতার বীজমন্ত্র ছিল, তখন ২৮% দেশ বিরোধী লোক স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। এরাই আবার ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ী চিনিয়ে দিয়েছে, লুটপাট করেছে, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ করেছে, পাকিস্তানি সেনাদের রাস্তা ঘাট চিনিয়ে দিয়েছে।

স্বাধীন দেশে আজও সেই কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেনি। বরং পদে পদে বাধা দিয়েছে। ৭১ সালের পরাজয়ের প্রথম প্রতিশোধ নিয়েছে ৭৫ এর ১৫ অগাষ্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করে। লক্ষণীয় বিষয় তথাকথিত আরব বিশ্ব দীর্ঘদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি। কারণ তারা এ দেশের কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মানুষকে মানুষ কিংবা মুসলিম বলেই মনে করেনি। ৭১ এর যুদ্ধ কেই বরং তারা ইসলাম ভার্সেস বাংলাদেশ হিসেবে দেখেছে। ধর্মযুদ্ধ হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করেছে ঈমানী আকীদা রক্ষা ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্য প্রশ্নে। ফলে সে সময় মুসলিম দেশগুলোর বহু সংবাদমাধ্যমগুলোও এটিকে পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ হিসেবে বর্ননা করেছে। বর্তমানের আলজাজিরা কিংবা খোদ দেশটির আমির ওমরাহরাও একই চরিত্র প্রদর্শন করেছে। সেই যে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয়েছে সেখান থেকে আজও বাংলাদেশ বের হতে পারেনি। ফলে আবারো সেই পুরোনো শকুন খামচে ধরেছে জাতির পতাকা। বিদেশী একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে ব্যবহার করে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের জানান দিলো ঘাতকরা। আপাত দৃষ্টিতে বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করা হলেও কোনভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। একটু অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিবন্ধ করলে প্রচারিত ডকু মুভিটি নির্মানের উদ্দেশ্য ধরা পড়বে।

সম্পুর্ন ডকুফিকশনটিতে নজর দিলে ঘাতকচক্র ও এদের লক্ষ্য অনুমান করা কঠিন নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুনাম ধ্বংসের পরিস্কার চিত্রটি যেমন ফুটে উঠে। যাতে করে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হেয় প্রতিপন্ন হয়, সেনা অভ্যন্তরে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরী হয় এবং শান্তি মিশনে না নেয়া হয় বাংলাদেশ থেকে। তেমনি এক ঢিলে সরকার প্রধান, রাষ্ট্রপতি, পুলিশ বিভাগকেও জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ডকুড্রামাটির এমন একটি বাজে নাম দেয়া হয়েছে, যা বিরাট আঘাত। ইসরায়েল প্রসঙ্গ টেনে এনে মুসলিম বিশ্বে দেশের ইমেজ নষ্ট করার একটা তৎপরতা,  দেশের অভ্যন্তরে ধর্মীয় উগ্রতাকেও উসকে দেয়ার হীন উদ্দেশ্য ধরা পড়ে।

প্রথমত সেনা প্রধানের নৈতিক ভিত্তিকে যেমন নাড়াতে চেয়েছে। একই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে একটি দুষ্ট বলয়কে প্রমানের খোঁড়া সব অজুহাত দাঁড় করাতে চেয়েছে। বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে বাংলাদেশ একটি মাফিয়া এস্টেট এবং প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব তেমন একটি বলয় দেশে বিদেশে তৎপর। সরকার প্রধানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত। মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নির্বাচন নেই।

পুরো ডকু-ফিকশন কিংবা ফ্লিমটি পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় প্রথমত তারা সেনা প্রধানকে আঘাত করতে চেয়েছে। যেহেতু সেটি করতে হলে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী ব্যক্তিতে জড়াতে হয়। ফলে পুরোনো একটি গল্পের অবতারণা করা হয়েছে মোহাম্মদপুরের এক সময়ের একটি ঘটনাকে সামনে এনে। অথচ ৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে সন্ত্রাস অস্ত্র সবই আমদানী করেছে খোদ তৎকালীন শাসকরাই। রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করতে সবই করা হয়েছে। জিয়াউর রহমান নিজেই বলেছেন- ‘মানি ইজ নো প্রবলেম/ আমি রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে দেবো’। তখন তো বেঁচে থাকতেও আত্মগোপন করতে হয়েছে বহুজনকে। আর মহল্লায় টিকে থাকতে প্রতিরোধ করে জীবন হারাতে হয়েছে অনেককে।

পরিচালক ফিল্মী কায়দায় এনিমেশনের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে একটি ঘটনাকে। অথচ ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন ছিল, রাজনীতির নামে কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা সহ হাজার হাজার আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, সেসবের কোন তথ্য নেই এখানে। নেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ। মনে হচ্ছে উড়ে আসা জুড়ে বসেছে বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত কি কি করা হয়েছে, চলেছে তার কোন কথা এখানে নেই। ৯১ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ সংখ্যালঘু উচ্ছেদ নির্যাতনের কোন তথ্য নেই।

বরং আরো একটি গভীর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, সেটি হলো ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড যেহেতু কিছু সেনা সদস্য সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল, সেটির প্রতিশোধ নিতেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী সহ বিজিবিকে কৌশলে ধ্বংস করছেন!! ভয়াবহ একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি নিয়ে যাচ্ছেন। এমনটাই বলা হয়েছে আল জাজিরা প্রচারিত এই ডকুফিল্মে। ডকুফিকশনটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিকে আঘাত করা হয়েছে। রাষ্ট্রের এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে প্রশ্নবিদ্ধ করে নির্মিত এই  ডকুফিল্মটি রীতিমতো ভয়াবহ কাজ। দেশ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি। বিপুল ব্যায়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এটি নির্মান করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কোন শক্তিশালী মহলের অর্থায়ন ও নিবিড় তদারকিতেই কেবল এমনটি হতে পারে।

প্রচারিত প্রতিবেদনটিতে দেখানো বহু তথ্যই শেষ পর্যন্ত তেমন কোন কিছুই প্রমান করেনা। যেমন হোটেল কিনতে চাওয়া, ম্যালেয়েশিয়ায় নজরদারি, একজন মাতালের চাপাবাজি, ড্রোন ব্যবহার করে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ইসরাইলের সাথে চুক্তি কিংবা ডিএইচএলে ডকুমেন্টস পাঠানো। তবে এটি প্রমান করে কাজটি বড় পরিকল্পনার অংশ। সরকার ও দেশপ্রেমিক জনগণের জন্যে কিছু শিক্ষণীয়। আমাদের বুঝতে হবে ষড়যন্ত্রের শেকড় কতটা গভীরে, ডালপালা কতটা বিস্তৃত।

আমরা হয়তো সদ্য স্বাধীন দেশে রাজনীতির নামে লোভের আগুনে পোড়া তথাকথিত বিপ্লবী রাজনীতি,  ফ্রিডম পার্টির দৌরাত্ম্য, ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্টের ময়নাতদন্তই এখনো সম্পন্ন করতে পারিনি। ১০ ট্রাক অস্ত্র কারা এনেছিল আমরা কি তা জানি আজও ? এক সময় সীমান্তসহ খোদ রাজধানীতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আনাগোনার খবর ভুলে গেছি? শাপলা চত্বরে হেফাজতের তান্ডব, একজন যুদ্ধপরাধীকে  চাঁদে দেখার গুজবে পিটিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা। মানবতাবিরোধী দের বিচার বন্ধের নামে তান্ডব, রাজধানীর সড়কে সড়কে মানুষ পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা। এসবই কি একই সূত্রে গাঁথা?

কথায় আছে শকুন যতই উপরে উঠুক চোখ তার ভাগাড়ের দিকেই থাকে। আমরা হয়তো ভুলে গেছি ’৭১, ৫২’র চেতনা। চেতনা হয়তো কফিন বন্দি। আবার সক্রিয় সেই একই ঘাতকেরা। এখন ফুলে ফেঁপে বড় হয়েছে। যেহেতু এদের বিদেশী বন্ধু রয়েছে। দেশে আছে ইন্টারেস্ট গ্রুপ। এসব গ্রুপের রয়েছে পাহাড় সমান টাকা। সেসব টাকায় পোষা পাহারাদার। মুখোশ পরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ঘরে মহল্লায় অফিসপাড়ায়।

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো পথ হারিয়ে ফেলেছে। সীমাহীন ভ্রান্ত রাজনীতি সহজ করে তুলেছে ঘাতকদের কাজকে। তথাকথিত উন্নয়নের রাজনীতির চোরাবালিতে হাবুডুবু খাচ্ছে দেশ। গালগল্প তোষামোদের রাজনীতি। ফলে কর্ম ফল হয়ে দেখা দিচ্ছে। জিডিপির হিসাব আছে কালচারাল জিডিপির হিসাব কারো জানা নেই। বরং চরিত্রহীনদের মোকাবেলা করতে যেয়ে শাসকদলও সেই স্রোতে কম বেশি ভেসে চলেছে। পর্যবেক্ষণ বলছে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সরকারী দলের প্রায় সব পর্যায়ের নেতা কর্মী। কেবলই উদভ্রান্তের মতো দৌঁড়ঝাপ। স্বজন প্রীতি, পকেট নীতি, দালাল তৈরীই যেন রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে যেমন অরক্ষিত করে তুলেছিল নিজেরাই। তেমনি বর্তমান নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকেই বিপদাপন্ন করে তুলছেন। মুজিব বর্ষ উদযাপনের নামেও অপ্রয়োজনীয় অদরকারী লোকদেখানো কর্মকান্ডের মহড়া চলছে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে। পদে পদে বর্নচোরা মুনাফেকরা ফাঁদ পেতেছে।

প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজজামান বলেছিলেন – ‘আওয়ামীলীগ আমাদের সমর্থন চায়, পরামর্শ চায় না’। তবু বলবো উন্নয়নের রাজনীতি নয়, দরকার রাজনীতির উন্নয়ন। একটা সামাজিক সাংস্কৃতিক জাগরণ। যা উপেক্ষা করা হয়েছে। নতুন ভাবনার রাজনীতি নেই। রাজনীতিতে সৃষ্টিশীল ভাবনা অনুপস্থিত। জাতি চেতনার শক্তির উপর দাঁড়িয়েই হাসতে হয় বিজয়ের হাসি। যা বেমালুম ভুলে বসে আছে রাজনীতিকরা।

বাংলা আমার অহংকার, বাংলা আমার পরিচয়

ড. খাঁন সরফরাজ আলী ॥ বাঙালি জাতির আত্ম-পরিচয়, স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের মূলে যে মহান দিনটির অবদান রয়েছে তা নিঃসন্দেহে আমাদের মহান শহীদ দিবস ও ভাষা দিবস। নিজস্ব ভাষার অধিকার আদায়ে পৃথিবীর অন্যতম দেশ বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমরা ভাগ্যবান। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের ভাষার অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াসে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান প্রকারান্তরে বাংলা ভাষাভাষী এদেশের জনসাধারণের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শামিল।

একজন পেশাজীবি হিসেবে পরিচয় যাই হোক না কেন সর্বপ্রথম আমি বাঙালি। বাংলা মায়ের সন্তান। বাংলা ভাষাভাষী ও একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি গর্বিত। ৫২’র ভাষা আন্দোলন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ না হলেও বাল্যকাল হতেই একুশের প্রথম প্রহরে প্রভাত ফেরীতে অংশ নেয়া ও শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেশপ্রেম ও ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পনের বোধ আসে মূলতঃ স্কুল জীবনে।

আশির দশকের শেষে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মহান শহীদ দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে কতিপয় স্কুল পড়–য়া কিশোর একতাবদ্ধ হয়ে সরকারি বাসভবনের নিজস্ব খেলার মাঠে ইট, বালু ও চুনের গুড়া দিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যা রাত হতে শহীদ মিনারের আদলে বেদী বানানোর আনন্দে মেতে উঠতাম। একইসঙ্গে, পার্শবর্তী বিভিন্ন বাগান হতে ফুল সংগ্রহ করে নিজেরাই শ্রদ্ধার্ঘ্য বানিয়ে নিতাম। পাশাপাশি, টিফিনের খরচ হতে বাঁচানো টাকা-পয়সা জড় করে মাইক ভাড়া করে।

সন্ধ্যা রাত হতেই বাজানো শুরু করতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। সমবয়সী কিশোর-তরুণ ছাড়াও এলাকার সব শ্রেণী-পেশার লোকজন ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ ভুলে আমাদের এ আয়োজনে সক্রিয় অংশ নিতেন। কালো রংয়ের কাপড় কেটে নিজেরাই ছোট ছোট ব্যাজ বানিয়ে পরিধেয় পোষাকের সঙ্গে লাগিয়ে শোক প্রকাশ করতাম। এ আয়োজন চলতো ২১’এর দুপুর পর্যন্ত। অনেকটা একই ধাঁচের আয়োজন করা হতো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। যেখানে ছাত্র-শিক্ষক সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছি। নতুন প্রজন্ম এ অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবে কিনা জানিনা তবে আমরা যারা প্রত্যক্ষ করেছি তারা তা ভুলতে পারবো না।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরীসহ যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয় মূলতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায়। সম্মান প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থাতেই স্বীয় বিভাগ ও হলের সিনিয়র ও সহপাঠীদের সঙ্গে খালি পায়ে একযোগে কালো ব্যানার হাতে ছোট ছোট ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি আর সেখান থেকে সোজা ছুটে গিয়েছি একুশের বই মেলায়। সাদা পাঞ্জাবি আর কালো প্যান্ট ছিল আমাদের সে সময়ের পোষাকী ঢং। পরের বছরগুলোতেও এ ধারাবাহিকতার কোন ব্যত্যয় হয়নি। বরং সম্মান শেষ বর্ষে ও মাস্টার্স-এ অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রথম সারিতে থেকে এ ধরনের আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছি। ফলশ্রুতিতে, দেশপ্রেম ও ভাষা শহীদদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার অংশ হিসেবে যে কোন অবস্থাতে শহীদ মিনারে গিয়ে একুশের আয়োজনে অংশ নেয়া একটি রীতি হয়ে গিয়েছিল।

ছাত্র জীবন শেষ করে চাকুরির শুরুতে রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠিত মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে ২০০১ সালে প্রথম বারের মত ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যানার হাতে প্রভাত ফেরী নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো শিহরণ জাগায়। পরবর্র্তীতে যখন জানতে পারলাম আমাদের বেদীতে ফুল নিবেদনের পর্বটি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছে তাতে ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে নিজেই বেশী পুলক অনুভব করেছি। অন্ততঃ এই ভেবে যে, পরবর্তী প্রজন্ম একুশ ও ভাষা শহীদদের সম্বন্ধে জানতে পারছে আর তাতে অংশ নিচ্ছে।  এখন ভাবতেই অবাক হই যে, সেদিন রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত শহরে যানবাহন ও গণমানুষের ভীড় ঠেলে সাইন্স ল্যাবরেটরির মোড় হতে নীলক্ষেত পার হয়ে বুয়েটের ভিতর দিয়ে ক্লান্তিহীন পায়ে ছাত্র-শিক্ষক সবাই একযোগে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। একমুখী পথ চলাচলের কারণে শহীদ মিনার হতে বেরিয়ে বাংলা একাডেমীর বইমেলা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে শাহবাগ মোড় হয়ে বেরিয়ে এসেছি।

সময়ের পরিসরে ও বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রভাত ফেরী ও একুশের প্রহরে শহীদ মিনারে যাওয়ার রীতি ধীরেধীরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হলেও প্রকৃত বাঙালি মনে একুশ মানে বাংলাকে চেনা, বাংলাকে জানা আর বারবার বাংলাকে ফিরে পাওয়া। আর তাই একজন গর্বিত বাঙালি হিসেবে সর্বস্তরে বাংলার চর্চা ও শুদ্ধ বাংলার অনুশীলন আন্দোলনে সোচ্চার হওয়া এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এ প্রেক্ষিতে যার যার অবস্থান থেকে সকল স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সত্যিকারের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের প্রতি আন্তরিক হয়ে দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারলে তবেই দেশ এগিয়ে যাবে এবং জাতি হিসেবে আমরা পৃথিবীর বুকে সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হবো। 

আল-জাজিরার প্রতিবেদন – চটকদার অন্তঃসার শূন্যতা

হাসান জামান টিপু ॥ ফেব্রুয়ারির প্রথমদিন কাতারভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনে All the prime minister’s সবহ নামে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথমপর্ব প্রচারিত হলো তাতে বাংলাদেশের জনমত দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। সরকার কিছুটা বেকায়দায় পড়েছে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবনে ও প্রতিক্রিয়া দেখাতে। জনগণের যে অংশটি সরকারবিরোধী তারা উল্লাসিত এই জন্য যে প্রতিবেদনটিতে সরকারের মধ্যে যে মাফিয়া তন্ত্রের প্রভাব এতো গভীর তাতে তারা জনসম্মুখে প্রকাশিত হওয়ার উল্লাসিত এবং ভবিষ্যতে সরকার পতনের একটা ভিত্তি তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। তারা আরও উল্লাসিত কারণ জানা গেছে এরকম আরো পর্ব ধারাবাহিকভাবে আসবে। সবচেয়ে বড় কথা দেশের গোপনীয় ও স্পর্শকাতর কিছু বিষয় একটা বিদেশী টিভি ক্যামেরা ধারণ করে নিলো যা সচেতন মানুষকে ভাবাচ্ছে।

All the prime minister’s সবহ এ কি কি আছে ?

১. সেনা প্রধানের পরিবারের লোকজন মাফিয়া, খুনি ও সরকারের অনুকম্পা পাওয়ার অভিযোগ।

২. বিডিআর প্রধান থাকাকালে সরকারকে ভোটে জয় ও সেনা প্রধান হিসাবে সরকারকে পূর্ণ অনৈতিক সহায়তা করা।

৩. হাঙ্গেরির মাধ্যমে ইসরাইলি স্পাইওয়্যার নামক অত্যাধুনিক গোয়েন্দা

সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া।

৪. সেনা প্রধানের ভাই মন্ত্রী, এমপি ও সরকারের নানান মহলে ঘুষ দিয়ে বা ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে টেন্ডার পাইয়ে এবং তারা ২০% হারে কমিশন নিয়ে কাজ পাইয়ে দেয়ার অভিযোগ।  

৫. আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিয়াল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। 

৬. বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলি সেনা প্রধান আজিজ সাহেবের ভাইকে সহযোগিতা করে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডকুমেন্টারিটি উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে তৈরি এবং উন্নতমানের নির্মাণ। প্রাথমিক একটা উত্তেজনা তৈরি করতে এটি সুড়সুড়ি দেয় বটে তবে দীর্ঘস্থায়ী কোন প্রতিক্রিয়া তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এই প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু সেনাবাহিনী, বিডিআর, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা একটা একপেশে প্রোপাগান্ডার অংশ, যথেষ্ট যুক্তিনির্ভর নয়। দেশে একাধিকবার বিভিন্ন অপকর্মের বা অপরাধের দায়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক, পরে বিদেশে পলাতক একজন বিদেশে বসে বললো, আর তা সত্য হিসাবে প্রচার করা যথেষ্ট তথ্যপূর্ণ না হলে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে এমন প্রতিবেদন করার আগে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকা বাঞ্ছনীয় ছিলো। দেশী বিদেশী যে কোন সাংবাদিকের জন্য এটা আবশ্যক। নিরপেক্ষতা ও নির্মোহতা সাংবাদিকতার অন্যতম হাতিয়ার অন্যথায় প্রকাশিত সংবাদ বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, নিছক প্রোপাগান্ডা হিসেবে গণ্য হয়। এতে সংবাদের উৎসগুলি যথেষ্ট নির্ভরশীল নয়। তাদের অন্যতম সোর্স সামি একজন মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করে তার মানে দালাল নিজেও একজন অপরাধী। এই দালালের সাথে হারিসের আলাপচারিতায় বিভিন্ন প্রসঙ্গ এসেছে। যা রাজা উজির মারার মতো বাগাম্ভরপূর্ণ যা প্রায়শ একজন স্বল্প-শিক্ষিত মাত্রাজ্ঞানহীন মানুষ করে থাকে। সামির দেওয়া তথ্য কখনোই গ্রহণযোগ্য নয় যতক্ষণ না সেগুলি যথেষ্ট তথ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশে পারিবারিক বন্ধন অনেক দৃঢ়, মানুষজনও বেশী ক্ষমতায় থাকা লোকগুলিকে বেশী মাত্রায় তোয়াজ করে এগুলো এদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। এতে যদি আইনে ব্যত্যয় না ঘটে তবে তা আলোচ্য হতে পারে না। 

কমিশনে বা দালালদের মাধ্যমে এদেশে কেন সারা বিশ্বেই ব্যবসা বাণিজ্য হয়ে থাকে সেখানে ২০% একটা অবাস্তব অংক। এরকম কমিশন দিয়ে কেউই ব্যবসা করবে না। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ভেদে এটা ১-৩% হতে পারে। কেউ একজন ব্যবসা পেতে সাহায্য করলে পারিশ্রমিক হিসাবে টাকা পেতেই পারে। সামরিক সরঞ্জাম যদি ইসরায়েল থেকে তৃতীয় কোন দেশের মাধ্যমে এসে থাকে এটা এই প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়নি।

আলজাজিরা বাংলাদেশকে নিয়ে বিশেষ করে বাংলাদেশ সরকারের রাজনৈতিক আদর্শের উল্টো দিকে চলা একটা সংবাদ মাধ্যম। এরা এর আগে হেফাজত নিয়ে যে রিপোর্ট করেছিলো তা মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে হয়েছিলো যা প্রমাণিত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও আল জাজিরার ভূমিকা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো যা দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। 

সেনাপ্রধানের নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে হয়, তিনি প্রধানমন্ত্রীর লোক হবেন সেটাও স্বাভাবিক আর তিনি যে তার আতœীয় স্বজনের অপরাধের দায় নেবেন তাও নয়। তার ভাইদের তিনি যদি সাহায্য করেও থাকেন এবং তা যদি আইনভঙ্গের কারণ না হয় তবে সমস্যা কোথায়? আল জাজিরা যদি নিরপেক্ষ হতো তাহলে বাংলাদেশের পজিটিভ খবরগুলিও প্রচার করতো যা তারা কখনোই করে না। তাই সংবাদমাধ্যম হিসেবে তারা যে বিশ্বাসযোগ্যতা সে দাবী করতে পারে না। এতে ধারণা হয় বিশেষ উদ্দেশ্যে এই ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে চটকদার মাল মসলায়। তাঁরা যে তাদের ফুটেজে অনেক কাট পেস্ট করেছে, তাও প্রমাণিত হয়ে গেছে। এতেও রিপোর্ট গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। যা সাংবাদিকতা কিংবা ডকুমেন্টারি তৈরির নীতিমালার চরম  ব্যত্যয়।

তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ যে নিজে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে একটা অবস্থানে পৌঁছেছে তা একটা সিনেমাটিক সাফল্যের গল্প শুধু নয়, এখানে অনেক ধরণের আপোষ ও চাতুর্যময় সিদ্ধান্তের ব্যাপার থাকে, থাকে অনেককিছুই উপেক্ষা করার যার মধ্য দিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া

যায়।  সে প্রচেষ্টার রাস্তা কখনোই সরলরৈখিক নয়, মসৃণ নয়। সংবাদমাধ্যমকে সেই পরিক্রমাটা নির্মোহভাবে তুলে ধরতে হয় তা না হলে সংবাদ মাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। স্মরণ রাখতে হবে এটা নাগরিক সাংবাদিকতার যুগ, এখানে তথ্য লুকানো বা ম্যানুপুলেট করা খুব কঠিন।

‘হক’ এর বচন- ‘গুরু যোগ্য ভক্তের চক্ষু কর্ণে জিহবায় এসে বসেন’

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ভক্তের ভালবাসা, প্রেম, পূজা পেতেই গুরুর আসা, আবির্ভাব। ভক্তের দ্বারে বাধা আছেন সাঁই। সাধক কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন -‘কৃষ্ণ তো রাধাময় দেহ’। এমন শত সহস্র উপাধি দেয়া যায় গুরু এবং শিষ্যের সম্পর্ক নিয়ে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন- ‘গুরু যোগ্য ভক্তের চক্ষু, কর্ণে, জিহবায় এসে বসেন। ভক্ত কে দর্শন করেন। ভক্তকে দর্শন করে চলে যান। সম্পর্ক হলে আর কিছু লাগে না’। তিনি আরো বললেন- ‘যোগ্য ভক্তের সাথে গুরুর এই চোখাচোখি, অনুরাগ কোনদিন কোন কালে শেষ হয়না। ইন অল আসপেক্ট-এ ভক্ত গুরুকে পান’।

সম্পর্ক নামক শব্দটি দিয়ে সম্পর্ক বুঝা যায় না। সম ভাব, সম ক্ষেপণ, সম চিন্তন, স্পন্দন, মানকেই নির্দেশ করে। এতে গুরুর গুরুত্ব কমে যায় না। প্রকৃত ভক্ত জানেন গুরু সব সময় গুরুই। তবু সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন- গুরু যোগ্য ভক্তকে এগিয়ে দিয়ে আনন্দ পান। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ একটি সফরের কথা উল্লেখ করে বললেন- ‘লম্বা সফর, আমি ড্রাইভ করছিলাম আর সূফী সাধক আনোয়ারুল হক পাশের সীটে। নানান আলাপ চারিতা। আমরা তখন রাম-লক্ষণ দুই ভাই।’  সাধনার জগতে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক কোন নিক্তি, কোন ভিত্তি, কখন কোন রঙে, রূপে রূপলাভ করে, করতে পারে মহান সাধকের এই একটি কথার মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলে উপলব্ধি করার সুযোগ করে দেয় আমাদেরকে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন – মাঝে মাঝে তব দেখ পাই, চিরদিন কেন পায় না’। এই কথাটি এখানে খাটে না। প্রকৃত ভক্ত সব সময় গুরুর আলোয় থাকেন। লালন ফকির বললেন- গুরু শিষ্যের এমনি ধারা চাঁদের কোলে থাকে তারা/ চাঁদের গায়ে চাঁদ আছে ঢাকা/ চাঁদ হতে হয় চাঁদের সৃষ্টি।’ জন্ম এবং সৃষ্টির মধ্যে যে বিশাল বিরাট পার্থক্য। সীমাহীন দূরত্ব, তা তো সাধক সান্নিধ্যে এসে জানা গেল। সাধনপীঠে এই মানুষই সৃজনশীল মানুষ হয়ে উঠেন। নব অনুরাগে নব জন্ম। এটিকেই সৃষ্টি বলা হচ্ছে। যিনি সৃষ্টি কর্মটি করছেন ভক্তের কাছে তিনিই স্রষ্টা।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন- ‘প্রতিটি পরিবর্তনেই প্রাপ্তির সৌন্দর্য। হাক্কানী থট কে এগিয়ে নিতেই কাজ করা হচ্ছে। এখানে পীর মুরিদ সিষ্টেম নেই।’

মহান সাধক বললেন- যে যা নিয়ে এসেছে তাই ফেরত পাবে। মহান সাধকের এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ  দিকনির্দেশনাটি উপলব্ধি করতে হবে। তিনি গভীর একটি উপলব্ধির দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছেন।

তিনি অনত্র বললেন – দরবার উন্মুক্ত, যতটুকু করবেন ততটুকুই পাবেন। ভক্ত তার চারপাশে যেখানে যতদূর দেখবেন সবই গুরু গুরুময়। গুরুর জগতই দেখতে পান। নিজেকে আবিস্কার করেন গুরু সাগরে। ধৈর্য নামক অলংকার পরে, গুরু রঙে রঞ্জিত হয়ে উঠেন। সেখানেই অহংকার হলো আত্মমর্যাদা। মর্যাদা একটি বোধ।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন- আমিত্ব থাকবেই। আমিত্ব থাকা দোষের নয়, লক্ষ্যের ব্যাপারে একরৈখিক কিনা এটিই দেখার বিষয়।

স্ব-ভাবে স্বভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নিজেকে নিজে গড়ি

সংলাপ ॥ মানুষ জন্মাবার পর পারিপার্শ্বিকতা হতে তার অভ্যাসের মাধ্যমে স্বভাব গড়ে তোলে। প্রথমে সে চোখকে বেশি কাজে লাগায়। অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের এবং চোখ দিয়ে যা দেখছে সেগুলোকে। অতঃপর চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের সহযোগিতায় হাত, পা, মুখ, পায়খানা ও প্রসাবের রাস্তা সমূহের দ্বারা বিভিন্ন কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। যখনই কোন কর্ম করে তখনই সে সুখ, দুঃখ বা ঔদাসীন্যের সঙ্গে জড়িত হয়, কর্মফলের উপর নির্ভর করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে পরিবেশগত কর্মের মাধ্যমে। গবেষকদের মতে একজন পূর্নাঙ্গ মানুষ ৭ (সাত) হাজার হতে ৮ (আট) হাজার কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে প্রতিদিন। প্রতিদিনের এই কর্মগুলোর মধ্য দিয়েই একই পরিবেশ অন্তর্ভুক্ত কর্মের বারবার বাস্তবায়নে তার গড়ে ওঠে অভ্যাস। এই অভ্যাসের বার বার প্রকাশ ভঙ্গিকেই আমরা স্বভাব বলে থাকি। ধর্মীয় আঙ্গিকে স্বভাবের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্বভাবের উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সর্বযুগে-সর্বকালে সকল ধর্মে।

ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে সরাসরি স্বভাবের উপর জোর দেয়া হয়েছে আত্মিক উন্নতির জন্য। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলেছেন : সৎ-স্বভাবই ধর্ম।

ধর্মীয় গবেষকগণ স্বভাবের পরিচয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণে নানা মতের জন্ম দিয়েছেন নিজেদের জানা ও উপলব্ধিবোধ হতে। যেমন – হাসি মুখ, কষ্ট সহ্য করা বা অত্যাচারে প্রতিশোধ না নেয়া। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো এক একটি শাখা বা লক্ষণ কিন্তু স্বভাবের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নয়।

মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্ম নেয়। পরবর্তীতে নিজের এক এক রূপ সৃষ্টি করে বিবর্তনের ধারায়। পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্যে কর্ম করে। কর্মের মধ্য দিয়েই তার চিন্তাজগত ব্যস্ত থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রকৃতি ও বৃত্তিগুলো সমভাবেই বিকশিত ও স্ফূর্ত হয়। এই বিকাশের ধারা থেকেই জানার আগ্রহ, বুদ্ধিমত্তা, দমন শক্তি, প্রবৃত্তিগুলো জেগে উঠে। এদের মাঝে সমতা এবং সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য উদ্ভব ঘটে বিচার শক্তির। এই শক্তির কম স্বভাব অপূর্ণ থাকে। কম হলে দুর্বল বা অকর্মণ্য হয় আর বেশি হলে কুৎসিত আকার ধারণ করে এবং তা তার কর্মের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একই তালে শক্তির প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে একটা কর্মকে কেন্দ্র করে তখনই গড়ে ওঠে স্বভাব। স্বভাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তা যথাক্রমে সৎ-স্বভাব ও অসৎ স্বভাব। এই দুই স্বভাবের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যক্তি যখন তাকে সজাগ রাখে তার বিচার শক্তি দিয়ে এবং প্রতিটি কর্ম বিশ্লেষণ করে চৈতন্যশীল হয় তখনই তার মধ্যে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় আর এই দ্বন্দ্বই তাকে তার মতো করে সৎ-অসৎ পথের সন্ধান দেয়।

যখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় প্রতিটি কর্মকে ঘিরে তখনই উচ্চস্তরের ব্যক্তিত্বের সংসর্গে আসা একান্ত আবশ্যক যিনি আত্মসংশোধনের বীজ বপন করতে পারেন তার মধ্যে। তিনি উন্নতির পথগুলো ব্যাখ্যা করবেন এবং পারিপার্শ্বিকতা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবেন। এছাড়াও যখন কেহ কর্ম বিশ্লেষণ করে নিজে উপলব্ধি করে তার কর্মগুলো খারাপ তখন তাকে ঠিক উল্টো কর্মগুলো করতে হবে যাতে সে নিজেকে দমন করতে পারে এবং সঠিক পথে চলতে পারে। কাজের অভ্যাস করতে থাকলে পরিশেষে এই অভ্যাসই তার স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কারণেই বলা হয় অভ্যাস থেকেই স্বভাব। এখানেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ পথ প্রদর্শক খোঁজে এবং গুরুর সন্ধান করে  আত্মিক উন্নতির জন্যে। গুরু তাকে পথ দেখায় – স্বভাব গড়ার জন্য।

দেহকে কার্যকরী করে যে সমস্ত কাজ করা যায় তার একটা প্রভাব অভ্যন্তরীণ চিন্তাজগতের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। ফলে ব্যক্তি এক অনির্বচনীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। গুরুর নির্দেশ আনন্দের সাথে পালন করে চলে। না পারার পথ ধরে নিষ্ঠা সহকারে পালন করা প্রয়োজন।

সাধনা এবং পরিশ্রম দুটোর সাহায্যেই স্বভাব ও গুণ অর্জন করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতই মানবজাতির মূল উৎপত্তিস্থল। ধন-দৌলত এবং পার্থিব প্রতিপত্তির মোহে মত্ত থাকলে পার্থিব স্বভাব গড়ে উঠে। বুদ্ধিমান সেই যে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে সজাগ থাকে।

এই আলোকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বভাবের কি প্রয়োজন তা একটু চিন্তা করলে বেশ বুঝা যাবে। প্রত্যেকটি পরিবার সচেতন হলে সমাজ সচেতন হবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে।

অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কর্ণধারদের অবশ্যই আদর্শিক স্বভাবী হতে হবে। তাঁদের আদর্শিক স্বভাব থাকলে তারই স্পর্শে প্রশাসনিক ধারায় সত্যের প্রভাব পড়তে থাকবে যা শুধু সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করবে না বরং অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যায় না। তাই মানুষ সংসার জীবনে শুধু লোভ আর মিথ্যা অহংকারের বশবর্তী হয়ে বিবেকের তাড়নাকে ঢাকা দেয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে মাত্র। ব্যক্তিজীবনে প্রত্যেক মানুষই ধর্মপালন করে যাচ্ছে আর সেটা হচ্ছে তার ইচ্ছামতো ইচ্ছাধর্ম। তাতে তার লোভ ও অহংকার দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ‘সংযম’ বলে শব্দটা বই পুস্তকে রয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যক্তিজীবনে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।

সংযমকে স্ব-স্ব জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে চোখ। এই চোখই যতো নষ্টের গোড়া আবার এই চোখই সাধারণ মানুষকে আত্মিক উন্নতিতে প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটায়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির অভ্যাসের পরিবর্তন দলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে করতে সমগ্র জাতির স্ব-ভাব গড়ে প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় জীবনে, এক মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তাই প্রয়োজন নেতৃত্বদানকারী নেতা-নেত্রীর অভ্যাসের পরিবর্তন। বিপদে পড়লে মানুষের চরিত্রের অনেক দিক উন্মোচিত হয় আবার প্রকৃত বন্ধুও চেনা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে দেশবাসী না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তারা একটু শান্তি চায়, একটা সুন্দর পরিবেশ চায় যেখানে সার্বিক আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারা যায়। আসুন না, আমরা একবার নিজের অভ্যাসগুলো  পরিবর্তন করে স্ব-ভাবে স্বভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা  নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পথে পা রাখি।

জনসেবার রাজনীতির ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তন!

শেখ উল্লাস ॥ ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই হবে মুজিব বর্ষের লক্ষ্য, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নত জীবনযাপন করতে পারে। দেশের ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে পারার চেয়ে বড় কোনো উৎসব আর কিছুই হতে পারে না।’ গত ৯ মাঘ ১৪২৭, ২৩ জানুয়ারি রোববার সারা দেশে ৬৬টি হাজার ১৮৯টি পরিবারকে জমি ও ঘর প্রদান ও ৩ হাজার ৭১৫টি পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন এবং এ উপলক্ষে অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে শান্তিপ্রিয় দেশবাসী নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে। বিশেষ করে পাকা বাড়ি ও জায়গা পাওয়া একদা ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষদের আবেগ-অনুভূতি-উপলদ্ধি যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাতে রাজনীতিবিমুখ এদেশের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষদের নতুন আশা উদ্দীপনার সঞ্চার করেছে। এ যেন এদেশের রাজনীতিতে দেশসেবা ও জনসেবার ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তনের আর এক নতুন যাত্রা! স্মরণ করতে হয়, ১৯৭১’এর ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত ‘এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে।’             

বস্তুত রাজনীতি-ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকুরি-বাকরি-ধর্মীয় আচার- ওয়াজ মাহফিল-পূজা-পার্বন-বক্তৃতা- ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা’ করে শুধুই নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক-ব্যালেন্স বাড়ানো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাজের আওতায় পড়ে না। এই প্রতিযোগিতাটি এমনভাবে এদেশের মানুষকে পেয়ে বসবে-এমনটি ১৯৬৯ ও ’৭১-এ কেউ হয়তো চিন্তাও করেনি। বিশেষ করে ১৯৭৫’এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাকিস্তানী ভাবধারায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনীতির সংস্কৃতিতে এ প্রবণতাটিই শক্তিশালী হয়েছে। যার পরিণতি ধনী আরও ধনী হবে, গরীব হবে আরও গরীব। ফলে বাস্তবতা এমনই যে, ব্যাংক-ব্যালেন্স বাড়ানোটাই যেন জীবনের প্রধান লক্ষ্য। যদিও নিজেকে ধার্মিক-ধর্মভীরু দাবি করতে এদেশে কেউ পিছপা হয় না। গর্ব করে সবাই নিজেকে মুসলমান দাবি করে! এদেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ মুসলমান-এ অহংবোধও কম দেখা যায় না। এ মর্মে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর একটি কথা স্মরণযোগ্য। সাধক একদিন তাঁর কাছে নবাগত একজনকে প্রথম দিনেই বলেছিলেন এ রকম একটি কথা, ‘কেউ যদি নিজেকে নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত)-এঁর অনুসারী দাবি করেন তাকে সবার আগে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটা বন্ধ করে আসতে হবে। কারণ, নবী মুহাম্মদ-(যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) এঁর কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ছিলো না। যা-ও ছিল, যা পেয়েছিলেন সেসবও তিনি মানুষের কল্যাণে, মানবতার মহান ব্রতে ব্যয় করেছিলেন’।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত এদেশের রাজনীতিতে গণবিরোধী শক্তির অনুপ্রবেশ কীভাবে শুরু হলো-এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আর একটু গভীরে যাওয়া দরকার। এক অর্থে এর হিসাব খুব সহজ। ১৯৪৭’এ ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর এদেশের মানুষ তথা বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর নানামুখী ষড়যন্ত্র, টালবাহানা এবং শেষ পর্যন্ত ৭১’এর ২৫ মার্চে বর্বরতম গণহত্যা চালানো হয়। আর তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় এদেশে দেশপ্রেমের রাজনীতির পক্ষে ও জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কার কী অবস্থান? দেশের ও মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ওইদিন যারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হাতে হাত মিলিয়ে ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হয়েছিল তারাই ইতিহাসে রাজাকার হিসেবে অভিশপ্ত হয়ে আছে। বিষয়টি এদেশে এমনই রূপ ধারণ করেছে যে, রাজাকার শব্দটির অর্থই এখন বিশ্বাসঘাতক, দেশ ও সমাজের শত্রুদের দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে। কেউই এখন আর রাজাকার বা রাজাকারের সন্তান-বংশধর-আত্মীয় হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না। পারলে সবাই মুক্তিযোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে চায়। ফলে দেশসেবার রাজনীতিকেই মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শ এবং দেশসেবার ব্রত না নিয়ে নিজের স্বার্থে যারা রাজনীতি করতে চায় তারাই রাজাকারী আদর্শের অনুসারী। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজনীতিতে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী এই রাজাকারী নীতির অনুসারীরা কখনও স্থান লাভ করতে পারবে না। আর পারলেও দেশের উন্নতিবিধান এদের দ্বারা কখনও সম্ভব হবে না। অথচ দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই শক্তিই এদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল দীর্ঘ ২১টি বছর। তার চেয়ে আরও দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগের ভেতরেই ঘাপটি মেরেছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এবং এদের ইন্ধন ও সহযোগিতাতেই সংঘটিত হয়েছিল ১৫ আগস্ট-জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় প্রত্যাবর্তন। এই অপশক্তিই রাজনীতিতে দেশসেবার ঐতিহ্যবাহী ধারাটিকে নিশ্চিহ্ন করে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-অত্যাচার-নিপীড়ণ-নির্যাতনের ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছিল।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর এদেশে সরকার ও রাষ্ট্রের পরিচালকরা রাজনীতিতে দেশসেবার ঐতিহ্যের বিপরীতে স্বাধীনতার ফসলকে ধূলায় পরিণত করতে কত হত্যা, ষড়যন্ত্র, দুর্নীতির আশ্রয় যে নিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অবশ্য, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা পাকিস্তানী হানাদারদের দোসর ছিল, তারা এদেশের গণমানুষের কল্যাণ চাইবে-সেটা আশা করাও বৃথা চেষ্টা। কারণ, এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গণমানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ ছিল স্বতঃর্স্ফূত। যুদ্ধটি বা সংগ্রামটির নামই ছিল মুক্তিযুদ্ধ বা জনযুদ্ধ। এই জনমানুষ বা গণমানুষের সার্বিক কল্যাণচিন্তা তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা বোকামী ছাড়া কিছুই নয়। তাই তো দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার পর থেকেই কেবল এই বাংলাদেশ একটি কার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে গেছে। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশের অর্থনীতিকে আজ এমন এক অবস্থানে নিয়ে এসেছেন যা বিশ্বের কাছে বিস্ময়ের ব্যাপার।              

এই বিস্ময়ের প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ। আর এই ২৩ জানুয়ারি সারা দেশে গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষদেরকে জমি ও বাড়ি প্রদানের মতো বিরাট কর্মযজ্ঞের সূচনা দেশের অবহেলিত বঞ্চিত মানুষদের চিত্তে আশা জাগানোর নতুন এক নজির স্থাপিত হলো।

এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের প্রাক্কালে এই মাহেন্দ্রক্ষণে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের (এসএসএন) বিভিন্ন ভাতা সরাসরি উপকারভোগীদের মুঠোফোনে পাঠানোর উদ্যোগ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করব, মানুষের সেবা করব। আমার সরকার মানে মানুষের সেবক। এই সেবক হিসেবেই কাজ করতে চাই।’  সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি যেদিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম শপথ নিয়েছিলাম, সেদিনই বলেছিলাম, দেশের সেবক হিসেবে কাজ করব। প্রধানমন্ত্রীত্ব আমার কাছে কিছু না, কেবল কাজের সুযোগ, কাজের ক্ষমতাটার প্রাপ্তি।’ সরকারের নতুন এই উদ্যোগের আওতায় দেশের শীর্ষ দুটো মুঠোফোন ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বয়স্কভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তির টাকা সরাসরি উপকারভোগীদের মুঠোফোনে পাঠানো হবে।

বিশ্ব রাজনীতিতেও এই ঐতিহ্যের নতুন হাওয়া বইছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পর জো বাইডেন বলেছেন-, ‘আমি দেশ সার্ভ করতে এসেছি, ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াতে নয়। যদি ব্যাংক-ব্যালেন্স বাড়ানোর ইচ্ছা থাকতো তবে ব্যবসায়ী হতাম, রাজনীতিবিদ নয়। রাজনীতি হলো বিলিয়ে দেওয়ার জায়গা, বিলিয়নিয়ার হবার নয়। ব্যবসায় মুনাফা থাকে, রাজনীতিতে থাকে শুধু সেবা। এই সেবাটাই হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মুনাফা।’ 

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জনৈক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আজকের দিনে জাতির প্রতি আপনার বাণী কি? এর উত্তরে বঙ্গবন্ধু বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘ উদয়ের পথে শুনি কার বাণী/ ভয় নাই ওরে ভয় নাই/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ পরদিন ১৩ জানুয়ারি স্বাধীন দেশে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের লক্ষ্য ঘোষণা করেছিলেন। এদেশের রাজনীতির ঐতিহ্যটা কী হবে- কী হওয়া উচিত বঙ্গবন্ধুর এসব বাণীতেই তা স্পষ্ট হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর এদেশে স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধী চক্র এ দেশে ফুলে-ফেঁপে অনেক মোটা হয়েছে। অবশ্য এর আগেও, অর্থাৎ, স্বাধীনতার পর পরই অনেকে যাদের মুক্তিযুদ্ধে কোনো অংশগ্রহণই ছিলো না, অথবা যাদের ছিলো তাদেরও ক্ষুদ্র একটি অংশ অবাঙালিদের পরিত্যাক্ত বাড়ি-সম্পত্তি দখল করে রাজনীতিতে-সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু যে বৃহৎ জনগোষ্ঠী একদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতার জন্য, দেশের জন্য উদারভাবে সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিল তারা পেছনেই পড়ে গেল। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, এদেশের স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধে, মুক্তিবাহিনীতে অংশগ্রহণকারীরাই অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে। ৭১’এর ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের এক সমাবেশে বলেছিলেন, ‘তিন বছর আমি তোমাদেরকে কিছুই দিতে পারবো না।..’ মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর কথায় আশ্বস্ত ছিলেন। কিন্তু, বঙ্গবন্ধুর সরকারও দলের মধ্যেই স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী চক্র এমনভাবেই বাসা বেঁধে ছিল যে, তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নিহত হতে হয়েছিল। তাঁকে হত্যার পর তাঁর দলের লোকেদের দিয়েই খুনী চক্র নতুন সরকার গঠন করেছিল। তাঁকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১টি বছর খুনীচক্র প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শাসন করতে গিয়ে এদেশের রাজনীতির ঐতিহ্যটাই মুছে ফেলে দিতে উদ্যত হয়েছিল ৭১’এর পরাজিত শক্তি। চক্রটি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটিই নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পায়তারা করে সাময়িকভাবে সফলও হয়েছিল।

অথচ এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতাপ্রিয় সকল নেতা-সংগঠন-সংগঠক-কর্মীর মূল লক্ষ্যই ছিল সমাজসেবা, দেশসেবা ও মানবসেবা। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানী আমলের শাসন-শোষণ-অত্যাচার-নিপীড়ণ-নির্যাতন-বঞ্চনা থেকে বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে জীবন উৎসর্গকারী সবাই ছিলেন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী। ‘মুক্তির মন্দির সোপানতল কত প্রাণ হলো বলি দান, লেখা আছে অশ্রুজলে’, ‘এক সাগরই রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা আমরা তোমাদের ভুলবে না, দুঃখসহ-বেদনার কন্টক পথ বেয়ে শোষণের নাগপাশ ছিড়লে যারা আমরা তোমাদের ভুলবোনা’ এই ধরনের অসংখ্য গান সেইসব দেশ্রপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের কথাই শুধু স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৯৭১’এর ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাইনা, আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’ 

তাই মুজিব বর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সচেতন দেশবাসীর বক্তব্য হচ্ছে, সরকারও রাষ্ট্র পরিচালিত এই দেশসেবার মধ্য দিয়ে যে রাজনীতি তাকে আরও বেগবান করার জন্য অশুভ চক্রের সকল কালো হাতকে অবশ করে দেয়ার এখনই সময়। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজনীতির ধারাটি শক্তিশালী হওয়ার যাত্রাপথ জাতি অতিক্রম করছে যা থেমে যাওয়ার নয়। কারণ, লাখো শহীদের রক্তে কেনা এদেশ ব্যর্থ হতে পারে না। স্বাধীনতার চেতনার রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকে শুধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহারের স্বপ্ন নিয়ে যারা ভীড় জমিয়েছে তাদের এখান থেকে কেটে পড়াই নিজেদের এবং জাতির জন্য মঙ্গলজনক। জনসেবা ও দেশসেবার ব্রত নিয়ে যারা এদেশে রাজনীতি করতে আসে তাঁরাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়-এটাই ধর্ম ও সংস্কৃতির মূল কথা।

অপচয় ও অপব্যয় জাতিকে পিছনে টানছে

সংলাপ ॥ অপচয় ও অপব্যয় ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ক্ষতি বয়ে আনে, পেছনে টেনে নিয়ে যায়। ইসলাম অপচয় ও অপব্যয়কে ঘৃণা করে। প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয়ই হলো ইসরাফ বা অপচয়। অপচয় ও অপব্যয়-এ শব্দ দুটি অনেক ক্ষেত্রে সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় ব্যয় করার নামই অপচয়, যা আরবীতে ‘ইসরাফ’ বলা হয়। অন্যদিকে, অপব্যয় হচ্ছে অন্যায় ও অযৌক্তিক উপায়ে সম্পদের অপব্যবহার, যাকে আরবীতে ‘তাবযীর’ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে তাবযীর বা অপব্যয় সম্পর্কে অনেকগুলো আয়াত রয়েছে। সূরা বনী ইসরাইলের ২৮ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’

যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু ব্যয় করলে তা অপচয় হবে না এবং ব্যক্তি বিশেষে এই ব্যয়ের পরিমাণে তারতম্য হতে পারে। অনেক সময় ব্যক্তির সামাজিক অবস্থানের উপরও তার ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করে। এছাড়া এক্ষেত্রে সামর্থ্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপচয়ের অর্থ হলো বিনা কারণে সম্পদ ব্যয় করা। অন্য কথায় বলা যায়, সম্পদ নষ্ট করার নামই অপচয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে দেহসম্পদ ও ধন-সম্পদ হচ্ছে মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। কাজেই কোনো ভাবেই এই আমানতের খেয়ানাত করা যাবে না এবং তা সঠিক কাজে সর্বোত্তম পন্থায় ব্যবহার করতে হবে। কেউ এই সম্পর্কে সঠিক পথে কাজে না লাগিয়ে তা অপচয় ও অপব্যয় করে তাহলে সে দোষী হিসেবে গণ্য হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আরাফের ৩২ আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আহার কর ও পান কর। কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহতায়ালা অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ এই আয়াত থেকে এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহতায়ালা চান তার দেয়া নেয়ামতগুলোকে সঠিক ও সর্বোত্তম ভাবে ব্যবহৃত হোক এবং যারা আল্লাহর নেয়ামতকে বিনষ্ট ও অবমূল্যায়ন করে আল্লাহ তাদের উপর অসন্তুষ্ট।

পাশ্চাত্য ও আরব দেশগুলোতে এখন মানুষকে অপচয় ও অপব্যয়ে উৎসাহিত করার জন্য প্রতিনিয়ত প্রচার চালানো হচ্ছে। আর এসব প্রচারণায় বাংলাদেশ এবং অনেক অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অধিবাসীরা উৎসাহিত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের বৃহৎ কোম্পানিগুলো বেশি বেশি পণ্য বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভের লক্ষ্যে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে অপচয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো কোনো মার্কিন কোম্পানির এখন এমন দশা যে, মানুষ যদি অপচয় না করে তাহলে ওইসব কোম্পানি টিকে থাকতে পারবে না। এ কারণে ওইসব কোম্পানি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের সহযোগিতায় এ ধরনের অসহিষ্ণু সংস্কৃতি চালুর নিরন্তর চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ধনী আরব দেশগুলো তাদের মদদ দিচ্ছে। অপচয় সব সময় মানুষকে পরনির্ভরশীল করে রাখে। অপচয়, অপব্যয় ও পরনির্ভরশীলতা যতো বাড়বে দেশ ও জাতি ততো সংকটে পড়বে। শুধু তাই নয় অন্য জাতির কাছে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবার সম্ভাবনা বেশি।

বাংলাদেশের ধনী সম্প্রদায় ও আরবের মুসলমানরা ভোগ-বিলাসিতার মাধ্যমে অহরহ ও অপব্যয় করছে।  বিশ্বব্যাপীও এ প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করা অপচয়। আমরা ভোগ বিলাসিতার জন্য অর্থ অপচয় করি কিন্তু এই অর্থই উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, পূঁজিবিনিয়োগে কাজে লাগানো যেতে পারে, দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং তা দিয়ে দরিদ্রদের সাহায্য করা যেতে পারে। আমরা খেয়ালের বশে অর্থ অপচয় করে থাকি। অনেকেই নিজেকে সম্পদশালী এবং অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার জন্য চড়াদামের জিনিসপত্র ক্রয় করে থাকে বিশেষ করে কোরবানী ও রোজার সময় দেখা যায়, যা প্রকৃতপক্ষে প্রয়োজনীয় নয়। দামি জিনিসপত্র ও চাকচিক্য ইসলামের কাছে মানদন্ড নয়। নিজেকে বড় হিসেবে তুলে ধরার মনোভাব ও অহংকার কখনোই মানুষকে উন্নত করে না।

বর্তমানে নব নব প্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিচ্ছে। ইসলাম নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের বিরোধী নয়। কিন্তু অল্প কিছু দিন পরপরই ঘরের নতুন আসবাবপত্র ও গাড়ি পাল্টে সর্বশেষ মডেলের আসবাবপত্র ও গাড়ী কেনা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজনের তুলনায় লোক দেখানোর মানসিকতাই প্রাধান্য পায় কারণ কোনো সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার না করাও অপচয়। ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কবির ভাষায় ‘যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি, আশুগৃহে তার দেখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ বাতি।’ অর্থাৎ আজ যে অপচয়কারী ও বিলাসী, কাল সে ভিখারী ও পরমুখাপেক্ষী। এটা ব্যক্তি জীবনের মতো রাষ্ট্রীয়  জীবনেও সত্য।

অপচয় ও অপব্যয়ে কোন প্রাপ্তি না থাকলেও মোহগ্রস্ত মানুষ এ থেকে বিরত থাকছে না। মানুষের জীবন ধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন অত্যন্ত জরুরি। এসব ছাড়া মানুষ জীবনধারণ করতে পারে না, তাই এগুলোকে মানুষের মৌলিক চাহিদা বলা হয়। ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষ, সাদা-কালো, ছোট-বড় সকলেরই এসব প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক ও আর্থিক ভিন্নতার কারণে সকল মানুষ সমভাবে এসব প্রয়োজন মেটাতে পারে না। আমরা অপচয় ও অপব্যয় পরিহার করে সেই অর্থ ওইসব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটাতে ব্যয় করলে সমাজ যেমন সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে তেমনি আমরাও মানসিক প্রশান্তি পাব যা শান্তি (ইসলাম) এর সহায়ক।

মানব সম্পদ ও শক্তিকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার না করাও এক ধরনের অপচয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ব্যক্তি যে কাজে অধিক পারদর্শী তাকে দিয়ে সে কাজ না করিয়ে অন্য কাজ করানো হচ্ছে অথবা অধিক পারদর্শী লোককে উপযুক্ত কাজে নিযুক্ত করা হচ্ছে না। এর মাধ্যমে অপব্যয় ও অপচয় বেড়ে যাচ্ছে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে অনুপযুক্ত স্থানে চাকুরি করায় অনিচ্ছাকৃত ভাবে মানব সম্পদ অপচয় করছে। পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক না হবার কারণে প্রতি বছর ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। এছাড়া, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে প্রতিদিনই বহু খাদ্য ও জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে।

ধুমপানসহ সব ধরনের নেশাই মারাত্মক অপব্যয়। এর ফলে স্বয়ং ধুমপায়ী বা মাদকসেবীর পাশাপাশি তার আশেপাশের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাভাবিক ভাবেই যা কিছু মানুষের জন্য ক্ষতিকর তার সবই অপচয় ও অপব্যয় হিসেবে গণ্য। সূফী সাধকরা বলেন, যা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং শরীরের ক্ষতি করে, তাই অপচয়।

অপচয় ও অপব্যয়ের নানাবিধ ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে ইসলামে তা নিষিদ্ধ। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে বৈষয়িক ক্ষতির পাশাপাশি আত্মিক ক্ষতিও ঘটে।

ভোগ-বিলাসিতা মানুষের দেহের চেয়ে আত্মার উপর বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপচয় ও অপব্যয়ের কারণে বরকতও হ্রাস পায়। মানুষের ধন-সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়।

মানুষ আল্লাহর নেয়ামতের অবজ্ঞা ও অবহেলা করে নিজের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনে। অপব্যয়ের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের পথ থেকে সরিয়ে নিয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করাই উত্তম। অপচয়কারী কাজের প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। বিনা কারণে অর্থ অপচয়কারী ব্যক্তিবর্গ যারা অপচয়ের মাধ্যমে সব শেষ করে আবার জীবিকা প্রার্থনা করে তাদের চেয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী ব্যক্তি উত্তম।

অপচয় ও অপব্যয়ের চূড়ান্ত পরিণতি হলো দারিদ্র্য। অপচয়কারী আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না এবং নিজেই নিজের করুণ পরিণতি ডেকে আনে। যারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে ও হিসাব-নিকাশ করে চলে, তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ বিরাজমান থাকে, আর অপচয়কারীরা আল্লাহর অনুগ্রহ হাতছাড়া করে। অপচয় ও অপব্যয় সমাজে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকটতর করে।

ইসলাম মানুষকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলার উপদেশ দেয় এবং ঐশী অনুগ্রহের ব্যাপারে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন ও সম্পদের সদ্ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। মিতব্যয় সম্পদকে বৃদ্ধি করে এবং অন্যকে সাহায্য করার পথ উন্মুক্ত রাখে। মিতব্যয়ীরা কখনোই নিঃস্ব হয় না। ইতিহাসের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও মনীষীদের জীবন প্রণালী বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব তারা সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন। তারা কখনোই ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়েননি। সম্পদ অপচয় ও অপব্যয় না করে মানুষকে বেশি বেশি দান করে মানুষের অন্তরে জীবিত আছেন। মিতব্যয় হচ্ছে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকু ব্যয় করা ও সম্পদের অপচয় না করা। কৃপণতা হলো, যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু ব্যয় না করা। ইসলামে অপচয় ও অপব্যয়ের মতো কৃপণতাও নিষিদ্ধ। ক্ষুধার্তকে খাদ্যদান, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, অভাবগ্রস্তকে সাহায্য প্রদান, অনাথ-ইয়াতীমদেরকে লালন-পালন, নিঃস্ব ব্যক্তিদের উপার্জনের ব্যবস্থা করা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করাই মুসলমানদের কর্তব্য।

করোনার টিকা নিয়ে বিতর্ক, গুজব ও অনীহা!

হাসান জামান টিপু ॥ সারাবিশ্ব জুড়েই করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। টিকা তৈরীকারক কোন কর্তৃপক্ষই দাবী করেননি টিকাটি ১০০% ভাগ কার্যকর। টিকা এখন বিশ্বজুড়ে মানুষ গ্রহণ করছেন নানান বিতর্কের মধ্যে। বিতর্কগুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ ঘটা করে প্রচার-অপপ্রচার চলছে- বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভ্যাকসিন আসার আগে মানুষের আগ্রহ ছিল। আসার পর সেই আগ্রহে যেন ভাটা পড়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে এক ধরনের অনাস্থা দৃশ্যমান। চলছে বিতর্ক। শুধু বাংলাদেশেই নয়, কমবেশি আস্থাহীনতা ও বিতর্ক চলছে প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশে। ভ্যাকসিন নিয়ে অনাস্থা কেন? মূল কারণ কী?

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ভারতে উৎপাদন করছে সেরাম ইনষ্টি টিউট অব ইন্ডিয়া। যার ভারতীয় নাম ‘কোভিশিল্ড’। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে সেই ভ্যাকসিনই কিনেছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে যে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন বাংলাদেশ উপহার হিসেবে পেয়েছে, সেটাও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন। এর বাইরে রয়টার্সের একটি সংবাদ নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে যে, ভারত তাদের প্রতিষ্ঠান ‘ভারত বায়োটেক’ উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে করতে চায়। বায়োটেকের সেই ভ্যাকসিনের নাম ‘কোভ্যাক্সিন’। কিন্তু, সেটি বাংলাদেশে  ট্রায়াল নিয়ে এখনো কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারত থেকে বাংলাদেশ উপহার হিসেবেও সেই ভ্যাকসিন পায়নি।

যখন কোন ভ্যাকসিন প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যাযয়র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলে, তখন সেটি অল্পসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের উপর করা হয়। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য থাকে টিকাটি নিরাপদ কি-না এবং কী পরিমাণ ডোজ প্রয়োগ করতে হবে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে এসব ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয় হাজার হাজার মানুষের ওপর। এই পর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা হয় টিকাটি আসলে কতটা কার্যকর। ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচনার মূলে হলো কতকগুলি গুজব।

১. ভ্যাকসিনটি ডিএনএ বদলে দিবে এরকমটি দাবী করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বৈজ্ঞানিকরা এ ধারণা অমূলক বলেছেন। বিবিসি এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল তিনজন স্বতন্ত্র বিজ্ঞানীর কাছে। তারা বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা মানবদেহের ডিএনএ-তে কোন পরিবর্তন ঘটায় না। করোনাভাইরাসের যেসব নতুন টিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে ভাইরাসটির একটি জেনেটিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এটিকে বলা হয় মেসেঞ্জার আরএনএ। ব্রিটেনে সদ্য অনুমোদন করা ফাইজার এবং বায়োএনটেকের টিকাটিও একইভাবে তৈরি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেফরি অ্যালমন্ড বলছেন, ‘একজনের শরীরে যখন ইনজেকশনের মাধ্যমে আরএনএ ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তখন এটি মানবকোষের ডিএনএ-তে কোন প্রভাবই ফেলে না।’

এই টিকা আসলে কাজ করে মানুষের শরীরকে এক ধরনের নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে এমন এক ধরনের প্রোটিন তৈরি হয়, যা করোনাভাইরাসের উপরিভাগে থাকে। মানুষের শরীরের যে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এটি তখন এরকম প্রোটিন শনাক্ত করে এবং এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করতে পারে। তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে আরএনএ (এমআরএনএ) ভ্যাকসিন প্রযুক্তি এর আগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি এবং অনুমোদনও করা হয়নি।

এটি সত্য যে, বর্তমান সময়ের আগে এমআরএনএ টিকা কখনও অনুমোদন করা হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে মানুষের শরীরে এমআরএনএ টিকা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এই টিকার পরীক্ষা চালানো হয়েছে হাজার হাজার মানুষের ওপর। অনুমোদনের জন্য এই টিকাকে খুবই কঠোর এক যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং ডিএনএ পরিবর্তন সংক্রান্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২. করোনার টিকা তৈরীতে শুকুরের জেলেটিন ব্যবহার করা হয়েছে এরকম একটি বিতর্ক তৈরী হয়েছে।  বায়োনটেক-ফাইজারের টিকা অনুমোদন দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম করোনা টিকা দেয়া শুরু করে যুক্তরাজ্য। তখনই শুরু হয় এ বিতর্ক। ইসলামের দৃষ্টিতে শূকরের মতো কিছু পশুকে হারাম বা খাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়। কিন্তু টিকা তৈরিতে যে কোলেস্টেরল ব্যবহার হয়েছে তার উৎস নিয়েই বাধে বিপত্তি মুসলিমদের আশঙ্কার জায়গা ছিল এই কোলেস্টেরল শূকরের চর্বি থেকে ব্যবহার না হলেও সঠিকভাবে জবাই না করা অন্য কোনো পশু, যেমন গরুর চর্বি থেকেও তৈরি হতে পারে৷

‘টিকা হারাম’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণার ফলে ব্রিটেনের মুসলিমদের মধ্যে টিকা নেয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়। ফলে বিতর্ক শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ব্রিটিশ ইসলামিক মেডিক্যাল এসোসিয়েশন- বিআইএমএ এই বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বিআইএমএ জানায় এ বিষয়ে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানান, ‘এই টিকা তৈরিতে কোনো পশুজাত দ্রব্য বা কোষ ব্যবহার করা হয়নি।

ব্রিটেনের কয়েকজন মুফতি একটি ফতোয়ায় ‘সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী’ বায়োনটেকের টিকাকে ‘হালাল’ বলে ঘোষণাও দেন, কিন্তু তাতেও থামেনি বিতর্ক।

সৌদি আরবসহ বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রেও এরই মধ্যে বায়োনটেকের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও শুরু হয়েছে এই বিতর্ক। অবশ্য বাংলাদেশে আমদানীকৃত সেরাম ইনষ্টি উটের তৈরী অক্সফোর্ড – আস্ট্রোজেনকার টিকায় এধরনের বিতর্ক আজ পর্যন্ত দেখা দেয়নি।

৩. আরেকটি গুজব হলো মাইক্রো চিপ টিকার মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে যা দ্বারা মানুষের গোপনীয়তা ভঙ্গ হবে। গত মার্চ মাসে যখন বিল গেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শেষ পর্যন্ত আমাদের এক ধরনের ডিজিটাল সার্টিফিকেটের দরকার হবে, তখন এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি বলেছিলেন, করোনাভাইরাস থেকে কে সেরে উঠেছে, কাকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কে এই রোগের টিকা পেয়েছে সেটা জানার জন্যই এই ডিজিটাল সার্টিফিকেটের দরকার হবে। তার সাক্ষাৎকারে তিনি কোন ধরণের মাইক্রোচিপের কথা উল্লেখই করেন নি। কিন্তু এই ঘটনার পর ব্যাপকভাবে শেয়ার করা একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিল গেটস মাইক্রোচিপ ইমপ্লান্ট ব্যবহার করবেন।’ এই প্রতিবেদনে গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থে পরিচালিত একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছিল। গবেষণাটি ছিল এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে, যার মাধ্যমে কাউকে ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেয়ার সময়েই বিশেষ এক কালিতে সেই টিকা দেয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। এই প্রযুক্তি কোন মাইক্রোচিপ নয় এটি বরং অনেকটা একটা অদৃশ্য ট্যাটু বা উল্কির মত। ‘এটি এখনও চালু করা হয়নি এবং এই প্রযুক্তি দিয়ে লোকজনকে ট্র্যাক করা অর্থাৎ তাদের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব নয়। আর কারও কোন ব্যক্তিগত তথ্যও এর মাধ্যমে ডেটাবেজে ঢোকানো হবে না’- বলছেন এই গবেষণার সঙ্গে জড়িত একজন গবেষক আনা জ্যাক লেনেক।

এবারের মহামারিতে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সম্পর্কে আরো বহু ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। বিল গেটস প্রতিষ্ঠিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান মূলত কাজ করে জনস্বাস্থ্য এবং টিকা উদ্ভাবন নিয়ে। একারণেই তিনি এই ধরনের গুজবের টার্গেট হয়েছেন। বাংলাদেশে কতিপয় ধর্মান্ধ মুফতি এ গুজব প্রচার করেন। মানুষ বিশ্বাস কতটা করে তা গবেষণার দাবী রাখে।

৪. টিকাটি ভারতীয় প্রতিষ্টান কর্তৃত প্রস্তুতকৃত। তার মানে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এ টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন। ভারত বিনামূল্যে কুড়িলাখ ডোজ টিকা সর্বপ্রথম বাংলাদেশে পাঠায় । প্রথম পাঠানোর কারণে একটা কথা উঠে বাংলাদেশের মানুষকে গিনিপিগ বানানোর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে। ধারণা দৃঢ় করে ভারত বায়োটেকের একটি আবদার। ভারত বায়োটেক, ভারতীয় টিকা তৈরীতে গবেষণার জন্য বাংলাদেশে সরকারের কাছে  ট্রায়ালের আবেদন জানায়। যা এখনো অনুমোদিত হয়নি। আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা চলে আসে অনেকটা ভারতীয় টিকা জেনারালাইজ করে। মূলত সেরাম ইনষ্টি টিউটে যে টিকা তৈরী করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে যা ভারতীয় সরকার উপহার হিসাবে দিয়েছে ও বেক্সিমকো ফার্মা আমদানি করছে তা অক্সফোর্ডের গবেষণালদ্ধ, সেরাম ইনষ্টি টিউটে এশিয়াতে উৎপাদনের জন্য অনুমোদিত।

আর ভারত বায়োটেক একটা আলাদা ঔষধ কোম্পানি যারা দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ভ্যাকসিন আবিস্কার নিয়ে। ভারতের তামিলনাড়ুর একজন মন্ত্রীসহ সাধারণ প্রচুর মানুষ এ টিকা নিয়েছেন তবুও এব্যাপারে ভারতীয় অনেকেই মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটি তাড়াহুড়ো করছে টিকা তৈরী ও গবেষণার ক্ষেত্রে। সিরাম ইনষ্টি টিউটের প্রধান নির্বাহীর একটা মন্তব্য বিতর্ক ও আশংকাকে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। তিনি সম্প্রতি বলেছেন ‘ভারত বায়োটেকের টিকায় পানি ছাড়া কিছু নাই। ‘এ বক্তব্যটি অবিবেচনাপ্রসুত ও ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে করা।

৫. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটা ভয় কাজ করছে। প্রতিটি ঔষধের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং তা অস্বাভাবিক নয়। শিশুদের টিকা দিলে জ্বর আসে, ছোট বেলায় আমরা যখন বসন্তের টিকা দিতাম তখন শরীর ব্যাথাসহ নানা সমস্যা দেখা দিত। তবুও আমরা টিকা নিয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তা পরিসংখ্যানগত দিক থেকে খুবই নগন্য। মানুষ মারা যাচ্ছে এটা একটা গুজব। কারণ টিকা পরবর্তীদেশসহ ইউরোপে যারা যারাই মারা গেছে বিশ্বব্যাপি তারা সকলেই ষাটোর্ধ। এটা নিশ্চিত করা যায়নি মৃত সকলেই টিকা গ্রহণের ফলে মৃত্যুবরণ করেছেন।

এইসব বিতর্ক ও হারাম হালালের ব্যাপার স্বত্বেও বাংলাদেশে টিকা নেওয়ার অনীহার অন্যতম কারণ টিকাটি ভারতে তৈরী ও ভারত আমাদের উপহার হিসাবে দিয়েছে। স্থুল ও ঠুনকো এই ভারত বিরোধিতা কারণ ভারতীয় চিকিৎসা বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য আমরা ব্যবহার করছি। এই বিরোধিতা অসার প্রমানিত হবে অচীরেই। টিকা নেওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো করোনার মহামারী বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে দেখা দেয়নি তাই ‘করোনা হলে কিছু হয় না’ আর রিকায় করোনা সারবে না এরকম কতকগুলি উন্নাসিকতা কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে অনেক বিতর্ক ও সমস্যা স্বত্বেও ইপিআই কর্মসূচীর আওতায় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম  রোল মডেল। যেহেতু বিশ্বে টিকা একসময় অপরিহার্য হয়ে উঠবে, বিদেশে যেতে, বিমান ও গনপরিবাহন ব্যবহার করতে টিকা আবশ্যক হবে তখন মানুষ ঠিকই এই টিকা গ্রহণ করবে।

সময়ের সাফ কথা….

‘হক’ এর বচন-

‘সাড়ে সাতশো কোটি মানুষের ধর্ম সাড়ে সাতশো কোটি’

নজরুল ইশতিয়াক ॥ যিনি ঘর (ঘোর, ঘেরাটোপ, মায়া, মোহ, সংকীর্ণতা) থেকে বের হয়েছেন কিংবা হতে পেরেছেন, গোটা পৃথিবীই তার দরবার, তীর্থভূমি, এবাদতের স্থান। সূফী সাধনপীঠে দরবার হলো সেই তীর্থ, সেই পাঠাগার, সেই দর্শন কেন্দ্র যেখানে আত্মদর্শনের অভূতপূর্ব পরিবেশ বিরাজ করে। দরবারে এসেই নিজেকে দর্শন করে নিতে হয়। আসতে হয় আশেক হয়ে। তখন ধরা পড়ে জীবন সত্য। পিছনের সত্য দেখা হয়। ফলে দেখা হয় পরকাল, বারবার মৃত্যু, বারবার জন্মের সত্য। গোটা পৃথিবীই একটা দরবার। ভিতরে বাইরে সব একাকার হয়ে যায় ভক্ত রূপি সত্য পথযাত্রীর। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদেও উপর বর্ষিত) বলেছেন- গোটা পৃথিবীর জমিনই মুমিনের মসজিদ। এই যে ঘর কিংবা ঘোর, ঘেরাটোপে আবদ্ধ জীবন, সেটিই তো অন্ধকার। নানান সংস্কারাবদ্ধ। আবদ্ধ জীবনের কোন খুঁটি নেই, আছে মায়া-মোহ সংকীর্ণতার সুক্ষ্ণ জাল।  সীমাহীন পরনির্ভরশীলতা, সংঘাত-সংঘর্ষ। মায়ার পাহাড় উচু হতে হতে চারদিক দিয়ে ঢেকে ফেলে। বাইরের অবারিত আকাশ, আলো দৃষ্টান্ত, নির্দশন কোন কিছুই আর দেখা হয়ে উঠে না। বিচ্ছিন্নতা বাড়ে, বাড়ে রোগ, জীবনের মহাযাত্রা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বদ্ধ ডোবার জল যেমন পচে যায় ঠিক তেমন। কিন্তু তবুও পরম প্রকৃতি তার আপন ইচ্ছায় সজল বরষার জল হয়ে আসে সিক্ত করে ডোবার বদ্ধ জলকে। সাময়িক সেই জলধারা আলোড়িত হয়, নব জোয়ারে । কিন্তু ডোবার জল কখনোই আপন ইচ্ছায় নিজেকে সেই বন্দি দশা থেকে মুক্ত করতে পারে না। কেবল দৈন্যতা নিয়ে অপেক্ষা করতে পারে। আত্মসমর্পণ করতে পারে। ইচ্ছেময়ীর ইচ্ছের কাছে সমর্পণই মুসলিম হওয়া। মুসলিমের ধর্ম শান্তি। এখন নামে মুসলিম তো শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি শ্বাশত রুট। যা অনাদীরও আদি থেকে সনাতন হয়ে প্রবাহমান হয়ে রয়েছে।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর অমৃত কথা-  “সংস্কারমুক্ত হয়ে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার পথে পা বাড়াও, তুমি তোমার আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হবে না।” এই যে সংস্কার, সংস্কার কেবল শব্দ নয়, সংস্কার এক একটি জাল বন্ধন ঘেরাটোপ। জাত, পাত, বংশ মর্যাদা, পদ-পদবী, অর্থ, ট্যাগ, শিক্ষার অহংকার। কর্তৃত্ব, আধিপত্য, জবর দখল, পাণ্ডিত্য সবই হয়ে উঠতে পারে সংস্কারের ঘেরাটোপ। লোকের কথায় চলা, উঠা, বসা সবই সংস্কার। মনগড়া সব কাজ এক একটা সংস্কার। সূরা বাকারায় মনগড়া কাজকে তুলনা করা হয়েছে ছাইয়ের সাথে। যা একটা ছোট ঝড়ে উড়ে যাবে। লালন ফকির তুলনা করেছেন – অসময়ে কৃষি করার সাথে। যার কোন সুফল নেই। মিছামিছি খাটুনী। সাধনার নামে, পীরতন্ত্র, সূফীবাদ, ওহাবীবাদ, সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত বাজারের পণ্য হয়ে উঠেছে কোথাও কোথাও। বাউল সাধনা, গবেষণার নামেও বহু সেলসম্যান জুটেছে হাল আমলে।  সুফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর  অমৃত কথা- “চোখ থাকবে অন্ধ, কান থাকতে কালা, মুখ থাকতে বোবা হয়ে যে আল্লাহর হুকুম পালন করে সেই  সর্বোত্তম”। বানীটিতে মহান সাধক সব ধরনের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে চলার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষ মূলত বহু মিশ্রণ ও প্রভাব দ্বারা আচ্ছন্ন একটি জীর্ন বস্তু। বিশ্বাসঘাতক তার চোখে, কানে, হৃদয়ে, রিপু ও রিপু প্রভাবিত ইন্দ্রিয়জাত। কেবলই আত্মদর্শন, আত্ম-উপলব্ধির সত্যকে ধরেই যিনি পথ চলতে পারেন প্রভাবমুক্ত হয়ে, তিনিই পারবেন। সৎ সঙ্গ, সৎ স্বভাবে আমি ও আমরা এই দৃষ্টি ভঙ্গিই হলো সংস্কার মুক্ত হয়ে চলা। সব সাধনপীঠ একটি সম সমাজ। মনগড়া কারসাজি নয়, নয় গালগল্প খেলা খেলা। আর ধর্ম কারো বাপের নয়, কোন গোষ্ঠী গোত্রের পণ্য নয়। এটি অবারিত ফসলের মাঠ। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন -‘সাড়ে সাতশো কোটি মানুষের ধর্ম সাড়ে সাতশো কোটি।’  

অনুরাগের মালায় জোড়ানো থাকে দেশ

সত্যদর্শী ॥ দেশ ধারণা সৃষ্টি না হলে ধর্ম, কর্ম, সচেতনতা কোন কিছুই জাগে না। দেশ কি, কিভাবে দেশ জড়িয়ে রয়েছে প্রতিটি বুননে, অপরূপ কারুকার্য হয়ে, সেটা জানতে হয় সবার আগে। স্থুল ভালোবাসা মহত মহীয়ান হয়ে উঠে দেশপ্রেমের বৃহত্তর পরিসরে এসে। তীব্র অনুরাগ সৃষ্টি হয়। আর তাই তো দেশের জন্য মানুষ অকাতরে জীবন ত্যাগ করতে কুণ্ঠিত হয়না। সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে যেমন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়, তেমনি দেশের সামনে সামনে দাঁড়িয়ে একজন দেশপ্রেমিক নিজেকে গভীর কৃতজ্ঞতা বোধে পায়।

জন্মভূমিকে ভালবেসে কোন দিন হৃদয়ের অনুরাগ শেষ হয় না। এখানে আকাশ যেন মায়ের দু’চোখ সারাদিন মেলে রাখে সোনার আলোক। গল্পের শেষ আছে, যেতে যেতে নদীও সাগরে গিয়ে মেশে তবু হৃদয়ের অনুরাগ শেষ হবে না জন্মভূমিকে ভালোবেসে। কথাটি গীতিকার আবু জাফরের।

এই যে দেশ মাতৃকার প্রতি তীব্র অনুরাগ তা কি কখনো ফিকে হতে পারে কোন দূরদর্শী দেশপ্রেমিকের কাছে। কোন নেতা কিংবা প্রজাতন্ত্রের সেবকের? শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট মহান শিক্ষক কিংবা সমাজসেবার ব্রতচারীরা কি কোন দিন দেশের প্রতি  দায়িত্ব বোধ কে উপেক্ষা করতে পারেন? পারেন না, পারবেন না।

তবু স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে অনিয়ম, অবিচারের শক্ত দেয়াল তুলে আজও গুটিকয়েক লোক দেশকেই ধ্বংস করছেন। এরা শিক্ষিত, চেহারা স্মার্ট, গুছিয়ে কথা বলে, সব বিষয়ে পারদর্শী। এদের অনেকে নামাজ পড়তে পড়তে কপালে দাগ ফেলেছেন, কেউ কেউ বহুবার হজ ওমরাহ সেরেছেন, বহু তথ্য ছবকে পারদর্শী। বেগমপাড়ার নাম তো আমরা শুনেছে কিন্তু নামে বেনামে কত বেগমপাড়া, কত অন্দরমহলের সত্য গল্প তো আমাদের অজানা। প্রাসাদের নিচে যেমন  চাপা পড়ে আছে শোষণের শত সহস্র জাল, তেমনি দূর্গ সমেত চৌহদ্দির ঘোর অন্ধকারে বন্দি হয়ে আছে শোষণের লাল নীল ফাইল।

আজ যখন আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী কিংবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শত বার্ষিকী উদযাপন করছি, যারা এই উদযাপন করছেন বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায়, তাদের মধ্যেই তো কত বর্ণচোরা প্রতারক রয়েছে। যারা এই পবিত্র স্বাধীনতা, অঙ্গীকার ভূলুণ্ঠিত করেছেন পদে পদে। কত রথী মহারথীদের ভিড় চোখে পড়ে যারা বিশ্বাসঘাতক। এই তো সেদিন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সত্য বলার লোক খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এই সত্য ভুলে গেলে চলবে না। এটা ভাবার কারণ নেই যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ, সেই দুঃসহ সত্য থেকে বহুদূরে। ভাববার কারণ নেই একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছে। সবাই দেশপ্রেমিক হয়ে গেছেন। বরং লুটেরারা সাময়িক ভোল পাল্টে স্রোতে গা ভাসিয়েছে।

সত্যিকারের দেশপ্রেমিক বাঙালিরা তো দেশের শক্তি, অতন্দ্র প্রহরী। দেশ শান্তি সত্য প্রশ্নে কোন আপোষ করে না। বঙ্গবন্ধু কিংবা বাংলাদেশের শক্তি তো বাঙালির শক্তি। একটা প্রকৃষ্ট বাঙালি গতি শত বাঁধার পরও টিকে রয়েছে। বাঙালির মাথাটি ঘাতকেরা হয়তো খুঁজে পেয়েও কর্তন করতে পারেনি। সুন্দর বনের সুন্দরী গাছের মতো আবার গজিয়ে উঠেছে।  আর বিপরীত প্রচেষ্টা তো প্লাষ্টি কের ফুলের মতো, কোন সৌরভ সৌন্দর্য নেই। ধর্মের নামে মুখস্থ গাল গল্পের হুংকার দিয়েও রুখে দিতে পারেনি বাঙালির ধারাকে।

বাঙালিরা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা বাঙালি। ৭১ এর ঘাতকরা যেমন কল্পনা করতে পারেনি, এদেশে তাদের কৃতকর্মের বিচার হবে। তেমনি ৭৫ এর ঘাতকরাও সীমাহীন উদ্ধত্যের মহড়া দেখালেও রক্ষা পায়নি। কেন পায়নি সেটিই উপলব্ধি করতে হবে। যত দ্রুত উপলব্ধি ততই মঙ্গল।