প্রথম পাতা

সিরাতুল মুস্তাকিমই পাথেয় হোক

‘প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক, আল্লাহরই প্রাপ্য, যিনি দয়াময়, পরম দয়ালু, কর্মফল দিবসের মালিক। আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। আমাদিগকে সরল পথ দেখাও, তাঁদের পথ, যাঁদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ, যাদের প্রতি অভিসম্পাত দেওয়া হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট নয় তাদের পথে নয়।’- আল কুরআন-সুরা ফাতেহা, আয়াত ১-৭।

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ ॥ ধর্মের নামে যারা রাজনীতি করে ক্ষমতায় যেতে চায়, সাম্রাজ্যবাদ আর রাজা-বাদশাহদের মদদপুষ্ট হয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করে ব্যক্তিগতভাবে বিপুল আর্থিক সম্পদের মালিক হয়ে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারে লিপ্ত থাকেন তারা ধর্মজীবি। ধর্মকে তারা জীবন নির্বাহের হাতিয়ার এবং উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। ব্যক্তিজীবনে তারা ধর্মের অনুশাসন কতটুকু মেনে চলেন তা সচেতন মানুষেরা যথার্থভাবেই অনুধাবন বা উপলব্ধি করতে পারেন। মানুষের ভালোমন্দ, পাপ-পূণ্যের বিচারের ভার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার যা পবিত্র কুরআনে বহুভাবে বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে তাদেরকে কখনই কোনো উচ্চ-বাচ্চ করতে দেখা যায় না।

ধর্মজীবীরা বিশেষ করে শান্তির ধর্ম ইসলামকে পুঁজি করে তারা নিজেদের ব্যক্তি ও কায়েমী স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে তারা কতটুকু অমানবিক ও নৃশংস হতে পারে তা যুগে যুগে, কালে কালে দেখা গেছে। এখনও দেখা যাচ্ছে ইসলাম ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করতে গিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ সমাজে বিভ্রান্তি ও অশান্তির সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ফেসবুক-টুইটার-ম্যাসেঞ্জারসহ তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রসার তাদের সেই অপচেষ্টাকে আরও বেশি বেশি করে ইন্ধন যোগাতে সহায়ক হয়ে উঠেছে। ধর্মজীবীদের এইসব অপচেষ্টার সাথে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সিরাতুল মুস্তাকিম (সহজ সরল পথ) কতটুকু সম্পর্কিত বা সাংঘর্ষিক তা আজ নতুন করে খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। কুরআনের প্রথম সুরা যাকে ‘কুরআনের জননী’ (উম্মুল কুরআন) বলা হয়েছে সেই সূরার তাৎপর্য, মাহাত্ম্য বর্ণনা করে ওয়াজ বা মিলাদ মাহফিল কদাচিৎ চোখে পড়ে, অথবা পড়েই না। অথচ বড় বড় ওয়াজ মাহফিলে অন্য ধর্ম, অন্য ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কোনো বিষয় নিয়ে উগ্র বা চড়া ভাষায় কথা বলা এখনকার অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নিত্যনৈমত্তিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। যেকোনো ভালো বিষয় যখনই ব্যক্তি স্বার্থ ও  গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার হয়ে উঠে তখনইতো ভয়াবহ অশান্তি ও অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যা এই দেশ তথা বিশ্ববাসী সব সময়ই দেখে আসছে। 

ধর্মের, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে শান্তি। যে সমাজে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি সেখানে  অন্য ধর্মাবলম্বীদের জীবন-যাপন-বসবাসসহ তাদের সার্বিক নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব মুসলমানদের ওপরই বর্তায়। ইসলাম শান্তি ও সাম্যের ধর্ম-এই কথাটি হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই আরব দেশ থেকে আগত সূফী সাধক-আউলিয়া-দরবেশগণের আস্তানা-দরবার-মাজার-রওজা শরীফগুলো সর্ব-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষদের কাছে ছিল শান্তির জায়গা। এদেশের প্রাকৃতিক অবস্থা-জলবায়ু-আবহাওয়া-হাওড়-বাওর অঞ্চলে বসবাসরত মানুষেরাও প্রকৃতিগতভাবে ছিল শান্তি ধর্মের অনুসারী, একেশ্বরবাদী। সূফী-দরবেশ-আউলিয়াগণের প্রচারিত ধর্মমত ও জীবন-যাপনের সাথে একাত্ততা ঘোষণা করতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। বরং এদেশের মানুষেরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল যার প্রধান কারণই ছিল এ ধর্মে কোনো বর্ণবাদ বা বর্ণপ্রথা-দাসপ্রথা নেই, সবাই সমান। ধর্মের নামে কোনো জোরজবরদস্তি ইসলাম ধর্মে নেই। এমনকি ভারত উপহাদেশে দিল্লিকে কেন্দ্র করে যখন মুসলমান সম্রাট-বাদশাহীতন্ত্র কায়েম তখন তারাও কাউকে জোর করে ধর্মান্তরিত করার  চেষ্টা করেননি। চেষ্টা করলে এ অঞ্চলে আজ হয়ত মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষ পাওয়া যেতো না। যদিও ক্ষমতার মসনদ নিয়ে দিল্লীকেন্দ্রিক মুসলমান সম্রাটদের মধ্যেকার হানাহানি-সংঘাতের ঘটনাও কম ছিল না।  ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং তারপর ১৮৫৭ সাল থেকে  সরাসরি  ব্রিটিশ রাজত্ব কায়েম হওয়ার আগে এই উপমহাদেশে  সাম্প্রদায়িক হানাহানির কোনো ঘটনা ইতিহাসে নেই বললেই চলে। আর ব্রিটিশরা ক্ষমতা গ্রহণের পর এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বের সাথে সাথে এখানে সংঘটিত হয় দুইটি মহাদুর্ভিক্ষ-একটি ১৭৫৭ সালের পর পর, অপরটি ১৯৪৬ সালে যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনাহারে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। এই দুই মহাদুর্ভিক্ষ (মন্বন্তর) যে ব্রিটিশদের কারণে সংঘটিত হয়েছিল ধর্মজীবীরা কখনও তা প্রচার করতে চায় না। এর কারণ ও অস্পষ্ট নয়-ব্রিটিশরা এদেশের ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের মত করে ইসলাম ধর্ম ও কুরআনের ব্যাখ্যাদানের জন্য এদেশে কলকাতা ও ঢাকাসহ সর্বত্র অসংখ্য মাদ্রাসা তৈরি করে এবং এইসব থেকে ডিগ্রিধারী মৌলভীরা চিরদিনই ব্রিটিশদের পক্ষ অবলম্বন করতে গিয়ে মানুষকে সহজ-সরল পথে আহবান করতে পারেননি। এভাবে ধর্ম রাজনীতি ও ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে যতটুকু ব্যবহৃত, সমাজে শান্তি, স্বস্তি ও মঙ্গলের বার্তা প্রচারে ততটুকুই অব্যবহৃত।

অপরদিকে, ‘দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ধায়’- প্রচলিত এই কথাটি তথ্য প্রযুক্তির বিপুল প্রসারের বর্তমান সময়ে গুজব আর মিথ্যাচার মানুষের কাছে যত দ্রুত পৌঁছে, ভালো কথা, সদুপদেশ তত সহজে পৌঁছে না। ফলে গুজব আর মিথ্যাচারটাই এখন সমাজের শান্তি শৃঙ্খলার পথে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা মানুষকে আরও বেশি অস্বস্তিকর ও অশান্তির মধ্যে ফেলে দিতে পারে বলে সচেতন মহলের আশঙ্কা। কুরআন নির্দেশিত সহজ-সরল পথ অবলম্বনই কেবল মানুষকে শান্তি দিতে পারে। পৃথিবীতে যত নবী-রাসুল-আউলিয়া-দরবেশ এবং বাংলার সাধককুল এসেছেন তারা সারাজীবন সাধনা করে, জীবন-যৌবনকে মানবতার মহান ব্রতে নিয়োজিত করে এই সত্যটিই তুলে ধরেছেন যে,  ‘যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সেই তার প্রভুকেও পেয়েছে। অর্থাৎ, ‘নিজেকে জানো’। নিজেকে না জানলে সিরাতুল-মুস্তাকিম-সহজ-সরল পথের সন্ধ্যান কখনও সম্ভব হয় না। এই সরল পথ পাওয়ার জন্য যে কঠিন অথচ সহজ সংগ্রামটি জীবনভর করতে হয় তা যেন অর্জন করতে পারি সেজন্য মহান সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর ‘ নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’-এই বাণী আমাদের জীবন চলার পথের পাথেয় হোক।

বাংলার জল-জমিনে খেয়ে কোথায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ?


নজরুল ইশতিয়াক ॥ মুখটা আপনার, চোখটা আপনার, জিহবাও আপনারই। তাহলে এই যে চোখ, মুখ, কান, জিহবা আপনার থাকার পরও সেগুলো দিয়ে কি দেখছেন, কি করছেন, কি বলছেন, কোন কাজে ব্যবহার করছেন, সেটা জানাও আপনার দায়িত্ব। আপনার মুখ দিয়ে কি আপনার কথা বের হচ্ছে, নাকি অন্যের কথায় শ্লোগান ধরছেন, অন্যের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছেন? আপনি আমি কি অন্য কারো পরামর্শ অনুযায়ী সব করছি ? কোন বাছবিচার না করেই? পূর্ব ধারণা তৈরী করে ফেলছি সম্পর্ক কিংবা বহুবিধ পরিচয়ের ক্ষেত্রে? ধর্ম চিন্তা, জীবন চিন্তার সবটুকু কি আরোপিত, প্রচলিত কথায়, বলায় গড়ে উঠছে? এগুলো ভেবে দেখার উপরই নির্ভর করে ব্যক্তির সচেতনতা- বোধ- ঈমান। ঈমান হলো ইপসিত মান নির্ধারক।

কোথায় আপনার আমার জীবন বোধ চিন্তা। এসবই সবার আগে অন্বেষণ করতে হয়। এটিই হলো জীবন উপলব্ধির শিক্ষা,  এভাবেই দীক্ষায় রূপান্তরিত হয় বোধ। সত্যিকার দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি গড়ে উঠে। দেহ আছে বলে জীবন আছে। দেহ কাঠামো হলো সৃষ্টির গভীর মাহাত্ম্য। দেহ বাদ দিয়ে সৃষ্টিকে ধরা সম্ভব নয়। দেহের প্রতিক্রিয়া হয় বলে সুখ দুঃখ, অনুভূতি বুঝা যায়। দেহ একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র। বাউল ও সূফী সাধনায় দেহ হলো সত্যের আধার। দেহের ঘরে, ভাঁজে ভাঁজে এই যে যন্ত্রগুলো বসানো রয়েছে, এগুলো মান নির্ধারক। লালন ফকিরের বিভিন্ন পদে – দেহ খাঁচা, অচিন পাখি, জীবনের বেলা কিংবা ক্ষণ কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেহ ধরেই সত্য উপলব্ধির সাধনা।  ছয় রিপু ও দশ ইন্দ্রীয়কে চেনার মাধ্যমে নিজেকে চেনার নাম সাধনা সত্য। সেই দেহ কেমন আছে, কোন কাজে লিপ্ত এই জীবনে? আপনি আমি কি দেহে বসানো এসব যন্ত্র, প্রদীপগুলোকে অস্বীকার উপেক্ষা করেই সবকিছু করছি? অনেকেই করছেন সেটা বলা যায় অবধারিত ভাবেই। করছেন বলেই অন্যের কথায়, দেখায়, বলায়, কখনো কপি পেষ্ট  জীবন, কখনো বা স্রোতে গা ভাসানো জীবন যাপন করছেন। যাকে হুবহু নকল করছেন জেনে না জেনে, আপনিও ক্রমাগত তা ই হয়ে উঠছেন। তবু যদি আদর্শিক লোকের পিছনে চললে কিছুটা রক্ষা হয়। সচেতন হয়ে উঠার একটা সুযোগ মেলে। তারপরও পরিপূর্ণ সচেতন হয়ে উঠা নির্ভর করে ব্যক্তির উপলব্ধির উপর। চূড়ান্ত বিচার উপলব্ধি ব্যক্তির নিজস্ব যোগ্যতা থেকে ঘটে।

“যারা না দেখে বিশ্বাস করে এবং প্রাপ্ত রিজিক থেকে ব্যয় করে” (সূরা বাকারা)। এই যে না দেখে বিশ্বাস করাকে ঈমানের মৌল ভিত্তি বলা হয়েছে, তা কি উপলব্ধি হয়? আমাদের নিজের জীবনই তো অদেখা-অজানা; এই যে অদেখা জীবন, যা দেখা হয়নি, দেখতে হয় ক্রমাগত, সেটির নামই ঈমান। নিজ জীবনকে দেখার প্রচেষ্টা থেকেই তো এই সত্য যাত্রা। আমরা আমাদের জীবনকে দেখবো সত্য হিসেবে এটিই হলো এবাদত। এখন যারা মুখস্থ কথায়, জোর করে শাস্ত্র কিতাব ফতোয়ার মাধ্যমে সত্য ধর্ম কে দেখাতে চাচ্ছেন জোর করে, এরা সবাই অজ্ঞলোক। কানার হাটবাজারের উদভ্রান্ত লোক। এরাই মানবতার শত্রু। আমরা নিজ নিজ জীবনকে দেখিনি, দেখার পথেই রয়েছি। এটিই ঈমানের ভিত্তি। এখানেই জীবনের রূপান্তর।

কোরআন শব্দটির মানেই বারবার পাঠ করা। কিন্তু অক্ষর না চিনলে যেমন পাঠ করা যায় না, তেমনি দেহ ও চিন্তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ না করা গেলে সত্য উপলব্ধি করা যায় না। সেই দেহের সন্ধান জানার নাম এবাদত। তখনই কেবল জীবনের আবরনগুলো তুলে ফেলা যাবে, দূরত্ব মোচন হবে। চিন্তার উপাদানগুলো তো দেহের বহুমাত্রিক শক্তির বলয়। দেহ শক্তি দ্বারা পরিচালিত। মানুষ তার চিন্তার সমান।

লালন ফকির বলেছেন- বসতবাড়ীর ঝগড়া কেজো আমার তো কই মিটলো না/ কার গোয়ালে কে ধুয়ো দেয় সব দেখি তানানানা”। এই বসতবাড়ী হলো দেহ। সেই দেহ গোলাযোগ পূর্ণ চিন্তার অপরিনামে। দেহরাজ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির সত্য আরাধ্য সত্য। অনাদীরও আদি, চলমান বহমান সত্যরূপ অধর। যা সদা বর্তমান। বর্তমানকে ধরলে সব এসে মেশে এই জীবনেই। পরম গতিশীলতায় অতীত ভবিষ্যৎ বলে কিছু থাকে না। ফলে দেহ স্বরূপে  সন্ধান পেলে অধর রূপ দর্শন হয়। কেউ তা করে দিতে পারে না। কারো কথায় তা হবে না।  কোরআন শরীফ দেহকে প্রদীপ স্বরূপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। প্রদীপের আলোয় নিজকে দেখা, নিজকে দেখেই সত্যকে পাওয়া। সাধনাপীঠে গুরু হলো  অখন্ড প্রদীপ স্বরূপ। সেই প্রদীপে খন্ড রূপ সাধারণ মানুষ অখন্ড রূপের সন্ধান পায়।

বর্তমান সমাজে ধর্ম নিয়ে এই যে এত সব মনগড়া ফতোয়া তাতো জীবনসত্যকে উপলব্ধি করতে না পারার ফল। এই যে এত দৌড়াদৌড়ি, ধর্মের নামে উন্মাদনা সবই বৃথা জঞ্জাল। এই যে মুখস্থ গালগল্প, বর্বরতা, ধর্মের নামে আগুনে পুড়িয়ে মারা সবই মহা অপরাধ।

দেহ ও চিন্তার সত্য যারা জানে না, পরিবর্তনকে যারা ধরতে পারে না, যাদের অন্তকরণ জরাজীর্ণ; তারাই বিপথগামী। তারাই মহাকালের কাছে শাস্তিযোগ্য মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ফলে শ্লোগান ধরার আগে, কারো গান গাওয়ার আগে, কারো কথায় জিগির তোলার আগে “এই বেলা তোর দেহের খবর জেনে নে রে মন”- সাঁইজী’র এই বাণীটি উপলব্ধি করা জরুরী। লালন ফকির আরো বলেছেন- ‘বুঝবি যদি ফারসি নাগড়ী/ বাংলা নেওগে পাশ করে’। বাংলায় বসে, বাংলার জল জমিন খাদ্য খেয়ে সবার আগে বাংলা- বাঙালিকে চিনতে হবে। ৫ হাজারের বছর বাঙালি সংস্কৃতিকে জানতে হবে। ফলে জীবন নামক এই প্রাপ্তি, সেই প্রাপ্তির সৌন্দর্য অন্বেষণ জরুরি। নিজের বিচার নিজে করেই তা জানতে হবে। মওলানা! আল্লামা! হুজুর, শায়েখ, হাফেজ ক্বারি সাহেবদের  কথা অকপটে মেনে চলবো? আর কত গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলা। জহুরী যাচাই করেই সোনা কেনে। জীবন ও জগতের সত্য অন্বেষন করতে চাইলে পরখ করেই সব করতে হবে।

ভূমি রাজনীতির স্বার্থে কুটনীতি!


সৈয়দ এ ফয়সাল ॥ সম্প্রতি জাতিসংঘে রোহিংগা ইস্যুতে ভোটাভুটি হয় যেখানে চীন না ভোট দেয় আর ভারত ভোট দানে বিরত থাকে। কেন রোহিংগা ইস্যুতে চীন ভারত বাংলাদেশকে সাপোর্ট দিচ্ছেনা যেখানে ভারত এবং চীন উভয় দেশকেই বাংলাদেশের বন্ধুদেশ মনে করা হয়! এর কারণ ইনভেস্টিগেট করলে ভূ-রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপার বেড়িয়ে আসবে। এখানে চীনের মানচিত্র ওয়ালা চিত্রটি খেয়াল করলেই চীন কেন বারবার মিয়ানমারকে সাপোর্ট দিচ্ছে তার আসল কারণ জানতে পারবেন। চিত্রটি খেয়াল করলে দেখা যায় যে চীনের ভুমি সংলগ্ন যে সাগর অবস্থিত তার নাম দক্ষিণ চীন সাগর। সেখান থেকে ভারত মহাসাগরে আসতে হলে নীল রং চিহ্নিত রাস্তা ধরে চীনকে আসতে হবে এবং আসার সময় মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ার মাঝে অবস্থিত সরু মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করতে হবে।

একটা বিষয় জানা দরকার দক্ষিণ চীন সাগরের তীরে অবস্থিত জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া  প্রত্যেকেই আমেরিকার মিত্র। অপরদিকে কোন কারণে যদি চীনের সাথে আমেরিকার প্রবলেম হয় এবং তার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা যদি মালাক্কা প্রণালী অফ করে দেয় তাহলে চীনের পক্ষে আর ভারত মহাসাগরে আসা পসিবল হবে না যা তাদেরকে বেশ বিপদে ফেলবে। এই রকম পরিস্থিতিতে চীনের সামনে অপশন দুইটা। সেটা হল মিয়ানমার হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করা অথবা পাকিস্তান হয়ে ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করা। সেজন্য দেখবেন যে ভারতের বিপক্ষে যে কোন ব্যাপারে চীন সবসময় পাকিস্তানকে ব্যাক আপ দেয় অথচ চীনের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশী। ঠিক একই নীতি অনুযায়ী 

চীন সবসময় মিয়ানমারকে ব্যাক আপ দেয়। অপরদিকে ভারতের বাংলাদেশকে ভোট না দেবার কারণ হল ভারতের ভুমির এক অংশ বাংলাদেশের পুর্বপাশে অপর অংশ বাংলাদেশের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে হলে সরু চিকেন নেক অতিক্রম করতে হয়। কোন কারণে চীকেন নেক অফ হয়ে গেলে বাংলাদেশের ভুমি ব্যবহার করে ভারতের সেভেন সিস্টারস রাজ্যে যাবার কোন বিকল্প ভারতের হাতে থাকবে না। সেটাও ডিপেন্ড করে যে বাংলাদেশে ভারতের বন্ধু সরকার থাকা বা না থাকার উপর। সেজন্য ভারত এর বিকল্প হিসেবে মিয়ানমারে একটা বন্দর নির্মাণ করছে যেন কলকাতা বন্দর থেকে মিয়ানমার হয়ে ভারতের সেভেন সিস্টারস এ প্রবেশ করা যায় এবং এই প্রজেক্টের নাম কালদান প্রজেক্ট। মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ উভয় দেশই এই ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ভারত সবসময় নিউট্রাল থেকেছে। মিয়ানমার অতিমাত্রায় চীনমুখী নীতি থেকে বের হয়ে আসা এবং নীতিতে ব্যালেন্স আনার উদ্দেশ্যে চীনের পাশাপাশি ভারতকেও রাখাইন রাজ্যে বন্দর নির্মানের সুযোগ দিয়েছে পাশাপাশি রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেবার ফলে যেন কেউ ঝামেলা করতে না পারে সেজন্য চীন এবং ভারত দুই শক্তিশালী দেশকেই তারা হাতে রেখেছে। নিজের লক্ষ্যে পথ চলতে সব নিয়েই আগাতে হয়। ‘সুজন-কুজন আর আপনজন, এই নিয়েই জীবন যাপন’। ভু-রাজনৈতিক স্বার্থের সাময়িক ফাঁদ- বাংলাদেশকে সুকৌশলেই সমাধানের পথে আগাতে হবে।

স্মৃতির চয়ন

শেখ বরকত উল্লাহ রানা ॥  জীবন বহু ধারায় প্রবাহিত। ব্যক্তির ইচ্ছা, কর্ম ও একনিষ্ঠতা যে ধারা বা ধারাসমূহে উপনিত সেদিকেই ধাবিত হয়। এ জগতে যারা প্রকৃত মানুষ হওয়া এবং এরও সফলতম পর্যায় সত্যরূপ পাথেয় করে, মানব ও জগতকল্যাণের কঠিন সাধনায় ব্রতী হয়ে, সত্যমানুষ হয়ে নিজ জ্যোতিতে আলোকিত করেন সবাইকে, তাঁরাই পূজনীয় ও আরাধ্য। আমার চরম সৌভাগ্য হয়েছে এরূপ দুইজন সত্যমানুষের সন্নিধ্যে এসে- তাঁদের সাথে চিরস্মরণীয় কিছু মুহুর্ত অতিবাহিত করার। যার কিছু আজ এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

সত্যমানুষ সূফী সাধক আনোয়ারুল হক এমন এক নাম, এমন এক রূপ যাতে মোহিত তাঁর লাখো অনুসারী, ভক্ত ও আশেকান। সেই রূপের ছটা, আপন করে নেয়া হৃদয়স্পর্শী ডাক, ধনী-গরিব নির্বিশেষে রাজকীয় আপ্যায়ন আর নিজের বিশাল সম্পদ পায়ে ঠেলে দিয়ে সাধনার পথে জীবন উৎসর্গ করা সবই এক আশ্চর্য দিব্য শক্তির মানবীয় প্রকাশ। দরবারে যেই আসত তাকেই তিনি পরম স্নেহে কাছে বসিয়ে আপ্যায়ন করতেন। হাসি মুখে জিজ্ঞেস করতেন বাড়ি কোথায়? বাবা-মাসহ আরও সব বৃত্তান্ত প্রথম দেখায় আর তার স্নেহাশিস সম মিষ্টি মধুর ব্যবহার বিমোহিত করত সবাইকে। সবাই তাকে আপনের চেয়েও আপন ভেবে নিজের সব দুঃখ কষ্ট বর্ণনা করত, সাহায্য চাইত। সত্যমানুষও নির্বিশেষে সবাইকে নিজের সব দিয়ে আত্মিক, মানসিক, জাগতিক,আধ্যাত্মিক, শরীয়ত সর্ব প্রকারে সহায়তা করে যেতেন।

আমার বাবার একবার কঠিন অসুখ হলো তিনি কিছুই খেতে পারছিলেন না, সাথে প্রচন্ড বমি। পরীক্ষা করে তার খাদ্যনালিতে পেঁচ খেয়ে এই সমস্যা। ডাক্তারের অভিমত। বয়স হিসেবে এর অপারেশন করা খুব রিস্কি। যথারীতি আমি হুজুরকে (নানা বলে ডাকতাম) বলার পর তিনি বললেন ডাক্তারের বিদ্যা যেখানে শেষ আমার বিদ্যা সেখানে শুরু। তখন আবির্ভাব (সে সময় হুজুরের জন্মদিন বলা হতো) উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল দরবারে। তিনি বললেন ‘নাতি কাজে লাইগা পড়’। অর্থাৎ দরবার অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করার কাজ। শাহ্ আলম মামার সাথে ডিউটি শুরু করলাম। সেই সাথে রাতে অনুষ্ঠানের পোষ্টার লাগানোর কাজ। এভাবে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি একদিন মিরপুর দরবারে এক কাজে পাঠালেন, বললেন শাহ্ সাহেবের সাথে কাজ শেষ করে বাসায় যেয়ে বাবাকে দেখে আসেন। আমি সাহস করে আবার জিজ্ঞেস করলাম আবার কি দরবারে আসব না বাসায় থাকব?  তিনি বললেন “শাহ্ সাহেবকে জিজ্ঞেস কইরেন”?

মিরপুর দরবারে মামা যিনি হুজুরের যোগ্য উত্তরসুরী সত্যমানুষ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর সাথে এর আগেও আমার কয়েকবার দেখা হয়েছিল হুজুরের পাঠানোর সুবাদে অথবা সংলাপের অনুষ্ঠানে। মিরপুর দরবারে যাবার পর মামার সামনে বসতেই তিনি বললেন “মামু কাছে এসে বসো তোমার গা থেকে আমার হুজুরের গন্ধ পাচ্ছি”। কাছে গিয়ে বসে আমার ডিউটি শেষ করে মামাকে জিঙ্গেস করলাম- “মামা বাবা তো অসুস্থ এখন হুজুর বললেন ডিউটি শেষ করে বাবাকে দেখে যেতে। এরপর কি দরবারে যাবো না বাসায় থাকবো বলতে তিনি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে বললেন কি করবো”?

মামা বললেন “যেখান থেকে শুরু সেখানেই শেষ”। বাবাকে দেখে কাজ শেষ করে দরবারে যাও হুজুর ছুটি দিলে তারপর বাসায় যাবে। আমি হুকুম মতো বাবাকে দেখে ধানমন্ডি দরবারে ফিরে গেলাম। পরদিন সকালে দরবার রঙ করার কাজ করছি, হঠাৎ হুজুরের খাস কামরায় যাবার ডাক পড়ল। রুমে ঢুকতেই হুজুর বললেন বাসায় ফোন করে বলেন বাবাকে এক/ দুই চামচ সেভেন আপ খাওয়াতে। বাবা অসুখের জন্য মুখে কিছুই খেতে পারতেন না। স্যালাইন চলছিল। তাই একথা বড় ভাইকে বলতেই সে রেগে গেল। আমিও কথা না বাড়িয়ে ফোন রেখে দিলাম। হুজুর অবস্থা বুঝে বললেন “আপনার কচি মামাকে ফোন করেন” যিনি কাজিপাড়ায় থাকতেন এবং যাদের হাত ধরে আমার দরবারে আসা। মামাকে হুজুরের নির্দেশ জানানোর পর তিনি বাসায় যেয়ে বাবাকে দুই চামচ সেভেন আপ খাওয়ান এবং মালিকের কৃপায় পরদিন সকালে বাবার টয়লেট ক্লিয়ার হয়ে এমনিতেই অসুখ ভালো হয়ে যায়।  এভাবে রূপান্তরের আগ পর্যন্ত এ দুই মহামানব সশরীরে অকাতরে সবার দুঃখ, কষ্ট লাঘব করে গেছেন এবং এখনও তাঁদের আশির্বাদ সংযোগ থাকা সবার জন্য নিঃশেষে দান করেছেন। হুজুর মিরপুর দরবারকে বলতেন সারদা বা প্রশিক্ষণের জায়গা। মিরপুরের প্রতি তাঁর ছিল এক অন্যরকম ভালোবাসা। কারণ দরবারে প্রকৃত আদব, আচরণ, শিক্ষা চলত মিরপুর দরবারে। যদিও মামা মিরপুরের কর্মীদের শাসন করতেন কিন্তু তার সবই ছিল সবাইকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার অংশ। নিজের হুজুরকে তিনি অন্তর দিয়ে ধারণ, লালন ও পালন করতেন। যার কারণে তিনি সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর সব ইশারা, ইঙ্গিত, ভাষার মর্মার্থ বা সব কাজের কারণ অনুধাবন করতেন অন্য সবার আগে ও সম্পূর্ণ সঠিকভাবে। হুজুর দিনের মধ্যে অসংখ্যবার তাঁর পরম ভক্ত ও প্রকৃত শিষ্য সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফের নাম নিতেন আর সবাইকে উদাহরণ দিতেন। প্রায় প্রতি রাতেই তিনি  বলতেন “রানাদা শাহ্ সাহেবকে ফোন দেন” এরপর রাতভর চলত গুরু শিষ্যের আলাপ। যার কিছুই আমি বুঝতাম না, শুধু দেখতাম কিভাবে গুরু তাঁর পরম শিষ্যকে স্নেহভরে ডাকছেন। গভীর নিমগ্নতার আদান-প্রদান তাদের ঐশ্বরীয় জ্যোতির্ময়তা।

মাঝে মাঝে ইসলাম কাওয়াল মামা দরবারে থাকলে রাতে হুজুরের রুমে গান হতো। সেই ফোনে মিরপুরের শাহ্ সাহেব মামাকে হুজুর শুনাতেন। এভাবে চলত ফজরের আজান পর্যন্ত। দরবারে থাকাকালীন ডিউটিরত অবস্থায় দিনরাত বলে কিছু থাকত না। সকালে একটু দেরিতে ওঠার সুযোগ হত কিন্তু এরপর শুরু হত দরবারের প্রাত্যহিক কাজ। শত শত লোকের আনাগোনা, সবার আপ্যায়ন, দরবারের রান্না, হুজুরের ডিউটি এসব চলত ফজর  পর্যন্ত। তাই সন্ধ্যা হলে আমরা বলতাম এই সকাল হলো।  মিরপুর থেকে যখনই কোন খাবার বা তাবারুক আসত তার এক আলাদা কদর ছিল হুজুর এর কাছে। তিনি সবাইকে সুন্দর করে তাবারুকগুলো খাওয়াতেন। আনু মামীর হাতের রান্না হুজুরের খুব প্রিয় ছিল তাই সেগুলো আলাদা করে রাখা হতো। আনু মামী বা মিরপুরের তাবারুক এলে তিনি সবাইকে খাইয়ে জিজ্ঞেস করতেন “বলেনতো এটা কোথাকার খাবার”?

বর্তমান সংলাপ পত্রিকা এলে তার পুরোটা পড়ার কাজ প্রায় সময় আমার উপর পড়ত। আমি পড়তাম তিনি মন দিয়ে শুনতেন। সেগুলো বিক্রির কাজও তিনি নিজেই করতেন আর আমাদেরও দিতেন। ২০শে শ্রাবণ হুজুরের মায়ের ওফাত দিবস হিসেবে চাঁন্দপুরে অনুষ্ঠান করা হতো আর সেজন্য ধানমন্ডি দরবার থেকে আমরা আগে চলে যেতাম অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির জন্য। একবার এরকম অনুষ্ঠানের আগে হুজুর আমাকে মিরপুরে পাঠালেন বললেন – “শাহ সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন কিভাবে চাঁন্দপুর দরবার সাজাবেন”। হুজুর বহু বছর ধরে ঘর ছাড়া হলেও মায়ের প্রচন্ড অনুরক্ত ছিলেন এবং প্রায় তাঁর মুখে বড় মায়ের বিভিন্ন গল্প শুনতাম। তাই শ্রাবণের অনুষ্ঠানের প্রতি হুজুরের বিশেষ প্রাধান্য ছিল। যাই হোক, হুকুম অনুযায়ী আমি মিরপুর দরবারের দিকে রওয়ানা হলাম। যাবার পথে চিন্তা করলাম খালি হাতে না গিয়ে মামার জন্য কিছু নিয়ে যাই। কারণ শাহ্ আলম মামা শিখিয়েছিলেন দরবারে খালি হাতে যেতে হয় না। তাই একটা কেক নিয়ে দরবারে গেলাম। গিয়ে খবর দিতেই মামা ডাক দিলেন ভিতরে যেতেন। সে সময় মিরপুর দরবার একতলা ছিল আর আমি যেয়ে মামাকে সামনের বারান্দায় বসা পেলাম। তিনি দুটো গামছা গায়ে বসে ছিলেন একটা লুঙ্গির  মত পড়া, গায়ে আরেকটা ওড়নার মত গলায় দেয়া। আমাকে দেখেই মামা সাথে সাথে বললেন “মামু কাছে এসে বসো। আমার হুজুরের গায়ের গন্ধ নেই”। কেকটা পাশে রাখতেই মামা বাচ্চাদের মত খুশি হয়ে উঠলেন “এই দেখ মামা আমার জন্য কেক নিয়ে আসছে, এইমাত্র তোদের বললাম- আমার কেকের টিন খালি করে রেখেছিস। আর দেখ কেক হাজির।” বলে তিনি নিজেই কেকটা টিনের মধ্যে রাখলেন। এরপর বললেন  “বলো মামা কি ম্যাসেজ নিয়ে আসছো?” মামাকে আসার উদ্দেশ্য বলতেই তিনি বললেন সাজানোর জিনিস কিনতে হবে আর দরবার ও বড় মায়ের রুমটা সাজানোর পরিকল্পনা করো। সাজানোর জিনিস চকবাজার থেকে কিনতে বললেন। তারপর উপস্থিত সবাইকে বললেন চাঁন্দপুরের সাজানোর জন্য এই মামুর কাছে টাকা দিবো। কার কাছে কত আছে, সবাই অল্প করে বের করায় তিনি একটু রাগ করেই একটা ঘটনা বললেন- মামা একদিন অফিস করে ধানমন্ডি দরবারে হাজির হলেন। গিয়ে দেখেন হুজুর সামনের বারান্দায় তাঁর আসনে বসা। মামা সালাম করে সামনে বসতেই হুজুর সামনে বসা সবাইকে উদেশ্য করে বললেন “কিও কার কাছে কত আছে? বার করুইন।” মামা বললেন সবাই পকেট থেকে, মানিব্যাগ থেকে বা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে কিছু কিছু টাকা বের করলেন। হুজুর মামার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতেই মামা সেদিনই পাওয়া বেতনসহ যা ছিল সব বের করে দিলেন। মামা বললেন হুজুর হাসি দিয়ে তাঁকে সাথে সাথে ছুটি দিয়ে দিলেন এমনকি নাস্তাও করালেন না। মামা বলছেন একেতো অফিস থেকে এসেছি কিছু খাইনি তার উপর সব দিয়ে পুরো পকেটে ফাঁকা। পুরো মাস কিভাবে চলবে জানি না। দরবার থেকে বের হয়ে সামনে চেনা দোকান থেকে ভাড়া নিয়ে তিনি চলে আসলেন। এই গল্প শোনার পর উপস্থিত সবাইকে আবারও টাকা বের করে দিলেন। সব মিলে ২২৮০-২৫৮০ টাকা তিনি আমার হাতে দিলেন। এইদিকে অনেক মানুষ ছিল মামা আর আমরা যেখানে বসেছিলাম সেই জায়গায়। গামছা পরা থাকায় মামাকে মশাগুলো কামড় দিচ্ছিল, আমি ছুটি পেয়ে বের হয়ে একটা এরোসল আর কিছু চকলেট কিনে আবারো দরবারের সামনে এসে একজনের হাতে দিয়ে

বললাম মামার বসার জায়গায় স্প্রে করতে আর চকলেটগুলো নাঈমকে দিতে যে মামার দুনিয়াদারি মতে ছেলে। পরে শুনেছি মামা এত খুশি হয়েছিলেন যে পরে এ গল্প তিনি অনেকের সাথে করেছিলেন। কিন্তু এরচেয়েও বড় চমক ছিল আমার জন্য। আমি ধানমন্ডি দরবারে ঢুকে হুজুরের খাসকামরায় যেতেই তিনি খুশি হয়ে আমাকে বসিয়ে এক জায়গা থেকে টাকা বের করতে বললেন। বের করে তার হাতে দিতেই তিনি সেখান থেকে ৫০০ টাকার নোট আমাকে দিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি কিছু নিয়ে খুব সন্তুষ্ট। মজার ব্যাপার হচ্ছে কেক, চকলেট, এরোসল দিয়ে আসার খরচও ঠিকই ৫০০ টাকা হয়েছিল।

বর্তমান সংলাপের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানগুলোতে হুজুর আমাদের পাঠাতেন। বিশেষ করে শাহ আলম মামা ও আমার ওপরই দায়িত্ব বেশি পড়ত। এরকম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান হচ্ছিল শাহবাগ পিজি (বর্তমানে বিএসএমএমইউ)এর মিলনায়তনে। আমরা কয়েকজন শাহ আলম মামার নেতৃত্বে হাজির হলাম। অনুষ্ঠানে মিরপুরের শাহ্ সাহেব মামা একটু উপরের দিকে চেয়ারে বসে ছিলেন। আমরা সামনে যেতেই পাশের চেয়ারে বসতে বলে মঞ্চের দিকে ইশারা করে বললেন “ঐ যে দেখছ মঞ্চে বসা (আমজাদ মামার দিকে ইশারা করে বললেন যিনি এখনও হাক্কানিতে এন্ট্রি হননি) উনাকে আমাদের এখানে আনার চেষ্টায় আছি।” পরবর্তীতে আমজাদ মামাসহ হাক্কানীর একজন নিবেদিত প্রাণ কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। হুজুর প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করতেন “রানাদা মিরপুর যাইবেন?” আমি নিশ্চুপ থাকতাম কারণ তাঁর মায়া, আদর আর দয়ার চাদর ছেড়ে যাবার কথা চিন্তাও করতে পারতাম না। একটু পরে তিনি নিজেই বলতেন “আচ্ছা, যাইবেন নে। সময় হোক।” হুজুরের সাথে সময় অতিবাহিত করা ছিল একই  আনন্দের, শেখার, দেখার, ভয়ের এবং পারপার্শ্বিকতার। মাঝে মাঝে চরম শারীরিক পরিশ্রম সাধ্য। কিন্তু একটা ছোট মিষ্টি ডাক বা আদর করে একটা খাবার মুখে তুলে দেয়ার সাথে সাথে সব কষ্ট নিমিষে দূর হয়ে যেত। হুজুরকে সবচেয়ে স্বাভাবিক মনে হতো একবারে রাতে সবাইকে বিদায় দেয়ার পর। তখন তিনি দরবারে থাকা একজন করে ডাকতেন এবং মন খুলে কথা বলতেন। এ পর্বের যোগে আমি এবং আমার সাথে হুজুরের খাঁস কামরায় যে থাকতো (আমি আশরাফ ভাইকে বেশি পেয়েছি) তাদের সাথে চলত তাঁর আন্তরিক কথাবার্তা। ফজরের আজানের ঠিক আগে তিনি জিজ্ঞেস করতেন “কিও রানাদা আপনাদের কাছে খাবার কি আছে?” তখন আমরা হালকা কিছু খাবার আনলে তা থেকে অল্প একটু মুখে দিয়ে বাকিটা আমাদের খাইয়ে দিতেন। তাঁর জন্য করা আনারের রস কাপে করে আমাদের দু’জনকে দিয়ে বাকি অল্প নিজে মুখে দিয়ে আমাদের নিয়ে বিশ্রামে যেতেন। কিন্তু প্রতি রাতে আমরা ঘুমিয়ে গেলেই তিনি আবার উঠে বসে থাকতেন বা বাইরে যেয়ে পায়চারি করতেন। মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে গেলে এ অবস্থা দেখতাম। হুজুরের মুখে সারাক্ষণ তাঁর গুরু হযরত আবু আলী আক্তার উদ্দীনের বিভিন্ন ঘটনা, গুণকীর্তন লেগেই থাকত। তাঁর সমস্ত নিবেদন যে একমাত্র মালিকের নিমিত্তে এতে যে এক বিন্দু খাদ বা কমতি নেই তা তাঁর প্রতিটি কথায় আচরণে প্রতিমুহুর্তে ফুটে উঠত। তাঁর মালিকের যে কোন ভুল তিনি হতে দিতেন না। আমার ডিউটির শেষে তিনি তাঁর মালিকের মাজার নির্মাণের কাজ করছিলেন আর তার জন্য তাঁর যে পরিমাণ চিন্তা, আন্তরিকতা ও সর্বোপরি পূর্ণ নিবেদন ছিল যা না দেখলে অনুধাবন করাও সম্ভব না। বিশিষ্ট কেউ দরবারে আসলেই তিনি তাঁর মালিকের মাজারের ডিজাইন দেখাতেন আর বর্ণনা করতেন মালিকের বিভিন্ন কর্মকান্ডের। ঠিক একই রকমের আত্মনিবেদন তাঁর মালিকের গুণকীর্তন দেখেছি মিরপুরের মামার মধ্যে। তিনি দশটা কথা বললে দশটাতেই কোন না কোনভাবে তাঁর মালিক সংযুক্ত। গুরু-শিষ্য সম্পর্কের সর্বোৎকৃষ্ট ও আদর্শ বিদ্যমান। যারা সরাসরি হুজুরকে তাঁর মালিকের আর মিরপুরের মামাকে তাঁর মালিক সূফী সাধক আনোয়ারুল হক-এঁর প্রতি পূর্ণ সমর্পণের বাহ্যিক দিকটা অন্তত কিছুটা হলেও প্রত্যক্ষ করেছেন তার অনুধাবনে সক্ষম হবেন। একবার বিশরপাশা থেকে ফেরার পথে মিরপুরের মামা ট্রলারের কার্নিশে বসে আছেন দেখে সাথে সাথে হুজুর আমাদের ট্রলার থেকে বলে উঠলেন – “শাহ সাহেব, শাহ্ সাহেব নিচে সাবধানে বসেন।” শিষ্যের প্রতি গুরুর সুদৃষ্টি এভাবেই বুঝি সর্বদা সদাজাগ্রত থাকে। মামাকে সেই বিশরপাশাতে থাকা দিনগুলোতে দেখেছি হুজুরের পাশের রুমে হুজুরের রুমের দিকে মাথা দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন- যেমন শিশু তার পরম আশ্রয় মায়ের কোলে সবকিছু ভুলে সবচেয়ে আনন্দে ক্লান্তি ভুলে, জগত ভুলে মগ্ন হয়ে যায়, এ যেন ঠিক তেমনি। সেই ডিউটির সময় একদিন হুজুর তিনতলার এক রুমে তাঁর সকালের নাস্তা করতে বসলেন। খাওয়ানোর ডিউটিতে আমি আশরাফ আর মিজান ছিলাম। হুজুর বললেন- “শাহ্ সাহেবকে ডাকেন”। আমি মামাকে ডেকে এনে দু’জনের জন্য প্লেট রেডি করে নাস্তা দিলাম। আয়োজনে ভাত, ইলিশ ভাজি, সবজি আর ডাল। হুজুরকে মাছ দিয়ে মামার প্লেটে মাছ দিতে যাব সাথে সাথে মামা খুব আস্তে বললেন “আমি ৪০ দিন মাছ-মাংস খাচ্ছি না”। সাথে সাথে হুজুর বললেন- “শাহ্ সাহেব সাহেব খাইন, শাহ্ সাহেব খাইন। এর অন্তর ভালো এর হাতে খাইন”। মালিকের হুকুমে মামা খাওয়া শুরু করলেন আর আমিও সুযোগে মামার প্লেটে দু’টুকরো মাছ দিয়ে দিলাম। মামা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন।

দরবারে খুব ছোট বয়সে যাওয়ায় এর গভীরতা, রহস্যময়তা বা আধ্যাত্মিকতার দিকগুলো তখনও সেভাবে চিন্তা করত না। শুধু হুজুরের আদর, অকৃত্রিম ভালোবাসা, “নাতি” ডাক হাসিমুখে কুশল জিজ্ঞাসা আর পরবর্তীতে “রানাদা” ডাকে আবিষ্ঠ ছিলাম পুরো সময়। তাই রাতের পর রাত জেগে থাকা সকাল থেকে ফজর পর্যন্ত একের পর এক কাজ করে যাওয়া বা একটানা দু’তিন রাত না ঘুমানো কিছুই কষ্টের মনে হতো না। শুরুর দিকে হঠাৎ একদিন হুজুর বললেন “নাতি বিছানাটা করলে” অর্থাৎ তার খাস কামরায় বিছানা করার নির্দেশ। আমিও নির্দেশ মতো রুমে হাজির। কিন্তু কেউ দেখানোর নেই কিভাবে বিছানা করব। তাই চারদিকে তাকিয়ে দেখছি কি দিয়ে বিছানা করা যায়। দরবারের সামনের বারান্দায় যেখানে হুজুর পরদিন সেখান থেকে ডানদিকে গেলে সোজা একটা ছোট গেষ্টরুম তার। ডানে খাবার পরিবেশন প্রস্তুতির জায়গা। বামে একটা লম্বা গ্যারেজ। এগুলোর ডানে মহিলাদের বসার রুম আর সোজা গেলে হুজুরের খাস কামরা। তার দরজায় লেখা “জনম জনম তুমি আলোর দিশারী” যা কালা মামার অসাধারণ তুলি আর রং দিয়ে কাঠের দরজার উপর করা আরো ছিল “প্রকাশিত হইও না, ধনবান হও”। যাই হোক সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে প্রথমে অল্প একটু খালি জায়গা আর হুজুরের টয়লেট আর ডানে তাঁর রুম ১৫/১০ ফুট বা ১৮/১০ ফুট পুরো রুমের আয়তন। রুমের দরজায় দাঁড়ালে বামে একটা ড্রেসিং টেবিল এরপর সুন্দর করে সাজানো একটা খাট যার উপরে হুজুরের গায়ে দেয়ার কম্বল, কোলবালিশ আর পড়ার লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা ইস্ত্রি করে সুন্দর করে ভাজ করে রাখা হতো। এ খাটে তিনি কখনো ঘুমাতেন না। সোজা তাকালে একটা স্টিলের আলমারি আর বামে একটা লো-হাইট শোকেস যার মধ্যে কাচের কাপ, পিরিচ, প্লেট ইত্যাদিসহ একটা গণেশ, একটা যিশু খ্রিস্টের আর একটা শিবের ছবি ছিল। শোকেসের উপর উইন্ডো এসি আর একটি আয়না। ড্রেসিং টেবিলে পারফিউমের বোতলগুলো থাকতো আর কডলেস ফোনটা রাখা। আলমারির উপর বিছানা বিছানোর ও গায়ে দেয়ার কম্বল, কাঁথা ভাজ করা। বিছানার মাথার কাছে একটা কাপড়ের আলনার নিচে ১৫১ জোড়া স্যান্ডেল, সু (মোকাসিন) সাজানো। যার অল্প কিছুই তিনি ব্যবহার করতেন। যাই হোক যা বলছিলাম সব দেখার পর নিজের বুদ্ধিতে মোটা কাঁথা নিচে মোটা কার্পেটের উপর বিছিয়ে দু’পাশে খাট থেকে দুটো কোলবালিশ দিলাম আর খাটের নিচ থেকে একটা ছোট কোলবালিশ মাথায় দেয়ার জন্য রেখে দিলাম। বিছানা করে বের হতেই হুজুর জিজ্ঞেস করলেন, “কি নাতি বিছানা করসেন?” আমি জ্বী বলতে তিনি শাহজাদা মামাকে বললেন আমার সাথে রুমে যেতে, যিনি কাছে নিয়মিত করতেন। শাহজাদা মামা তুমি যে বিছানা দেখে হাসলেন আর বললেন, “রানা অনেকটাই ঠিক করস”। আসো তোমাকে শিখিয়ে দেই। সেই প্রথম মামার কাছে শেখা যা বহু বছর ধরে বহু রাত করতে হয়েছিল।

প্রথমে ২.৫ ফুট চওড়া আর ৫ ফুট লম্বা একটা সাদা ম্যাট বিছালো তার উপর দুটো কম্বল লম্বা ভাজে ম্যাটের মাপে দেয়ার পর একটা সাদা মোটা কাঁথা এগুলোর উপর দিয়ে নিচের বিছানা। তার উপর দু’পাশে দুটো  কোলবালিশ মাথায় ছোট কোলবালিশ যা দিনের বেলায় তিনি পিঠে দিতেন। এর উপর গরমের দিনে পাতলা একটা কাঁথা আর

শীতে কম্বল। হুজুরের বিছানা ড্রেসিং টেবিলের পাশ ঘেষে করা হতো আর এর পাশে তাঁর সাথে থাকত (যেমন আমার ডিউটির সময় আমি) আর পায়ের কাছে আরেকজন মাঝে মাঝে থাকত (আমার ডিউটিকালে আমি আর আশরাফ বেশিরভাগ সময় থাকতাম)। হুজুরের রুমে সারাক্ষণ এসি চলত তাই রাতে শোয়ার সময় আমরা বালিশ আর কাঁথা নিয়ে ঢুকতাম। একদিন আশরাফ ভাই বাইরে ঘুমিয়ে পড়ায় আমি একা খাস কামরায় যাওয়ার সময় কোন কাঁথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সবাই যে যার মতো কাঁথা নিয়ে শুয়ে পড়েছে। শেষমেশ যেটা পেলাম সেটা আমার ছোট শরীরের ডাকার মতোও পর্যাপ্ত না। যাই হোক এটি আর একটা বালিশ নিয়ে রুমে যেয়ে দেখি হুজুর শুয়ে পড়েছেন। তাঁর  বিছানা আমি আগেই করে কিচেনে বাসন ধুতে গিয়েছিলাম আশরাফের সাথে। শোবার পর ঠান্ডায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম কারণে ১৬ ডিগ্রীতে দেয়া কাঁথা অর্ধেক শরীর বের হয়ে যাচ্ছিলো। এত ক্লান্ত ছিলাম এর মধ্যেই ঘুমিয়ে গেলাম। হঠাৎ করে আরামদায়ক উষ্ণতা অনুভব  করে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমার হুজুর আমার দিকের পাশ বালিশটা বিছানায় উঠিয়ে তাঁর কম্বল দিয়ে আমাকে ডেকে আমাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছেন। অর্থাৎ আমার ঠান্ডায় কাবু আবস্থা দেখে তিনি তার নিজের কম্বল দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে আবারো ঘুম দিলাম। এক ঘুমে রাত শেষ করে সকালে উঠলাম। দরবারে একজনের কথা আমার ক্ষুদ্র এ প্রচেষ্টায় না তুলে ধরলেই না। তিনি হলেন মহীয়সী নারী হুজুরের দুনিয়াদারীমতে স্ত্রী যাকে তিনি দু’সন্তানসহ সংসারে রেখে মানবকল্যাণে নিজ গুরুর ডাকে সংসার ত্যাগ করেন

এবং দেহত্যাগ করে রূপান্তরের আগ পর্যন্ত নিজ বাড়িমুখী আর হননি। অথচ এ দীর্ঘ সময় এ মহীয়সী নারী যাকে আমি নানি বলে ডাকি পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে তাঁর সারধর্ম পালন করেছেন। দু’সন্তান মানুষ করা শুধু নয় দরবারের প্রত্যেককে তিনি আপন করে নিয়ে নিজ কর্তব্য আজও পালন করে চলেছেন। হুজুর প্রায় সময়ই তার উদ্দেশ্য বলতেন “এই যে তারে সংসারে রাইখা আইলাম কই আইজতো সে বাইরে গেল না” অর্থাৎ তার পূর্ণ নিষ্ঠার  সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তার মুর্শিদের মুখে তিনি পেলেন। আমরা যারা চান্দপুরে যেতাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা হুজুরের রূপান্তরের পর তাঁর মাজার দর্শনে তাঁর সাথে দেখা করতে বা আজও যারা যাচ্ছি সবাইকে তিনি এক আশ্চর্য আদর দিয়ে আগলে রাখেন। সবার প্রতি ওয়াক্তের খাবার নিয়মিত ব্যবস্থা করা, অনুষ্ঠানের সময় শত শত ভক্তবৃন্দের সুষ্ঠু আপ্যায়ন আর যত রাতই হোক জেগে থেকে আমাদের খাইয়ে নিজে খেয়ে সবাইকে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়া, এসবই অনন্য নিষ্ঠার উজ্জ্বল উদাহরণ। সাধককে তিনি নিজের সর্বস্ব দিয়ে প্রতিমুহূর্তে ত্যাগ স্বীকার করে সাধনার পথে অনুকূলতার নিশ্চিন্ত করেছেন নিজ কর্তব্য অবিচলতায়। আজও কিছু কথা ভুলে গেলেও বলে ওঠেন “কি ভাইয়ো কখন আইলা তে, খাইসো ভাইয়ো, তোমার পুত কয়টা?” এ আরেক মায়ার বাধন।

আর যখন তিনি নিজে দৌড়ে বেড়াতেন ঘরময় তখন সব কাজ তার নখদর্পণে। দরবারে, সংসারে কোথায় কি হচ্ছে, কাকে হুজুর পাঠাচ্ছেন কি কাজে, তাদের আপ্যায়ন, থাকার ব্যবস্থা সবকিছু নিজ হাতে করে গেছেন। আমরা দরবার সাজানোর কাজ করার সময় আমাদের ছাড়া কখনও খেতেন না। রাত দুটা-তিনটা যত রাতই হোক কাজ শেষ করে আমাদের খাইয়ে তবেই তার অবসর।

অনুভূতি-উপলদ্ধি যে করে লালন সোজা পথে হয় তার চলন

পর্ব:২

সাইমা, মাস্কাট (ওমান) থেকে ॥ আজকাল মানুষ এসব কথা শুনতে রাজী নয়। যেখানে ফিট-ফাট ওখানে দৌড়া-দৌড়ি করে। স্মরণ রাখা অবশ্যই প্রয়োজন , “যার কথায় মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি দুর হয় না -বুঝতে হবে তার উপলদ্ধি জ্ঞান নাই”। যার উপলদ্ধি নাই – সে অন্ধ। ঐ ব্যক্তির খপ্পড় থেকে নিজকে নিরাপদ রাখতে হবে।  আজকাল সমাজে আদমদের শেষ নাই। প্রচুর লোকে আদম সেজেছে। বর্ণিত আছে – “দুই কোটি মানুষের মধ্যে একজন আদম হয় অথবা একজনও  হয় না”। ইহা একজন সাধকের বাণী। 

এই কারণে, আমার পিতা আমাকে সর্বদাই বলতেন “আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট” দিল্লী – লাহোর দৌড়াদৌড়ি করার প্রয়োজন নাই। এক জায়গায় স্থির থাকা আবশ্যক। আমার পিতা-আমার ইশ্বর, ইহাই আমার দৃঢ় পরিচয়। অন্য পরিচয়ের প্রয়োজন নাই। পবিত্র গ্রন্থে বর্ণিত  আছে, কেয়ামতের মাঠে আল্লাহ মানুষ-কে নিজ দল নেতাসহ উপস্থিত করবেন। আমার পিতা আমার দলনেতা। অন্য কারো সাথে যাবো না। পিতার নিকট আমি চির দিনের জন্য স্থির। পিতাকে আমি ভালোবাসি। পিতা-কে ছাড়া থাকতে পারী না। আমি পিতার নিকট একনিষ্ট স্থির। এই বিষয়ে আমি আমার পিতার অনুগ্রহ প্রার্থনা করি।

স্থির প্রসংগ: সাধারণ/সুস্থ আবহাওয়ায় একটি পুকুর/ঝিলের পানি স্থির। বাসা-বাড়ীতে ব্যবহৃত আয়নার উপরিভাগ সমতল। অর্থাৎ স্থির। এক ইশ্বরের নিকট নিজেকে ঠিক এমন করেই স্থির করতে হয় সারাটি জীবন। যদি ইহা না হয়, তবে তুমি যেমন ২ নম্বর,  পাবেও তুমি ২ নম্বর কিছু। তবে সকলকে ভক্তি এবং শ্রদ্ধা করা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ, তোমার প্রতি ইহা মানুষের হক/প্রাপ্য এবং অধিকার। এসব অধিকার মানুষকে দিয়েই আমি আমার এককের প্রতি স্থির।

মসজিদ/কওমী মাদ্রাসার হুজুরের সাথে আল্লাহ থাকেন না। পবিত্র গ্রন্থ বলছে “নিশ্চই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন”। পবিত্র গ্রন্থ আরো বলছে :  যাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ হয়, তাঁদেরকে তোমরা মৃত বলো না। বরং তাঁর জীবত ও রিযিক প্রাপ্ত । কিন্তু তোমরা ইহা অনুধাবন করতে পারছো না।

আমার জীবনে এবং জীবনের অনুভব এবং উপলদ্ধির যে চরম ও তীব্র সংকট আছে -ইহা স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র গ্রন্থে নিখুঁতভাবে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর বাণীর উপর মানুষের তর্ক চলে না। মানুষের অনুভূতি এবং উপলদ্ধি যে চরম দুর্বল, ইহা স্বীকার করতেই হবে।

একটি একক শক্তিকে সর্বদা সাথে নিয়ে নিজেকে শক্তিময় করে, নিজের মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা বাধ্যতামূলক। নিজ পিতা-কে যদি আল্লাহর আসনে বসিয়ে পিতাকে উপলদ্ধি করা হয়, তবে ইহা উচ্চ পর্যায়ের। পিতা কখনেই বলেন না ,যে তিঁনি আল্লাহ। তবে পিতাকে স্থির করে যদি আল্লাহকে ডাক দেয়া হয় /আহ্বান করা হয় – তবে আল্লাহ এই ডাকে সাড়া দেন এবং নিজ পিতার অনুগ্রহ ও হে নিজের প্রতি অনন্তকাল প্রবাহমান থাকে। সেই সাথে নিজ অনুভূতি ও উপলদ্ধি সমৃদ্ধ হয়। পিতার মাধ্যামে আল্লাহর নিকটে পৌঁছা যায় এবং নিজের মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্ব অনুভব ও উপলদ্ধি করা যায়। জাগতিকভাবে পিতা নিজের ছেলে-মেয়েদের নিকট খুশী হয়।

কিন্তু পিতা -সেই রকম পিতা হতে হবে। আজকাল পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ের যে দুর্দশা- আলোচ্য ক্ষেত্রে এমন বেকুব/নিজের প্রতি অনাচারকারী পিতাদের কথা এখানে বলা হয়নি।

ইয়কুব (আঃ) এবং তাঁর অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা , ইউসুফ (আঃ)-কে সিজদা করেছিলেন। ইউসূফ (আঃ) ছিলেন, ইয়াকুব (আঃ) এর নিজ পুত্র।  এমন পিতা-পুত্র মেয়ে হওয়া চাই। সূরা ইউসুফ-এ এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে।  এতে মানুষের অনুভূতি এবং উপলদ্ধির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। 

আল্লাহ সর্বত্রই উপস্থিত। কিন্তু উপলদ্ধি জ্ঞানের অভাবে ইহা বুঝতে পারি না। জাতীয় গ্রীড লাইনে যখন বিদুৎ সংযোগ দেয়া হয়, মুহুতের মধ্যে গোটা দেশজুড়ে লাইনে বিদুৎ প্রবাহিত হয়। সংযোগ বন্ধ করা হলে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যায়। নিজকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করে রাখতে হবে সারাটি জীবন। এক মুহুর্তও বিরতি বা নিজকে বিচ্ছিন্ন নয়। বিচ্ছিন্ন হলে নিজেকে বিদ্যুৎহীন এর মতো অন্ধকারে ডুবতে হবে। অন্ধকারে ডুবে গেলে মানুষ বেহুশ বা অন্ধ ব্যক্তিতে পরিণত হয়।  অন্ধকার তো অন্ধকারই ।

অতএব, তিনিই নিজকে ভালো অনুভব করতে পারেন, যিঁনি ইশ্বরের সাথে সার্বক্ষনিক যুক্ত আছেন। অন্য কেহ নয়। ইশ্বরের সাথে সর্বদাই যুক্ত থাকা ব্যক্তি, অনুভবের মাধ্যমে সুস্থ একটি উপলদ্ধি খুঁজে পান। এই সুস্থ উপলদ্ধি অনুসরণ করে জীবনকে যাপন করলে সোজা পথে তাঁর নিশ্চিত চলন হবে। যদি তুঁমি গুরুতর অসুস্থ হও এবং অধিক সময় পৃথিবীতে বাঁচতে চাও, তবে তোঁমাকে অবশ্যই একজন ইশ্বরের নিকট সার্বক্ষণিক যুক্ত থাকতে হবে এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের একনিষ্ঠ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। অনুভূতির মাধ্যমে তুঁমি ইশ্বরের ভাষা এবং উপস্থিতি বুঝতে পারবে। ইহা হবে এক দৃঢ় প্রচেষ্টা।

অথবা যদি কোন সুস্থ মানুষ, তার অনাচার এবং অত্যচারে পাড়া-প্রতিবেশী/দেশ-জাতি অতিষ্ঠ। তবে ইশ্বর তাকে একটি নিদিষ্ট সময় বেঁধে দেন এবং তার জীবন সমাপ্তি ঘটান। ইহা মানুষের প্রতি ইশ্বরের অনুভূতি এবং ইশ্বরের নির্ধারিত ব্যবস্থা। 

মানুষ যখন ইশ্বরের আনুগত্যহীন/ ইশ্বরের প্রেম/ভালোবাসা এবং ইশ্বর অনুভব থেকে দূরীভূত হয়/ বিচ্ছিন্ন হয়-  নিজের প্রতি/দেশ/ জাতির প্রতি অনুগ্রহশীল নয় – ঠিক তখনই ইশ্বর ব্যবস্থা গ্রহন করেন। কারণ, অনুভব এবং উপলদ্ধিহীন এবং অনাচার সৃষ্টিকারীকে ঈশ্বর পৃথিবীতে বেশী দিন বাঁচিয়ে রাখেন না।

যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে গরু/ছাগল/কুকুর/ বিড়াল/ইদুর /পিপড়া, এমন কি গাছ-পালায় বসবাসরত পাখী পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাণী ভালো করে দুর্যোগের নিদিষ্ট সময়/অবস্থা বা প্রকৃতি/ স্থায়িত্ব দুর্যোগের মাত্রা ইত্যাদি তথ্য নির্ভুলভাবে অনুভব এবং উপলদ্ধি করতে পারে। এই সব প্রাণী বাঁচার জন্য সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করে। তাঁদের উচ্চ মাত্রার অনুভূতি এবং উপলদ্ধি শক্তি আছে।

কুকুরকে বিভিন্ন সিকিউরিটি ফোর্স নিরাপত্তার জন্য মানুষের কল্যাণে কাজে প্রয়োগ করা হচ্ছে। কুকুর কোথায়ও লেখাপড়া করেনি। কুকরের অনুভূতি এবং উপলব্ধি কাজে প্রয়োগ করে বিভিন্ন সরকারী/বেসরকারী স্থাপনায় (যেমন বিশ্বের যে কোন বিমান বন্দর/ব্যাংক/গুরুত্বপূর্ন স্থাপনা) নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে- আমরা দেখছি।

অথচ মানুষেরই উচ্চ মাত্রার অনুভূতি এবং উপলদ্ধি থাকার কথা। মানুষের এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে, তার শরীরে উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিস দীর্ঘ দিন থাকার কারণে নিজের শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু নিজের অনুভূতি নাই। একদিনে কি এই অবস্থা হয়? তবু একটু বিশুদ্ধ খাবার খেতে চায় না এবং নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত দীন-হীনকে দান করে না।

নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা কিছু আছে-ইহাই যাকাতের বিষয় – দিন, হীনদের প্রাপ্য। ধর্মীয় দূর্নীতিবাজ ও ধর্মীয় মূর্খরা এই যাকাতের মাপ ইচ্ছামতো % এ হিসাব করছে। মানুষের যে দিন একটু সামান্য উপলদ্ধি এবং অনুভব জ্ঞান এর বিকাশ ঘটবে – সে দিন গুরুত্বর  প্রতিবাদ শুরু হবে। পৃথিবীতে এই  প্রতিবাদ কাজটি করতে না পারলে, হাশরের মাঠে এর তীব্র প্রতিবাদ এবং  কঠোর আন্দোলন করা হবে। শেষ রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নাই। 

প্রতিটি মানুষের পেট একটি নিদিষ্ট মাপের থাকে। চিকিৎসকরা ইহা ভালো জানেন। এই নির্দিষ্ট মাপের পেটে অতিরিক্ত কিছু খেলে, পেট ফুলে/ফেপে উঠে। মানুষ অন্যের খাবার বা সম্পদ নিজে ভোগ করার চেষ্টা করে। ১০০ জনের খাবার/সম্পদ কি একজনে খাওয়া বা ভোগ করা  যায় ?

(১) পৃথিবীর টানে আপেল গাছ থেকে আপেল মাটিতে পড়ছে দেখে, বৈজ্ঞানিক নিউটন অনুভব এবং উপলদ্ধি করলেন, যা কিছু উধ্বমুখী-প্রতিটি বস্তুকেই পৃথিবী তার নিজের দিকে আকর্ষণ করছে। এই অনুভব এবং উপলদ্ধির গভীরে গিয়ে নিউটন গতির সূত্র আবিষ্কার করেন- যা নিউটনের গতি সূত্র নামে পরিচিত। ইহা অনুভব এবং উপলদ্ধির উজ্জ্বল একটি উদাহারণ। এই অনুভব এবং উপলদ্ধি বিজ্ঞানকে এক ধাপ উপরে নিয়ে যায়। শুধুমাত্র নিউটনের অনুভব এবং উপলদ্ধিতে বিজ্ঞানের এত উন্নতি হলো – অথচ তাঁর সময়ে প্রচুর মানুষ ছিলো, কিন্তু তারা বিষয়টি অনুভব বা উপলদ্ধি করেনি। অনুভব/অনুভূতি এবং উপলদ্ধি ছিল নিউটন এর যার ফলে আমরা এক বৈজ্ঞানিক সত্য পেলাম। সুতরাং, এভাবেই একজন আদম বিকশিত হয়। সবাই আদম হয় না। আজকাল প্রচুর আদম/খাজা/কলন্দর আছে-তাদের নিকট গেলে মানুষের দুরারোগ্য ব্যধি দুর করা তো দুরের কথা – সামান্য জ্বরও দুর করতে পারে না। উপলদ্ধি জ্ঞানের অভাবে, এসব ধোকাবাজদের নিকট মানুষ গিয়ে শুধু প্রতারিত ও জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। সাধক আনোয়ারুল হক- এঁর অমৃতবাণী  “ধনবান হও, প্রকাশিত হওয়ার চেষ্টা করো না ”।

২). একজন খেলোয়াড়  দৌড় প্রতিযোগিতায়য় যত দ্রুত দৌড় দেয়, তত দ্রুত মাটি তাকে আকর্ষণ করে। নতুবা সে দৌড়াতে পারতো না।

(৩) পৃথিবী চন্দ্র এবং সূর্য-কে ঘূর্ণায়মান লাটিমের মতো আকর্ষণ করে। এই কারণে, চন্দ্র এবং সূর্য নিজ নিজ কক্ষ পথে আবর্তিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতি ফল গাছের মতো দায়িত্ব পালন করে।

(৫) পৃথিবী চন্দ্র এবং সূর্যকে আকর্ষণ করে বলেই নদী/সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা হয়। ইহা বাস্তবে উপলদ্ধি নয় । বাস্তকে ইহা ঘটে -যা দেখা যায় ।

(৩) সমুদ্রের তীরে পানিতে নামলে, মনে হয় সমুদ্র আমাকে তার কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করছে। সমুদ্রের কেন্দ্রের সাথে একটি সংযোগ অনুভুত হয়। তাই সমুদ্রে সাতার কাটতে ইচ্ছা হয়। উচ্চ মাত্রার জোয়ারে এই সাতার স্বাভাবিক থাকে এবং ভাটার সময় নিজেকে রক্ষা করা কঠিন হয়।  ইহা অনুভব এবং উপলদ্ধি।

(৪).চোখে-মুখে বা অন্য কোথাও কিছু আঘাত করলে, আমরা বুঝতে পারি -ইহা অনুভূতি এবং উপলদ্ধি।  মানুষ একদিন মাটির আকর্ষণে মাটিতে মিশে যাবে। কেবল সিদ্ধ আত্মাই থাকবে নিত্য রূপে। সুতরাং, মানুষের নিজের অনুভব/অনুভুতি/ এবং উপলদ্ধি প্রতি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এই অনুভব/অনুভূতি এবং উপলদ্ধির গভীরে নিজের বিচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনুভব/ উপলদ্ধি থেকে গবেষণার সূত্রপাত ঘটে এবং বিজ্ঞানে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের দিক উন্মোচিত হয়। অতএব জীবন চলার পথে, অনুভব/অনুভূতি এবং উপলদ্ধির গভীরে নিজের বিচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত খাওয়া বা নিজের প্রতি অন্যায়/জুলুম করার কারণে জীবণে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে।  মানুষ বলে- আল্লাহ যা করেন – ইহা ভালো করেন। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো, আল্লাহ তোমাকে যেমন অনুভব করেছেন -ঠিক সেই অনুভব অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন। এই ব্যবস্থা কারো জন্য ভালো /খারাপ হয়। এই ব্যবস্থার জন্য ব্যক্তি নিজে দায়ী। রাষ্ট্র বা সমাজ নয়। যার যেমন অনুভব এবং উপলদ্ধি। অনুভব এবং উপলদ্ধি হলো জ্ঞানের একবারে প্রাথমিক স্তর। সুতরাং নিজের অনুভূতি এবং উপলদ্ধির উন্নয়ন/শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তখন উপলদ্ধি বা নির্ণয় করা যাবে, কোন নামে/কিভাবে ঈশ্বর আমার নিকট উপস্থিত।

দুর্নীতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের সংশ্লিষ্টতা অশনিসংকেত !

ডঃ সরফরাজ ॥  দেশব্যাপী সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের ফলস্বরূপ ইতোমধ্যে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিসহ অনেকের নাম ও চরিত্র দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ বিষয়টিকে শুদ্ধি অভিযানের অংশ মনে করলেও বিজ্ঞ মহল ভীষণ উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে শীর্ষ দুর্নীতিবাজদের তালিকায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আধিক্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিস্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। অতি সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনি এক ভয়াবহ তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন মতে, ২০১৬ সাল হতে এ পর্যন্ত দুর্নীতির মামলায় যে ৭৯৯ জন আটক হয়েছেন তাদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছেন ৩৯০ জন। যা জাতির জন্য এক অশনী সংকেত বলে চিন্তাশীল মহল আশঙ্কা করছেন।

সরকারের বলিষ্ঠতায় ও কার্যকরি কিছু উদ্যোগের বদৌলতে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কালিমা লেপনে সক্ষম হলেও স্বার্থান্বেষী গুটি কয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারির নৈতিক স্খলন দেশের ভাবমূর্তিকে শুধু ম্লানই করছে না সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের প্রতি জনগণের বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’ যুগ আগেও সরকারি চাকুরিতে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের পারিবারিক তথ্য যাচাই-বাছাই ও পারিবারিক মর্যাদা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। বিশেষ করে সাব-রেজিষ্ট্রার, প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন রীতি চালু ছিল। প্রতিদান হিসেবে জাতি অনেক দক্ষ, সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারিকে সেবক হিসেবে পেয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তো দূরের কথা, চাকুরির মেয়াদ শেষে তারা স্ব-স্ব বিভাগে অনুকরণীয় হয়ে আছেন। নব্বই পরবর্তি সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে ও উৎকোচের বিনিময়ে সরকারি চাকুরিতে নিয়োগে সুবিধাপ্রাপ্তদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির কালিমায় কলংকিত হয়েছেন। একই গড্ডালিকা প্রবাহে কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারি এখনো এমনভাবে দুর্নীতিতে লিপ্ত রয়েছেন যে, সরকারি চাকুরি নিয়ে জনমনে সংশয় দানা বাঁধছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূণ্য অবস্থানের কারণে দেশব্যাপী যে অভিযান চলছে তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিৎ করা হলে জনমনে স্বস্তি ও আস্থা আসবে বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন সচেতন মহল।

হাক্কানী বর্ষের প্রথম মাস অগ্রহায়ণ

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার মহান পদক্ষেপ

সংলাপ ॥ রাজনীতির জটিল কুটিল আবর্তে পড়ে ইতিহাস ঐতিহ্য তার গতি প্রকৃতি হারায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এগিয়ে চলা জাতি স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভুলতে বসে তার ঐতিহ্যকে। ক্ষমতার দ্বান্দ্বিকতায় বিদ্বেষের আগুনে পুড়ে নিরীহ মানুষ হারিয়ে ফেলে অনেক কিছূ। তবু থেমে থাকে না কিছুই। এরই মাঝে কেউ কেউ শেকড়ের সন্ধানে লেগে থাকে নিরন্তর। হারাতে দেয় না সবকিছুকে। ধারণ- লালন-পালন করে চলে জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যের আর আনন্দের বিষয়গুলোকে। পাকা ধানের মউ মউ গন্ধে বিমোহিত দশদিগন্ত। শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মাখছে প্রকৃতি। কমছে তাপমাত্রা, কুয়াশার চাঁদরে মোড়ানো প্রত্যুষের গ্রামবাংলা। ভোরের কোমল রোদ, শিশির ভেজা ঘাসের ডগায় যেন মুক্তোর মেলা।

ঝলমল  শিশিরের হাসি, লকলকে লাউয়ের ডগায় তারুণ্যের সতেজতা – কানে কানে বলে যায়, এসেছে অগ্রহায়ণ। শৈত্যপ্রবাহও নেই, খরতাপও নেই। মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। উদাসীন বাতাসে ওড়ে ঝরাপাতা। সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে পাখির কলকাকলি সৃষ্টি করে ভিন্নমাত্রিক দ্যোতনা। রাতে মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্নার আলো ঠিকরে পড়ে। প্রাণে প্রাণে দোলে গানের কলি – ‘ও মা অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি মধুর হাসি’।

১৪২৭ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণ, সোমবার। বাংলার মহান সূফী সাধক খাজা আনোয়ারুল হক এর হুকুমে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত রাজধানী ঢাকার ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ’ এ হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীগণ ১ অগ্রহায়ণ কে হাক্কানী নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে উদ্যাপন করা শুরু করেন আজ হতে ১০ বছর পূর্ব হতে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ হাক্কানী নববর্ষের প্রচলন পূনঃ শুরু করেন এবং তাঁরই নির্দেশে প্রতি বছর সারা বাংলার হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীগন হাক্কানী বর্ষের প্রথম দিন ১ অগ্রহায়ন পালন করে আসছেন ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজে। এবার উদ্যাপিত হলো ১০ হাক্কানী বর্ষবরণ উৎসব। এ মাসেই ধূলির ধরায় আবির্ভূত হয়েছিলেন হাক্কানীর দুই সাধক- সূফী সাধক আনোয়ারুল হক ও সূফী সাধক আবু আলী আক্তার উদ্দিন। এ দিনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শুরু হয় উৎসবের ধুম। বাংলার চিরায়ত লোক ধারার সঙ্গে  মিল রেখেই পালিত হয় এ উৎসব।

ইতিহাস বলে, অগ্রহায়ণই ছিল বাঙালির বর্ষ গণনার প্রথম মাস। বাংলা বছরের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস রয়েছে তার মধ্যে ১১টি মাসেরই নামকরণ হয়েছে নক্ষত্রের নামে। ‘বৈশাখ’ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, ‘জ্যৈষ্ঠ’ জ্যাষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, ‘আষাঢ়’ আষাঢ়ার নামে এবং এরূপ শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে অঙ্কিত হয়েছে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামটির সঙ্গেই মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।

‘অগ্র’ শব্দের অর্থ প্রথম, আর ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ বছর। বছরের প্রথম বা অগ্রে অবস্থান করার কারণে নক্ষত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন একমাত্র মাসটির নাম হচ্ছে অগ্রহায়ণ। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে প্রণীত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় মাস হিসেবে অগ্রহায়ণ মাসটির উদ্ধৃতি রয়েছে (১০ম অধ্যায় : ৩৫ নম্বর শ্লোক)।

বাংলার এই মাস ও ঋতুগুলো যে বহুপূর্বকাল থেকে প্রচলিত, নির্ভরযোগ্য তথ্য মূলত তারই পরিচায়ক। প্রায় প্রাচীন কাল থেকেই এ অঞ্চলে অগ্রহায়ণের ১ তারিখে নববর্ষের উৎসব পালন করা হতো। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব।

বলা হয়, সম্রাট আকবরের সময় থেকে ‘বৈশাখ’ মাস বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু আকবরের অনেক পরে রচিত বাংলা সাহিত্যে, বছরের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখের উল্লেখ নাই। ঠাকুর পরিবারে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। পরে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেন।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন কেন্দ্রীয় সরকারের বাধার মুখে পড়ে। তারা একে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে আখ্যায়িত করে। বাঙালি পন্ডিতেরা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমুখের নেতৃত্বে সম্রাট আকবর যে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন, তা স্মরণ করিয়ে বাঙালির নববর্ষকে বাধাগ্রস্ত না করার আহ্বান জানান। পাকিস্তান সরকার সেই দাবি অগ্রাহ্য করে। এ রকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছায়ানট’ (১৯৬১) নামক আজকের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। এই সংগঠন ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে নিয়মিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতির নানা আঙ্গিকে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্যভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতে শুরু করে। সেই নববর্ষ উৎসব প্রতিবছরই বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে এখন বাঙালির সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক করোনা মহামারি জনিত কারনে সারাদেশে এবারের নবান্ন উৎসব পালনে তেমন কোন আয়োজন ছিল না। তবুও বাংলার সাধককূলের আশীর্বাদ নিয়ে হাক্কানী বর্ষের প্রথম দিন হিসেবে ১ অগ্রহায়ণ উদ্যাপন বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পূন:প্রতিষ্ঠার এক মহান পদক্ষেপ। বাঙালি জাতিসত্ত্বার সত্য প্রতিষ্ঠায় হারিয়ে যাওয়া বাংলার সংস্কৃতিকে বাঙালির প্রতিটি জীবনাচরণে ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই। ১ অগ্রহায়ণের এই হাক্কানী বর্ষবরণ উৎসব শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক মহান প্রচেষ্টা। বাংলার দিক্ হতে দিগন্তে হাক্কানী বর্ষবরণের এই উৎসবের আবির ছড়িয়ে পড়ুক।

সময়ের সাফ কথা….

‘প্রতি মসজিদে মিনারে জনপদে অগ্রহায়ণ আবার হোক প্রেরণার প্রপাতে আপ্লুত’

শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ ॥ মসজিদে মসজিদে, মিনারে মিনারে বঙ্গের প্রতি জনপদ প্রতিটি বাড়ি ঘরের কিনারে কিনারে আবার অগ্রহায়ণ হোক প্রেরণার প্রপাতে প্রপাতে আপ্লুত।’ -‘অগ্রহায়ণ’ নিয়ে অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ কর্তৃক ১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দের বিভিন্ন সময়ে (১৩৯৬ বঙ্গাব্দের) লেখা ও কবিতাগুলো বেশ উদ্দীপনাময়ী ও প্রেরণাদায়ক। ‘অঙ্গে আমার বঙ্গ রক্ত বহে ’- নামে কবিতা ও কবিতাগ্রন্থের লেখক তিনি। বঙ্গবন্ধুর হাতেগড়া এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে ছিল এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের প্রতিনিধিরা এবং এই হত্যার সুফল ভোগকারীরা ক্ষমতার মসনদে ছিল বলেই অবস্থা সচেতন মানুষদের কাছে সহজেই অনুমেয়। ওই সময় গ্রন্থটিতে বঙ্গ, বাঙালি, বাংলা, বঙ্গবন্ধু, বাংলা নববর্ষ, বাঙালির চেতনা, বাঙালির বিজয় ও স্বাধীনতা দিবস, নবান্ন প্রসঙ্গে তাঁর লেখাগুলোর তাৎপর্য গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। উল্লেখ্য যে, দেশের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও কবি – সাংবাদিক আসাদ চৌধুরী এই গ্রন্থের ভূমিকায় অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদকে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসচেতন ভাষা-সৈনিক ও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে আ্যখ্যায়িত করে লিখেছেন , ‘তাঁর স্বাপ্নিক মনের পরিচয় বিভিন্ন সময়ে আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রায় এক যুগ অবস্থানের সময় আমি পেয়েছিলাম’ (তারিখ: ৩০.০১.২০০৭) । ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিতে উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলোর শিরোনাম- ‘বাঙালির রাজধানী হলো মুজিবনগর,‘আমি এক নতুন অগ্রহায়ণ চাই’, ‘অগ্রহায়ণ আবার হোক বাঙালির নতুন বছর’, ‘একটি বঙ্গবাণী’, ‘ঐতিহ্যের অন্বেষণে’, ‘একদা এখানে ইবনে বতুতা’, ‘নবী নূহের কথা’ ইত্যাদি।  

‘আমি এক নতুন অগ্রহায়ণ চাই’, কবিতায় তিনি লিখেছেন – ‘আমি এক অগ্রহায়ণের আবাহনী গাই, আমি এক নতুন অগ্রহায়ণ চাই। ফসল সম্ভার ভরা হৈমন্তিক প্রশান্তিপূর্ণ-নতুন এক অগ্রহায়ণ।’

ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লক্ষাধিক মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়- ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর তারিখটি ছিল ১৩৭৭ সালের ৩১ অগ্রহায়ণ। এখন এবং এবারও বাংলা দিনপঞ্জিকার হিসেবে তারিখটি অবশ্য ১ পৌষ-এ পড়েছে। বাঙালির জীবনে ১৬ ডিসেম্বর তারিখটি অগ্রহায়ণেই এসেছিল বলে এ নিয়ে তাঁর উচ্ছ্বাস অন্যান্য লেখায় তিনি বিভিন্নভাবেই তুলে ধরেছেন। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১-সময়ের হিসেবে ১৮ বছর। ‘একটি বঙ্গবাণী’তে তিনি লিখেছেন- ‘আটই ফাল্গুন, অমর একুশ’!  বঙ্গভক্ত অনেক রক্ত ঢেলেছিল অকুতোভয়ে বাঙালির রাষ্ট্র চেতনার উন্মেষ উদ্বোধনে। সংগ্রাম সাথী সালাম-বরকতের খুলি হতে ফিনকী দিয়ে ঝরা আরমানীটোলাস্থিত ঢাকা কলেজের ছাত্রাবাস বান্ধব কুটিরে বসে লিখেছিনু ‘রক্তলিপিকা’খানি- ‘মসি নেই লোহু আছে, লেখনীও নেই আছে শির। শির দিয়ে লোহু দিয়ে তব লিপিকার জবাব দিই। প্রায় আঠার বছর পর তের শ’ সাতাত্তরের একত্রিশে অগ্রহায়ণের-ফসল সম্ভারের আশ্বাসে ভরা এক হৈমন্তিক প্রভাতে জাতি পেল লিপিকার জবাব-‘স্বাধীন বাংলাদেশ।’

১৩৯৬ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণে ‘ঐতিহ্যের অন্বেষণে’ কবিতায় লিখলেন, ‘…আজ শেখাবাদে এসে সেই ইতিহাস-আবার বাঙালিকে জানাতে চাই-‘বঙ্গ’র প্রবর্তিত অব্দের তল্লাসী করে আমি তো প্রদীপ্ত, আমি তো জেনেছি, দিল্লির সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফসলস্বরূপ প্রবর্তিত ১৩৯৬ সাল আমাদের বর্ষপঞ্জী নয়। আজ হতে হবে ৪৩৯৬ সাল। অগ্রহায়ণ বাঙালির বর্ষপঞ্জীর প্রথম মাস। গাঙ্গেয় বদ্বীপের ঘরে ঘরে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কোন একদিন নবান্ন উৎসবে মুখরিত অগ্রহায়ণ, হত যে প্রদীপ্ত। আজ আমাদের ফিরে পেতে চাই। মসজিদে মসজিদে, মিনারে মিনারে বঙ্গের প্রতি জনপদে প্রতিটি বাড়ি ঘরের কিনারে কিনারে আবার অগ্রহায়ণ হোক প্রেরণার প্রপাতে প্রপাতে আপ্লুত। শশাত-ঈল-গাঙ্গের আধুনিক প্রতি ভিলায় ভিলায় ঐতিহ্যের অন্বেষণে প্রতি টিলায় টিলায় চট্টগ্রামের প্রতি ঘরে ঘরে সরাইল সোনারগাঁও ও সন্দ্বীপে-‘বঙ্গ’এর প্রবর্তিত অগ্রহায়ণের উৎসব থেকে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত  হোক, অযুত কন্ঠে বাঙালির আমরা জেনেছি, আমরা পেয়েছি, আমাদের পরিচয়।’

‘অঙ্গে আমার বঙ্গ রক্ত বহে’ কবিতায় লিখলেন, ‘ অঙ্গে আমার বঙ্গ রক্ত বহে, আমি ত আজিকে বঙ্গের আঁখিতারা। গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে বসতি আমার, কন্ঠে আমার কন্ঠ মিলিয়ে, অযুত জনতা আজও এ কথা কহে-। আমরা ত আছি একেশ্বরবাদী সাহসী বঙ্গ তনয়। যুগে যুগে মোরা হাকি বাঙালি পরিচয়। আমরা যে ভাই নবী নূহের আদূরে তনয় সাহসী হামের কওম। বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকা আমাদের রাজধানী আজ বাঙালি সভ্যতার ভিত। বঙ্গভবন হেথা পেয়েছে নতুন সাজ ভূবন বঙ্গে আমরা অযুত বঙ্গ তনয় আজিকে সত্যি সাহসী নির্ভীক অকুতোভয়।’

এই ভাষা-সৈনিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর লেখাগুলো অগ্রহায়ণ নিয়ে বাঙালি জাতিকে নতুন করে প্রেরণা সঞ্চারের ডাক দিয়ে যায়। তাই তাঁর লেখা ‘অগ্রহায়ণ আবার হোক বাঙালির নতুন বছর’ কবিতাটির পুরোটাই সত্যানুন্ধানীদের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

 ‘তোমাদের সম্বিৎ ফিরে পাওয়া উচিত

বিস্মৃতির অতল গহবরে বিলীন হয়েছে যে ইতিহাস

তার উদ্ধার আজ জানতেই হবে।

কখন কোথায় বঙ্গাব্দের গণনা শুরু

জানাত হলো না আজ তক্-

কে সে এ মহাপুরুষ এ অব্দের প্রবর্তক?

শেখাবাদে আজকাল

প্রেরণার প্রপাত নামে

রাত রাত দিন দিন ভর

শেখাবাদ হয় প্রেরণা মুখর।

পাহাড় ফারান, হীরা গহ্বর,

আরব উপদ্বীপের মক্কা শহর

গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের আমার এ শেখাবাদ যদিও না হোক,

তবুত তারই প্রেরণার প্রপাতে প্রপাতে

গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের প্রতি জনপদ প্রতি বাড়িঘর,

ব-দ্বীপের ইতিহাসের আরেক প্রেক্ষাপটে

হয়েছে প্রদীপ্ত হয়েছে মুখর।

হয়োনো অবাক,

 পেছনে সবাক ইতিহাস কথা কয়।

 তোমাকে আমাকে যে দিয়ে গেল বরাভয়,

দৃপ্ত বলিষ্ঠ সহাসী কন্ঠে তাই

ঘুষিলাম আজ ‘বঙ্গ’এঁর পরিচয়-

কবিতার ইতিহাস

কবিতায় ইতিহাস

কবিতা ও ইতিহাসে আর শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনীতির অঙ্গনে যদি

অদ্যাবধি কেউ না বলে থাকেন

প্রেরণার প্রপাতে আপ্লুত অকুতোভয়

আমাকে ত আজ বলতেই হয়

আমাকে ত আজ জানাতেই হয়

গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে আবাদের আনজাম দৃপ্ত

সেই সে সাহসী পুরুষ একেশ্বরবাদী ‘বঙ্গ’এর পরিচয়-

হাজার বছর পাঁচেক আগে

মহাপ্লাবনোত্তর পৃথিবীতে নতুন বসতি শুরু,

নবী নূহকে তাই ত বলা হয় দ্বিতীয় আদম।

সৈনিক আস ভাই সকল অঙ্গনের

হাতে হাত রেখে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে

চল বাঙালি মিলিত কন্ঠে বলি বৈশাখ আমাদের পহেলা মাহিনা-

আকবরের প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জী আমরা বদলিয়ে দেব

চল ভাই এক সাথে গণনা চালাই।

চলতি সালের সাথে চার হাজার বছর লাগালেই

পিতা ‘বঙ্গ’র প্রবর্তিত বর্ষপঞ্জী পাই।

করজোড়ে তাঁর কাছে প্রার্থনা করি

অগ্রহায়ণ আবার হোক বাঙালির নতুন বছর।

বঙ্গের প্রতিঘর উৎসবে হোক আনন্দ মুখর।’

সময়ের সাফ কথা….চেতনায় বাঙালিত্ব

শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন ॥ ‘একজন খাঁটি বাঙালি  একজন খাঁটি মুসলিম’, ‘বাঙালির জন্য বাঙালি সাধকই পথ  প্রদর্শক’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণতো রেকর্ড শুনেছি, দেখিনি, ৭ মার্চের ওই উদ্যানে থাকলে কি রকম পুলক হতো তা কিছুটা উপলব্দি করতে পারছি।

চেতনা কি আমরা জানি। সবার মধ্যেই প্রবাহিত হচ্ছে চেতনা। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে এসেছে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস বাঙালির। এই পাঁচ হাজার বছরে সকল দিকে বাঙালি যে সমৃদ্ধ, বাঙালির জীবনধারা থেকে হাজার বছর ধরে যে বিষয়গুলো চলে আসছে, সবগুলোর সমন্বিত রূপে যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটাই বাঙালি চেতনা। কালকেও বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে যেটা এসেছে এবং আজকের এই অবস্থান পর্যন্ত যোগ হয়েছে সেটাও বাঙালি চেতনার অংশ হিসেবে আমাদের মধ্যে আছে। সুতরাং আমরা সেটা কতটুকু ধারণ-লালন-পালন করে চলেছি সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। চেতনার যে ৭ টি স্তরের কথা বলা হয়েছে (অচেতন, অবচেতন, প্রাক-চেতন, দ্বৈত-চেতন, উর্ধ্ব-চেতন, মহাচেতন) আমরা যারা এখানে আছি, কোন বিন্দুতে, চেতনার কোন স্তরে আমি অবস্থান করছি? চেতনায় যে বাঙালিত্ব আলোচনা সেখানে কোন্ দেশটা এসেছে, কোন্ দেশের সীমানা এসেছে, কোন জাতি এসেছে, কোন্ কোন্ নেতা নিয়ে এসেছেন, সেখানে মূল যে প্রশ্ন চেতনায় বাঙালিত্ব আমার চেতনায় তা কতটুকু আছে? আমি আমার চেতনায় বাঙালিত্বকে ধারণ করেছি কিনা? বঙ্গবন্ধু কতটুকু ধারণ করেছিলেন সেটা বঙ্গবন্ধু জানেন, আমি কিভাবে বিচার করবো বঙ্গবন্ধুকে, আমার ক্ষমতা কোথায়! আমি ধারণ করেছি কতটুকু সেটাই দেখার বিষয় এবং আমার এই ধারণ-লালন-পালনের দ্বারা আমি আমার বাঙালিত্বকে কতটা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এই চেতনা আমার মধ্যে কতটা প্রবাহিত হচ্ছে সেটাই আজকের বিচার্য বিষয় এবং আলোচনার মূল পয়েন্ট। আমরা অনেক দিকে চলে গেছি, কিন্তু সেই ডাইমেনশন থেকে আমরা যদি নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম তাহলে এই আলোচনাটা আরও বেশি অর্থবহ হতো এবং নিজের ও সকলের জন্য উপলব্ধি করার একটা জায়গা তৈরি হতো। প্রশ্ন আসে আমি কি চেতনা সম্পন্ন? যে বাঙালি চেতনা, যে বাঙালিত্বের কথা বলা হচ্ছে-আমি কোন্ বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে আছি, কিভাবে ধারণ করে আছি? যদি বলি আমি পোষাকে বাঙালি, তাহলে হাজার-হাজার বছর ধরে যে পোষাক চলে এসেছে, সেই পোষাকটা কি আমি আমার পরিধানের মধ্যে রপ্ত করেছি? যে বাংলা ভাষার কারণে বাঙালি জাতি-গোষ্ঠীর পরিচয়, সেই ভাষাকে কি আমি সেইভাবে মূল্যায়ণ করেছি আমার ব্যক্তি জীবন, পেশাগত জীবনে, আমার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় এবং চারপাশে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সেই জায়গায়। এই যে আমার আচার-ব্যবহার, চাল-চলন প্রতিটি জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতির যে ধারা, সেই ধারার কতোটা আমার মধ্য দিয়ে বহি:প্রকাশ হচ্ছে? সেটা বিচার করলেই নিজের একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যায়। আমার যে কথা, কাজ, চিন্তাজগৎ, আমার দৈনন্দিন আচার-ব্যবহার, চলাফেরা, পোষাক, খাবার-দাবার, আমার ভাষা এই যে বিষয়গুলো চলে এসেছে এর মধ্য দিয়ে আরেকটি জায়গায় আমার যাওয়া দরকার আমার নিজ ভাবনা, আমার পরিবার ভাবনা, আমার সমাজ ভাবনা, রাষ্ট্র ভাবনা, বাঙালি জাতি নিয়ে ভাবনাগুলো আমি কি তা বাঙালি চেতনা থেকে ভাবি? আমার চিন্তাজগতে যতো ভাবনা আছে, বাঙালি চেতনার ধারক-বাহক হয়ে আমি কি প্রতিনিয়ত ভাবি? আমি যে কর্ম করে যাচ্ছি সেই কর্মগুলোতে কি সেই বাঙালিত্বের ছোঁয়া আছে? নাকি অন্য অসংখ্য ধার করা বিষয়গুলোকে আমি ধারণ-লালন করে চলেছি? বাহ্যিকভাবে উদাহরণ টানতেই হয়, আজ ঢাকা শহর থেকে যারা এখানে এসেছেন, রাস্তার দুই পাশের সাইনবোর্ডগুলোর দিকে যদি দেখেছেন নিশ্চয়ই, সেখানে কতভাগ বাংলার ব্যবহার করেছি আমরা? বাংলাদেশ বলছি, বাঙালি বলে গর্ব করছি, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের গর্ব করছি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বঙ্গবন্ধুসহ সকল কিছু নিয়েই গর্ব করছি, আমরা বলি পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, গর্ব করার মতো বিষয়, কিন্তু যার যার জায়গা থেকে দেখেন, যার যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দেখেন, কতটুকু আমরা বাঙালি হয়ে বাংলার ব্যবহার করছি, বাংলা মায়ের সন্তানেরা দেশ ও জাতির জন্য যে রক্ত দিয়েছেন, সেই রক্তের ঋণ কি আমরা শোধ করতে পারছি? না আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। কারণ সেই ভাষার অমর্যাদা, অসম্মান আমরাই করে চলছি। প্রতিনিয়ত বৃটিশের দাসত্ব আমাদের চেতনার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। এমন এক বিকৃত চেতনার মধ্যে আমাদেরকে বৃটিশরা নিয়ে গেছে, সেই বিকৃত চেতনা থেকে আমরা বের হতেই পারছি না। বরং সগৌরবে বলছি এবং করে চলেছি। সুতরাং যে জায়গাটা থেকে বাঙালি জাতির উদ্ভব বা যে ভাষাগত কারনে আমরা বাঙালি, সেই ভাষার অমর্যাদা করলে কোনভাবেই প্রমাণ হয় না যে আমরা বাঙালি চেতনা ধারণ করে আছি। একধরণের দ্বিচারিতা, প্রতারণা আমাদের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে চলছে আমারই মায়ের ভাষার সাথে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের সাথে, দেশ ও জাতির সাথে। যার যার অবস্থান থেকে এই দ্বিচারিতার অবস্থান সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা করে আবার ওই জায়গায় নিজের ভাষায়, নিজের স্বকীয় ঠিকানায় প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে, তাহলেই বাঙালি চেতনার বহি:প্রকাশ ওখানে ঘটতে পারে।

স্বাধীন দেশে বাস করি কিন্তু আমরা মুক্তভাবে বলতে পারি না আমরা বাঙালি। বাংলাদেশের এমন বহু মানুষ আছে আমি বাঙালি কথাটি বললে এখনো অনেকের গায়ে জ্বালা ধরে। এটা কিন্তু বাস্তব এবং রাস্তা-ঘাটে, অফিসে-আড্ডায় আমরা দেখতে পাই বাঙালি জাত তুলে গালি দেয়। অর্থাৎ আমিই আমার জাতকে অসম্মান করছি। পাকিস্তান, বৃটিশরা কতটুকু অসম্মান করেছে বা অন্যান্য জাতি যারা লুটেপুটে খেতে এসেছে তারা কতোটা অসম্মান করলো অতীত স্মরণ করে দেখতে যাচ্ছি, কিন্তু বর্তমানে আমরা যারা বাঙালি চেতনা ধারণ করি বলছি, তারা নিজেরাই নিজেদের কতোটা অসম্মান করি বিচার করে দেখি! ‘এই দেশে কি বসবাসের পরিবেশ আছে’, ‘এই নোংরা দেশে কি থাকা যায়’ বলে নিজেদের কতবার খাটো করেছি, যার বিদেশে গিয়ে বসবাস করার স্বপ্নের ডামাডোলের মধ্যে আছেন! আমেরিক, লন্ডন, সুইট হোম মালয়েশিয়ায় যাবো কখন সেই চিন্তায় বিভোর, তার মানে চেতনায় বাঙালিত্ব নয়, চেতনায় স্বার্থপরতা, ব্যক্তিলোভ, ব্যক্তি চাওয়া-পাওয়া।

বঙ্গবন্ধুসহ আরো যারা বড় নেতা আছেন তাদের কথা আমরা বলবো, তাদের অবদানের কথা স্বীকার করবো এবং তাদের দিক্-নির্দেশনা অনুসারে চলবো, কিন্তু ব্যক্তি আমি এই দেশে কতোটা ফায়দা নিচ্ছি, লেখাপড়া করতে গিয়ে, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে আমি কি কি সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছি? আমি কি সহজ স্বাভাবিকভাবে আমার অবস্থানটা তৈরি করছি? নাকি আমি আবার বাঁকা পথে ওখানে যাচ্ছি আমার আরেকজন ভাইকে হারিয়ে দিয়ে? আমি যেসব সুযোগ-সুবিধাগুলো নিচ্ছি তা কি শুধু ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে নিচ্ছি, নাকি আমার যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই জায়গাটার মধ্যে যাচ্ছি? সেটাও কি প্রতারণা নয়? আমি বলছি আমি বাঙালি, কিন্তু আমি একটা চাকুরী যোগাড় করছি, একটা স্বার্থ উদ্ধার করছি বাঁকা পথে সেটা বাঙালি চেতনার সাথে যায় না। আমি শুরু করেছিলাম সাধক বাণী দিয়ে – ‘একজন খাঁটি বাঙালি একজন খাঁটি মুসলিম’। অর্থাৎ বাঙালি চরিত্র এমন যে, একজন মুসলিমের যে চরিত্র তার সেই চরিত্র। মুসলিমের বাংলা শব্দ হচ্ছে শান্ত এবং ভদ্র। যে বাঙালি চরিত্রে পরিপূর্ণভাবে সেই শান্ত এবং ভদ্রের রূপটা আছে সে কখনও অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে না। তাহলে আমি নিজকে প্রশ্ন করে দেখি তুমি কি একজন খাঁটি বাঙালি? তাহলে তুমি একজন খাঁটি মুসলিম। আমার পরিচয় দেই, আমি জন্মগতভাবে মুসলিম। মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই কেউ মুসলিম হয় না। আমি জন্মগতভাবে বাঙালিও না। বাঙালি ঘরে জন্ম নিলেও বাঙালি হওয়া যায় না। কারণ বাঙালি চেতনাকে যে ধারণ করবে সে-ই বাঙালি হবে। বাঙালি চেতনা ধারণ না করে কারও পক্ষে বাঙালি হওয়া সম্ভব নয়। বাঙালি হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই চেতনাকে ধারণ-লালন এবং পালনের বিষয় অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষাভাষী হয়েছি দেখেই যে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসবো তা হতে পারে না। আজ এখানে আমরা জাতীয় বন্দনা সমবেতভাবে গাইছিলাম। আমি নোট নিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো এই প্রশ্নটাইতো আমি কখনো নিজেকে করিনি, আমার ‘সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। আমরা কি জাতীয় বন্দনা পড়ার জন্যই পড়ি বা গাওয়ার জন্যই গাই, কথাটি কি শুধু দুই ঠোঁট থেকেই বেরিয়ে আসে, নাকি চেতনার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবাহিত অনুরণ থেকে বেরিয়ে আসে? আমার হৃদয় থেকে উৎসরিত কিনা যে আমি আমার বাংলাকে ভালোবাসি! কোন বাংলাকে ভালোবাসি, যে বাংলা শুধু স্বার্থের ফুল-ফসল দেয় সেই বাংলাকে? অর্থাৎ আমার ব্যক্তিস্বার্থে বাংলা যখন তার ছায়া দিচ্ছে, আলো-বাতাস দিচ্ছে, আমি সুবিধা পাচ্ছি সেখানেই শুধু আমার সোনার বাংলা হচ্ছে, নাকি এই বাংলায় যখন ঝড়-ঝাপটা আসছে, দু:খ, কষ্ট দিচ্ছে তখন কি বলতে পারি আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, নাকি তখন ওই কথাটি বলে উঠি, এই দেশে কি থাকা যায়! তখন পালাই কেন আমরা, তার মানে কি ব্যক্তিস্বার্থেই কথাটি বলি। বাঙালি যারাই জাতীয় বন্দনা গায় তারা কতজন এই চেতনাকে তার চিন্তাজগতে ধারণ করে সত্যিকার অর্থে এই বাংলাকে, বাংলাদেশকে ভালোবেসে কথাটি বলে!

তারচেয়েও কঠিন একটি কথা আছে এখানে, ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’। আমি নিজের সাথে মিলিয়ে দেখি, কতবার নয়ন জলে ভেসেছি; কতজন নয়ন জলে ভেসেছে। শুধু কি বহি:শত্রুর আক্রমণে মা-এর বদন মলিন হয়? আমি কি আমার কর্ম দ্বারা এমন পরিবেশ করছি না যে, প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত মা-এর বদন মলিন করার মতো কর্ম করে চলেছি। প্রতিনিয়ত প্রকৃতির ক্ষতি করে, নিজের ফায়দা লুটার জন্য একটা দুর্নীতির মধ্যে প্রবেশ করি অথবা আমার একটা রাজনৈতিক স্বার্থে অথবা পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে যখন একটা অপকৌশলের আশ্রয় নেই তখনও কি মা-এর বদন মলিন হয় না? আমাদের কতজনের নয়ন জলে ভেসেছে এই বাংলা মা-এর বদন মলিন হলে আমি জানি না। বাংলা মা-এর বদন প্রতিদিন হাজার হাজার বার মলিন হচ্ছে। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, কিসের উন্নয়ন? আমরা উন্নতি করেছি, সারা পৃথিবীইতো উন্নতি করেছে। মোবাইল নাই এমন কে আছে? সারা বিশে^র এমন কোন দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে মোবাইল নাই। এটা টেকনোলজির ব্যবহার, স্যাটেলাইটের ব্যবহার। প্রতিটা দেশই তার সক্ষমতা অনুসারে এগিয়ে যাবে, কিন্তু নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ছাড়া উন্নতির কোন মানে নেই। আমি সরকারের সমালোচনায় যাচ্ছি না, ব্যক্তি আমি’র সমালোচনায় যাচ্ছি। তুমি যে বাঙালি চেতনার কথা বলছো, তোমার মধ্যে সেই মূল্যবোধটা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করেছ? সেই প্রশ্নটা এখন করা জরুরি। প্রতিদিনই তো আমি আমার ফ্ল্যাট-বাড়ি সাজাই নিত্য-নতুন আধুনিক জিনিস দিয়ে। সব কি উন্নয়ন? আমরা বলি আমাদের আছে রবীন্দ্রনাথ, আমাদের আছে নজরুল, আমাদের আছে লালন। থাকলে কি হবে? আলোচকগণ বলে গেছেন, আমাদের এত ঐশ্বর্য-সম্পদ আছে, আমিও শুনেছি সাধক-এঁর কাছে বাংলায় এত সাধক এসেছেন, তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বিদেশীরা আমাদের লালন-কে নিয়ে গবেষণা করলে আমরা পুলকিত হই কেন? আমরা কি হলফ করে বলতে পারি, আমি লালন সাঁইজীর সেই দর্শন, চেতনা, আদর্শকে ধারণ করেছি? তাহলে লালনকে নিয়ে গর্ব করার অধিকার কি আমি রাখি? লালন দর্শন আমার জীবনের বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই লালনকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। লালন-এঁর মতো সাধকগণ যে দর্শন আমাদের জন্য দিয়ে গেছেন সেগুলো বাস্তবায়ন হলে তো বাঙালির চেহারাই পাল্টে যেতো। অন্য কোন দেশের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হতো না। কারণ বাঙালির যে মূল্যবোধ, সেটি জাগ্রত হলে তো আর কিছু লাগে না। সাধক নজরুল চমৎকারভাবে বলে গেছেন – ‘বাঙালির মস্তিষ্ক ও হৃদয় ব্রহ্মময়, কিন্তু দেহভূবন পাষাণময়। বাঙালির মতো জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তি এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীর কোন জাতির নেই।’ জ্ঞানশক্তি এবং প্রেমশক্তি বাঙালির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে কি সেই জ্ঞানশক্তি, প্রেমশক্তি আছে, তাহলে কি আমি বাঙালি, প্রশ্নটা তো নিজের দিকেই আসবে। সাধক নজরুলকে নিয়ে আনন্দ-পুলক অনুভব করি, সাধক নজরুলকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ছবি হয়, কানাডায় পাঠ্যসূচীতে নজরুল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে কি লাভ। নজরুলতো পড়ার বিষয় না, নজরুলকে আমার চেতনার জগতে ধারণ করার বিষয়। আমি কি নজরুলকে পড়তে পারছি আমার চেতনায় নিয়ে? তেমনিভাবে রবীন্দ্রনাথ, লালনকে কি আমার চেতনায় ধারণ-লালন করে দেখেছি। হাক্কানী সাধক-এর কাছ থেকে এসেছে, ‘বাঙালির জন্য বাঙালি সাধকই পথ প্রদর্শক।’ সেন্টার থেকে কিভাবে সত্যমানুষ বেরিয়ে আসছেন আমরা কিন্তু জানি না। এই চেতনার উন্নতি সত্যমানুষের দ্বারা এসেছে। বাংলা ভাষার আগমনও হয়েছে সত্যমানুষের দ্বারা। বাংলা ভাষার একেকটা অক্ষর সৃষ্টি করেছেন একেক জন সত্যমানুষ। একেকটা সত্য সৃষ্টি হয়েছে সত্যমানুষের দ্বারা। এর থেকে সরে গিয়ে সর্বত্র বিকৃতি প্রবেশ করছে, এই মূল্যবোধটা নষ্ট করে দিয়ে অন্য মূল্যবোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে সম্পদের দিকে, লোভ-মোহ, ক্ষমতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজ তো প্রায় সকল রাজনীতিকের লক্ষ্য হয়ে গেছে ক্ষমতায় যাওয়া। এটা তো বাঙালি চেতনা এবং বাংলার উন্নয়ন না। আমরা বাংলা এবং বাঙালি চেতনাকে জাগ্রত করবো, বাংলা এবং বাঙালির মধ্যে বাঙালি চেতনাকে প্রবাহিত করবো। বাঙালি চেতনার যে ধারা, সুরগুলো আছে, সেই সুরগুলো যেন সকলের মধ্যে বিস্তৃত করতে পারি সেই প্রত্যাশা। সাধক বলেছেন, ‘বাঙালিত্বেই আছে উত্তরণের পথ।’ যারা যতো পথেই যাওয়ার চেষ্টা করেন, কোন লাভ হবে না, কারণ সাধক-এঁর কাছ থেকে যখন এই কথা বের হয়ে গেছে, এটা উল্টানোর ক্ষমতা এই সৃষ্টি জগতের আর কারো নাই। বাঙালি যদি নিজেকে উত্তরণ ঘটাতে চায়, সেই চরম-পরম সীমায় পৌঁছতে চায় তাহলে বাঙালিত্বের মধ্যেই তার উত্তরণের পথ আছে, এছাড়া আর কোন পথ নেই। জ্ঞানশক্তি এবং প্রেমশক্তি ধারণ-লালন এবং পালনের মাধ্যমে, অর্জনের মাধ্যমে আমার বাঙালিত্বকে জাগ্রত করছি কিনা এবং সেই বাঙালিত্ব জাগ্রত করার মাধ্যমে আমার উত্তরণ ঘটছে কিনা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমরা ভবিষ্যতে একটা বেকার ও মেরুদন্ডহীন জাতি পাচ্ছি। দেশের এমন কোন অলি-গলি নাই যেখানে মাদকের ছোঁয়া লাগেনি! আমরা উন্নয়ন করছি বলছি, কিন্তু এর সাথে মাদকটাও চলে এসেছে। আমরা এটা বন্ধ করে তো ওটা করতে পারতাম। উন্নয়নের নামে কি হলো। ভবিষ্যতে যারা নেতৃত্ব দেবে, এমন একটা পঙ্গু, মূল্যবোধহীন প্রজন্ম আমরা পাচ্ছি যারা উন্নয়নের  নামে দেশকে না জানি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, যাবে। আমরাই তো এখানে জড়িত। বাংলাকে তো অন্য কেউ পাহারা দেয় না, হয় বাংলার ভিতরে তৈরি হচ্ছে এই পরিস্থিতি অথবা আমরাই মাদক আমদানি করছি চোরাপথে। কারা একাজে সহায়তা করছে, তারা আমাদের দেশেরইতো নাগরিক। কারা কারা এই কাজগুলোর সাথে জড়িত যারা রাজনীতির সাথে অথবা প্রশাসনে আছি অথবা নেই, সবাই জানি কিন্তু মুখ ফুটে বলতে দ্বিধাবোধ করি, আর ফাঁকা বুলিতে উন্নয়নের কথা বলে যাই। কোনই লাভ হবে না, কারণ ওই যে মেরুদন্ডহীন প্রজন্ম আসতেছে কাল আপনার, আমার বাচ্চারাও সেদিকে ধাবিত হবে, সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখার সুযোগ নেই। পরিসংখ্যান ব্যুরোর লোগো দিয়েই সম্প্রতি ফেইসবুকে একটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, এদেশে এখন ৪ কোটি ৬০ লক্ষ লোক বেকার। উন্নয়ন হতে হবে বাঙালি চেতনায়, তাহলে আর কোন কিছুই আমাদের লাগবে না। টাকা, ধন-সম্পদ, অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে তো আমরা তথাকথিত উন্নয়ন চাই না, প্রেম এবং ভালবাসা দিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করতে চাই। অস্ত্রের জোরে আমরা আধিপত্য বিস্তার করতে চাই না। বরং আধিপত্যবাদীদের হটানোর জন্য বাঙালির যে শক্তি দরকার, সেই শক্তি বাঙালির মধ্যে আছে এবং সেই শক্তিটা সময়মতো বাঙালির মধ্যে জেগে উঠে। সাধক নজরুল বলেছিলেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে বাঙালির বাংলা, সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।’ সেই  অসাধ্য সাধন আমরা করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ভাষণের মধ্যদিয়ে ১৯৭১-এ। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের প্রত্যেকটি জায়গায়ইতো  বাংলা-বাঙালির কথা, বাঙালির মুক্তির কথা বলেছিলেন। বাঙালির মুক্তি কি আজ হয়েছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল একত্রিত হয়েছে, স্বাধীন হয়েছে বলে। আজ আমরা কি একত্রিত, না প্রতিনিয়ত বিভেদ বাড়িয়ে চলেছি যেটা বাঙালি চরিত্রের সাথে যায় না। আমরা টিভি-পত্রিকা খুললেই কেবল দেখি পরের কথা, নিজের কথা আর কেউ বলে না, নিজের বিচার করে না। আমরা এখন ঘুম থেকে উঠেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অন্যের কথা স্মরণ করি, আরেকজনের নিন্দা-মন্দের মধ্যে লেগে যাই, অন্যের বিচার করতে শুরু করি। এটাতো খাঁটি বাঙালি চরিত্র না। বাঙালি সাধক বলছেন, ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’। এই শাশত বাণী ধারণ-লালন করলেই চেতনায় বাঙালিত্ব জাগ্রত হয়।

আত্মসম্মান সমুন্নত রেখে কথা বলুন

ড. সরফরাজ ॥ ব্যক্তিত্ব কথাটি মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্যক্তি মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ইঙ্গিত করলেও সামষ্টিক অর্থে কোন সমাজ, প্রতিষ্ঠান এমনকি রাষ্টের ভূমিকাও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার বা তাদের ব্যক্তিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববরেণ্য রাজনীতিক, নেতা ও আদর্শবান ব্যক্তিদের বলিষ্ঠতায় তাদের স্বীয় ব্যক্তিত্বের ছাপ বিদ্যমান। বারবার কারাভোগ করে ক্ষমতাসীনদের সাথে আপোস না করে স্বীয় ব্যক্তিত্বে মূর্তমান রয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। লোভনীয় প্রস্তাব পেয়েও দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে বাংলাদেশ নামক দেশটিকে উপহার দেয়া বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব অতুলনীয় ও অনুকরণীয়। কারণ তিনি কোন প্রদেশের গভর্ণর না হয়ে একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সে লক্ষ্যেই অটল ছিলেন।

অথচ এমন একজন বিশ্বমানের নেতার অবদানে সৃষ্ট দেশের স্বাধীন নাগরিক হয়েও অনেকের ভূমিকা এ জাতির ব্যক্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ ইস্যুতে কোন কোন অযোগ্য, অকালকুষ্মা- কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও নেতাদের নতজানু মনোভাব, বেফাঁস মন্তব্য ও বিতর্কিত ভূমিকা বিভিন্ন সময় দেশের ভাবমূর্তি ম্লান করেছে। খেসারত স্বরূপ অনেককেই দায়িত্বচ্যুতও করা হয়েছে। পরবর্তিতে এসব ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে খুব বেশী পরিবর্তন  এসেছে বলে জাতির জানা নেই। অতি সম্প্রতি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে ঘিরে কোন কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংবাদ মাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি সীমাহীন চাটুকারিতা, বিদেশ প্রীতি ও ঐ দেশটির প্রতি অনুরাগের চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকারান্তরে তাদের ব্যক্তিত্বকেই উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে দেশটির নির্বাচনী দিন হতে শুরু করে সর্বশেষ ঘোষণা পর্যন্ত ভোটযুদ্ধে কে এগিয়ে রয়েছেন শিরোনামে এ দেশের কোন কোন সংবাদ মাধ্যম এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিল যে, সাধারণ জনগণের ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল আসলে এগুলো কোন দেশের সংবাদ মাধ্যম বা কারা এদের নিয়ন্ত্রণ করে। পুরো সংবাদের দুই-তৃতীয়াংশ সময় কোন কোন সময় অর্ধেকেরও বেশী সময় যুক্তারাষ্ট্রের নির্বাচনী ফলাফল আপডেট ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের বিশ্লেষণের মাঝে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক সংবাদই চাপা পড়তে দেখে গেছে। সঙ্গতকারণেই জনমনে প্রশ্ন জাগে, এ ধরণের কাভারেজ কি শুধুই আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রচারের স্বার্থে নাকি শক্তিশালী রাষ্ট্রটির নতুন রাষ্ট্র প্রধানের পক্ষে ডিজিটাল তাবেদারি! বিশ্লেষণের অন্যতম যুক্তি হচ্ছে, হতে পারে বাংলাদেশ তাদের তুলনায় ছোট দেশ, শক্তি-সামর্থ্যে ও কাঠামোগত উন্নয়নের মাপকাঠিতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাই বলে নিজেদের তো একটা ব্যক্তিত্ব আছে। এ দেশে যখন জাতীয় নির্বাচন হয় তখন তাদের কয়টি চ্যানেল বা কোন সংবাদ মাধ্যম কতটুকু সময় তা প্রচার করে সে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচ্য। পাশাপাশি, এ ধরণের প্রচারের মাধ্যমে দেশের লাভ কতটুকু তাও ভেবে দেখা দরকার। ১৯৭১ পূর্ব বাংলাদেশ আর ২০২০-এর বাংলাদেশ যেমন এক নয়; তেমনি আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্বের বিবেচনায়ও বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক মন্ডলে স্ব-অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। এ বোধ সবার মাঝে যত জাগ্রত হবে দেশপ্রেমও তত পোক্ত হবে।