হাক্কানী নববর্ষ বরণে প্রস্তুত হাক্কানী হওয়ার পথযাত্রীগণ

ধন্য অগ্রহায়ণ মাস বিফল জনম তার-নাহি যার চাষ

সংলাপ ॥ রাজনীতির জটিল কুটিল আবর্তে পড়ে ইতিহাস ঐতিহ্য তার গতি প্রকৃতি হারায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এগিয়ে চলা জাতি স্মৃতি বিস্মৃত হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ভূলতে বসে তার ঐতিহ্যকে। ক্ষমতার দ্বান্দিকতায় বিদ্বেষের আগুনে পুড়ে নিরীহ মানুষ হারিয়ে ফেলে অনেক কিছূ। তবু থেমে থাকে না কিছুই। এরই মাঝে কেউ কেউ শেকড়ের সন্ধানে লেগে থাকে নিরন্তর। হারাতে দেয় না সবকিছুকে। ধারণ- লালন-পালন করে চলে জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যের আর আনন্দের বিষয়গুলোকে। পাকা ধানের মউ মউ গন্ধে বিমোহিত দশদিগন্ত। শীতের পরশ আলতো করে গায়ে মাখছে প্রকৃতি। কমছে তাপমাত্রা, কুয়াশার চাঁদরে মোড়ানো প্রত্যুষের গ্রামবাংলা। ভোরের কোমল রোদ, শিশির ভেজা ঘাসের ডগায় যেন মুক্তোর মেলা। ঝলমল শিশিরের হাসি, লকলকে লাউয়ের ডগায় তারুণ্যের সতেজতা – কানে কানে বলে যায়, এসেছে অগ্রহায়ণ। শৈত্যপ্রবাহও নেই, খরতাপও নেই। মৃদু হিমস্পর্শ প্রাণে শিহরণ জাগায়। উদাসীন বাতাসে ওড়ে ঝরাপাতা। সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে পাখির কলকাকলি সৃষ্টি করে ভিন্নমাত্রিক দ্যোতনা। রাতে মেঘমুক্ত আকাশে জ্যোৎস্নার আলো ঠিকরে পড়ে। প্রাণে প্রাণে দোলে গানের কলি – ‘ও মা অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি মধুর হাসি’।

১৪২৭ বঙ্গাব্দের ১ অগ্রহায়ণ, সোমবার। বাংলার মহান সূফী সাধক খাজা আনোয়ারুল হক এর হুকুমে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত রাজধানী ঢাকার ‘মিরপুর আস্তানা শরীফ’ এ হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীগণ ১ অগ্রহায়ণ কে হাক্কানী নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে উদ্যাপন করা শুরু করেন আজ হতে ১০ বছর পূর্ব হতে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ হাক্কানী নববর্ষের প্রচলন শুরু করেন এবং তাঁরই নির্দেশে প্রতি বছর সারা বাংলার হাক্কানী হওয়ার পথের যাত্রীগন হাক্কানী বর্ষের প্রথম দিনটি পালন করে আসছেন ঐতিহ্য ও উৎসবের আমেজে। এবার উদ্যাপিত হচ্ছে ১০ হাক্কানী বর্ষবরণ উৎসব। এ দিনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে শুরু হয় উৎসবের ধুম। বাংলার চিরায়ত লোক ধারার সঙ্গে  মিল রেখেই হবে এ উৎসব। প্রতি বছর  ঢাকার রমনার বটমূলে, চারুকলায় বসে নবান্ন উৎসবের বর্ণিল আয়োজন। যদিও এবার বৈশ্বিক করোনা মহামারির কারনে সেসব অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব হচ্ছে না।

ইতিহাস বলে, অগ্রহায়ণই ছিল বাঙালির বর্ষ গণনার প্রথম মাস। বাংলা বছরের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস রয়েছে তার মধ্যে ১১টি মাসেরই নামকরণ হয়েছে নক্ষত্রের নামে। ‘বৈশাখ’ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, ‘জ্যৈষ্ঠ’ জ্যাষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, ‘আষাঢ়’ আষাঢ়ার নামে এবং এরূপ শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে অঙ্কিত হয়েছে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামটির সঙ্গেই মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।

‘অগ্র’ শব্দের অর্থ প্রথম, আর ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ বছর। বছরের প্রথম বা অগ্রে অবস্থান করার কারণে নক্ষত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন একমাত্র মাসটির নাম হচ্ছে অগ্রহায়ণ। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ বছর আগে প্রণীত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় মাস হিসেবে অগ্রহায়ণ মাসটির উদ্ধৃতি রয়েছে (১০ম অধ্যায় : ৩৫ নম্বর শ্লোক)।

বাংলার এই মাস ও ঋতুগুলো যে বহুপূর্বকাল থেকে প্রচলিত, নির্ভরযোগ্য তথ্য মূলত তারই পরিচায়ক। প্রায় প্রাচীন কাল থেকেই এ অঞ্চলে অগ্রহায়ণের ১ তারিখে নববর্ষের উৎসব পালন করা হতো। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব।

বলা হয়, সম্রাট আকবরের সময় থেকে ‘বৈশাখ’ মাস বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু আকবরের অনেক পরে রচিত বাংলা সাহিত্যে, বছরের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখের উল্লেখ নাই। ঠাকুর পরিবারে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। পরে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেন।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলায় বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন কেন্দ্রীয় সরকারের বাধার মুখে পড়ে।  তারা একে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে আখ্যায়িত করে। বাঙালি পন্ডিতেরা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমুখের নেতৃত্বে সম্রাট আকবর যে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন, তা স্মরণ করিয়ে বাঙালির নববর্ষকে বাধাগ্রস্ত না করার আহ্বান জানান। পাকিস্তান সরকার সেই দাবি অগ্রাহ্য করে। এ রকম একটি অবস্থার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ছায়ানট’ (১৯৬১) নামক আজকের খ্যাতনামা সাংস্কৃতিক সংগঠনটি। এই সংগঠন ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে নিয়মিতভাবে বাঙালি সংস্কৃতির নানা আঙ্গিকে পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্যভাবে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করতে শুরু করে। সেই নববর্ষ উৎসব প্রতিবছরই বিশাল থেকে বিশালতর হয়ে এখন বাঙালির সর্ববৃহৎ জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে হাক্কানী বর্ষের প্রথম দিন হিসেবে ১ অগ্রহায়ণ বাঙালির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পূনপ্রতিষ্ঠার এক মহান পদক্ষেপ। বাঙালি জাতিসত্ত্বার সত্য প্রতিষ্ঠায় হারিয়ে যাওয়া বাংলার সংস্কৃতিকে বাঙালির প্রতিটি জীবনাচরণে ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই। ১ অগ্রহায়ণের এই হাক্কানী বর্ষবরণ উৎসব শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক মহান প্রচেষ্টা।