হাক্কানী চিন্তনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং ‘আচরণ’ নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনা

সংলাপ  ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ)’এর নিয়মিত সাপ্তাহিক হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে ১২তম দিনে প্রশ্নোত্তর পর্ব ৮ কার্তিক ১৪২৭, ২৪  অক্টোবর ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনের আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠিত এ পর্বে সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের মহাসচিব শাহ্ খায়রুল মোস্তফা। এই পর্বে নির্ধারিত উপস্থিত সুধীবৃন্দের কাছ থেকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা) এর নির্বাহী সভাপতি ও বর্তমান সংলাপ-এর নির্বাহী সম্পাদক শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন। প্রশ্নোত্তর পর্বের পর চিন্তন বৈঠকে পরবর্তী আলোচ্য বিষয় ‘আচরণ’ নিয়ে সূচনা-বক্তব্য অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্বে আলোচনায় অংশ নেন বাহাখাশ যুগ্ম-সচিব মো. আব্দুল ওয়াহেদ এবং নির্বাহী সদস্য আবু ইসহাক রাজু। সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ও সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ রওজা ব্যবস্থাপনা পর্ষদের যুগ্মসচিব শাহ্ আবেদা বানু তরু। 

প্রশ্নগুলো ছিল-নিয়ন্ত্রণ কি? কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? নিয়ন্ত্রণনের বাধাগুলো কি কি? আমরা কি সব সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? কখন এবং কীভাবে নিয়ন্ত্রণের বোধ আসে? ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করার সহজ উপায় কি? ‘আমি’ এবং ‘নিয়ন্ত্রক’-এর মধ্যে পার্থক্য কোথায়? থাকলে কে-কাকে নিয়ন্ত্রণ করে? নেতৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ-আচরণ এই ধারাবাহিকতা সম্পর্কে জানতে চাই..ইত্যাদি। প্রশ্নকারীগণ হলেন মো. আচমতউল্লাহ স্যার, শাহ্ আবেদা বানু তরু, মো. আব্দুল ওয়াহেদ, রাশেদ আহমেদ এবং সাঈয়েদা মারজিয়া। 

উত্তর-দান পর্বে অংশ নিয়ে শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন বলেন, বাইরের দিকে নয়, নিজের দেহে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করাই আসল কথা। তিনি বলেন,‘স্বীয় জিহবা শাসনে রেখো, পলকে পলকে মুর্শিদ দেখো’ মহান সাধক শেখ আবদুল হানিফ’এর এই বাণীটি নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে নিয়ন্ত্রণ বিষয়টি উপলব্ধি সহজ হতে পারে তাদের কাছে যারা তাঁকে মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেকে সত্যপথের পথিক হওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন। সাধক-এঁর কাছে যারা এসেছেন, যারা আসতেন তাদের সকলের কাছেই আলাদা আলাদাভাবে যে-সব নির্দেশনা দিয়ে গেছেন তা স্মরণ রেখে ধারণ, লালন-পালন করাই প্রধান বিষয়। নেতৃত্ব-নিয়ন্ত্রণ-আচরণ একটি ধারাবাহিক পর্ব, একটি সিকুয়েন্স। নেতৃত্ব দেয়ার জন্য সূক্ষ্মদেহের মূল দেহরাজ্যে ‘গুরু’র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। দেহের ভেতরেই সবকিছু, এর বাইরে কোনো ব্রহ্ম নেই, ঈশ্বরও নেই। দেহের ভেতরেই সব কিছু খেলা। দেহের প্রতিটি কোষ, প্রতিটি ইন্দ্রিয়ে গুরুকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি কি-না সেটিই আসল কথা। পুকুরের পানি শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে যায়। কিন্তু গভীর কূয়ার পানি কখনও শুকায় না। কারণ, কূয়ার পানির সাথে সংযোগ থাকে ভূগর্ভস্থ জল ও মহাসমুদ্রের সাথে। নিজের চিন্তাশক্তিকে গুরুর সাথে, মহাশক্তির সাথে সংযুক্ত এবং সম্পর্কিত করে তুলতে পারলে সেখানে আর কোনো কিছুর অভাব হয় না, তখন গুরুই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন, আচরণও সেখান থেকে আসে। এ নিয়ন্ত্রণ ও আচরণ গুণগুলো অর্জন যাঁর দ্বারা সম্ভব হয় তিনি নেতৃত্বও দিতে পারেন। প্রশ্নোত্তর পর্ব মূলতবী হওয়ার পর ‘আচরণ’ নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনায় অংশ নিয়ে আবু ইসহাক রাজু বলেন, আচরণ বিষয়টি আমার স্বভাবের সৌন্দর্যের অংশ। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত  যা কিছু আছে তার সবই সম্পদ। আমার বলতে কিছু নেই, সবই তাঁর। তার পরেও বলতে হয়, আমার মধ্যে যা প্রকাশ পায় তাই আচরণ। রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বিধিবিধান রয়েছে ঠিক ওইভাবে তা মেনে চলাই আমার নৈতিক দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। দুনিয়াদারিতেও বেঁচে থাকতে হলে এর প্রয়োজন রয়েছে। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ আপনার-আমার সকলের কাছে মডেল ও উদাহরণস্বরূপ। তিনি আমাদের যা শিখিয়েছেন, যা বলে গেছেন তার সমস্ত কিছুই  বিধিমালার মধ্যে রয়েছে। আমার আপাদমস্তক সমস্ত কিছুই তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং চালাচ্ছেন। যা কিছু বলি, করি সব তাঁরই বলে। কিন্তু ব্যতিক্রম একটা বিষয়ে এবং তা হলো মন। এই মনটা একটু ছোটাছুটি বেশি করে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নানাভাবে কথা বলতে চায়, বলে। আচার-আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় মনের ভাব। বিধি মেনে না চললে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিজেকে বিনাশ বা ক্ষতির দিকে ফেলে দেয়। এই বেপরোয়া মন ভুলে যায় গুরু কী শিক্ষা দিয়েছেন! কী বলে গেছেন! এভাবে আমি মনে এক, মুখে আর এক। এভাবে আমি যেন না হয়ে যাই মোনাফেক!মো. আব্দুল ওয়াহেদ প্রশ্নোত্তর-পর্বে অংশগ্রহণ করে ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে আগ্রহী সুধীবৃন্দের জানার বিষয়গুলোভাবে চমৎকারভাবে তুলে ধরার জন্য শাহ্ ড. আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ  ও কৃতজ্ঞতা জানান।

সভাপতির বক্তৃতায় শাহ্ খায়রুল মোস্তফা বলেন, নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে চলমান মেশিনের মতো। সাধকগণ তাঁর শিষ্যদেরকে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার শিক্ষা দিয়ে থাকেন। মানুষের আচরণ হচ্ছে তার স্বভাবের বহিঃপ্রকাশ। ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে উত্তর-পর্বে অংশগ্রহণের জন্য তিনি সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং চিন্তন বৈঠকে আলোচিত সকল বিষয়গুলোকে এক সাথে তা গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করা হবে বলে জানান এবং বৈঠক মূলতবী ঘোষণা করেন। য