স্ব-ভাবে স্বভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে নিজেকে নিজে গড়ি

সংলাপ ॥ মানুষ জন্মাবার পর পারিপার্শ্বিকতা হতে তার অভ্যাসের মাধ্যমে স্বভাব গড়ে তোলে। প্রথমে সে চোখকে বেশি কাজে লাগায়। অনুকরণ ও অনুসরণ করতে চেষ্টা করে পরিবারের সদস্যদের এবং চোখ দিয়ে যা দেখছে সেগুলোকে। অতঃপর চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বকের সহযোগিতায় হাত, পা, মুখ, পায়খানা ও প্রসাবের রাস্তা সমূহের দ্বারা বিভিন্ন কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত করে। যখনই কোন কর্ম করে তখনই সে সুখ, দুঃখ বা ঔদাসীন্যের সঙ্গে জড়িত হয়, কর্মফলের উপর নির্ভর করে। এভাবেই ধীরে ধীরে সে বড় হতে থাকে পরিবেশগত কর্মের মাধ্যমে। গবেষকদের মতে একজন পূর্নাঙ্গ মানুষ ৭ (সাত) হাজার হতে ৮ (আট) হাজার কর্মের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে প্রতিদিন। প্রতিদিনের এই কর্মগুলোর মধ্য দিয়েই একই পরিবেশ অন্তর্ভুক্ত কর্মের বারবার বাস্তবায়নে তার গড়ে ওঠে অভ্যাস। এই অভ্যাসের বার বার প্রকাশ ভঙ্গিকেই আমরা স্বভাব বলে থাকি। ধর্মীয় আঙ্গিকে স্বভাবের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। স্বভাবের উপর বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে সর্বযুগে-সর্বকালে সকল ধর্মে।

ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে সরাসরি স্বভাবের উপর জোর দেয়া হয়েছে আত্মিক উন্নতির জন্য। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) বলেছেন : সৎ-স্বভাবই ধর্ম।

ধর্মীয় গবেষকগণ স্বভাবের পরিচয় বা তত্ত্ব বিশ্লেষণে নানা মতের জন্ম দিয়েছেন নিজেদের জানা ও উপলব্ধিবোধ হতে। যেমন – হাসি মুখ, কষ্ট সহ্য করা বা অত্যাচারে প্রতিশোধ না নেয়া। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এগুলো এক একটি শাখা বা লক্ষণ কিন্তু স্বভাবের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নয়।

মানুষ প্রাকৃতিক নিয়মেই জন্ম নেয়। পরবর্তীতে নিজের এক এক রূপ সৃষ্টি করে বিবর্তনের ধারায়। পরিবেশকে মোকাবিলা করার জন্যে কর্ম করে। কর্মের মধ্য দিয়েই তার চিন্তাজগত ব্যস্ত থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রকৃতি ও বৃত্তিগুলো সমভাবেই বিকশিত ও স্ফূর্ত হয়। এই বিকাশের ধারা থেকেই জানার আগ্রহ, বুদ্ধিমত্তা, দমন শক্তি, প্রবৃত্তিগুলো জেগে উঠে। এদের মাঝে সমতা এবং সামঞ্জস্য রক্ষা করার জন্য উদ্ভব ঘটে বিচার শক্তির। এই শক্তির কম স্বভাব অপূর্ণ থাকে। কম হলে দুর্বল বা অকর্মণ্য হয় আর বেশি হলে কুৎসিত আকার ধারণ করে এবং তা তার কর্মের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। একই তালে শক্তির প্রবৃদ্ধি যখন ঘটে একটা কর্মকে কেন্দ্র করে তখনই গড়ে ওঠে স্বভাব। স্বভাব দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এবং তা যথাক্রমে সৎ-স্বভাব ও অসৎ স্বভাব। এই দুই স্বভাবের মধ্যে ব্যবধান নির্ণয় করার জন্য কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যক্তি যখন তাকে সজাগ রাখে তার বিচার শক্তি দিয়ে এবং প্রতিটি কর্ম বিশ্লেষণ করে চৈতন্যশীল হয় তখনই তার মধ্যে দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয় আর এই দ্বন্দ্বই তাকে তার মতো করে সৎ-অসৎ পথের সন্ধান দেয়।

যখনই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় প্রতিটি কর্মকে ঘিরে তখনই উচ্চস্তরের ব্যক্তিত্বের সংসর্গে আসা একান্ত আবশ্যক যিনি আত্মসংশোধনের বীজ বপন করতে পারেন তার মধ্যে। তিনি উন্নতির পথগুলো ব্যাখ্যা করবেন এবং পারিপার্শ্বিকতা গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবেন। এছাড়াও যখন কেহ কর্ম বিশ্লেষণ করে নিজে উপলব্ধি করে তার কর্মগুলো খারাপ তখন তাকে ঠিক উল্টো কর্মগুলো করতে হবে যাতে সে নিজেকে দমন করতে পারে এবং সঠিক পথে চলতে পারে। কাজের অভ্যাস করতে থাকলে পরিশেষে এই অভ্যাসই তার স্বভাব হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কারণেই বলা হয় অভ্যাস থেকেই স্বভাব। এখানেই অনুসন্ধিৎসু মানুষ পথ প্রদর্শক খোঁজে এবং গুরুর সন্ধান করে  আত্মিক উন্নতির জন্যে। গুরু তাকে পথ দেখায় – স্বভাব গড়ার জন্য।

দেহকে কার্যকরী করে যে সমস্ত কাজ করা যায় তার একটা প্রভাব অভ্যন্তরীণ চিন্তাজগতের মধ্যে বিস্তার লাভ করে। ফলে ব্যক্তি এক অনির্বচনীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময় হয়ে ওঠে। গুরুর নির্দেশ আনন্দের সাথে পালন করে চলে। না পারার পথ ধরে নিষ্ঠা সহকারে পালন করা প্রয়োজন।

সাধনা এবং পরিশ্রম দুটোর সাহায্যেই স্বভাব ও গুণ অর্জন করা যায় এবং আধ্যাত্মিক জগতই মানবজাতির মূল উৎপত্তিস্থল। ধন-দৌলত এবং পার্থিব প্রতিপত্তির মোহে মত্ত থাকলে পার্থিব স্বভাব গড়ে উঠে। বুদ্ধিমান সেই যে নিজের দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে সজাগ থাকে।

এই আলোকে ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বভাবের কি প্রয়োজন তা একটু চিন্তা করলে বেশ বুঝা যাবে। প্রত্যেকটি পরিবার সচেতন হলে সমাজ সচেতন হবে এবং সামাজিক পরিবর্তনের পথ খুলে যাবে।

অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জীবনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন কর্ণধারদের অবশ্যই আদর্শিক স্বভাবী হতে হবে। তাঁদের আদর্শিক স্বভাব থাকলে তারই স্পর্শে প্রশাসনিক ধারায় সত্যের প্রভাব পড়তে থাকবে যা শুধু সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করবে না বরং অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে।

পৃথিবীর সকল চোখকে ফাঁকি দেয়া যায় কিন্তু নিজের বিবেককে ফাঁকি দেয়া যায় না। তাই মানুষ সংসার জীবনে শুধু লোভ আর মিথ্যা অহংকারের বশবর্তী হয়ে বিবেকের তাড়নাকে ঢাকা দেয়ার জন্য অভিনয় করে যাচ্ছে মাত্র। ব্যক্তিজীবনে প্রত্যেক মানুষই ধর্মপালন করে যাচ্ছে আর সেটা হচ্ছে তার ইচ্ছামতো ইচ্ছাধর্ম। তাতে তার লোভ ও অহংকার দিন দিন বাড়ছে বই কমছে না। ‘সংযম’ বলে শব্দটা বই পুস্তকে রয়ে যাচ্ছে কিন্তু ব্যক্তিজীবনে এর যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।

সংযমকে স্ব-স্ব জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করে চোখ। এই চোখই যতো নষ্টের গোড়া আবার এই চোখই সাধারণ মানুষকে আত্মিক উন্নতিতে প্রধান সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে অভ্যাসের পরিবর্তন ঘটায়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তির অভ্যাসের পরিবর্তন দলের উপর প্রভাব বিস্তার করতে করতে সমগ্র জাতির স্ব-ভাব গড়ে প্রভাব বিস্তার করে জাতীয় জীবনে, এক মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। তাই প্রয়োজন নেতৃত্বদানকারী নেতা-নেত্রীর অভ্যাসের পরিবর্তন। বিপদে পড়লে মানুষের চরিত্রের অনেক দিক উন্মোচিত হয় আবার প্রকৃত বন্ধুও চেনা যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে দেশবাসী না খেয়ে থাকতে পারে কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তারা একটু শান্তি চায়, একটা সুন্দর পরিবেশ চায় যেখানে সার্বিক আতঙ্কমুক্ত থাকতে পারা যায়। আসুন না, আমরা একবার নিজের অভ্যাসগুলো  পরিবর্তন করে স্ব-ভাবে স্বভাবী হওয়ার প্রতিজ্ঞা  নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পথে পা রাখি।