সরাইলের শাহজাদাপুরে সূফী সাধক শাহ্ জালালের সফরসঙ্গী

সূফী সাধক শাহ্ রুকনউদ্দীন আনসারী’এঁর
পূণ্যস্মৃতি এতিহ্য রক্ষার ডাক দিয়ে যায়

 (পর্ব - ৪)

এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুর্তাজা আলী আরও লিখেছেন, ‘সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের বংশে দ্বিতীয় নাসিরউদ্দীন একজন বিখ্যাত দরবেশ ছিলেন। এই বংশে বিখ্যাত শাহ্ ওলী শাহ্ দাউদের জন্ম হয়। তাঁর চিল্লাহ্ খানাই দাউদ নগরের দরগাহ। এই দরগাহে শাহ্ দাউদের ব্যবহৃত তক্তপোষ সংরক্ষিত আছে। ঐ দরগাহের সংলগ্ন পুষ্করিণীতে অসংখ্য গজার মাছ সর্বদা ভেসে বেড়ায়। শাহ্ দাউদ তরফ থেকে তাঁর নামীয় দাউদপুর পরগণা খারিজ করেন। ফতেহ গাজী শাহাজী বাজার রেলস্টেশনের নিকটে রঘুনন্দন পাহাড়ে ফতেহ্পুর মৌজায় অবস্থান করতেন; ঐ স্থানে তাঁর চিল্লাখানা এখনও প্রদর্শিত হয়। এই পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর ভাগ্নে মাহমুদ গাজী ও মসউদ গাজীর কবর আছে; এখানে বৎসরে একবার মেলা বসে। এই দরগাহের ব্যয় নির্বাহের জন্য মোঘল বাদশাহের সময় থেকে একটি গ্রাম লাখেরাজ আছে। সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের বংশে সৈয়দ সালেহ বা সুলেমান শাহ্ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাজার রঘুনন্দন পাহাড়ের পার্শ্বে রেললাইনের ধারে অবস্থিত। উহা সুলেমান শাহের দরগাহ নামে পরিচিত (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-৩২-৩৩)।

সৈয়দ বদরুদ্দীন ওরফে শাহ্ বদর: তিনি সৈয়দ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে তরফ জয় করতে গিয়েছিলেন। তরফ বিজয়ের পরে তিনি বদরপুরে অবস্থান করেন। বদরপুর রেলস্টেশনের নিকটে তাঁর মাজার অবস্থিত। তাঁর নামানুসারে ঐ স্থানের নাম বদরপুর হয়েছে। এক সময় বদরপুরের নিকটবর্তী বরাক নদীর বাঁকে নৌকা চলাচল বিশেষ দূরূহ ছিল। ঐ বাঁকে নৌকা নিয়ে যাবার সময় মাঝিরা পীর বদরের নামে শিরনী দিয়ে যেত। সম্ভবত এই শাহ্ বদরই চট্টগ্রামের বিখ্যাত বদর পীর। চট্টগ্রামের ইতিহাসে জানা যায় যে, চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম বিজেতা কদল খান গাজীর সঙ্গে বদর পীরের দেখা হয়েছিল। ঐ ঘটনা বাংলার সুলতান ফখরউদ্দীন মোবারক শাহের সময়ে ১৩৩৮ খ্রীস্টাব্দে ঘটে। বদরপুরের শাহ্ বদরের ঐ সময়ে জীবিত থাকার সম্ভাবনা আছে, কারণ তিনি শাহজালালের সমসাময়িক। নৌকার মাঝিমাল্লারা বিপদে পড়লে সর্বদাই বদরপীরের স্মরণ করেন’ (পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা:২৮)। 

‘সরাইল’এর নামকরণ নিয়ে অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদ ১৯৯৫ সালে ঢাকাস্থ সরাইল থানা সমিতির প্রকাশিত ‘সরাইল যুগে যুগে’ গ্রন্থে লিখেন-‘দেশ ও দেশবহির্ভূত প্রথিতযশা ইতিহাসবেত্তাদের মূল্যবান বই-পুস্তকাদি অধ্যয়ন, আর সুদীর্ঘ ৫০ বৎসর যাবৎ মেঘনা-তিতাস-লাহুর নদীর বাঁকে বাঁকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষার উন্নয়নমূলক সৃষ্টিধর্মী কর্মকা-ে অবস্থান করে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও গবেষণাধর্মী কার্যকলাপের সাথে পঠিত ও অধীত বিদ্যার নির্যাসের সমন্বয়ে একটি সত্যে উপনীত হয়েছি-৭শ’ বছর পূর্বে সরাইলের অন্য নাম ছিল। আমার বক্তব্যের পেছনে যে যুক্তিগুলো দেবো তা বলার আগে সবিনয়ে আরজ করছি যে, এ যুক্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবেত্তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্তর দশকের উপাচার্য ডঃ আব্দুল করিম সাহেব-এর দ্বারস্থ হয়েছিলাম। তিনি আমাকে এ নিয়ে সন্দর্ভ লিখতে বলেছিলেন। কেননা, বাংলার ইতিহাসের এ অংশটা তখন (এখন) পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।

সরাইলকে সর্বপ্রথম ভৌগলিকভাবে চিহ্নিত করি। হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎসারিত হয়ে ইতিহাসের বিখ্যাত নদী গঙ্গা প্রবাহপথে পললে পললে গড়ে তুলেছে বদ্বীপ সদৃশ জনপদ ‘বঙ্গ’। এই বঙ্গ বা বাংলাদেশের পূর্ব দক্ষিণে বর্তমান মেঘনা নদীর পূর্ব তীর ও ত্রিপুরা পার্বত্যাঞ্চলের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি সরাইল। ভাটি নামে এটি অভিহিত হয়ে আসছে। আমার ধারণা ভাটি অঞ্চলের রাজধানী সরাইলের কোথাও না কোথাও ছিল। আমরা এর নামকরণের বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে এগিয়ে গেলে তার ইতিহাস অনেকটা উন্মোচিত হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

সরাইল থানার কালীকচ্ছ গ্রামটির অস্তিত্ব প্রাচীনকালের ‘কালীদহ’ সাগরের অস্তিত্বের সত্যতাজ্ঞাপক। তবে এ কালীদহ সাগরের সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস অর্থাৎ চর ঠেকাতে চাষাবাদের সময় আইল বা বাঁধ বাধা হতো বলে সরাইল নামকরণের যুক্তিটা বেমানান লাগে। সর+আইল=সরাইল হয়ে গাঙ্গেয় বদ্বীপের সর্বত্রই এমন নামকরণ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ‘ইতিহাস কথা কয়’ নামক পুস্তকে বড় দেওয়ান পাড়ার ফরিদ উদ্দীন ঠাকুর অবশ্য এ মতই পোষণ করেন। 

সরাইলের নামকরণ নিয়ে আকৈশোর অনুসন্ধিৎসু ছিলাম। আমার পিতা পীরজাদা শেখ মাসিহুজ্জামান আমাকে সিলেট বিজয়ের কাহিনী বলতেন। বলতেন এ অঞ্চলে আমাদের বংশের আগমনের কথা। পিতার মুখের কথা ও আমার অধীত পঠিত বিদ্যার সমন্বয়ে বুঝতে থাকি যে, মুসলমানদের সিলেট বিজয়ের পরবর্তী একটি রাষ্ট্রবিপ্লবের সাথে ‘সরাইল’ নামকরণ জড়িত। যে স্থানের বর্তমান নাম সরাইল এ স্থানটির ওপর দিয়ে সিলেটে বিজয়াভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তবে তখন স্থানটির অন্য নাম ছিল।’ অধ্যক্ষ শেখ আবু হামেদের এ দাবির সাথে সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ‘হযরত শাহজালাল ও সিলেটের ইতিহাস ’ গ্রন্থে বর্ণিত বিবরণীর মিল পাওয়া যায়। (চলবে)