সময়ের সাফ কথা…. ওয়াহিদুল হকের বাংলা

200px-HaqueWahidulসংলাপ ॥ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পরিচয় না থাকলেও একজন লেখক সাংবাদিক বা কলামিস্ট শুধুমাত্র তাঁর লেখনী দ্বারা একজন পাঠকের কাছে যে কত আপন হয়ে উঠতে পারেন তার এক বড় উদাহরণ তিনি। যাঁর নাম ওয়াহিদুল হক। ২৭ জানুয়ারি তারিখটি হলো তাঁর প্রয়াণদিবস।

২০০১ সালের অক্টোবরে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানকারীদের যোগসাজশে সীমাহীন লুটপাট, অনিয়ম, সন্ত্রাসে জর্জরিত বাংলার মানুষের কথাগুলো তাঁর নিজের মতো বলতে পেরেছিল আর ক’জন? একদিকে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অপরদিকে মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে পুঁজি করে সীমাহীন কালো টাকার মালিক ও সঙ্গে দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী কোম্পানীগুলোর রমরমা মিডিয়া বাণিজ্যের প্রসারেও তিনি ছিলেন সমভাবে ব্যথিত।

হাজার বছরের বাংলা ও বাঙালি, এর ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, অসামপ্রদায়িক চেতনা, সুরসাধনাকে যিনি ধারণ, লালন ও পালন করেছেন সারাটা জীবন তিনি বাংলার দুঃখে, লাঞ্ছনায় ব্যথিত হবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ যেখানে গুটি কয়েক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হতে থাকে সেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে যতই থাকুক, তা সেই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারে নিয়োজিত হয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বিএনপি-জামাত জোটের সময়ে বাংলাদেশে হয়েছেও তাই। হাতে গোনা কয়েকটি দৈনিক সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের প্রতিবাদী ও দায়িত্বশীল ভূমিকায় দেশের সেই কঠিন বাস্তবতা পাঠকের সামনে উঠে এসেছে। তবুও প্রকৃত চিত্র মানুষ উপলব্ধি করেছে নিজ নিজ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে। যে কারণে দুঃশাসনে জনগণ অতীষ্ঠ হলেও তাদেরকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামতে দেখা যায়নি। বলা চলে তৎকালীন সরকার গণতন্ত্র, পার্লামেন্ট, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ইত্যাদি সবকিছু বজায় রেখেই মানুষকে জিম্মি ও অসহায় করতে পেরেছিলো। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকায়ও জনগণ তুষ্ট না হওয়ার পেছনে তাদের জনসম্পৃক্ততা নিয়েও সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। আর সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোও জনগণকে কোনো পথ দেখাতে পারেনি।

সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক বাংলার জনগণ ও সংবাদপত্র তথা প্রেসের এ দুরাবস্থার কথাগুলোই বলেছিলেন, ২০০৫ সালের ২৬ মে দৈনিক সংবাদ’এর ৫৫ তম বর্ষপূর্তি সংখ্যায় -‘প্রেসের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মিলিত রূপের অর্ধেকেরও অনেক বেশি সরকারের কেনা। স্বল্প-শিক্ষিত দেশে সংবাদপত্রের চাইতে টেলিভিশনের প্রভাব অনেক বেশি। সেই টেলিভিশনের সবটা-তাবৎ চ্যানেল, সাংবাদিক, কলা-কুশলী সরকারের সাক্ষাৎ কিংবা পরোক্ষ প্রভাবাধীন। …… বাংলার প্রেস আজ পৃথিবীর নিকৃষ্টতম ম্যানেজড প্রেসের একটি। এটি এখন কোনক্রমে রাষ্ট্রিক ও ব্যক্তিক স্বাধীনতাকে পরিমাণ ও গুণগতভাবে বৃদ্ধি করার কোন প্রতিষ্ঠান নয়। আবদ্ধ প্রেস অন্ধকারেও শৃঙ্খলে আবদ্ধ প্রাণীর মতোই বিকাশহীন ও পচনশীল হতে বাধ্য। এতোসব বাধা বন্ধের পরেও বাংলাদেশের প্রেসের মূলধারা এবং প্রবণতাটি দালালির বিপরীতে। বীরত্বের প্রবণতার।’

এই বক্তব্যের স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল দৈনিক জনকন্ঠে তাঁর ‘অভয় বাজে হৃদয় মাঝে’ ও ভোরের কাগজে ‘এখনো গেল না আঁধার’ শীর্ষক কলাম। সময়ের সাহসী সৈনিক সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ এবং হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ সম্পর্কেও তিনি লিখেছিলেন। ভোরের কাগজে-এর ‘এখনো গেল না আঁধার’ কলামে তিনি ‘বর্তমান সংলাপ’ সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘রাষ্ট্র আক্রান্ত হওয়ার ঘোর নিদানের কালে ‘বর্তমান সংলাপ’ পত্রিকাটির চাইতে বড় বেশি সাহসী ভূমিকা আর কেউ পালন করেনি।’ ওই কলামেই ‘এক হাক্কানীতে কি অন্ধকার যাবে’ শীর্ষক শিরোনামে এক দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন। এ জাতীয় কলাম যে দেশের পত্রিকায় ছাপানো হয়েছে, সে দেশের প্রেসের প্রবণতাকে দালালির বিপরীতে বীরত্বের প্রবণতা না বলার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের আড়ালে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্বরূপ বিশ্লেষণে তাঁর এই দুই কলাম আগামী দিনে গবেষকদের জন্য মহামূল্যবান হয়ে থাকবে। তবে নিরক্ষর প্রধান এই  দেশের দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, শতকরা দশভাগ জনগণের কাছেও তাঁর এই দুই কলামের লেখাগুলোও পঠিত হয়েছে কি-না সন্দেহ। যে দেশের একজন নিরক্ষর লোকেরও ‘রিমোর্ট’ টিপে টিপে চল্লিশ/পঞ্চাশ বা আরো বেশি টিভি চ্যানেল দেখার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে সেখানে ওয়াহিদুল হক-এর লেখা পড়ার সময় তাদের কোথায়? কথিত শিক্ষিত এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হিসেবে গর্বিত অনেক সচেতন পাঠকের কাছেও তাঁর কলাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘খুব কঠিন লেখা’ বা তিনি ‘লেখায় এক জায়গায় থাকেন না’।

কবি শামসুর রহমান একবার ওয়াহিদুল হককে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে ‘বান্ধব তোমার জন্য’ শীর্ষক কবিতায় লিখেছিলেন-

‘বান্ধব তোমার কথা ভাবলেই এই বাংলার/ পথঘাট, উদার প্রান্তর, নদী দীঘি, খাল বিল,/ পাল তোলা নাও, ফিঙে শ্যামা পাখি, গ্রামীণ দুপুরে/ …..কি ক’রে যে……/ নিজের ভেতরে তুমি সব কিছু করেছ ধারণ -/ এ এক বিস্ময় আজো আমার নিকট। সত্য, শিব,/ সুন্দরের ধ্যানে কাটে তোমার প্রহর নিত্যদিন।’

আইয়ুবী শাসনামলে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন, ছায়ানটের মতো সংগঠন প্রতিষ্ঠা যে সংগঠন বাংলার জনজীবনে আজ পহেলা বৈশাখ-নববর্ষের উদযাপনকে একমাত্র সর্বজনীন উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে, স্বাধীন বাংলা সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা গঠনসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক ও প্রস্তুতি পর্বে যার অসামান্য অবদান এবং সর্বোপরি একটি অসামপ্রদায়িক ও সাম্যের সমাজ গঠনে মানুষকে শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান করে তুলতে যিনি একজন বড়মাপের শিক্ষক ও দক্ষ সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছেন অত্যন্ত নির্মোহ ভাবে তাঁর সম্পর্কে তাঁর প্রিয় জন্মভূমির মানুষদের খুব কমজনই জানতে পেরেছেন। তাঁর থেকে গ্রহণ করার ব্যাপারটা তো আরো পরের কথা। ষোল কোটিরও বেশি মানুষের এ দেশে তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলো খেটে খাওয়া মানুষ বিশেষ করে কৃষক ও গার্মেন্টস কর্মীরা যারা এ দেশটাকেও আজো বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর মরদেহ ২৮ জানুয়ারী ছায়ানট ভবনে, জাতীয় শহীদ মিনারে ও জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে আনার পর তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের সংখ্যা বড়জোর কয়েক হাজার হতে পারে, যারা তাঁকে একান্ত কাছ থেকে জানতে পেরেছিলেন, দেখেছিলেন এঁদের বেশির ভাগই দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সংবাদপত্র জগতের সামনের সারির লোক কিন’ যে দেশ ও মানুষদের অগ্রগতি নিয়ে তিনি ভাবতেন অর্থাৎ বাংলাদেশের আপামর জনগণ তাদের কাছে তিনি অজানা ও অপরিচিতই রয়ে গেলেন। এমনকি অনেক মিডিয়ার শীর্ষ সংবাদেও তাঁর মৃত্যু সংবাদটি যথাযথ স্থান পায়নি। দেশের অধিকাংশ জনগণকে একই সাথে সুশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত করে তুলতে না পারলে ওয়াহিদুল হকদের মতো গুণীদের আলো থেকে তাঁরা বঞ্চিতই হতে থাকবে। ওয়াহিদুল হকদের স্বপ্নের দেশ গড়ে তোলাও সহজ হবে না। হে দুর্দিনে অভয়দানকারী! তোমাকে নমস্কার। হে নির্মোহ, সাধক বাংলা ও বাঙালির জন্য তুমি লিখে গেলে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। সাংবাদিক পরিচয়টি তোমাকেই মানায়।