সময়ের সাফ কথা….

‘হক’ এর বচন-

‘সাড়ে সাতশো কোটি মানুষের ধর্ম সাড়ে সাতশো কোটি’

নজরুল ইশতিয়াক ॥ যিনি ঘর (ঘোর, ঘেরাটোপ, মায়া, মোহ, সংকীর্ণতা) থেকে বের হয়েছেন কিংবা হতে পেরেছেন, গোটা পৃথিবীই তার দরবার, তীর্থভূমি, এবাদতের স্থান। সূফী সাধনপীঠে দরবার হলো সেই তীর্থ, সেই পাঠাগার, সেই দর্শন কেন্দ্র যেখানে আত্মদর্শনের অভূতপূর্ব পরিবেশ বিরাজ করে। দরবারে এসেই নিজেকে দর্শন করে নিতে হয়। আসতে হয় আশেক হয়ে। তখন ধরা পড়ে জীবন সত্য। পিছনের সত্য দেখা হয়। ফলে দেখা হয় পরকাল, বারবার মৃত্যু, বারবার জন্মের সত্য। গোটা পৃথিবীই একটা দরবার। ভিতরে বাইরে সব একাকার হয়ে যায় ভক্ত রূপি সত্য পথযাত্রীর। নবী মুহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদেও উপর বর্ষিত) বলেছেন- গোটা পৃথিবীর জমিনই মুমিনের মসজিদ। এই যে ঘর কিংবা ঘোর, ঘেরাটোপে আবদ্ধ জীবন, সেটিই তো অন্ধকার। নানান সংস্কারাবদ্ধ। আবদ্ধ জীবনের কোন খুঁটি নেই, আছে মায়া-মোহ সংকীর্ণতার সুক্ষ্ণ জাল।  সীমাহীন পরনির্ভরশীলতা, সংঘাত-সংঘর্ষ। মায়ার পাহাড় উচু হতে হতে চারদিক দিয়ে ঢেকে ফেলে। বাইরের অবারিত আকাশ, আলো দৃষ্টান্ত, নির্দশন কোন কিছুই আর দেখা হয়ে উঠে না। বিচ্ছিন্নতা বাড়ে, বাড়ে রোগ, জীবনের মহাযাত্রা রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বদ্ধ ডোবার জল যেমন পচে যায় ঠিক তেমন। কিন্তু তবুও পরম প্রকৃতি তার আপন ইচ্ছায় সজল বরষার জল হয়ে আসে সিক্ত করে ডোবার বদ্ধ জলকে। সাময়িক সেই জলধারা আলোড়িত হয়, নব জোয়ারে । কিন্তু ডোবার জল কখনোই আপন ইচ্ছায় নিজেকে সেই বন্দি দশা থেকে মুক্ত করতে পারে না। কেবল দৈন্যতা নিয়ে অপেক্ষা করতে পারে। আত্মসমর্পণ করতে পারে। ইচ্ছেময়ীর ইচ্ছের কাছে সমর্পণই মুসলিম হওয়া। মুসলিমের ধর্ম শান্তি। এখন নামে মুসলিম তো শান্তি বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি শ্বাশত রুট। যা অনাদীরও আদি থেকে সনাতন হয়ে প্রবাহমান হয়ে রয়েছে।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর অমৃত কথা-  “সংস্কারমুক্ত হয়ে সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার পথে পা বাড়াও, তুমি তোমার আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হবে না।” এই যে সংস্কার, সংস্কার কেবল শব্দ নয়, সংস্কার এক একটি জাল বন্ধন ঘেরাটোপ। জাত, পাত, বংশ মর্যাদা, পদ-পদবী, অর্থ, ট্যাগ, শিক্ষার অহংকার। কর্তৃত্ব, আধিপত্য, জবর দখল, পাণ্ডিত্য সবই হয়ে উঠতে পারে সংস্কারের ঘেরাটোপ। লোকের কথায় চলা, উঠা, বসা সবই সংস্কার। মনগড়া সব কাজ এক একটা সংস্কার। সূরা বাকারায় মনগড়া কাজকে তুলনা করা হয়েছে ছাইয়ের সাথে। যা একটা ছোট ঝড়ে উড়ে যাবে। লালন ফকির তুলনা করেছেন – অসময়ে কৃষি করার সাথে। যার কোন সুফল নেই। মিছামিছি খাটুনী। সাধনার নামে, পীরতন্ত্র, সূফীবাদ, ওহাবীবাদ, সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত বাজারের পণ্য হয়ে উঠেছে কোথাও কোথাও। বাউল সাধনা, গবেষণার নামেও বহু সেলসম্যান জুটেছে হাল আমলে।  সুফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর  অমৃত কথা- “চোখ থাকবে অন্ধ, কান থাকতে কালা, মুখ থাকতে বোবা হয়ে যে আল্লাহর হুকুম পালন করে সেই  সর্বোত্তম”। বানীটিতে মহান সাধক সব ধরনের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে চলার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষ মূলত বহু মিশ্রণ ও প্রভাব দ্বারা আচ্ছন্ন একটি জীর্ন বস্তু। বিশ্বাসঘাতক তার চোখে, কানে, হৃদয়ে, রিপু ও রিপু প্রভাবিত ইন্দ্রিয়জাত। কেবলই আত্মদর্শন, আত্ম-উপলব্ধির সত্যকে ধরেই যিনি পথ চলতে পারেন প্রভাবমুক্ত হয়ে, তিনিই পারবেন। সৎ সঙ্গ, সৎ স্বভাবে আমি ও আমরা এই দৃষ্টি ভঙ্গিই হলো সংস্কার মুক্ত হয়ে চলা। সব সাধনপীঠ একটি সম সমাজ। মনগড়া কারসাজি নয়, নয় গালগল্প খেলা খেলা। আর ধর্ম কারো বাপের নয়, কোন গোষ্ঠী গোত্রের পণ্য নয়। এটি অবারিত ফসলের মাঠ। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বললেন -‘সাড়ে সাতশো কোটি মানুষের ধর্ম সাড়ে সাতশো কোটি।’