সময়ের সাফ কথা….মহানবী ছিলেন উচ্চতম মানবতার প্রতীক

নূরে মোহাম্মদী’র আদর্শ গুণসম্পন্ন

মানুষই হলেন সূফী বা ‘সত্যমানুষ’

সংলাপ ॥ ‘তোমাকে (মোহাম্মদ) বিশ্ববাসীর জন্য কেবল রহমত স্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি’। (সূরা আম্বিয়া-১০৭) হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) সমগ্র বিশ্বের মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ ও রহমত স্বরূপ, যেহেতু তাঁর বাণী বিশেষ জাতি বা দেশের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মাধ্যমে বিশ্বের জাতিসমূহ আল্লাহ্ অনুগ্রহপ্রাপ্ত হয়েছে।

সূরা আহযাবের ২১ আয়াতে আছে – “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহ্ রাসূলের (মোহাম্মদ) মধ্যে উৎকৃষ্টতম আদর্শ রহিয়াছে তাঁহার জন্য, যে আল্লাহ্ ও পরকালের আশা রাখে এবং আল্লাহ্কে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে।” মানুষের মনের প্রকৃত পরিচয়, তার মাহাত্ম্য বা সংকীর্ণতা তখনই পাওয়া যায় যখন সে মহাবিপদে বা ঘোর অন্ধকারে পতিত হয় অথবা যখন সে নিজের শত্রুকে পরাজিত দেখে কৃতকার্যতা ও বিজয়ের গৌরব অর্জন করে। ইতিহাসে একথার ভুরি ভুরি সাক্ষ্য প্রমাণে ভরপুর যে, মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) স্বীয় সঙ্কট মুহূর্তে যেমনি মহান ও মহীয়ান ছিলেন, স্বীয় কৃতকার্যতা ও বিজয়ের মুহূর্তে তেমনি মহান মহীয়ান ছিলেন। সঙ্কট বা বিপদ তাকে হতাশ বা মুহ্যমান করেনি। আবার কৃতকার্যতা ও বিজয় তাকে গর্বিত করেনি।  

হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর চরিত্র মাহাত্ম্যের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল স্বাক্ষর এই যে, যারা তার নিত্যসঙ্গী ছিলেন এবং তাঁকে ঘনিষ্টভাবে জানতেন তারা সকলে তাঁকে সত্য নবী বলে গ্রহণ করেছিলেন।  এদের মধ্যে ছিলেন বিবি খাদিজা, হযরত আলী, হযরত আবু বকর ও মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস যায়েদ।

মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) ছিলেন উচ্চতম মানবতার প্রতীক। তিনি ছিলেন সুন্দরের, কল্যাণের ও পরহিতের মহত্তম আদর্শ। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনের ও মহান চরিত্রের যে কোনো দিক দিয়ে তিনি ছিলের অনুপম। তিনি মানবতার জন্য অতুলনীয় দৃষ্টান্ত ও আদর্শ, সর্বাধিক অনুসরণযোগ্য। তাঁর জীবন, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, উন্মুক্ত ইতিহাসের মতো পাতায় পাতায় বর্ণিত। তিনি অনাথ বালক হিসেবে জীবন শুরু করেন এবং সমগ্র জাতির ভাগ্যনিয়ন্তা হিসেবে জীবন সমাপ্ত করেন। বালক বয়সে তিনি ছিলেন শান্ত, গম্ভীর ও মর্যাদাবান। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন নীতিবান, চারিত্রিক গুণাবলীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ, ন্যায় ও গাম্ভীর্যের মূর্ত প্রতীক। মধ্য বয়সে তিনি সকলের কাছে হলেন আল-আমিন (বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী)। ব্যবসায়ী হিসাবে তিনি ছিলেন বিবেক-বিবেচনা ও সততার শীর্ষে। পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন অতিশয় স্নেহশীল, বন্ধু হিসাবে ছিলেন বিশ্বস্ত ও বিবেচনাশীল। একটি অধঃপতিত সমাজের সংস্কারের গুরু দায়িত্ব যখন তাঁর কাঁধে চাপল এবং এই কারণে যখন অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হলেন, তখন তিনি মোটেই দমে যাননি। বরং ধৈর্য্য ও মর্যাদার সাথে তা বরণ করে নেন। সাধারণ সৈনিকরূপে তিনি যুদ্ধ করেছেন। আবার বড় বড় সেনাবাহিনী পরিচালনাও করেছেন। তিনি পরাজয় বরণ করেছেন, বিজয়ীও হয়েছেন। তিনি আইন প্রণয়ন করেছেন, আবার বিচারকের আসনও অলংকৃত করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাদাতা ও মানুষের নেতা। নিয়মিত সেনাবাহিনী ছাড়া, নিয়মিত দেহরক্ষা ছাড়া, নিয়মিত রাজত্ব ও রাজপ্রাসাদ ছাড়া যদি কোনো মানুষের এ কথা বলবার অধিকার থাকে যে তিনি ঐশী অধিকার বলে শাসন করেছেন, তবে সে অধিকার একমাত্র নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর ছিল। কেননা তিনি সর্বময় ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী ছিলেন। যদিও ক্ষমতা প্রয়োগের সব যন্ত্র ও ব্যবস্থাপনা তাঁর হাতে ছিল না। তিনি নিজ হাতে গৃহকর্ম করতেন, চামড়ার মাদুরে নিদ্রা যেতেন। দৈনিক কয়েকটি খেজুর কিংবা বার্লি-রুটি, পানিসহ আহার হিসাবে গ্রহণ করতেন। সারাদিন নানাবিধ কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের পর রাত্রির প্রহরগুলো তিনি দোয়া ও প্রার্থনায় কাটিয়ে দিতেন। বিশ্বে এমন কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই যিনি এসব পরিবর্তিত অবস্থা ও অবস্থানের ভিতর দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন, অথচ নিজে সামান্য পরিবর্তিত হননি। 

মহানবী হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিজে উম্মী – নিরক্ষর ছিলেন এ কথায় আধুনিক গবেষকরা সন্দেহ প্রকাশ করেন। কোনো শিক্ষকের কাছে রীতিসিদ্ধ শিক্ষা গ্রহণ না করেও নিজেই বিশ্বের শিক্ষকরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁর শিক্ষার ভার নিয়েছিলেন স্বয়ং বিশ্ব শিক্ষক, আল্লাহ্তায়ালা যেমন হযরত আদম (আঃ)-কে নিজেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। আর কুরআনে বলা হয়েছে ঃ ওয়া আল্লামা আদামাল আসমাআ কুল্লাহ… আর তিনি শিক্ষা দিলেন আদমকে যাবতীয় নাম। মানব রচিত কোনো পুস্তক থেকে নয়, প্রকৃতির বিশাল উন্মুক্ত গ্রন্থ থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) নিরক্ষর হওয়া  সত্ত্বেও তিনি মানুষের বিদ্যাশিক্ষার সমস্যার যে উৎকৃষ্ট সমাধান দিয়ে গেছেন, এমন অন্য কোনো মহাপুরুষ করতে পারেননি। তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে যে অপার্থিব মনীষা ও সংস্কৃতি মূর্ত হয়ে উঠেছে, তার তুলনা নেই। তাঁর ওপর প্রথম যে আয়াত নাজিল হল, সেটাই বিদ্যা শিক্ষার প্রেরণাব্যঞ্জক। বলা হল ঃ ইকরা বি ইসমি রাব্বিকাল্লাযী খালাক। খালাকাল ইনসানা মিন আলাক। ইকরা ওয়া রাব্বুকাল আকরা মুল্লাযী আল্লামা বিল কালামু আল্লামাল ইনসানা মালাম ইয়ালাম। অর্থাৎ পড় তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত, যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে- শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (৯৬ঃ১-৫)।

কুরআনপাক-এ আল্লাহ্ বলেছেন ঃ তোমরা আমাকে অনুসরণ কর এবং আমার নবীকে অনুসরণ কর। মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) এর কাছে ক্ষমা না পেলে আল্লাহ্ আমাদেরও ক্ষমা করবেন না। নবীর শাফায়াত লাভের উপায় হচ্ছে নবী আমাদের যা করতে বলেছেন সেগুলো আমল করা এবং যা নিষেধ করেছেন সেগুলো বর্জন করা। আমাদের আদর্শ একটিই – আমাদের নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)। তিনি সম্পূর্ণ মানুষ। তিনি একজন মানবতার মূর্তস্বরূপ।  

রাসুল করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর বাণীগুলো ভুলে আমরা দলে দলে বিভক্ত হচ্ছি, খন্ড-বিখন্ড হচ্ছি। একদল ডানে গেলে অন্যদল বাঁয়ে হাঁটে। একদল অন্য দলকে সঙ্কটে-বিপদে ফেলবার জন্য জোর চক্রান্ত করে, মোর্চা গঠন করে। এতে দেশের ও ধর্মের উপকার হয় না।  সাধারণ মানুষের কল্যাণে আসে না। হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর বাণী মিথ্যা হবার নয়। তিনি বলেছিলেন ঃ তোমরা আবার আগের  মতো বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং একে অপরের বিরুদ্ধে ফেতনা-ফ্যাসাদে লিপ্ত হবে। মুসলমানগণ ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, হচ্ছেও তাই। অথচ আল্লাহ্তা’লা পবিত্র কুরআনে বলেছেন ঃ তোমরা সকলে সমবেতভাবে আল্লাহ্ রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর। তোমরা পরস্পর বিভক্ত হইও না। এবং স্মরণ কর তোমাদের ওপর আল্লাহ্ নিয়ামতকে যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করলেন এবং তোমরা তারই নিয়ামতের ফলে পরস্পরের ভাই ভাই হয়ে গেলে (৩ঃ১০৪)।

অন্যত্র আল্লাহ্ বলছেন ঃ নিশ্চয়ই মোমেনগণ পরস্পর ভাই ভাই, অতএব তোমাদের মধ্যে বিভেদ সংশোধন করে শান্তি স্থাপন কর (৪৯ঃ১১)।

আল্লাহ্ আরও বলেছেন – আমার সরল ও সুদৃঢ় পথ অনুসরণ কর, অন্য পথের অনুসরণ করো না, কারণ সেগুলো আল্লাহ্ পথ থেকে তোমাদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে (৬ঃ১৫৪)।

কিন্তু হায়! ধর্মের নামে, ইসলামকে ব্যবহার করে, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ বজায় রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের ধর্মে যে সমস্ত ভালো গুণ ছিল, যা নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, সেগুলো ক্রমে ক্রমে আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ধর্মকে নিয়ে এক ধরনের উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দৃশ্যত মসজিদে অসংখ্য লোকের আগমন লক্ষ্য করি। দেশে এত মুসলমান, এত মসজিদ, এত ধর্মপ্রাণ মানুষ – তবুও এত দুর্নীতি, এত হত্যা, এত সন্ত্রাস কেন? দেশের মানুষ মিথ্যা বলে কেন? মানুষের চরিত্রে এত কলঙ্ক কেন? তাহলে বুঝতে হবে যে, মহানবী (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) আমাদের যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই শিক্ষা আর যেটুকু আমাদের গ্রহণ করা এবং অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল তা আমরা পরিহার করছি। 

ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী আমাদের জন্য রহমত বরকতে পরিপূর্ণ দিবস। নিজের অন্তরে সুপ্তভাবে বিরাজিত নুরে মোহাম্মদী সত্ত্বা যার যখন জাগ্রত হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিই হবে তার জন্য হাকিকতে ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী। মহানবীর আগমন দিবসে আমাদের শপথ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে – আমরা মুসলমান (শান্তি প্রিয়) হব। মোমেন (সত্যমানুষ) হব। আল্লাহ্ রজ্জুকে আঁকড়ে ধরব। নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত) কে অনুসরণ করব, তাঁর শিক্ষার আদর্শে নিজেদের জীবনকে গড়ে তুলব। ধর্মের নামে ইসলামের নামে মিথ্যাচার করে দেশের মানুষের ক্ষতি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করব না। সত্যমানুষকূলের বাণী- ‘সত্য মানুষ হোন, দেশ ও জাতির কল্যাণ হবেই হবে’-অনুস্মরণের মাধ্যমে নূরে মোহাম্মদীর চরিত্রগুণে নিজেদের সাজাবো।