সময়ের সাফ কথা…. বিজয়ের মাস ধর্মজীবীদের মুখোশ নতুন করে প্রকাশের ডাক দিয়ে যায়

‘তোমার প্রতিপালক ইচ্ছা করলে পৃথিবীতে যারা আছে তারা সকলেই বিশ্বাস করত। তবে কি তুমি বিশ্বাসী হওয়ার জন্য মানুষের ওপর জবরদস্তি করবে?’ আল কুরআন- ১০:৯৯।

‘অবশ্য যারা ধর্ম সম্মন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নয়, তাদের বিষয়টি আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। আল্লাহ্ তাদের কৃতকার্য সম্মন্ধে তাদের জানাবেন। কেউ কোন সৎ কাজ করলে সে তার দশগুণ পাবে আর কেউ কোন অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু এর প্রতিফল দেওয়া হবে, আর তারা অত্যাচারিতও হবে না।’

                                    –  আল কুরআন -৬ঃ১৫৯-১৬০।

‘হে বিশ্বাসের পথের যাত্রীগণ! তোমরা ধৈর্য্য ও প্রার্থনার মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ তো ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। যারা আল্লাহর পথে মারা যায় তাদের মৃত বলো না, না, তারা জীবিত; কিন্তু তা তোমরা বুঝতে পার না। আমি তো তোমাদের ভয় ও ক্ষুধা, ধনপ্রাণ ও ফলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্য্যশীলদের সুখবর দাও তারাই ধৈর্যশীল যারা তাদের ওপর কোন বিপদ এলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই আর আমরা তারই দিকে ফিরে যাব। এদেরই ওপর রয়েছে আল্লাহর আশীর্বাদ ও দয়া। এরাই সৎপথে পরিচালিত।’       – আল কুরআন -২ঃ১৫৩-১৫৭।

‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোন পূণ্য নেই; কিন্তু পূণ্য আছে দুঃখ, কষ্ট ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করলে।’ 

                                    – আল কুরআন-  ২ঃ১৭৭।

শেখ উল্লাস ॥ বাংলা ও বাঙালির জীবনে ফসলভরা মাঠ আর ধানকাটার আনন্দ নিয়ে চলছে অগ্রহায়ণ মাস। এই মাসেই আবির্ভূত হয়েছিলেন যুগাবতার, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সূফী সাধক আবু আলী আক্তারউদ্দীন (কিশোরগঞ্জের কান্দুলিয়ার হুজুর হিসেবে সমধিক পরিচিত) এবং তাঁরই প্রধান শিষ্য সূফী সাধক আনোয়ারুল হক (কটিয়াদীর চান্দপুর শরীফে যাঁর রওজা)। এরই মাঝে আবারও এসেছে ডিসেম্বর মাস, বাঙালির বিজয়ের মাস। কী ত্যাগ-তিতিক্ষা আর আনন্দ-অনুভূতি এই মাসের সঙ্গে জড়িত তা কেবল কৃতজ্ঞ আর সচেতন মানুষেরাই উপলদ্ধি করতে পারেন। আজ থেকে ৪৯ বছর আগে এই বিজয় না হলে এদেশের মানুষের জীবনে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করতো তা চিন্তা করতেও গা শিহরে উঠে। দেশি-বিদেশি অপশক্তি তখন চেষ্টার কোনো ত্রুটিই রাখেনি ডিসেম্বরের এই বিজয়কে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রুখে দেয়ার। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় যেখানে বাঙালির বিজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী সেটা রুখে দেয়ার সাধ্য কার? ওই বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশি-বিদেশি অপশক্তির মুখোশই সেদিন উন্মোচিত হয়েছিল। আজ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব জাতির দুয়ারে কড়া নাড়ছে, অপশক্তিগুলো মাথাচাড়া দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে শান্তিপ্রিয় বাঙালি জাতি ঠিকই ধৈর্য্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। সাধারণ ও শান্তিপ্রিয় মানুষেরা বিশ্বাসঘাতকদের চিনতে কখনও ভুল করে না।  কারণ এদেশের পলিমাটি-হাওড়-বাওড়-শান্ত-প্রকৃতি-নাতিশীতাষ্ণ জলবায়ুতে বড় হওয়া এদেশের মানুষ প্রকৃতিগত কারণেই ধৈর্য্যশীল।              

হাজার বছর ধরে এই বাংলার মাটিতে নামাজ (কুরআন মতে সালাত), পূজা-পার্বনসহ যাবতীয় ধর্ম-কর্ম পালিত হয়ে আসছে মসজিদ-মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা, বাড়ি-ঘরের ভেতরে-বাইরের আঙ্গিনায় বা মক্তবে-চত্বরে। কেউ কাউকে বাঁধা দেয়নি-বাঁধা দেয়ার চিন্তাও করেনি। সত্য ইতিহাস ও চিন্তার গভীরে গেলে দেখা যায়, দুই শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশ সহযোগিতায় ও ইন্ধনে প্রথমে আরব দেশে ওয়াহাবীবাদ এবং তার প্রভাব এ বাংলা তথা উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই এখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শুরু হয় বিভ্রান্তি। সূফী সাধক-আউলিয়া-দরবেশগণের জীবন-যৌবনের বিনিময়ে এদেশে প্রতিষ্ঠিত শান্তির (ইসলামের) ধর্মাবলম্বীদেরকে ফেলা দেওয়া হয় বিভ্রান্তির বেড়াজালে। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন ধর্মজীবী ও ধর্মব্যবসায়ী সম্প্রদায় যারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করতে শুরু করে। এদেরই নানামুখী ষড়যন্ত্র আর কুপ্রভাবে সৃষ্ট ধর্মব্যবসার পরিণতির সবচেয়ে উদাহরণ বিগত ১৯৬০’এর দশকের বাঙালির স্বাধীকারের আন্দোলন এবং বিভৎস রূপ ধারণ করে ১৯৭১’এর স্বাধীনতা সংগ্রামে। তখন  বঙ্গবন্ধুর ডাকে স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত  তখন এই ধর্মজীবী ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হয়েছিল যথার্থরূপে। ধর্মব্যবসায়ীরা পক্ষ নিয়েছিল ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানদের স্বার্থের বিরুদ্ধে এবং হাত মিলিয়েছিল পাকিস্তানী বর্বর হানাদার বাহিনীর সাথে। সেই বিভ্রান্তি ও অশান্তির রেশ আজও তারা টেনে চলেছে।  কিন্তু এরা সফল হতে পারেনি। বাংলাদেশ ঠিকই স্বাধীন হয়েছিল, বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছিল এই দেশ। বিপরীতে স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজাকার-আলবদর-আল শামস-দালাল ও যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বাংলার মানুষের কাছে চিরকালের জন্য ঘৃণিত হয়ে আছে এবং থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এদের বশংবদরা আজও রয়ে গেছে এবং স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় এরা শক্তি অর্জনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। শক্তি অর্জন কিছু করেছেও। দুঃখজনক হচ্ছে, এদেশেরই একশ্রেণীর রাজনীতিজীবী ও স্বার্থেন্বেষী মহল এবং সরল-প্রাণ মানুষেরা না বুঝে এদেরকেই আবার দুধ-কলা দিয়ে পুষেছে, পুষছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এরা কখনও চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারেনি, বিভ্রান্তিই শুধু সৃষ্টি করেছে।      

আজকের বাস্তবতা হচ্ছে, দেশ একদিকে যেমন এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে সমাজ, পরিবার, সংগঠন ও  প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, আর্থিক লেনদেনে দুর্র্নীতি, অনিয়ম, অনাচার, শোষণ-বঞ্চনার চিত্রটিও  কারও অজানা নয়। বিভিন্ন প্রকারের মাদকের ছোবলে রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম-মফস্বলের উঠতি বয়সের তরুণেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্রাম্য মাতব্বর থেকে শুরু সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি-শিক্ষক-গণমাধ্যম কর্মী-সাংবাদিক-আমলা-ব্যবসায়ী-ব্যাংকার তথা সমাজের সকল স্তরে  বিরাজমান নানামুখী মিথ্যাচার ও দুর্নীতির কথা কারও অজানা নয়। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে বিদেশে ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে বাকী জীবন কাটানোর জন্য এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী মানুষের দূরভিসন্ধি এবং বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের চরম অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপের খবর গণাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমের নিত্যদিনের খবর। কিন্তু এসব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কোনো ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ধর্মজীবী কোনো মোল্লা-মৌলভীর মুখে কখনও শোনা যায়নি। এখনও শোনা যাচ্ছে না। অথচ ধর্মের নামে মাঠ গরম করে এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষদের জীবনকে অস্বস্তিকর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা করতে ধর্মজীবীরা আজও পিছিয়ে নেই সেটাই দেখা গেল সম্প্রতি। এই ধর্মজীবী ও ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ডাক দিয়ে যায় এই বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। আর মুখোশ উন্মোচনের গুরু দায়িত্ব – দেশ পরিচালনার দায়িত্ব যাঁদের ওপর অর্পিত তাঁদেরকেই পালন করতে হবে।