সময়ের সাফ কথা…. নেতা ফিরেছিলেন স্বদেশে আমরা কি ফিরতে পেরেছি আজও?

নজরুল ইশতিয়াক ॥ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরেছিলেন। তিনি ফিরেছিলেন বিপুল বিস্ময়, আস্থা, ভালোবাসার প্রতীক হয়ে। বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালির অমিত শক্তি ও তেজ। জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে তিনি যা বলেছিলেন তা অনুসন্ধানী মাত্রই জানেন। বহু বই পুস্তকে ডকুমেন্টারিতে ইউটিউবে সেদিনের চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে। চাইলেই আমরা তা দেখে নিতে পারি। তিনি তাঁর এই ফিরে আসা কে আখ্যায়িত করেছিলেন অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা হিসাবে।

বঙ্গবন্ধু জানতেন নতুন শপথে নতুন প্রত্যয়ে এই পথ চলা শুরু করতে হবে। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন – শাসক কিংবা রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে নয়- আপনারা আমার ভাই, আমি আপনাদের ভাই, আমাদের পরিচয় হবে এভাবে। তিনি নারী, বৃদ্ধ, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন সবাই ভাই ভাই। এই যে সম্বোধন এটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকারের অবসান মন্ত্র, আলোর পথে যাত্রার গভীর দর্শন, দিকনির্দেশনা। এগিয়ে চলার অবিরাম গতি। গভীর ইঙ্গিতবহ সেই ভাষণটি মাইল ফলক হয়ে আছে। আমরা কি সেই সত্য উপলব্ধি করতে পেরেছি আজও। পেরেছি গোটা দেশের মানুষকে একই আস্থায়, একটি দর্শনে ঐক্যবদ্ধ করতে? সবার কথা শুনতে চেয়েছি? দূরত্ব বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে পাশাপাশি চলার সংস্কৃতির রূপায়ন কি সম্ভব হয়েছে গত ৪৯ বছরেও? গোপন, গহীন, বিচ্ছিন্নতার অবসান কি ঘটেছে?

ধর্মের নামে, দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বহু খেলার পথ রুদ্ধ করতে পেরেছি? খুলে দিতে পেরেছি মুখোশের আড়ালের চেহারাগুলো। যুক্তি বিশ্লেষণ নির্ভর সমাজ বিনির্মানের মাধ্যমে ভয় শংকা দূর করতে পেরেছি নাকি উপেক্ষা করেছি দেশ জনগণের অধিকারকেই। বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃজনশীল চিন্তাগুলো কি আজও খাঁচায় বন্দি পাখির মতো ডান ঝাপটায় না ? সামাজিক মূল্য বোধ, সত্য চর্চার পাদপীঠ গুলোও হুমকীর মুখে পড়েছে বারবার।

নেতা তো ফিরেছিলেন তার নিজ দেশে। গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে অসীম সাহস ও বীরত্বের মালা গলায় নিয়ে। আমরা যারা সেদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলাম, তারা কি স্বদেশে থেকেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন স্বদেশে রয়েছেন কিনা? আমাদের আবেগ, উচ্ছ্বাস আনন্দের কোন ঘাটতি ছিল না সেদিন, তবু কি আমরা সেদিন বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার তাৎপর্য টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম? হয়তো বিপুল আবেগ তাৎক্ষণিক নাড়া দিয়েছিল আমাদের। দেশ সরকার বিশ্ব রাজনীতি সংস্কৃতি উন্নয়ন সম্বন্ধে তেমন কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় আমরা অনেক কিছুই উপলব্ধি করতে পারিনি সেদিন। এ কারণে বেশি দিন সেটা ধরে রাখতে পারিনি। সেই বিপুল উচ্ছাস আনন্দে ভাটা পড়ে। রাজনীতির মাঠে বহু অপরিনামদর্শী খেলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। লোভী ভোগী রাজনীতিক ও সামরিক বেসামরিক আমলারা সেই

সত্য কে লালন পালন করতে পারেনি। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব কেই সীমাহীন এক চ্যালেঞ্জ এর মুখে পড়তে হয়েছে। একটি উত্তেজনাকর অশান্ত পরিবেশ তৈরীর সমস্ত উপকরণ  সেদিন বিদ্যমান ছিল। দেশ গঠনে সংবিধান প্রণয়ন সহ সময়োপযোগী আইন, পরিকল্পনা সবাই তিনি শুরু করেছিলেন। তার গৃহীত বহু পদক্ষেপ যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো মাত্র তিন বছরের মাথায় কেন তাঁকে হত্যা করা হলো এবং দলের লাখ লাখ নেতা কর্মী কেন সেদিন হতবিহ্বল হয়ে দিক্বিদিকশুন্য হয়ে রইলেন? কেন নেতা কর্মীরা মহান নেতাকে হত্যার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেন না এবং কার্যত কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও ব্যর্থ হলেন?

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে জাতি কোন আলোর পথে যাত্রা করে কোন তিমিরে চলে গেল? এসবই চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। আত্মউপলব্ধিই কেবল সত্য কে চেনায়। তথ্য ভুরি ভুরি গল্প, উদাহরণ বস্তুত তেমন কোন কাজে লাগেনা। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অতীতে বলেছেন- যে দেশে জাতির জনক হত্যা হয়, সে দেশে সব করা যায়, সব হতে পারে। তিনি এও বলেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মাঠে কাউকে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনার এই সরল অভিব্যক্তিকে গুরুত্ব দিয়েই সত্য অন্বেষণ করতে হবে। ৭২ এ সংবিধান কে ঐতিহাসিক বলা হলেও কেন  আমরা ২০২১ সালে এসেও তা ফিরিয়ে আনতে পারিনি, কেন রাষ্ট্রীয় চরিত্র বিনষ্ট হবার পরও তার পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে না?

দেশ শব্দটি ব্যাপক ও বিশাল। দেশ মানে দশের সমষ্টি আবার দেশ মানে দিশা। প্রকৃত নেতা সব সময় সময়ের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে। এগিয়ে থাকেন বলেই তিনি নেতা। নেতৃত্ব দিতে পারেন। তিনি অগ্রসরমান মানুষ। নেতার সাথে কর্মীর এবং জনগণের কিংবা জনসাধারণের পার্থক্য এখানেই। এ জন্যই লক্ষ কর্মীর চেয়ে নেতার গুরুত্ব বেশি।

বঙ্গবন্ধু তৎকালীন সময়টিকে ধরেছেন। এমন একটি সময় তিনি রাজনীতিতে ঢুকেছেন, সময়টি পরাধীন একটি জাতির প্রতি বৈষম্য দুঃখ কষ্টের সময়। তিনি ৪৬ এর দাঙ্গা, ৫০ এর মন্নন্তর দেখেছেন। ৫২, ৫৪, ৬২, ৬৬, ৬৯,৭০ তাঁর জীবন প্রবাহ। একই সময়ে কারাগারে বসে পড়েছেন, জেনেছেন বিশ্ব ইতিহাস,  প্রতিদিন গ্রেফতার নেতা কর্মীদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি। দেখেছেন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব। তাই তো তিনি বাংলার বন্ধু বঙ্গবন্ধু।

আজকের নেতৃত্ব কি সেটা উপলব্ধি করেন? তারা কি জানেন কেন শেখ হাসিনাকে থামিয়ে দিতে চায় ঘাতকরা? বুঝতে পারেননা বলেই ত্যাগের বিপরীতে ভোগের, সত্য সুন্দরের বিপরীতে নষ্ট উদভ্রান্তের রাজনীতি ঝেঁকে বসেছে। চরিত্রহীন লোকের হাতে রাজনীতি। লুটেরা ভূঁইফোড় মোসাহেবদের হাতে দল। পথ দেখানোর মতো নির্মোহ সৌন্দর্যবান নেতৃত্বই সব সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে, পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। বুনন সহমর্মিতার রাজনীতিই তো বাঙালির রাজনীতি। সেখানেই শক্তি ও সার্মথ্য।