সময়ের সাফ কথা….চেতনায় বাঙালিত্ব

শাহ্ ড. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন আলন ॥ ‘একজন খাঁটি বাঙালি  একজন খাঁটি মুসলিম’, ‘বাঙালির জন্য বাঙালি সাধকই পথ  প্রদর্শক’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণতো রেকর্ড শুনেছি, দেখিনি, ৭ মার্চের ওই উদ্যানে থাকলে কি রকম পুলক হতো তা কিছুটা উপলব্দি করতে পারছি।

চেতনা কি আমরা জানি। সবার মধ্যেই প্রবাহিত হচ্ছে চেতনা। হাক্কানী চিন্তনপীঠ থেকে এসেছে, প্রায় পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস বাঙালির। এই পাঁচ হাজার বছরে সকল দিকে বাঙালি যে সমৃদ্ধ, বাঙালির জীবনধারা থেকে হাজার বছর ধরে যে বিষয়গুলো চলে আসছে, সবগুলোর সমন্বিত রূপে যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটাই বাঙালি চেতনা। কালকেও বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে যেটা এসেছে এবং আজকের এই অবস্থান পর্যন্ত যোগ হয়েছে সেটাও বাঙালি চেতনার অংশ হিসেবে আমাদের মধ্যে আছে। সুতরাং আমরা সেটা কতটুকু ধারণ-লালন-পালন করে চলেছি সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। চেতনার যে ৭ টি স্তরের কথা বলা হয়েছে (অচেতন, অবচেতন, প্রাক-চেতন, দ্বৈত-চেতন, উর্ধ্ব-চেতন, মহাচেতন) আমরা যারা এখানে আছি, কোন বিন্দুতে, চেতনার কোন স্তরে আমি অবস্থান করছি? চেতনায় যে বাঙালিত্ব আলোচনা সেখানে কোন্ দেশটা এসেছে, কোন্ দেশের সীমানা এসেছে, কোন জাতি এসেছে, কোন্ কোন্ নেতা নিয়ে এসেছেন, সেখানে মূল যে প্রশ্ন চেতনায় বাঙালিত্ব আমার চেতনায় তা কতটুকু আছে? আমি আমার চেতনায় বাঙালিত্বকে ধারণ করেছি কিনা? বঙ্গবন্ধু কতটুকু ধারণ করেছিলেন সেটা বঙ্গবন্ধু জানেন, আমি কিভাবে বিচার করবো বঙ্গবন্ধুকে, আমার ক্ষমতা কোথায়! আমি ধারণ করেছি কতটুকু সেটাই দেখার বিষয় এবং আমার এই ধারণ-লালন-পালনের দ্বারা আমি আমার বাঙালিত্বকে কতটা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এই চেতনা আমার মধ্যে কতটা প্রবাহিত হচ্ছে সেটাই আজকের বিচার্য বিষয় এবং আলোচনার মূল পয়েন্ট। আমরা অনেক দিকে চলে গেছি, কিন্তু সেই ডাইমেনশন থেকে আমরা যদি নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম তাহলে এই আলোচনাটা আরও বেশি অর্থবহ হতো এবং নিজের ও সকলের জন্য উপলব্ধি করার একটা জায়গা তৈরি হতো। প্রশ্ন আসে আমি কি চেতনা সম্পন্ন? যে বাঙালি চেতনা, যে বাঙালিত্বের কথা বলা হচ্ছে-আমি কোন্ বাঙালি চেতনাকে ধারণ করে আছি, কিভাবে ধারণ করে আছি? যদি বলি আমি পোষাকে বাঙালি, তাহলে হাজার-হাজার বছর ধরে যে পোষাক চলে এসেছে, সেই পোষাকটা কি আমি আমার পরিধানের মধ্যে রপ্ত করেছি? যে বাংলা ভাষার কারণে বাঙালি জাতি-গোষ্ঠীর পরিচয়, সেই ভাষাকে কি আমি সেইভাবে মূল্যায়ণ করেছি আমার ব্যক্তি জীবন, পেশাগত জীবনে, আমার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ায় এবং চারপাশে যে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সেই জায়গায়। এই যে আমার আচার-ব্যবহার, চাল-চলন প্রতিটি জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতির যে ধারা, সেই ধারার কতোটা আমার মধ্য দিয়ে বহি:প্রকাশ হচ্ছে? সেটা বিচার করলেই নিজের একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যায়। আমার যে কথা, কাজ, চিন্তাজগৎ, আমার দৈনন্দিন আচার-ব্যবহার, চলাফেরা, পোষাক, খাবার-দাবার, আমার ভাষা এই যে বিষয়গুলো চলে এসেছে এর মধ্য দিয়ে আরেকটি জায়গায় আমার যাওয়া দরকার আমার নিজ ভাবনা, আমার পরিবার ভাবনা, আমার সমাজ ভাবনা, রাষ্ট্র ভাবনা, বাঙালি জাতি নিয়ে ভাবনাগুলো আমি কি তা বাঙালি চেতনা থেকে ভাবি? আমার চিন্তাজগতে যতো ভাবনা আছে, বাঙালি চেতনার ধারক-বাহক হয়ে আমি কি প্রতিনিয়ত ভাবি? আমি যে কর্ম করে যাচ্ছি সেই কর্মগুলোতে কি সেই বাঙালিত্বের ছোঁয়া আছে? নাকি অন্য অসংখ্য ধার করা বিষয়গুলোকে আমি ধারণ-লালন করে চলেছি? বাহ্যিকভাবে উদাহরণ টানতেই হয়, আজ ঢাকা শহর থেকে যারা এখানে এসেছেন, রাস্তার দুই পাশের সাইনবোর্ডগুলোর দিকে যদি দেখেছেন নিশ্চয়ই, সেখানে কতভাগ বাংলার ব্যবহার করেছি আমরা? বাংলাদেশ বলছি, বাঙালি বলে গর্ব করছি, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের গর্ব করছি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ, বঙ্গবন্ধুসহ সকল কিছু নিয়েই গর্ব করছি, আমরা বলি পৃথিবীতে একমাত্র আমরাই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, গর্ব করার মতো বিষয়, কিন্তু যার যার জায়গা থেকে দেখেন, যার যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে দেখেন, কতটুকু আমরা বাঙালি হয়ে বাংলার ব্যবহার করছি, বাংলা মায়ের সন্তানেরা দেশ ও জাতির জন্য যে রক্ত দিয়েছেন, সেই রক্তের ঋণ কি আমরা শোধ করতে পারছি? না আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হচ্ছি আমরা। কারণ সেই ভাষার অমর্যাদা, অসম্মান আমরাই করে চলছি। প্রতিনিয়ত বৃটিশের দাসত্ব আমাদের চেতনার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। এমন এক বিকৃত চেতনার মধ্যে আমাদেরকে বৃটিশরা নিয়ে গেছে, সেই বিকৃত চেতনা থেকে আমরা বের হতেই পারছি না। বরং সগৌরবে বলছি এবং করে চলেছি। সুতরাং যে জায়গাটা থেকে বাঙালি জাতির উদ্ভব বা যে ভাষাগত কারনে আমরা বাঙালি, সেই ভাষার অমর্যাদা করলে কোনভাবেই প্রমাণ হয় না যে আমরা বাঙালি চেতনা ধারণ করে আছি। একধরণের দ্বিচারিতা, প্রতারণা আমাদের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে চলছে আমারই মায়ের ভাষার সাথে, ভাষা আন্দোলনের শহীদদের সাথে, দেশ ও জাতির সাথে। যার যার অবস্থান থেকে এই দ্বিচারিতার অবস্থান সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা করে আবার ওই জায়গায় নিজের ভাষায়, নিজের স্বকীয় ঠিকানায় প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে, তাহলেই বাঙালি চেতনার বহি:প্রকাশ ওখানে ঘটতে পারে।

স্বাধীন দেশে বাস করি কিন্তু আমরা মুক্তভাবে বলতে পারি না আমরা বাঙালি। বাংলাদেশের এমন বহু মানুষ আছে আমি বাঙালি কথাটি বললে এখনো অনেকের গায়ে জ্বালা ধরে। এটা কিন্তু বাস্তব এবং রাস্তা-ঘাটে, অফিসে-আড্ডায় আমরা দেখতে পাই বাঙালি জাত তুলে গালি দেয়। অর্থাৎ আমিই আমার জাতকে অসম্মান করছি। পাকিস্তান, বৃটিশরা কতটুকু অসম্মান করেছে বা অন্যান্য জাতি যারা লুটেপুটে খেতে এসেছে তারা কতোটা অসম্মান করলো অতীত স্মরণ করে দেখতে যাচ্ছি, কিন্তু বর্তমানে আমরা যারা বাঙালি চেতনা ধারণ করি বলছি, তারা নিজেরাই নিজেদের কতোটা অসম্মান করি বিচার করে দেখি! ‘এই দেশে কি বসবাসের পরিবেশ আছে’, ‘এই নোংরা দেশে কি থাকা যায়’ বলে নিজেদের কতবার খাটো করেছি, যার বিদেশে গিয়ে বসবাস করার স্বপ্নের ডামাডোলের মধ্যে আছেন! আমেরিক, লন্ডন, সুইট হোম মালয়েশিয়ায় যাবো কখন সেই চিন্তায় বিভোর, তার মানে চেতনায় বাঙালিত্ব নয়, চেতনায় স্বার্থপরতা, ব্যক্তিলোভ, ব্যক্তি চাওয়া-পাওয়া।

বঙ্গবন্ধুসহ আরো যারা বড় নেতা আছেন তাদের কথা আমরা বলবো, তাদের অবদানের কথা স্বীকার করবো এবং তাদের দিক্-নির্দেশনা অনুসারে চলবো, কিন্তু ব্যক্তি আমি এই দেশে কতোটা ফায়দা নিচ্ছি, লেখাপড়া করতে গিয়ে, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে আমি কি কি সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছি? আমি কি সহজ স্বাভাবিকভাবে আমার অবস্থানটা তৈরি করছি? নাকি আমি আবার বাঁকা পথে ওখানে যাচ্ছি আমার আরেকজন ভাইকে হারিয়ে দিয়ে? আমি যেসব সুযোগ-সুবিধাগুলো নিচ্ছি তা কি শুধু ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে নিচ্ছি, নাকি আমার যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেই জায়গাটার মধ্যে যাচ্ছি? সেটাও কি প্রতারণা নয়? আমি বলছি আমি বাঙালি, কিন্তু আমি একটা চাকুরী যোগাড় করছি, একটা স্বার্থ উদ্ধার করছি বাঁকা পথে সেটা বাঙালি চেতনার সাথে যায় না। আমি শুরু করেছিলাম সাধক বাণী দিয়ে – ‘একজন খাঁটি বাঙালি একজন খাঁটি মুসলিম’। অর্থাৎ বাঙালি চরিত্র এমন যে, একজন মুসলিমের যে চরিত্র তার সেই চরিত্র। মুসলিমের বাংলা শব্দ হচ্ছে শান্ত এবং ভদ্র। যে বাঙালি চরিত্রে পরিপূর্ণভাবে সেই শান্ত এবং ভদ্রের রূপটা আছে সে কখনও অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে না। তাহলে আমি নিজকে প্রশ্ন করে দেখি তুমি কি একজন খাঁটি বাঙালি? তাহলে তুমি একজন খাঁটি মুসলিম। আমার পরিচয় দেই, আমি জন্মগতভাবে মুসলিম। মুসলমানের ঘরে জন্ম নিলেই কেউ মুসলিম হয় না। আমি জন্মগতভাবে বাঙালিও না। বাঙালি ঘরে জন্ম নিলেও বাঙালি হওয়া যায় না। কারণ বাঙালি চেতনাকে যে ধারণ করবে সে-ই বাঙালি হবে। বাঙালি চেতনা ধারণ না করে কারও পক্ষে বাঙালি হওয়া সম্ভব নয়। বাঙালি হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই চেতনাকে ধারণ-লালন এবং পালনের বিষয় অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষাভাষী হয়েছি দেখেই যে বাংলা ভাষাকে ভালোবাসবো তা হতে পারে না। আজ এখানে আমরা জাতীয় বন্দনা সমবেতভাবে গাইছিলাম। আমি নোট নিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো এই প্রশ্নটাইতো আমি কখনো নিজেকে করিনি, আমার ‘সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। আমরা কি জাতীয় বন্দনা পড়ার জন্যই পড়ি বা গাওয়ার জন্যই গাই, কথাটি কি শুধু দুই ঠোঁট থেকেই বেরিয়ে আসে, নাকি চেতনার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবাহিত অনুরণ থেকে বেরিয়ে আসে? আমার হৃদয় থেকে উৎসরিত কিনা যে আমি আমার বাংলাকে ভালোবাসি! কোন বাংলাকে ভালোবাসি, যে বাংলা শুধু স্বার্থের ফুল-ফসল দেয় সেই বাংলাকে? অর্থাৎ আমার ব্যক্তিস্বার্থে বাংলা যখন তার ছায়া দিচ্ছে, আলো-বাতাস দিচ্ছে, আমি সুবিধা পাচ্ছি সেখানেই শুধু আমার সোনার বাংলা হচ্ছে, নাকি এই বাংলায় যখন ঝড়-ঝাপটা আসছে, দু:খ, কষ্ট দিচ্ছে তখন কি বলতে পারি আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, নাকি তখন ওই কথাটি বলে উঠি, এই দেশে কি থাকা যায়! তখন পালাই কেন আমরা, তার মানে কি ব্যক্তিস্বার্থেই কথাটি বলি। বাঙালি যারাই জাতীয় বন্দনা গায় তারা কতজন এই চেতনাকে তার চিন্তাজগতে ধারণ করে সত্যিকার অর্থে এই বাংলাকে, বাংলাদেশকে ভালোবেসে কথাটি বলে!

তারচেয়েও কঠিন একটি কথা আছে এখানে, ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’। আমি নিজের সাথে মিলিয়ে দেখি, কতবার নয়ন জলে ভেসেছি; কতজন নয়ন জলে ভেসেছে। শুধু কি বহি:শত্রুর আক্রমণে মা-এর বদন মলিন হয়? আমি কি আমার কর্ম দ্বারা এমন পরিবেশ করছি না যে, প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত মা-এর বদন মলিন করার মতো কর্ম করে চলেছি। প্রতিনিয়ত প্রকৃতির ক্ষতি করে, নিজের ফায়দা লুটার জন্য একটা দুর্নীতির মধ্যে প্রবেশ করি অথবা আমার একটা রাজনৈতিক স্বার্থে অথবা পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে যখন একটা অপকৌশলের আশ্রয় নেই তখনও কি মা-এর বদন মলিন হয় না? আমাদের কতজনের নয়ন জলে ভেসেছে এই বাংলা মা-এর বদন মলিন হলে আমি জানি না। বাংলা মা-এর বদন প্রতিদিন হাজার হাজার বার মলিন হচ্ছে। উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে, কিসের উন্নয়ন? আমরা উন্নতি করেছি, সারা পৃথিবীইতো উন্নতি করেছে। মোবাইল নাই এমন কে আছে? সারা বিশে^র এমন কোন দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে মোবাইল নাই। এটা টেকনোলজির ব্যবহার, স্যাটেলাইটের ব্যবহার। প্রতিটা দেশই তার সক্ষমতা অনুসারে এগিয়ে যাবে, কিন্তু নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ছাড়া উন্নতির কোন মানে নেই। আমি সরকারের সমালোচনায় যাচ্ছি না, ব্যক্তি আমি’র সমালোচনায় যাচ্ছি। তুমি যে বাঙালি চেতনার কথা বলছো, তোমার মধ্যে সেই মূল্যবোধটা কতটুকু প্রতিষ্ঠিত করেছ? সেই প্রশ্নটা এখন করা জরুরি। প্রতিদিনই তো আমি আমার ফ্ল্যাট-বাড়ি সাজাই নিত্য-নতুন আধুনিক জিনিস দিয়ে। সব কি উন্নয়ন? আমরা বলি আমাদের আছে রবীন্দ্রনাথ, আমাদের আছে নজরুল, আমাদের আছে লালন। থাকলে কি হবে? আলোচকগণ বলে গেছেন, আমাদের এত ঐশ্বর্য-সম্পদ আছে, আমিও শুনেছি সাধক-এঁর কাছে বাংলায় এত সাধক এসেছেন, তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বিদেশীরা আমাদের লালন-কে নিয়ে গবেষণা করলে আমরা পুলকিত হই কেন? আমরা কি হলফ করে বলতে পারি, আমি লালন সাঁইজীর সেই দর্শন, চেতনা, আদর্শকে ধারণ করেছি? তাহলে লালনকে নিয়ে গর্ব করার অধিকার কি আমি রাখি? লালন দর্শন আমার জীবনের বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই লালনকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি। লালন-এঁর মতো সাধকগণ যে দর্শন আমাদের জন্য দিয়ে গেছেন সেগুলো বাস্তবায়ন হলে তো বাঙালির চেহারাই পাল্টে যেতো। অন্য কোন দেশের দিকে তাকানোর প্রয়োজন হতো না। কারণ বাঙালির যে মূল্যবোধ, সেটি জাগ্রত হলে তো আর কিছু লাগে না। সাধক নজরুল চমৎকারভাবে বলে গেছেন – ‘বাঙালির মস্তিষ্ক ও হৃদয় ব্রহ্মময়, কিন্তু দেহভূবন পাষাণময়। বাঙালির মতো জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তি এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীর কোন জাতির নেই।’ জ্ঞানশক্তি এবং প্রেমশক্তি বাঙালির মধ্যেই সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে কি সেই জ্ঞানশক্তি, প্রেমশক্তি আছে, তাহলে কি আমি বাঙালি, প্রশ্নটা তো নিজের দিকেই আসবে। সাধক নজরুলকে নিয়ে আনন্দ-পুলক অনুভব করি, সাধক নজরুলকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ছবি হয়, কানাডায় পাঠ্যসূচীতে নজরুল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে কি লাভ। নজরুলতো পড়ার বিষয় না, নজরুলকে আমার চেতনার জগতে ধারণ করার বিষয়। আমি কি নজরুলকে পড়তে পারছি আমার চেতনায় নিয়ে? তেমনিভাবে রবীন্দ্রনাথ, লালনকে কি আমার চেতনায় ধারণ-লালন করে দেখেছি। হাক্কানী সাধক-এর কাছ থেকে এসেছে, ‘বাঙালির জন্য বাঙালি সাধকই পথ প্রদর্শক।’ সেন্টার থেকে কিভাবে সত্যমানুষ বেরিয়ে আসছেন আমরা কিন্তু জানি না। এই চেতনার উন্নতি সত্যমানুষের দ্বারা এসেছে। বাংলা ভাষার আগমনও হয়েছে সত্যমানুষের দ্বারা। বাংলা ভাষার একেকটা অক্ষর সৃষ্টি করেছেন একেক জন সত্যমানুষ। একেকটা সত্য সৃষ্টি হয়েছে সত্যমানুষের দ্বারা। এর থেকে সরে গিয়ে সর্বত্র বিকৃতি প্রবেশ করছে, এই মূল্যবোধটা নষ্ট করে দিয়ে অন্য মূল্যবোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে সম্পদের দিকে, লোভ-মোহ, ক্ষমতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজ তো প্রায় সকল রাজনীতিকের লক্ষ্য হয়ে গেছে ক্ষমতায় যাওয়া। এটা তো বাঙালি চেতনা এবং বাংলার উন্নয়ন না। আমরা বাংলা এবং বাঙালি চেতনাকে জাগ্রত করবো, বাংলা এবং বাঙালির মধ্যে বাঙালি চেতনাকে প্রবাহিত করবো। বাঙালি চেতনার যে ধারা, সুরগুলো আছে, সেই সুরগুলো যেন সকলের মধ্যে বিস্তৃত করতে পারি সেই প্রত্যাশা। সাধক বলেছেন, ‘বাঙালিত্বেই আছে উত্তরণের পথ।’ যারা যতো পথেই যাওয়ার চেষ্টা করেন, কোন লাভ হবে না, কারণ সাধক-এঁর কাছ থেকে যখন এই কথা বের হয়ে গেছে, এটা উল্টানোর ক্ষমতা এই সৃষ্টি জগতের আর কারো নাই। বাঙালি যদি নিজেকে উত্তরণ ঘটাতে চায়, সেই চরম-পরম সীমায় পৌঁছতে চায় তাহলে বাঙালিত্বের মধ্যেই তার উত্তরণের পথ আছে, এছাড়া আর কোন পথ নেই। জ্ঞানশক্তি এবং প্রেমশক্তি ধারণ-লালন এবং পালনের মাধ্যমে, অর্জনের মাধ্যমে আমার বাঙালিত্বকে জাগ্রত করছি কিনা এবং সেই বাঙালিত্ব জাগ্রত করার মাধ্যমে আমার উত্তরণ ঘটছে কিনা। লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমরা ভবিষ্যতে একটা বেকার ও মেরুদন্ডহীন জাতি পাচ্ছি। দেশের এমন কোন অলি-গলি নাই যেখানে মাদকের ছোঁয়া লাগেনি! আমরা উন্নয়ন করছি বলছি, কিন্তু এর সাথে মাদকটাও চলে এসেছে। আমরা এটা বন্ধ করে তো ওটা করতে পারতাম। উন্নয়নের নামে কি হলো। ভবিষ্যতে যারা নেতৃত্ব দেবে, এমন একটা পঙ্গু, মূল্যবোধহীন প্রজন্ম আমরা পাচ্ছি যারা উন্নয়নের  নামে দেশকে না জানি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, যাবে। আমরাই তো এখানে জড়িত। বাংলাকে তো অন্য কেউ পাহারা দেয় না, হয় বাংলার ভিতরে তৈরি হচ্ছে এই পরিস্থিতি অথবা আমরাই মাদক আমদানি করছি চোরাপথে। কারা একাজে সহায়তা করছে, তারা আমাদের দেশেরইতো নাগরিক। কারা কারা এই কাজগুলোর সাথে জড়িত যারা রাজনীতির সাথে অথবা প্রশাসনে আছি অথবা নেই, সবাই জানি কিন্তু মুখ ফুটে বলতে দ্বিধাবোধ করি, আর ফাঁকা বুলিতে উন্নয়নের কথা বলে যাই। কোনই লাভ হবে না, কারণ ওই যে মেরুদন্ডহীন প্রজন্ম আসতেছে কাল আপনার, আমার বাচ্চারাও সেদিকে ধাবিত হবে, সারাক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখার সুযোগ নেই। পরিসংখ্যান ব্যুরোর লোগো দিয়েই সম্প্রতি ফেইসবুকে একটি তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, এদেশে এখন ৪ কোটি ৬০ লক্ষ লোক বেকার। উন্নয়ন হতে হবে বাঙালি চেতনায়, তাহলে আর কোন কিছুই আমাদের লাগবে না। টাকা, ধন-সম্পদ, অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে তো আমরা তথাকথিত উন্নয়ন চাই না, প্রেম এবং ভালবাসা দিয়ে আমরা বিজয় অর্জন করতে চাই। অস্ত্রের জোরে আমরা আধিপত্য বিস্তার করতে চাই না। বরং আধিপত্যবাদীদের হটানোর জন্য বাঙালির যে শক্তি দরকার, সেই শক্তি বাঙালির মধ্যে আছে এবং সেই শক্তিটা সময়মতো বাঙালির মধ্যে জেগে উঠে। সাধক নজরুল বলেছিলেন, ‘বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে বাঙালির বাংলা, সেদিন তারা অসাধ্য সাধন করবে।’ সেই  অসাধ্য সাধন আমরা করেছিলাম বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ভাষণের মধ্যদিয়ে ১৯৭১-এ। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের প্রত্যেকটি জায়গায়ইতো  বাংলা-বাঙালির কথা, বাঙালির মুক্তির কথা বলেছিলেন। বাঙালির মুক্তি কি আজ হয়েছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল একত্রিত হয়েছে, স্বাধীন হয়েছে বলে। আজ আমরা কি একত্রিত, না প্রতিনিয়ত বিভেদ বাড়িয়ে চলেছি যেটা বাঙালি চরিত্রের সাথে যায় না। আমরা টিভি-পত্রিকা খুললেই কেবল দেখি পরের কথা, নিজের কথা আর কেউ বলে না, নিজের বিচার করে না। আমরা এখন ঘুম থেকে উঠেই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অন্যের কথা স্মরণ করি, আরেকজনের নিন্দা-মন্দের মধ্যে লেগে যাই, অন্যের বিচার করতে শুরু করি। এটাতো খাঁটি বাঙালি চরিত্র না। বাঙালি সাধক বলছেন, ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’। এই শাশত বাণী ধারণ-লালন করলেই চেতনায় বাঙালিত্ব জাগ্রত হয়।