সময়ের সাফ কথা….জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ এর প্রত্যাশায়

সংলাপ ॥ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার করে বাঙালি জাতি আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রার্ষ্ট্রের। ১৯৭২ সালে সদ্য ভূমিষ্ট রাষ্ট্রটির সংবিধান প্রণয়ণ কমিটি এর নামকরণ করেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। ইংরেজী ভাষায় এর নামকরণ করা হয় The People’s Republic of Bangladesh’. দেশের সকলেই জানেন সংবিধান প্রণয়ণ কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তৎকালীন আওয়ামীলীগ নেতা ড. কামাল হোসেন। বরাবরই তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের প্রণেতা বলে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন এবং বর্তমানে তিনি বিএনপি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী মানবতাবিরোধী অপরাধী রাজাকারদের সাথে রাজনৈতিক স্বার্থিক আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে তোলা ঐক্যফ্রন্ট নেতা। ঐক্যফ্রন্ট নেতা হিসেবে তিনি বারবার জনগণের কাছে দেশের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চান। অথচ তার রচিত সংবিধানেই তিনি এদেশের নামকরণ করেছেন ‘প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে। তিনি খুব ভাল করেই জানেন বাংলাদেশে কোন প্রজা নেই। জনগণকে সাংবিধানিকভাবে প্রজা সাজিয়ে সংবিধান রচনা করে জনগণের তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা এক ধরণের প্রতারণা। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে তিনি বুঝতে পারছেন জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে! অবশ্য তিনিই সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন ‘প্রজাতন্ত্র’।

আমরা জানি ‘রাজার নীতিকে বলে রাজনীতি। যারা রাজা হতে চায়, কিংবা রাজা হিসেবে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকতে চায় তারা যেসব নীতি, ছলা-কলা-কৌশল অবলম্বন করে জনসমর্থন আদায় করে, তা রাজনীতি হিসেবে পরিচিত। কে কিভাবে রাজা হবে বা রাজা হিসেবে টিকে থাকবে এ নিয়েই ব্যস্ততা রাজনীতিকদের। রাজনীতিকদের সাথে পাল্লা দিয়ে একই ব্যাপারে ব্যস্ত আছে মিডিয়া ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণী। সারা দেশের শক্তি ও মেধা ব্যয় হচ্ছে কে কিভাবে রাজা হবে এ নিয়ে। আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচন দেশের নতুন রাজা নির্বাচন করবে এদেশের প্রজাগণ (জনগণ)। চলছে চুড়ান্ত প্রচার-প্রচারণা। বিতর্ক ও বাক-বিতন্ডা ছড়িয়ে পড়ছে টিভি, পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শহর-গ্রামের চায়ের স্টলে। যদিও জনগণের সাথে বর্তমান রাজনীতির (!) কোনো সম্পর্কই নেই তবু কে রাজা হবে এ নিয়ে জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। মানুষ ভুলে যাচ্ছে তাদের নিজেদের প্রকৃত সমস্যা। রাজনীতিক ও তাদের পোষা বুদ্ধিজীবীরা ঘুরিয়ে দিয়েছে সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনা। এদেশের সাধারণ মানুষ আর নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবে না, ভাবে রাজাদের সমস্যা নিয়ে। রাজনীতিকদের ষড়যন্ত্রে দেশে এখন আর রাজা-প্রজার দ্বন্দ্ব নেই, শাসক ও শাসিত শ্রেণীর মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। এখন চলছে  ‘আওয়ামী লীগ Ñ বিএনপির (রাজাকার শক্তির ব্যাকআপে) দ্বন্দ্ব’। এই ক্ষমতার লড়াই আর দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট যারা আগামী একাদশ নির্বাচনে মহাজোটের বিপক্ষ শক্তি হয়ে মাঠে নামছে।

অন্যদিকে রাজনীতি হয়েছে দুষ্টলোকদের আশ্রয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিছু অসৎ লোক আবৃত হয়েছে দেশপ্রেমের পোশাকে। এখন বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসায়ী ও টাকাওয়ালারা। সারা জীবন যিনি সাধারণ মানুষের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেন, জীবন-যৌবন উৎসর্গ করলেন, তার কোন দাম নেই। এখন দাম আছে টাকার, টাকা দিয়ে কেনা-বেচা হয় মনোনয়ন। শোনা যাচ্ছে, ১৫০০ কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে এবারের নির্বাচনে। দেশের ত্যাগী রাজনীতিবিদরা আজ করুণা ও পরিহাসের পাত্র। অন্যদিকে মূর্খ, বর্বর ও মতলববাজ কিছু লোক আজ রাজনীতিতে সমাদৃত। তাই হাজার কোটি, লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেও সাধারণ মানুষের কোন সমস্যার সমাধান হচ্ছে না! মানুষের সামনে তৈরি হচ্ছে সমস্যার নতুন পাহাড়! কারণ যেসব মতলববাজরা রাজনীতিতে টাকা বিনিয়োগ করেন, তারা তো ব্যবসার উদ্দেশ্য নিয়েই তা করেন; জনসেবা তাদের উদ্দেশ্য নয়। রাজনীতিকরা এখন আর জনগণের নেতা নন, জনগণের কাছে তাদের কোন দায়বদ্ধতাও নেই। কেবল ভোটের মৌসুমে জনগণ এদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। ভোট শেষ হলে এরা জনগণের কথা ভুলে যান, জনগণকে প্রজা ভাবতে শুরু করেন, মিশে যান রাজধানীর হাওয়ার সাথে। জনগণের ভাত-কাপড়ের মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাববার সময় তাদের কখনো হয় না। এসব মতলববাজ রাজনীতিকরা আজ দুর্বিষহ করে তুলেছে সাধারণ মানুষের জীবন। একদিকে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার অভাব অন্যদিকে অপহরণ, গুম-খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি, জমিজমা থেকে উচ্ছেদ, কাজের অভাব, ছাঁটাই, মূল্যবৃদ্ধি, ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এসব নিয়ে দেশে কোন আন্দোলন নেই। জনগণের কণ্ঠ আজ আবদ্ধ রাজার নীতিতে যেহেতু তারা সাংবিধানিকভাবে প্রজা। সময় এসেছে। ভেবে দেখা দরকার সাংবিধানিক নামকরণে কোথায় আছি আমরা? কোথায় যাচ্ছি? কি করছি? কার স্বার্থে মিছিল, হরতাল করছি? রাজপথে জীবন দিচ্ছি? কে রাজা হলো বা না হলো, তার সাথে আমাদের অর্থাৎ জনগণের সংশ্লিষ্টতা কতখানি? কে কিভাবে রাজা হবে, কিভাবে নির্বাচন হবে তা জনগণের সমস্যা নয়। এটা রাজনীতিকদের সমস্যা। রাজাদের সমস্যা রাজারাই সমাধান করুক এ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাববার কোন দরকার নেই। সচেতন হওয়া দরকার।

যে রাজনীতি মানুষের কোন কল্যাণে আসে না, যে রাজনীতি জনগণের কথা বলে না, সে রাজনীতি আমরা আর চাই না। বন্ধ হোক রাজাদের নীতি ও রাজনীতির খেলা এবার থেকে শুরু হোক জননীতি। প্রজাতন্ত্র নয় জনতন্ত্র-গণতন্ত্র হোক। এদেশ জনগণের। কোন রাজা এদেশের স্বাধীনতা আনেনি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার আপামর জনগণ এদেশের স্বাধীনতা এনেছে মরণপণ লড়াই করে। যারা সেই যুদ্ধের সময় লুকয়ে ছিল, পালিয়ে ছিল ব্যক্তিস্বার্থকে সুরক্ষা দিতে; যারা দেশের ক্রান্তিকালে সবসময়ই নিজেকে নিরাপদ রেখে জনগণের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়িয়েছে, তাদের কাছ থেকে কোন প্রত্যাশা এদেশের জনগণ করে না। সময় এসেছে দেশের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তনের। প্রজা হয়ে জনগণ আর থাকতে চায় না। সব নেতারাই আজকাল জনগণ-জনগণ বলে মুখে ফেনা তোলেন।    এতই যদি জনগণের কথা ভাবেন তাহলে জনগণকে ‘প্রজা’ থেকে মুক্তি দিয়ে ‘জন’ নামে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার করুন। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নয় ‘জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে আগামীর বাংলাদেশ হোক এটাই সময়ের দাবী।