‘সত্য বলিতে মানা তবু বলিতে হয়’

নজরুল ইশতিয়াক ॥ সাধনপীঠে একটা নির্দেশনা রয়েছে আপন ভজন কথা না বলিবে যথা তথা। আবার বলা হয়েছে সত্য বইলো না বাড়িবে বিবাদ, ঘটিবে বিপত্তি।

শিরোধার্য মেনেই চলি এবং ততটুকুই বলি। তাই এই বলা, বলা হয়ে উঠে না। বলেও হয়তো কিছু হয় না এই জন্যই এমন নির্দেশনা। ছেড়ে দেয়া মুরগী তেড়ে ধরা কঠিন। আবার খুনির হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে কিংবা বেডরুমের চাবি চোরের হাতে দিয়ে চুপচাপ ঘর পাহারার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিতে ঘুমালে যা হয়, তাই’ই হবে।

ধর্ষণের বিচারে সোচ্চার ঘুমন্ত বাঙালি যেন হঠাৎই চুপ ও বিস্মিত বলাৎকারের সংবাদগুলোতে। মাদ্রাসার শিক্ষক ও রুমমেটদের যৌন বিকৃতি নিয়ে যেন কথাই বলা যাবে না। কতটা বর্বরতা ঘটলে একজন আপাদমস্তক কিশোর আত্মহত্যা করে! আর কতটা জঘন্য হলে লাশ নিজেরাই নামিয়ে দাফন করে দেয়!  নুসরাত হত্যার হয়তো বিচার হচ্ছে। কিন্তু এই বিকৃতি ভয়াবহতার বিচার কি করা যাবে??  কতটা বেপরোয়া রুগ্নতার বলি নুসরাত?  জানা কি যাবে সেই সত্য?? পরিকল্পক একজন মাওলানা! তিনি মানুষকে ধর্ম শেখানো একজন মানুষ-মাদ্রাসার অধ্যক্ষ – সবচেয়ে বড় অভিভাবক!!! নাকি এও সংস্কৃতি?  

শুনেছি কুরআন পাকে বর্ণিত – আদ ও সামুদ জাতি ধ্বংসের কারণের মধ্যে বলাৎকার ও এই জাতীয় যৌনতা একটি কারণ। এছাড়া আরো কিছু ভীবৎসতা নোংরামি ছিল সেসব জাতির। বাংলাদেশে মাদ্রাসা শুধু কেন সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে সরকারি নজরদারী উপেক্ষিত জায়গাগুলোতে কি কি হয় সেটা নতুন করে ভাবাচ্ছে। হয়তো সেগুলো বর্বরতার এক একটা মহাকাব্য। 

ক’দিন আগে ধর্ষণের বিচার দাবিতে দেশ তোলপাড় হলো। কেবল আইন করা হলো মৃত্যুদন্ডের। এর মানে কফিনে পেরেক ঠুকে দেয়া হলো। উপেক্ষা করা হলো সত্যকেই। নারী নির্যাতন তো বহুমাত্রিক। ধর্ষণ তো একটা দিক মাত্র।

নারীর প্রতি সহিংসতার বড় কারণ পর্দা নয়, বাজারীপনা, আইটেম ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই বড় কারণ। আজকাল নারী হলো রোবট কিংবা পুতুলের মতো।

রাজা রামমোহন রায় লিখেছেন – বিয়ের সময় অর্ধাঙ্গিনী রূপে গ্রহণ, বিয়ের পর পশুর মতো আচরণ আর শেষ কালে পতির সাথে পুড়িয়ে সতীদাহ!! বাহ! কি চমৎকার র্ধম রক্ষা।

একদিকে তথাকথিত হুজুরদের যৌন উত্তেজক বয়ান, নারী বশ ও পুরুষ উত্তেজক তাবিজ মন্ত্র। হুরপরীদের নিয়ে লোলুপ দৃশ্য। অবাধ যৌন সহায়ক অবস্থা। চাহিদার বিপরীতে অবাধ যোগান ও উৎপাদন সহায়ক পরিবেশ। ফলে যা হবার তা হবেই। সভ্য ধর্মীয় শিক্ষা কই? এগুলো তো শ্রেফ বাজারীপনা ও প্রতারণা।

দৈহিক নারী-পুরুষ কি আদৌ মানুষ হয়ে উঠছে। বুঝতে পারছে ন্যূনতম সত্য জীবনের ? জীবন মাধুর্য? ঘরে ঘরে ধর্ষণের শিকার নারীরা। ধর্মীয় মোড়কে হিজাব বোরকা পরলেই সমাধান হয়ে যাবে না। বরং শুধু হিজাব হিজাব করা চরম মানবাধিকার লংঘন। অনেক কিছু করতে হবে এ বিষয়ের সমাধান খুঁজতে। তবে সবার আগে দরকার পুরুষের শিক্ষা।

তেতুল বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে হবে না। তিন চার ক্লাস পড়ালেই নারীরা বেহেশতে চলে যাবে এগুলো চরম অরুচিকর কথা। বেহেশতে না হয় গেল, দুনিয়াটাও তো দেখতে হবে??

মাদ্রাসা মানেই ধর্মীয় উপাসনালয় কিংবা মসজিদ মন্দির গীর্জা মানে সুরক্ষিত নীতি নৈতিকতার উৎকৃষ্ট ভূমি? বিষয়টি তা নয়। হয়তো সেসব জায়গায় নীতি নৈতিকতার শিক্ষা দেয়া হয়, জানানো হয় ধর্মীয় রীতি-নীতি। সেটিও শিক্ষা হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য মহাপরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রকৃত শিক্ষার বুনিয়াদ গড়ে উঠবে পরিবারে সমাজে স্কুলগুলোতে।

তিনটি সন্তান থাকলে একটিকে মাদ্রাসায় পড়াতেই হবে। এমন একটা প্রচারনা শুনতে পাওয়া যায়। অথচ মাদ্রাসা তো ছিলই না তৎকালে। আবার মাদ্রাসা ভার্সেস সাধারণ স্কুল কলেজ ? এই যে বৈপরীত্য, সেটি কত বড় ক্ষত তৈরী করছে, তা কি আমরা উপলব্ধি করছি ?? মাদ্রাসায় পড়া মানে ঈমানদার, আর সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতরা বিভ্রান্ত, এটিই তো দাঁড়াচ্ছে শেষ পর্যন্ত। 

কোমলমতি শিশুদেরকে আমরা কার হাতে তুলে দিয়েছি, কি হয় সেখানে, সেটা কি আমরা অভিভাবক হিসেবে খোঁজ রাখি ?? নাকি বেহেশতের আশায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছি অজানা জগতে ?

রাষ্ট্রের একটি বড় ক্ষতের জায়গা মাদ্রাসা সহ সব ধরনের শিক্ষায়। কোন কোন অন্ধকার রয়েছে মাদ্রাসা, ক্যাডেট কলেজ, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, রাষ্ট্র তা খুঁজে পায়না! কখনো কখনো থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। বিড়াল নাকি সাপ!! খুঁজে বার করে তার একটি সুন্দর সমাধান করা সময়ের দাবি ॥