লালন সুধা পাঠ – ১৭

এসব দেখি কানার হাটবাজার

এসব দেখি কানার হাটবাজার বেদবিধির পর শাস্ত্রকানা আর এক কানা মন আমার।।

পন্ডিত কানা অহঙ্কারে গ্রামের মাতবর কানা চোগলখোরে সাধু কানা অনবিচারে আন্দাজি এক ঘুঁটি গাড়ে জানে না সীমানা তার।।

এক কানা কয় আর এক কানারে চল সাধুর বাজারে নিজে কানা পথ চেনে না পরকে ডাকে বারংবার।।

কানায় কানায় ওলামেলা বোবাতে খায় রসগোল্লা লালন তেমনই মদনভোলা ঘুমের ঘোরে দেয় বাহার।।

‘এসব দেখি কানার হাটবাজার বেদবিধির পর শাস্ত্রকানা  আর এক কানা মন আমার।’  উক্তপদে ‘কানার’ স্বরূপ দারুণ অলঙ্করণে ও প্রহসনের মাধ্যমে সাঁইজি তুলে ধরেছেন। মোটাদাগে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিকে আমরা কানা বলে থাকি। তবে এখানে ‘কানা’ অর্থে সামগ্রিক দর্শন ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। ‘কানা’ শব্দটি কন্ ধাতুসাধিত। এর অর্থ নিমীলন অর্থাৎ চোখবন্ধকরণ। দুটো আঙ্গিক চোখের বাইরেও একটি আত্মিক চোখ বিদ্যমান যাকে ত্রিনয়ন (third eye) বলে। এই নয়ন নষ্ট হলে ইন্দ্রিয়পরায়ণ ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টিতে আবরণ পড়ে যায় যার ফলে তার আচরণে শঠতা, ছল, মুগ্ধতা প্রকাশ পায়। সংসারে এই অস্বচ্ছ দৃষ্টিসম্পন্ন জীবের রমরমা অবস্থাকে সাঁইজি বলছেন‘এসব দেখি কানার হাটবাজার’।  মনোদৈহিক অস্তিত্ব ধরে রাখার জন্য যা ধারণ করা হয় তার নাম ধর্ম; এই সত্য জেনে তা সম্পাদিত হলে সেটাকে বলে ধর্মজ্ঞানসাধন যাকে অন্যকথায় ‘বেদ’ও বলে। বৈদিক আচার শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণ পরম্পরায় যে অনুশাসন লাভ করে তার নাম শাস্ত্র। সার্বিক অর্থে বেদ-স্মৃতি-শ্রুতি-পুরাণ সবটাই শাস্ত্রবাচ্য। শাসনকে যা ত্রাণ (উদ্ধার) করে তাকে শাস্ত্র বলা হয়। যিনি শাসনের অধীন তিনি শিষ্য। আসলে এই শাসানি স্বেচ্ছাচারী ইন্দ্রিয়াচার দমনের জন্য। মোহাবিষ্ট মন ঘোরের মধ্যে থেকে বিশেষ চোখ বা বিচক্ষণতা হারিয়ে ফেলে তখন অনুশাসনীয় কর্মকা- (বেদবিধি, শাস্ত্র) সেই অন্ধচোখ দেখতে পায় না। এটাকে সাঁইজি ‘বেদবিধির পর শাস্ত্র কানা/আর এক কানা মন আমার’ বলে নির্দিষ্ট করেছেন। ‘পন্ডিত কানা অহঙ্কারে  গ্রামের মাতবর কানা চোগলখোরে সাধু কানা অনবিচারে  আন্দাজি এক ঘুঁটি গাড়ে  জানে না সীমানা তার।’  প্রত্যেকের অহম (আমি) যা করে তা-ই অহঙ্কার। পন্ডিতের মধ্যে প- আছে, যা কমবেশি কৃতকার্যকে  (নষ্ট) করে দেয় এ কারণে যে, পন্ডিতসুলভ বুদ্ধিতে সব কাজের কর্তা হয় পন্ডিত আমি; আদতে যার কর্তা পরম আমি। মিথ্যে আমি তার দৃষ্টিকে একচোখা করে দেয় এটাই পন্ডিতের অহঙ্কার। মাতবর নিজেকে গ্রামজনপদের প্রধান ভেবে তাকে উৎকর্ষে উন্নীত করে অন্যসবাইকে অবজ্ঞা করে। এই আত্মাভিমানে আড়ালে সে অন্যের কুৎসা গায়। হীনমানসিকতা তার জ্ঞানচক্ষুকে ছিদ্র করে দেয়। এটাই গ্রামপ্রধানের অবজ্ঞাজনিত অন্ধত্ব যেটা লালন গায়নে‘গ্রামের মাতবর কানা চোগলখোরে।’ সাধনমার্গের পথিকের বিচরণ ও আচরণে সুষ্ঠ বাছাই না থাকলে সে বিচারদোষে দুষ্ট হয় যা ‘সাধু কানা অনবিচারে’ বলে বর্ণিত। পন্ডিত-মাতবর-সাধু মহলের জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন না ঘটায় প্রমাণে পৌঁছুতে না পেরে নিতান্ত অনুমানে সীমিত গন্ডির মধ্যে তারা চলাচল করে যাকে লালন বলছেন ‘আন্দাজি এক ঘুঁটি গাড়ে জানে না সীমানা তার।’ ‘এক কানা কয় আর এক কানারে  চল সাধুর বাজারে নিজে কানা পথ চেনে না  পরকে ডাকে বারংবার।’  মোহনিদ্রায় আচ্ছন্ন একজন মোহাবিষ্ট অন্যজনকে মোহমুক্তির বার্তা প্রচার করে। কামিনীকাঞ্চনাসক্ত মন আরেক কামুককে পদস্থ করতে গিয়ে সংসারকার্য সম্পাদনের ঠিকানা নির্ণয় করে দেয়; লালন সংকীর্তনে যার ধুয়া ‘এক কানা কয় আর এক কানারে/চল সাধুর বাজারে।’ পরিতাপের বিষয় সাধনমার্গের হদিস না জানা সত্ত্বেও অর্থাৎ দিশাপ্রাপ্ত না হয়ে অনাদিষ্টরা অন্যকে বারবার আদেশ-উপদেশ দিতে থাকে। ‘কানায় কানায় ওলামেলা  বোবাতে খায় রসগোল্লা লালন তেমনই মদনভোলা  ঘুমের ঘোরে দেয় বাহার।’  অজ্ঞতার (কানা) অধিকারী (ওয়ালা)-দের সমাবেশকে (মেলা) বলা হয়েছে কানায় কানায় ওলামেলা। আস্বাদনীয় বস্তুকে অন্ধজন ভোগ করে একান্ত ঘোরে যা ‘বোবাতে খায় রসগোল্লা’র সমার্থক। লালন সাধারণের কাতারে শামিল হয়ে মদগর্বে আপনাকে ভুলে অন্ধকার গৃহ শোভিত করতে চাইছে যা সাঁইজির খবরে ‘লালন তেমনই মদনভোলা/ঘুমের ঘোরে দেয় বাহার’ রূপে প্রচারিত।(চলবে)