রাজনীতিকরা বুঝেও বোঝেননা – মিথ্যা ও চাটুকারিতার ভয়াবহতা

শেখ উল্লাস ॥ মিথ্যা ফুলঝুরি ছড়ানো ও চাটুকারিতা আমাদের দেশে রাজনীতিকদের স্ব-ভাবে পরিণত হতে চলছে! মিথ্যার কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতিকরা পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু এবং শ্রদ্ধাশীল নন। যারা এই মিথ্যার বেসাতি করছেন তারা ভাবেন জনগণ বোকা এবং অজ্ঞ। জনগণ এদের প্রতি কেবল করুণা করছেন এবং সহিষ্ণুতার পরিচয় দিচ্ছেন, রাজনীতিকরা হয়তো স্বপ্নেও ভাবার অবকাশ পান না। রাজনীতিকরা এসব করেন, কারণ দেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার চর্চা অনুপস্থিত। বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে অন্ধ হয়ে রাজনীতিকদের সাথে দলবদ্ধ হয়ে পার্থিব ফায়দা লুটছেন। এরা কখনো রাজনৈতিকদের ভুল ধরিয়ে দিতে সত্য কথা বলেন না।

দেশের প্রতিহিংসা পরায়ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য আমাদের ওইসব মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা যেমন দায়ী তেমনি এদের সঙ্গে আছেন একশ্রেণীর সাংবাদিক নামধারী গোষ্ঠী। প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, সংস্কৃতিসেবী এবং শিক্ষাবিদ সর্বত্র দলবাজদের জয় জয়কার। আশ্চর্য লাগে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কিভাবে প্রতিদিন বৈদ্যুতিন মাধ্যমে উপস্থিত হয়ে রাজনৈতিক নেতানেত্রী, রাজনীতিক কিংবা সরকারের তোষামোদে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার মান এবং ছাত্রদের হানাহানি নিয়ে উৎকণ্ঠার পরিবর্তে এরা কেমন উৎকটভাবে চিবিয়ে-চিবিয়ে কথা বলতে থাকেন যে, মনে হয় বিশ্বমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৌঁছে গেছে সেরা একশ’টির মধ্যে। প্রেসক্লাব হলো নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার প্রতীক। অথচ এই প্রতিষ্ঠান এবং পেশাদার গোষ্ঠীটিকে রাজনৈতিক দলের পকেটে ঢুকিয়ে দেয়ার নজির বোধকরি বিশ্বের আর কোথাও মিলবে না। দেশে প্রকাশ্যে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করলেও মানবাধিকার এবং গণতন্ত্রের পতাকা ওড়ানোর কোনো বাধা নেই যেহেতু ওই দুটোর বাংলাদেশী সংজ্ঞা নেই। দলবাজ বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতায় রাজনীতিকদের এই উৎকট প্রবণতা সম্পর্কে বিভিন্ন চিন্তাবিদ বিভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে যাচ্ছেন। অনেকে দলবাজ বুদ্ধিজীবীদের জঙ্গলের নিম্নজাত প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করে অভিমত ব্যক্ত করেন – শিয়াল, কুকুর, শকুন, হায়েনারা যেমন দল বেঁধে খাবারের অন্বেষণ করে, দলবাজ বুদ্ধিজীবীরাও অনেকটা সেরকম। বাঘ কিংবা সিংহকে কখনো দল বেঁধে খাবারের অন্বেষণ করতে হয় না।

বর্তমানে দেশের লোভী রাজনীতিক, রাজনীতিজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের চাটুকারিতায় মুগ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা। সম্প্রতি এক চাটুকার মন্ত্রীসভার সদস্যের কথায় দেশবাসী স্তম্ভিত! সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে এ কথাটা তিনি কিভাবে বলতে পারেন? ওই সভায় উপস্থিতি কোনো প্রতিবাদ করেননি বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। উপলব্ধি করার সময় এসেছে – স্বাধীন ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা কোন পর্যায়ে? যোগ্যতা না ক্ষমতা? বিবেক না চাটুকারিতা? জনগণ আজ এসব প্রশ্নের জবাব চায়, যেহেতু সংসদীয় রাজনীতিতে রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার ইতিহাস প্রমাণ করে, কেউ যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন বাংলার মাটিতে মিথ্যাচারী ও দাম্ভিকদের ঠাঁই হয় না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিতে চায় না। মীর জাফর, লর্ড ক্লাইভ, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ থেকে শুরু করে সামরিক শাসক আইয়ুব ইয়াহিয়া, টিক্কা, নিয়াজী, এবং তাদের দোসররা কেউই বাংলার সহজ-সরল মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেনি, তারা আজ নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। আর সেই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্তদের আদর্শ ধারণ করে যারা বাংলার মানুষকে ধোঁকা দিতে চায় যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও নব্য রাজাকারদের  সহযোগিতা নিয়ে তারাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থই হবেন – এটাই ইতিহাসের নির্মম সত্য। মিথ্যাচার করে, রাজনৈতিক নীতি আদর্শ না মেনে যারা চাটুকারিতা করে এদেশে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছে এবং আগামীতে নিতে উদগ্রীব তাদেরকে এখন সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। মিথ্যাচার করে, চাটুকারিতা করে বা ষড়যন্ত্র করে বাংলার মাটিতে পার পাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। বাংলার মাটিতে রাজনীতিজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, ধর্মজীবী বা কোন পেশাজীবী যিনিই হোন না কেন প্রতিটি কর্মের প্রারম্ভে স্মরণ রাখার সময় এসেছে কুরআনের বাণী- সত্য এসেছে আর মিথ্যা অন্তর্ধান করেছে। মিথ্যাকে অন্তর্ধান করতেই হবে (সূরা-১৭:৭৮-৮১)। দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে যখন রাজনীতিকদের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠবে।