মিরপুর আস্তানা শরীফের ‘জ্যোতিভবন’এ ‘আচরণ’ নিয়ে ৮ম পর্বের আলোচনা

মানবধর্মের সৌন্দর্য -আচরণগত উৎকর্ষতা ও নিরুদ্বেগ জীবনাচারে

সংলাপ ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) এর নিয়মিত হাক্কানী চিন্তন বৈঠকে ‘আচরণ’ বিষয়ে ৮ পর্বের আলোচনা ২৫ পৌষ ১৪২৭, ৯ জানুয়ারি ২০২০ শনিবার মিরপুর আস্তানা শরীফের জ্যোতিভবনের আবু আলী আক্তারউদ্দীন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন বাহাখাশ সহ-সভাপতি শাহ্ শেখ মজলিশ ফুয়াদ।  করোনাজনিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে এ আলোচনায় অংশ নেন বাহাখাশ উপদেস্টাম-লির সদস্য এবং বাহাখাশ ধীতপুর, ভালুকা, ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক শাহ্ শাহাবুদ্দিন খান, বাহাখাশ-এর কোষাধ্যক্ষ শাহ্ মো. শহীদুল আলম,  যুগ্মসচিব মোঃ আব্দুল ওয়াহিদ এবং সাংগঠনিক সচিব দেলোয়ার হোসেন পিন্টু।  সঞ্চালনায় ছিলেন মিরপুর আস্তানা শরীফ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য শাহ্ আবেদা বানু তরু।

শাহ্ শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আচরণ  ব্যক্তিসত্তা দর্শনের ফসল ও অবস্থানের ব্যারোমিটার। আচরণ যতটা ব্যক্তিক তথা অর্জনগত তার থেকে কম বংশগত। পর্যবেক্ষণ করে করে তিলে তিলে এটি অর্জন করতে হয় । এটি উন্নতি ও অবনতির প্রথম ও শেষ সোপান । আচরণ ব্যক্তিসত্তার ধমনির্যার্স। একটি  সত্তা কর্তৃক  অন্য একটি সত্তাকে গ্রহণ ও বর্জনের মিথস্ক্রিয়া হল আচরণ। আচরণ সে অর্থে সত্তা  প্রকাশের প্রধানতম মাধ্যম। সূক্ষ্মতম ক্রিয়া যেমন- কথা,বাক্য, আলাপচারিতা, ক্রোধ, হাসি, ঠাট্টা, ঈশারা ঈঙ্গিত, অঙ্গভঙ্গি,কন্ঠস্বর, সংযম, নীরবতা, ধৈর্য, লিখনি পোশাক পরিচ্ছদে এর প্রকাশ। আচরণ বহুপাক্ষিক অর্থাৎ এক সত্তার সঙ্গে এক বা একাধিক সত্তার, হতে পারে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির।   সবচেয়ে কম খরচে, বলা যায় বিনামূল্যে সবচেয়ে মূল্যবান যে সম্পদ অর্জন, বিতরণ ও সৃষ্টিসেবার কাজে লাগানো যায় সেটি হল আচরণ। মানুষের যতরকম সম্পদ থাকে যেমন: অর্থবিত্ত, জ্ঞান-বুদ্ধিজাত সম্পদ সেগুলোর মধ্যে আচরণ হল সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। চরিত্র ব্যক্তির স্থায়ী প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট, আর আচরণ হচ্ছে স্থান-কাল-পাত্র-ভেদে ব্যক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ-মানুষের সকল গুণের মধ্যমণি, ব্যক্তিক অলংকার ও সৌন্দর্য, ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের প্রকাশিত রূপ। সকল মানবীয় গুণাবলী অর্জন যেখানে শেষ সেখান থেকে আচরণের শুরু। জীবন ও জীবিকার প্রকৃতি অনুযায়ী আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়। একজন মানুষ চরম বৈরি পরিবেশ-পরিস্থিতিতেও সাবলীল, ঠান্ডা ও খোশ -মেজাজে প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ করছে, অন্য একজন হয়তো তিলকে তাল করে সামান্য একটু কারণেই তেলে-বেগুনে জলে ঊঠছে, চিৎকার করে পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলছে। এর কারণ ব্যক্তির জীবনদর্শন। একটি হিসাবে সমাজে আনুমানিক ৭০% মানুষ দুনিয়াবী চাকচিক্যে মধ্যে ডুবে থাকে, না পাওয়ার হাহাকার, ক্রমাগত অসন্তুষ্টি, মেকি অবস্থান, ২০% মানুষ জীবনের মূলসময় পার করছে বেহেশত পাওয়ার লোভ ও দোজখ থেকে বাঁচার উপায়  নিয়ে, ৯%  মানুষ দোদুল্যমান ও  সিদ্ধান্তহীনতায় জীবন কাটায়, তাদের নিজস্বতায় নয় -পরিবেশ, পরিস্থিতি ও জীবনের গতিপ্রকৃতি দ্বারা তাদের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়, মাত্র ১%  মানুষ নিরুদ্বিগ্ন, সরল, সমর্পিত, কৃতজ্ঞচিত্ত, অকপট,পবিত্র ও আচরণে পরিচালিত  হয়।

মানুষ স্রষ্টার নেয়ামতে পরিপূর্ণ। তৎসত্ত্বেও যাদের পর্যবেক্ষণ নেই সন্তুষ্টি নেই তারা থাকে অশান্ত। মানবতা হয় ব্যহত, মানবাত্মা পায় কষ্ট, নিজে হয় অপদস্থ ও অবমূল্যায়িত। মানুষের চিন্তন প্রক্রিয়া একদিকে বহমান নিরন্তর, অন্যদিকে স্বার্থকেন্দ্রিক। তাই একই মানুষ একই স্থানে একই বিষয়ে একজনের সঙ্গে একরকম অন্যজনের সাথে অন্যরকম আচরণ করে থাকে। তারা সময়, পরিবেশ,  ঘটনা,  আবেগ,উৎকন্ঠা,অভিমান ও ক্রোধ দ্বারা চালিত ও তাড়িত হয় । এটি সে নিজের সঙ্গেও করে অর্থাৎ  নিজের চিন্তা, কথা ও কর্মের মধ্যে কোন সমন্বয় রাখতে পারে না তাই তাদের ইবাদতও শুদ্ধ হয় না। আর যারা কোন দর্শন দ্বারা সিক্ত হয়ে জীবনদর্শন গড়ে তুলেছে তাদের আচরণ সর্বত্রই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সৃষ্টি তথা মানুষের সেবার প্রথম  যোগ্যতা, মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার অর্থাৎ সদাচরণ । তাই কোন ব্যক্তি জীবনে ধর্মের স্বাদ পাওয়ার সাধ থাকলে তাকে সদাচারী ও সৎস্বভাবী হওয়া অপরিহার্য। মানবধর্মের সৌন্দর্য লুক্কায়িত থাকে তার আচরণগত উৎকষতার্য় ও নিরুদ্বেগ জীবনাচারে অর্থাৎ সৎস্বভাবে ।

সূফী সাধক আবু আলী আক্তার বলেছেন, ‘বিদ্যা, বুদ্ধি, বল- বিক্রম, পান্ডিত্য গর্বদোষে খর্ব হয়’। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেছেন, ‘ ত্রুটিপূর্ণ আচরণ ত্যাগ করে ভদ্র আচরণ করতে হবে, ত্রুটি ও অক্ষমতা অকপটে স্বীকার করে উন্নতির চেষ্টা করা উত্তম। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেছেন, ‘সর্বাগ্রে একজনকে বিহ্যাভ্যারিয়্যাল প্যাটার্ন ঠিক করতে হয়। কোন কিছুকে গভীরভাবে গ্রহণ এবং সুক্ষভাবে প্রকাশ করার সমক্ষমতা রাখতে হয়, ঠোটে হাসি লাগিয়ে কথা বলতে হয়, কারো সঙ্গে কথোপকথন শুরু করতে হয় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, মুক্ত হয়ে ষ্পষ্টভাষায় কথা বলতে হয়।’ আচরণের মানদ- মুর্শিদ দর্শন ও  মুর্শিদ  আচরণ । মানব দ্বিবীজ প্রাণিঃ প্রথমত: মা এর গর্ভে, দ্বিতীয়ত: মুর্শিদ দর্শনে। যেদিন থেকে মানবীয় জন্ম সেদিন থেকে তার আচরণ গণণা শুরু । মুর্শিদ আচরণই  ব্যক্তির আচরণ পরিমাপের একমাত্র মানদ।

শাহ্ মো. শহীদুল আলম বলেন, আমরা কতটুকু মানুষ হয়েছি তা আচরণেই বুঝা যায়। আচরণের প্রকাশে আমার সর্ম্পকে মানুষ জানতে পারে। চুপচাপ বসে থাকলে তা বুঝা যায় না। লোকটি কি সত্যবাদী, সদালাপী, হাসিমুখী একমাত্র মানুষের আচরণেই বুঝা যায়। ভদ্র আচরণ কীভাবে করবো এ ক্ষেত্রে কুরআনের সূরা আরাফ আল্লাহ্ বলেন “ আল্লাহ যাকে  গোমরাহ  করে দেয় তারা গুরু/মুর্শীদ/পথপ্রদর্শক পায়না।’ সত্য পথের যাত্রী বা হাক্কানী হতে পারে না। পথের দিশা পেতে হলে অবশ্যই আল্লাহর রহমত লাগবে। বাংলায় একটি কথা আছে ‘আপনী আচারী পরকে বলো’। অর্থাৎ আমি সত্য কথা বলি না অপরকে সত্য বলার দাওয়াত দেই’! জানা যায়, নবী মুহাম্মদ  (যাঁর কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত) এঁর কাছে একজন ব্যক্তি তার ছেলে মিষ্টি বেশী খায় জানিয়ে তা বন্ধ করার হুজুরকে বলেন। হুজুর তাকে কিছুদিন পরে আসতে বলেন। কয়েকদিন পর লোকটি এলেন হুজুর বলেন, ‘বেশি মিষ্টি খাওয়া ভাল না’। তাই তার ছেলেকে বলতে বলেন এই কথা শুনে লোকটি বলেন, হুজুর এই একটি কথা বলার জন্য এত সময় নিলেন কেন? হুজুর বলেন, আমিও মিষ্টি পছন্দ করি তা বলিনি। এখন আমি মিষ্টি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। এই হলো আপনী আচারী পরকে বলো’- এই হলো ভদ্র আচরণ।সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘আপনারা মা, বোন, স্ত্রী, সন্তান- সবার সঙ্গে কি একই রকম আচরণ করেন?।’

 সূফী সাধক আনোয়ার হক বলেন, ‘প্রেম আদায় করা যায় না প্রেম হয়ে যায়।’ যারা ধর্ম পালন করে তারা প্রতারক, আর যারা ধর্ম লালন করে তারা ধার্মিক। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি একজন নামাজী আজান দিলে আমাকে নামাজ পড়তে বলেন। কিছুদিন পর জানতে পারি সে অন্যের টাকা চুরি করে ধরা পড়েছে। এতে বুঝা যায় ধর্ম পালন আর ধর্ম লালন করা এক জিনিস নয়। মানুষের আচরণ অত্যন্ত রহস্যময় ও চিন্তার বিষয়।

দেলোয়ার হোসেন পিন্টু বলেন, মানুষের কথা-বার্তা, অঙ্গভঙ্গি, বাচনভঙ্গি ও চোখে-মুখে, দৈনন্দিন জীবনে সর্বক্ষণ তার আচরণ প্রকাশ পায়। তবে এ আচরণ আমাদের বাহ্যিক রূপ। আচরণে আমি নিজের সাথে নিজে প্রতারণা করি। আমার ভেতরে এক, বাইরে আরেক রূপ। দরবারের ভাষায় একে ‘দ্বিচারিতা’ বলে।

একটা প্রবাদ আছে, ব্যবহারে বংশের পরিচয়। আমরা সব সময় নিজের স্বার্থে আচরণ করি। যেমন-একজন বিক্রেতা ক্রেতার সঙ্গে, ডাক্তার তার রোগীর সঙ্গে, স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে, এমনকি ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের আচরণেও স্বার্থ রয়েছে। আমাদের ভেতরে এক রক, কিন্তু বাইরে প্রকাশ পায় আরেকটা। ভেতর ও বাইরে এক না হলে কোনো কিছু অর্জন করা যায় না। ভাগ্যগুণে মিরপুর আস্তানা শরীফে এসে এক ‘সত্যমানুষ’ পেলাম-সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ-এঁর দেখা। তাঁর বাণী, ‘আমরা প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে নিজে প্রতারণা করি ’-কথাটা বাস্তব। তিনি কৃপা করে আমাদের প্রতি উপদেশমূলক যেসব কথা বলে গেছেন সেগুলোকে যে আদেশ হিসেবে নিয়েছেন সি নিজেকে এগিয়ে নিতে পারবে। দরবারে একটা কথা আছে-‘ তোর স্বভাব তাকে দিয়ে, তাঁর স¦ভাব নে না কেড়ে’। এখানে ধারণ-পালন-লালনের একটা ব্যাপার থাকে। আমি যাঁকে স্মরণে নিয়ে চলবো সে আমার মধ্যে উদিত হবে, আমার আচরণ তাঁকেই প্রকাশ করবে। প্রভুকে স্মরণে রেখে ‘নিজের বিচার নিজে কর রাত্র-দিনে’র মধ্যে থাকতে পারলে অবশ্যই আমার শুদ্ধতা, আচরণ প্রভুর সুবাতাস সবাই দেখতে পারে-এটাই আমার বিশ্বাস। প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে আর বলবো, ‘আমি মানব, এখনো মানুষ নই।’ ফলে আমার মধ্যে এখনো মানুষের আচরণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি-হয়তো এটাই স্বাভাবিক।