মাতৃত্বের পূর্ব-পশ্চিম

দিলশাদ সুলতানা অন্তরা ॥ শরীরটা ক’দিন যাবত অন্যরকম লাগত। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে থাকতো। থেকে থেকে বুক ধরফর করতো। নাটক সিনেমার মত বমি হওয়া, টক খাওয়া দিয়ে আমার নতুন প্রাণের আগমণ বার্তা আসেনি। এসেছিল অন্যরকম অনুভূতি দিয়ে। টেস্ট করে যখন প্রেগনেন্সির খবর নিশ্চিত করি, বাবার বাড়ি  শ্বশুরবাড়ি মিলিয়ে তখন উৎসব আমেজ। অদ্ভূত এক মিশ্র অনুভূতি। আনন্দ, উৎসাহ, উচ্ছাস, ভয়, বিস্ময়, সব মিলিয়ে কি একটা জগা খিচুড়ি। মালিকের কৃপায় পুরো সময়টাই মোটামুটি সুস্থ স্বাভাবিক কেটেছে। পুরো গর্ভকালীন সময়টাই আমি যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবার উপর নির্ভরশীল ছিলাম। আমাদের দেশে পরিবারের বয়োজেষ্ঠ্যরা গর্ভবতী মায়ের ভালো মন্দ দেখাশোনার গুরুদায়িত্ব পালন করে। প্রবাসে নিজেই নিজের অভিভাবক। এখানকার মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আমার জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম এক অভিজ্ঞতা ছিল। শুরুতেই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা মেডিকেল রেকর্ড, পারিবারিক অসুস্থতার ইতিহাস সবকিছু বিবেচনা করে হাই অথবা লো রিস্ক প্রেগনেন্সি ধরা হয়। জটিলতা না থাকলে গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত চেকআপের দায়িত্ব থাকে মিডওয়াইফ বা ধাত্রীর উপর। এই ধাত্রী আমাদের দেশের গ্রামীণ ধাত্রী নয়, যারা বংশ পরম্পরায় সন্তান প্রসবে সহায়তা করে। ইউকেতে এমন সাহায্যকারীদেরকে ডুলা (doula) বলা হয়। মিডওয়াইফ হওয়া এখানে যথেষ্ট সম্মানজনক পেশা। এবং যথাযথ কোর্স (Midwifery) আর প্রশিক্ষণের পরই একজন স্বীকৃত মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করতে পারে। অপরদিকে হাই রিস্ক প্রেগনেন্সিতেও মিডওয়াইফ চেকআপ করে, তবে জটিলতা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারও ফলোআপ করে। গর্ভাবস্থায় ১৪ সপ্তাহ ও ২০ সপ্তাহ আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়। এর আগে বা পরে কোনরকম জটিলতা দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে আলট্রাসনোগ্রাম করে নিয়মিত রক্ত ও প্রসাব পরীক্ষা করে। শুরু থেকে মাল্টিভিটামিন ছাড়া যে কোনও ওষুধ দেয়া থেকে এখানকার ডাক্তার বিরত থাকে। খুব প্রয়োজন না হলে প্যারাসিট্যামল ছাড়া অন্য ওষুধ এড়িয়ে চলে। বমির সমস্যার জন্য প্রথম কয় মাস আমি খাওয়া  দাওয়া করতে পারতাম না। অনেক অনুনয় বিনয় করেও সমবেদনা ছাড়া কিছু জোটেনি। এদিকে আমাদের দেশে আমার চেনা জানার মধ্যে সম-সাময়িক যারা সন্তান সম্ভবা ছিল, সবারই দেখি একদম শুরু থেকে বমির ওষুধ, রুচির ওষুধ, হজমের ওষুধ, বেডরেষ্ট, কত রকম নির্দেশনা গাইনোকলজিস্টের। আর এখানে বেড রেস্ট তো দূরে থাক, সাঁতার সাইকেলিং, টেনিস খেলা, ব্যায়াম সবকিছুতে উৎসাহ দেয়। বমির সমস্যা হলেও যতক্ষণ পর্যন্ত শরীর থেকে কিটোন (keton) নামক উপাদান নি:সৃত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ঘরোয়া টোটকা / নিরাময়ই ভরসা। আমরা জানি আমাদের শরীর গ্লুকোজ থেকে শক্তি উৎপাদন করে। শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ অতিরিক্ত কমে গেলে পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদনের জন্যই ক্ষতিকর। বতর্মান সময়ে কিটো ডায়েট খুবই জনপ্রিয়। তবে জনপ্রিয় হলেও এর অপকারিতা সম্পর্কেও এখন প্রচুর লেখালেখি হয়।

মূল কথায় আসি, দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে থাকা অবস্থায় আমার অতিরিক্ত বমির কারণে কিটোসিস প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং তখন জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করে গ্লুকোজ ও বমির ওষুধ চালু করে। মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলত পারি যে প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যঘাত ঘটায় এমন যে কোন পদক্ষেপ নিতেই পশ্চিমা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নারাজ। অগত্যা স্বাভাবিক নিয়মেই সবকিছু চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা চলে। আমাদের দেশে সন্তানের আগমনী বার্তা পাবার সাথে সাথেই ধরে নেয়া যায় ডেলিভারি সিজারে মাধ্যমে হবে। এই সিজার যে কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ ও মায়ের শরীরে এর প্রভাব কতখানি তা বুঝতে বুঝতেই দুইবার অন্তত সিজার করা হয়ে যায়। পত্র-পত্রিকায় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় যা বোঝা যায় তা হল ডাক্তার ও হাসপাতাল টাকার লোভে সন্তান সম্ভবা মা ও তার পরিবারকে নানান রকম ঝুঁকির ভয় দেখিয়ে সিজার করাতে বাধ্য করে। গর্ভের সন্তান বেশি বড় হয় যাচ্ছে নয়ত ওজন কম, নয়ত পানি কমে যাচ্ছে, ইত্যাদি কারণ দর্শিয়ে সিজার করে থাকে। অবশ্যই কিছু কিছু ক্ষেত্রে সিজার করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। যেমন আমার নিজেরও দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম সিজারের মাধ্যমে। তবে আমাদের দেশে মাত্রাতিরিক্ত সিজারের জন্য সাধারণ জনগণ দায়ী করে ডাক্তারকে। আর ডাক্তাররা দায়ী করেন রোগীদেরকে। পুরো বিষয়টি নিয়েই রয়েছে নানান মত বিরোধ। আশে-পাশের বিভিন্ন শুভাকাঙ্খীদের উপদেশ, পরামর্শ ও নানান কুসংস্কারের পালন সব মিলিয়ে গর্ভবতী মায়ের অবস্থা এমনিতেই কাহিল হয়ে যায়। দু:খের বিষয় এই যে এ ব্যাপারে কথা উঠলেই পশ্চিমা বিশ্ব কতটা উন্নত আর আমাদের দেশ কতখানি পেছানো সেই তর্কের ঝড় ওঠে। আমাদের সোনার দেশের সোনার সন্তানেরা ভুমিষ্ঠ হবার আগেই কেন এত জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে জানার জন্য কৌতুহলী হয়ে খোঁজ নিতে শুরু করি। অবাক হয়ে জানতে পারি আমাদের দেশে ২০১০ সালে মিডওয়াইফরি কোর্স ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু জনসচেতনতার অভাব, যথাযথ অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের অভাব এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য সেবায় অব্যবস্থা সব মিলিয়ে এই গোটা দিকটাই অন্ধকারে অবস্থান করছে। এরপর কথা বলা শুরু করি পরিচিত যারা কাছাকাছি সময়ে মা হয়েছেন বা হবেন তাদের সাথে। অধিকাংশের অভিযোগ আমাদের দেশের গাইনী বিশেষজ্ঞের কথা-বার্তায়ই সহমর্মীতা ও নম্রতার অভাব। একজন সন্তান সম্ভবা এমনিতেই হাজার রকমের দুশ্চিন্তা, শারীরিক পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত থাকে। সেখানে ডাক্তারের সামান্য সহানুভূতি ও সহমর্মীতার দু’একটি কথা কতখানি প্রভাব ফেলতে পারে তা হয়ত তারা উপলব্ধি করেন না, কিন্তু আমার মতে সাধারণ মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখলে জানতে পারবেন যে একজন আন্তরিক সহানুভূতিশীল চিকিৎসকের সাথে দেখা করেই উপসর্গ অনেকখানি কমে যায়। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও রোগীর মুখে মুখে সেই চিকিৎসকের নাম ও প্রশংসা শুনতে পাওয়া যায়। যখন

 কোন কারণে মুষড়ে পড়েছি, ডেলিভারির সময় যখন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি এমনকি নিয়মিত চেকআপের সময়ও আমার মিডওয়াইফ, ডাক্তাররা বার বার বলেছে ‘ইউ আর ডুইং গ্রেট মামি, ইউ আর সো ব্রেভ’; এই ধরনের কথা শুধু আমাকে না, যে কোন অন্ত:স্বত্তা বা নতুন মাকেই তারা বলে থাকে। অপ্রয়োজনীয় অতি সাধারণ এই কথাগুলো যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় তার ভেতরে যে পরিমাণ ভরসার সঞ্চার করে তা অতুলনীয়। মাতৃত্ব মানেই এক রাশ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পূর্ণ অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা। মা যতই চেষ্টা করুক,

যতই ভালোভাবে নিজের সন্তানের যত্ম নিক, ভেতরে অজানা আশংকা অসন্তুষ্টি থেকেই যায়। একজন মা যখন নিজের ভেতরেই হাজার খানেক ভুল ত্রুটির হিসাব কষতে শুরু করে, সন্তানের কোন অসুখ অস্বস্থি, বা গর্ভকালীন জটিলতার জন্য নিজেকে দায়ী করে, আশ্বাসের সেই দুই চারটা বাক্য সেখানে ভালো বৈ খারাপ কিছু করে না। এবার আসি মাতৃত্বের এই আদিম অথচ আশ্চর্যজনক এই যাত্রায় সন্তানের বাবার ভূমিকায়। গর্ভাবস্থায় ২৮ সপ্তাহ পার হবার পর ইউকে তে জন্মপূর্ববর্তী ক্লাস বা অ্যানটেনাটাল  ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। ১০-১২ জন অন্ত:স্বত্তাকে নিয়ে একটি গ্রুপ হয় এবং তাদের   সাথে একজন করে বার্থ পার্টনার, যিনি সন্তান জন্মের সময় সাথে থাকবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বার্থ পার্টনার সন্তানের বাবা বা নানী/দাদী হয়ে থাকে। অ্যান্টিনেটাল ক্লাসের উদ্দেশ্যই হলো নতুন মা বাবাকে সন্তান জন্মের সময়ের জন্য যথাসম্ভব প্রস্তুত করা। নরমাল ডেলিভারির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। হাসপাতালের ব্যাগ গোছানো, প্রয়োজনীয় কি কি জিনিস ব্যাগে রাখতে হবে, কোন কোন উপসর্গ দেখলে বুঝতে হবে প্রসব বেদনার শুরু হয়েছে, ব্যাথা শুরু হয়ে গেলে শিশুর জন্মের আগ পর্যন্ত কি কি সুযোগ – সুবিধা ও ব্যথা নিরাময়ের উপায় এভেইলেবল আছে তার ধারণাও এই ক্লাসগুলোতে দিয়ে দেয়। বার্থ পার্টনার এর করণীয় কি কি আছে সেই প্রস্তুতিও সেখান থেকে শুরু হয়। নতুন মা ও বাবার আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য অ্যাটেনাটাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবজাতকের পরিচর্চা ও পরিচর্যা, দুধ খাওয়ানো, নতুন মায়ের জন্য স্বাভাবিক অস্বাভাবিক সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি নিয়ে কাঠামোভিত্তিক একটি শর্ট কোর্সের মত এটি। বিনা মূল্যে এলাকাভিত্তিকভাবে এই ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। এমনই এক ক্লাসে আমাদের প্রশিক্ষক একদিন সব বার্থ পার্টনারদের জন্য লাইফ জ্যাকেটের মত ভারী ভারী জ্যাকেট নিয়ে আসে। গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের অনাগত সন্তানের ওজন বয়ে সাধারণ চলাফেরা, কাজকর্ম করা কতটা কষ্টকর, তার নমুনা দেখানোর জন্যই এই আয়োজন করা হয়। প্রত্যেক বার্থ পার্টনার কে এই জ্যাকেট পরে হাঁটা চলা, মেঝে থেকে জিনিস তোলা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজ করতে বলা হয়। স্বভাবতই কিছুক্ষণের মধ্যে তারা হাপিয়ে যায় এবং তারপর কোমর ব্যাথার কারণে খুলে ফেলে। এছাড়াও নবজাতকে নিয়ে প্রথম দিনগুলো কেমন কাটতে পারে, কিভাবে আরেকটু সহজ করা যেতে পারে এই সময়টাকে, তা বিভিন্ন ধরনের ভিডিও এবং কার্যক্রমের মাধ্যমে ধারণা দিয়ে দেয়। সন্তান জন্মের সময় বাবার উপস্থিতি ও সন্তান লালন পালনে বাবার সক্রিয় ভূমিকায় এখানে শুরু থেকে উৎসাহ দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে সন্তান জন্মের সময় তো দূরে থাক, সাধারণ স্ক্যানের সময়ও বেশিরবাগ সময়ে বাবাকে থাকতে দেয়া হয় না। বর্তমানে অনেক বাবা শিশুর পরিচর্চায় অংশগ্রহণ করলেও অনেক পরিবারের সদস্যদের বিরূপ মন্তব্য, কখনো নিরুৎসাহে পিছিয়ে যায়। পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনে নারী পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উপার্জন করলেও সন্তানের দেখাশুনা নারীকেন্দ্রিক কাজ কেন হবে, এই প্রসঙ্গে আলোচনা সমালোচনার শেষ নেই। একই ঘরে নারী পুরুষ উভয়ে থাকলেও সেই ঘরের ঝাড়া, মোছা রান্নাবান্না ইত্যাদি কাজে অংশগ্রহণ করতে বাড়ির ছেলেদের পৌরুষে কেন আঘাত আসে, তার উত্তর আমাদের সমাজ দিতে পারে না। যেই সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে বাবায়-মা দুজনেরই জৈবিক ভূমিকা সমান, সেই সন্তানের লালন পালনের ভার শুধু মায়ের উপর এসে পড়ে। আর বাবার দিন শেষে শিশুকে নেড়েচেড়ে একটু খেলেই জগত সংসারকে ধন্য করেন।সন্তান মাতৃগর্ভে আসার পর একজন মায়ের শরীরে শুধু হরমোনের পরিবর্তন হয় না।  নতুন স্বত্তাকে জায়গা দেবার জন্য মায়ের আভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো কুঁচকে সরে যেতে থাকে। মেরুদন্ড দেহের ভার সামলানোর জন্য বেঁকে যায়। শরীরে যে কোন নতুন – অপরিচত অস্তিত্বকে ক্ষতিকর হিসেবে ধরে আমাদের শরীর। ফলস্বরূপ দেহে অ্যান্ডিবডি তৈরি হয়। বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীর এভাবেই মোকাবেলা করে। নতুন ভ্রুণকে মায়ের শরীর যেন প্রত্যাখ্যান না করে তার জন্য গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে সবচেয়ে দুর্বল।

শরীরে অতিরিক্ত অক্সিজেনের যোগান দিতে মায়ের মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। যার কারণে গর্ভাবস্থায় অনেক নারীদের অভিযোগ থাকে যে তারা অনেক কিছু ভুলে যায়, দাপ্তরিক কাজে সময় লাগে,         হিসাব নিকাশে ভুল ত্রুটি হয়। অনেকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। এই অবস্থাকে প্রেগনেন্সি ব্রেইন বলা হয়। হরমোনজনিত উপসর্গগুলো শুধু মায়ের শরীরে নয়, মানসিক সুস্থতারও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য মাতৃত্বকালীন মানসিক পরিবর্তনকে ইউকেতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখে। প্রতিবার চেক আপের সময় তারা জানতে চায় আমি মানসিকভাবে কেমন বোধ করি। অবসাদ, অস্থিরতা, বিষন্নতার ক্ষেত্রে তারা তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নেয়। সমাজসেবিরা বাড়িতে গিয়ে গিয়ে গর্ভবতী বা নতুন মায়ের সাথে সময় কাটায়, কথা বলে, প্রয়োজনে তাকে অন্যান্য সেবা প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত করে। এলাকাভিত্তিক কমিউিনিটি সেন্টারগুলো নানান ধরনের সেবার সুব্যবস্থা করে। অথচ অবাক হয়ে দেখি আমাদের মতো স্পর্শকাতর জাতি নতুন মায়ের মানসিক সুস্থতার প্রতি কি পরিবাণ উদাসীন। নবজাতকের সুস্থতার খবর সবাই জানতে চায়, কিন্তু মায়ের শরীর ও মনের খোঁজ নেয় খুব কমই। নবজাতককে দেখতে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প জমানো, দাওয়াত খওয়া, মিষ্টির আবদার এসবের মধে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা ভুলে যাই প্রসূতী মা ও নতুন শিশুর একটু নিরিবিলি বিশ্রাম নেয়ার গুরুত্ব। সন্তানের মায়ের দুধ টেনে খেতে শেখার জন্যেও সময় দরকার। শিশু মাতৃগর্ভ থেকেই দুধ খাওয়া শিখে আসে কথাটা পুরোপুরি সঠিক নয়। অনেককিছুর উপর এটা নির্ভর করে। সন্তানের জন্মের পর মায়ের সাথে স্কিন টু স্কিন কন্টাক্ট বা ত্বকের সংস্পর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেটা আমাদের দেশের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। যতটা সময় শিশু মায়ের ত্বকের সংস্পর্শে থাকবে, তত তার শরীরে উষ্ণতা বাড়বে, প্রশান্ত হবে, আর মায়ের শরীর তখন অক্সিটোসিন, প্রোল্যাকটিন, এনডুরফিন নামক হরমোন উৎপাদন করবে। মায়ের দুধের যোগান দিতে এই হরমোনগুলোর প্রভাব সর্বাধিক। তাই মা ও শিশুর জন্য প্রথম কিছুদিন নিরিবিলি, শান্ত পরিবেশ খুব জরুরি। নতুন শিশুর জন্মের পর সবাই হুমড়ি খেয়ে উপহার নিয়ে দেখতে চলে যাই। নতুন মায়ের জন্য একবেলা খাবার কি নিয়ে যাই কেউ? নবজাতকে এক বেলা দেখে রাখার মাধ্যমে নতুন মাকে একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দেয়ার কথা ক’জন ভাবি? প্রবাস জীবনের সাথে আমাদের দেশের একটা বিশদ পার্থক্য হলো দেশে আমরা  আত্মীয়-স্বজন, চেনা পরিচিতরা একে অন্যের সুখে দু:খে পাশে থাকতে পারি। প্রবাসে এই অভাব প্রতিনিয়ত অনুধাবন করি। এত মানুষজন চারপাশে থাকার পরও আমাদের দেশে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভুক্তভোগী মায়েদের সংখ্যা কম নয়। নির্ণয়কৃত রোগী ছাড়াও উপসর্গ রয়েছে ডায়াগনোসিস হয়নি এমন মায়েদের সংখ্যা প্রচুর । এই সময়টাতে পাশে না দাঁড়িয়ে উলটো তার ভুল ভ্রান্তিগুলো তুলে ধরতে আর কুসংস্কার কুপ্রথার বেড়াজালে তাকে কাবু করতে অস্থির হয়ে যাই আমরা। অথচ ভাবি না নবাগত এই সন্তানের সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে বেড়া ওঠার পুরোটাই তার মায়ের ভালো থাকার উপর নির্ভরশীল। তাই পারিবারিকভাবে সামাজিকভাবে, জাতীয় পর্যায়ে মাতৃত্বকালীন শিক্ষা, সচেতনতা, সেবা সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন আর প্রচার প্রসার প্রয়োজন। কেননা গোড়ায় গলদ রেখে তো আর মহিরুহের স্বপ্ন দেখা যায় না।