বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমগুলোর মুখোশ!

সংলাপ ॥ গুটেনবার্গের অক্ষর বিন্যাসের ছায়াপথ পার হয়ে এসে আজকের স্যাটেলাইট শাসিত বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম পুরোমাত্রায় সাবালক, আধুনিক থেকে উত্তর-আধুনিকতার পথের যাত্রী। গণমাধ্যমের এই প্রকৃতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বিপুলভাবে ঘটছে এর পরিবেশনগত বিবর্তন, এর পরিচালনার সমীকরণ পাল্টে যাচ্ছে আমূল। সেই কারণেই আজকের সমাজের বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে বার্তা পরিবেশনের কৌশল তথা উদ্দেশ্য তথা পরিচালকম-লীর স্বার্থ চরিতার্থ করার পদ্ধতিসমূহ। বিশ্বখ্যাত মিডিয়াগুরু মার্শাল ম্যাকলুহান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন মানুষের চোখ এবং কানের সম্প্রসারণ। দূর-দূরান্তের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী সম্পর্কে আমরা অবগত হই গণমাধ্যমেরই সূত্রে। গণমাধ্যমের বিপুল ক্ষমতার মূল উৎস হলো তার বার্তাকে সংশ্লেষ ক্ষমতা। গণমাধ্যমের সাহায্যে একই বার্তা অপেক্ষাকৃত কম সময়ে এবং কম খরচে পৌঁছে যেতে পারে অসংখ্য মানুষের কাছে। এমনকি ভৌগোলিক সীমানাও এক্ষেত্রে বাধা হয় না। আজকের ইন্টারনেটের যুগে কোন বার্তা নিমেষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াব্যাপী। গণমাধ্যমের সর্বব্যাপী অস্তিত্ব মানুষের কাছে অত্যন্ত নিবিড়। সকালের চা থেকে অবসরের ড্রইংরুম, এমনকি নিভৃত বেডরুম পর্যন্ত আজ বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম মানুষের সঙ্গী। এখানেই প্রাসঙ্গিক গণমাধ্যমের পরিবেশন শৈলী এবং পরিচালনার নীতি। গণমাধ্যমের নীতি, তার দৃষ্টিকোণ নিঃসন্দেহে মানুষকে প্রভাবিত করে। আর এখানেই দর্শক বা পাঠক কি পড়বে বা দেখবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কীভাবে দেখবে।

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিন মাধ্যম সংক্রান্ত আলোচনায় নতুনতম উপাদান খুব সম্ভবত পেইড নিউজ টাকার বিনিময়ে খবর। অর্থাৎ কোনো খবর বা বিশ্লেষণ মুদ্রণ বা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে প্রচার করার জন্য যখন অর্থ বা অন্য সুবিধা (ক্যাশ অর কাইন্ড) প্রদান করা হয়। এই ঘটনা প্রকৃতপক্ষেই একটি অশনিসংকেত। সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের খবর বা বিশ্লেষণ এমন সুচারুভাবে পরিবেশিত হয় যাতে সাধারণ মানুষ এর অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে না পারেন! এই ধরনের পরিবেশন শৈলী অনুসৃত হয় কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন অথবা মতাদর্শের পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে। এর কার্যকারিতা অনেকটা বিজ্ঞাপনের সমতুল্য। অর্থ বা অন্য সুবিধা পাইয়ে দেবার পরিবর্তে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যগত কোনো পার্থক্য নেই। এভাবে খবর বা বিশ্লেষণ প্রচার করা ছদ্ম বিজ্ঞাপনেরই নামান্তর।

বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার মুখোশ খসে পড়ছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেভাবে কয়েকটি কর্পোরেট সংস্থার ভাবমূর্তি নির্মাণে নিরলসভাবে রত তা দেশ ও জাতির স্বার্থের পরিপন্থী। বেশ কিছু কর্পোরেট সংস্থা এবং মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার এই ‘গোপন চুক্তি’ সম্পর্কেও সচেতন মহল উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ যে কত প্রাসঙ্গিক তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দিকে চোখ রাখলেই বোঝা যায়।

অর্থের বিনিময়ে প্রচারিত সংবাদ সংবাদমাধমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে। সংবাদমাধ্যম থেকে মানুষ যে বস্তুনিষ্ঠতা প্রত্যাশা করে তা ব্যাহত হচ্ছে। উইকহ্যাম স্টিড তার বিখ্যাত ‘দ্য প্রেস’ গ্রন্থে লিখেছিলেন প্রেসের কেন্দ্রীয় আলোচনা আর গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয় একই। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কাছে প্রত্যাশা তো তেমনই। কিন্তু সংবাদ যখন ক্রমশ ছদ্ম বিজ্ঞাপনে পরিণত হয় তা তখন গণতন্ত্রের তথা মতামত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের পক্ষেও ক্রমান্বয় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এই ভয়ঙ্কর বিপদের স্বরূপ অনুধাবন করার সময় এসেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই সমস্যাটিও আপাদমস্তক রাজনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে এই রাজনৈতিক সমস্যার উদ্রেক রাজনীতির ক্ষেত্রে অর্থবলের আমদানির সঙ্গে সঙ্গে। অর্থবলের এই নির্লজ্জ আস্ফালনের ফল হলো  দেশে রাজনীতিকদের মধ্যে কোটিপতির সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

বৈদ্যুতিন মাধ্যম পরিচালনার ক্ষেত্রেও কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রভাবশালী মানুষগুলোর যে চাপ তা সংবাদ মাধ্যমের বস্তু নিরপেক্ষতা তথা বিশ্বাসযোগ্যতার কাছে এক ভয়ানক আঘাত। বৈদ্যুতিন মাধ্যমের ভূমিকা এক্ষেত্রে আরো ভীতিপ্রদ।

মুনাফা লাভের অসদুপায় আচরণে বৈদ্যুতিন মাধ্যমও পিছিয়ে নেই। স্বাভাবিক কারণেই বিশ্বাসযোগ্যতা খানিক বেশি। বার্তার দৃশ্যরূপ সর্বদা হাজির থাকায় এই মাধ্যমের প্রতি মানুষের আকর্ষণও বেশি। তাছাড়া অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তার আর একটি বড় কারণ সাক্ষরতা এখানে পূর্বশর্ত নয়। এই জনপ্রিয়তা এবং আকর্ষণকে ব্যবহার করে অ্যাজেন্ডা তৈরি অর্থাৎ সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিকোণকে দর্শকের ওপর চাপিয়ে দেবার চেষ্টাতেও স্বভাবতই কর্পোরেট সেক্টর অগ্রগামী। টাকার বিনিময়ে সংবাদপ্রচার নিয়ে সচেতন মহল ক্রমাগত এ বিষয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করছেন।

বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের প্রভাব বিস্তারের আর একটি সূত্র হলো একই ঘটনা বারংবার প্রচার করার সুবিধা। স্বভাবতই এক্ষেত্রে সম্মতি নির্মাণের জন্য মালিকপক্ষের মতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দৃশ্যই বারবার প্রচারিত হয়। কারিগরি কুশলতাকে কাজে লাগিয়ে ড্রইংরুম থেকে বেডরুম সম্মতি নির্মাণের এই প্রক্রিয়া চলে।  সুচারু সম্পাদনায় কোনো ঘটনা বারবার দিনের পর দিন প্রচারের ফলে মানুষের মনে প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। প্রিয় পাঠক ভাবুন, কয়েক মিনিটের ঘটনা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে কয়েক শত ঘণ্টা। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সময়ের মূল্য অপরিসীম। বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রচার তো কোনো এক পক্ষকে বিজ্ঞাপিত করাই। সংবাদের মোড়কে এও ছদ্ম বিজ্ঞাপন, কোনো ‘গোপন চুক্তি’র সম্যক সম্ভাবনাও বটে।

প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণেই বৃহৎ পুঁজির প্রতি নির্ভরতা বাড়ছে গণ-মাধ্যমের। আধুনিক গণ-মাধ্যম আরো শক্তিশালী তার সমকেন্দ্রিকতার কারণে।

বর্তমানে কর্পোরেট ইচ্ছার অধীনে রচিত হচ্ছে সংবাদ পরিবেশনের দৃষ্টিকোণ। নোয়াম চমস্কি তার ‘সম্মতির নির্মাণ’ তত্ত্বে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার রাজনৈতিক বিরোধিতার কথা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা আগাগোড়া সত্য। বর্তমান বাংলাদেশে মহাজোট সরকারের বিরোধিতায় প্রায় সব মেইনস্ট্রিম বৈদ্যুতিন মাধ্যমেরই একই দৃষ্টিকোণ। বহুত্ববাদের প্রাথমিক নিয়মেও এটি অস্বাভাবিক। এ যেন ঠিক পুতুলনাচের ইতিকথা – পুতুলগুলোর সুতো কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে দৃষ্টির অগোচর থেকে।

বৈদ্যুতিন মাধ্যমের অতিকথন, বৈদ্যুতিন মাধ্যমের নৈঃশব্দ সবই বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের প্রক্রিয়া। তার মুখ আর মুখোশের মধ্যে দুর্লঙ্ঘ ব্যবধান। একদিকে মহাজোটের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কুৎসা আর অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও নব্য রাজাকারদের গোপন অভিসার সম্পর্কে মুখে কুলুপ, চোখে ঠুলি। তবে সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় এই মুখোশ খসে পড়ছে। বেরিয়ে পড়ছে প্রকৃত অবয়ব। এইসব মুখচ্ছবি সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের পক্ষে, একাত্মবাদ বা বহুত্ববাদের পক্ষে বিপজ্জনক এবং দেশে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি হুমকি স্বরূপ। তাই জাতির বিবেক জাগ্রত হোক এটাই সময়ের  দাবী।