বাংলা আমার অহংকার, বাংলা আমার পরিচয়

ড. খাঁন সরফরাজ আলী ॥ বাঙালি জাতির আত্ম-পরিচয়, স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের মূলে যে মহান দিনটির অবদান রয়েছে তা নিঃসন্দেহে আমাদের মহান শহীদ দিবস ও ভাষা দিবস। নিজস্ব ভাষার অধিকার আদায়ে পৃথিবীর অন্যতম দেশ বাংলাদেশের একজন গর্বিত নাগরিক হিসেবে আমরা ভাগ্যবান। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার মধ্য দিয়ে অর্জিত আমাদের ভাষার অধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াসে জাতিসংঘ কর্তৃক দিবসটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান প্রকারান্তরে বাংলা ভাষাভাষী এদেশের জনসাধারণের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শামিল।

একজন পেশাজীবি হিসেবে পরিচয় যাই হোক না কেন সর্বপ্রথম আমি বাঙালি। বাংলা মায়ের সন্তান। বাংলা ভাষাভাষী ও একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি গর্বিত। ৫২’র ভাষা আন্দোলন স্বচক্ষে দেখার সুযোগ না হলেও বাল্যকাল হতেই একুশের প্রথম প্রহরে প্রভাত ফেরীতে অংশ নেয়া ও শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দেশপ্রেম ও ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পনের বোধ আসে মূলতঃ স্কুল জীবনে।

আশির দশকের শেষে সপ্তম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মহান শহীদ দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে কতিপয় স্কুল পড়–য়া কিশোর একতাবদ্ধ হয়ে সরকারি বাসভবনের নিজস্ব খেলার মাঠে ইট, বালু ও চুনের গুড়া দিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যা রাত হতে শহীদ মিনারের আদলে বেদী বানানোর আনন্দে মেতে উঠতাম। একইসঙ্গে, পার্শবর্তী বিভিন্ন বাগান হতে ফুল সংগ্রহ করে নিজেরাই শ্রদ্ধার্ঘ্য বানিয়ে নিতাম। পাশাপাশি, টিফিনের খরচ হতে বাঁচানো টাকা-পয়সা জড় করে মাইক ভাড়া করে।

সন্ধ্যা রাত হতেই বাজানো শুরু করতাম ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। সমবয়সী কিশোর-তরুণ ছাড়াও এলাকার সব শ্রেণী-পেশার লোকজন ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শ ভুলে আমাদের এ আয়োজনে সক্রিয় অংশ নিতেন। কালো রংয়ের কাপড় কেটে নিজেরাই ছোট ছোট ব্যাজ বানিয়ে পরিধেয় পোষাকের সঙ্গে লাগিয়ে শোক প্রকাশ করতাম। এ আয়োজন চলতো ২১’এর দুপুর পর্যন্ত। অনেকটা একই ধাঁচের আয়োজন করা হতো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। যেখানে ছাত্র-শিক্ষক সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছি। নতুন প্রজন্ম এ অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবে কিনা জানিনা তবে আমরা যারা প্রত্যক্ষ করেছি তারা তা ভুলতে পারবো না।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরীসহ যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয় মূলতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায়। সম্মান প্রথম বর্ষের ছাত্রাবস্থাতেই স্বীয় বিভাগ ও হলের সিনিয়র ও সহপাঠীদের সঙ্গে খালি পায়ে একযোগে কালো ব্যানার হাতে ছোট ছোট ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি আর সেখান থেকে সোজা ছুটে গিয়েছি একুশের বই মেলায়। সাদা পাঞ্জাবি আর কালো প্যান্ট ছিল আমাদের সে সময়ের পোষাকী ঢং। পরের বছরগুলোতেও এ ধারাবাহিকতার কোন ব্যত্যয় হয়নি। বরং সম্মান শেষ বর্ষে ও মাস্টার্স-এ অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রথম সারিতে থেকে এ ধরনের আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছি। ফলশ্রুতিতে, দেশপ্রেম ও ভাষা শহীদদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার অংশ হিসেবে যে কোন অবস্থাতে শহীদ মিনারে গিয়ে একুশের আয়োজনে অংশ নেয়া একটি রীতি হয়ে গিয়েছিল।

ছাত্র জীবন শেষ করে চাকুরির শুরুতে রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠিত মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুবাদে ২০০১ সালে প্রথম বারের মত ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যানার হাতে প্রভাত ফেরী নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো শিহরণ জাগায়। পরবর্র্তীতে যখন জানতে পারলাম আমাদের বেদীতে ফুল নিবেদনের পর্বটি সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয়েছে তাতে ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে নিজেই বেশী পুলক অনুভব করেছি। অন্ততঃ এই ভেবে যে, পরবর্তী প্রজন্ম একুশ ও ভাষা শহীদদের সম্বন্ধে জানতে পারছে আর তাতে অংশ নিচ্ছে।  এখন ভাবতেই অবাক হই যে, সেদিন রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত শহরে যানবাহন ও গণমানুষের ভীড় ঠেলে সাইন্স ল্যাবরেটরির মোড় হতে নীলক্ষেত পার হয়ে বুয়েটের ভিতর দিয়ে ক্লান্তিহীন পায়ে ছাত্র-শিক্ষক সবাই একযোগে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি। একমুখী পথ চলাচলের কারণে শহীদ মিনার হতে বেরিয়ে বাংলা একাডেমীর বইমেলা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর দিয়ে শাহবাগ মোড় হয়ে বেরিয়ে এসেছি।

সময়ের পরিসরে ও বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রভাত ফেরী ও একুশের প্রহরে শহীদ মিনারে যাওয়ার রীতি ধীরেধীরে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হলেও প্রকৃত বাঙালি মনে একুশ মানে বাংলাকে চেনা, বাংলাকে জানা আর বারবার বাংলাকে ফিরে পাওয়া। আর তাই একজন গর্বিত বাঙালি হিসেবে সর্বস্তরে বাংলার চর্চা ও শুদ্ধ বাংলার অনুশীলন আন্দোলনে সোচ্চার হওয়া এ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। এ প্রেক্ষিতে যার যার অবস্থান থেকে সকল স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সত্যিকারের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের প্রতি আন্তরিক হয়ে দেশের কল্যাণে অবদান রাখতে পারলে তবেই দেশ এগিয়ে যাবে এবং জাতি হিসেবে আমরা পৃথিবীর বুকে সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হবো।