বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় মৃত্যু শেখ হাসিনার নব উত্থান

নজরুল ইশতিয়াক॥ ১৯৭৫ সালে মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-  কোন কারণে দৈহিকভাবে আমার একবার মৃত্যু হলেও পরবর্তীতে লুটেরা, দলীয় চরিত্রহীন, নষ্ট  বিভ্রান্তদের হাতে নেতৃত্ব গেলে দ্বিতীয় মৃত্যু হবে। সেটা হবে ভয়াবহ। বিস্তৃ অতল গহ্বরে দীর্ঘকাল হারিয়ে থাকবে আওয়ামীলীগ। তিনি বলেছিলেন স্বাধীন দেশে লুটপাট ধনপতি হবার সুযোগ বেড়েছে।

দলকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সেটা কাজে লাগাবে। জাতির জনকের এই গভীর উপলব্ধি হতে প্রাপ্ত সত্য থেকে কতদূরে আমরা অবস্থান করছি? কঠিন অথচ সত্য জানার তাগিদেই যদি প্রশ্ন আসে ১৯৭৫ এর ১৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে কতবার বঙ্গবন্ধুকে মরতে হয়েছে? সেই হিসেব কি মিলবে বাঙালি জাতির?

তবু দেশ থাকে, থাকে দেশমাতা, থাকে সত্য। থাকে প্রকৃতি প্রতিবেশ ও মানবিক সৃজনশীল চিন্তার অপূর্ব এক উদ্যান। যা গোপনে গভীর আবেদন রেখে চলে। এই পথ চলা হয়তো শেষ হয়না।

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় মৃত্যু হয়তো হয়েছে,  শুধু একবার দুইবার কেন শত শত বার হয়তো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হয়েছে। সেটা প্রমান করাও যায়। তবু বাঙালির জাতীয়তাবোধের সুকুমারী সুক্ষ্ম বুননের ভাঁজে ভাঁজে একটি সত্য; সত্য ধারা হয়ে বহমান প্রবাহ। সেই ধারা কিংবা শক্তিটি সাধারণ মানুষের, সেই সত্যটি কিছু নিদর্শন স্বরূপ বাংলার পথে প্রান্তরে রয়েছে। অল্প কিছু পরিসরে জোরালো ভাবেই নিরবে নিভৃতে সেটা কার্যকর রয়েছে। বাংলার সাধককূলের দানে অবদানে তা নির্মিত। রয়েছে কিছু ত্যাগী দেশপ্রেমিকের অবদান। ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণগুলো যারা মনোযোগ দিয়ে পাঠ করেছেন, তারা জানেন তিনি কতটা দূরদর্শী ছিলেন। তিনি তো কোন সত্য এড়িয়ে যান নি। তিনি তো কোন বিভ্রান্তি তৈরী করে যাননি। অথচ আজকের আওয়ামীলীগ সেসব সত্য তুলে ধরতে চায় না, বলো না বঙ্গবন্ধু কি বলেছেন দেশ বিনির্মানের জন্য! আফসোস তারা সেসময়ের জিডিপি বিনিয়োগ অর্থনীতি নিয়ে কথা বলে বাহ্বা নেন। অথচ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, চোরের দল, চাটার দল, মোসাহেব, লুটেরা, প্রতারক এসব বিশ্লেষণ। কারা এরা, তারা এখন কোথায়? আমরা কি সেই সত্য থেকে দূরে?

বঙ্গবন্ধু তো চরম অসহায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। পৃথিবীর দেশে দেশে ছুটেছেন দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। বিভিন্ন সম্মেলনে গেছেন কেবলমাত্র দেশের মানুষের ভাগ্য ফোরাতে। যেসব তথাকথিত মুসলিম দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি তাদের কাছেও গেছেন সাহায্য সহযোগিতার জন্যই। বঙ্গবন্ধু তো সবই জানতেন, হয়তো কিছুই করার ছিল না, বাস্তবতার মধ্যে পড়ে মরতে হয়েছে। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়তেন। বলতেন আমার কৃষক শ্রমিক চোর না। তারা উৎপাদন করে আর লুটেরারা লুট করে নিয়ে যায়। আমার গরীব মানুষেরা আমাকে ভালবাসে, তাদের পেটে ভাত নাই, পরনে কাপড় নেই তবু মুখে হাসি নিয়ে আমাকে একনজর দেখার জন্য পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। তিনি বহুবার স্পষ্ট করে বলেছেন শিক্ষিত লোকেরাই চুরি করে, সাধারণ মানুষ নয়। কৃষক শ্রমিকের ঘামের ঋণ শোধ দিতে পারি না। তিনি সমাজের উঁচুতলার অফিসারদের উদ্দেশ্য করে বলেন আপনাদের বেতন হয় ঐ নিচুতলার মানুষদের টাকায়, আপনারা জনগণের চাকর, প্রজাতন্ত্রের সেবক। ৭২- ৭৫ এর শাসনামল পর্যবেক্ষণ করে উপলব্ধি করা যায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দূরদর্শীতার কোন ঘাটতি ছিল না। মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কোন ঘাটতি ছিল না। বস্তুত তার মতো মহান দেশপ্রেমিকের কোন মৃত্যু নেই।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও ধীরে ধীরে সেই সত্য রেখা ধরেই চলছেন। স্পষ্টতই তাঁর সাফল্যের ঝুলিতে বহু অর্জন। চেতনায় তিনি বিজয়কে ধারণ করেই এগিয়ে চলেছেন। সব অসম্ভবকে তিনি সম্ভব করে তুলেছেন, তুলছেন। দূর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

সাম্প্রতিক ভাস্কর্য ইস্যুতেও শেখ হাসিনার দূরদর্শীতা দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। তিনি উপলব্ধি করছেন হাজার হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারীদের শিক্ষা। তাইতো এবারের বিজয় দিবসে বললেন- এদেশ লালন, হাসন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শাহজালালের দেশ। এদেশ বঙ্গবন্ধুর দেশ। এদেশে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি মেনে নেয়া যাবে না। বস্তুত এই উপলব্ধি দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে এগিয়ে নেবে। দলের সহযোগী সংগঠনগুলোতে সংস্কার, দূর্নীতি বিরোধী অভিযান তাঁর অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। আমাদের স্মরণে রাখতে হবে তিনি মানবতাবিরোধী ঘাতকদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন। একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ যাত্রা শুরু হয়েছে। চাইলেই তিনি রাতারাতি সব আবর্জনা সাফ করতে পারবেন না। সেটি সম্ভব হবে সব পর্যায়ের নেতৃত্বের গুণ সমৃদ্ধ নেতাদের অবদানে। সরকারী কর্মকতা ও চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে। সামাজিক পরিকাঠামো সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে।