প্রবাহ

ইয়েমেন ইস্যুতে বাইডেন সরকারের ইতিবাচক অবস্থান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরকার ইয়েমেন যুদ্ধ সম্পর্কে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে ব্যাপারে যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলোর মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির প্রথম পদক্ষেপেই ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর ওপর থেকে অবরোধ এক মাসের জন্য তুলে নিয়েছে। মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, জো বাইডেন কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে, আনসারুল্লাহকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি বাইডেনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর আগে পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কির্বিও বলেছিলেন, ইয়ামেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র রিয়াদকে সহায়তা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

বাইডেন সরকারের এই সিদ্ধান্তগুলোকে বেশিরভাগ কৌশল বলেই মনে হয়। কৌশলটা হলো আনসারুল্লাহ’র সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। কেননা এটি বর্তমানে ইয়েমেনের সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। অবশ্য এই সিদ্ধান্তগুলো কৌশলগত হলেও এর ইতিবাচকতা রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমে নয়া মার্কিন প্রশাসন আনসারুল্লাহকে ইয়েমেনের প্রভাবশালী একটি দল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অপরদিকে বাইডেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতি আনসারুল্লাহর প্রতিক্রিয়াও লক্ষণীয়। আনসারুল্লাহ এই সিদ্ধান্তগুলিকে স্বাগত জানিয়ে এই ‘ঘোষিত’ নীতিকে ‘প্রায়োগিক’ নীতিতে রূপান্তর করার আহ্বান জানিয়েছে।

মার্কিন সরকার গত ছয় বছর ধরে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। আমেরিকাকে বিশ্বাস করা দুরূহ ব্যাপার। সুতরাং আস্থা সৃষ্টির জন্য যুদ্ধ বন্ধ করতে সৌদি আরবের উপর চাপ সৃষ্টি করার দাবি জানিয়েছে আনসারুল্লাহ।

এ প্রসঙ্গে ইয়েমেনের সর্বোচ্চ বিপ্লবী কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী আল-হুথি বলেছেন: ‘আমরা বর্তমানে বাইডেনের অবস্থানকে একটি মৌখিক বিষয় হিসেবে নিয়েছি। আমরা যুদ্ধের অবসান এবং অবরোধ তুলে নেয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। ওয়াশিংটনের মদদপ্রাপ্ত সৌদি ও আরব-আমিরাত আগ্রাসন বন্ধ করবে বলে আশা করছি।”

ইয়েমেনে সৌদি হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং সৌদি নৃশংসতার ধারাবাহিকতার কারণেই আমেরিকার ব্যাপারে এ ধরনের আস্থাহীনতার মতো প্রতিক্রিয়া আনসারুল্লাহর।

সৌদি আরব অবশ্য বাইডেন সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নীরব রয়েছে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, তারা গত দেড় বছর ধরে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়িত ছিল না। তারা ২০২০ সালের অক্টোবরের পর থেকে ইয়েমেনে সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়েছে।

যাই ইয়েমেন যুদ্ধে বর্তমানে আনসারুল্লাহ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এমনকি কৌশলগত প্রদেশ মার্বেও তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে রয়েছে। সুতরাং বাইডেন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বরং সৌদি জোটকে ইয়েমেন যুদ্ধের চোরাবালি থেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে।

মার্কিন সরকার ও মিডিয়ার প্রতি জনগণের ব্যাপক অবিশ্বাস : হোয়াইট হাউজ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস ও অনাস্থা দিনকে দিন বাড়ছে। এমনকি হোয়াইট হাউজও এ বিষয়টি স্বীকার করেছে।

মার্কিন সরকার, সার্বভৌমত্ব ও মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতি এই অবিশ্বাসের কারণ হল সেখানকার সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট-নির্বাচন-পরবর্তী নজিরবিহীন সহিংসতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও  করোনা ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জেনিফার সাকি  বলেছেন,  সরকার, সংবাদ মাধ্যম ও তথ্য-উপাত্ত এবং পরিসংখ্যানের প্রতি মার্কিন জনগণের মধ্যে ব্যাপক অবিশ্বাস বিরাজ করছে। তিনি বলেন, কোন্টি সঠিক ও কোন্টি সঠিক নয় এবং বাস্তবতা ও বাস্তবতা নয় তা বোঝা যাচ্ছে না!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আমেরিকার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন বলে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র দাবি করেন।

হোয়াইট হাউজের স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট মার্কিন সরকার ও গণমাধ্যমের প্রতি মার্কিন জনগণের  অবিশ্বাস ক্রমেই বাড়ছে। এর অর্থ মার্কিন জনগণের মনে দেশটির  সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে।

এই সংকটের এক বড় কারণই হল সাম্প্রতিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পক্ষে নজিরবিহীন কারচুপি হয়েছে বলে পরাজিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিযোগ। কেবল তাই নয় ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন। ট্রাম্পের মতে এবারের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছিল এবং তার পরোক্ষ আহ্বান ও উসকানিতে একদল উগ্র সমর্থক গত ছয় জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবনে অভ্যুত্থানের স্টাইলে ভয়াবহ হামলা চালায়।

আর এ বিষয়টি দেশটির রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বৈধতাকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট দলের সমর্থক ও দেশটির রক্ষণশীলদের মধ্যে এখন দিনকে দিন দূরত্ব বাড়ছে এবং উভয় পক্ষের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মেরুকরণ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। ফলে মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বাড়ছে দেশটির জনগণের অনাস্থা।

মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনা দেশটির ঘরোয়া সন্ত্রাস ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা জোরদারের ইঙ্গিতও তুলে ধরেছে। এ ছাড়াও ট্রাম্প সরকারের উদাসীনতার কারণে দেশটিতে করোনা ভাইরাসে মারা গেছে প্রায় ৫ লাখ নাগরিক ও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে দুই কোটি আশি লাখ মানুষ। ট্রাম্প সরকারের সময় বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটিতে দারিদ্র ও ক্ষুধা ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। আর এই অবস্থামোকাবেলা করা এখন বাইডেন সরকারের কর্মসূচির প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হল মার্কিন ডেমোক্রেট দলের সমর্থক ও রিপাবলিকানদের মধ্যে বিতর্ক এখনও চলছে। বাইডেন সরকার এক দশমিক নয় ট্রিলিয়ন ডলারের যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েছে তার বিপক্ষে ভোট দিয়েছে সব রিপাবলিকান সিনেটর!

মার্কিন রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে এই কাদা- ছোঁড়াছুঁড়িতে দু পক্ষের সমর্থক মিডিয়াগুলোও অংশ নিচ্ছে! ফলে দেশটি সংবাদের জগতের প্রতিও আস্থা হারাচ্ছেন মার্কিন জনগণ!