প্রবাহ

রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা যার কঠিনই ছিল!

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট

শুরুটা কঠিনই হয়েছিল জো বাইডেনের জন্য। ফেব্রুয়ারির শীতে আইওয়া ককাসের ভোটের ফলাফল দেখে মুষড়ে পড়েছিলেন। ২০২০-র প্রেসিডেন্ট পদে তার প্রার্থী হবার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত টিকবে কিনা তা নিয়েই বড় রকম সংশয় দেখা দিয়েছিল।

এক কথায়, গত ফেব্রুয়ারিতেও তিনি ছিলেন হোয়াইট হাউসের দৌড়ে একজন পরাজিত ব্যক্তি। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে হোয়াইট হাউসে যাবার যে স্বপ্ন জো বাইডেন বহুদিন থেকে লালন করে আসছেন, তা পূরণ হবার জন্য এটাই ছিল সম্ভবত তার শেষ চেষ্টা।

প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দলের পূর্ব-বাছাই প্রক্রিয়া – যাকে বলা হয় প্রাইমারি নির্বাচন – তার শুরুর পর্যায়ে প্রচারণার সময় মি.বাইডেনকে এবার দেখা গেছে আবেগপূর্ণ কথাবার্তা বলতে। তিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে তার ছেলের মৃত্যুর কথা বলেছেন, বলেছেন তার ছেলেবেলার কথা, অভাব অনটনের পরিবারে তার বেড়ে ওঠার কথা। তবে জনগণকে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন: “সবসময়ই আশা আছে।” এটাই তার বিশ্বাস। বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাইমারিতে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেও তাকে রীতিমত বেগ পেতে হয়েছে। তবে তার ব্যক্তিসত্ত্বার পরিচয় উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রচারণা সভায় তার আবেগপূর্ণ আবেদন থেকে। তার মনমানসিকতা, তার রাজনৈতিক জীবনে ব্যক্তিগত ও পেশাগত ক্ষেত্রে মানসিক আঘাতের জায়গাগুলো এবং যেসব রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছে তার একটা ছবি পরিষ্কার হয়েছে এসব প্রচারণায়।

২০২০র প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর দৌড়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের উত্থান পতনের আবেগময় মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছেন মি. বাইডেন “আমি ভাগ্য মানি – ভাগ্যের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস,” মি. বাইডেন ১৯৮৯ সালে বলেছিলেন ন্যাশানাল জার্নাল নামে সরকারের একটি উপদেষ্টা সংস্থাকে। “আমার ব্যক্তিগত জীবন কখনই আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আমি যেটা চেয়েছি, সেটা কীভাবে যেন হয়ে গেছে- একটা অদৃশ্য হাত সেটা ঘটিয়ে দিয়েছে।”

ঘনিষ্ঠ প্রিয়জনদের অকালমৃত্যুর অভিজ্ঞতা হয়েছে মি. বাইডেনের জীবনে একাধিকবার। রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা অর্জনে উপরে ওঠার সিঁড়ি যখন তিনি তৈরি করেছেন, সেগুলো ভেঙে পড়েছে। আবার তাকে নতুন করে সেগুলো গড়তে হয়েছে। বাকপটু হবার জন্য তাকে অনেক খাটতে হয়েছে। কারণ উল্টোপাল্টা ও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ ব্যবহারের যে প্রবণতা একসময় তার ছিল, তার জন্য তাকে অনেক ব্যঙ্গবিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছে। জো বাইডেন প্রায়ই একটা কথা বলেন, “বাবার একটা কথা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা – কে তোমাকে কতবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল, সেটা বড় কথা নয়, কত দ্রুত তুমি উঠে দাঁড়াতে পারলে, মানুষ হিসাবে সেটাই হবে তোমার সাফল্যের পরিচয়।”

প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়াইয়ে হেরে গিয়েও লড়ে গেছেন মি. বাইডেন। প্রতিটা পরাজয়ের পর উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সিনেটার বব কেরি, ১৯৯০এর দশকে কংগ্রেসে মি. বাইডেনের সহকর্মী বলেছেন, “জো কখনও হাল ছাড়ে না। দরকার না হলেও তার কাজ সে করেই যায়।”

অনেকের মতে মি. বাইডেন অনেক প্রতিকূলতা কাটিয়েটিকে থাকা একজন ব্যক্তি।

ডিসেম্বর ১৮, ১৯৭২ – মি. বাইডেন ছিলেন ওয়াশিংটনে। টেলিফোন বাজল, তার ভাই জিমি বাইডেন ডেলাওয়ার থেকে ফোন করেছেন। বোন ভ্যালেরির সাথে কথা বলতে চাইলেন।

বোন বললেন, ‘একটা ছোট দুরর্ঘ ঘটেছে। কিন্তু চিন্তা করার কিছু নেই।’

সেদিনই আরও পরের দিকে মি. বাইডেন জেনেছিলেন ওই দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী নেইলিয়া এবং শিশুসন্তান নেওমি মারা গেছেন। তার স্ত্রী গাড়ি চালাচ্ছিলেন। একটা লরি গাড়িতে ধাক্কা মারে। গাড়িতে থাকা তার দুই ছেলে বোও আর হান্টারও গুরুতরভাবে আহত হয়েছে।

তারা ক্রিসমাস উৎসবের জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনতে গিয়েছিলেন। মি. বাইডেন তখন সবে সেনেটার নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার কংগ্রেস অফিসের কর্মী নিয়োগের জন্য সেদিন ইন্টারভিউ নিতে ব্যস্ত ছিলেন। এছাড়াও পরিবারের থাকার জন্য একটা বাসা কেনার বিষয়টি সেদিন তিনি চূড়ান্ত করতে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনায় তিনি একেবারেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। ‘আমি কথা বলতে পারতাম না, বুকের ভেতরে একটা বিশাল শূণ্যতা অনুভব করতাম, মনে হতো একটা কালো গহ্বর আমাকে ভেতরে টেনে নিচ্ছে,’ তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন মি. বাইডেন। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবার কথা ভেবেছিলেন, ঠিক করেছিলেন যাজক হবেন, দুই ছেলেকে মানুষ করবেন। তিনি লিখেছেন, যেসব এলাকায় খুব গুন্ডামি হতো, সেসব এলাকায় তিনি সন্ধ্যেবেলা ঘুরে বেড়াতেন। মারপিট করতে তার ইচ্ছা হতো। ‘আমার ভেতরে একটা বিরাট ক্রোধ তৈরি হয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, ঈশ্বর আমার সাথে একটা নিষ্ঠুর খেলা খেলছেন। আমার রাগ হতো।’ জো বাইডেনের রাজনৈতিক জীবনে ৩০ বছরের জন্মদিন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর না হলে সেনেটারের দায়িত্ব পালন সাংবিধানিক নিয়ম বহির্ভূত। ৩০ বছরের জন্মদিনের পার্টিতে স্ত্রী ও দুই শিশু পুত্রকে নিয়ে কেক কাটছেন মি. বাইডেন। জো বাইডেনের বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী। মি. বাইডেনের জন্মের আগে তিনি ব্যবসায় সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু জো-র জন্মের পর তার ব্যবসা পড়ে যায়। জো বাইডেনের কৈশোর কেটেছে পারিবারিক অভাব অনটনের মধ্যে দিয়ে। পেনসিলভেনিয়ায় খুবই সাদামাটা এক বাসায় যৌথ পরিবারে বড় হয়েছেন তিনি। তার পরিবার ছিল খুব ধার্মিক। ক্যাথলিক মূল্যবোধ ও তার ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছিল পারিবারিক ধর্মচর্চ্চার সুবাদে। ছেলেবেলায় তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তোতলামি কাটিয়ে ওঠা। স্কুলের উঁচু ক্লাস পর্যন্ত এই সমস্যা তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পড়তে গিয়ে তার তোতলামির জন্য সহপাঠীরা তো বটেই, এমনকী শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে ঠাট্টা মস্করা করতেন। “এখনও আমার মনে আছে সেই যন্ত্রণার কথা, লজ্জা রাগ আর অপমানের দিনগুলোর কথা,” মি. বাইডেন লিখেছেন তার স্মৃতিকথায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে কবিতা আবৃত্তি ও সংযতভাবে কথা বলা আয়ত্ত করতে করতে, হাই স্কুল পার হবার পর তোতলামো কাটিয়ে ওঠেন তিনি। হাই স্কুল শেষ করে তিনি পড়তে যান ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখান থেকে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়তে।

কলেজেই পরিচয় হয়েছিল নেইলিয়া হান্টারের সাথে। লেখাপড়া শেষে ফিরে যান ডেলাওয়ারের উইলমিংটন শহরে। বিয়ে করেন নেইলিয়াকে। উইলমিংটনেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। একটি বড় আইনী প্রতিষ্ঠানে তিনি আইনজীবী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ধনী ও ক্ষমতাশালীদের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তিনি অল্পদিনেই হাঁপিয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষের হয়ে বিবাদী পক্ষে আইন লড়ার কাজ নেন তিনি। নগর পরিষদের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে জেতার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় রাজনীতিতে তার পথচলা। এরপর আসে সিনেটে তার বিজয় ১৯৭২ সলে। অনেকদিন ওই আসনে থাকা রিপাবলিকান সিনেটারকে হারিয়ে তিনি সবার দৃষ্টি কাড়েন। রাজনৈতিক জীবনে জো বাইডেন তখন সফল তরুণ। মাত্র ৩০ বছর বয়সে দুই মেয়াদে সিনেটার থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি সিনেটে আসন জয় করেছেন। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের যেখানে ভরাডুবি হয়েছে, সেখানে তার এই অভাবনীয় জয়ের পর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি তখন হয়ে উঠেছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের সম্ভাবনাময় তরুণ।

তিনি বড় ছেলে বো বাইডেনকে হারান ২০১৫ সালে। বো মারা যান মস্তিষ্কের ক্যান্সারে। বাবার মত তিনিও রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ডেলাওয়ারের অ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে কাজ করতেন।

দু’হাজার সতের সালে লেখা তার আত্মজীবনীতে মি. বাইডেন তার ছেলের অসুস্থতা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ২০১৬-র নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর লড়াইয়ে নামার ইচ্ছা ঘোষণার তোড়জোড় যখন তিনি নিচ্ছেন ২০১৫ তে, তখন তার ছেলের অকালমৃত্যু আবার তাকে বিধ্বস্ত করে দেয়। তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টান। “মানসিকভাবে যথেষ্ট উৎসাহ পাবো কিনা আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি শোক এমন একটা মানসিক চাপ, যা কোন সময়সূচি বা কাজের সময়। য়ের তোয়াক্কা করে না,” তিনি লিখেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে শোক ও আঘাতের পাশাপাশি তিনি তার রাজনৈতিক জীবন গড়ে তুলেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ জো বাইডেন ঘোষণা করেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবার লড়াই থেকে তিনি নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। পাশে স্ত্রী জিল বাইডেন। এক ঝাঁক সাংবাদিকের সামনে ১৯৮৭ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর জো বাইডেনকে ঘোষণা করতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট পদের জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পাবার দৌড় থেকে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন। মাত্র তিন মাস আগে তিনি প্রার্থিতার লড়াইয়ে নেমেছিলেন।

‘এর জন্য দায়ী আমি নিজে। নিজের ওপর রাগ আর হতাশায় ভুগছি। আমেরিকার মানুষকে আমি কীভাবে বোঝাবো এটাই জো বাইডেনের আসল পরিচয় নয়। এটা শুধু আমার মস্ত একটা ভুল,” লিখেছেন মি. বাইডেন।

সেটা ছিল ১৯৮৮র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য লড়াই। মি. বাইডেনের প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার উদ্যোগ লজ্জাজনক ঘটনার কারণে হোঁচট খায়। তার বিরুদ্ধে অন্যের লেখা চুরির ও অসততার অভিযোগ আনা হলে তিনি প্রচারণা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।

আইওয়ায় এক বিতর্কসভায় সমাপনী বিবৃতিতে মি. বাইডেন যে কথাগুলো বলেছিলেন তা ছিল ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা নিল কিনকের একটি ভাষণের প্রতিটি শব্দের হুবহু উচ্চারণ। মি. কিনক তার শ্রমিক পরিবারে বড় হেয়ে ওঠা নিয়ে। তার ভাষণে যা বলেছিলেন তা প্রায় হুবহু আওড়ে যান মি. বাইডেন। এর আগের এক ভাষণে একই বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি মি. কিনকের নাম উল্লেখ করলেও আইওয়ার সভায় সে কথা বলেননি। তারই এক ডেমোক্র্যাট প্রতিপক্ষ বিষয়টি সামনে আনেন। এই অভিযোগের সূত্র ধরে সামনে আনা হয় তার ছাত্র জীবনের একটি ঘটনা, যখন তিনি আইনের ছাত্র হিসাবে তার সাইটেশন পেপারে আরেকজনের লেখা হুবহু ব্যবহার করেছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন সেটা যে নিয়ম বহির্ভূত তা তিনি জানতেন না। এই ঘটনা মি. বাইডেনের সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বড় রকমের ধাক্কা খায়। পরে তার এক জীবনীকারকে মি. বাইডেন বলেছিলেন, ওই ঘটনা তাকে “কুরে কুরে খেয়েছে। নিজেকে আমি চিরকাল একজন সৎ মানুষ হিসাবে মনে করেছি। সেই জায়গাটা বিরাট ধাক্কা খেয়েছে।” তার স্ত্রী ও শিশু কন্যার মৃত্যুর পর মি. বাইডেন তার জীবনে স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টা করেন। তার দুই ছেলেকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য ঘরে অনেক সময় দেন। প্রথম ১৪ বছর তিনি ডেলাওয়্যার থেকে ওয়াশিংটন দৈনন্দিন যাতায়াত করতেন।

পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন জিল জেকবস নামে এক স্কুল শিক্ষয়িত্রীকে। তাদের একটি ছেলে হয়- অ্যাশলি। মি. বাইডেন সিনেটের বিচার কমিটিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজেকে আরও তুলে ধরতে শুরু করেন। প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হবার জন্য তার প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পেছনে ওই লেখাচুরির কলঙ্ক তাকে অনেকদিন তাড়া করে বেড়িয়েছে। তবে ১৯৮৮ সালের ওই নির্বাচন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবার ঘটনা অনেকে বলেন তার জন্য শাপে বর হয়েছিল। লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক মাসের মাথায় নিউ ইয়র্কে এক হোটেল ঘরে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন জো বাইডেন। মস্তিষ্কের রক্তনালী ফুলে ওঠার এক সম্ভাব্য প্রাণঘাতী অসুখে তিনি আক্রান্ত হন। এর পরের ছয় মাস তাকে বহুবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। বিশ বছর পর আবার নতুন করে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার লড়াইয়ে নেমেছিলেন মি. বাইডেন ২০০৮এর নির্বাচনের জন্য। তখন তিনি রাজনীতিতে আর নতুন মুখ নন, তিনি একজন প্রবীণ রাজনীতিক। তিনি বলেন ১৯৮৭ সালে তার প্রচারণা ছিল বড় বড় বুলি আর ছবিতে ভরা। বিশ বছর পর তিনি তার প্রচারণার ভাষা বদলে ফেলেন। “গত বিশ বছর আমার জীবনযাত্রা দেখে আপনাদের নিশ্চয়ই বিশ্বাস জন্মেছে যে আমি একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ,” ২০০৮। য়ে আইওয়ার প্রচারণা সমাবেশে তিনি একথা বলেন। “আর সে কারণেই আবার এই পদে প্রার্থী হবার লড়াইয়ে আমি ফিরে এসেছি।”

তবে সেই লড়াইয়ে তিনি সফল হননি। বারাক ওবামা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মনোনয়ন পান প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার জন্য। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বারাক ওবামা তার ভাইস প্রেসিডেন্ট রানিং মেট হিসাবে বেছে নেন জো বাইডেনকে।

‘তারা দুজনে খুবই আলাদা প্রকৃতির মানুষ, বলেছেন সাংবাদিক ও ভাইস-প্রেসিডেন্সি বইয়ের লেখিকা কেট অ্যান্ডারসন ব্রাওয়ার। ‘ওবামা খুব সতর্কতার সাথে কথা বলেন, খুব ভাবনা চিন্তা করে মন্তব্য করেন। কিন্তু বাইডেন একেবারে উল্টো। না ভেবেই হুটহাট কথা বলা তার স্বভাব, যে কারণে অনেকবার তাকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। বাইডেন ওবামাকে বলেছিলেন, তিনি বদলাবেন না ‘আমি যেমন আমি তেমনই থাকব’, বলেছেন কেট অ্যান্ডারসন ব্রাওয়ার। ওই নির্বাচনে মি.বাইডেনের একজন প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ মেক্সিকোর সাবেক গভর্নর বিল রিচার্ডসন বলেন, ডেমাক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচন পর্বের প্রচারণার সময় ওবামা আর বাইডেনের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। “ওবামা তার প্রশাসনে পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ে একজন ঝানু রাজনীতিককে চাইছিলেন,” তিনি বলেন। ইলিনয়ের জন সমাবেশে মি. বাইডেনকে তার রানিং মেট ঘোষণা করে মি. ওবামা বলেছিলেন, “জো বাইডেন একজন বিরল মানুষ- কয়েক দশক ধরে তিনি ওয়াশিংটনে নানা পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ওয়াশিংটন তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আনতে পারেনি। আমি মনে করি আমার পার্টনার হিসাবে, দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত।” মি. বাইডেন পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক আমেরিকান সিনেট কমিটিতে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন।

সিনেটের এই কমিটির সভাপতি হিসাবে ২০১২ সালের অক্টোবরে আমেরিকার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের ইরাক যুদ্ধে যাবার বিষয়টিকে অনুমোদন দেবার সিদ্ধান্ত ছিল তার ওপর। এর ১১ বছর আগে উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশকে সাদ্দাম হুসেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুমোদনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন মি. বাইডেন। “কুয়েতের মুক্তির জন্য আমেরিকানদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার আগে আমাদের উচিত দেখা কোনরকম বিকল্প পথ আমরা চেষ্টা করেছি কিনা, “সিনেট কমিটির শুনানিতে বলেছিলেন মি. বাইডেন। “আমরা করিনি।” ১৯৯০এ উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ সৌদি আরবে আমেরিকান নৌ সেনাদের সাথে মি. বাইডেনের হুঁশিয়ারি স্বত্ত্বেও উপসাগরীয় যুদ্ধের পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ওই যুদ্ধে আমেরিকান মারা যায় অল্প সংখ্যক। এরপর থেকে বাইডেনকে পররাষ্ট্র ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে দুর্বলচিত্ত বলে তুলে ধরা শুরু হয়। ওই ভোট নিয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হবার পরবর্তী কয়েক বছর মি. বাইডেন আন্তর্জাতিক বিষয়ে কট্টর অবস্থান দেখাতে শুরু করেন, যেমন বলকান গৃহযুদ্ধে আমেরিকান অবস্থান, ইরাকে বোমা হামলা এবং আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েমের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরাকের কাছে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র আছে এই অভিযোগে যখন ইরাকে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তাব করেন, তখন মি. বাইডেন তাতে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন।

“আমি মনে করি না এটা যুদ্ধ করার জন্য একটা হুজুগ, আমার বিশ্বাস এটা শান্তি ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে অভিযান,” তিনি বলেন। বাইডেনের ইরাক যুদ্ধে সমর্থন নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাতা মার্ক ওয়েসব্রট বলেছেন, “যেসব ডেমোক্র্যাট এই যুদ্ধ সমর্থন করেছিলেন, তাদের মনে হয়েছিল এই যুদ্ধ সমর্থন না করার ঝুঁকিটা হল, যুদ্ধটা যদি সফল হয়ে যায়, তাহলে তার থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ক্ষেত্রে তারা পেছিয়ে পড়বেন। “তবে তার ওই সমর্থনের কারণে অনেক ডেমোক্র্যাট সমর্থকের সমালোচনার মুখে তিনি পড়েন।

তার আত্মকথায় ২০০৭ সালে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে অধ্যায়ের শিরোনাম তিনি দেন – ‘আমার ভুল’। তিনি লেখেন: ‘তাদের আন্তিরকতা ও দক্ষতা আমি বুঝতে ভুল করেছিলাম।’

২০০৩এর এপ্রিলে আমেরিকান নৌ সেনারা বাগদাদে সাদ্দাম হুসেনের মূর্তি টেনে নামায় ইরাক যুদ্ধের পর তিনি বামপন্থার দিকে ঝোঁকেন। তিনি ইরাকে আমেরিকান সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধির বিরোধিতা করেন এবং সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী জোরদার করার এবং ওসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিপক্ষে পরামর্শ দেন। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হবার লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দেবার পর তিনি ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের প্রতি আমেরিকার সমর্থন বন্ধ করার পক্ষে মত তুলে ধরেন। ইরানের সাথে পরমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখা, জলবায়ু নিয়ে প্যারিস চুক্তি সমর্থন, চীনে মার্কিন স্বার্থ বজায় রাখা এবং ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক সংস্কার উৎসাহিত করা সহ নানা বিষয়ে তিনি গত কয়েক বছর কংগ্রেসের ওপর চাপ দিয়েছেন।

তবে চীন ও ইউক্রেন নিয়ে মি. বাইডেনের অবস্থানকে বিভিন্ন প্রচারণায় কড়া ভাষায় আঘাত করেছেন মি. ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মি. বাইডেন চীনের বেশি ঘনিষ্ঠ এবং ইউক্রেন নিয়েতার আগ্রহ মূলত ইউক্রেনে তার ছেলে হান্টারের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার খাতিরে। কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে শুরু হলেও, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনীত প্রার্থী হবার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন জো বাইডেন। তার প্রতিপক্ষ বার্নি স্যান্ডার্সকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থী হবার টিকেট পান মি. বাইডেন। অনেক রাজনৈতিক বিশে¬ষক বলছেন, তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আট বছর বারাক ওবামার ডেপুটি হিসাবে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্বপালন। এর সুবাদে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ডেমোক্র্যাটদের বিপুল সমর্থন পেয়েছেন।

একজন কৃষ্ণাঙ্গ-ভারতীয় বংশোদ্ভুত নারী কমালা হ্যারিসকে তিনি বেছে নিয়েছেন তার ভাইস প্রেসিডেন্ট রানিং মেট হিসাবে। প্রায় ৫০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তার তৃতীয় প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ ৪০ বছরের স্বপ্ন তার শেষ পর্যন্ত পূরণ হলো। আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক পপুলার ভোট আর ২৭০টিরও বেশি ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন জো বাইডেন।

শিগগিরই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে পম্পেও: ইরান

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরানের ব্যাপারে যে অশোভন টুইট করেছেন তার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান বলেছে, ব্যর্থতার বিশাল বোঝা কাঁধে নিয়ে অচিরেই পম্পেওকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হবে। মাইক পম্পেও সম্প্রতি এক টুইটার বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে তার পুরোনো অভিযোগগুলোর পুনরাবৃত্তি করে ইরানের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবজাদে এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, একথা সহজেই অনুমেয় যে, আড়াই বছর ধরে একের পর এক লজ্জাজনক ব্যর্থতা শেষে যখন পম্পেওকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ত্যাগ করতে হচ্ছে তখন তার মেজাজ খারাপ থাকাটাই স্বাভাবিক।  আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে পম্পেওসহ ট্রাম্প প্রশাসনের সবাইকে তল্পিতল্পা গুটাতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, তার দেশের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। সেইসঙ্গে পরাজিত হয়েছে এই নীতির ভিত্তি স্থাপনকারী আইন ভঙ্গকারী গুন্ডারা।

তিনি আরো বলেন, এমন সময় ব্যর্থতার বিশাল দায়ভার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে হচ্ছে যখন ইরানি জনগণ আগের মতো বুক ফুলিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করছে।

ইরান নিয়ে ইউরোপ-মার্কিন বিরোধ নিরসন চায় জার্মানি

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেইকো মাস হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা নিয়ে ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার মতবিরোধ নিরসন করা না হলে আলোচনা বা অন্য কোনো প্রচেষ্টা কোনো ফল বয়ে আনবে না।

তিনি জার্মানির একটি রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জো বাইডেনের নেতৃত্বাধীন পরবর্তী মার্কিন সরকারের সঙ্গে ইউরোপের সহযোগিতা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। হেইকো মাস বলেন, “আমেরিকা যখন সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে এবং আমরা আলোচনার নীতি অনুসরণ করছি তখন দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমাধানে আসা অসম্ভব ব্যাপার। আমাদেরকে আবার এক জায়গায় আসতে হবে।”

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে তার দেশকে বের করে নিয়ে তেহরানের ওপর অতীতের সব নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন। সেইসঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে তেহরানের ওপর নতুন নতুন অনেক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন ট্রাম্প।

বর্তমানে নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের পরমাণু সমঝোতা স্বাক্ষরের সময় আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি এবারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতাকে তিনি তেহরানের সঙ্গে ‘আলোচনা শুরুর উপলক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তিনি বলেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে আমেরিকা পরমাণু সমঝোতায় প্রত্যাবর্তন করবে। এ সম্পর্কে ইরান বলেছে, আমেরিকাকে আগে অনুতপ্ত হয়ে পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসতে এবং সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগে তেহরানের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে দিতে হবে।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মঙ্গলবার তার দেশের ডয়েচল্যান্ড ফুংক রেডিওকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আরো বলেন, জো বাইডেন আমেরিকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর দেশটিতে অবশ্যই এই আলোচনা সামনে আসবে যে, ওয়াশিংটন পরমাণু সমঝোতায় ফিরবে নাকি ইরানের সঙ্গে আরো বিস্তারিত চুক্তি করবে। হেইকো মাস বলেন, এ বিষয়ে ইউরোপ আমেরিকাকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে; কারণ, ইউরোপ ও আমেরিকা যতক্ষণ ইরানের ব্যাপারে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকবে ততক্ষণ সমস্যার কোনো সমাধান হবে না।

পরিবেশ রক্ষায় দরকার ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

প্রযুক্তির কল্যাণকর অগ্রযাত্রায় দিন দিন বেড়েই চলেছে মোবাইল ফোনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রিক ডিভাইসের ব্যবহার। মানুষের হাতে শোভা পাচ্ছে নিত্যনতুন ফোন। এক সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে হাতের মোবাইলটি আর শখের ফোনটি পরিণত হচ্ছে পরিবেশ দূষণকারী ই-বর্জ্য।

দেশে ই-বর্জ্য আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় তা রোধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা। এবার নষ্ট বা পুরনো মোবাইল টাকার বিনিময়ে ফেরত নেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ মোবাইল ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাহিদ যুগান্তরকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, নষ্ট মোবাইল ফোন ফেরত দিলে যাতে ফোনের মালিক কিছু টাকা পায়, সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ফলে ই-বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলে না রেখে মানুষ তা নির্দিষ্ট স্থানে দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হবে। পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১০টি শপিংমলে এ বুথ বসানোর কথাও জানান তিনি। এবং পর্যায়ক্রমে দেশের ১০০টি শপিংমলে এ বুথ বসান হবে। জনাব জাকারিয়া শাহিদ বলেন, করোনা মহামারীর কারণে আমাদের এ উদ্যোগ কিছুটা থেমে আছে, তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আবার পূর্ণোদ্যমে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ শুরু করব। এখন স্বল্প পরিসরে চলছে, তবে এটি যথেষ্ট নয়। আর সবার আগে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, যাতে নিজ উদ্যোগে মানুষ পরিবেশ রক্ষার্থে এগিয়ে আসে।

পরিবেশ রক্ষার্থে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি বলেও যোগ করেন জাকারিয়া শাহিদ। বাংলাদেশে প্রতি বছরে প্রায় ৪ কোটি মোবাইল সেট নষ্ট হয়। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি হ্যান্ডসেট আমদানি করা হচ্ছে। ফলে এখান থেকে যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, সেটি পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ অধিদফতর জানায়, বিশ্বে দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে চলছে ইলেকট্রিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর। এর কারণে ক্যান্সারে পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারেন মানুষ। এ বর্জ্যে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও।

বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৪ লাখ টন ইলেকট্রনিক বর্জ্য হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে এটি ১২ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে।

ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখা। এতে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ট্যাব বেশি দিন ধরে ব্যবহার করা যাবে। গুরুত্ব দিতে হবে পুরনো সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর ওপরে। একই যন্ত্র একাধিক কাজ করবে, এমন মাল্টিপারপাস ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই চার্জারে সব সংস্থার সব মডেলের মোবাইল চার্জ করা যায়, এমন চার্জারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্মের ব্যবহার, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

৩ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কিত দিন

সংলাপ ॥ ৩ নভেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। ঢাকা জেলে নিহত এই চার মহান জাতীয় নেতা হচ্ছেন – স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায় তৎকালীন সরকার। ১৫ই আগস্টের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেলের অভ্যন্তরে জাতীয় এ চার নেতাকে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সবচাইতে ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক সদস্য হিসেবে পরিচিত এবং তৎকালীন স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমদের প্ররোচনায় এক শ্রেণীর উচ্চাভিলাসী মধ্যম সারির জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা এ নির্মম হত্যাকান্ড ঘটায়। দেশের এই চার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৫ই আগস্টের হত্যাকান্ডের পর কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে গুলি এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে। জাতীয় এ চার নেতা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার পর পরই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে দীর্ঘ নয় মাস সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপর ঘনিষ্ঠ সহযোগী এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলী আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতি ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান শুধু বড় মাপের রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনেও তারা ছিলেন অসাধারণ মানুষ। তাদের হত্যাকান্ডের বিচার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দেশের রাজনীতিকরাও তাদের নৈতিক দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। এ হত্যাকান্ডের পেছনের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিল, সে ব্যাপারে রাজনীতিকদের উচিত ছিল ব্যাপক অনুসন্ধান করা এবং সত্য খুঁজে বের করা। সেই কাজটি তাদের রাজনৈতিক সহকর্মী ও সহযোগীরা এখনো করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের এ জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চারনেতার হত্যার বিচার সম্পন্ন হওয়া জরুরি। জাতি আশা করে জাতীয় চারনেতার হত্যার সুষ্ঠু বিচার এদেশে সম্পন্ন হবে। জাতি হত্যার কলঙ্ক থেকে মুক্তি চায়। খুনিদের শাস্তি চায়। সেই সঙ্গে হত্যা ও নৃশংসতাকে যারা উৎসাহ দিয়েছে তাদেরও বিচার করা জরুরি।