প্রতিযোগিতা নয় প্রয়োজন সহযোগিতা

শেখ উল্লাস ॥ প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা-বাংলা ভাষার এ শব্দ দু’টোর সাথে সবাই পরিচিত। দুটো শব্দেরই মূলে রয়েছে ‘যোগ’। সমাজে এখন সহযোগিতার চাইতে প্রতিযোগিতার প্রবণতাই বেশি, হয়তো সব সময়ই কম-বেশি ছিল। তবে এখনকার সমাজ যেখানে আগের যেকোনো সময়ের চাইতে বিশেষ করে নগদ অর্থ-বিত্তের দিক থেকে অনেক দূর এগিয়ে, সেখানে সহযোগিতার চাইতে প্রতিযোগিতার দিকটিই বেশি নজরে আসে। ভালো কাজে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা দু’টোই মঙ্গলজনক কিন্তু এই প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা প্রকৃত অর্থে কতটুকু বিদ্যমান সেটাই প্রশ্ন।

মনিষী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত অভিধানে শব্দ দুটোর আদি-অন্ত খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সহযোগ অর্থ-সহিত যোগ, সংযোগ, এক যোগ, সম্মেলন, সমবায়, সহযোগিতা সাহায্য-যোগী, সহকারী ও সহায়। ‘যোগ’ অর্থ-যোজন, যুক্তি, জোতা, সঙ্গতি, সংশ্লেষ, সংযোগ, সম্ভাবনা, সম্মেলন, সদ্ভাব, সান্নিধ্য, সমবায়, সম্মন্ধ, প্রয়োগ, সম্পর্ক, সংস্পর্শ, যত্ন, চেষ্টা, প্রাপ্তি, লাভ, মন্ত্র, কুহক, মায়া, ধ্যান, পরমাত্মধ্যান।

যোগী অর্থ-সমাধিশীল, যোগযুক্ত, যোগ+ইন্ (ইনি), লব্ধযোগ, ব্রহ্মবিদ্বান, ধ্যানী, ধ্যায়ী, পরমাত্মধ্যানপর সাধু, কর্ম্মী, কর্ম্মযোগাধিকারী, বিষ্ণু, শিব, অর্জ্জুন এবং সঙ্কীর্ণতা জাতিবিশেষ 

হিসেবে যোগী দেখানো হয়েছে। যোগ-এর বিপরীত শব্দ বিয়োগ। যোগে সমর্থ্য হলে হয় যোগ্য। আর প্রতিযোগ অর্থ বিরোধ, বিরুদ্ধসম্মন্ধ, পুনরুদ্যোগ, প্রতিকারোপায়, প্রতিযোগিতা, প্রতিকূলভাব, বিরুদ্ধতা, বিরোধীপক্ষ, শত্রু।

পবিত্র কুরআনিক মুসলিম এবং ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কুরআনে ‘সালাত’ শব্দটি এসেছে প্রায় ৮২ বার এবং এঁর অর্থ এক এক প্রসঙ্গে এক এক রকম হলেও প্রধান অর্থটি হচ্ছে সংযোগ। এই সংযোগ থেকেই সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের অধিভূক্ত ধর্মভিত্তিক সামাজিক সংগঠন হাক্কানী মিশন বাংলাদেশ (হামিবা)’এর একটি আহ্বান – “হে মানবজাতি তুমি যে ধর্মাবলম্বীই হও না কেন জীবন চলার পথে শান্তি ও মঙ্গল হাসিলের জন্য মুর্শিদ/গুরু/পথ প্রদর্শক তালাশ কর এবং সংযোগ স্থাপন কর। যদি সংযোগ স্থাপন করতে না পার তবে অন্ততঃপক্ষে সংযোগ রক্ষা করে চল।” যে বা যিনি সালাত করেন, অর্থাৎ সালাতকারীকে পবিত্র কুরআনে মুসল্লি বলা হয়েছে। আবার কুরআনের ১০৭ নম্বর সুরা মাউনে বলা হয়েছে, ‘তুমি কি দেখিয়াছ তাহাকে যে দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করে? সে তো সে-ই, যে ইয়াতীমকে রুঢ়ভাবে তাড়াইয়া দেয় এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহ দেয় না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের (মুসল্লিদের), যাহারা তাহাদিগের সালাম সম্মন্ধে উদাসীন, যাহারা লোক লোক দেখানোর জন্য উহা করে, এবং গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় সাহায্য দানে বিরত থাকে।’

১০২ নম্বর সুরা তাকাছুরে বলা হয়েছে, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদিগকে মোহাচ্ছন্ন রাখে যতক্ষণ না তোমরা মৃত্যুমুখে পতিত হও। ইহা সঙ্গত নহে, তোমরা শীঘ্রই ইহা জানিতে পারিবে; আবার বলি, ইহা সঙ্গত নহে, তোমরা শীঘ্রই ইহা জানিতে পারিবে। সাবধান! তোমাদিগের নিশ্চিত জ্ঞান থাকিলে অবশ্যই তোমরা মোহাচ্ছন্ন হইতে না। তোমরা তো জাহান্নাম দেখিবেই; আবার বলি তোমরা তো উহা দেখিবেই চাক্ষুষ প্রত্যয়ে, ইহার পর অবশ্যই সেইদিন তোমাদিগকে নিয়ামত সম্মন্ধে প্রশ্ন করা হইবে।’

কুরআনের এই বাণীসমূহ এভাবেই ‘সংযোগ’, ‘যোগ’ এবং ‘সালাত’-এ শব্দগুলো নিয়ে বিস্তৃত চিন্তাভাবনা ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক উন্নতি-সমৃদ্ধির এই সময়ে আত্মিক উন্নতি সাধনের গুরুত্বের কথা। পবিত্র কুরআন মানবজাতির জন্য এক অপূর্ব জীবন-দর্শন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য হচ্ছে, কুরআন এবং ইসলাম ধর্ম অবলম্বনকারীর সংখ্যাটা পৃথিবীতে আজ যে বিশাল অঙ্কে দাঁড়িয়েছে সেভাবে এ কিতাবি ধর্মের প্রকৃত অনুশীলন বা চর্চা সেভাবে হচ্ছে না। বরং, এ ধর্মের নামে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য তথা পার্থিব স্বার্থে এর প্রয়োগ-অপপ্রয়োগের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। সাধক কাজী নজরুল ইসলাম সেই কবে বলেছিলেন, ‘আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান? কোথা সে আরেফ অভেদ যাহার জীবন-মৃত্যু জ্ঞান।’ এক ধরনের অসুস্থ এবং অশুভ প্রতিযোগিতা মুসলমান সমাজে যেমনটি দেখা যায় তা অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই অসুস্থ ও অশুভ প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষে-মানুষে সহযোগিতার বিষয়টি এখন গৌণ হয়ে পড়ছে। বড় মনের মানুষ নয়, সবাই যেন এখন চায় বড় লোক হতে, নিজেকে জাহির করতে। বড় মানুষের সংখ্যাটি কেন বাড়ছে না-এর উত্তর খুঁজতে গেলেই সমাজের অসুস্থ’তার চিত্রটি উপলব্ধি করা সহজ হয়। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া)সমূহ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ অসুস্থ প্রতিযোগিতার এই প্রবণতাটি বর্তমান সময়ে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এই  মাধ্যমগুলোকে মানুষে-মানুষে সহযোগিতায় কাজে লাগিয়ে সমাজকে অনেক সুন্দরভাবে সাজানো যেতে পারে।

দেশ ও জাতির এই পরিস্থিতি বিবেচনায় ও উপলব্ধিতে আনতে পারেন বলেই সূফী সাধক শেখ আব্দুল হানিফ-এঁর বাণী ‘পাশাপাশি চলো বন্ধু হতে পারো’-অনুসরণ আজ মানবজাতির জন্য করণীয় হয়ে উঠছে। সমাজের কল্যাণে একে অপরের বন্ধু হয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন-এটাই আজ সময়ের দাবি।