নির্ভীক সাংবাদিকতা উপহার দিতে পারবেন কে?

সংলাপ ॥ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা – কথাটা শুনতে দারুণ লাগে! আর ভাবতে গেলে তো এক অদ্ভূত রকমের রোমাঞ্চ অনুভব হয়! কিন্তু, নতুন সরকারের ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার বিশাল কর্মযজ্ঞে সাংবাদিকরা  সত্যিই কী স্বাধীনভাবে, নিরাপদে কাজ করতে পারেন? সংবিধানে দেয়া বাক্ স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কি সব সময় রক্ষিত হয়? রাজনৈতিক শাসানি এড়িয়ে নানারকম দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারি, খুন, ধর্ষণ, অপরাধ, সামাজিক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের পক্ষে সত্যিই কি রুখে দাঁড়ানো সম্ভব হয়?  প্রখ্যাত সাংবাদিকগণ ও সমাজকর্মীদের খুন ও নির্যাতনের ঘটনার পরম্পরায় এই প্রশ্ন যেন আরও বড় ভাবে সামনে উঠে এসেছে।

প্রভাব খাটিয়ে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে তো নতুন নয়! বরং রোগটা বহু পুরানো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নির্ভীক সাংবাদিকতার বলি হয়েছেন প্রায় অর্ধশতের বেশী সাংবাদিক। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই খুনের কোনও কিনারা হয়নি। কোনও গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের খবর সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণহানি বা গুম হওয়ার ঘটনা এখনো বন্ধ হয়নি। এসব খুনের পিছনে রয়েছে শাষক-শোষকগোষ্ঠীর সঙ্গে মতপার্থক্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চাঁচাছোলা প্রতিবেদন প্রকাশ। নির্ভীক সাংবাদিকতার তালিকায় প্রথম চারটি স্থানে রয়েছে যথাক্রমে নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং ডেনমার্ক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৪৩তম স্থানে। ১৭৬তম স্থানে চীন। সবার নীচে উত্তর কোরিয়া।

বাংলাদেশের অবস্থানের কথা নাই বা বল্লাম। দুঃখের বিষয় হলো, তথ্য জানার অধিকার আইন চালু হওয়ার পর থেকে দেশে শতাধিক সংবাদকর্মী খুন হয়েছেন। কিন্তু, দুর্বলতার সুযোগে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুবিচার কাগজে-কলমে শুধু অধিকারই থেকে গিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার উদ্যোগও এই প্রবণতাকে ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বেশি শোরগোল উঠলেই ঢাল হিসাবে খাড়া করা হয়েছে পুরানো জমানার ঘটনা প্রবাহকে। যখনই একের পর এক খুনের ঘটনা সামনে এসেছে, প্রতিবাদের ঝড় আছড়ে পড়েছে গোটা দেশে। চেষ্টা হয়েছে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেসব ঘটনার তদন্ত গতি হারিয়েছে।

গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তিও গণমাধ্যমকে একটা বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ফলে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রভাব বেড়েছে। আর সেই কারণেই পেশাগত বাধ্যবাধকতার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর রক্তচক্ষুর সামনে পড়তে হচ্ছে নির্ভীক সাংবাদিকতাকে। শুধু হুমকি বা আক্রমণই নয়, অনেক ক্ষেত্রে কখনও কখনও (বিশেষত মহিলা সাংবাদিকদের) সোশ্যাল মিডিয়ায় চরম হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। আইনের ফাঁক খুঁজে মানহানির মামলা ঠুকে দেয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে মিথ্যাচারী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় আসার আগে রাজনীতিকরা একাধিকবার দাবি করেন এবং এখনও করছেন,  তিনি এবং তার দল যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, বিভাজন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। ক্ষমতায় আসার পর তাদের জমানাতেও নির্ভীক সাংবাদিকতার সেই পুরানো ছবিরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে  কেন? কেন  স্বাধীন বংলাদেশে নির্ভীক সাংবাদিকতাকে রাজনীতিকদের আজ্ঞাবহ হয়েই মুখ বুঁজে অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে? কে  দেবেন জবাব? কে করবেন  প্রতিকার?