নিজের কথা – ৫৭

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ক্রোধ জীবনের এক ধরনের বিষাক্ত শক্তি, যা শরীরের উপর মহামারীর ন্যায় প্রাণঘাতী বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে থাকে। এ বিষ হাটে বাজারে ক্রয় বিক্রয় করা যায় না। ব্যক্তির অজ্ঞতা হলো এ বিষ উৎপাদনের মূল কারখানা। অজ্ঞতা ব্যক্তির চিত্তের অসচেতন স্তরের চিন্তাশক্তির একটি অবস্থা। প্রাকচেতন অবচেতন কিম্বা অচেতন স্তরের অজ্ঞতা থেকেই ঈর্ষা হিংসা লোভ ক্রোধ ইত্যাদি নামক চিন্তাশক্তির উদ্ভব ঘটে থাকে। লোভ নামক চিন্তাশক্তির প্রভাব থেকেই অজ্ঞ ব্যক্তিগণ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়। আর ক্রোধশক্তির উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে। ক্রোধশক্তির উৎপাদন ও প্রয়োগ করে অন্যের যতটা ক্ষতিসাধন করা যায় এ শক্তির প্রভাবে মানুষ তারচেয়ে অনেক বেশি নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

ক্রোধশক্তি প্রজ্বলিত অনলের মত চেতনাস্তরের এক শিখা বিহীন অনল। যা প্রাণশক্তির ভাললাগা নামক চিন্তাশক্তির স্তরকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারপূর্বক ভষ্ম করে ফেলে। ফলে ব্যক্তির ভালোলাগার ঘাটতি ও আত্মবল দুর্বল হতে দর্বলতর হতে থাকে। যার প্রভাবে ব্যক্তির জীবনের সুখ বিনষ্ট হয় এবং অসুখ ও জ্বরাব্যধির সুত্রপাত হতে থাকে । ব্যক্তি প্রথমে আত্মিক ও মানুষিক এবং পরবর্তীতে ক্রমেই শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কথায় আছে, রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘অজ্ঞতাই সকল ভুলের মূল।’

অজ্ঞতার কারণে ব্যক্তির ক্রোধ নামক চিন্তাশক্তির উদ্ভব হয়। ফলে অসুস্থতার সুত্রপাত ঘটে এবং ব্যক্তির জীবনের দুর্বলতা বৃদ্ধি পেয়ে আচরণের উপর বিরক্তিভাব ও বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। ফলে মাত্রাধিক্য ক্রোধের কারণে চলার পথে ব্যক্তি পারিবার ও সমাজের জনগনের সাথে সদ্ব্যবহার ও আত্মীয়তা রক্ষা করে চলতে পারে না। যে কারনে ব্যক্তি ক্রমেই পরিবার ও সমাজের অশান্তির কারন হয়ে দাঁড়ায়। আর পরবর্তীতে সে পরিবার ও সমাজের সদস্যদের সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। এভাবেই অজ্ঞতার কারনে উদ্ভুত বিভিন্ন চিন্তাশক্তির অপব্যবহার করে অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ্য ও দুর্বল হয়ে শারীরিক মানসিক পারিবারিক সামাজিক ও আর্থিকভাবে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি সাধন ও প্রতারিত করে থাকে। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ নিজেরাই নিজেদের অধিক প্রতারিত করে থাকে।

সাম্প্রতিক ৬০ বয়ষোর্ধ এক উচ্চশিক্ষিত  মহিলার বাস্তব জীবনের ঘটনা থেকে জানা যায় তার শরীরের রক্তচাপ মেপে দেখা গেল তার রক্তচাপের উপরের মাত্রা ছিল ১০০ একক ও নিচের মাত্রা ছিল ৬০ একক। অর্থাৎ সে তখন নিম্ন রক্তচাপ নিয়ে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় সে তার ছেলের সাথে পারিবারিক বিষয় নিয়ে  উত্তেজিতভাবে কিছু কথা বলে। মাত্র ৩০ মিনিট পর তার রক্তচাপ মেপে দেখা যায় তার রক্তচাপ বেড়ে উপরের মাত্রা ১০০ একক থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ একক আর নিচের মাত্রা ৬০ একক থেকে বেড়ে হয়েছে ৯০ একক। অর্থাৎ তার নিম্ন রক্তচাপ বৃদ্ধি পেয়ে উচ্চরক্তচাপের যন্ত্রণা অনুভব করতে আরম্ভ করেছে। এতে দেখা যায় একটা বয়সের সাথে মানুষের রক্তচাপ তার চিন্তাশক্তির পরিবর্তনের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। মানুষের প্রত্যাশার অনুকূলের রক্তচাপ মাত্রা ও প্রত্যাশার প্রতিকুলের রক্তচাপের মাত্রা ভিন্নতর হয়ে থাকে। অর্থাৎ ব্যক্তির মেজাজের তথা আচরণের নিয়ন্ত্রণের উপর নির্ভর করে প্রবাহিত হয় ব্যক্তির স্বাভাবিক রক্তচাপ। অর্থাৎ ব্যক্তির সুস্থ্য স্বাভাবিক আচরণের উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে ব্যক্তির সুস্থ্য স্বভাবিক জীবন যাপন।

গবেষণায় দেখা যায় ব্যক্তির নিজস্ব পরিবেশ গড়ে ওঠে তার আচরণের উপর নির্ভর করে। দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে অনুসারে একই কর্ম সম্পাদন করতে বিভিন্ন ব্যক্তির বিভিন্ন ভাবে আচরণ করে থাকে। কেহ পরিবেশ শান্ত ও সুখকর রেখে তার কর্মগুলো সম্পাদন করতে পারেন আর কেহ তা পারে না। সুখকর পরিবেশ বজায় রেখে নিজের কর্মগুলো সম্পাদন করা ব্যক্তির অন্যতম যোগ্যতা। এ সুখকর পরিবেশ বজায় রেখে কর্ম সম্পাদন করতে চেতনার অজ্ঞতা স্তরের চিন্তাশক্তির ব্যবহার না করে সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তির ব্যবহার করা হয়। সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তিগুলো হলো ভাললাগা ভালবাসা স্নেহ সম্মান শ্রদ্ধা প্রেম ভক্তি বিশ্বাস সম্পর্ক এসব উচ্চতর স্তরের জ্ঞানমূলক চিন্তাশক্তি।

চিত্তের সচেতন স্তরের চিন্তাশক্তিগুলো ব্যক্তির আচরণের উপর যে প্রভাব ফেলে থাকে তার ফলে ব্যক্তি নিজে থাকেন শান্ত ও পরিবেশের অন্যরাও শান্ত থেকে ব্যক্তিকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে প্রেরণা যোগায়। ফলে একদিকে ব্যক্তি সফলতা অর্জনের ক্ষেত্রে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কর্ম করতে পারেন। অন্যদিকে নিজের সুস্বাস্থ্য পরিবার ও সমাজের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আর্থিক ও আত্মিক ভাবে উন্নত ও শান্তিময় জীবন যাপনের নিশ্চয়তা লাভ করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে সূফী সাধক আনোয়ারুল হক তাঁর অনুসারীদের আচরণের উপর যে অমর বাণী রেখে গেছেন তা অনুসরণীয়। ‘বিদ্যাই মানবগণে প্রদানে নম্রতা, নম্রতা হতে পরে পায় সে যোগ্যতা। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়, ধন হতে ধর্ম, ধর্ম হতে সুখোদয়।’ (চলবে)