নিজের কথা – ৫৪

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥  ‘আমিত্বের আবরণ দুর  করার প্রচেষ্টার অপর নাম এবাদত’ – সূফী সাধক আনোয়ারুল হক।

সাধক তাঁর এ বাণীতে স্বীয় অভিজ্ঞতার আলোকে বাস্তব জীবনের এবাদত কি এবং তা কিভাবে করা যায়? তারই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন তাঁর এ মহান বাণীতে। এ বাণী থেকে বুঝা যায় আমিত্বের আবরণ ধারণ করে আর যা কিছু করা যাক কখনো এবাদত নামক কর্মটি করা যায় না। তাই এবাদত নামক কর্মটি যথাযথ ভাবে করতে হলে এর মৌলিক বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া দরকার। বুঝা দরকার আমিত্ব কি? আমিত্বের আবরণ কিভাবে হতে থাকে? আমিত্বের আবরণ দুর করার প্রচেষ্টার কিভাবে করা যায়? মানুষের এবাদত করার প্রয়োজন ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি? এবাদত করার জন্য এইসব বিষয় বুঝা দরকার।

আমি এবং ত্ব এ শব্দ দু’টি যোগ করে আমিত্ব শব্দটি লিখা হয়। আমি শব্দটিতে একবচন নিজ সত্ত্বাকে বুঝায়। ত্ব শব্দটিতে ব্যক্তির গুণাবলীর বিষয় বুঝায়। কাজেই আমিত্ব শব্দটিতে আমির গুণাবলী তথা নিজের গুণাবলীকে বুঝায়। আমির গুণাবলী তথা নিজের গুণাবলী প্রকাশের মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের পরিচয় তুলে ধরতে পারেন। জ্ঞানী ব্যক্তিগণ যুগে যুগে বলেছেন,’  নিজেকে চেন। আবার শাস্ত্র মতে বলা হয়, ‘যে নিজকে চিনতে পারেন, সে ব্যক্তি তাঁর স্রষ্টাকেও চিনতে পারেন। ‘তাই বলা যায় কেহ নিজের পরিচয় সম্পর্কে সঠিক সমাধান বের করতে পারলে সে ব্যক্তির নিকট তাঁর স্রস্টার সৃষ্টির সকল রহস্যের সমাধান সহজ হয়ে যাবে।’

ব্যক্তির ভুমিষ্ঠ ও বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তার পারিবারিক সামাজিক ও অন্যান্য জীবনের সম্পর্ক, জনবল, বিত্তবল, শিক্ষা, চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোন কর্মগুণাবলীর পরিবর্তনের প্রকাশ ও বিকাশ সাধন হতে থাকে।  এ সকল পরিবর্তনের হ্রাসবৃদ্ধির ক্ষমতা যখন ব্যক্তির নিজের কাছে ধরা পড়ে তখন ব্যক্তির আত্মবলের সমানুপাতিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। এ আত্মবল যতবার পরিবর্তিত হতে থাকে, ব্যক্তির পূর্ব পরিচিতির উপর ততবারই এর কিছুটা প্রভাব পড়তে থাকে। এর ফলে পরিবার ও সমাজের নিকট ব্যক্তির নুতন পরিচিতির বিস্তার ঘটতে থাকে।

পরিবার ও সামাজিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে একজন মানব শিশুর পরিচয় তুলে ধরার জন্য প্রথমে পায় একটি নাম, অতঃপর পিতা মাতা ভাইবোন দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচী, বন্ধু-বান্ধব, ছাত্র-ছাত্রী ইত্যাদি সহ বিভিন্ন মহলে পরিচিতির জন্য লাভ করতে থাকে বি.এ, এম.এ, এসব বিভিন্ন ডিগ্রি। চাকুরীর ক্ষেত্রে দারোয়ান পিয়ন সুপারভাইজার, সেকশন অফিসার, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাপরিচালক এভাবে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একইভাবে বিভিন্ন পরিচিতি তুলে ধরার জন্য পায় বিভিন্ন খেতাব ও পদবী। এ সকল সাময়িক কর্মপদবীর মাধ্যমে মানুষের আচরণের সাময়িক কর্মপরিচিতি প্রকাশ পেলেও, স্থায়ী জীবন পরিচিতির প্রকৃত পরিচয় বহন করেনা। সাময়িক কর্মপরিচিতি মানুষে মানুষে উঁচু নীচু, অমির ফকির, ধনীগরিব এসব ভেদাভেদ তুলে ধরে। যা মানুষ হিসেবে সবাই সকলের মর্যাদাকে একইভাবে সমুন্নত দেখতে পায়না। মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী এসকল গুণাবলীর পরিচিতির মাধ্যমে সৃষ্টি হয় মানুষের ইগো বা মিথ্যে অস্থায়ী পরিচয়। মানুষের এ অসুস্থ অস্থায়ী পরিচিতির এক এক স্তরের গুণাবলী হতেই সৃষ্টি হয় মানুষের আচরণে আমিত্বের আবরণ।

মানুষের অস্থায়ী দেহকেন্দ্রিক ঋণাত্মক আচরণের প্রভাব যেমন তার জীবনকে আমিত্বের আবরণে আবৃত করে থাকে তেমনি ভাবে আত্মকেন্দ্রিক আচরণের ধনাত্মক পরিবর্তন অনাবৃত করতে পারে ব্যক্তির জীবনের আমিত্বের আবরণ। আত্মকেন্দ্রিক আচরণের ধণাত্মক পরিবর্তন বলতে বুঝায় সকলের আত্মার রয়েছে সত্যময় ক্ষমতাসম্পন্ন স্রষ্টাকে অনুভব করা ও বুঝার সুষম-ক্ষমতা। এ ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার করে ব্যক্তি চাইলে সমুন্নত মর্যাদা সম্পন্ন স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি সদ্ব্যবহার পূর্বক আনন্দ ও শান্তিময় জীবন উপভোগ করতে পারেন। কারণ সকল ব্যক্তির আত্মাই হলো সমউপযোগী সমমর্যাদা ও সমক্ষমতা সম্পন্ন সুবিচারক মহান স্রষ্টার সৃষ্টি। স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও মর্যাদা সম্পন্ন আচরণ প্রদর্শন করার উপযোগী গুণাবলী সম্পন্ন আত্মাই হলো মানব জীবনের প্রকৃত পরিচিতি বা স্থায়ী আমিত্ব। ব্যক্তির এ স্থায়ী আমিত্বের প্রভাব ও পরিচয় তুলে ধরার জন্যে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টিকারী আচরণের মাঝে সৃষ্ট যে সকল অসুস্থ অস্থায়ী পরিচয়ধারী আমিত্বের আবরণ গড়ে ওঠে, ব্যক্তির স্থায়ী আমিত্বকে এসব সৃষ্ট আবরণের প্রভাবমুক্ত করার অব্যহত প্রচেষ্টাকেই সাধক এবাদত হিসাবে গণ্য করেন।

শান্তি ও আনন্দ ব্যক্তির জীবনের এমন এক সম্পদ যা উপভোগ করে কেহ কখনও ক্লান্ত বা অবস্বাদগ্রস্থ হয়না। তাই ব্যক্তি তার অনন্তকালীন জীবনকে শান্তিময় আনন্দলোকের মাঝে যাপিত করতে চাইলে নানান পরিচয়ধারী আবৃত জীবনকে আমিত্বের আবরণমূক্ত করা অত্যাবশ্যক। এ কর্মটি সুসম্পন্ন করার জন্যই মানব জীবনে এবাদতের ভূমিকা বিশেষ ভাবে অনন্য। (চলবে)