নিজের কথা ৫০

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ‘সুজন কুজন আর আপনজন, এই নিয়ে হয় জীবন যাপন’ – সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ।

এ পৃথিবীতে আগমন করার পর পরই শুরু হয় আমাদের সকলের কান্নার আওয়াজ। এ আওয়াজ জানান দেয় আমরা জীবিত। যত্মের ক্ষেত্রে যাঁর আশ্রয়ে থেকে প্রয়োজনীয় আহার নিদ্রা বিশ্রাম এসব যাবতীয় কার্যকলাপের জন্য আমাদেরকে নির্ভর করতে হয় তিনিই হলেন আমাদের পরম পূজনীয় প্রতিপালনকারী মা।

এ পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই প্রতিপালকের পরম কৃপায় আমাদের মা-কে সুরক্ষাদান করতে যিনি সর্বদাই সহযোগিতা করে থাকেন তিনি হলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় বাবা। এ মা-বাবার যোগসাজশে গড়ে ওঠে আমাদের পারিবারিক জীবন ব্যবস্থা। পরিবারের মাধ্যমে আমরা মাতৃগর্ভেই এ মোহনীয় দেহ ধারণ পূর্বক স্রষ্টার অতুলনীয় সুন্দর পৃথিবীতে আগমন করি। আর এ পৃথিবীতে আগমনের পূর্বেই মাতৃগর্ভ থেকে আমরা অনেকেই কৃপাধন্য মা বাবার প্রেমের পরশে প্রতিপালিত হতে থাকি। তাইতো জীবন চলার পথে স্রষ্টার পরম কৃপায় আমরা মা বাবার সান্নিধ্যে থেকেই শুরু করি আমাদের পৃথিবীর পথচলা।

পৃথিবীর পথচলার প্রারম্ভে আমাদের সুরক্ষাদানে দয়াল স্রষ্টার পরম কৃপায় সুজন ও আপনজন হয়ে যাঁরা সঙ্গী হিসেবে আমরা আমাদের পাশে থাকেন তাঁরাই হলেন আমাদের সকলের পূজনীয় মা বাবা।

জীবন চলার পথে আমরা যাঁদের কূজন বলে থাকি আমাদের দয়াল প্রভুর কৃপায় তাঁদের পাশবিকতা থেকেই আমরা আমাদের মহান মানবতার জীবন গড়ার শিক্ষালাভ করে থাকি। প্রশ্ন আসে কিভাবে তা সম্ভব হয়? কথায় আছে,  ‘শিখলে কোথায়? ঠেকলে যেথায়।’ আমরা বাহ্যিকভাবে দুঃখের যাতনা-বেদনা অনুভব করি। তাই দুঃখকে ভয় পাই এবং দুঃখ থেকে দূরে সরে থাকতে চাই। এ দুঃখ দানের কর্মটিকে আমরা কুকর্ম বলি। আর এ কুকর্ম  যিনি সম্পাদন করে থাকেন, তাকেই আমরা কুজন বলে থাকি। একইভাবে যে সকল কর্ম আমাদের জীবনের দুঃখ মোচন করে থাকে এসকল কর্মকে আমরা সুকর্ম বলি। আর সুকর্ম সম্পাদনকারীদের আমরা সুজন ও আপনজন হিসেবে গণ্য করে থাকি।

 বাস্তবে প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি নয় বরং ব্যক্তির সম্পাদিত কর্মের কারনেই আমরা সাধারণত বাহ্যিকভাবে ব্যক্তিকেই সুজন, কুজন ও আপনজন বলে বিবেচনা করে থাকি। আর ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে আমরা কখনো কখনো দয়া মায়া সম্মান শ্রদ্ধা প্রেম ভক্তি বিশ্বাস এসকল সুকর্ম সম্পাদন করে সুজন ও আপনজনদের আসন অলংকৃত করে নিজেরা সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকি। আবার কখনো কখনোও ক্রোধ হিংসা বিদ্বেষ ঈর্ষা ঘৃণা এসকল অপকর্ম করে মানুষে মানুষে অপ্রীতিকর অশান্তির অনল জ্বালিয়ে নিজেরাই নিজেদের দগ্ধ বিদগ্ধ করে জীবন যাপন করে থাকি। তাই সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করার জন্য গুণীজনদের গানের বাণীতে বলা হয়, ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপী কে নয়। ‘গুণীজনদের এ কথারই প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয় সাধক শেখ আবদুল হানিফ এঁর বাণীতে, ‘সুজন কুজন, আপনজন এই নিয়ে হয় জীবন যাপন।’

সুজন, কুজন ও আপনজন সকলেই বাহ্যিকভাবে দেহধারী মানুষ হলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষ দেহ নয় বরং দেহী আত্মা। সকল দেহধারী মানুষই সুখী শান্তিময় জীবন যাপন করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে সকল মানুষ অজ্ঞতা বসত সুস্থ্য ও বলবান আত্মা ধারণ ও লালন পালন করতে না পারার কারনে সুখী শান্তিময় জীবন যাপন করতে পারে না।

সুস্থ্য ও নিরোগ জীবন যাপনের জন্য দেহ ও আত্মা উভয়ের জন্যই পুষ্টিকর পরিমিত খাবার প্রয়োজন। অজ্ঞতার কারনে অশিক্ষিত মানুষ তার সুস্থ্য ও সবল দেহগঠন ও আত্মবল বৃদ্ধির জন্য পরিমিত মাত্রায় পুষ্টিকর খাবারের যোগান দিতে পারেনা। তাই অপুষ্টির কারনে অধিকাংশ মানুষ অসুস্থ্যকর দুর্বল জীবন যাপন করে থাকে।মানুষ তার চোখ কান ত্বক মুখ চিন্তা এসকল ইন্দ্রিয় পথের মাধ্যমে দেহ ও আত্মার খোরাক গ্রহন করে থাকে। ইন্দ্রিয় পথে যেসব তথ্য নিজের সাথে আদান-প্রদান করে এসব তথ্যের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় ব্যক্তির চিন্তার জগৎ। এ চিন্তার জগৎ থেকেই ব্যক্তি তার পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী তার চিন্তা শক্তি ব্যবহার করে আত্মার খোরাক গ্রহন করে থাকে। আধ্যাত্মিকভাবে পর্যায়ক্রমে দুষিত চিন্তা গ্রহন করার কারনে অসচেতন অজ্ঞ ব্যক্তিদের আত্মা ও শরীর উভয়ই অসুস্থ্য ও দুর্বলতর হতে থাকে। যার পরিণতিতে ব্যক্তি অসুখী ও অশান্তির জীবন যাপন করে থাকে। অপরদিকে আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ পর্যায়ক্রমে বিশুদ্ধ চিন্তা গ্রহন করার কারনে তাঁদের আত্মা ও শরীর উভয়ই সুস্থ্য থাকে। তাই তাঁরা সুখী ও শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকেন। যে ব্যক্তি স্রষ্টার বিধিমালা অনুযায়ী জীবন যাপন করে থাকেন তিনিই আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন ও জ্ঞানী ব্যক্তি। আধ্যাত্মিকভাবে সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সর্বদাই সুজন, কুজন ও আপনজনদের নিয়ে সুখী সমৃদ্ধ শান্তিময় জীবন যাপন করে থাকেন। (চলবে)