নিজের কথা – ৪৬

শাহ্ মোঃ লিয়াকত আলী ঃভক্তি নিয়ে রয়েছে নানা মণি ঋষির নানান উক্তি। প্রশ্ন আসে ভক্তি কি, কিভাবে ও কেন করা হয়? ভক্তি হলো কল্যাণকারী সর্বশক্তিমান প্রভুর (আরাধ্যের) নৈকট্য লাভের জন্য ভক্তের আত্মিক এক মহাশক্তি। ভক্তি করে ভক্তকে শান্ত। আনে ভক্তের জীবনে শান্তি।  ঘটায় ভক্তের চিন্তাজগতের কঠিনতম জীবনযুদ্ধের অবসান। তাই ভক্তির মাঝেই থাকে ভক্তের জীবনের চরম উন্নতি ও পরম প্রাপ্তি মুক্তি। ভক্তির অবস্থান  প্রসঙ্গে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বলেন, ‘শুদ্ধ চিত্ত্বেই একমাত্র আসে ভক্তি। নচেৎ ভক্তির নামে আসে ব্যক্তির স্বার্থের অভিব্যক্তি।’

ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ আত্মা তার বাহ্যিক দেহের পরিচালিকা শক্তি। শক্তিশালী বলবান আত্মা যেমন ব্যক্তির চিন্তাজগতের উপর নিয়ন্ত্রিত আচরণের মাধ্যমে সমগ্র দেহজগৎকে সুস্থ্য ও সবল রেখে আনন্দ ও শান্তির জীবন যাপন করতে শক্তি যোগায়। তেমনি দুর্বল আত্মা চিন্তা জগতের উপর নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের মাধ্যমে  দেহজগতের শান্তি ও আনন্দ ধরে রাখতে পারেনা। ফলে ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

ভক্তি নিবেদন ব্যতীত কারো পক্ষে আরাধ্যের নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব নয়। ভক্তি নিবেদন করা যায় না যদি না ভক্ত আরাধ্যের দিক নির্দেশনা পেয়েও সেই নির্দেশনা  অনুসরণ পূর্বক কর্ম করে জীবন যাপন না করেন। আরাধ্যের নৈকট্য অর্জন করা বলতে বুঝায় আরাধ্যের প্রদত্ত নিয়ামত তথা রহমতপূর্ণ জ্ঞানশক্তির পরশ অনুভব করা। নিরাপদ জীবন যাপনের ক্ষেত্রে সকল নরনারীর জন্য এই জ্ঞান অন্বেষণ করা অত্যাবশ্যক। যে রহমতপূর্ণ জ্ঞান অর্জন ব্যতীত কেউই কোন কাজ সময়মত সঠিক ও সুষ্ঠু ভাবে সম্পাদনা করতে পারে না। তাই বলা যায় একমাত্র এই জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই ব্যক্তি তাঁর মালিকের নিকট প্রকৃতপক্ষে ভক্তি নিবেদন করে থাকেন। আর আরাধ্যের প্রতি ভক্তি নিবেদন করার  মাধ্যমে ভক্ত তাঁর আরাধ্যের জ্ঞানশক্তিপূর্ণ রহমতের পরশ অনুভব পূর্বক আরাধ্যের নৈকট্য লাভ করে থাকেন।

যে জ্ঞান ব্যক্তির জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারেনা  সে জ্ঞান রহমতশূন্য।  প্রকৃতপক্ষে রহমতশূণ্য কোন জ্ঞান প্রকৃত জ্ঞান নয় বরং তা অজ্ঞতারই নামান্তর জ্ঞানশূন্য বিদ্যা মাত্র। এ জ্ঞানশূন্য বিদ্যা ব্যক্তিকে ভক্তিপূর্ণ নম্রতার জীবন যাপন করতে দেয় না।  বরং যা করতে ইন্ধন যোগায় তা হলো  ভক্তিশূণ্য দাম্ভিকতাময় অহংকারী জীবন যাপন করা। যে অহংকার হলো ব্যক্তির পতনের মূল। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক অনুসারীদের জন্য ‘বিদ্যার’ ক্ষমতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে যে অমূল্য বাণী রেখে যান তা হলো, “বিদ্যাই মানবগনে প্রদানে নম্রতা, নম্রতা হতে পরে পায় সে যোগ্যতা। যোগ্যতা হতে ধন লভে সুনিশ্চয়। ধন হতে ধর্ম। ধর্ম হতে সুখোদয়।”

শাস্ত্রে আছে জ্ঞান জগতের পরিমন্ডল একমাত্র স্রষ্টার। আর স্রষ্টার ইচ্ছে ব্যতীত কেউই তাঁর জ্ঞানের পরিমন্ডলে পরিভ্রমণ করতে পারে না। তাই জ্ঞান অন্বেষণের জন্য  স্রষ্টার কৃপা ও রহমতের দরজা উন্মুক্ত করা অত্যাবশ্যক। এ কৃপা ও রহমতের দরজা  খোলার সুযোগ লাভ করেন ভক্ত তাঁর আরাধ্য তথা জ্ঞানজগতের মালিকের নিকট ভক্তি নিবেদন পূর্বক আরাধনা তথা আরাধ্যের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন পূর্বক জীবন যাপন করে। আর এরূপ জীবন যাপনের মাধ্যমেই ভক্ত তাঁর আরাধ্যের নৈকট্য লাভ তথা ভক্তিপূর্ণ জীবন চলার পথ অর্জন করে থাকেন।

সাধক আরো বলেন, ‘প্রেম, ভক্তি, সমর্পণ’ এ ত্রয়শক্তির সমন্বয় ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণের পথে সম্পর্ক গড়তে জীবন যাপন করতে শক্তি যোগায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সমর্পণ করা সহজ কিন্তু আত্মসমর্পণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।’

সাধক বলেন প্রেমের পরবর্তী স্তরের শক্তি হলো ভক্তি। যা ব্যক্তিকে সমর্পণ থেকে আত্মসমর্পণের পথে পথ চলতে শক্তি ও সামর্থ যোগায়। প্রেম ও ভক্তিশক্তি অর্জন করতে চাইলে প্রেমিক ও ভক্তকে  ভাললাগা ও ভালবাসার পথে চলে জীবন যাপন করার অভ্যাস গঠন আরম্ভ করতে হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ভোগের লিপ্সা নিয়ন্ত্রণকারীদের মাঝে আসে প্রেমের স্তর। এ প্রসঙ্গে সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘প্রেম কিয়া নেহী যাতা, প্রেম হো যাতা’। প্রেমশক্তির পরবর্তী স্তরের শক্তি হলো ‘ভক্তিশক্তি’। সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ সাধনার পথে পথ চলায় ভক্ত ও প্রেমিকের মর্যাদার অবস্থানের স্তর তাঁর মালিকের উদ্ধৃতি দিয়ে তুলে ধরতেন এভাবে, “সাধক আনোয়ারুল হক ভক্ত ও প্রেমিকের সান ও মর্যাদা তুলে ধরেন,  “এ দরবারের সকল ভক্ত ও আশেকান তথা প্রেমিকের পা এর নীচে আমার মাথা থাকে। আর আমার মালিকের পা এর নীচে আমার মাথা রয়েছে।” তাই ভেবে দেখুন, প্রেমিক ও ভক্তের মর্যাদা কত উপরে। ব্যক্তি জীবন যাপন করে  তার আচরণের মাধ্যমে। এ আচরণ গড়ে ওঠে ব্যক্তির কর্ম করার দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে। সাধনার মাধ্যমে শক্তি অর্জন পূর্বক ব্যক্তি আচরণের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নিয়ন্ত্রিত আচরণ ব্যক্তির যোগ্যতার উত্তরণ ঘটায় এবং ক্ষতিকর জীবন যাপন থেকে নিজেকে রক্ষা পূর্বক শান্তিময় জীবন যাপনের ক্ষমতা অর্জন করে  থাকেন। আচরণের এ স্তরকে বলা হয় আদব বা শিষ্টাচার। আর শিষ্টাচার বহির্ভূত ব্যক্তিরা নিজেদের আচরণের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা। ফলে তারা ক্ষতিমুক্ত নিরাপদ জীবন গড়ার বলয়ে প্রবেশ করতে পারে না। এরাই নরকের যন্ত্রণাময় জীবন যাপন করে থাকে। এরাই অশিষ্ট আচরণের মাধ্যমে নিজেরাই নিজেদের ক্ষতিসাধন পূর্বক নিজেদের প্রতারিত করে থাকে। সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলেন, “আদবে আওলিয়া, বেয়াদবে শয়তান।” যে শক্তি জ্ঞান অর্জন পূর্বক ব্যক্তি জীবনের শয়তানী শক্তি নিয়ন্ত্রণে এনে আওলিয়ায় রূপান্তরিত করে ব্যক্তির এস্তরের শক্তিই হলো আমার নিকট ভক্তি।