নিজের কথা – ৪৪

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ শাহ্জীর মালিক সূফী সাধক আনোয়ারুল হক বলতেন ‘গরীবের শখ করলেই হয়।’  তিনি আরও বলতেন, ‘আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ছোটলোক না।’ আবার কখনও কখনও বলতেন, ‘গরীব গজবের পয়দা।’  এসকল বাণী থেকে বুঝা যায়, গরীব দু’ধরনের। এক ধরনের গরীব যারা গজবের পয়দা তারা ছোটলোক। আর যে সকল গরীব ছোটলোক না তাঁরা যেসব সখ করেন, সেই সকল সখ করা মাত্রই তা পূরণ বা বাস্তবায়ন করে থাকেন। যা নিম্নোক্ত বাণীটিতে প্রকাশ পায়। ‘আমরা গরীব হতে পারি কিন্তু ছোটলোক না।’ আর যে সকল গরীব নিজেদের শখ পূরণ করতে পারে না, এসকল গরীব হলো গজবের পয়দা।

‘আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু ছোটলোক না।’ এই বাণীতে সাধক নিজেকে সেই শ্রেণীর গরীবদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করেন, যাদের শখ করা মাত্রই পূরণ করে থাকেন। আবার যে সকল গরীব গজবের পয়দা তারা নিজেদের সখ পূরণ করতে পারে না অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকে। এরাই প্রকৃতপক্ষে কৃপণ ও সংকীর্ণ।

সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ তিনি ছিলেন তাঁর মালিকের মতই অত্যন্ত সফরপ্রিয়। মাঝে মাঝেই শত শত সফরসঙ্গীদের নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকদিনের জন্য তিনি সদলবলে সফরের আয়োজন করতেন। তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্য আরব আমিরাতের বিভিন্ন সাধনাকেন্দ্র ও দর্শনীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সফর করেন। দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা উপজেলার সাধকদের মাজার শরীফ ও দর্শনীয় এলাকা সফর করেন।  সাধক শেখ আবদুল হানিফ কোথাও কোন সফরে যেতে চাওয়া মাত্রই তা যতই ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল হোক না কেন তিনি তা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতেন।

তিনি কখনও কিশোরগঞ্জ, চাঁন্দপুরশরীফ, ফরীদপুরশরীফ, জঙ্গলবাড়ী, সরারচর, হবিগঞ্জ কালিকাপুর দরবার শরীফ, সিলেট সীপাহশালার মাজার শরীফ, কখনও কুষ্টিয়া সাঁইজির মাজার শরীফ সফর করেছেন। আবার কখনও খুলনা, বাগেরহাট খানজাহান আলী মাজার শরীফ, নলতা খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ্ সাধকের মাজার শরীফ, সুন্দরবন হীরণ পয়েন্ট, কটকা দুবলারচর, কখনো কাপ্তাই, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়া, বান্দরবান নীলকান্ত, নীলাচল, নীলগিড়ি। আবার কখনওবা সম্পন্ন করেছেন ভোলা হাতিয়া নিঝুমদ্বীপে শুদ্ধিযাত্রা।

সাধক বছরের অধিকাংশ সময়ই বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানসহ নানান ঐতিহ্যময় ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহ জাঁকজমকের সাথে উদ্যাপন করতেন। তিনি বেশ কয়েকটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাসব্যাপী উদযাপন করতেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তাঁর মালিকের আবির্ভাব ও লোকান্তর মাস অগ্রহায়ণ ও শ্রাবণ মাসসহ সাধক খাজা মঈনুদ্দিন হাসানের আবির্ভাবের রজব মাস ও রমযান মাসব্যাপী নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান উদ্যাপন করতেন। অনুষ্ঠানে শত শত আগত ভক্ত ও অন্যান্য সকলের জন্য তেহারী ও বিভিন্ন ফলের মাধ্যমে শোধনসেবার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া দৈনন্দিন দরবারে নানাবিধ প্রয়োজন ও  ফরিয়াদ নিয়ে আগত নানান শ্রেণীর নারী-পুরুষের সমস্যা সমাধানের উপদেশসহ আত্মশুদ্ধির জন্য দরবার ও শিষ্টাচারের উপর রবিবার ও বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে উদ্যাপন করা হয় এবং আত্মিক উন্নয়নে জ্ঞান চর্চার জন্য প্রতি শনিবার বিকেলে সাধকের গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফের ব্যবস্থাপনায় হাক্কানী চিরন্তন বৈঠকের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলোচনা অনুষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চালু রয়েছে।

এভাবে সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ বছরের পর বছর ধরে সমাজ ও দেশের জনগণের উন্নয়নের জন্য নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণপূর্বক আজীবন নিজেকে মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেন। (চলবে)