নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী

সংলাপ ॥ মানুষের মধ্যে পৃথক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দু’টি সৃষ্টি – নারী ও পুরুষ। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে এদের উভয়েরই স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। কুরআনে নারী-পুরুষের সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে সকলেই সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াতকে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন। এ আয়াতের পক্ষে-বিপক্ষে বাদানুবাদের অন্ত নেই। আয়াতটির প্রচলিত অনুবাদ হলো – ‘পুরুষেরা নারীদের উপর কৃর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেক্কার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ্ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।’ ধর্মান্ধগোষ্ঠী নারীদের ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করতে আশ্রয় নেয় এই আয়াতটির।

সত্য হলো এই যে – উক্ত আয়াতে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কি অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। কুরআনের দৃষ্টিতে নারী কোন ভোগ্যবস্তু নয়, দাসীও নয়। এই আয়াতে আল্লাহ্ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। ‘কাওয়্যামুনা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, ঠেক্না, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা [আরবি-বাংলা অভিধান, ই.ফা.বা.]। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদ- এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহ্ই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য নারীর তুলনায় অধিক দান করেছেন। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ্ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়ণতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তারা সন্তান ধারণ, লালন-পালন ও গৃহকর্ম করে থাকেন।

আদম ও হাওয়া আল্লাহ্ অবাধ্য হওয়ায় আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। তওরাতের বর্ণনায় আল্লাহ্ হাওয়াকে বললেন, ‘আমি তোমার গর্ভকালীন অবস্থায় তোমার কষ্ট অনেক বাড়িয়ে দেব। তুমি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সন্তান প্রসব করবে।’ তারপর তিনি আদমকে বললেন, ‘যে গাছের ফল খেতে আমি নিষেধ করেছিলাম তুমি তোমার স্ত্রীর কথা শুনে তা খেয়েছ। তাই তোমার জন্য মাটি অভিশপ্ত হলো। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করে তবে তুমি মাটিতে ফসল উৎপন্ন করবে। তোমার জন্য মাটিতে কাঁটাগাছ ও শিয়ালকাঁটা গজাবে, কিন্তু তোমার খাবার হবে ক্ষেতের ফসল। যে মাটি থেকে তোমাকে তৈরি করা হয়েছিল সে মাটিতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোমাকে খেতে হবে। তোমার এই ধূলার দেহ ধূলাতেই ফিরে যাবে।’ (তওরাত: জেনেসিস: ১৬-১৯)।

‘মনুসংহিতা’য় নারীর কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীলোকেরা সন্তান প্রসব ও পালন করে বলে তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী; এরা গৃহের দীপ্তিস্বরূপ হয়। এই কারণে স্ত্রীলোকদের সকল সময় সম্মান-সহকারে রাখা উচিৎ, বাড়িতে স্ত্রী এবং শ্রী-র মধ্যে কোন ভেদ নেই।’

বাংলা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেয়া হয়েছে – পতি, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। পুরুষের দায়িত্ব হলো – স্ত্রী ও পরিবারভুক্ত সকলের জাগতিক প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা, তাদের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়গুলোর যোগান দেয়া।

উল্লিখিত কাজগুলো নারী ও পুরুষের বুনিয়াদি ও নীতিগতভাবে মৌলিক কাজ হলেও অন্যান্য অঙ্গনে তাদের কাজ করার অবাধ স্বাধীনতা আল্লাহ্ দিয়েছেন। কুরআন মতে যার নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা রয়েছে সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে। অযোগ্য পুরুষকে নারীর কর্তা করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত কুরআন সমর্থন করে না। যে প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতায় নারী অন্যদের থেকে অগ্রগামী সে প্রতিষ্ঠানে নারীকে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে মেনে নিতে কোন বাধা নেই।

অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে জীবিকার যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলে তাতে ধর্মের কোন বাধা নেই। রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর অনেক নারী অনুসারী নিজ পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় কিংবা পুরুষ সদস্যরা ধর্মপ্রতিষ্ঠায় অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। স্বয়ং খাদিজাও ছিলেন একজন ব্যবসায়ী।

রসুলাল্লাহ্ সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। আনাস (রা:) ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সেদিন আমি আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা:) এবং উম্মে সুলাইমকে (রা:) দেখেছি, তাঁরা উভয়েই পায়ের কাপড় গুটিয়ে নিয়েছিলেন। আমি তাদের পায়ের গোছা দেখতে পেয়েছি। তারা মশক ভরে পিঠে বহন করে পানি আনতেন এবং (আহত) লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন। আবার চলে যেতেন এবং মশক ভরে পানি এনে লোকদের মুখে ঢেলে দিতেন’ (বোখারী শরীফ, হাদিস নং ৩৭৬৭)। মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী – রুফায়দাহ (রা:)। শুধু তাই নয়, যুদ্ধে যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেও অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে হবে তাহলে  তারা পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করতে পারে। তার প্রমাণ ইতিহাস। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় তখন নারীরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-কে সুরক্ষা দেয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের উপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী অনুসারী উম্মে আম্মারার (রা.) ভূমিকা ছিল অবিশ্বাস্য। এ সম্পর্কে রসুলাল্লাহ্ ((যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাহকেই লড়াই করতে দেখেছি।’ তিনি যেভাবে যুদ্ধ করেছিলেন তা নজিরবিহীন – এক শত্রু সৈন্যের তরবারির কোপ পড়ল তার মাথায়, তিনি ঢাল দিয়ে তা প্রতিহত করেই পাল্টা আঘাত করলেন ওই সৈন্যের ঘোড়ার পায়ের উপর। অশ্ব ও অশ্বারোহী দুজনেই পড়ে গেল মাটিতে। মহানবী এই দৃশ্য দেখে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ্কে (রা.) সাহায্যের নির্দেশ দিলেন। তিনি পতিত সৈন্যকে শেষ করলেন। এলো অন্য এক শত্রু। সে আঘাত হানলো আব্দুল্লাহ্ (রা.) বাম বাহুতে। মা পুত্রের ক্ষতস্থান বেঁধে দিলেন। আর ছেলেকে আমৃত্যু লড়াই করার জন্য উদ্দীপ্ত করলেন। এই অপূর্ব দৃশ্য দেখে রসুলাল্লাহ্ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) বললেন, ‘হে উম্মে আম্মারাহ! তোমার মধ্যে যে শক্তি আছে, তা আর কার মধ্যে থাকবে?’ নবী করিম (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক) নিজ হাতে সেদিন এই বীরাঙ্গনার ক্ষতস্থানে পট্টি বেঁধে দিয়েছিলেন। তাঁর কাঁধ থেকে গল গল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকজন বীর সৈনিকের নাম উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘আল্লাহ্ কসম! আজ তাদের সবার চেয়ে উম্মে আম্মারাহ বেশি বীরত্ব দেখিয়েছেন।

যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসঙ্কুল এবং সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পুরুষদের পাশাপাশি নারী অনুসারীরা অংশ নিয়েছেন, সেখানে তৎকালীন অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং অন্যান্য কাজে যে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা কখনই পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। তারা পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জাতীয় ও সামাজিক প্রয়োজনে নিশ্চিন্তে, নির্বিঘেœ যে কোন ভূমিকা রাখতে পারতেন। ঠিক একইভাবে সংসার সমরাঙ্গণেও যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যে নারীকেই প্রথম সারিতে অর্থাৎ উপার্জন ও পরিবার ভরণপোষণের কাজে নামতে হবে তবে ইসলাম কোন বাধা তো দেয়ই না বরং তাকে উৎসাহিত ও সহযোগিতার হাত প্রসারিত করার নির্দেশ দেয়।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যেসব নারী রসুল (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত হোক)-এঁর পাশাপাশি থেকে যুদ্ধ করেছেন, তারা তাবুসদৃশ বোরখা গায়ে দিয়ে যুদ্ধ করেন নি। বোরখা পড়ে ঘোড়ায় চড়া যায় না, তলোয়ার চালানো যায় না। অথচ ধর্মান্ধ গোষ্ঠী এখন নারীদের গায়ে বোরকা চাপিয়ে দিয়েছে, তাদের গৃহবন্দি করেছে। দুঃখের বিষয় – তথাকথিত প্রগতিশীলরাও ধর্মান্ধদের মুর্খতাকে অসার প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মকেই দোষারোপ করছেন। বোরখা পরিহিতা কিম্ভুতকিমাকার নারীমূর্তি দেখেই তারা ধরে নিয়েছেন কুরআন বুঝি নারীকে অথর্ব, জড়বুদ্ধি, অচল, বিড়ম্বিত করেই রাখতে চায়। অথচ ধর্মান্ধদের ইসলামের সাথে আল্লাহ্-রসুলের ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

একটি জাতির প্রায় অর্ধাংশই নারী। জাতির অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অচল করে রাখা, আর এক পায়ে হাঁটার চেষ্টা করা সমান কথা। নারী-পুরুষ একে-অন্যের শুধু পরিপূরকই নয়, উভয়ে মিলেই ভারসাম্য ও জীবসত্ত্বা রক্ষা করে চলছে সৃষ্টির প্রথমাবধি। আমরা সেই পরিপূরকের জায়গাটায় ভারসাম্য রক্ষা করছি না।  নারী-পুরুষ মিলে যে পূর্ণ আকাশ, তার অর্ধেক ঢাকা পড়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক পেশী জোরে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে নারীদের শোষণ ও বঞ্চনার যে ভয়াবহ চিত্র আমরা নিরন্তর দেখতে পাই, তা পরোক্ষভাবে পিছিয়ে দেয় পুরো সমাজকেই। আমাদের দেশে কন্যাভ্রুণ হত্যা, যৌতুক কিংবা পণজনিত কারণে গৃহবধূ হত্যার তালিকা ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে। আইন থাকলেও বাল্যবিবাহ হচ্ছে হরহামেশা। নারীদের প্রতি হিংসাত্মক আক্রমণের হারও কম নয়। ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, দৈহিক, মানসিক নির্যাতন, অপহরণ এখনও দৈনন্দিন ঘটনা।

বুদ্ধিমত্তার নিরীক্ষায় বহু পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে যে, যা পুরুষ পারে তা নারীও পারে। দায়িত্ব পেলে নারী যে তা পুরুষের সমান বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পারে, সে উদাহরণ আজ শত-সহস্র। অর্ধেক অন্ধকার আকাশ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হচ্ছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে দেশের     অগ্রগতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রগতিশীলতা, অগ্রসরমানতা ও অসাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে নারীমুক্তি সংগ্রামের সম্পর্ক দৈনন্দিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক। নারীশক্তির জাগরণে মহিমান্বিত হোক পৃথিবী।