ধাতু সুধায় লালন পাঠ – ২১

আপন ঘরের খবর লেনা

আপন ঘরের খবর লেনা

অনাসে দেখতে পাবি

কোনখানে সাঁইর বারামখানা।।

কমলকোঠা কারে বলি

কোন মোকাম তার কোথা গলি

কোন সময় পড়ে ফুলি

মধু খায় সে অলিজনা।।

সূক্ষ্মজ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য সাধকের উপলক্ষ অপরূপ

তাহার বৃক্ষ দেখলে চোখের পাপ থাকেনা।।

শুক্লনদীর সুখ সরোবর তিলে তিলে হয় গো সাঁতার লালন কয় কীর্তিকর্মার কী কারখানা।।

‘আপন ঘরের খবর লেনা অনাসে দেখতে পাবি  কোনখানে সাঁইর বারামখানা।  জীবদেহে নিত্যানন্দ বা আরামসত্তার নির্ব্যাপার আরতি চলছে; তার সন্ধান পেতে গেলে জীবকে উপর থেকে গভীর তলদেশে নেমে আত্মঅবগাহন করতে হয়; তবেই জগৎস্বামীর স্বতঃস্ফূর্ত বিরতিমূলক অবস্থান (বারামখানা) দেখা সম্ভব। কমলকোঠা কারে বলি  কোন মোকাম তার কোথা গলি কোন সময় পড়ে ফুলি  মধু খায় সে অলিজনা।

এখানে ‘কমল’ শব্দটির সবিস্তার আলোচনা জরুরি। কম ধাতুযোগে কমল নিষ্পন্ন; এর অর্থ স্পৃহা, অভিলাষ। জীব/অজীব নির্বিশেষে প্রত্যেক সত্তার মধ্যে বিরাজিত স্পৃহা (spirit) যে স্থান-কাল থেকে তৈরি হয়েছে তা-ই কমল বা কমলযোনি অর্থাৎ কমল যার উৎপত্তিস্থানরূপে আছে সেই ব্রহ্ম (সহজ মানুষ) সত্তা। কমলের আরেক অর্থ পদ্ম; যা লক্ষ্মীর বাহনরূপে পরিচিত। লক্ষ্মীর মধ্যে লক্ষ আছে যার অর্থ দেখা; তবে লক্ষ্মী যাকে তাকে দেখেন না নীতিমানকে দেখেন। মহাজগতের সমস্ত মান যে সত্তার মাধ্যমে নীত বা আনীত হয় তিনিই নীতিমান। নীতির ইংরেজি প্রতিরূপ Principle যেটা আসলে prime ও cap শব্দযোগে গঠিত। প্রধানকে (prime) আয়ত্ত (capture) করে যা তা-ই principle. সোজা কথায় মহাজগতের প্রকৃষ্ট ধারণ যে সত্তায় তাই  principle. . Principle -এর prince কে যে পালন করে তার নাম principal. এই যে কমল উদ্ধার করতে গিয়ে পদ্ম-লক্ষ্মী হয়ে নীতির  দিকে যাত্রা তা অনেকটা কেঁচো খুঁড়তে সাপের মতো। তো এই স্পৃহা, অভিলাষের কুঠির (কমলকোঠা) দরজা দেহস্থ মূলাধার নাড়িচক্রে অবস্থিত। তন্ত্রে দেহের সুষুম্নানাড়ী মধ্যস্থ পদ্মাকৃতি ষটসংখ্যক চক্রের ১ম চক্রের নাম মূলাধার। চক্রগুলো পদ্মনামধারী। মানবদেহে পুরুষ-প্রকৃতির সহাবস্থান। পুরুষ-প্রকৃতির সম্ভোগ বা রতিবন্ধন পদ্ম নামে অভিহিত। মূলাধারে সুপ্তস্পৃহা (কুলকু-লিনী শক্তি) রতিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জাগ্রত করে সাধক বিভিন্ন পদ্মাকার চক্র ভেদ করে মস্তিষ্কের সহস্রারে ব্রহ্মরন্ধ্রে পরিচালনা করেন। এটাকে সাঁইজি কমলকোঠা কারে বলি/কোন মোকাম তার কোন গলি বলে বর্ণনা করেছেন।  ফুলি শব্দটি ফুল থেকে এসেছে। এর মানে বিকাশ। পূজার আচারিক অনুষ্ঠানে দেবতার প্রসাদ লাভের জন্য দেবপ্রতিমায় ও মাথায় ওপর থেকে ফুল দেওয়া হয় আবার গাজন উৎসবে শিব বা ব্রহ্মার প্রসাদলাভের জন্য শিবমূর্তির মাথায় ওপর থেকে ফুল দেওয়া হয় যা ফুলপড়া নামে পরিচিত। দাশরথি রায়ের পাঁচালিতে পাই পূজে চন্ডী পড়িল ফুল, চন্ডী আমার অনুকূল।  সাধকের সাধনশক্তির পূর্ণ বিকাশ সহস্রারের পরমব্রহ্মের অনুভূতি লাভের মধ্য দিয়ে। এই অনুভূতির আস্বাদনকে সাঁইজি ‘মধু’ বলে উল্লেখ করেছেন। মধু তৈরি হয়েছে মন্ ধাতু থেকে। ‘যখন সর্বত্র কামদেবকে মনে হয়’ সেই অবস্থার নাম মধু। কমলকোঠায় (বারামখানা) স্পৃহার বান ডাকলে মধুমাসের আগমন ঘটে। এই অমৃত (মধু) শুধু সাধকপুরুষই (অলি) পান করে যা লালন মধুভাষ্যে ‘কোন সময় পড়ে ফুলি/মধু খায় সে অলিজনা।’ ‘সূক্ষ্মজ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য  সাধকের উপলক্ষ অপরূপ তাহার বৃক্ষ  দেখলে চোখের পাপ থাকেনা।’  স্থূলবুদ্ধির অধিকারী অর্থাৎ মোহাচ্ছন্ন জীব খ- জ্ঞানের জন্য অখ-কে (এক) খন্ডিত (অনেক) করে দেখে। এ মহাজগতের বিচিত্র রূপ তো মূলত সেই একেরই অনেক মাত্রা মাত্র। একজন প্রকৃত সাধকের লক্ষণ হল তিনি সবকিছুকে ‘এক’-এর ভাবে উপলব্ধি করে থাকেন। এ ক্ষমতা তিনি অর্জন করেন সূক্ষ্ম জ্ঞানের মাধ্যমে। সূক্ষ্ম শব্দটি সূচ ধাতু দিয়ে তৈরি। যার অর্থ সূচনা। স্থূলের মধ্যে সূচ প্রবেশ করতে পারে না, তাই সেখানে সূচনা নেই। কিন্তু সূক্ষ্মে সূচ অনুপ্রবেশ করে জ্ঞানের সূচনা করে। এভাবে সাধক একতার মধ্যে দিয়ে আদিতে (মুখ্য) পৌঁছায়। উপরোক্ত বক্তব্যের লালন প্রতিধ্বনি ‘সূক্ষ্মজ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য/

সাধকের উপলক্ষ।’  একের ভাবে সাধক একককে ছেদ করে তার অপূর্ব নির্যাস (অপরূপ বৃক্ষ) টেনে নেয়। এটাই সাঁইজির বাণীতে অপরূপ তাহার বৃক্ষ। আর এই রসে টুইটুম্বুর সত্তাকে (মনের মানুষ) দর্শন করলে মনের মলিনতা, অজ্ঞানতা দূর হয়; যাকে সাধক লালন ‘দেখলে চোখের পাপ থাকে না’ বলেছেন। শুক্লনদীর সুখ সরোবর  তিলে তিলে হয় গো সাঁতার লালন কয় কীর্তিকর্মার  কী কারখানা।’ ‘শুক্ল’ শব্দটি শুক্র থেকে এসেছে যা জ্যোতি, দীপ্তি প্রকাশক। শ্বেত বীররসের (বীর্য) উর্দ্ধমুখী প্রবাহজনিত আনন্দ ‘শুক্লনদীর সুখ’। আভিধানিক অর্থে পদ্মের আকরকে সরোবর বলে তবে এখানে সাধকের বীররসের প্রবাহজনিত আনন্দে সহস্রার পদ্মে অবস্থানকে ‘শুক্লনদীর সুখ সরোবর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থায় সাধক সূক্ষ্মমাত্রায় উত্তীর্ণ হয়ে সহস্রারের জ্যোতির্বলয়ে ভেসে বেড়ায় যার সাঁইজীয় ভাষ্য‘তিলে তিলে হয় গো সাঁতার’  সাদামাটা অর্থে কীর্তির অর্থ বিস্তার, দীপ্তি। তন্ত্রে কীর্তি মাতৃকা দেবী বা ব্রহ্মের শক্তিবিশেষ। নিরাকার ব্রহ্মার (পরম পুরুষ) বিভিন্ন মাত্রা বা আকারে মহাজাগতিক বিস্তারকে লালন ‘কীর্তিকর্মার কী কারখানা’ বলে পদস্থ      করেছেন। (চলবে)