ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ২৫

মিলন হবে কতদিনে

মিলন হবে কতদিনে আমার মনের

মানুষের সনে ॥

চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালোশশী হব বলে চরণদাসী ও তা হয় না কপালগুণে ॥

মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন লুকালে না পায় অন্বেষণ কালারে হারায়ে তেমন

ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে ॥

ঐ রূপ যখন স্মরণ হয় থাকে না লোকলজ্জার ভয় লালন ফকির ভেবে বলে সদাই

ও প্রেম যে করে সেই জানে॥

‘মিলন হবে কতদিনে আমার মনের মানুষের সনে।’ প্রত্যেকের অহম বা আমি (ইগো) যেখানে রয় তাকে আমার বলা হয়। এই মায়াবৃত আমির মান হীন বা কম; তাই এই আমির জ্ঞান অনুমানভিত্তিক। এই আনুমানিক আমি মনের মানুষ অর্থাৎ পরম আমি বা প্রামাণিক আমির সঙ্গে জ্ঞানালোকের সাহায্যে সংযুক্ত হতে চায় যা সাঁইজির ভাষ্যে ‘মিলন হবে কতদিনে/আমার মনের মানুষের সনে।’ ‘চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী হব বলে চরণদাসী ও তা হয় না কপালগুণে।’  এখানে চাতক ও প্রায় শব্দের মর্মার্থ বুঝে নিতে হবে। মেঘজল প্রার্থনাকারী হল চাতক এবং নাওয়াখাওয়া ইত্যাদি প্রতিদিনের কাজ ত্যাগ করার নাম প্রায়। অর্থাৎ ভোজন পরিত্যাগ করে রাতদিন বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করাকে ‘চাতক প্রায় অহর্নিশি’বলা হয়েছে। আর এই অনশনব্রত পালন করা হচ্ছে কালোশশীর জন্য। কৃষ্ণচন্দ্রই হল কালোশশী; যিনি চন্দ্রের মতো আনন্দকর। কৃষ্ণ শব্দের মধ্যে কৃষ ধাতু আছে যার অর্থ ‘যিনি প্রলয়ে বিশ্ব আপনাতে আকর্ষণ করেন।’ চাতকের মতো জীবসত্তার সেই পরমপুরুষের আকর্ষণে আকৃষ্ট হবার মানসিকতাকেই সাঁইজি চেয়ে আছে কালোশশী’ – বলেছেন।  দাসের মধ্যে দান, অর্পণ বা আত্মনিবেদন জড়িত। সবিনয় নিবেদনে পরমের চরণ বা গতির মধ্যে বিলীন হওয়াকে ‘হব বলে চরণদাসী’রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তা সম্ভব হচ্ছে না কপালগুণে। কপাল শব্দটিতে ‘ক’ ও ‘পাল’ বিদ্যমান। ক মানে ব্রহ্ম (মনের মানুষ) পাল মানে (পালন) অর্থাৎ ব্রহ্ম যেখানে পালিত হয় তার নাম কপাল। প্রতীকী অর্থে যা শিরোরক্ষক হিসেবে অভিহিত। উল্লেখ্য শিরই জ্ঞানের আধার; যেখানে ব্রহ্মজ্ঞান পালিত ও পুষ্ট হয়। অপর দিকে বন্ধন বা বাঁধনকে গুণ বলে। তা হলে জীব বা রাধাসত্তা পরম বা কৃষ্ণসত্তার সঙ্গে ঐক্য গড়তে চাইলেও ব্রহ্মজ্ঞান বন্ধনযুক্ত থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থাকেই লালন ও তা হয় না কপালগুণে’বলেছেন। ‘মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন  লুকালে না পায় অন্বেষণ কালারে হারায়ে তেমন  ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।’  মেঘের ইচ্ছা জল, জলের ইচ্ছা বিদ্যুৎ। এই এষণা বা ইচ্ছাগুলো মেঘ-জল-বিদ্যুতে একাকার থাকে। ইচ্ছাগুলো প্রকাশিত না হয়ে গুপ্ত থাকলে অন্বেষণ বা সন্ধান পাওয়া যায় না। এর প্রতিফলন নিজের দুই চরণে প্রতিফলিত মেঘের বিদ্যুৎ মেঘেই যেমন/লুকালে না পায় অন্বেষণ।’ কৃষ্ণরূপী মহাকাল সত্তাই হল কালা। এই দেহেই জীব ও পরম জুটি মেঘ-বিদ্যুৎ জুটির মতো মিলেমিশে আছে। বিদ্যুৎরূপী পরম মাঝে মাঝে ঝিলিক দিলেও ব্রহ্মজ্ঞান লব্ধ না হওয়ার কারণে সেই পরমপুরুষ বা মহাকাল ‘কালা’ অদৃশ্যমান থেকে যায় যার সাঁইজীয় ভাষ্য ‘কালারে হারায়ে তেমন।’ তা সত্ত্বেও সেই শ্রীকৃষ্ণের রূপ এই দেহের আদর্শে বা আরশিতেই দেখা যায় যাকে লালন বলেছেন ঐ রূপ হেরি এ দর্পণে।’ ‘ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়  থাকে না লোকলজ্জার ভয় লালন ফকির ভেবে বলে সদাই  ও প্রেম যে করে সেই জানে।’  জীব যখন সেই পরমরূপ ভজন বা ভাজক করে নিজেই পরমের অংশী হয় তখন নির্বিকার পরমাত্মিক চেতনার দর্শন থেকে উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা যাকে ‘লজ্জা’ বলা হয়েছে তা দূর হয়, পরম আকর্ষণীয় সত্তাকে (কৃষ্ণ) প্রিয় বা পতিরূপে বরণ করলে যে অনুরাগের সূচনা হয় সেই অনুরাগই জীবকে (রাধা) পরমের যানে উঠিয়ে দেয়। এই অনুরাগী পরমপুরুষ সম্পর্কে অবগত হয়।

লালন ফকিরের আত্মজ্ঞানের নিত্য অনুসন্ধানী দৃষ্টি তাই বলে। যার লালন সুভাষণ ‘লালন ফকির ভেবে বলে সদাই/ও প্রেম করে সেই জানে।’ (সমাপ্ত)