ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ২২

ধন্য ধন্য বলি তারে

ধন্য ধন্য বলি তারে  বেঁধেছে এমন ঘর শূন্যের উপর পোস্তা করে।।   ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি, খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি কিসে ঘর রবে খাড়ি ঝড়-তুফান এলে পরে।।

ঘরের মূলাধার কুঠুরি নয়টা তার উপর চিলেকোঠা তাহে এক পাগলা ব্যাটা বসে একা একেশ্বরে।।

ঘরের উপর নিচে সারি সারি সাড়ে নয় দরজা তারি লালন কয় যেতে পারি কোন দরজা খুলে ঘরে।।

‘ধন্য ধন্য বলি তারে বেঁধেছে এমন ঘর  শূন্যের উপর পোস্তা করে।’  এই পদাবলীর মাধ্যমে সাঁইজি মানবদেহের তাত্ত্বিক ও তাথ্যিক বর্ণনা তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। এই মানবঘরে পার্থিব ও আধ্যাত্মিক ধন প্রভূত পরিমাণে যুক্ত আছে এই জন্য সাঁইজি‘ধন্য ধন্য বলি তারে’বলে গেয়ে উঠেছেন। এই ঘর তত্ত্ব বা বস্তুস্বরূপে নির্মিত যা আসলে শূন্যের সমার্থক। ভাব ও রূপের এমন অপূর্ব সমন্বয় জগতের অন্য কোন ঘরে নেই। কাশ বা জ্যোতিসত্তায় তৈরি এই ঘরে অফুরন্ত অবকাশ যার নিকাশ বের করা অসম্ভব। পরমজ্ঞান ভিত্তিক (শূন্য) এই গৃহনির্মাণ প্রকল্প অকল্পনীয়রূপে সংহত (পোস্তা)। যা লালনভাষ্যে‘শূন্যের উপর পোস্তা করে’ পদশৈলীতে উঠে এসেছে। ‘ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি  খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি কিসে ঘর রবে খাড়ি  ঝড়-তুফান এলে পরে।’  ঘরের প্রধান অবলম্বন একক (অখণ্ড) পরমচেতনা। কণ্ঠের উপর দ্বিদল বা তার উপরে সহস্রারে পরমচেতনলোক। এই চেতনার উৎস লিঙ্গমূল বা মূলাধার। এখানে কুণ্ডলিনী শক্তির নিবাসভূমি (মাটি), এটি ঐ পরমগুরুর শ্রীক্ষেত্র। আসক্ত জীবের মূলাধারে সেই ক্ষেত্র বা মাটির অভাব থাকে; ক্ষেত্র ধাতুগত অর্থে ঐশ্বর্য, উৎপত্তিসূচক ও জাগরণমূলক। বীজের অঙ্কুরোদ্গম এখানে সম্পন্ন হয়। কুণ্ডলিনী ঘুমিয়ে থাকলে ইন্দ্রিয় বাজার সরগরম হয়; কাম-ক্রোধ তীব্র বেগে বইতে থাকে। এতে সৃষ্টি হয় জীবের টাল-মাটাল অবস্থা। তা হলে দেখা যাচ্ছে পরমের একক চেতনার (খুঁটি) বীজ জীবের মূলাধারের ক্ষেত্র থেকে প্রস্ফুটিত না হওয়ায় জীব মায়ামোহ ঝটিকায় পড়ে বিপর্যস্ত হয়; যার সাঁইজীয় বাকপ্রতিফলন ‘ঘরে সবে মাত্র একটি খুঁটি/খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি/কিসে ঘর রবে খাড়ি/ঝড়-তুফান এলে পরে।’ ‘ঘরের মূলাধার কুঠুরি নয়টা  তার উপর চিলেকোঠা তাহে এক পাগলা ব্যাটা  বসে একা একেশ্বরে।’  ঘরের প্রধান কক্ষগুলো নয়টি; যাকে নবদ্বার বলা হয়। কানের ২টি, নাসিকার ২টি, চক্ষুর ২টি, মুখের ১টি, মলদ্বারে ১টি, লিঙ্গ/যোনিদ্বার ১টি। কপালের নীচ থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত নবদ্বারের বিস্তার। এই নয়টি ছাড়াও কপালের শীর্ষভাগে অবস্থিত মস্তিষ্কও একটি কক্ষ যেটি ঐ প্রধানগুলোরও প্রধান; যাকে সাঁইজি চিলেকোঠা বলেছেন। ঘরের এই শীর্ষে-থাকা-কামরায় (মস্তিষ্ক) এক সংক্ষিপ্ত (পাগলা), সূক্ষ্ম পরমপুরুষ (পাগলা ব্যাটা) একক কর্তৃত্ব বা সার্বভৌমত্ব নিয়ে অবস্থান করছে। লালনশ্লোকে যা ‘তাহে এক পাগলা ব্যাটা/বসে একা একেশ্বরে’ রূপে বর্ণিত। ‘ঘরের উপর নাচে সারি সারি  সাড়ে নয় দরজা তারি লালন কয় যেতে পারি  কোন দরজা খুলে ঘরে।’  ঘরের উত্তর ও দক্ষিণ দিকে উচ্চ-নিম্নক্রমে সারণি আকারে দরজাগুলো সজ্জিত আছে। এর আগের অন্তরায় নয় দরজার উল্লেখ রয়েছে; এখানে সাড়ে নয়। সাড়ে শব্দটি সার্ধ থেকে এসেছে। অর্ধের সহিত যা তা-ই সার্ধ। আবার অর্ধের মধ্যে আছে ঋধ্ যার অর্থ বৃদ্ধি। অর্থাৎ নয়কে সমুদয়রূপে বৃদ্ধি করে যা তার নাম সাড়ে নয়। আগে যে নয় দরজার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর নিয়ন্ত্রক অবস্থান করছে আড়ালে যার নাম মন। এই মনকে অনেকে দশম দ্বার বলে থাকে যা রসিক সাঁইজির পদে সাড়ে নয় হিসাবে পদস্থ। এই মন আসলে পরম মন; যার

অবস্থান মস্তিষ্কের সহস্রপদ্মে। সাধক মূলাধারের সর্পিল শক্তিকে সুষুম্নার ভিতর দিয়ে উর্দ্ধগামী করে সহস্রারে নিয়ে গিয়ে পরম মনের সঙ্গে মিলিত করেন আর তখনই রুদ্ধ দরজা খুলে যায়। যা সাধক লালনভাষায়‘লালন কয় যেতে পারি/কোন দরজা খুলে ঘরে।’ (চলবে)

নিজের কথা ৫২

শাহ্ মো. লিয়াকত আলী ॥ ‘যেখানে আল্লাহ থাকেন সেখানে শয়তান থাকে’, এ কথাটি বলেন সূফী সাধক আনোয়ারুল হক। অমৃত কথাটি তাঁদের জন্য মহামূল্যবান যাঁরা আল্লাহওয়ালা হতে চান। আল্লাহর আদেশ নিষেধ উপদেশ অনুস্মরণ পূর্বক নিরহংকার জীবন যাপন করেন আল্লাহওয়ালাগণ। আর শয়তানগণ নিজেদেরকে অন্যদের চেয়ে উত্তম বিবেচনা করে। তাই তারা সর্বদাই অহংকারী তথা হামবড়াই ভাবনিয়ে জীবন যাপন করে । তাই আল্লাহওয়ালাদের জীবন চলার পথ আর শয়তানের জীবন চলার পথ সম্পূর্ন ভিন্ন ও বিপরীত। আর অধিকাংশ সাধারণ মানুষ অজ্ঞতার কারনে কখনও আল্লাহওয়ালার আবার কখনও কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের অনুস্মরণ করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের ত্রুটিপূর্ণ আচরণের কারনে তাদের জীবন যাপন পদ্ধতিও অনেকটা দ্বিচারিতাপূর্ণ। শয়তান সন্দেহপ্রবণ, সংকীর্ণ পরচর্চাকারী ঈর্ষাকাতর ও অহংকারী। তাই তারা অন্যদের মঙ্গলময় জীবন যাপন সহ্য করতে পারে না। তারাজীবন চলার পথে কখনও মনে মুখে এক থাকতে পারে না। তাই শয়তান সর্বদাই সাধারণ মানুষকে কুমন্ত্রনা দিয়ে পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্তিতে রাখার জন্য মুনাফেকি তথা দ্বিচারী চরিত্রের আচরণ করা পছন্দ করে।

সত্যদর্শী সূফী সাধকগন আল্লাহর সুপথে জীবন যাপনের ক্ষেত্রে অনুসারীদের সজাগ থাকতে একদিকে বলেন,  ‘সুজন কুজন আপনজন এই নিয়ে হয় জীবন যাপন’। অন্যদিকে শয়তানের কুমন্ত্রনা থেকে মুক্ত থাকতে সাবধান করেন এভাবে, ‘সাবধান হাসতে খেলতে চলতে আর বলতে ঈমান চলে যেতে পারে!’

শয়তানের চক্রান্ত আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে না থাকলে যে কেউ আল্লাহওয়ালা হতে পারত। আল্লাহওয়ালা হতে সাধকদের সাধনার প্রয়োজন হতো না। তাই বলা যায় সাধনা জগতের পথচলায় সাধকগণের আল্লাহওয়ালা হবার নেপথ্যে শয়তানের শয়তানী ভূমিকা পালন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। শয়তানী চক্রান্ত জয় করার মাধ্যমে সাধকগণের একদিকে যেমন জ্ঞান অর্জনের পথ প্রসারিত হতে থাকে। অন্যদিকে সাধনার সাফল্যের পরিণতি হিসেবে সাধকেরা জ্ঞানের পরিমন্ডলে বিচরণ করে আলোকিত ভুবনের আনন্দময় জীবনের সন্ধান লাভ করে থাকেন।

তাই বাস্তবে দেখা যায় সাধারণ মানুষ চতুরতার আশ্রয় নিয়ে তাদের কর্মক্ষেত্রের সৃষ্ট জটিলতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পছন্দ করে এবং নিজেরাই নিজেদের জ্ঞান অর্জনের পথ রুদ্ধ করে নিজেদের আলোকিত আনন্দময় জীবনের পথচলা থেকে বঞ্চিত করে। ফলে তারা পরমুখাপেক্ষী হয়ে ভিখারির জীবন যাপন করে। আর কর্ম ক্ষেত্রে অজ্ঞতার অন্ধকারে ডুবে থেকে দারুন কষ্টের মাঝে ধুঁকে ধুঁকে মরে।

সাধনা জগতের সাধনশক্তি বলে সাধকগণ নিজেদের শয়তানী কর্মকান্ড থেকে নিয়ন্ত্রিত রেখে মহান মৃত্যুঞ্জয়ী জীবন যাপনের কর্মক্ষমতা লাভ করে থাকেন। ফলে কুজন শয়তান সুজন সাধকদের সাথী হয়ে সাধকদের নিয়ন্ত্রিত আজ্ঞাবহ শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং সাধকগনের কর্মকন্ড পরিচালনা করার উপযোগী পরিবেশ গড়ার ক্ষেত্রে নিজেদের নিয়োজিত করে। (চলবে)