ধাতুসুধায় লালনপাঠ – ১২

এই ধারাবাহিক রচনায় প্রথমবারের মতো ইটিমোলজি’র (শব্দের বুৎপত্তি নির্ণায়ক শাস্ত্র) নিরিখে লালন সাইজি’র পদাবলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পদাবলির প্রতিটি চরণ শব্দমূল অর্থাৎ ধাতুভিত্তিক দর্শনে বর্ণিত; তাই এটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ধাতুসুধায় লালনপাঠ’। গোটা ভাব বা বস্তুকে যা দিয়ে ধরে রাখা যায় সেটাই তার মূল বা ধাতু। দেহ নানা প্রকার প্রাণরস ধারণ করে টিকে থাকে; সেগুলোই দেহের ধাতু। ঠিক তেমনি শব্দ একটি ভাব বা চেতনার কাঠামো যা ধাতুকে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে। শব্দের গোটা ছবি দেখতে হলে ধাতুবিচার খুবই জরুরি।

॥ তারিফ হোসেন ॥

সকল কর্মের প্রারম্ভেই তুমি তোমার আল্লাহ্কে অবশ্যই স্মরণ করিও।

আমিত্বের আবরণ দূর করার প্রচেষ্টার অপর নাম ইবাদত।

তোমার আল্লাহ্ হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করার মধ্যেই রয়েছে সার্বিক শান্তি।

বাড়ির কাছে আরশি নগর বাড়ির কাছে আরশি নগর সেথায় এক পড়শী বসত করে

আমি একদিনও না দেখিলাম তারে ॥

গেরাম বেড়ে অগাধ পানি নাই কিনারা নাই তরণী পারে বাঞ্ছা করি দেখব তারে

আমি কেমনে সেথা যাইরে ॥

বলব কী সেই পড়শীর কথা হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর

ক্ষণেক ভাসে নীরে ॥

পড়শী যদি আমায় ছুঁতো যমযাতনা সকল যেত দূরে সে আর লালন একখানে রয়

লক্ষ যোজন ফাঁকরে ॥

‘বাড়ির কাছে আরশি নগর  সেথায় এক পড়শী বসত করে আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’  এই নগর যেনতেন নগর নয়; খোদ আরশি নগর অর্থাৎ আদর্শ নগর। আরশি শব্দটি দর্শনসূচক। সাধারণভাবে আরশিতে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর ছবি দেখা যায়। সাধারণ জীব অনেক কিছু দেখে কিন্তু পরমদর্শনযোগ্য শিষ্ট-রসিক-পুরী অর্থাৎ আরশি নগরকে দেখে না। সাঁইজি আরশিগ্রাম না ব’লে তাকে যে নগর বলেছেন তা অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ শব্দচয়ন। গ্রাম্য শব্দটি মূর্খ, অরসিক, অশিষ্ট, অসভ্য ইত্যাদি অর্থে প্রচলিত। গ্রাম্য থেকে গোঁয়ার, গেঁয়ো, গাঁইয়া ইত্যাদি শব্দমালার সৃষ্টি। মানুষের গোবিন্দরূপী দেবসত্তা যখন পশুসুলভ আচরণে মাতে তখন তাকে আমরা গোঁয়ারগোবিন্দ বলে থাকি। যা হোক দর্শনীয় পুরবাসী (মনের মানুষ) আমার পড়শী বা প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও সে অদৃশ্যই থেকে যায়। এখানে প্রতিবেশীকে একটু বেশি করে দেখলে বেশ হয়। ‘বিশ’ ধাতুযোগে শব্দটি তৈরি। আবেশ, প্রবেশ, নিবেশ ইত্যাদি শব্দরাজি এই ধাতুর জ্ঞাতিগুষ্টি। দুটো বস্তুর একটি অপরটির বিপরীতে যে বেশ (গৃহ) বা বাস (অবস্থান) তাই প্রতিবেশ অর্থাৎ প্রতিবাস। তা হলে মুখোমুখি অবস্থান করেও নিমেষের তরে কামিনী-কাঞ্চন আসক্ত জীব তার নিকটের আবেশে আবিষ্ট বা প্রবিষ্ট হতে পারে না, দেখা পায় না দ্রষ্টব্য শহরতলীর। এই ভাষ্যের লালন-রূপায়ন ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর/সেথায় এক পড়শী বসত করে/আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’   ‘গেরাম বেড়ে অগাধ পানি  নাই কিনারা নাই তরণী পারে বাঞ্ছা করি দেখব তারে  আমি কেমনে সেথা যাইরে।গ্রাম (গেরাম) শব্দটি নিয়ে আরও কিছুটা বিশ্লেষণ করা যাক। গম ধাতু থেকে গ্রাম নিষ্পন্ন। তাই লোকজনের গমনীয় অর্থাৎ যাতায়াতযোগ্য স্থান গ্রাম নামে অভিহিত। গ্রামে অনেক লোকের বাস এই হেতু গ্রাম শব্দটি সমূহ বা সমষ্টিবাচক অর্থেও ব্যবহৃত হয়; যেমন স্বরগ্রাম। পদাবলীর এই অংশে নগর ও গ্রামের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে অতল জলরাশির জন্য। আসলে মূঢ় জীবের ইন্দ্রিয়পরায়ণতার বিস্তার ঘটায় সহজ মানুষের সঙ্গে জীবের বিস্তর ফারাক রচিত হয়েছে; সহজমানুষে জীব অগম্য থেকে যাচ্ছে। কারণ এই কামসাগর উতরে যাবার কোন যান (তরণী) সেখানে নেই। যদিও উত্তীর্ণ হবার আকাঙ্খা (বাঞ্ছা) জীব পোষণ করে। ‘বলব কী সেই পড়শীর কথা  হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর ক্ষণেক ভাসে নীরে।’  দেহঘরের মধ্যেই যে পরমের উপনিবেশ সেই পরিবেশ বস্তুত বেশহীন, আকারহীন। হাত-পা-মাথা বিশিষ্ট অবয়ব সেখানে অনুপস্থিত। এই অবেশী প্রতিবেশী স্বরূপত এতই ঊন, হীন যে তা শূন্য শব্দব্রহ্মরূপী। এই আকাশসত্তার কখনও রিক্তভাব (শূন্য) কখনও সিক্তভাব (নীর)। শূন্যস্বরূপা আদিদেব তথা ধর্মের রসাস্বাদনের সেচনে তা সময়সময় ভেসে বেড়ায়। এটাই সাঁইজির বর্ণনায় ‘ক্ষণেক ভাসে শূন্যের উপর/ক্ষণেক ভাসে নীরে”রূপে বর্ণিত।   ‘পড়শী যদি আমায় ছুঁতো  যমযাতনা সকল যেত দূরে সে আর লালন একখানে রয়  লক্ষ যোজন ফাঁকরে।’

জীবসত্তা যম বা যমজ অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে যন্ত্রণা ভোগ করে। প্রতিবেশী যদি তার নিবাসে জীবের আবাসন প্রকল্প গড়ে দিত তবে সমস্ত দূরত্ব ঘুচে গিয়ে দুর্দশার অবসান হত। প্রকৃত ঘটনা হল দুই প্রতিবেশীর একটি ছদ্মবেশী। জীব মোহের ছাদনে আচ্ছাদিত; এর বেশ থেকে ছাদ (আবরণ) সরে না গেলে পরম প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগ তথা অবস্থান যেটাকে যোজন বলা হয় তাতে লক্ষণীয় বা লক্ষমাত্রায় ফাঁক থেকে যায় যদিও তা অভেদাত্মক। এই অবস্থা লালন পদাবলীতে মূর্ত হয়ে ওঠে ‘সে আর লালন একখানে রয়/লক্ষ যোজন ফাঁকরে।’ (চলবে)