তথাকথিত জিহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ

সংলাপ ॥ কোন রাষ্ট্রই এখন দার-উল হরব বা ধর্মযুদ্ধের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ নয়। সবদেশেই এখন সমবেত ধর্ম র্চচা ও চর্যা হয়। বিশ্বে মুসলমানদের আত্মপরিচয়েও সঙ্কট নেই। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পরের সঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য-মক্কার ইমাম, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুফতি এবং ভারতীয় উলামারা ফতোয়া জারি করে এই মর্মে যে ভারতবর্ষ ধর্মযুদ্ধের দেশ নয়। ওই ফতোয়া জানিয়ে দেয়া হয়েছিল মুসলিম উম্মাকে। ভারতবর্ষ ভাগের পর সাময়িক বিভিন্ন সংশয় তৈরি হলেও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ আবহ প্রতিটি জনগোষ্ঠির সর্বমুখী নিরাপত্তাকে ক্রমাগত মজবুত করেছে। বাণিজ্যে, সংস্কৃতিতে, রাজনীতিতে সবার অবাধ অংশগ্রহণ সব রাষ্ট্রে স্বীকৃত। আরেক অর্থে, ইন্দোনেশিয়া কিংবা পাকিস্তানের জনসংখ্যার তুলনায় বর্তমান ভারতই বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত, যেখানে রাষ্ট্র এবং সংবিধান তাদের প্রতিটি অধিকারকে গণ্য করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষারোহণের দরজাকেও উন্মুক্ত রেখে। দূরের কিংবা কাছের মুসলমান দেশ যা পারেনি, ভারত তা পেরেছে অনায়াসে, নিঃসংশয়ে। ভারতের পথ নৃশংস, নৈরাজ্যের উপাসকদের  সামনে অনুকরণযোগ্য না-ও হতে পারে-কিন্তু সত্যের রাস্তা বলে যে মহাআদর্শ বাতলে দিয়েছেন উপমহাদেশের সূফিরা, যে সড়ক বেয়ে হাঁটতে চেয়েছিলেন সাধককূল, যে প্রজ্ঞা আর বাস্তবতার

মিলনে গড়ে উঠেছে ভারতে বহুমাত্রিক সমাজের ভিত আর নিবিড় বন্ধন, তথাকথিত হিন্দুত্ব ও ‘জেহাদিদের’ অস্ত্র ও কৌশলে আক্রান্ত আজ তার অস্তিত্ব।

তথাকথিত হিন্দুত্ব বা জেহাদির কোনও দেশ নেই, সীমা নেই। বর্বর হলেও তারা আন্তর্জাতিক। সর্বদলীয়  বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা অনেকবার বলেছেন, সন্ত্রাস নিয়ে রাজনীতি নয়। অপরদিকে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে অবরুদ্ধ এবং সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে লালন করে পাকিস্তান প্রায় দুই দশক ধরে পুষে নিজের এবং উপমহাদেশের বিপদ খাড়া করে রেখেছে। তাদের বিদেশমন্ত্রীও বলেছেন, সন্ত্রাস নিয়ে রাজনীতি বন্ধ হওয়া দরকার। সীমানার ভেতরে কিংবা বাইরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রাষ্ট্র গঠনই যেমন সন্ত্রাসবাদীদের লক্ষ্য, তেমনই তাদের যে কোনও হামলার পর লাশ এবং মুমূর্ষুকে সামনে রেখে ভোটের পীড়াদায়ক হিসেব-নিকেশও অব্যাহত।

উপমহাদেশের সংবাদমাধ্যম রাজনীতির এ সব নোংরামির প্রতিবাদ করছে। সব রাষ্ট্রে ক্ষুব্ধ জনমতও প্রবল হয়ে উঠছে। সঙ্ঘবদ্ধ এবং বহু নামে পরিচিত জঙ্গিদের কারা প্ররোচিত করছে, কারা অস্ত্র যোগাচ্ছে- তার তল স্পর্শ করা কঠিন। কিন্তু জালিমের লক্ষ্য খুবই পরিষ্কার। নিরীহ মানুষ তাদের প্রধান ও প্রথম লক্ষ্য। উন্মাদনা আর বিদ্বেষ ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ফাটল তৈরিও আরেক লক্ষ্য। তাই সব দেশে নিরস্ত্র জনশক্তির লড়াইও দ্বিমুখী। উন্মাদনার পূজারিদের বিরুদ্ধে, বিদ্বেষের  বিরুদ্ধে, তথাকথিত জিহাদিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জিহাদ অপরিহার্য। উপমহাদেশে বিদ্বেষ ছড়াতে চায়  বলেই তথাকথিত জিহাদিরা সমপ্রদায়- ঘেঁষা আরবী ও স্থানীয় ভাষায় নাম এবং ধর্মীয় ভাবাবেগকে প্রায় অবাধেই ব্যবহার করছে। মুহাম্মদী ইসলাম অবশ্য তাদের মুসলিম মানতে রাজি নয়। উপমহাদেশে যারা ধর্মবিশেষজ্ঞ এবং বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারা এ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ফতোয়া (ধর্মীয় উপদেশ) জারি করে বলেছেন, ইসলামে, ইসলামি সমাজে সন্ত্রাসের জায়গা নেই। সন্ত্রাসীরা ইসলামের প্রধান শত্রু।

উপমহাদেশের পন্ডিতরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেননি, সমপ্রতি ভারতের প্রতিটি শহরে গণসম্মেলনে জড়ো হয়ে জনমত গঠনে সরব হয়েছেন। পাকিস্তানও সরব হচ্ছে। উলামাদের সহ বাংলাদেশেও জনবলকে সঙ্ঘবদ্ধ করা দরকার। কিন্তু এই দায়িত্ব কে নেবে? যারা নিজেদের সচেতন মনে করেন, বুদ্ধিজীবী বলে সমাজে যাদের পদচারনা, যারা রাজনীতির ভেতরে আছেন, বাইরে আছেন, যারা সামান্য সঙ্কটে কিংবা শোকে হই হই করে শহীদ মিনারের দিকে বেরিয়ে পড়েন-তারা এত উদাসীন কেন? এ কীসের লক্ষণ? সংশয়, ভয়, না নৈঃশব্দের? গণতান্ত্রিক উপমহাদেশ বহু সঙ্কট দেখেছে। লড়তে লড়তে অতিক্রমও করেছে দুর্গম গিরি। দাঙ্গা, গণহত্যা বাঙালির বাংলাকে রুখতে পারেনি। জনশক্তির সরব কিংবা নীরব বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বাংলার মাটি স্বমহিমা অক্ষুন্ন রেখেছে। সন্ত্রাসকেও এই পথে রুখবে। তার চিরায়ত ঐতিহ্য, তার লোকায়ত সত্তা আর বহুমতের সুন্দরকে প্রতিটি মুহূর্তে যারা ভয় দেখাচ্ছে, তথাকথিত জিহাদের নামে কলঙ্কিত করছে ইসলাম ধর্মকে, রাজনীতি না চাইলেও আজ কিংবা কাল কিংবা পরশু যুবশক্তির সাথে ধর্মভীরু সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামবে, অবিলম্বে তথাকথিত জিহাদিদের বিরুদ্ধে শুরু হবে সত্যকারের এক জিহাদ। যাদের দেশ নেই, সীমা নেই, বিবেক নেই, আদর্শ নেই, আত্মীয় নেই, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না, আবর্জনা বানিয়ে ফেলে দেয় আস্তাকুড়ে দেয়।

সর্বনাশকে বিনাশ করেই হয় সভ্যতার উত্তরণ। এটাও ইতিহাসের শিক্ষা। পৃথিবী এখন উপদ্রুত অঞ্চল। দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের মোকাবিলা করেছে, কিন্তু গত তিন দশকে সন্ত্রাসের এমন বিশ্বায়ন এবং সংক্রমণ বিরল বলেই সব সংশয়, সন্দেহ, আঞ্চলিক বিরোধকে রুদ্ধ করে দুনিয়া জুড়ে বীভৎসের বিরুদ্ধে শুরু হতেই হবে সংহত যুদ্ধ-তথাকথিত জিহাদের বিরুদ্ধে জিহাদ।