জ্ঞানের প্রসারে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আবশ্যক সকল ভাস্কর্য মূর্তি নয়, সকল মূর্তিই ভাস্কর্য

সংলাপ ॥ ‘কোথা খোজ মুসলিম, শুধু বুনো জানোয়ার, যে বলে সে মুসলিম, জিভ ধরে টান তার, জগতে মুসলিম আজ পোষা জানোয়ার।’ সাধক কবি নজরুল যিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কবি তিনিই শতবর্ষ আগে একথাগুলি লিখেছিলেন। প্রশ্ন জাগে নজরুল কি কাফের হয়ে গিয়েছিলেন? তিনি কি মুসলিম বিরোধী শক্তির এজেন্ট হয়েছিলেন? না, তা নয়। তিনি সূফী সাধক। তিনি ছিলেন সত্যদ্রষ্টা। সততই শাশ্বত সত্যের সুর ঝরে পড়ত তাঁর অমর লেখনিতে। আর এজন্য অন্ধকারের শক্তি, সে সময়কার মোল্লা-মতলববাজ-ধর্মব্যবসায়ীরা তাঁকে কাফের ফতোয়া দিতে দ্বিধা করেনি। সাধক নজরুল কেন মুসলমানদের বুনো জানোয়ার আর পোষা জানোয়ার বলেছিলেন তা বুঝার জন্য একশ বছর পেছনে যাবার দরকার নেই, বর্তমান বাংলাদেশের মতলববাজ মোল্লাদের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। ভাস্কর্য আর মূর্তি নিয়ে ওদের কর্মকান্ড দেখলে সাধক নজরুলের বাণীর সত্যতা বুঝা যায়।

‘সকল ভাস্কর্য মূর্তি নয়, সকল মূর্তিই ভাস্কর্য।’

ভাস্কর্যকে পূজারির দ্বারা পবিত্রতার সাথে জাগ্রত মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে প্রাণ দান করে পূজা অর্চনা করলে মূর্তি হয়, এই কর্ম পদ্ধতি বিহনে কোনও ভাস্কর্যই মূর্তি হয় না। ইসলাম ধর্মে জাগ্রত মন্ত্র পাঠও নাই, পূজাও নাই, তাই কোনও ভাস্কর্যই ইসলাম ধর্মে মূর্তি নয়। মূর্তি বলে স্বীকৃতি ঐ ব্যক্তিই দিতে পারেন যিনি ভাস্কর্যকে সামনে রেখে পূজারি তার জাগ্রত মন্ত্র পাঠ করে পূজা অর্চনা করেন।

পূজা অর্থ পূর্ণ জাগরণ, পূজার মাধ্যমে কেহ নিজেকে পূর্ণ জাগরণ করে, কেহ ভাস্কর্যকে পূর্ণ জাগরণ ঘটায়,      পূর্ণ জাগরিত মূর্তিই পারে ভক্তের প্রার্থনা পূরণ করে    দিতে। যাহারা ভাস্কর্যকে মূর্তি বলেন তারা অবশ্যই পূজারি, পূজারি বিহনে কোনও ভাস্কর্যই মূর্তি হয় না। শিল্পীর দ্বারা মূর্তি গড়া হয় না, গড়া হয় ভাস্কর্য, পূজারি তাহারে মূর্তি হিসাবে গড়ে লয়। ভাস্কর্য প্রতিটি জাতির ঐতিহ্য ইতিহাস সভ্যতা সংস্কৃতি বহন করে যুগের সাক্ষ্য রাখে। জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে প্রতিটি জাতির সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করা অতি আবশ্যক।

ধর্ম বড্ড স্পর্শ কাতর, ছুঁইলে জাত চলে যায়, বললে আগুন জ্বলিয়া যায়। মোল্লা যা বলবে তাতে সম্মতি দিতেই হবে!! মোল্লা বলাৎকার ধর্ষণ করে না!!! এতিম বাচ্চাদের ধর্মের তালিম এভাবেই শিক্ষা-দীক্ষা দিয়া আলেম করে!! তাহারাও এইভাবে বহু কষ্ট করিয়া আলেম হইছে, মোল্লা হইয়াছে, তাহা তোমরা কখনও বুঝিবে না!!!

ভাস্কর্য দ্বারা বলাৎকার ধর্ষণ করানো সম্ভব না, ধর্মের তালিম দেয়াও সম্ভব নয়, ধর্মের মোল্লা, আলেম গড়া সম্ভব না, তাই ধর্মের মাঝে ভাস্কর্য হারাম। এক সময় ছবি তোলাও হারাম ছিল, এখন ছবি ছাড়া কিছুই হালাল করা যায় না। কিছু একটা হালাল করতে হইলে মোল্লাদের স্বার্থ থাকতে হবে। হাজার হাজার বছরের পৌরাণিক মূর্তির শিক্ষাটি মস্তিষ্কে লালিত্য করে আধুনিকতার ভাস্কর্য মস্তিষ্কে ঢুকবে না। বিশ্বকে পৌরাণিকতার মাঝে নিমজ্জিত করে রাখবার নাম মোল্লা কৌশল, ধর্মের কৌশল না। বিশ্ব যখন আঙ্গুলের ডগায়, ধর্ম তখনও পৌরাণিক কিতাবের পাতায় পাতায়, আমরা যে বেদাতের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত ধার্মিক! আধুনিকতা হারাম হলেও উপভোগ্যে পিছিয়ে নাই, শুধু পিছিয়ে আছি মোল্লার সিদ্ধান্তে!! ধর্মের পোষাকটি এক মহা আবিস্কার, ইহা দেখলেই মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে। এহেন ধর্মের দ্বারা বহু অবতার অপঘাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, আমরা তো কেবলি মানুষ। মূর্তি আর ভাষ্কর্য যে এক নয় তা কান্ডজ্ঞানহীন অপদার্থদের বুঝানো যায় না। হযরত সোলায়মান (আ.) জীনদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের মূর্তি, ভাস্কর্য, চৌবাচ্ছা তৈরী করিতেন যা কোরান পাকে বর্ণিত রয়েছে। কিন্তু হযরত মোহাম্মদ (যাঁর কৃপা আমাদের উপর বর্ষিত)-এঁর আমলে কাবাগৃহের ৩৬০টি মূর্তি অপসারন করা হয়েছিল, মক্কা মদীনায় তখন পৌত্তলিকতা ছেঁয়ে গেছিল। মোটকথা মুসলিমগণ পৌত্তলিকতার ঘোর বিরোধী ছিল, এখনও তাই। আমি হিন্দু ধর্মের ইসকনের গীতায় প্রথমেই দেখতে পাই তোমরা ঈশ্বর বা শ্রীকৃষ্ণের পূজা কর। দেব-দেবীর আরাধনা একদম নিষেধ করা হয়েছে।

পূজা বা আরাধনার উদ্দেশ্যে যে মন পরিকল্পিত মূর্তি তৈরী করে সেজদা বা মাথা নত করে ভক্তি দিল সে শিরক করল। শিরক মানে এক স্রষ্টার সাথে বা অখন্ড সত্ত্বার সঙ্গে খন্ডায়িত করে পূজা বা আরাধনা যে করল সে শিরক করল। শিরক ইসলাম ধর্মে একটি জঘন্য পাপ যা ক্ষমা অযোগ্য বলে ঘোষিত। কিন্তু কি সেই শিরক তার উচ্চমাকাম লাভকারী ব্যতীত কেউ ধরতে পারে না। বাংলাদেশ একটি ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ। এখানে সকল ধর্মের লোকের বসবাস এবং সংবিধানে উল্লেখ আছে সকলে সকল ধর্ম পালন করতে পারবে। কেউ কারো ধর্মে আঘাত হানবে না। ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করে চলতে হবে, কোন প্রকার সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই এখানে। সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষ সমঅধিকার পাবে। ধর্ম নিয়ে কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা চলবে না, ধর্মীয় উস্কানী দেয়া যাবে না। ভাস্কর্যের বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখার দরকার নেই। ভাস্কর্যকে কেহ ভগবান বা দেব-দেবী মনে করে পূজা দেয় না। এটি স্বীকৃত শিল্প মাধ্যম – শিল্পকলা। নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রকাশ। ইতিহাস বা অতীতের কোন বিষয় ঘটনা স্মৃতিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যূত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র গণঅভ্যূত্থানসহ ঐতিহাসিক দিন, ক্ষণ, তার সাথে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব বা নেতৃত্ব এর সম্মানিত ব্যক্তিকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। যেমন-ভাষা সৈনিকদের ভাস্কর্য, শহীদ আসাদের ভাস্কর্য, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। মোটকথা ভাস্কর্য আর মূর্তি কখনোই এক নয়। ভাস্কর্য একটি দেশের বিশেষ কোন গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্ত বা সময়কে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে প্রেজেন্ট করা, স্মরনীয় বা স্মৃতি হিসাবে রাখার জন্য নির্মিত শিল্পকর্ম।

বর্তমানে উগ্র ধর্মজীবী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ভাস্কর্য নিয়ে যে রাজনীতি করছেন বা তথাকথিত আন্দোলনে নামছেন তা সাধারণ মানুষকে, সাধারণ ধর্মভীরু বাঙালিকে বিভ্রান্ত করার একটি অপকৌশল মাত্র। ইতিপূর্বে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সামনে লালন সাঁইজির ভাস্কর্য নিয়ে ধর্মজীবী সম্প্রদায় রাস্তায় বিশৃঙ্খলা শুরু করলে তৎকালীন সরকার উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির কর্মকান্ডে ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধ করে দেয়। আরো নানাস্থানে এ নিয়ে বহু ঘটনার সূত্রপাত করেছে সেসব উগ্রগোষ্ঠী। সরকারের নতজানু মনোভাব আজ সরকারকেই যেন বিপদে ফেলতে চাইছে। কারণ এবার ধর্মজীবীর দল খোদ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে জঘণ্য কর্মকান্ড করে বেড়াচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের একাধিক মন্ত্রী নানান বিবৃতি দিয়ে চলেছেন কিন্তু তাতে ফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। বিশেষ করে ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সাধারণ সচেতন দেশপ্রেমিক জনগণ হতাশ।

ধর্মকে পুঁজি করে যারা রাজনীতি করে তাদেরকে কোনভাবেই সীমা অতিক্রম করতে দেয়া ঠিক হবে না। পূর্বের কৃত ভুল হতে সরকারি দল শিক্ষা নিয়ে থাকলে উগ্রধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। সারাবিশ্বে স্বীকৃত শিল্পকলা শিক্ষা ও সৌন্দর্যের মাধ্যম এই ভাস্কর্য শিল্প। এর বিরুদ্ধে ধর্মান্ধদের আস্ফালন বহু পুরনো।  বাংলার হিন্দু-বাংলার খ্রিস্টান-বাংলার বৌদ্ধ-বাংলার মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালি। বাঙালি চেতানার ধারক-বাহক বাঙালি জাতি স্বাধীন দেশে সংবিধান মেনে চলছে-চলবে। সাংবিধানিক আইনের উর্ধ্বে কিছু নেই। এদেশে যারা থাকবেন তারা অবশ্যই দেশের আইন মানবেন। ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষের – সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কৃষ্টি-সংস্কৃতি নির্ভয়ে – নির্বিগ্নে পালনের পরিবেশ তৈরি করার দায়িত্ব সরকারের। নয়তো সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার দায় সরকারের উপরই বর্তাবে। বিজয়ের মাস শুরু হয়েছে। ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে জাগ্রত হওয়ার সময় বহমান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর বাঙালির আস্থা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপশক্তি নির্মূলে তিনি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এটাই সচেতন দেশপ্রেমিক বাঙালির প্রত্যাশা।