জীবনে একটা ক্ষত থাকতেই হয় – ১

শাহ্ ফাতেমা আফরোজ নাসরিন ॥ জীবন মানে যুদ্ধ। জীবন মানে স্নায়ুযুদ্ধ। জীবন অনন্ত যাত্রাপথের একটা ষ্টেশন। জীবন মানে গতি। এই গতি তাক করে রাখতে হয় জীবনের লক্ষ্যপানে। লক্ষ্যকেন্দ্রিক জীবনে একটা ক্ষত থাকতেই হয়। এই ক্ষতই জীবনকে বৃহৎ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। জীবনকে গতিশীল করে রাখে। এই ক্ষত কখনো তাকে সীমালঙ্ঘন করতে দেয়না। ক্ষতটা শুকিয়ে গেলে আর বৃদ্ধি হয় না। ক্ষতটা শুকিয়ে গেলে যুদ্ধ ঝিমিয়ে পড়ে। ক্ষতটার সাথে আর একটা গতি প্রয়োজন, আর একটা অনুপ্রেরণার প্রয়োজন।

দ্বন্দের মধ্যে চলতে চলতে কখনও কখনও জীবনে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয়। কখনও হার্ডলাইনে যেতে হয় যখন আর কোন পথ খোলা থাকেনা, তখন একটাই পথ খোলা থাকে সেটাই হার্ডলাইন। সেটাই কঠিন পদক্ষেপ। হঠাৎ করেই সব ছাপিয়ে দ্বিচারিতা, বহুচারিতা এক এ রূপ নেয়। একটাই যখন প্রাধান্য পায় তখন আর কোন দ্বিধা দ্বন্দ থাকেনা। যখন কোন ভয় ডর থাকেনা, যখন আর কোন পথ থাকেনা তখনই আসে কঠিন সিদ্ধান্ত।

সারাজীবন ছাত্র থাকতে চান যিনি তাঁর পথটা কেমন? তিনি কি সারাজীবন ক্ষত নিয়েই চলেন? কোন শক্তিতে চলেন, কেমন করে চলেন?

মানুষের জীবনে কিছু ক্ষত  শুকায়না। ক্ষরণ হতেই থাকে। ক্ষত শুকিয়ে গেলে জীবন আর আগে বাড়েনা। ক্ষত রেখেই বৃদ্ধির কাজটি করতে হয়। ভাঙ্গা-চোরা অবস্থায় রেখেই আগাতে হয়। একেবারে ফাইন ফিনিসিং দিয়ে দিলে রাস্তা আর খোলা থাকে না। রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের কাজ কখনও শেষ হয় না। জীবন চলার পথের কাজ, একেকটা কাজ আপাতত শেষ হতে পারে কিন্তু সময়ে আবার তা ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে হয়। সাময়িক বিশ্রাম হতে পারে তবে ঝুলে ঝুলেই যেতে হয় সারাজীবন। এজন্যই হয়তো সাধনার জীবনে, মানে গুরুকেন্দ্রিক জীবনে কোন কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে দেয়া হয় না। একটা জায়গায় এনে থামিয়ে দেয়া হয়। আবার স্থান-কাল-পাত্র, বাস্তবতাভেদে যাত্রা শুরু করানো হয়। বিনির্মাণ করার সুযোগ দেয়া হয় অনুতে অনুতে। ভিতর ফাঁকা রেখে যে আগানো  তা বেশীদূর যেতে দেয়া হয় না। দেয়ালে পিঠ ঠেকতে দেয়া হয় না সাধারণত। ভিতর বিনির্মাণ করে স্থান পাত্র পরিবর্তন করে বা একটা দুইটা অবস্থা পরিবর্তন করে কখনও সামগ্রীকতার ভিত্তিতে আবার যাত্রা শুরু করানো হয়। কখনও একজনকে দিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান টেনে নেয়া হয়, সাময়িকভাবে ধরে রাখা হয়, কালক্ষেপন করা হয় সময়, সুযোগ ও বাস্তবতার জন্য। এক্সপেরিমেন্ট করেই চলেন, চালান, শিখান। সাময়িক স্বাধীনতা দেন, দেখেন আবার সময়মত হস্তক্ষেপ করেন। ভুল করার সুযোগ দেন, যেখানে গলদ আছে সেখানে ভুলের আঘাতে শিক্ষাটি পোক্ত করেন সে ভুল যেনো আর না হয়। পরিবেশ তৈরী করেন, ধাঁধার সৃষ্টি করেন। চোরকে চুরি করতে, গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলেন। পরীক্ষা করে, সুযোগ দিয়ে, ধাঁধার সৃষ্টি করে প্রত্যেকের জায়গাটা চিহ্নিত করেন, করান। এই খেলা চলতেই থাকে। এ এক মহাবিস্ময়কর, মহাবিজ্ঞানময়, সূক্ষèাতি সূক্ষè এক আর্ন্তজাল যা ধরতে হয় অত্যন্ত সচেতনভাবে।

অকালে পেকে গেলে সেই জিনিস আর সুন্দরভাবে পাকানো যায়না, কখনও আর ম্যাচিউরিটি আসেনা। বাস্তবতার কষাঘাতে যে পাকে তার মতো আর হয় না।  জীবনের প্রতিটি বাস্তবতায় চিরে চিরে চলা ব্যক্তি যেভাবে পোক্ত হয় আর কিছুতেই এমন পোক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিখতে হলে বাস্তবতার নিরিখে খোলা পথে চলতে হয়। সারাজীবন যিনি ছাত্র থাকতে চান তাঁর জীবনের কাজ কখনও শেষ হয় না। মানুষ তৈরী করার কারখানা কখনও রঙ চঙা চুনকাম করা যায় না। টিউনিং রিপেয়ারিং যেখানে চলে সেখানে নতুনের সাথে সাথে পুরাতনও চলে, চালানো হয়। কাউকেই ফেলে দেয়া হয় না। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। টাকা ঢেলে যে প্রতিষ্ঠান তৈরী করা হয়, বাহির থেকে তা দৃশ্যমান হয়, চকচকে হয়। মানুষ তৈরী করার কারখানায় সে সুযোগ থাকে না। ক্ষতগুলো দৃশ্যমান করে রাখতেই হয়, বার বার ঘুনে ধরা জায়গায় নতুন করে ক্ষত সৃষ্টি করতে হয়। দূর্বল ঘুনেধরা পচনধরা জায়গাগুলো এমনভাবে পরিষ্কার করতে হয় যাতে শক্ত অবস্থানটুকু শুধু থাকে। এভাবেই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পচন পরিষ্কার করে ধৌত করতে হয়। সারা জীবনব্যাপী চলে এই টিউনিং আর রিপেয়ারিং এর কাজ। এ এক চলমান প্রক্রিয়া। আজ যেটা ঠিক প্রতীয়মান হয় কাল সেটা ঠিক নাও হতে পারে । চার বছর বয়সে যে কাজটি ঠিক ছিলো দশ বছর বয়সে সেটা ঠিক হতে পারে কি। পরিবর্তন, বিবর্তন, রূপান্তরের সাথে সাথে কর্মপদ্ধতিও পরিবর্র্তিত হতে হয় বাস্তবতার নিরিখে। বাস্তবতার নিরিখে সচেতনভাবে সংস্কার করে করেই চলে এ পথ পরিক্রমা।

একজনের সাথে কথা হয়েছিলো। তার সারা শরীরে ক্ষত, কাটা, শরীরে পুঁজ জমা হয় একেক জায়গায়। কেটে কেটে পুঁজ বার করতে হয়, আর কোন চিকিৎসা নেই এভাবেই চলতে হয়, চলতে হবে তার সারাজীবন। সারা শরীরে তার কাটার চিহ্ন। এতো কষ্ট মেনে নিয়েছেন তিনি। হাসিমুখে থাকেন ।  এ জীবনই মেনে নিয়েছেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, শরীরের একটা না একটা জায়গা তার কাটাই থাকে সবসময়। তেমনি চিন্তার জগতের পুঁজ পরিষ্কার করার জন্য একটা না একটা ক্ষত সারাজীবন লেগে থাকতে হয়। এভাবেই চালাতে হয় শুদ্ধিকরণ সারাজীবনব্যাপী। একটা না একটা ক্ষত নিয়েই চলতে হয় এপথে। এপথ বিশ্বাসীদের পথ। সত্যের পথে, সাধনার পথে একবার থেমে গেলে, ক্ষত শুকিয়ে গেলে শুদ্ধির আর পথ থাকেনা। সুখে ডোবার কোন সুযোগ নেই এই যাত্রায়। অত্যন্ত সতর্ক, সচেতন, সন্তর্পনে পার হয়ে যেতে হয় এ পথ। সুখে, দুখে কোনটাতেই ডুবে যাওয়ার সুযোগ নেই, কাতর হওয়ার সুযোগ নেই এ যাত্রায়, সাময়িক হতে পারে কিন্তু চলমান রাখতে হয়। এ এক অনন্ত যাত্রাপথের ট্রানজিট ষ্টেশন, ওয়েটিং রুম, ডুবে যাওয়ার সুযোগ কোথায় এখানে। ডুবতে হয় শুধু নিজের মধ্যে নিজেকে নিয়ে। একটা সাফল্য নিয়ে আটকে থাকার সুযোগ নেই এখানে। সাময়িক প্রাপ্তি সাময়িক সন্তুষ্টি। আবার যাত্রা শুরু করতে হয়। একটার পর একটা করে যেতে হয় এভাবে। সময়ে ঝিমিয়ে পড়লেও আবার উঠে দাঁড়াতে হয়, আবার চলা শুরু করতে হয় আস্তে আস্তে শামুকের ন্যায় দূর্গে অবস্থান করে ধীর লয়ে। পায়ের নীচে কাঁচের টুকরো, চারপাশে কাঁটা, তাই সাবধানে, সন্তর্পনে অতি ধৈর্য নিয়ে চলতে হয় এপথে। জীবন চলার খোলা পথে একটা ক্ষত রেখে দিতেই হয়, যে পথ দিয়ে খারাপ রক্তের মত সব খারাপ বেরিয়ে যেতে পারে শেষ পর্যন্ত।

খোলা পথটি হলো এক্সপেরিমেন্ট করে চলার পথ। আধ্যাত্মিক সাধকগন প্রয়োজনের অতিরিক্ত সবকিছুকে বিষ বলেন, পুজিকে পুঁজ বলেন। খোলাপথ  সব খারাপ বেরিয়ে যাবার পথ, যেমন কারো ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গেলে আঙ্গুলের মাথা বা শরীরের কোন জায়গা সুঁই দিয়ে ফুটো করে দিলে বাড়তি রক্ত বেরিয়ে গিয়ে রোগী বিপদমুক্ত হয়।

নিজেকে চেনাই সাধনা, চিনতে গেলে দেখতে হয়। দেখা, শোনা, জানা, বুঝা তারপর হয় চেনা। আঘাত ছাড়া মানুষ নিজেকে চিনতে পারেনা। আঘাত মানুষকে সমৃদ্ধ করে, তিল তিল করে বিনির্মাণ করে ভিতর থেকে।