জাতিগত শেকড়ের সত্য যেন ভুলে না যাই

সংলাপ ॥ জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কিসের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে? একটি ইমারত বানাতে কমপক্ষে চারটি স্তম্ভ দরকার হয়। ভারসাম্যপূর্ণ বিকাশমান একটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটি জরুরি বলেই ৭২’ এর সংবিধানে চারটি মূলনীতির সন্নিবেশ ঘটেছিল। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের দলীয় পতাকায় চারটি তারকা দেয়া হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতি পুনর্গঠনে বাকশালের মতো মহাকর্মযজ্ঞ চালু করতে চেয়েছিলেন। ঘাতকেরা বুঝেছিল বাকশাল কায়েম হলে বাংলাদেশ খুব দ্রুত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। ফলে তারা সেটি করতে দেয়নি। কারা করতে দেয়নি, কেন করতে দেয়নি তা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। বাকশাল ছিল একটি যুগান্তকারী কর্মসূচি। যদিও পরবর্তীতে এটিকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে বিভাজন সৃষ্টির অপচেষ্টা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সংবিধান বারবার সংশোধনের কারণে, পাল্টাতে পাল্টাতে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জাতিগত স্বকীয় চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। জবরদখলকারী সব শাসকেরাই নিজেদের মতো করে সংবিধান কাঁটাছেড়া করেছে। ’৭৫ এর পরবর্তী দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে সীমাহীন নিষ্ঠুরতা হয়েছে। সেই রুগ্নযাত্রা ছিল দেশের ভিতরে, দেশ-জাতির ভিতরে, জাতি-সংস্কৃতির ভিতরে আরেকটি অপসংস্কৃতির জন্ম দেয়ার নির্মমতা মাত্র। অনেকটা এরকম যে গর্ভের মধ্যেই একটি শিশুকে বিকলাঙ্গ করার মতো চরম দানবিক এক মহাঅন্যায় করা হয়েছে। জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করার মহোৎসব চলেছে। হাজার বছরের বাঙালির সব অর্জনকে ম্লান করে দেয়া কিংবা ভিন্ন এক যাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সব করা হয়েছে। বিশেষত এই বাংলায় কীর্তিমান বাঙালিদের সব অর্জন, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উত্থানের সব পথকে রুদ্ধ করে দেয়ার প্রবণতা চলেছে।৩০ লক্ষ মানুষের চরম আত্মত্যাগকে ভুলুন্ঠিত করতে সম্ভাব্য সবই করেছে ঘাতকেরা। সাময়িকভাবে পথ হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশ-জাতি। যারা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাদেরকে বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছে। ক্যাঙ্গারু কোর্টের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের বেছে বেছে খুন করা হয়েছে। প্রতিদিন, প্রতিরাতে চলেছে হত্যার নির্মমতা। কারারক্ষী থেকে শুরু করে সামরিক, আধা সামরিক বাহিনীকেও ব্যবহার করা হয়েছে এই নীলনক্সা বাস্তবায়নে। সরকারি চাকুরিতে উপেক্ষিত ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা। প্রমোশন পদায়ণের ক্ষেত্রে সীমাহীন নৈরাজ্য চলেছে। সরকারের শিক্ষা-সংস্কৃতি-মন্ত্রাণালয়ের কাজই ছিল পুরো দেশকে বিকৃত ইতিহাস চর্চার আওতায় আনা। মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি জাতির প্রকৃত ইতিহাস কোন কিছুই নতুন প্রজন্মকে জানতে দেয়া হয়নি।

দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশপরিচালনার সুযোগ পাবার পর থেকে জাতি তার প্রকৃষ্ট পরিচয়ে ফিরে আসার পথ পেয়েছে। তবু সমাজে রাষ্ট্রের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে, এমনকি খোদ নিজ দলে লুকিয়ে থাকা বর্ণচোরা গুপ্তঘাতকেরাই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বুদ্ধিজীবী মহল, সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী, ডাক্তারদের মধ্যে জাতিবিনাশী বিপুল সংখ্যক করিতকর্মাদের খুঁজে পাওয়া যায়। স্মরণে রাখতে হবে বিগত সরকারগুলো সব ক্ষেত্রে দালাল লুটেরা তাবেদারী গোষ্ঠী তৈরী করেছে নিজেদের স্বার্থে। তাদের কাজই বাধা দেয়া।

তেজগাও, গুলশান, বনানী , পূর্বাচল, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদেরকে প্লট, জায়গা-জমি দেয়া হয়েছে। দেশে ও দেশের বাইরে ঘাতকদের বিশাল সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। এই ঘাতকেরা সরকারের শুভ উদ্যোগে বাধা দেয়া অনেকটা ঈমানী দায়িত্ব মনে করে। বহু প্রতিষ্ঠানের মালিক বর্ণচোরা ঘাতক।

এর বিপরীতে দলীয় ও সরকারি আনুকূল্যে যারা সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন তাদের দায়িত্বশীলতা কতটুকু? সমাজে তাদের অবদান কতটুকু? তারাও কেন স্রোতে গা ভাসিয়ে চলেন? শেখ হাসিনার লক্ষ্যের পথে তারা কোথায় কিভাবে যুক্ত সহায়ক সে সবই ভেবে দেখার সময় এসেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন অযোগ্য ও নীতিহীন নেতা দিয়ে দেশ ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়। পদে পদে তিনি নীতিহীন লুটেরাদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। আর সে সময় খোদ আওয়ামীলীগের মধ্যে কতজন নীতিহীন খুনি লুকিয়ে ছিল তার প্রমাণ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাতি দেখতে পেয়েছে।

দল হিসেবে আওয়ামীলীগ এবং সরকার যেন ভুলে না যান জাতিগত সত্য শেকড়ের কথা। শেকড়বিহীন গাছ দাঁড়াতে পারে না। যত উন্নয়ন চিত্র দেখানো হোক যত প্রচার প্রপাগান্ডা চালানো হোক আর মাঠে দলীয় অফিস পাড়ায় যতজনের আনাগোনা দেখা যাক না কেন বাস্তবে তা কাজে আসেনা। একটি মৃদু কম্পন ,ছোটখাট ঝড় সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। এক্ষেত্রে পবিত্র কুরআনের একটি বাণী প্রণিধানযোগ্য- ‘যারা নিজেদের মতো করে ভালো কাজের প্রচার করলো তাদের সে সব ভালো কাজ হচ্ছে ছাইয়ের মত, একটি ঝড় দমকা বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়’। যদি আমরা স্তম্ভগুলোকে শক্তিশালী না করি এগুলোর পাহারা, সংরক্ষণ পরিচর্যা করার সার্মথ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হই তবে তা উল্লেখিত ছাই ভষ্মের মত কোনই কাজে লাগবে না। দেখতে হবে বৈষম্য কতটুকু কমেছে,শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার নামে কি দেয়া হচ্ছে। মননে চরিত্রে বিবেক বুদ্ধিতে কতটুকু মানবতার প্রেমের জাগরণ ঘটছে। সমাজে রাষ্ট্রে ব্যক্তি গোষ্ঠীতে মূল্যবোধ কতটুকু যোগ হচ্ছে তার উপর নির্ভর করছে সফলতা। কাউকে বঞ্চিত করে দূরে রেখে, কাঁচের দেয়াল তুলে দিয়ে ভুল বুঝিয়ে প্রতারণা করে কেউই পার পায় না। কারণ মানুষের চিন্তা ও দর্শনের শক্তিই জাতির স্তম্ভ। প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভই জাতির স্তম্ভ। কর্মীর সাথে নেতার, সরকার ও দলের সাথে জনগণের দূরত্ব না কমলে সব অর্জন ব্যর্থ হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতজানু হলে শৈথিল্যতা দেখানো হলে আঘাত প্রত্যাঘাত হয়ে ফিরে আসে। এ সবই সহজ সরল সমীকরণ মাত্র। এটিই সিরাতুল মোস্তাকিমের অনুস্মরণ। একজন ৯০ বছর বয়সী প্রবীণকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার পায়ের উপর ভর করেই দাঁড়াতে হয়। তার বয়স ৯০ মানে তার পায়ের বয়সও ৯০। পুরোনো বলে সেটিকে কেটে ফেলা যায় না। একটি বড় গাছ উপরে যতটা বড় তার শেকড় ততটাই মাটির গভীরে প্রোথিত। ফলে দল হিসেবে আওয়ামীলীগকে যুক্ত থাকতে হবে তার ঠিকানায়। তার ঠিকানা মানে দেশের ঠিকানায়।

সময় এমন একটি বাস্তবতাকে সামনে এনেছে যা ষ্পষ্টতই গভীর দিকনির্দেশনা দেয়। আওয়ামী লীগের দায়িত্ব অনেক। তাদেরকে স্মরণে রাখতে হবে, তারা ব্যর্থ হলে কিংবা বুঝতে অক্ষম হলে জনগণের উপর আঘাত আসতেই থাকবে। প্রচন্ড ঝড়ে তারা লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। জাতি আবারও মুখ থুবড়ে পড়বে।