জনগণই ক্ষমতার উৎস দলের চেয়ে দেশ বড়

সংলাপ ॥ বিদেশীদের সাহায্য নিয়ে, দেশের মধ্যে মিথ্যাচার-দুর্নীতি চলতে দিয়ে, প্রশাসন কাঠামো আমলাতন্ত্রের ইচ্ছামতো পরিবর্তন করে, রাজনৈতিক ইসলাম ও ধর্মান্ধদের সাহায্য নিয়ে এবং আঁতাত করে ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা যায় বিশেষ করে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় সর্বস্তরে সত্য প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ় প্রত্যয়ী না হলে জাতির আশীর্বাদ পাওয়া কঠিন। জাতির আশীর্বাদ না পেলে আল্লাহ্‌র রহমত পাওয়া দুরূহ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ওলী-আল্লাহ্‌দের দেশ। সহস্রাধিক সাধক এই মাটিতে শুয়ে আছেন। তাঁরাও দেশ ও জাতির কল্যাণে অন্তরালে থেকে সত্য প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন ও আছেন। তাই দেশের সর্বস্তরের ৭০ ভাগ মানুষ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাঁদেরকে অন্তরের অন্তঃস্থলে ধারণ করে রেখেছেন। আল্লাহ্‌‌ও তাঁদের সহায় আছেন। সব ধরণের চক্রান্তকে পরাস্ত করতে দেশের গরিব মানুষের ঐক্যের ভিতটাকে আরও মজবুত করার জন্য আত্মনিয়োগ করাই হবে এই মুহূর্তে সরকারের জরুরি কর্তব্য। সবকিছুর উর্দ্ধে উঠে সার্বিক অঙ্গনে সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তির লক্ষ্যে দেশ ও জাতির কল্যাণে যিনি কান্ডারি – তিনি অবশ্যই জাতি ও ওলী- আল্লাহ্‌‌দের আশীর্বাদ এবং সর্বোপরি আল্লাহ্‌র কৃপা হতে বঞ্চিত হতে পারেন না। ইতিহাসই তার প্রমাণ।

সংস্কার একটা পথ বা পদ্ধতি যা সময়, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর ভর করে কোনো ব্যক্তি, দেশ ও জাতি উন্নতির দিকে যায় এবং পরীক্ষিত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে আবারও সংস্কারের পথে এগিয়ে যায়। এ পথে চলার শেষ নেই। এটা ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্র জীবনে অবশ্যই ঘটতে হবে এবং ঘটে চলেছে বলেই আমরা ব্যক্তি জীবনে প্রতিদিন প্রতিটি কর্মের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারছি সময় ও পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে। পরিবর্তনের ধারায় ব্যক্তি যে বিষয়ে উর্দ্ধারণের পাথেয় কুড়িয়ে চলেছেন তিনিই হচ্ছেন সে বিষয়ে অভিজ্ঞ > পরবর্তীতে দূরদর্শী > পরবর্তীতে দিব্যজ্ঞানী। অন্ততঃপক্ষে যারা একটা বিষয়ে অভিজ্ঞ পর্যায়ে যেতে পারেন তারাই সে বিষয়ে পৃথিবীর, রাষ্ট্রের, সমাজের বা ব্যক্তি জীবনের দিক নির্দেশনা দিতে পারেন। তাই দেখা যায়, অভিজ্ঞরাই জ্ঞান অর্জনের জন্য যুগে যুগে শিক্ষার ওপর জোর দিতে বলেছেন কারণ শিক্ষাই জ্ঞানের বাহন। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতির মধ্যে ততো অভিজ্ঞ, দূরদর্শী ও দিব্যজ্ঞানী ব্যক্তিত্ব আছেন। তারা যখন দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেন সেই দেশ ও জাতি তখন উন্নতির চরম শিখরে ওঠার পথে অগ্রসর হয়। আর যারা তা হতে পারেননি তারা ব্যক্তি জীবনে, সমাজ জীবনে এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে যদি দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন যে কোনো পরিস্থিতিতে ক্ষমতা হাতে পেয়ে, তাহলে দেশ ও জাতির উন্নতি ব্যাহত হবে এবং জাতির মধ্যে হতাশা প্রকটভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, রাহাজানি, খুন ইত্যাদি বেড়ে যাবে। এর মধ্যেই অগ্রসররা পরিবর্তন চাইবে এবং প্রয়োজনে  জাতিকে সেই পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যে পথে সংস্কারের ধারা স্তুবির না হয়ে চলমান থাকে (যদিও তার মধ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য বিদ্যমান থাকে)। অপ্রিয় হলেও সত্য বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দূরদর্শী শ্রেণীর ঐকতানে দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য একরৈখিক পথের পথিক হয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারিনি যেহেতু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের মোহে অন্ধত্বের জন্য। ফলে বারবার পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন ঘটবে বা ঘটাতে হবে এটা সুনিশ্চিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের সর্বস্তরের পেশাজীবী মানুষ যখন সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বর্তমান সরকারই একমাত্র শক্তি। ‘সংস্কারক’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হলে শুধু প্রশাসন ও বিভিন্ন কমিশনের সংস্কার করে নয়, জাতীয় জীবনে সর্বক্ষেত্রে বিশেষ করে সামাজিক কাঠামোর উন্নতির লক্ষ্যে একরৈখিক সংস্কার কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। বর্তমান সরকারই পারে অবিলম্বে বাংলাদেশ বিরোধী ও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কবল হতে জাতিকে মুক্ত করে নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশ ও জাতির স্বার্থে রাজনৈতিক ইসলামওয়ালা ধর্মজীবী, উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করে জাতির সামনে তাদের মুখোশ খুলে, তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহ বাজেয়াপ্ত করে জনকল্যাণ করতে। এছাড়াও বর্তমান সরকারই পারে বিচারবিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানসমূহে যোগ্য ব্যক্তিত্ব যোগ্যস্থানে বসিয়ে দেশ ও জাতির সেবা করার সুযোগ সৃষ্টি, কঠোর হস্তে লক্ষ্যভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে সার্বিক মিথ্যাচার বন্ধ করে জাতির আস্থা ফিরিয়ে আনতে। নচেৎ চক্রান্তকারীদের খপ্পরে পড়ে রাজনীতিজীবী ও ধর্মজীবীদের সাহচর্যে থেকে যত কথা আর কার্যক্রম বর্তমান সরকার নিক না কেন তা বিফলে যাবার সম্ভাবনা বেশি এবং আগের অন্যান্য সরকারকে যেমন জাতি (?) চিহ্নিত করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তেমনি সত্যের মানদন্ডে বর্তমান সরকারকে চিহ্নিত করে জাতি নিজেদের অবস্থান ঠিক করতে পারে।  কারণ বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি।

এখনো হাতে যথেষ্ট সময় আছে। বর্তমান সরকার কোনদিকে যাবেন এটা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই – ক্ষমতার চেয়ে জনতা বড়, দলের চেয়ে দেশ।