মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইন শিক্ষার প্রভাব: ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া

সংলাপ ॥ গত মার্চ মাস থেকে সরকারী নির্দেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। বৈশ্বিক মহামারী করেনাকালীন সময়ে কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিশ্বের সকল দেশের মতো বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও বিধ্বস্ত। দীর্ঘ আট মাস যাবৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখায় মারাত্বক ক্ষতি হয়েছে। এরই মধ্যে এই অবস্থা উত্তোরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে; যদিও এর নেতিবাচক প্রভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। ম্যাধমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরে অনলাইন ভিত্তিক শ্রেণি কার্যক্রমের প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য সাপ্তাহিক বর্তমান সংলাপ-এর গবেষণা দলের পক্ষ থেকে অতি সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিক্রিয়া জানার উদ্যোগ নেয়া হয়। অধ্যক্ষ নাসিমা করিম, কাউন্সিলর মোঃ আমিরুল ইসলাম ও শামসুন্নাহার বিষয়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করেন যা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

বশিরউদ্দিন আদর্শ স্কুল এন্ড কলেজ-এর অধ্যক্ষ মোঃ বিল্লাল হোসেন-এর মতে, অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম ভালো, কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। অনলাইন কার্যক্রমের জন্য যে রকম প্রস্তুতি বা সরঞ্জামের প্রয়োজন তা যথেষ্ট পরিমাণে নেই। অধিকাংশ অভিভাবকদের মতে ছাত্র-ছাত্রীদের  শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার  মতো ডিভাইস বা ল্যাপটপ নেই। তাই উপস্থিতির হার অনেক কম। ঢাকা শহরে কিছু সুবিধা থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল বা গ্রামাঞ্চলে সুযোগ সুবিধা একদমই নাই। সরকারের সহযোগিতা ও কর্তৃপক্ষ সবার মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম ফলপ্রসূ হতো।

কল্যাণপুর গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ-এর অধ্যক্ষ শাহনাজ বেগম জানান, এই প্রতিষ্ঠানে যেমন উচ্চবিত্তের সন্তানরা লেখাপড়া করেন তেমনি মধ্যবিত্ত বা নিম্মবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও পড়াশোনা করছে। নিম্নবিত্ত পরিবারের অধিকাংশ অভিভাবকদের অনলাইন ক্লাস কারার উপযোগী ডিভাইস নেই। বাসায় নেট কানেকশন নেই। আবার কানেকশন থাকলেও সব সময় ভালো সার্ভিস দিচ্ছে না বলে অভিভাবকরা জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, প্রতিষ্ঠানের শতকরা ষাট ভাগ ছাত্র-ছাত্রী অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত। যদিও অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রমের ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত পড়াশুনার সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারছে এবং শিক্ষকদের সাথে সব সময় যোগাযোগ করতে পারছে তবুও অনলাইন কার্যক্রমের নেতিবাচক দিক বেশি বলেই মনে করি। কারণ এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা ক্লাসের বাইরেও দীর্ঘক্ষণ মোবাইল সাথে রাখছে যা তাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সরকার সীমিত আকারে স্কুল-কলেজ চালু করে দিলে প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারলে ছাত্র-ছাত্রীরা আরো উপকৃত হতো বলে তিনি মনে করেন। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম যদিও ব্যয়বহুল এবং এর নেতিবাচক প্রভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা মোবাইলের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। তারপরও ছাত্র-ছাত্রীরা উপকৃত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কল্যাণপুর গার্লস্ স্কুল এন্ড কলেজ-এর একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রের অভিভাবক বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অন-লাইন শিক্ষা কার্যক্রম ফলপ্রসূ নয়। রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে না। কারণ বিষয়টি ব্যয়-বহুল, পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের অমনোযোগিতা ও মোবাইল ফেনের প্রতি আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ছাত্র-ছাত্রীর স্মার্ট ফোন নাই। তাই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম অনেকাংশে ফলপ্রসূ নয়।

মিরপুর থানাধীন মডেল একাডেমীর সপ্তম শ্রেণির একজন অভিভাবক বলেন, অনলাইনের শ্রেণি কার্যক্রম তেমন ফলদায়ক হচ্ছে না। কারণ বাচ্চারা মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। গণিতের সমস্যাগুলো বুঝতে পারছেনা। যে সমস্ত অভিভাবক সচেতন তাদের ছেলে-মেয়েরা উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু, অনলাইনের পরীক্ষা দ্বারা মেধা যাচাই হচ্ছে না। অন্যদিকে, বিদ্যালয়টির সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী দিপ্তি বলেন, অন-লাইনে জুমের মাধ্যমে ক্লাস করি এবং পরীক্ষা দিয়ে থাকি। পরীক্ষার পদ্ধতি হল এমসিকিউ। ৪০ মিনিটে ৫০টি এমসিকিউ-এর উওর দিতে হয়। এমসিকিউ প্রশ্ন হওয়ায় কম সময়ের মধ্যে আমাদের চুরি করার সুযোগ থাকে না। এজন্য অনলাইন পরীক্ষায় আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু, অনলাইনের ক্লাসের চেয়ে সরাসরি ক্লাস হলে ভালো হত। সরকার যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরাসরি ক্লাসের অনুমতি দিতেন তাহলে ভাল হত এবং আমরা আরো ভালো করে শিখতে পারতাম।

মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী মোবাশশীরা রোজ এর মতে, বিদ্যালয়ের অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা খুব সন্তোষজনক। কিন্তু সরাসরি ক্লাস হলে ভালো হতো। স্কুলটির প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রের অভিভাবক বলেন, অনলাইন শিক্ষা দ্বারা বাচ্চারা অনেক উপকৃত হচ্ছে। স্কুলে যাওয়া লাগছে না, ঘরে বসে বাচ্চরা শিখতে পারছে । এই ব্যাপারে অভিভাবকদের একটু সচেতন থাকতে হবে।

হাক্কানী মিশন বিদ্যাপীঠ ও মহাবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির একজন অভিভাবক বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপওার কথা চিন্তা করলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ভূমিকা রাখছে। ছাত্র-ছাত্রীরা কিছুটা হলেও শিখতে পারছে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা বেশি। অভিভাবকরা সচেতন না হলে ছেলে-মেয়েরা অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম থেকে উপকৃত হবে না।

একই প্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া ইসলাম বলেন, আমাদের অনলাইনে ফেসবুক পেজ-এর মাধ্যমে ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া হয়। আমাদের স্কুলের ক্লাস বন্ধের কারণে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হওয়ায় কিছুটা পড়াশোনা  হয়। কিন্তু বাস্তবে ফেসবুকে পড়া পাই কিন্তু শিক্ষা হয় না। বিশেষ করে গণিতটা সরাসরি ক্লাস না করলে কিছুই বুঝা যায় না। যদি সপ্তাহে একদিন স্কুলে সরাসরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস নেয়া হয় তাহলে আমরা উপকৃত হবো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষাক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও  এর নেতিবাচক প্রভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, তারপরেও এর অবদান অস্বীকার করা যাবে না। ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ঘরে চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রমের দ্বারা বাচ্চারা কিছুটা হলেও শিখতে পারছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আর্থিক সমস্যার কারণে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে পারছে না বলে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম ফলপ্রসূ হচ্ছে না। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনায় সরকার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিবেন এমন প্রত্যাশা সবার।