চেতনা হারিয়ে গেলে সব হারিয়ে যায়

সংলাপ ॥ মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় পরিণতি হচ্ছে ভাষার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া। ভাষার উপর দখলদারিত্ব চাপিয়ে দেয়ার চেয়ে বড় অপরাধ নেই। আধিপত্য বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল হচ্ছে ভাষাকে হারিয়ে দেয়া কিংবা অকার্যকর করে দেয়া। আবার ভাষাকে মর্যাদা না দিয়ে ভাসা ভাসা পথ চলার চেয়ে মানহানিকর কিছু নেই। ভাব চিন্তার গভীরতা যতই হোক ভাষাবিহীন সেই সৌন্দর্য কোন কাজে লাগে না। সমাজে গোষ্ঠীতে শোষকের প্রধান কৌশল ভাষা রুদ্ধ করে দেয়া। ভাষা চেতনা হারিয়ে গেলে দেশ জাতি হারিয়ে ফেলে তার গতিপথ। সেই পথে এসে যুক্ত হয় বিপর্যয় বৈরিতা ধ্বংসের নানা উপাত্ত। গোলকধাঁধায় পড়ে বাঙালির ভাষা চেতনা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়েছে। উপেক্ষিত হচ্ছে ভাষার শক্তি। ভাষার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে না পারার কারণে ক্ষয়িঞ্চু হয়ে বেড়ে উঠছি আমরা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের সব ধরনের সৃষ্টিশীলতা। ভাসা ভাসা হয়ে তৈরি হচ্ছে জীবন মান। মান সম্মত হচ্ছে না কোন কিছু। ভাষার সত্য প্রকাশ হতে পারছে না ফলে ভাষা বিহীন ষড়যন্ত্র কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ফুলে ফেপে বড় হচ্ছে। অচেনা হচ্ছি আমরা, আর সেই পথে নিয়ে যাচ্ছি অন্যদেরকে। আত্মবিস্তৃত জাতি এগুতে পারে না। সামগ্রিক ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এটিই আমাদের ভাষার সত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাষা চেতনা হচ্ছে গতিময়তা, সক্ষমতা লড়াই করার সামর্থ্য সর্বোপরি নিজেকে নিয়ে চলার পাথেয়। নিজের সাথে নিজের লড়াই, সমাজে, পরিবেশকে বাসযোগ্য করার লড়াই। পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজনের পথে চালিত করার মূলধন হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বিমুখ জাতি হারিয়ে ফেলে ঐতিহ্য, কৃষ্টি, গতিময়তা, ছন্দময়তা, নিজস্ব ভাষা ও দার্শনিকতা। ইতিহাস বিকৃতি ঘটে, মিথ্যাচার, চাটুকারিতা, বিভ্রান্তি মাথা তুলে দাঁড়ায়। আত্মঘাতি প্রবণতা বাড়ে। লোভ খ্যাতির মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। মারাত্মক জীবনঘাতি অসুখ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অস্থিরতা বাড়ায়। দর্শন, উপলব্ধি, চেতনা নির্বাসিত হয়। মুক্তির আকাঙ্খা জাগে না। ছিটকে পড়ে জীবন-যাত্রা। রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না, নেতা আর নেতা থাকে না। প্রেম হয়ে যায় শুষ্ক বালুকাবেলা। ভুইফোঁড় এক মতলববাজে পরিণত হয় মানব জীবন। দারুণ অন্ধত্ব বন্ধ্যাত্ব ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে। মুখে খঁইমুড়কীর মতো ভাষা থাকে বটে তবে তা আর ভাষা হয়ে উঠে না। ভাষাপ্রেম মুখ থুবড়ে পড়ে। মা মাতৃভূমি অচেনা হয়ে পড়ে। ভাষা হচ্ছে ভাবের প্রকাশ। বোধ প্রকাশিত হয় ভাষার অলংকারে। মানুষের চিহ্ন তার মনন, প্রকৃতির উৎস, মোহনা, চলাফেরা সবই তো ভাষার ক্ষমতা। ভাষা শনাক্তের মধ্য দিয়েই আসে আত্ম-পরিচয়, সৃষ্টি হয় সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র। পুরো শরীরটাই ভাষা, ফলে তার প্রত্যেকটি প্রকাশও ভাষা। বাঙালিকে হারানোর যে সব জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে নানা প্রক্রিয়ায় তার মধ্যে ভাষার উপর আগ্রাসনই প্রথম। বহুমাত্রিক সে আক্রমণে একপ্রকার ধরাশায়ী হয়ে পড়েছে আমাদের ভাষা। এখন ভাষা অনেকটা ভাসা কচুরী পানার মতো। ভাষার চেয়ে ভাতই মূখ্য হয়ে উঠেছে পেটুক স্বভাবের কাছে। আবার কারো কারো শিক্ষার নামে আধিপত্য বিস্তার, বিভেদ, বিভাজন রেখা জিইয়ে রাখার কৌশলও ভাষাকে নিয়ে। নামি-দামি শিশু শিক্ষালয়গুলোতে ভাষার উপর রীতিমতো ছুরি চালানো হয়।

আমাদের আচরণ অসহিঞ্চু কারণ আমাদের ভাষা জ্ঞান নেই। আমরা নিজেদের ভাষা জানি না। নিজের ভাষা অনুভব, উপলব্ধি করি না। আমাদের ভাষা কি, কি তার রং, রূপ, ব্যঞ্জনা, দোতনা তা দেখা যায় না, খুঁজে পায় না। পন্ডিতজন নিজেকে কঠিন কঠিন ভাষায় প্রকাশ করেন ফলে তাতে জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ে। ভাষা আহত হয়। কৌশল-অপকৌশলের খেলায় ভাষা অসুস্থ হয়। শিশুর ভাষা প্রাঞ্জল, মধুর। শিশুর প্রতিটি শব্দ প্রয়োগ দারুণ ঝংকার তোলে। তাই তাকে উপেক্ষা করা চলে না। কিন্তু একজন প্রতারক গোছের মানুষ যত সুললিত কন্ঠে ভাষার প্রয়োগ করুন সেখানে বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না। ভাষা কোন প্রতারককে ধারণ করে না। চোর, বাটপার, খুনিরা সবেচেয়ে বেশি প্রতারণা করে ভাষার সাথে। ফিসফিসিয়ে গোপনে অধরা পথে ভাষা এড়িয়ে চলে। আবার চোরের মা’র বড় গলা প্রবাদের কথা স্মরণে বলতে হয় গলা যত বড়ই হোক ভাষা তার চরিত্রের গোপন  চেহারা প্রকাশ করে দেয়। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে প্রতারক যতই দৃষ্টি আকৃষ্ট করুক না কেন থলের বিড়াল থেকে ভাষা সব বের করে দেয়। রুক্ষতার পথ রুদ্ধ করে দেয় ভাষা। ফলে তা বিস্তার করতে পারে না।

বহুমুখি আগ্রাসনে প্রথম আঘাত আসে ভাষার উপর। এই যে এতসব ধমআন্ধতা তাতো ভাষার দখল ছিনিয়ে নেবার জন্য। যতদিন ভাষা সক্রিয় থাকে, ভাষার মর্যাদা লোপ পায় না, ততদিন সার্বভৌমত্ব আত্ম-পরিচয় প্রবল থাকে। প্রতিরোধে দ্রোহে বিক্ষোভে বাধাপ্রাপ্ত হয় সব অপশক্তি। যতক্ষণ ছোট ছোট শিশু এক সাথে গেয়ে উঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ তখন ষড়যন্ত্রকারী মিথ্যুকের দল ভড়কে যায়, তাদের চোখ কপালে গিয়ে ঠেকে। যখন মা মা বলে ডাকতে থাকে কোন শিশু, তখন ৭১’এর ভ্রন হত্যাকারীরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। যখন প্রতিবাদী শ্রমীক মজুর কৃষক সম্মিলিত কন্ঠে ধ্বনি তোলে তখন পুরো লুটেরারা ভয়ে আটসাট হয়ে মুখ লুকায়। যে কৃষক সারা বছর হাড়ভাঙা খাটুনিতে ফসল ফলায়, সে শ্রমিক সব বৈষম্য সহ্য করে উৎপাদন অব্যাহত রাখে তার কাছেই ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ধরা দেয়। যে শিশু তার লেখায় আঁকায়, বলায় ছড়িয়ে দেয় ভাষার শক্তি সে শিশু রীতিমতো আতঙ্কের হয়ে উঠে ভন্ড প্রতারক কৌশলবাজের কাছে। ভাষার হাত ধরেই আসে পরিবর্তন, ভেঙে চুরমার হয় নটরাজদের প্রাসাদ। প্রতারক প্রবঞ্চকের কাছে সবচেয়ে বেশি ভয়ের হচ্ছে ভাষা। ধর্মান্ধরা ভাষার প্রকাশ্য শত্রু। লুটেরারা ভাষাকে বাক্সবন্দি করতে চায়। ছলে, বলে, কৌশলে ভাষা রুদ্ধ করার প্রচেষ্টায় রত থাকে। নিজেকে আড়ালে রাখে দূর্গে, ভয় পাছে ভাষার আঘাতে খান খান হয়ে যায়। তাইতো পালিয়ে বাঁচতে চায় সে। এদের কেউ-ই ভাষার মুখোমুখি হতে চায় না। এ এক স্বেচ্ছা নির্বাসন। এ জন্যই হঠাৎই কোন কোন চেনা প্রতারক ভাষা হারিয়ে চুপসে যায়। আবার খুব বেশি ভাষা দরদী ভাড়াটে ভাষা প্রেমিক ভাষার পাল্টা হামলায় আহত হয় মাঝে মধ্যেই। ভাষার যত্রতত্র ব্যবহারকারীদেরকে ভাষা ছুড়ে ফেলে বহুদূরে। ভাষা প্রতারকরা নিজ নিজ কামনায় ধরা পড়ে। ভাষা নিজেও মুখোশ খুলে দেয়। কিন্তু সহজ সরল ভাষাবন্ধুরা টিকে থাকে বছরের পর বছর। কত সুন্দর সুশ্রী স্বভাবের হয় তারা। কত প্রেম, ভাললাগা, আনন্দ জাগানিয়া হয়ে বেঁচে থাকে তারা। এ যেন ফুলের সৌরভ মাখা বিশুদ্ধ বাতাস। এই গাছ পালা পশু পাখি, কাকতাড়–য়া, বৈশাখী বর্ষবরণ সবই ভাষা। ভাষাহীন চোখে গভীর দৃষ্টিতে যে ভাষা কথা বলে উঠে সে ভাষা চরম  প্রকাশ। খুব বেশি ভালবাসলেও  বলতে হয় ভালবাসি এটাই তো ভাষার শক্তি। মাকে মা বলার অনিবার্য সত্য হচ্ছে ভাষা। নিজেকে কেবলই মাতৃভাষার কাছেই আপন করে রাখা যায়। নিজেকে কেবলই মর্যাদাবান রাখা যায় মাতৃভাষার কাছে। মাতৃভাষার প্রতি প্রেম মানে মায়ের প্রতি, দেশের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি, সর্বোপরি সৃষ্টির প্রতি দারুণ প্রেমের প্রকাশ। যোগ সংযোগ সম্পর্কের সাথে থাকা। রুচিবোধ, চিন্তা সবই প্রস্ফুটিত ফুলের সৌরভ হয়ে ঝরে পড়ে ভাষায়। স্রষ্টা ভাষাময়, উদ্ভাসিত সব সত্য তো ভাষা হয়ে ফুটে আছে। রূপ, সৌরভ, মাধুর্যতা তাও ভাষা। সৃষ্টির পরতে পরতে নির্যাসে লুকায়িত আছে ভাষা। ভাষার পুরো কাঠামোর মধ্যে গভীর আত্মপরিচয়। এখানে শব্দ হয়ে, চিহ্ন হয়ে, সুর হয়ে, ছন্দ হয়ে ভাষার নৃত্য দেখি আমরা। ভাষা সত্য, ভাষা নিত্য, ভাষা নিয়তি। ভাষার গভীরে লুকিয়ে আছে ভূবন মোহন বাঁশি। এক একটি উচ্চারণ, এক একটি মহাসাগরের পথে নিয়ে যায়। ভাষার অন্তর্নিহিত যোগসূত্রের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে পৃথিবীর তাবৎ রহস্য, সুর লহরী। সব সত্যের আধার ভাষা। আশা নয়, নয় ভালবাসা। ভালবাসা খেলা, আসুন ভাষাতে বাঁচি ভাষাতেই চষি আমাদের এ জীবন।