গুরু নামের স্মরণ – ২

শাহিনুর আক্তার ॥ দরবারে যেতাম-আসতাম, নানা কাজে ভুল করে ফেলেছি। কারন একজন সাধকের দরবারে প্রতি নিয়ত আদব রক্ষা করতে হয়। আমাদের পরিবারে মা ছাড়া কেউ যেতেন না। তাই সেভাবে তেমন কিছু শিখে উঠতে পারিনি, ছোট বেলায় মায়ের সাথে মামার কাছে গেলে, মাকে দেখতাম সরাসরি মামার পা ছুঁতেন না, পায়ের সামনের স্থানটিকে স্পর্শ করে কদমবুচি করতেন। পরে এটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। দর্শনরুমে মামার সাথে দেখা করার পর পায়ের কাছে কদমবুচি করতাম। একদিন বললেন, ‘এভাবে লোক দেখানো সম্মানের কোন প্রয়োজন নাই, মামাকে যদি চাস, হৃদয়ে স্থান দিস। তাহলেই হবে যোগ্য সম্মান।’ তখন কিছু না ভেবে বলে ফেললাম, ছোট বেলা থেকে মাকে দেখে অনেকটা অভ্যাস হয়ে গেছে। মামা তখন শব্দ করে হেসে উঠলেন। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না আমি কি ঠিক/ভুল করলাম। অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। এখনও যে সবটা বুঝে ফেলেছি এমনটাও নয়।

জীবনের নানা দুঃখ-যন্ত্রণা, কষ্ট, ক্ষোভ নিয়ে মামার কাছে যেতাম। খুলে বলব বলে। যখন তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছি। ঐ চোঁখের চাহনিতে মনে হয়েছে সবটা জানেন। কালো মোটা ফ্রেমের মধ্যে দুটো চোঁখ যেন, আমার ভেতরের হৃদপিন্ডটার স্পন্দনটা পর্যন্ত  দেখতে পাচ্ছেন। যেন আমার অন্তর্যামী। বলতেন, ‘গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পঁয়সা করা কোন ব্যাপার নয়। ইচ্ছে করলেই করা যায়।’ বিভিন্ন সন্মানীত ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বলতেন। কথাগুলো কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তাও তো বুঝতে পারতাম না।

সালটা সঠিকভাবে মনে করতে পারছিনা। পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষ্যে মিটিং ডাকা হয়। যুব উন্নয়নের পক্ষ থেকে ঐ মিটিং এ আমিও উপস্থিত ছিলাম। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত চাওয়া হয়। সকল সদস্যগণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। জ্যোতিভবনের সামনে রাস্তায় প্যান্ডেল ও মঞ্চ প্রস্তুত করা হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপন করার জন্য। আমার কেবল সেমিনার রুমের ঘড়ির দিকে চোঁখ। রাত গভীর হচ্ছে। কারন একা আমি, ফার্মগেট আমার গন্তব্য। সাথে বাচ্চাকে নেইনি। সুতরাং মায়ের বাসায়ও থাকতে পারবো না। ভেতরে ভেতরে দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিভাবে বাড়ি ফিরবো। রাতে গণপরিবহন পাব কিনা নানাবিধ চিন্তায় আমি বিভোর। ঘড়ির কাটা ১২:০০ টায়, মামাও সভা মূলতবী ঘোষণা করলেন। মামা উঠে অফিস রুমের দিকে গেলেন। আবার ফিরে আসলেন শাহ সূফী শামসুল হক চৌধুরী মহোদয়কে সম্বোধন করে বললেন,  ‘আমার একটা মেয়ে আছে, তাকে একটু ফার্মগেট নামিয়ে দিতে পারেন?’ উনি অত্যন্ত সমীহ করে বললেন, ‘অবশ্যই পারব’। উনি নিচে এসে আমাকে বললেন,  আমি কোন দিকে নামবো। সবশুনে সেভাবে গাড়িতে বসলেন, যাতে আমার নামতে সুবিধা হয়। মানুষের সুন্দর ব্যবহার কতটা সুন্দর হতে পারে । ভালোর কতরূপ হতে পারে, তা বুঝি এরকম একজন ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে না আসলে বুঝতে পারতাম না। জীবনে ভালো মানুষের প্রতিচ্ছবি দেখার সুযোগ খুব কাছ থেকে হয়েছিল। এগুলো চরম পাওয়া। এটা তাঁর আর্শীবাদ। নিজেকে বড় ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। এমন পাওয়া আর কি ভাগ্য হবে? ছোট বা বড় সকলের প্রতি এমন করে ভাবনা তো কেবল সাধক শ্রেণীর মানুষই করতে পারেন।

সময়টা ২০১৩ সাল হবে। অডিট আসার আগে সদস্যদের বইগুলো অফিসের হিসেবের সাথে মিলিয়ে দেখা হয় হিসেব কোন গড়মিল আছে কিনা। প্রতিটি বইকে খুব যত্ন সহকারে রাখা হয়। কারন প্রতিটি বইয়ে, মানুষের টাকা গচ্ছিতের দলিল থাকে। অফিসের অডিট অফিসার ও উর্ধ্বতনরা প্রতিটি বই সংরক্ষণ ও তার প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অফিস কর্তৃক সামান্য ত্রুটিকেও তাঁরা সহজভাবে নিতে পারেন না। হিসেবে কোনরকম গড়মিল হলে দিগুন অর্থজরিমানা দিতে হয়। একটা সমিতির সবসদস্যের ব্যাগ ভর্তি বই আমি এক সদস্যের

বাসায় ভুলে ফেলে আসি। পড়ে খোঁজ করলে উনি বিষয়টি অস্বীকার করেন। ভীষণভাবে মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ এতগুলো বই ডুপ্লিকেট কপি করার অনুমতি অফিস দেবে না। এতবড় দায়িত্বহীনতার কথা অফিসে বলতে পারছিলাম না। ম্যানেজার স্যারকে বলবো কিনা সাহস করে উঠতে পারছিনা। অডিট  অফিসাররা ভেবেই নেবেন কোন বড় ধরনের ঘাপলা ঢাকার জন্য বইগুলো আমি ইচ্ছে সরিয়ে ফেলেছি। মাসব্যপী অনুষ্ঠান চলছিল আমি দরবারে গেলাম। আমি অনুষ্ঠানে এক মুহূর্তের জন্য মনোসংযোগ স্থাপন করতে পারছিলাম না। আমার মন ঘুরেফিরে সেই হারানো বইয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমার চিন্তা জগতে শুধু বই নিয়ে অস্থির ছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম যেন, বইয়ের সন্ধান পাই। পরের দিন অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম, আমার অফিসে এক ভদ্রমহিলা ফোন করে জানিয়েছেন, আপার ব্যাগভর্তি বই পাওয়া গেছে। আপা যেন নিয়ে যায়। এদিকে ম্যানেজার শুনে খুব বেশি কিছু বললেন না। বইয়ের সন্ধান আমার মনের স্বস্তি ফিরে এলো। অজানা কারনে ঐ ভদ্রমহিলা রাতের শেষভাগে বই খুঁজতে লাগলেন এর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে না কিন্তু আমি জানি এটা অবশ্যই আমার মালিকের রহমত ছাড়া আর কিছু নয়।

মানুষের জীবনের নানা উত্থান পতনের এক জটিল সমীকরণ। আমরা জানি না কোথায় আমি কতখানি ব্যাকুল হয়ে উঠবো। চান্দপুর কাফেলার উদ্দেশ্যে মিরপুর আস্তানা শরীফ থেকে রওনা হলাম। সঙ্গে সানী ছিল। তখন সানী বেশ ছোট। আমাদের গাড়ির অগ্রভাগে হাসান ভাই ছিলেন। মাঝে মধ্যে চান্দপুর যাত্রার নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। আমরা সকলে খুব খেয়াল করে শুনছিলাম। চান্দপুর শরীফ পৌছে ভেতরে গেলাম। দরবার মধ্যে মহিলাদের সঙ্গে বসে আছি। দরুদে সামা চলছিল। সংসারের নানাবিধ কারনে আমি ভীষণ ভাবে ব্যাথিত ছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, আর যেন কোন সন্তান আমার জীবনে না আসে। যেন কোন কষ্ট পেতে আমার সঙ্গী না হয়। অদ্ভূত এক অভিমান ভেতরে দানা বেঁধে ছিল। জানি না সেদিন কেন এমন প্রার্থনা করছিলাম। মালিক তা সত্যি করে দিলেন। ২০০৩-২০১৩ পযন্ত কোন এক অজানা কারনে আমার জীবনে কোন সন্তান ধারনের সুযোগ হয়নি। যারা দুনিয়াদারী জীবনে সক্ষম দম্পতি আছেন, তারা জানেন অকারণে কেউ ইচ্ছে করলেই সন্তান ধারণ প্রকৃতিগতভাবে রোধ করতে পারেন না। কোন ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্র ছাড়া। সকলে উৎকন্ঠা রোধ করছেন আরেকটি সন্তান কেন আসছে না। আমি তো জানি কোথায় আমার প্রার্থনা কবুল হয়ে আছে। ভেতরে একটা খচখচানি ছিল তবুও সবাই ডাক্তারি চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমি জানি পৃথিবীর কোন ডাক্তার আমার এই বন্ধ্যাকরন দূর করতে পারবে না, আরজি/ক্ষমা প্রার্থনা তো আমার সেখানেই জানাতে হবে। (চলবে)