গুরু নামের স্মরণ ০৪

শাহিনুর আক্তার ॥ ভোলা দরবার, নিঝুম দ্বীপ, দ্বীপের মাটিতে চোখ বুজে তাঁর শুয়ে থাকা। ভোলা দরবারে বড় পুকুরে একটা ‘জলযান’ প্রস্তুত ছিল। ফুলের উপাচারে সজ্জিত। মামার জন্য আসন পাতা। সকলে বারে বারে তাঁর জলযানে সঙ্গী হচ্ছিলো আর প্রার্থনা সঙ্গীত গাওয়া হচ্ছে সমেবেত স্বরে। আমার ছোট ছেলেটা বিরক্ত করছিল তাই আমি দরবারে কক্ষেই ছিলাম। বের হলাম দেখলাম পুকুর থেকে বড় বড় মাছ তোলা হচ্ছে। বিভিন্ন মানুষ নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত। আমার ছেলে বললো আম্মু নানাভাই তো পুকুরে খুব মজা করছেন। সবাইকে চড়িয়েছেন, তুমিও যাও। ছোটকে নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। মামা ভীষণ খুশি ছিলেন, বেশ হাসিখুশি। আমাকে ছোট’র নাম জিজ্ঞেস করলেন, আমি বললাম ‘সালেহ আল রাজীন’। শুনে বললেন ভালো হয়েছে। জুবায়ের জী জলযানের সাথে ভাসছিলেন। দড়ি দিয়ে জলযানকে টেনে টেনে ঘুড়িয়ে আনা হচ্ছিল।  মামার দিকে তাকিয়ে তাঁর সেই হাসিমুখ অদ্ভত ভালোলাগা যেন মনে রঙ্গিন প্রজাপতির মত। নিঝুম দ্বীপের নৌকায় যেতে যেতে যে নৈস্বর্গের ছোঁয়া মানুষের চোখে ধরা পড়েছে তা কল্পনাতীত। এমন কাফেলা এমন মহামানবের রহমতের ছোঁয়া পাওয়া এ জীবনে হবে না, এযে তোমার অপার রহমতের ধারা।

০১/০৪/১৯ইং পাইকপাড়া দরবার – এ সত্যব্রত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করি। আমার সাথে আমার ছোট ছেলে ছিলো। আমার পাশে বসা ছিল। কিন্তু বার বার সে মামার কাছে চলে যাচ্ছিল । স্বেচ্ছাসেবী যারা ছিল ওরা সামলাতে পারছিল না। আমিও তাকে আটকাতে পারছিলাম না। বিরতি পর্বে আমার মায়ের বাড়ি চলে আসি। ০৩/০৪/১৯ইং চলছে রজব মাসব্যাপী অনুষ্ঠান। আমি দরবারে খুব একটা উপস্থিত হতে পারি না। বৃহস্পতিবার মিলাদে আমার জন্য এতটা চমক আমার জন্য অপেক্ষা করছিল ভাবিনি। মিলাদ প্রায় শেষ তখন মাসুম এসে বললো,  আপনি শাহিনূর আপনার বাসা ফার্মগেট? বললাম হ্যা। আবার প্রশ্ন, আপনার ছোট ছেলেকে আনেননি? আমি লজ্জিত হয়ে বললাম,  না আনিনি।  মাসুম বললো, মামা বলে পাঠিয়েছেন – মিলাদ শেষে দেখা না করে যাবেন না। আমি অপেক্ষা করছিলাম যাব। অবাক করে উঠে, মহিলা কক্ষে নিজেই চলে এলেন। হাস্বোজ্জল মুখে বললেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আপনার ছেলেটিকে কেন আনেন নি? এখন সম্পর্ক আমার ওর সাথে। পাইকপাড়া দরবারে ও  আমার পায়ে চুমা খাচ্ছে। হাত দিয়ে পায়ে আদর করছে।’ কথাগুলো যখন বলছিলেন মামাকে ভীষণ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। তাঁর চোখ -মুখ দেখে আমার ভেতরে এত আনন্দ হচ্ছিল, পৃথিবীর সমস্ত খুশি, সমস্ত সম্পদের অধিকারী, শান্তি , সুখ, আনন্দ যেন আমাকে ঘিরে ধরেছে। আমার মত দীনহীন তুচ্ছ প্রাণীর জন্য এ প্রাপ্তির কোন মূল্য হয় না। জাগতিক পরিমাপক একে পরিমাপ করতে পারে না। 

পরের দিন ক্ষুদে হাক্কানীকে নিয়ে গেলাম।  মামার জন্য ছোট ফুলের তোড়া নিয়ে গেল। একজন সত্যমানুষ অন্যজন শিশু তাই দু’জনের আলাপচারিতায় শিশুসুলভ সৌন্দর্য যেন ঝরে পড়ছে।  রাজীন মামার পাশে বেশ শান্ত  ভাবে বসে আছে। নানা ভাইয়ের কাছ থেকে চকলেট উপহার পেয়ে সে বেশ খুশি। মিলাদ শেষে  মামা রাজীনের সাথে করমর্দন করতে করতে বললেন, ‘আগামীকাল রজবের শেষ, কালকে আবার আসবেন।’ মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো রাজীন।

পরের দিন দু’জনকে নিয়ে গেলাম। নানাভাইয়ের আদর পেয়ে ভীষণখুশি সে। অনুষ্ঠান শেষে ফিরে এলাম।  একরাশ ভালোলাগা নিয়ে। এত আনন্দ জীবনে হইনি। এত প্রাপ্তিও কখনো ঘটেনি। এত আর্শীবাদ পেয় আমি ধন্য।

সূফী সাধক আনোয়ারুল হক আর্শীবাদপুষ্ট বাংলাদেশ হাক্কানী খানকা শরীফ (বাহাখাশ) বার্ষিক সাধারণ সভা ২০১৮ইং নিমন্ত্রণ পাই।  সময়টা ছিল ১৪/০৬/১৯ইং রোজ শুক্রবার। একটু আগেভাগে চলে যাই। যেয়ে দেখি মামা সামনের সারিতে বসে আছেন, নতুন কমিটি গঠন করায়ে, এগারজনের নবগঠিত কমিটিতে আমার নাম ঘোষনা করা হয়। আমি ভীষণ ভাবে চমৎকৃত হই। তাঁর সাথে ছিল শেষ সাক্ষাত। মামাকে সামনা সামনি আর দেখিনি।  বাহাকাশ  চান্দপুর শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষ বেলায়, মামার সাথে দেখা হয়নি। আর সৌভাগ্য হলো না তাঁর সেই দ্বীপ্তিময় মুখশ্রী দেখার। আর হলো না।  তাকেই তো রাগের ভাষায় কথা বলা যায়। যে আমার আপনার আপন আত্মার আত্মীয়। কেন বুঝতে পারিনি কেন তাঁর কাছে বারবার আসিনি। কেন দূরে থেকে অভিমান পুষেছি। আজ কেন আফসোস করছি কেন কাঁদছি। এখন এই ব্যাকুলতার জন্য দুঃখ হয়। তাঁর  চলে যাওয়া বড় বুকে বাজে। তাঁর দর্শনরূপের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর আচ্ছাদিত গিলাফের ফুলের ঝালর বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। আমি সেই বিশাল শুভ্র অবয়বে আপনার স্নিগ্ধ হাসিমাখামুখ দেখতে চাই। আমাদের ভুলের জন্য বজ্রকন্ঠের সেই হুংকার শুনতে চাই। আমাদের বেদনাতুর চোঁখে স্নেহের পরশ পেতে চাই। ভীষণ কষ্ট লাগে, ভীষণ কষ্ট…….

‘সাজানো ফুলের বনে ঝড় বয়ে গেল

সে ঝড় থামার পরে

পৃথিবী আধার হলো

তবু দেখি দ্বীপ গেছো জ্বেলে।

তুমি চলে গেলে…. ’

৫ শ্রাবণ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ২০ জুলাই ২০১৯ইং সূফী সাধক শেখ আবদুল হানিফ লোকান্তরিত হন।

‘মৃত্যু বলে কিছু নেই আছে রূপান্তর

অনন্ত অসীম স্রষ্ঠা অ-জড় অমর।’

শ্রাবণ যেন আমাদের কাছে করুণার ধারার মতোই  বইয়ে দিলো। অনন্ত কাল ধরে। যত দিন পৃথিবীর বুকে হাক্কানীর ধারা অব্যহত থাকবে।

‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা

কে বলে তুমি নাই

তুমি আছ মন বলে তাই।’ (চলবে)