খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি ঃ জীবন ও দর্শন

সংলাপ ॥ সূফী সাধক খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এঁর জন্ম সিস্তানের চিশতি নামক গ্রামে। তাঁর      জন্মসাল নিয়ে মতবিরোধ আছে। মতবিরোধের সীমানা হিজরি ৫৩০ থেকে ৫৩৭। তা সত্ত্বেও ৫৩৬ হিজরির (১১৪১ খ্রি.) ১৪ রজবকে জন্ম সন ও তারিখ হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে মোটামুটি একটা ঐক্যমত আছে। পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকেই তিনি হযরত আলীর বংশধর। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধনী ব্যবসায়ী এবং সাধক, নাম- গিয়াসুদ্দীন হাসান। তাঁর মায়ের নাম, সাইয়েদা উম্মুল ওয়ারা।

তাঁর আবির্ভাবকালে সমগ্র মুসলিম জগতেই ছিল অরাজকতা ও নৈরাজ্য। বিশেষ করে তাঁর জন্মস্থান সিস্তানে মানব জীবনের কোন নিরাপত্তা ছিল না। মারামারি, কাটাকাটি, লুটতরাজ, রাহাজানী লেগেই থাকতো। তাছাড়াও তাতার জাতির অত্যাচারে অতিষ্ট ছিল সাধারণ মানুষ। এরকম পরিস্থিতিতে তাঁর পিতা গিয়াসুদ্দীন হাসান নিরাপত্তার খোঁজে সিস্তান ছেড়ে রাজধানী নিশাপুরে বসবাস শুরু করেন। নিশাপুর ছিল তৎকালীন সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্র। নিশাপুরের নিজামিয়া পাঠাগার ছিল বিশ্বখ্যাত। কিন্তু যে শান্তি ও নিরাপত্তার সন্ধানে পিতা গিয়াসুদ্দিন হাসান সিস্তান ছেড়ে এসেছিলেন তা নিশাপুরেও ছিল না। সুলতান একদিকে তার ভাইদের সাথে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলেন অন্যদিকে, তাকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে হতো। এক পর্যায়ে বহিঃশত্রুদের সাথে যুদ্ধে সুলতানের পতন হলে শত্রুরা রাজ্যে প্রবেশ করে অসংখ্য নিরীহ জনতাকে বিশেষ করে জ্ঞানী-গুণীদের হত্যা করে, নারী ও তরুণদের বলপ্রয়োগে তাদের দাসত্ব করতে বাধ্য করে।

খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি শিশুকাল থেকেই তাঁর পিতার তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া শুরু করেন। তাঁর পিতা একজন প্রখ্যাত আলেম ও আরেফ ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি শরীয়ত ও মারেফাত বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। কথিত আছে, মাত্র ১০ বৎসর বয়সে তিনি কুরআনে হাফেজ হয়েছিলেন।

হিজরী ৫৫১ সালে ১৫ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি পিতৃহারা হন। মা হারিয়েছিলেন এর আগেই। ফলে লোভ, হিংস্রতা, হত্যা ও রাহাজানির মধ্যে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে তিনি একবারেই একা হয়ে যান।

তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি – এঁর মানসে দেশব্যাপী হত্যা, লুণ্ঠন এবং নৈরাজ্যকর পরিবেশ গভীর দাগ কাটে। শিশুকাল থেকেই তিনি যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন তাও তাঁর মনে গভীর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরকম ভয়ংকর পঙ্কিল পরিস্থিতি থেকে তিনি মুক্তির পথ খোঁজেন, ভাবতে থাকেন পরিত্রাণের পথ, নিবিষ্ট হলেন প্রকৃত শান্তির অন্বেষায়। তাঁর দরদী মন নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠে। ঐ সময় থেকেই তিনি অসহায় মানুষের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। যৌবনের সমগ্র শক্তি ও সাহস তিনি ব্যয় করেছেন আধ্যাত্মিক সাধনায়। যৌবনে তিনি বিয়ে করেননি। লক্ষ্য অর্জনের পর, মতান্তরে ৫৯০ হিজরিতে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। তিনি নিজে তাঁর স্ত্রীকে স্ব-ধর্মে দিক্ষীত করেন এবং স্ত্রীর নাম রাখেন বিবি আমাতুল্লাহ।

৬২০ হিজরীতে অর্থাৎ প্রায় ৯০ বৎসর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম বিবি আসমত। বিবি আসমত ছিলেন আজমীরের কমিশনার সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিনের কন্যা। সৈয়দ ওয়াজিউদ্দিন তার কন্যার বিয়ের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। কথিত আছে, তিনি একদিন স্বপ্নে রসুল সা. হতে তার মেয়েকে খাজা মঈন উদ্দিন চিশতি-এঁর নিকট বিয়ে দেবার জন্য নির্দেশিত হন। খাজা ছিলেন আঁতায়ে রসুল অর্থাৎ রসুল সা. এঁর উপহার। তাই তিনি ওয়াজউদ্দিনের প্রস্তাবে সম্মত হলেন।

দুনিয়াদারির হিসেবে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি -এঁর তিন ছেলে এবং এক মেয়ে ছিল। তিন ছেলের নাম – ফখরুদ্দিন, হিসামুদ্দিন, জিয়াদ্দিন। মেয়ের নাম- বিবি হাফিজা জামাল। মতান্তরে জিয়াদ্দিনের মা ছিলেন বিবি আসমত। বড় ছেলে ফখরুদ্দিন আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন এবং দিল্লীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সংস্পর্শে আসেন। ১২৬৫ খৃষ্টাব্দে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীর থেকে ৩৭ মাইল দূরে আজমীর কিকরি রোডে তাকে শায়িত করা হয়। দ্বিতীয় ছেলে হিসামুদ্দিনও সাধক ছিলেন। তিনি ১২৫৫ সালে দেহত্যাগ করেন। তৃতীয় সন্তান জিয়াদ্দিন সম্পর্কে এইটুকুই জানা যায় যে, ৫০ বৎসর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। আজমীরে দরগায় তাকে সমাধিস্থ করা হয়। দুনিয়াদারির হিসেবে তাঁর একমাত্র মেয়ে, বিবি হাফিজা জামাল ছিলেন বিদূষী মহিলা। তার বিয়ে হয়েছিলো সূফী সাধক হামিদ উদ্দিনের ছেলে রাজিউদ্দিনের সাথে। দরগার দক্ষিণ দিকে বিবি হাফিজা জামাল শায়িত আছেন। খাজার সহধর্মীনীদেরকেও আজমীর দরগায় সমাধিস্থ করা হয়।

হিজরি ৬৩৩ সনে (১২৩৩ খ্রি.) ৬ রজবে ৯৭ বৎসর বয়সে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি দেহত্যাগ করেন। ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক আবেগ ও অনুভূতির মহাকর্ষণে প্রতি বছর ৬ রজবে তাঁর উরস বা মহামিলন দিবস উৎযাপন করা হয়। সংক্ষেপে এই তাঁর দুনিয়াদারি জীবন।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত জীবন হচ্ছে সাধনার জীবন, দর্শন এবং দরশনের জীবন। যতদূর জানা যায়, এ জীবনের শুরু হিজরি ৫৫৬ সনে অর্থাৎ ২০ বৎসর বয়সে, একটি বিশেষ ঘটনার মাধ্যমে। ঘটনাটা হলো- হিজরি ৫৫৬ সনে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি একদিন তাঁর বাগানে পানি দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক মজ্জুম সাধক তাঁর দিকে এগিয়ে এলেন। তিনির মজ্জুম সাধকের হাতে চুমু খেয়ে তাঁকে গাছের ছায়ায় বসতে আকুতি জানালেন। বাগান থেকে কিছু আঙ্গুর নিয়ে এলেন তাঁর জন্য। সাধক, তরুণ খাজা মঈন উদ্দিন- এঁর আদব, বিনয় ও আন্তরিক আতিথেয়তায় বুঝতে পারলেন যে, এ তরুণের মধ্যে সত্যের জন্য প্রবল তৃষ্ণা আছে। এই সাধকের নাম শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি। শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি তাঁর নিজ থলে হতে একটা রুটি বা খৈল বের করলেন। রুটিটি চিবিয়ে তিনি খাঁজা মঈন উদ্দিন- এঁর মুখে দিলেন। খাজা কোন দ্বিধা না করে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে খেলেন এবং অসাধারণ এক আত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করলেন। এই দুনিয়া থেকে কিছু সময়ের জন্য তিনি বিচরণ করলেন পরমানন্দলোকে। ভাব জগত থেকে যখন তাঁর প্রত্যাবর্তন হলো তখন আর খুঁজে পেলেন না সাধক শেখ ইব্রাহিম কান্দোজি-কে।

এই ঘটনার পর তাঁর চিন্তার জগতে একটা তীব্র আলোড়ন শুরু হলো। ‘উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল সম্পত্তি অভাবী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে তিনি গৃহত্যাগী হলেন। ২০ বৎসর বয়সী এক তগবগে যুবক তাঁর সর্বস্ব ত্যাগ করে কপর্দকহীনভাবে একাকী লোকালয় ত্যাগ করে বের হলেন এলমে দ্বীন অর্জনের পথে এবং মানবেতর প্রাণীদের মতো জীবন-যাপন শুরু করলেন। কোন পিছুটান না থাকায় তিনি একনিষ্ঠভাবে সাধনায় নিমগ্ন হলেন। জ্ঞানের প্রবল পিপাসায় সমরকন্দ থেকে বোখারা, বোখারা থেকে খোরাসান ছুটলেন। বোখারায় তিনি কুরআনের তফসীর, হাদিস ও ফেকাহশাস্ত্রে গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তিনি প্রথাগত ইসলামী শিক্ষায় সমরখন্দ ও বোখারার বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত ছিলেন। কিন্তু জ্ঞানের তৃষ্ণা যে কেতাবী বিদ্যায় মেটে না। তাই তিনি হাটতে থাকেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের আধার অলি-মাশায়েখগণের দরবারে, মাজারে। সত্যের সন্ধানে দরবার থেকে দরবারে ঘুরে তিনি এসে পৌঁছেন ‘হারুন’ নামক গ্রামে। এখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় খাজা ওসমান হারুনী-এঁর সাথে। তিনি খাজা ওসমান হারুনী-কে তাঁর মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং হযরত ওসমান হারুনীও তাঁকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলেন। এরপর থেকে মুর্শিদের আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এবং একনিষ্ঠ সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। একটানা ১৫ বছর তিনি তাঁর মুর্শিদের সাথে অবস্থান করেন।

খাজা উসমান হারুনীর বয়স যখন ৭০ বছর অতিক্রান্ত, তখন খেলাফত প্রদান করে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি-কে দ্বীন-এ মোহাম্মদী প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আধ্যাত্মিকতায় চিশতিয়া ধারার প্রচার এবং প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু চিশতিয়া ধারাটি শুরু হয়েছিল তাঁর আগে। খাজা উসমান হারুনীর মুর্শিদ ছিলেন খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি। খাজা আবু ইসহাক শামী চিশতি থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় চিশতি ধারা শুরু হয়। খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি তাঁর মুর্শিদের মাধ্যমে চিশতি ধারায় দীক্ষিত হন এবং ভারতবর্ষে চিশতি ধারার ব্যাপক প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন।

নিজের ভক্তশ্রেষ্ঠকে ভারতবর্ষে প্রেরণকালে খাজা উসমান হারুনী বলেছিলেন- ‘বাবা মঈন উদ্দিন সৃষ্ট জীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না।’ নিজের মুর্শিদের এই উপদেশকে আদেশ হিসেবে গ্রহণ করে খেরকান, ওস্তারাবাদ, হেরাত, সবজাওর, বলখ, গজনী, লাহোর, দিল্লী পার হয়ে তিনি আজমীরে পৌঁছেন। আজমীরে এসে তিনি যাত্রা বিরতি করার ও আস্তানা স্থাপনের নির্দেশনা লাভ করেন। যতদিন মানুষের মাঝে মানুষকে নিয়ে ছিলেন তিনি তাঁর মুর্শিদের আদেশ- ‘সৃষ্টজীবের কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করবে না’ বিস্মৃত হননি। প্রত্যাশাহীন কর্ম করে গেছেন আজীবন। তাই লোকে তাঁর নাম দিয়েছে গরীরে নওয়াজ। ‘নওয়াজ’ অর্থ প্রতিপালক। তিনি ছিলেন আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার গরীবের প্রতিপালক ও বন্ধু। আল্লাহ্ হচ্ছেন দাতা। যিনি অকারণে, অহেতুক, প্রত্যাশাহীনভাবে দিতে থাকেন তিনিই আল্লাহ্। আল্লাহ্ বলছেন- তোমরা আমার রঙে রঞ্জিত হও। প্রত্যাশাহীনভাবে দিতে থাকাই আল্লাহ্র রং। এই রঙে যিনি নিজেকে রঞ্জিত করেন তিনিই তাঁর পরিচয় লাভ করেন।

গরীবে নেওয়াজ খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি আল্লাহ্র রঙে নিজেকে রঞ্জিত করেন। তাই লোকশ্রোতি আছে- ‘খাজার দরবারে কেউ ফেরে না খালি হাতে’। খাজা, আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান এবং রাহমাতুললিল আলামীনের উত্তম আদর্শের পরিপূর্ণ বাস্তব উদাহরণ। এজন্যই মানুষ সম্পর্কে তাঁর কোন ভেদজ্ঞান ছিল না। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসহায় ও দিশেহারা মানুষ শান্তি লাভের আশায় ভীড় করেছে তাঁর দরবারে। ধর্মীয় অনুশাসন ও আত্মিকভাবে গরীব মানুষ তাঁর কাছে থেকে সমভাবে উপকৃত হয়েছে এবং এখনও তাঁর নির্দেশনা থেকে সঠিক পথের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছে।

আজমীরের প্রভাবশালী হিন্দুগণ নানা উৎপীড়ন নিপীড়ন অত্যাচার করেও যখন তাঁর প্রচার প্রতিরোধ করতে পারেনি তখন তারা দিল্লি ও আজমীরের নৃপতি পৃথ্বিরাজের কাছে খাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রেরণ করেন। এতে পৃথ্বিরাজ খাজার প্রতি এক পত্র প্রেরণ করে খাজাকে আজমীর ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।

খাজা পত্রের মর্ম অবগত হয়ে বাহককে বললেন, ‘আমি পৃথ্বিরাজকে জীবন্ত বন্দী করে শিহাবুদ্দিন ঘোরীর হাতে তুলে দিলাম’। এ কথা বলার কয়েকদিন পরেই পৃথ্বিরাজ বন্দী হলেন শিহাবুদ্দিন ঘোরীর হাতে। উল্লেখ্য, কোন মুসলিম শাসকের প্রচেষ্টায় বা শক্তির প্রভাবে ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়নি। ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে মূলত খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি এবং তাঁর পরবর্তী হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল, শাহপরান, শাহআলী, শাহ সুলতান প্রমুখ সূফী সাধকদের প্রচেষ্টায়।

সুদীর্ঘ কালের সাধনা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে খাজা মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি যে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন সে জ্ঞানের জ্যোতি ছড়িয়েছে তাঁর কালজয়ী লেখার মাধ্যমে। কাব্যের অনুপম ছন্দে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর অর্জিত তত্ত্ব। তিনি এক চিরঞ্জীব কবি ও সাহিত্যিক, তত্ত্বজ্ঞান ও দর্শন ভান্ডার। সূফীতত্ত্বকে যে অসাধারণ বাক্যচয়নে তিনি প্রকাশ করেছেন তা সত্যানুসন্ধানী ও জ্ঞান-পিপাসুদের কাছে চিরন্তন আলোকবর্তিকা।

শুধুমাত্র একটা গজলে সাধক কবি মঈন উদ্দিন হাসান চিশতি সূফীতত্ত্বের সবটুকু প্রকাশ করেছেন, শব্দের সীমানায় আবদ্ধ করেছেন অসীমকে। তাঁর গজল পাঠে ব্যক্তি মানস হারিয়ে যেতে থাকে অসীম শূণ্যতায়। এমনই একটি গজলে খাজা আল্লাহ্কে উদ্দেশ্য করে বলছেন-

‘আমরা তোমাকে অন্বেষণ করি আর তুমি আমাদের থেকে পালিয়ে বেড়াও, আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো।

আমরা তোমার দিকে ঝুঁকে থাকি আর তুমি আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো।

আমরা ছয়দিক থেকে বেড়িয়ে এসে শতদিকে তোমাকে অন্বেষণ করি। আমাদের দিকে না তাকিয়ে আর কতকাল তুমি সবদিকে নিজেকে ব্যস্ত রাখবে ?’

সত্যের অন্বেষণে ব্যাকুল আত্মার এটাই শ্বাশ্বত প্রশ্ন। এই প্রশ্নের জবাবে কবি আল্লাহ্র জবানীতে গেয়ে উঠেন-

‘হে বেখবর, তুমি যেখানেই থাক না কেন, আমাদের সাথেই আছো আমরা তোমাকে ছাড়া থাকি না, যদি না তুমি থাক আমাদের ছাড়া।

আমরা সমুদ্র, তুমি মেঘমালা, কাজেই বারি বর্ষণের চিন্তা করো না। যদি তুমি অশ্রুজল ফেলো তবে তোমার বাগিচা হবে হাস্যোজ্জ্বল। মারেফাতের নিগূঢ়তত্ত্ব আরো স্পষ্ট করার জন্য তিনি আবার পরম করুণাময়ের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘তাকে বললাম, পর্দার অন্তরালে আর কতকাল গোপন থাকতে চাও?

সে সময় এসেছে যখন তুমি আমাদের কাছে চেহারা ঢেকে রাখতে পারবে না।

আল্লাহ্ উত্তরে বললেন,- ‘আমি পর্দাবিহীন, যদি কোন পর্দা দেখ তবে তা- ‘তুমিই’।

তুমি আছো হাজার পর্দায় ঢেকে আমাদের থেকে।

তুমিইতো তোমার হকিকত, কতদিন আর এনাম ওনামে চলবে? (আমিত্বের আবরণ) এ এক অনর্থক অস্তিত্ব, তা তুলে নাও আমাদের থেকে।’

খাজার এই একটি মাত্র গজলে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার সকল প্রশ্নের উত্তর। খাজা কেবল একজন কবিই নন, তিনি একজন জ্ঞানবান প্রবন্ধকার। খাজা যেসব প্রবন্ধ তাঁর ভক্তশ্রেষ্ঠ, প্রধান খলিফা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকিকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, তাতে প্রকাশিত হয়েছে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দার্শনিক ও সূফীতাত্ত্বিক তাৎপর্য, যা সাধনায় রত প্রত্যেকের জন্য আলোকবর্তিকা।

পঞ্চস্তম্ভের প্রথমে রয়েছে কালেমা তাইয়্যেবা। কালেমা তাইয়্যেবা বা তওহিদতত্ত্বের হকিকত সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তার মর্মার্থ হলো-

মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু’ বললেই কালেমা তাইয়্যেবার দায়িত্ব শেষ হয় না। কি বলা হচ্ছে তা হৃদয়াঙ্গম না করে শুধু মুখে উচ্চারণ করলে তা মানবিক উচ্চারণই হয় না। ‘নাই কোন মাবুদ আল্লাহ্ ব্যতিত’- এ কথা উচ্চারণের আগে প্রথমে জানতে হবে এর নিগূঢ়তত্ত্ব, তারপর নিজের জানাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে।

নিজের মাবুদগুলোকে নাই করতে পারলেই কেবল ‘ইল্লালাহু’ বলার তাৎপর্য আছে, অন্যথায় মুখে এই কালেমা পড়ার কোন তাৎপর্যই নেই। ‘লা ইলাহা’ দ্বারা সাধক প্রথম নিজের আমিত্ব ও প্রবৃত্তির দাসত্বকে অস্বীকার করবে এবং ‘ইল্লালাহু’ দ্বারা আল্লাহ্ আমিত্বের প্রভুত্ব মেনে নেবে। ‘লা ইলাহা’ প্রবৃত্তির দাসত্বের স্তর আর ‘ইল্লালাহু’ আল্লাহর প্রেমের স্তর। ‘ইল্লালাহু’ স্তরে প্রবৃত্তির দাসত্ব থাকতে পারে না। তাই এই স্তরে শুধু ‘ইল্লালাহু’ আছে কিন্তু ‘লা ইলাহা’ বলার কোন অর্থ নেই। এই স্তরে উপনীত হয়েই সাধকগণ শুধু ‘ইল্লালাহু’ জিকির করেন, ‘লা ইলাহা’ বলেন না। মুনসুর হাল্লাজ এই স্তরে উপনীত হয়েই বলেছিলেন ‘আনাল হক’; বায়েজিদ বলেছিলেন ‘আমি-ই পবিত্র সত্তা’; ফরিদ বলেছিলেন ‘আমি-ই সে’। তাই খাজা বলেন ‘মনে রেখো যে পর্যন্ত সালেক তার চিন্তাজগত থেকে গায়রুল্লাহ্ খেয়াল দূরীভূত করতে না পারবে অর্থাৎ যে পর্যন্ত ‘লা ইলাহা’ না বলতে পারবে সে পর্যন্ত সে মারেফাতের রাস্তায় এক কদমও অগ্রসর হতে পারবে না। আরেফ-কামেল আল্লাহ্কে স্মরণ করাও বিস্মৃত হয়। কারণ, স্মরণও এক প্রকারের দ্বিত্ব এবং দ্বিত্ব আরেফের কাছে কুফরি তুল্য। যে পর্যন্ত শিক্ষার্থী হকিকতের এ তত্ত্ব উপলব্ধি করতে না পারবে সে পর্যন্ত সে তওহিদের মর্ম বুঝতে পারবে না এবং দ্বিত্বের সাগরে ডুবে থাকা অবস্থায় তওহিদভুক্ত হবার দাবি করা বিলকুল মিথ্যাচার বলে প্রতিপন্ন হবে।’ এইভাবে একবার যে ব্যক্তি কালেমা পড়তে পাড়বে নিশ্চয়ই শান্তি হবে তাঁর ঠিকানা।

ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাত। খাজা সালাতকে দুইভাগে বিভক্ত করেন। রুকু, সেজদা, কেয়াম, কেরাত সম্বলিত লোক দেখানো সালাত এবং আম্বিয়া ও আউলিয়াগণের সালাত যা হুজুরি কালব্ সহকারে আদায় করা হয়। কুরআন প্রথমোক্ত সালাতকারীদের জন্য অর্থাৎ লোক দেখানো নামাজীদের জন্য ধ্বংস নেমে আসবে বলে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছে। এ ধরনের লোক দেখানো নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্ পরিচয় লাভ করা যায় না। খাজা বলেন ‘লোক দেখানো নামাজ একেবারে মূল্যহীন শারীরিক কসরত মাত্র। সাধকগণ হুজুরি কালব সহকারে হকিকি সালাত করেন এবং তাঁরা সর্বদা নিজেদেরকে গায়রুল্লাহ্র খেয়াল থেকে মুক্ত রাখেন। তারা সালাতে স্বীয় লতিফাগুলোকে আল্লাহ্র জেকের ও ফেকেরে মশগুল রাখেন এবং প্রতিটি নিঃশ্বাসের হিসাব তারা রাখেন। তাঁরা ইয়াদে ইলাহি ব্যতিত কোন নিঃশ্বাস ছাড়েন না। এরাই প্রকৃত সালাতি।

সালাতের হকিকত হলো আমিত্বের আবরণগুলো উন্মোচন করার প্রচেষ্টা। এই সালাত রুকু, সিজদা ও কেয়ামে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের আল্লাহ্ ব্যতীত চিন্তাজগত থেকে অন্য সকল চিন্তাকে দূরীভূত করা এবং চিন্তায় কেবলমাত্র আল্লাহ্ প্রতিষ্ঠিত করাই সালাতের তাৎপর্য। এই সালাত নিশ্চয়ই সালাতকারীর জন্য মেরাজ অর্থাৎ আল্লাহ্ সাক্ষাৎ। যে সালাতে মেরাজ হয় না তা লোক দেখানো নামাজ হয় কিন্তু কুরআনিক সালাত হয় না।

ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ সিয়াম। সিয়ামের তাৎপর্য হচ্ছে নিজেকে দ্বিন এবং দুনিয়ার আশা-আকাঙ্খা থেকে মুক্ত করা। দ্বিনের আশা-আকাঙ্খা হচ্ছে বেহেশতের আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি ও হুরের লোভ। এসব লোভ ও আশা-আকাঙ্খা সাধকের জন্য পরিত্যাজ্য। কারণ, এসব আকাঙ্খাও আল্লাহ্ ও বান্দার মাঝে আবরণের সৃষ্টি করে। যতক্ষণ সাধকের মনে বেহেশতের লোভ থাকে ততক্ষণ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায় না। দুনিয়ার প্রতি লোভ হচ্ছে অর্থ-বিত্ত, নাম-যশ ও ক্ষমতার লোভ। এসব লোভ শেরেক পর্যায়ভুক্ত। খাজা বলেন ‘সিয়াম হকিকি তখনই সঠিক হবে যখন মানুষ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য সবকিছু চিন্তাজগত থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, যাতে গায়রুল্লাহ্ ধারণা পর্যন্ত থাকে না এবং সব রকমের আশা ও ভয় থেকে চিত্ত মুক্ত হয়।’

সাধারণ মানুষ প্রথমে রোজা রাখে এবং রোজা শেষে ইফতার করে। কিন্তু হাকিকি সিয়াম শুরু হয় ইফতার দিয়ে। সিয়ামের জন্য ইফতার শর্ত নয় বরং ইফতারের জন্য সিয়াম শর্ত। সাধকের অবস্থা এমন নয় যে, তিনি বছরে একমাস সিয়াম বা সংযম করবেন আর বাকী সময় সংযম ভঙ্গ করবেন। সাধকের সংযম একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তিনি সংযম করেন কিন্তু কখনো তা ভঙ্গ করেন না। সাধকের ইফতার দিদারে এলাহি।

খাজা বলেন ‘মনে রেখো, যে ব্যক্তির শায়েখ, মুর্শিদ বা পথ প্রদর্শক নেই তার দ্বিন নেই। যার দ্বিন নেই তার মারেফাতে এলাহি নেই। যার মারেফাতে এলাহি নেই সত্যপথের পথিকদের সাথে তার সম্পর্ক নেই।

সত্যপথের পথিকদের সাথে যার সম্পর্ক নেই তার কোন শুভাকাঙ্খী নেই। যার শুভাকাঙ্খী নেই তার কোন বন্ধু বা মাওলা নেই।’ যার মাওলা নেই তার সিয়াম থাকবে কি করে?

সিয়ামের পরেই আসে যাকাতের প্রসঙ্গ। শরীয়তের দৃষ্টিতে শতকরা আড়াই ভাগ অর্থাৎ ১০০ টাকার মধ্যে আড়াই টাকা অভাবীদের দেয়া যাকাত কিন্তু তরিকতের দৃষ্টিতে আড়াই ভাগ নিজের জন্য রেখে বাকী সব বিলিয়ে দেয়া যাকাত। সুরা বাকারর ২১৯ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন, ‘লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করে কি তারা ব্যয় করবে? বলে দাও উদ্বৃত্তের সমুদয়।’ প্রশ্ন হচ্ছে ‘উদ্বৃত্তের সমুদয়’ বলতে কি বুঝায়? উদ্বৃত্ত কি শুধু ধন-সম্পত্তি? ধন-সম্পত্তি তো বাহ্যিক উদ্বৃত্ত। আয় থেকে ব্যয় বাদ দিলে যা থাকে তা আর্থিক উদ্বৃত্ত। আর কোন উদ্বৃত্ত কি মানুষের নেই? সন্তান জন্ম দেয়া ব্যতিত মানুষের কাম শক্তির সবটাই উদ্বৃত্ত। এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহ্ উদ্দেশে উৎসর্গ করার নাম যাকাত। দৈনিক ৮ ঘন্টা কাজের শেষে যে সময়টুকু থাকে সে সময়টুকুও উদ্বৃত্ত। এই উদ্বৃত্ত সময় আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার নাম যাকাত। একইভাবে, মেধা, বুদ্ধি, শারিরীক ও মানসিক শক্তিরও উদ্বৃত্ত আছে। কার, কোথায়, কতটুকু উদ্বৃত্ত আছে তা তাকেই খুঁজে বের করতে হয় এবং এই উদ্বৃত্তের সমুদয় আল্লাহ্ পথে ব্যয় করার নাম যাকাত।

মুক্ত মানুষেরই যাকাত দেবার অধিকার আছে। যে ব্যক্তি মুক্ত নয় তার যাকাত নেই। সুতরাং যাকাত প্রদানের পূর্বশর্ত হচ্ছে মুক্ত হওয়া। যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির বন্ধনে আবদ্ধ তার প্রথম যাকাত হচ্ছে প্রবৃত্তিকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে আনা। যে ব্যক্তি নফসের দাসত্ব করে সে কোন যাকাত দিতে পারে না।

যাকাত দিতে পারে কেবল সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ। উন্মাদের উপর যাকাত দেয়ার কর্তব্য বর্তায় না। যে ব্যক্তি অনাবশ্যক বাক্য ব্যয় করে, জীবনীশক্তিগুলোর অপচয় করে, সকালে এক কথা আর বিকালে অন্য কথা বলে, মিথ্যাচার ও আত্মপ্রঞ্চনা করে, নিজের জিহ্বার উপর যার কোন নিয়ন্ত্রন নেই তাকে কি সুস্থ মানুষ বলা যায়? একজন সুস্থ মানুষ হচ্ছে যে জানে সে কি চায়, যে জানে কেন সে জীবন যাপন করছে। একজন সুস্থ মানুষের জীবন কর্মবৃত্তের একটা কেন্দ্র থাকবে।

একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকবে। লক্ষ্যহীন জীবন হচ্ছে ‘ন’ ছাড়া জীবন অর্থাৎ জীবের জীবন, জীবের জীবন সুস্থ মানুষের জীবন নয়। সুতরাং যাকাত দিতে হলে প্রথমে সুস্থ হতে হবে অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য বা কাবা ঠিক করতে হবে।

নাবালকের কোন যাকাত নাই। সাবালকের যাকাত আছে। মানুষের নাবালকত্ব আর সাবালকত্ব বয়সের উপর নির্ভর করে না। নাবালকত্ব হচ্ছে নিজেকে রক্ষা করার জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীলতা। মানুষ আল্লাহ্ ছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের উপর নির্ভরশীল থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে নাবালক।  যে ব্যক্তি তার প্রতিটি কর্মের জন্য ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ অর্থাৎ মানুষের গ্রহণশীলতার উপর নির্ভরশীল থাকে সে সাবালক নয়। যে সাবালকই হয়নি তার যাকাতও নেই। সাবালকত্ব হচ্ছে ‘অনেষ্টি টু দ্যা পারপাস, সিনসিয়ারিটি টু দ্যা পারপাস’। সাবালকত্ব হচ্ছে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের যোগ্যতা। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের পরিপূর্র্ণ দায়িত্ব নিজে নিতে না পারে, যতক্ষণ  পর্যন্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তার নিষ্ঠা, সততা ও একাগ্রতা প্রতিষ্ঠিত না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে সাবালক বলা যায় না।

পঞ্চস্তম্ভের শেষ স্তম্ভটি হজ। হজে কাবাকে প্রদক্ষিণ করতে হয়। খাজা বলেন ‘ইনসানের দেল খানায়ে কাবা এবং মোমিনের দেল আল্লাহ্র আরশ। এ দেল কাবার হজ করা প্রয়োজন।’ এই দেল কাবার হজ সম্পন্ন করতে হয় ‘ইন্দ্রিয়সমূহের নিকট আগমনকারী সকল বিষয়বস্তু ও ইন্দ্রিয়সমূহের দ্বারা ঘটিত সকল কর্ম সূক্ষèভাবে দর্শন করার মাধ্যমে।’

ইন্দ্রিয়সমূহ বহির্মুখি। ইন্দ্রিয়সমূহের বর্হিমুখিতাই চিত্তচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এই চিত্তচাঞ্চল্যের প্রভাবে মানুষ অশান্ত হয়। ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ, স্পর্শ প্রবেশ করে নিজের ভেতরে। প্রতিটি শব্দ, দৃশ্য, স্পর্শ, গন্ধ, স্থান করে নেয় অস্তিত্বে, সৃষ্টি করে মিথ্যা আমিত্ব। ফলে, স্তরে স্তরে আবৃত হয় এক, একক এবং অদ্বিতীয় ‘আমি’। মিথ্যা আমিত্বের আবরণ উন্মোচন করলে অপরিবর্তনীয় আমির সাক্ষাৎ মেলে। তাই খাজা বলেন, ‘সন্দেহ, গোমরাহি ও গায়রুল্লাহ্ পর্দা দূরীভূত করলে দেলরূপ আয়নায় আল্লাহ্ জাতের জলোয়া প্রত্যক্ষ নজরে আসবে। এটাই খানায়ে কাবার হজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ রকম হকিকি হজের আরো একটা বিশেষ উদ্দেশ্য হলো ইনসান মিথ্যা আমিত্বকে এমনভাবে মিটিয়ে দেবে যেন এই আমিত্বের কোন নাম-গন্ধও অবশিষ্ট না থাকে। এ পর্যায়ে সে ভেতর-বাহিরে সমভাবে পবিত্র হবে এবং দেল আল্লাহ্ সিফাতে গুণান্বিত হবে।’ খাজা লিখেছেন ‘এরপর উমর জিজ্ঞেস করলেন, কাবায়ে দেলের হজ কে সমাধা করে? রসুল সা. উত্তরে বললেন, ‘কাবায়ে দেলের হজ একমাত্র খোদ মহিমান্বিত সত্তা সমাধা করে থাকে। অর্থাৎ বান্দা যখন নফসের বন্দেগিরূপ পর্দা দূর করে দেয় এবং আবেদ ও মাবুদের মধ্যে যখন কোন পর্দা অবশিষ্ট থাকে না তখন সে সিফাতে এলাহিতে সামিল হয়ে যায় এবং তখন তার দেলে জাতে এলাহি প্রকাশ পায়। বান্দার দেলে আল্লাহ্ জাতের প্রকাশ হওয়াই কাবায়ে দেলের হজ বা হকিকি হজ।’

‘কেউ ফেরে না খালি হাতে খাজা তোমার দরবারে।’ খাজার দরবারে চাইতে জানলে এখনো কেউ খালি হাতে ফেরে না। কিন্তু এসব চাওয়া পাওয়ার ব্যাপারে খাজা বলেন যে ব্যক্তি আল্লাহ্কে চিনতে সক্ষম হয়েছে সে কখনো আল্লাহ্ কাছে কিছু চায় না।’ এইসব চাওয়া পাওয়া থেকে যে ব্যক্তি নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছেন তিনিই আল্লাহ্ পরিচয় লাভ করেন।

খাজা বলেন

‘নিজের সম্মুখ থেকে চাওয়া-পাওয়ার নেকাব তুলে ফেলো

হৃদয়ের আয়নায় তুমি মাওলার সৌন্দর্য দেখো।

সাধুতার কাঁচ দিয়ে আঘাত কর ভৎসনার পাথরে

তাকওয়ার মর্যাদাকে ঢেলে দাও প্রেমালয়ে।’

খাজার এই আহ্বান আঘাত করে অস্তিত্বের অতলান্তে। তাই তাসাউফ ভুবনে খাজা চিরঞ্জীব, অবিস্মরণীয়। প্রায় হাজার বছর ধরে সত্যানুসন্ধানীরা তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ দিয়ে আসছেন। পৃথিবীতে মানুষ যতদিন থাকবে ততদিন এ ধারাও থাকবে অব্যাহত। খাজা বলেন

‘প্রেমাস্পদ এমন আগুন জ্বালিয়েছে যা

আমার দেহ ও প্রাণ পুড়ে ফেলেছে,

ভাবলাম, আহ্ করে চীৎকার দেবো,

অমনি আশা ও ভাষা পুড়ে গেছে।

বিরহ অনলের তাপ ও জ্বালা দোজখের আগুনেও নেই

হায়! এ আগুন আমার ভেতরটাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে।

দোজখের আগুন দগ্ধ করে শুধু গুনাহ্গারদের চামড়া তাঁর বিরহের আগুন দগ্ধ করেছে আমার হাড়ের ভেতরের মজ্জা।

হৃদয় দোজাহানের নেয়ামত ও তার পরিণাম কামনা করেছে

প্রেমাস্পদের আগুন এসে আমার

দোজাহানই পুড়ে ছাই করেছে।

দুনিয়া ও আখেরাত চলে যাক্,

শুধু মাওলার প্রেম থাকাই যথেষ্ট।’

যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর নির্ভরশীল তাঁর জন্য তাঁর আল্লাহ-ই যথেষ্ট। আমিন।  (পুনঃপ্রকাশিত)