করোনার টিকা নিয়ে বিতর্ক, গুজব ও অনীহা!

হাসান জামান টিপু ॥ সারাবিশ্ব জুড়েই করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। টিকা তৈরীকারক কোন কর্তৃপক্ষই দাবী করেননি টিকাটি ১০০% ভাগ কার্যকর। টিকা এখন বিশ্বজুড়ে মানুষ গ্রহণ করছেন নানান বিতর্কের মধ্যে। বিতর্কগুলি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ ঘটা করে প্রচার-অপপ্রচার চলছে- বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়।

ভ্যাকসিন আসার আগে মানুষের আগ্রহ ছিল। আসার পর সেই আগ্রহে যেন ভাটা পড়েছে। ভ্যাকসিন নিয়ে এক ধরনের অনাস্থা দৃশ্যমান। চলছে বিতর্ক। শুধু বাংলাদেশেই নয়, কমবেশি আস্থাহীনতা ও বিতর্ক চলছে প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশে। ভ্যাকসিন নিয়ে অনাস্থা কেন? মূল কারণ কী?

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ভারতে উৎপাদন করছে সেরাম ইনষ্টি টিউট অব ইন্ডিয়া। যার ভারতীয় নাম ‘কোভিশিল্ড’। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মাধ্যমে সেই ভ্যাকসিনই কিনেছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে যে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন বাংলাদেশ উপহার হিসেবে পেয়েছে, সেটাও অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন। এর বাইরে রয়টার্সের একটি সংবাদ নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে যে, ভারত তাদের প্রতিষ্ঠান ‘ভারত বায়োটেক’ উদ্ভাবিত ভ্যাকসিনের ট্রায়াল বাংলাদেশে করতে চায়। বায়োটেকের সেই ভ্যাকসিনের নাম ‘কোভ্যাক্সিন’। কিন্তু, সেটি বাংলাদেশে  ট্রায়াল নিয়ে এখনো কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারত থেকে বাংলাদেশ উপহার হিসেবেও সেই ভ্যাকসিন পায়নি।

যখন কোন ভ্যাকসিন প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্যাযয়র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলে, তখন সেটি অল্পসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকের উপর করা হয়। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য থাকে টিকাটি নিরাপদ কি-না এবং কী পরিমাণ ডোজ প্রয়োগ করতে হবে। তবে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে এসব ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয় হাজার হাজার মানুষের ওপর। এই পর্যায়ের পরীক্ষায় দেখা হয় টিকাটি আসলে কতটা কার্যকর। ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচনার মূলে হলো কতকগুলি গুজব।

১. ভ্যাকসিনটি ডিএনএ বদলে দিবে এরকমটি দাবী করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বৈজ্ঞানিকরা এ ধারণা অমূলক বলেছেন। বিবিসি এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল তিনজন স্বতন্ত্র বিজ্ঞানীর কাছে। তারা বলেছেন, করোনাভাইরাসের টিকা মানবদেহের ডিএনএ-তে কোন পরিবর্তন ঘটায় না। করোনাভাইরাসের যেসব নতুন টিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে ভাইরাসটির একটি জেনেটিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এটিকে বলা হয় মেসেঞ্জার আরএনএ। ব্রিটেনে সদ্য অনুমোদন করা ফাইজার এবং বায়োএনটেকের টিকাটিও একইভাবে তৈরি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জেফরি অ্যালমন্ড বলছেন, ‘একজনের শরীরে যখন ইনজেকশনের মাধ্যমে আরএনএ ঢুকিয়ে দেয়া হয়, তখন এটি মানবকোষের ডিএনএ-তে কোন প্রভাবই ফেলে না।’

এই টিকা আসলে কাজ করে মানুষের শরীরকে এক ধরনের নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে এমন এক ধরনের প্রোটিন তৈরি হয়, যা করোনাভাইরাসের উপরিভাগে থাকে। মানুষের শরীরের যে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, এটি তখন এরকম প্রোটিন শনাক্ত করে এবং এর বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করতে পারে। তখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে আরএনএ (এমআরএনএ) ভ্যাকসিন প্রযুক্তি এর আগে কখনো পরীক্ষা করা হয়নি এবং অনুমোদনও করা হয়নি।

এটি সত্য যে, বর্তমান সময়ের আগে এমআরএনএ টিকা কখনও অনুমোদন করা হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে মানুষের শরীরে এমআরএনএ টিকা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। আর করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে এই টিকার পরীক্ষা চালানো হয়েছে হাজার হাজার মানুষের ওপর। অনুমোদনের জন্য এই টিকাকে খুবই কঠোর এক যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এবং ডিএনএ পরিবর্তন সংক্রান্ত কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

২. করোনার টিকা তৈরীতে শুকুরের জেলেটিন ব্যবহার করা হয়েছে এরকম একটি বিতর্ক তৈরী হয়েছে।  বায়োনটেক-ফাইজারের টিকা অনুমোদন দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম করোনা টিকা দেয়া শুরু করে যুক্তরাজ্য। তখনই শুরু হয় এ বিতর্ক। ইসলামের দৃষ্টিতে শূকরের মতো কিছু পশুকে হারাম বা খাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়। কিন্তু টিকা তৈরিতে যে কোলেস্টেরল ব্যবহার হয়েছে তার উৎস নিয়েই বাধে বিপত্তি মুসলিমদের আশঙ্কার জায়গা ছিল এই কোলেস্টেরল শূকরের চর্বি থেকে ব্যবহার না হলেও সঠিকভাবে জবাই না করা অন্য কোনো পশু, যেমন গরুর চর্বি থেকেও তৈরি হতে পারে৷

‘টিকা হারাম’ দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণার ফলে ব্রিটেনের মুসলিমদের মধ্যে টিকা নেয়ার বিষয়ে অনাগ্রহ দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও দেখা দেয়। ফলে বিতর্ক শুরুর কয়েকদিনের মাথায় ব্রিটিশ ইসলামিক মেডিক্যাল এসোসিয়েশন- বিআইএমএ এই বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বিআইএমএ জানায় এ বিষয়ে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানান, ‘এই টিকা তৈরিতে কোনো পশুজাত দ্রব্য বা কোষ ব্যবহার করা হয়নি।

ব্রিটেনের কয়েকজন মুফতি একটি ফতোয়ায় ‘সবশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী’ বায়োনটেকের টিকাকে ‘হালাল’ বলে ঘোষণাও দেন, কিন্তু তাতেও থামেনি বিতর্ক।

সৌদি আরবসহ বেশ কিছু মুসলিম রাষ্ট্রেও এরই মধ্যে বায়োনটেকের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও শুরু হয়েছে এই বিতর্ক। অবশ্য বাংলাদেশে আমদানীকৃত সেরাম ইনষ্টি উটের তৈরী অক্সফোর্ড – আস্ট্রোজেনকার টিকায় এধরনের বিতর্ক আজ পর্যন্ত দেখা দেয়নি।

৩. আরেকটি গুজব হলো মাইক্রো চিপ টিকার মাধ্যমে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে যা দ্বারা মানুষের গোপনীয়তা ভঙ্গ হবে। গত মার্চ মাসে যখন বিল গেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শেষ পর্যন্ত আমাদের এক ধরনের ডিজিটাল সার্টিফিকেটের দরকার হবে, তখন এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি বলেছিলেন, করোনাভাইরাস থেকে কে সেরে উঠেছে, কাকে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কে এই রোগের টিকা পেয়েছে সেটা জানার জন্যই এই ডিজিটাল সার্টিফিকেটের দরকার হবে। তার সাক্ষাৎকারে তিনি কোন ধরণের মাইক্রোচিপের কথা উল্লেখই করেন নি। কিন্তু এই ঘটনার পর ব্যাপকভাবে শেয়ার করা একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিল গেটস মাইক্রোচিপ ইমপ্লান্ট ব্যবহার করবেন।’ এই প্রতিবেদনে গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থে পরিচালিত একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছিল। গবেষণাটি ছিল এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে, যার মাধ্যমে কাউকে ইনজেকশনের মাধ্যমে টিকা দেয়ার সময়েই বিশেষ এক কালিতে সেই টিকা দেয়ার রেকর্ড সংরক্ষণ করে রাখা যাবে। এই প্রযুক্তি কোন মাইক্রোচিপ নয় এটি বরং অনেকটা একটা অদৃশ্য ট্যাটু বা উল্কির মত। ‘এটি এখনও চালু করা হয়নি এবং এই প্রযুক্তি দিয়ে লোকজনকে ট্র্যাক করা অর্থাৎ তাদের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব নয়। আর কারও কোন ব্যক্তিগত তথ্যও এর মাধ্যমে ডেটাবেজে ঢোকানো হবে না’- বলছেন এই গবেষণার সঙ্গে জড়িত একজন গবেষক আনা জ্যাক লেনেক।

এবারের মহামারিতে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস সম্পর্কে আরো বহু ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। বিল গেটস প্রতিষ্ঠিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান মূলত কাজ করে জনস্বাস্থ্য এবং টিকা উদ্ভাবন নিয়ে। একারণেই তিনি এই ধরনের গুজবের টার্গেট হয়েছেন। বাংলাদেশে কতিপয় ধর্মান্ধ মুফতি এ গুজব প্রচার করেন। মানুষ বিশ্বাস কতটা করে তা গবেষণার দাবী রাখে।

৪. টিকাটি ভারতীয় প্রতিষ্টান কর্তৃত প্রস্তুতকৃত। তার মানে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে এ টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন। ভারত বিনামূল্যে কুড়িলাখ ডোজ টিকা সর্বপ্রথম বাংলাদেশে পাঠায় । প্রথম পাঠানোর কারণে একটা কথা উঠে বাংলাদেশের মানুষকে গিনিপিগ বানানোর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে। ধারণা দৃঢ় করে ভারত বায়োটেকের একটি আবদার। ভারত বায়োটেক, ভারতীয় টিকা তৈরীতে গবেষণার জন্য বাংলাদেশে সরকারের কাছে  ট্রায়ালের আবেদন জানায়। যা এখনো অনুমোদিত হয়নি। আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা চলে আসে অনেকটা ভারতীয় টিকা জেনারালাইজ করে। মূলত সেরাম ইনষ্টি টিউটে যে টিকা তৈরী করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে যা ভারতীয় সরকার উপহার হিসাবে দিয়েছে ও বেক্সিমকো ফার্মা আমদানি করছে তা অক্সফোর্ডের গবেষণালদ্ধ, সেরাম ইনষ্টি টিউটে এশিয়াতে উৎপাদনের জন্য অনুমোদিত।

আর ভারত বায়োটেক একটা আলাদা ঔষধ কোম্পানি যারা দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ভ্যাকসিন আবিস্কার নিয়ে। ভারতের তামিলনাড়ুর একজন মন্ত্রীসহ সাধারণ প্রচুর মানুষ এ টিকা নিয়েছেন তবুও এব্যাপারে ভারতীয় অনেকেই মন্তব্য করেছেন প্রতিষ্ঠানটি তাড়াহুড়ো করছে টিকা তৈরী ও গবেষণার ক্ষেত্রে। সিরাম ইনষ্টি টিউটের প্রধান নির্বাহীর একটা মন্তব্য বিতর্ক ও আশংকাকে অনেকটা বাড়িয়ে দেয়। তিনি সম্প্রতি বলেছেন ‘ভারত বায়োটেকের টিকায় পানি ছাড়া কিছু নাই। ‘এ বক্তব্যটি অবিবেচনাপ্রসুত ও ব্যবসায়িক চিন্তা থেকে করা।

৫. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটা ভয় কাজ করছে। প্রতিটি ঔষধের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে এবং তা অস্বাভাবিক নয়। শিশুদের টিকা দিলে জ্বর আসে, ছোট বেলায় আমরা যখন বসন্তের টিকা দিতাম তখন শরীর ব্যাথাসহ নানা সমস্যা দেখা দিত। তবুও আমরা টিকা নিয়েছি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টিকার যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তা পরিসংখ্যানগত দিক থেকে খুবই নগন্য। মানুষ মারা যাচ্ছে এটা একটা গুজব। কারণ টিকা পরবর্তীদেশসহ ইউরোপে যারা যারাই মারা গেছে বিশ্বব্যাপি তারা সকলেই ষাটোর্ধ। এটা নিশ্চিত করা যায়নি মৃত সকলেই টিকা গ্রহণের ফলে মৃত্যুবরণ করেছেন।

এইসব বিতর্ক ও হারাম হালালের ব্যাপার স্বত্বেও বাংলাদেশে টিকা নেওয়ার অনীহার অন্যতম কারণ টিকাটি ভারতে তৈরী ও ভারত আমাদের উপহার হিসাবে দিয়েছে। স্থুল ও ঠুনকো এই ভারত বিরোধিতা কারণ ভারতীয় চিকিৎসা বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয়। ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য আমরা ব্যবহার করছি। এই বিরোধিতা অসার প্রমানিত হবে অচীরেই। টিকা নেওয়ার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো করোনার মহামারী বাংলাদেশে ব্যাপক আকারে দেখা দেয়নি তাই ‘করোনা হলে কিছু হয় না’ আর রিকায় করোনা সারবে না এরকম কতকগুলি উন্নাসিকতা কাজ করছে।

বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে অনেক বিতর্ক ও সমস্যা স্বত্বেও ইপিআই কর্মসূচীর আওতায় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম  রোল মডেল। যেহেতু বিশ্বে টিকা একসময় অপরিহার্য হয়ে উঠবে, বিদেশে যেতে, বিমান ও গনপরিবাহন ব্যবহার করতে টিকা আবশ্যক হবে তখন মানুষ ঠিকই এই টিকা গ্রহণ করবে।