কয়লা পোড়া দেহের শহর-বাজারের ইতিবৃত্ত উজানে ঢেউ মাড়িয়ে জীবনের খোঁজ যারা পেয়েছেন – তাঁরাই আদর্শ

নজরুল ইশতিয়াক ॥ আধুনিক সমাজে বাজারের অন্য সব পণ্যের মতই মানুষের সব কিছু ক্রয় বিক্রয় হয়। পণ্যের বাজারে যেমন সিন্ডিকেট রয়েছে, একটি ব্যবস্থাপনা আছে, আছে প্রবেশাধিকারের কঠোর বিধিনিষেধ। তেমনি হাল আমলে মানুষ নামক পণ্য কত দামে কতটুকু কোথায় বিক্রি হবে সেটাও শক্ত নিয়মে বাঁধা।

দূর থেকে সেটা বোঝা যায় না। শৈশবে কৈশোরেও অজানা থাকে। শহুরে শিক্ষিত পিতা-মাতা বিষয়টা জানে বলে পণ্য মান উপযোগী সন্তান প্রসব ও বৃদ্ধি  নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বাজার উপযোগী করেই গড়ে তোলা সন্তানকে। সমাজ রাষ্ট্র পরিবার সবই বৃহত্তর বাজারেরও নানা স্তর। ফলে বাজারে যখন ধর্ম, পেশা পরিচয়, গোষ্ঠী ঐক্য, সমাজ সেবার নামে ঐক্য, দারিদ্র্য বিমোচন নামক ঐক্য চড়া দামে বিক্রয় হয়। বিপরীতে সৌখিন ক্রেতা হিসেবে গান, কবিতা, শিল্পকলার বাজার মূল্য নির্ধারিত হয়। তখন জীবন হয়ে উঠে কেবল ঘৌড় দৌড়। ভীড় বাড়তে থাকে সেই পথে।  সম্পর্ক বুনন সবই তখন বিক্রয় যোগ্য আইটেম।

বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটের বাইরে বহু সিন্ডিকেটের প্রতিযোগিতা থাকে। চলে একে অপরকে ঘায়েল করার তীব্র প্রচেষ্টা। এখানে নীতিকথা, মূল্য বোধগুলোও বাজারে প্রবেশের এক একটা প্রচেষ্টা হয়ে উঠে। দর্শন, বির্তকগুলো মাঠ দখলের মহড়া হয়ে যায়। পাড়া মহল্লায় সন্ত্রাসী পোষা, কিছু সাপ্লাই চেন মেইনটেইন করা, সবই বাণিজ্য বসতি। এমনকি উপাসনালয় দখল, কমিটি নিয়ন্ত্রণ এগুলোও বাদ যায় না। ফলে চরম ভারসাম্যহীনতার ফল স্বরূপ সংঘাত নির্যাতন বৈষম্য সাধারণ ঘটনা হিসেব চলে আসে।

বিদ্যমান সমাজ কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে প্রতিহিংসা, বর্বরতা, সংঘাত, সংঘর্ষ প্রতিক্রিয়ার বীজমন্ত্র। পুঞ্জিভূত রয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও একে অপরকে নির্মূলের ঘাত-অভিঘাত। পশ্চাৎপদ, বিপথগামী কিংবা কখনো কখনো অন্ধকারের শক্তি হিসেবে আমরা শক্তিকেই নানা নামে আখ্যায়িত করি। নিজেদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অবস্থান থেকে একপক্ষ আরেকপক্ষকে দেখে নেয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকি যেমন রাজনীতির মাঠে, বক্তৃতা, বিবৃতি, সংসদে, টকশো’তে দেখা যায়। তেমনি ওয়াজের মাঠে, তাফসির মাহফিলের নামে, মসজিদে খুৎবায় পর্যন্ত প্রকাশ্য দেখা মেলে। বিশেষ করে নির্বাচনের মাসগুলোতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে আসে। আর সারা বছরই পাড়া মহল্লায়, ঠিকাদারী চাঁদাবাজিতে,  নানান অনুষ্ঠানে তার মহড়া দেখা যায়। এসবই শক্তির বহুমাত্রিক খেলা। কখনো কখনো রাজনীতিকরা বলেও ফেলেন মাঠ সমতল করে তারপর খেলতে আসেন দেখা যাবে কার কত শক্তি।

শক্তিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন শক্তি তো শক্তিই। মানুষ হিসেবে আমরা শক্তিকে যখনই যৌক্তিক সভ্য কাজে লাগাতে চায়, সমাজ গঠনে কাজে লাগাতে চায়, তখনই কেবল শক্তিকে সংযত পরিমার্জিত রূপ কিংবা একটা নিয়মতান্ত্রিকতার ধাঁচে ফেলতে চায়। এটি সংস্কারের স্বাভাবিক ধারণা। এটিকে আমরা অগ্রগতি মূল্যবোধ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেখতে চায় সমাজটাকে।

নৈতিক-অনৈতিক ট্যাগ লাগাই, আইনী-বেআইনী, ঈমানী কিংবা বেঈমানী কথার ম্যারপ্যাচে, কথামালা দিয়ে সমাজ বিনির্মাণের চেষ্টা করি। নতুন নতুন আইন তৈরী ও নির্বাহী আদেশে কঠোর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করি, তখন সেটি সংঘাত সংস্কৃতিকে জিইয়ে রাখে ভবিষ্যতের জন্য।  ইট মারলে পাটকেলটি খেতে হয় প্রবাদের মতো সরল নয় সেই সংঘাত স্বার্থ।

গোষ্ঠীগত শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে কাজে লাগানো হয়। সমাজে অর্থনীতিতে কিংবা রাজনীতিতে নানান পক্ষ, নানান প্রতিযোগীতা, বৈষম্য রয়েছে। এটি থাকবেই। প্রবাহমান সমাজকে আমরা কোন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে, কোন একটি পক্ষভূক্ত অবস্থান থেকে কিংবা দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করি। এক কথায় কোন একটি মোড়কবদ্ধ হয়ে। সমাজে রাজনীতিতে তো সবাই কম বেশি মোড়ানো। ফলে সূক্ষ বিশ্লেষণের পরিবর্তে পক্ষপাতযুক্ত চোখে মূল্যায়ণ করা হয়। এটি হলো ছানিযুক্ত চোখে দেখার মতো। তবে চিন্তা মূল্যায়ণের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভয়াবহতর।

নিরপেক্ষতা বলে হয়তো কিছু না থাকলেও নির্লোভ মুক্তমনা জ্ঞানবানরা অপেক্ষাকৃত সত্যকে তুলে ধরে। নানান বাস্তব কারণেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ সংঘাত। বলা যেতে পারে পাওয়ার পলিটিক্সে সবকিছু চাহিদা ও যোগান নির্ভর। চাহিদা থাকলে সংঘাত সংঘর্ষের যোগান মিলবেই। অনেকটা উৎপাদনের কাঁচামালের মতো। এক্ষেত্রে ধর্ম ও দারিদ্র্য হয়ে পড়ে তুরুপের তাস। সৃজনশীলতা, শিষ্টাচার, সুর কাব্য কলা নস্যি হয়ে যায়। প্রেম ভালোবাসাও কেমন যেন উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে নিরাপত্তাহীনতায়, আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটায়। করুন রোদনে তিলে তিলে মারা যায় কবি, শিল্পীর সুর, লেখকের চোখ। শিক্ষক ধর্মজীবী ও সব ধরনের চরিত্রহীনেরা এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সময় পরিবেশ ও চাহিদা তো পরিবর্তনশীল। তাছাড়া গায়ের জোর, চোখের জোর, বুলেট চালানোর সক্ষমতাও তো চিরদিন থাকে না। পলেস্তারার মতো খসে পড়ে অনেক কিছু। ক্ষমতার জোরে জোড়াতালি দিয়ে কেউ আজ জিতবে, কেউ জিতবে কালকে। লড়াইটা বাইরে যেমন, ভিতরে ভিতরেও চলে। উভয় পক্ষ আরো বহু গ্রুপের জন্ম দেয়। শক্তি সমরে অর্থে বিত্তে, রসদ সম্ভারে বহুমাত্রিক দূষণে দূষিত হয় সমাজ।

যেহেতু রাজনীতির বিষয়। ক্ষমতায় থাকা কিংবা যাওয়ার বিষয় ফলে শিল্পকলা, উপাসনালয়, সবই বাজারের পণ্য। এগুলো বাজারে বিক্রি চলে। কখনো বাঙালি সংস্কৃতির নামে, কখনো বা কাল্পনিক বামপন্থী পণ্যের নামে, কখনো কখনো ওয়াজ মাহফিলের নামে, ধর্মীয় উন্মাদনার নামে। সবই কেনাবেচা। ওয়াজের বায়না জোটে মোটর লঞ্চ শ্রমিক সমিতি, বাজার সমিতি, যুবলীগের মহল্লার চাঁদাবাজ শেয়াল নেতারাদের কৃপায়!। কোন কোন খ্যাতিমান যুদ্ধাপরাধী জেলে থেকেও বাজার দখল রাখতে কাউকে কাউকে সমর্থন দেয়। বন্দি কারাগারের অন্ধ কুটির থেকেও চলে বাণিজ্য বসতি। তাই তো গান ভেসে আসে  “এ কোন সকাল রাতের চেয়ে অন্ধকার”।

জীবন কোথায়? কোথায় জীবনের সৌন্দর্য। উজানে ঢেউ মাড়িয়ে জীবনের খোঁজ যারা পেয়েছেন তাঁরাই আদর্শ নমস্য। সেই পথে যে নব রাগ, নব অনুরাগের অমূল্য নিধি তা তো এই বাজারের লোকজন জানে না। আগুন দেখে লাফ দিচ্ছে নাগরিক সমাজের লোকজন। কয়লা পোড়া দেহ।

সত্যানুসন্ধানীরাও সেই পোড়া গন্ধের কিছুটা বৈরী বাতাসের দহন পায়। কারণ কিছু আবরনে সেও তো আচ্ছন্ন।